আমি জিজ্ঞেস করলুম, ওই যে, কী?
মোহনবাগান।
–মোহনবাগান মানে?
টিকটিকি। মানে টিকটিকির ল্যাজ।
শুনে আমি আর ক্যাবলা একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলুম, খবরদার টেনিদা, মোহনবাগানের অপমান কোরো না।
টেনিদা নাক-টাক কুঁচকে মুখটাকে পাঁপর ভাজার মতো করে বললে, আরে খেলে যা। বললুম কী, আর কী বুঝল এ-দুটো!
–এতে বোঝবার কী আছে শুনি। তুমি মোহনবাগানকে টিকটিকির ল্যাজ বলছ
-চুপ কর প্যালা–মিথ্যে কুরবকের মতো বকবক করিসনি। যদি বাবা কচুবনেশ্বরের কথা জানতিস তা হলে বুঝতিস-টিকটিকির রহস্য কী!
কচুবনেশ্বর। সে আবার কী? এবার ক্যাবলার জিজ্ঞাসা।
–সে এক অত্যন্ত ঘোরালো ব্যাপার। যাকে ফরাসী ভাষায় বলে পুঁদিচ্চেরি!
–পুঁদিচ্চেরি তো পণ্ডিচেরি। সে তো একটা জায়গার নাম। ক্যাবলা প্রতিবাদ করল।
-শট আপ। জায়গার নাম! টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে বললে, ভারি ওস্তাদ হয়ে গেছিস যে। আমি বলেছি যে, পুঁদিচ্চেরি মানে ব্যাপার অত্যন্ত সাংঘাতিক ব্যস! এ-নিয়ে তক্কো করবি তো এক চড়ে তোর কান
আমি বললুম–কানপুরে উড়ে যাবে।
রাইট।–টেনিদা গম্ভীর হয়ে বললে, এবার তা হলে বাবা কচুবনেশ্বরের কথাটা বলি। ঠাকুর-দেবতার ব্যাপার, খুব ভক্তি করে শুনবি। যদি তক্কো-টকো করিস তা হলে…
আমরা সমস্বরে বললুম-না-না।
টেনিদা শুরু করল :
সেবার গরমের ছুটিতে সেজ পিসিমার কাছে বেড়াতে গেছি ঘুঁটেপুকুরে। খাসা জায়গা। গাছে গাছে আম, জাম, কাঁঠাল, কলা
আমি বললুম-আহা, শুনেই যে লোভ হচ্ছে। ঘুঁটেপুকুরটা কোথায় টেনিদা?
ক্যাবলা ব্যাজার হয়ে বললে আঃ, গল্প থামিয়ে দিস নে। ঘুঁটেপুকুর কোথায় হবে আবার? নিশ্চয় গোবরডাঙার কাছাকাছি।
টেনিদা বললেনা, না গোবরডাঙার কাছে নয়। রানাঘাট ইসটিশন থেকে বারো মাইল দূরে। দিব্যি জায়গা রে। চারদিকে বেশ শ্যামল প্রান্তর-টান্তর–পাখির কাকলি-টাকলি কিছুরই অভাব নেই। কিন্তু তারও চাইতে বেশি আছে আম, জাম, কাঁঠাল, কলা। খেয়ে খেয়ে আমার গা থেকে এমনি আম-কাঁঠালের গন্ধ বেরুত যে, রাস্তায় আমার পেছনে-পেছনে আট-দশটা গোরু বাতাস শুকতে-শুকতে হাঁটতে থাকত। একদিন তো-কিন্তু না, গোরুর গল্প আজ আর নয় বাবা কচুবনেশ্বরের কথাই বলি।
হয়েছে কী জানিস, আমি যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুঁটেপুকুর ফুটবল ক্লাব তো আমায় লুফে নিয়েছে। আমি পটলডাঙার থাণ্ডার ক্লাবের ক্যাপটেন- একটা জাঁদরেল সেন্টার ফরোয়ার্ড–সেও ওদের জানতে বাকি নেই।
