মুখ গোঁজ করে হাবুল বললে, হুঁ।
ক্যাবলা বললে, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? হিস্টরির এমন চমৎকার বইখানা পাওয়া গেল কোথায়? ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে নাকি?
ছোঃ! এ-সব বই ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে পাওয়া যায়? ভীষণ রেয়ার। দাম কত জানিস? পঞ্চাশ হাজার টাকা।
অ্যাঃ।
ক্যাবলার চশমা লাফিয়ে আর একবার নেমে পড়ল। হাবুল কুট করে আমাকে চিমটি কাটল একটা, আমি চাটুজ্যেদের রোয়াক থেকে গড়িয়ে পড়তে-পড়তে সামলে নিলুম।
ক্যাবলা বোধ হয় আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু টেনিদা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল :
স্টপ। অল সাইলেন্ট। আচ্ছা, হ্যামলিন শহরের সেই বাঁশিওয়ালার গল্পটা তোদের মনে আছে?
নিশ্চয়—নিশ্চয়–আমরা সাড়া দিলুম। সে-গল্প আর কে না জানে! শহরে ভীষণ ইঁদুরের উৎপাত বাঁশিওলা এসে তার জাদুকরী সুরে সব ইঁদুরকে নদীতে ড়ুবিয়ে মারল। শেষে শহরের লোকেরা যখন তার পাওনা টাকা দিতে চাইল না–তখন সে বাঁশির সুরে ভুলিয়ে সমস্ত বাচ্চা ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোথায় যে পাহাড়ের আড়ালে চলে গেল, কে জানে!
টেনিদা বললে, চেঙ্গিস খাঁর নাম জানিস?
কে না জানে! যা নিষ্ঠুর আর ভয়ঙ্কর লোক!
টেনিদা বললে, চেঙ্গিস দেশে দেশে মানুষ মেরে বেড়াত কেন জানিস? হ্যামলিনের ওই বাঁশিওলাকে খুঁজে ফিরত সে। কোথাও পেত না, আর ততই চটে যেত, যাকে সামনে দেখত তারই গলা কুচ করে কেটে দিত।
ক্যাবলা বললে, এসব বুঝি ওই বইতে আছে?
আছে বইকি। নইলে আমি বানিয়ে বলছি নাকি? তেমন স্বভাবই আমার নয়।
আমরা একবাক্যে বললুম, না না, কখনও নয়।
টেনিদা খুশি হয়ে বললে, তা হলে মন দিয়ে শুনে যা। এ সব হিস্টরিক্যাল ব্যাপার, কোনও তক্কো করবিনে এ-নিয়ে। এখন হয়েছে কি, আগে মোঙ্গলদের দেশে লোকের বিরাট বিরাট গোঁফদাড়ি গজাত। এমন কি, ছেলেপুলেরা জন্মাতই আধ-হাত চাপদাড়ি আর চার ইঞ্চি
গোঁফ নিয়ে।
ক্যাবলা পুরনো অভ্যেসে বলে ফেলল :স্রেফ বাজে কথা। ওদের তো গোঁফ দাড়ি হয়ই বলতে গেলে।
ইউ-চোপ রাও!–টেনিদা চোখ পাকিয়ে বললে, ফের ডিসটার্ব করবি তো–
আমি বললুম, এক চড়ে তোর কান কানপুরে রওনা হবে।
ইয়াহ্– কারেকট।—টেনিদা আমার পিঠ চাপড়ে দেবার আগেই আমি তার হাতের নাগালের বাইরে সরে গেলুম : শুনে যা কেবল। সব হিস্টরি। দাড়ি আর গোঁফের জন্যেই মোঙ্গলরা ছিল বিখ্যাত। বারো হাত তেরো হাত করে লম্বা হত দাড়ি, গোঁফগুলো শরীরের দুপাশ দিয়ে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঝুলে পড়ত। তখন যদি মঙ্গোলিয়ায় যেতিস তো সেখানে আর তোক দেখতে পেতিস না, খালি মনে হত চারদিকে কেবল গোঁফ-দাড়িই হেঁটে বেড়াচ্ছে। কী বিটকেল ব্যাপার বল দিকি?
