তেমুজিন আবার কোত্থেকে এল?—আমি জানতে চাইলুম।
ক্যাবলা বললে, ঠিক আছে। চেঙ্গিসের আসল নাম তেমুজিনই বটে।
টেনিদা আমার মাথায় কটাং করে একটা গাঁট্টা মারল, আমি আঁতকে উঠলাম।
হিস্টরি থেকে বলছি, বুঝেছিস বুরবক কোথাকার। সব ফ্যাক্টস! তোর মগজে তো কেবল খুঁটেক্যাবলা সমঝদার, ও জানে।
হাবুল বললে, ছাড়ান দাও—ছাড়ান দাও–প্যালাডা পোলাপান।
এইসব পোলাপানকে পেলে চেঙ্গিস্ খাঁ একেবারে জলপান করে ফেলত। যত সব ইয়ে—! একটু থেমে টেনিদা আবার শুরু করল : বাঁশিওলা বললে, সম্রাট তেমুজিন, আমি শহরের সব ছারপোকা এখনি নির্মূল করে দিতে পারি। একটিরও চিহ্ন থাকবে না। কিন্তু তার বদলে দশ হাজার মোহর দিতে হবে আমাকে।
ছারপোকার কামড়ে তখন প্রাণ যায় যায়, দশ হাজার মোহর তো তুচ্ছ। চেঙ্গিস বললেন, দশ হাজার মোহর কেন কেবল, পাঁচ হাজার ভেড়াও দেব তার সঙ্গে। তাড়াও দেখি ছারপোকা!
বাঁশিওলা তখন মাঠের মাঝখানে মস্ত একটা আগুন জ্বালাতে বললে। আগুন যেই জ্বলে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে সে পিপিপি করে তার বাঁশিতে এক অদ্ভুত সুর বাজতে আরম্ভ করল। আর বললে– বিশ্বাস করবিনে—শুরু হয়ে গেল এক তাজ্জব কাণ্ড। দাড়ি-গোঁফ থেকে লক্ষ-লক্ষ কোটি-কোটি অবুদ-নির্বুদ ছারপোকা লাফিয়ে পড়ল মাটিতে–সবাই হাত-পা তুলে ট্যাঙ্গো-ট্যাঙ্গো জিঙ্গো-জিঙ্গো বলে হরিসংকীর্তনের মতো গান গাইতে গাইতে–
আমি আর থাকতে পারলুম না : ছারপোকা গান গায়।
চোপ—টেনিদা, হাবুল আর ক্যালা একসঙ্গে আমাকে থামিয়ে দিলে।
তখন সারা দেশ ছারপোকাদের নাচে-গানে ভরে গেল। চারদিক থেকে, সব দাড়ি-গোঁফ থেকে, কোটি-কোটি অবুদ-নিবুদ ছারপোকা লাইন বেঁধে নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে গিয়ে। জয় পরমাত্ম্ বলে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। ছারপোকা পোড়ার বিকট গন্ধে লোকের নাড়ি উলটে এল, নাকে দাড়ি চেপে বসে রইল সবাই।
দুঘণ্টার ভেতরেই মঙ্গোলিয়ার সব ছারপোকা ফিনিশ। সব দাড়ি, সব গোঁফ সাফ। কাউকে একটুও কামড়াচ্ছে না। চেঙ্গিস খোশ মেজাজে অর্ডার দিলেন রাজ্যের মহোৎসব চলবে সাতদিন।
বাঁশিওলা বললে, কিন্তু সম্রাট, আমার দশ হাজার মোহর? পাঁচ হাজার ভেড়া? আরে, দায় মিটে গেছে তখন, বয়ে গেছে চেঙ্গিসের টাকা দিতে। চেঙ্গিস বললেন, ইয়ার্কি? দশ হাজার মোহর, পাঁচ হাজার ভেড়া? খোয়াব দেখছিস নাকি? এই, দে তো লোকটাকে ছগণ্ডা পয়সা।
বাঁশিওয়ালা বললে, সম্রাট, টেক কেয়ার, কথার খেলাপ করবেন না। ফল তা হলে খুব ডেঞ্জারাস হবে।
অ্যাঁ! এ যে ভয় দেখায়! চেঙ্গিস চটে বললেন, বেতমিজ, কার সঙ্গে কথা কইছিস, তা জানিস? এই—কৌন হ্যায়—ইসকো কান দুটো কেটে দে তো।
