টেনিদা খ্যাঁক-খ্যাঁক করে বললে- আঃ, কচু খেলে যা। আমি কি কচুর পোলাও খেয়েছি নাকি যে বলব! ইচ্ছে হয় পয়লা শ্রাবণ ঘুঁটেপুকুরে গিয়ে খেয়ে আসিস।
ক্যাবলা অধৈর্য হয়ে বললে, টিকটিক করিস নে প্যালা, গল্পটা বলতে দে। তুমি থেমো না টেনিদা, চালিয়ে যাও।
টেনিদা বললে, সেজ পিসিমার ভক্তি দেখে আমারও দারুণ ভক্তি হল। আর ভেবে দ্যাখ কচু সেদ্ধ, কচু ঘন্ট, কচুর অম্বল, কচুর কালিয়া–মানে এত কচু ম্যানেজ করা চাট্টিখানি কথা! আমার তো কচু দেখলেই গলা কুটকুট করে। কচু ভোগের বহর দেখে মনে হল, দেবতাটি তো তবে সামান্যি নয়।
জিজ্ঞেস করলুম– বাবা কচুবনেশ্বরের কাছে ধরনা দিয়ে ফুটবল ম্যাচ জেতা যায়, পিসিমা?
পিসিমা বললেন- ফুটবল ম্যাচ বলছিস কী? বাবার অসাধ্য কাজ নেই। এই তো, ওবাড়ির মেন্টির মাথায় এমন উকুন হল যে, তিনবার ন্যাড়া করে দিয়েও উকুন যায় না। কত মারা হল, কত কবিরাজী তেল–উকুন যে-কে সেই! শেষে মেন্টির মা কচুবনেশ্বরের থানে ধন্না দিয়ে আধ ঘণ্টা চুপ করে পড়ে থেকেছে–
ব্যস, হাতে টুপ করে কিসের একটা শেকড় পড়ল। সেই শেকড় বেটে লাগিয়ে দিতেই একদিনে উকুন ঝাড়ে বংশে সাফ। আর মেন্টির যা চুল গজাল–সে যদি দেখতিস! একেবারে হাঁটু পর্যন্ত।
আমি তড়াক করে লাফিয়ে উঠলম। বললুম- বাবার থান কোন দিকে পিসিমা?
ওই তো সোজা পুবদিক বরাবর একেবারে নদীর ধারেই। কচুবনের ভেতরে বাবার থান, অনেক দূর থেকেই তো দেখা যায়। তুই সেখানে ধন্না দিতে যাবি নাকি রে? তোর আবার কী হল?
-কিছু হয়নি বলে সোজা পিসিমার সামনে থেকে চলে এলুম। মনে-মনে ঠিক করলুম, কাউকে জানতে দেওয়া নয়- চুপিচুপি একাই গিয়ে ঘণ্টাখানেক ধরনা দেব। একটা শেকড়-টেকড় যদি পেয়ে যাই–বেটে খেয়ে নেব, তারপর কালকের খেলায় আমাকে আর পায় কে? ওই ডাকসাইটে বিলটে ঘোষের হাতের তলা দিয়েই তিন তিনখানা গোল ঢুকিয়ে দেব।
একটু পরেই রামায়ণ খুলে সুর করে সূর্পনখার নাসাচ্ছেদন পড়তে-পড়তে পিসিমা যেই ঘুমিয়ে পড়েছে, আমি সোজা একেবারে কচুবনেশ্বরের খোঁজে বেরিয়ে পড়লুম।
বেশি হাঁটতে হল না। আমবাগানের ভেতর দিয়ে সিকি মাইলটাক যেতেই দেখি সামনে একটা মজা নদী আর তার পাশেই কচুর জঙ্গল। সে কী জঙ্গল। দুনিয়া সুদ্ধ সব লোককে কচু ঘণ্ট খাইয়ে দেওয়া যায়- কচুপোড়া খাওয়ানোও শক্ত নয়, এমন বন সেখানে। আর তারই মাঝখানে একটা ছোট মন্দিরের মতো বুঝলুম ওইটেই হচ্ছে বাবার থান।