দুদিন ওদের সঙ্গে খেলেই বুঝতে পারলুম- ওদের নাম হওয়া উচিত ছিল বাতাবি নেবু স্পোর্টিং ক্লাব। মানে বাতাবি নেবু পর্যন্তই ওদের দৌড়, ফুটবলে পা ছোঁয়াতে পর্যন্ত শেখেনি। কিছুদিন তালিম-টালিম দিয়ে এক রকম দাঁড় করানো গেল। তখন ঘুঁটেপুকুরে পাঁচুগোপাল কাপের খেলা চলছিল। বললে বিশ্বাস করবিনে, আমার তালিমের চোটে ঘুঁটেপুকুর ক্লাব তিন-তিনটে গেঁয়ো টিমকে হারিয়ে দিয়ে একেবারে ফাইনালে পৌঁছে গেল। অবিশ্যি সব কটা গোল আমিই দিয়েছিলুম।
ফাইনালে উঠেই ল্যাঠা বাধল।
ওদিক থেকে উঠে এসেছে চিংড়িহাটা হিরোজ–মানে এ-তল্লাটে সব চেয়ে জাঁদরেল দল। তাদের খেলা আমি দেখেছি। এদের মতো আনাড়ি নয়–এক-আধটু খেলতে-খেলতে জানে। সব চেয়ে মারাত্মক ওদের গোলকিপার বিলটে ঘোষ। বল তো দূরের কথা, গোলের ভেতরে মাছি পর্যন্ত ঢুকতে গেলে কপাৎ করে লুফে নেয়। আর তেমনি তাগড়াই জোয়ান কাছে গিয়ে চার্জফার্জ করতে গেলে দাঁত-মুখ আস্ত নিয়ে ফিরতে হবে না।
স্পষ্ট বুঝতে পারলুম, ঘুঁটেপুকুরের পক্ষে পাঁচুগোপাল কাপ নিতান্তই মরীচিকা!
ঘুঁটেপুকুর ক্লাব চুলোয় যাক– সে জন্যে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু আমি টেনি শর্মা, খাস পটলডাঙা থাণ্ডার ক্লাবের ক্যাপ্টেন আসল কলকাতার ছেলে, আমার নাকের সামনে দিয়ে চিংড়িহাটা ড্যাং-ড্যাং করতে করতে কাপ নিয়ে যাবে। এ-অপমান প্রাণ থাকতে সহ্য করা যায়? তার ওপর এক মাস ধরে ঘুঁটেপুকুরের আম কাঁঠাল এন্তার খেয়ে চলেছি–একটা কৃতজ্ঞতাও তো আছে?
কিন্তু কী করা যায়।
দুপুরবেলা বসেবসে এই সব ভাবছি, এমন সময় শুনতে পেলুম, সেজ পিসিমা কাকে যেন বলছেন–বসেবসে ভেবে আর কী করবে–বাবা কচুবনেশ্বরের থানে গিয়ে ধন্না দাও।
কচুবনেশ্বর! ওই বিটকেল নামটা শুনেই কান খাড়া করলুম।
সেজ পিসিমা আবার বললেন- বাবার থানে ধন্না দাও–জাগ্রত দেবতা– তোমার ছেলে নির্ঘাত পরীক্ষায় পাশ করে যাবে।
গলা বাড়িয়ে দেখলুম, পিসিমা দত্ত-গিন্নির সঙ্গে কথা কইছেন। দত্ত-গিন্নি বললেন– তা হলে তাই করব, দিদি। হতচ্ছাড়া ছেলে দুবার পরীক্ষায় ডিগবাজি খেলে, উনি বলছেন এবারেও ফেল করলে লাঙলে জুড়ে চাষ করাবেন।
দত্ত-গিন্নির ছেলে চাষ করুক- আমার আপত্তি নেই, কিন্তু বাবা কচুবনেশ্বরের কথাটা কানে লেগে রইল। আর দত্ত-গিন্নি বেরিয়ে যেতে না যেতেই আমি পিসিমাকে পাকড়াও করলুম।
বাবা কচুবনেশ্বর কে পিসিমা?
শুনেই পিসিমা কপালে হাত ঠেকালেন। বললেন– দারুণ জাগ্রত দেবতা রে। গাঁয়ের পুব দিকে কচুবনের মধ্যে তাঁর থান। পয়লা শ্রাবণ ওখানে মোচ্ছব হয়- কচু সেদ্ধ, কচু ঘন্ট, কচুর ডালনা, কচুর অম্বল, আর কচুর পোলাও দিয়ে তাঁর ভোগ হয়।
টেনিদার গল্প শুনতে-শুনতে আমার জানতে ইচ্ছে হল, কচুপোড়াটাই বা বাদ গেল কেন। কিন্তু ঠাকুর-দেবতাদের কচুপোড়া খেতে বললে নিশ্চয় তাঁরা চটে যাবেন– তাই ব্যাপারটা চেপে গেলুম। জিজ্ঞেস করলুম, কচুর পোলাও খেতে কেমন লাগে টেনিদা!