ওই রকম পেল্লায় দাড়ি নিয়ে হাঁটত কী করে?–আমি ধাঁধায় পড়ে গেলুম।
করত কী, জানিস? দাড়িটাকে পিঠের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ঠিক বস্তার মতো করে বেঁধে রাখত। আর গোঁফটা মাথার ওপর নিয়ে গিয়ে বেশ চুড়োর মতো করে পাকিয়ে
হাবুল বললে, খাইছে।–বলেই আকাশজোড়া হাঁ করে একটা।
অমনভাবে হাঁ করবিনে হাবলা—টেনিদা হাত বাড়িয়ে কপ করে হাবুলের মুখটা বন্ধ করে দিলে : মুড নষ্ট হয়ে যায়। খোদ চেঙ্গিসের দাড়ি ছিল কত লম্বা, তা জানিস? আঠারো হাত। বারো হাত গোঁফ। যখন বেরুত তখন সাতজন লোক সঙ্গে সঙ্গে গোঁফ দাড়ি বয়ে বেড়াত। বিলেতে রানী-টানীদের মস্ত মস্ত পোশাক যেমন করে সখীরা বয়ে নিয়ে যেত না? ঠিক সেই রকম।
আর দাড়ি-গোঁফের জন্যে মোঙ্গলদের কী অহঙ্কার। তারা বলত, আমরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি। এমন দাড়ি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দাড়ির রাজা সে যে-ই।
কিন্তু বুঝলি, সব সুখ কপালে সয় না। একদিন কোত্থেকে রাজ্যে ছারপোকার আমদানি হল, কে জানে! সে কী ছারপোকা। সাইজে বোধ হয় এক-একটা চটপটির মতন, আর সংখ্যায়—কোটি-কোটি, অবুদ, নিদ! কোথায় লাগে হ্যামলিন শহরের ইঁদুর!
সেই ছারপোকা তো দাড়িতে ঢুকেছে, গোঁফে গিয়ে বাসা বেঁধেছে। ছারপোকার জ্বালায় গোটা মঙ্গোলিয়া ইয়ে ব্বাস—গেছি রে—খেয়ে ফেললে রে বলে দাপাদাপি করতে লাগল। দুচারটে ধরা পড়ে বাকি সব যে দাড়ির সেই বাঘা জঙ্গলে কোথায় লুকিয়ে যায়, কেউ আর তার নাগাল পায় না! আর স্বয়ং সম্রাট চেঙ্গিস রাতে ঘুমুতে পারেন না—দিনে বসতে পারেন না—গেলুম গেলুম বলে রাতদিন লাফাচ্ছেন আর সঙ্গে লাফাচ্ছে দাড়ি-গোঁফ ধরে-থাকা সেই সাতটা লোক। গোটা মঙ্গোলিয়া যাকে বলে জেরবার হয়ে গেল!
হাবুল বললে, অত ঝাটে কাম কী, দাড়ি-গোঁফ কামাইয়া ফ্যালাইলেই তো চুইক্যা যায়।
কে দাড়ি কামাবে? মঙ্গোলিয়ানরা? যা না, বলে আয় না একবার চেঙ্গিস খাঁকে!—টেনিস বিদ্রুপ করে বললে, দাড়ি ওদের প্রেস্টিজ—গর্ব–বল না গিয়ে! এক কোপে মুণ্ডটি নামিয়ে দেবে।
হাবুল বললে, থাউক, থাউক, আর কাম নাই।
টেনিদা বলে চলল : হুঁ, খেয়াল থাকে যেন। যাই হোক, এমন সময় একদিন সম্রাটের সভায় এসে হাজির হ্যামলিনের সেই বাঁশিওলা। কিন্তু সভা আর কোথায়! দারুণ হট্টগোল সেখানে। পাত্র-মিত্র সেনাপতি-উজীর-নাজীর সব খালি লাফাচ্ছে, দাড়ি-চুল ঝাড়ছে—দুএকটা ছারপোকা বেমক্কা মাটিতে পড়ে গেল, সবাই চেঁচিয়ে উঠল : মার-মার—ওই যে–ওই–যে—
বাঁশিওলা করল কী, ঢুকেই পি করে তার বাঁশিটা দিলে বাজিয়ে। আর বাঁশির কী ম্যাজিক–সঙ্গে-সঙ্গে সভা স্তব্ধ! এমন কি দাড়ি-গোঁফের ভেতর ছারপোকাগুলো পর্যন্ত কামড়ানো বন্ধ করে দিলে। গম্ভীর গলায় বাঁশিওলা বললে, সম্রাট তেমুজিন