বন ঠেলে তো মন্দিরে পৌঁছানো গেল। কচুর রসে গা একটু চিড়বিড় করছিল কিন্তু ওটুকু কষ্ট না করলে কি আর কেষ্ট মেলে। গিয়ে দেখি, মন্দিরে মূর্তি-ফুর্তি নেই- একটা বেদী, তার ওপর গোটা কয়েক রং-চটা নয়া পয়সা, কিছু চাল, আর একরাশ কচুর ফুল শুকিয়ে রয়েছে। সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে মন্দিরের বারান্দায় ধরনা দিলুম।
চোখ বুজে লম্বা হয়ে শুয়ে আছি। হাত দুটো মেলেই রেখেছি কোন্ হাতে টুপ করে বাবার দান পড়বে বলা যায় না তো। পড়ে আছি তো আছিই–একরাশ মশা এসে পিন-পিন করে কামড়াচ্ছে কানের কাছে গোটা দুই গুবরেপোকা ঘুরঘুর করছে, কচু লেগে হাত-পা কুটকুট করছে। কিন্তু মশা তাড়াচ্ছি না, গা চুলকোচ্ছি না, খালি দাঁত-মুখ সিঁটিয়ে প্রাণপণে প্রার্থনা করছি–দোহাই বাবা কচুবনেশ্বর, একটা শেকড়-টেকড় চটপট ফেলে দাও চিংড়িহাটার বিলটে ঘোষকে ঠাণ্ডা করে দিই। বেশি দেরি কোরো না বাবা-গা-হাত ভীষণ চুলকোচ্ছে, আর দারুণ মশা! আর তা ছাড়া থেকে-থেকে বনের ভেতর কী যেন খ্যাঁক-খ্যাঁক করে ডাকছে– যদি পাগলা শেয়াল হয় তা হলে এক কামড়েই মারা যাব। দোহাই বাবা, দেরি কোরো না– যা দেবার দিয়ে দাও, কুইক কচুবনেশ্বর।
যেই বলেছি অমনি বাঁ হাতে কী যেন টপাস করে পড়ল।
ইউরেকা বলে যেই লাফিয়ে উঠেছি–দেখি, শেকড়ের মতোই কী একটা পড়েছে বটে! কিন্তু এ কী! শেকড়টা তুরুক-তুরুক করে অল্প-অল্প লাফাচ্ছে যে!
মন্ত্রপূত জ্যান্ত শেকড় নাকি?
আর তখুনি মাথার ওপর ট্যাক-ট্যাক-টিকিস করে আওয়াজ হল। দেখি, দুটো টিকটিকি দেওয়ালের গায়ে লড়াই করছে তাদের একটার ল্যাজ নেই। মানে, মারামারিতে খসে পড়েছে।
রহস্যভেদ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গেই। তা হলে আমার হাতে শেকড় পড়েনি, পড়েছে টিকটিকির কাটা ল্যাজ! টিপে দেখলুম রবারের মতো আর অল্প-অল্প নড়ছে তখনও।
দুবুদ্ধি হলে যা হয়–ভীষণ রাগ হয়ে গেল আমার মনে হল, বাবা কচুবনেশ্বর আমায় ঠাট্টা করলে। এতক্ষণ গায়ের কুটকুটুনি আর মশার কামড় সহ্য করে শেষে কিনা টিকটিকির ল্যাজ! গোঁ গোঁ করে উঠে পড়লুম। তক্ষুনি আবার সেই শিয়ালটা খ্যাঁক খ্যাঁক করে ডেকে উঠল–মনে হল এখানে থাকাটা আর ঠিক নয়। মন্দির থেকে নেমে কচুবন ভেঙে সোজা বাড়ি চলে এলুম– আধ সের সর্ষের তেল মেখে এক ঘন্টা পরে পায়ের জ্বলুনি খানিকটা বন্ধ হল।
টেনিদা এই পর্যন্ত বলতে আমি আর ধৈর্য রাখতে পারলুম না। ফস করে জিজ্ঞেস করলুম– সেই টিকটিকির ল্যাজটা কী হল?
আঃ থাম না–আগে থেকে কেন বাগড়া দিচ্ছিস? ফের যদি কথা বলবি, তা হলে দেওয়ালের ওই টিকটিকিটক পেড়ে তোর মুখে পুরে দেব বলে টেনিদা আমার দিকে বজ্ৰদৃষ্টিতে তাকাল।
ক্যাবলা বললে ছেড়ে দাও ওর কথা, তুমি বলো।
