বলবার আর আছে কী–টেনিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলল : ভুল যা হয়ে গেল, তার শাস্তি পেলুম পরের দিনই।
ইস্কুলের মাঠে পাঁচুগোপাল কাপের ফাইনাল ম্যাচ। ঘুঁটেপুকুর ক্লাবকে বলেছি, প্রাণ দিয়েও কাপ জিততে হবে। আর সত্যি কথা বলতে কী-বাতাবি নেবু স্পোর্টিং আজ সত্যিই ভালো খেলছে। এমন কি আমরা হয়তো দু-একটা গোলও দিয়ে ফেলতে পারতুম– যদি ওই দুরন্ত-দুর্ধর্ষ বিলটে ঘোষটা না থাকত। আমাদের গোলকিপার প্যাঁচাও খুব ভালো খেলেছে- দু-দুবার যা সেভ করলে, দেখবার মত।
হাফ-টাইম পর্যন্ত ড্র। কিন্তু বুঝতে পারছিলুম–ঘুঁটেপুকুরের দম ফুরিয়ে আসছে, পরের পঁচিশ মিনিট ঠেকিয়ে রাখা শক্ত হবে। হাফ-টাইম হওয়ার আগেই আমি একটা মতলব এঁটে ফেলেছিলুম। মাঠের ধারে বাদাম গাছ থেকে হাওয়ায় পাতা উড়ে উড়ে পড়ছিল, তাই দেখেই প্ল্যানটা এল। মানে, মতলবটা মন্দ নয়। কিন্তু জানিস তো– মরি অরি পারি যে-কৌশলে।
হাফ-টাইম হতেই সেজ পিসিমার বাড়ির রাখাল ভেটকির কানে কানে আমি একটা পরামর্শ দিলুম। ভেটকিটা দেখতে বোকা-সোকা হলেও বেশ কাজের ছেলে। শুনেই একগাল হেসে সে দৌড় মারল।
আবার খেলা আরম্ভ হল। হাওয়ায় বাদামের পাতা উড়ে আসছে, আমি আড়চোখে তা দেখছি আর ভাবছি ভেটকি কখন আসে। এর মধ্যে চিংড়িহাটা আমাদের দারুণ চেপে ধরেছে– জান কবুল করে বাঁচাচ্ছে প্যাঁচা! আমিও ফাঁক পেলে ওদের গোলে হানা দিচ্ছি..কিন্তু বিলটে ঘোষটা যেন পাঁচিল হয়ে গোল আটকাচ্ছে।
আমি শুধু ভাবছি…ভেটকি গেল কোথায়?
অনেক দূর থেকে একটা বল গড়াতে গড়াতে আমাদের গোলের দিকে চলেছিল। একটা কড়ে আঙুল আলতো করে ছুঁইয়েও তাকে ঠেকানো যায়। কিন্তু এ কী ব্যাপার! হঠাৎ প্যাঁচা হালদার দারুণ চিৎকার ছেড়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠল–প্রাণপণে পা চুলকোতে লাগল আর সেই ফাঁকে
সোজা গোল!
শুধু প্যাঁচা হালদার? ফুলব্যাক কুচো মিত্তির লাফাতে লাফাতে সেই-যে বেরিয়ে গেল, আর ফিরলই না। প্যাঁচা সমানে পা চুলকোতে লাগল, আর পর-পর আরও চারটে গোল। মানে ফাঁকা মাঠেই গোল দিয়ে দিলে বলা যায়!