কিন্তু কে কার কান কাটে? হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা তখন নতুন করে বাঁশিতে দিয়েছে ফঁ। আর সঙ্গে সঙ্গে আকাশ অন্ধকার করে উঠল ঝড়ের কালো মেঘ। চারদিকে যেন মধ্যরাত্রি নেমে এল। হু-হু করে দামাল বাতাস বইল আর সেই বাতাসে—
চড়াৎ–চড়াৎ-চড়াৎ
না, আকাশ জুড়ে মেঘ নয়–শুধু দাড়ি-গোঁফ। ঠোঁট থেকে, গাল থেকে চড়াৎ চড়াৎ করে সব উড়ে যেতে লাগল–জমাট বাঁধা দাড়ি-গোঁফের মেঘ আকাশ বেয়ে ছুটে চলল, আর সেই দাড়ির মেঘে, যেন গদির ওপর বসে, বাঁশি বাজাতে বাজাতে হ্যামলিনের বাঁশিওলাও উধাও।
আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেলে সারা মঙ্গোলিয়া এ-ওর দিকে থ হয়ে চেয়ে রইল। জাতির গর্ব দাড়ি-গোঁফের প্রেস্টিজ—সব ফিনিশ! সব মুখ একেবারে নিখুঁত করে প্রায় কামানো, কারও কারও এখানে-ওখানে খাবলা-খাবলা একটু টিকে রয়েছে এই যা। সর্বনেশে বাঁশি। তাদের সর্বনাশ করে গেছে।
রইল মহোৎসব, রইল সব। একমাস ধরে তখন জাতীয় শোক। আর দাড়ি-গোঁফ সেই যে গেল, একবারেই গেল–মোঙ্গলদের সেই থেকে ওসব গজায়ই না, ওই দু-চারগাছা খাবলা খাবলা যা দেখতে পাস। হ্যামলিনের বাঁশিওলা-হুঁ হুঁ, তার সঙ্গে চালাকি!
আর সেই রাত্রেই চেঙ্গিস মানুষ মারতে বেরিয়ে পড়ল। বাঁশিওয়ালাকে তো পায় না–কাজে কাজেই যাকে সামনে দেখে, তার মুণ্ডুটিই কচাৎ! বুঝলি—এ হল রিয়্যাল ইতিহাস। স্তোরিয়া দে মোগোরা পুঁদিচ্চেরি বোনানজা বাই সিলিনি কামুচ্চি ফিফথ সেনচুরি বি-সি!
টেনিদা থামল।
ক্যাবলা বিড় বিড় করে বললে, সব গাঁজা।
ভালো করে টেনিদা শুনতে না পেয়ে বললে, কী বললি, প্রেমেন মিত্তিরের ঘনাদা, কী যে বলিস! তাঁর পায়ের ধুলো একটু মাথায় দিলে পারলে বর্তে যেতুম রে!
টিকটিকির ল্যাজ
ক্যাবলাদের বসবার ঘরে বসে রেডিয়োতে খেলার খবর শুনছিলুম আমরা। মোহনবাগানের খেলা। আমি, টেনিদা, আর ক্যাবলা খুব মন দিয়ে শুনছিলুম, আর থেকে-থেকে চিৎকার করছিলুম—গো-গো–গোল। দলের হাবুল সেন হাজির ছিল না–সে আবার ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টার। মোহনবাগানের খেলায় হাবলার কোনও ইন্টারেস্ট নেই।
কিন্তু চেঁচিয়েও বেশি সুবিধে হল না– শেষ পর্যন্ত একটা পয়েন্ট। আমাদের মন-মেজাজ এমনি বিচ্ছিরি হয়ে গেল যে, ক্যাবলার মার নিজের হাতে তৈরি গরম গরম কাটলেটগুলো পর্যন্ত খেতে ইচ্ছে করছিল না। এই ফাঁকে টেনিদা আমার প্লেট থেকে একটা কাটলেট পাচার করল- মনের দুঃখে আমি দেখেও দেখতে পেলুম না। কিছুক্ষণ উদাস হয়ে থেকে ক্যাবলা বললে, দ্যুৎ!
আমি বললুম, হুঁ।
টেনিদা হাড়-টাড় সুদ্ধ চিবিয়ে কাটলেটগুলো শেষ করল, তারপর কিছুক্ষণ খুব ভাবুকের মতো চেয়ে রইল সামনের দেয়ালের দিকে। একটা মোটা সাইজের টিকটিকি বেশ একমনে কুপকুপ করে পোকা খাচ্ছিল, তাকে লক্ষ্য করতে করতে টেনিদা বললে, ওই যে!