হয়েছিল কী জানিস? ভেটকিকে বলেছিলুম, গাছ থেকে একটা লাল পিঁপড়ের বাসা ছিঁড়ে এনে উড়ো পাতার সঙ্গে ওদের গোলের দিকে ছেড়ে দিতে, তা হলেই বিলটে ঘোষ একেবারে ঠাণ্ডা! ভেটকি দৌড়ে গেছে, বাসাও এনেছে- কিন্তু ওটা এমন বেল্লিক যে, হাফ টাইমে যে সাইডবদল হয় সে আর খেয়ালই করেনি। একেবারে প্যাঁচা হালদারের গায়েই ছেড়ে দিয়েছে। যখন টের পেয়েছে, তখন আর
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেনিদা থামল।
–কিন্তু কচুবনেশ্বরের টিকটিকির ল্যাজ?– আমি আবার কৌতূহল প্রকাশ করলুম।
আরে, আসল দুঃখু তো সেইখানেই। চিংড়িহাটা যখন কাপ নিয়ে চলে গেল, তখন পরিষ্কার দেখলুম, ওদের ক্যাপ্টেন বিলটে ঘোষের কালো প্যান্টে একটা নীল তাপ্পি মারা।
–তাতে কী হল? ক্যাবলা জিজ্ঞেস করলে।
–তাইতেই সব। নইলে কি ভেটকিটা এমন ভুল করে, বিলটের বদলে প্যাঁচার গায়ে পিঁপড়ের বাসা ছেড়ে দেয়! সবই সেই বাবা কচুবনেশ্বরের লীলা।
–কিছুই বুঝতে পারলুম না–হাঁ করে চেয়ে রইলুম টেনিদার মুখের দিকে।
আর টেনিদা খপ করে আমার মুখটা চেপে বন্ধ করে দিয়ে বললে, আরে, বাবার থান থেকে বেরিয়েই দেখি সামনের নদীর ধারে দড়ি টাঙিয়ে ধোপারা জামাকাপড় শুকোতে দিয়েছে। হাতে টিকটিকির ল্যাজটা তখনও ছিল– কী ভেবে আমি সেটাকে একটা কালো প্যান্টের পকেটে গুঁজে দিয়েছিলুম আর সেই প্যান্টটায় নীল রঙের একটা তাপ্পি মারা ছিল।
আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল টেনিদা। আর মাথার ওপরে টিকটিকিটা ডেকে উঠল : টিকিস-টিকিস ঠিক ঠিক?
টেনিদা আর ইয়েতি
ক্যাবলা বলে, ইয়েতি-ইয়েতি। সব বোগাস।
চ্যাঁ চ্যাঁ করে চেঁচিয়ে উঠল হাবুল সেন।
হ, তুই কইলেই বোগাস হইব! হিমালয়ের একটা মঠে ইয়েতির চামড়া রাইখ্যা দিছে জানস তুই?
ওটা কোনও বড় বানরের চামড়াও হতে পারে।–চশমাসুদ্ধ নাকটাকে আরও ওপরে তুলে ক্যাবলা গম্ভীর গলায় জবাব দিলে।
হাবুল বললে, অনেক সায়েব তো ইয়েতির কথা লেখছে।
কিন্তু কেউই চোখে দেখেনি। যেমন সবাই ভূতের গল্প বলে–অথচ নিজের চোখে ভূত দেখেছে–এমন একটা লোক খুঁজে বের কর দিকি?
এইবারে আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় টেনিদা এসে চাটুজ্যেদের রোয়াকে পৌঁছে গেল। একবার কটমট করে আমাদের তিনজনের দিকে তাকিয়ে মোটা গলায় বললে, কী নিয়ে তোরা তক্কো করছিলি র্যা?
আমি বললুম, ইয়েতি।
অ–ইয়েতি।–টেনিদা জাঁকিয়ে বসে পড়ল : তা তোরা ছেলেমানুষ–ও-সব তোরা কী জানিস? আমাকে জিজ্ঞেস কর।
হাবুল বললে, ইস কী আমার একখানা ঠাকুর্দা আসছেন রে।
টেনিদা বললে, চোপরাও। গুরুজনকে অচ্ছেদ্দা করবি তো এক চড়ে তোর কান আমি–
আমি ফিল আপ দি গ্যাপ করে দিলুম : কানপুরে পৌঁছে দেব।
ইয়া–ইয়া কারেক্ট।–বলে টেনিদা এমন জোরে আমার পিঠে থাবড়ে দিলে যে হাড়-পাঁজরাগুলো পর্যন্ত ঝনঝন করে উঠল। তারপর বললে, ইয়েতি? সেই যে কী বলে–অ্যাব–অ্যাব–অ্যাবো
ক্যাবলা বললে, অ্যাবোমিনেবল স্নোম্যান।
মরুক গে ইংরিজিটা বড় বাজে ইয়েতিই ভাল। তোরা বলছিস নেই? আমি নিজের চক্ষে ইয়েতি দেখেছি।
তুমি!–আমি আঁতকে উঠলুম।
অমন করে চমকালি কেন, শুনি?–চোখ পাকিয়ে টেনিদা বললে, আমি ইয়েতি দেখব না তো তুই দেখবি? সেদিনও পটোল দিয়ে শিঙিমাছের ঝোল খেতিস, তোর আস্পর্ধা তো কম নয়।
