চামচিকেটা আবার উড়তে শুরু করেছে। আমার মতোই তো বিনাটিকিটের যাত্রী চেকার দেখে ভয় পেয়েছে নিশ্চয়।
আর সঙ্গে সঙ্গেই সায়েব ভয়ানক চমকে উঠল। বললে, ওটা কী পাখি?
জবাব দিতে যাচ্ছিলাম, চামচিকে কিন্তু তার আগেই সায়েব হাঁইমাই করে চেঁচিয়ে উঠল। নাকের দিকে চামচিকের এত নজর কেন কে জানে- ঠিক সায়েবের নাকেই একটা ঝাঁপটা মেরে চলে গেল।
ওটা কী পাখি? কী বদখত দেখতে; সায়েব কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেল! চুনকাম করা মুখটা তার ভয়ে পানসে হয়ে গেছে।
আমি বুঝলাম এই মওকা! বললাম, তুমি কি ও-পাখি কখনও দ্যাখোনি?
–নো-নেভার! আমি মাত্র ছমাস আগে আফ্রিকা থেকে ইণ্ডিয়ায় এসেছি। সিংহ দেখেছি- গণ্ডার দেখেছি কিন্তু
সায়েব শেষ করতে পারল না।
চামচিকেটা আর একবার পাক খেয়ে গেল। একটু হলেই প্রায় খিমচে ধরেছিল সায়েবের মুখ। বোধহয় ভেবেছিল, ওটা চালকুমড়ো।
সায়েব বললে, মিস্টার ও কি কামড়ায়?
আমি বললাম, মোক্ষম। ভীষণ বিষাক্ত! এক কামড়েই লোক মারা যায়। এক মিনিটের মধ্যেই।
–হোয়াট! বলে সায়েব লাফিয়ে উঠল। তারপরে আমার কম্বল ধরে টানাটানি করতে লাগল;
মিস্টার—প্লিজ–ফর গড সেক আমাকে একটা কম্বল দাও।
তারপর আমি ওর কামড়ে মারা যাই আর কি। ও সব চলবে না। আমি শক্ত করে কম্বল চেপে রইলাম।
–অ্যাঁ? তা হলে!–বলেই একটা অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল সায়েব। বোঁ করে একেবারে চেন ধরে ঝুলে পড়ল প্রাণপণে। তারপর জানলা খুলে দিয়ে গলা ফাটিয়ে চ্যাঁচাতে লাগল। হেলপ-হেলপ–আর খোলা জানলা পেয়েই সাহেবের কাঁধের ওপর দিয়ে বাইরের অন্ধকারে চামচিকে ভ্যানিস।
সায়েব খানিকক্ষণ হতভম্ব হয়ে রইল। একটু দম নিয়ে মস্ত একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললে, যাক–স্যামসিকেটা বাইরে চলে গেছে। এখন আর ভয় নেই–কী বলো?
আমি বললাম, না, তা নেই। তবে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা দেবার জন্য তৈরি থাকো।
সাহেবের মুখ হাঁ হয়ে গেল : কেন?
–বিনা কারণে চেন টেনেছ গাড়ি থামল বলে। আর শোনো সায়েব- চামচিকে খুব লক্ষ্মী পাখি। কাউকে কামড়ায় না কাউকে কিছু বলে না। তুমি রেলের কর্মচারী হয়ে চামচিকে দেখে চেন টেনেছ–এ জন্যে তোমার শুধু ফাইন নয়– চাকুরিও যেতে পারে।
ওদিকে গাড়ি আস্তে আস্তে থেমে আসছে তখন। মিস্টার রাইনোসেরাস কেমন মিটমিট করে তাকাচ্ছে আমার দিকে। ভয়ে এখন প্রায় মিস্টার হেয়ার মানে খরগোশ হয়ে গেছে।
তারপরই আমার ডান হাত চেপে ধরল দুহাতে।
–শোনো মিস্টার, আজ থেকে তুমি আমার বুজুম ফ্রেণ্ড। মানে প্রাণের বন্ধু। তোমাকে আমি ফার্স্ট ক্লাস সেলুনে নিয়ে যাচ্ছি- দেখবে তোফা ঘুম দেবে। হাওড়ায় নিয়ে গিয়ে কেলনারের ওখানে তোমাকে পেট ভরে খাইয়ে দেব। শুধু গার্ড এলে বলতে হবে, গাড়িতে একটা গুণ্ডা পিস্তল নিয়ে ঢুকেছিল, তাই আমরা চেন টেনেছি। বলো–রাজি?
রাজি না হয়ে আর কী করি! এত করে অনুরোধ করছে যখন।
বিজয়গর্বে হাসলে টেনিদা : যা ক্যাবলা– আর চার পয়সার পাঁঠার ঘুগনি নিয়ে আয়।
চেঙ্গিস আর হ্যামলিনের বাঁশিওলা
টেনিদা বললে, আজকাল আমি খুব হিস্টরি পড়ছি।
আমরা বললুম, তাই নাকি।
যা একখানা বই হাতে পেয়েছি না, শুনলে তোদর চোখ কপালে উঠে যাবে। চুয়িং গামটাকে গালের আর একপাশে ঠেলে দিয়ে ক্যাবলা বললে, বইটার নাম কী, শুনি?
টেনিদা হযবরলর কাকেশ্বর কুচকুচের মতো গলায় বললে, স্তোরিয়া দে মোগোরা পুঁদিচ্চেরি বোনানজা বাই সিলিনি কামুচ্চি।
শুনে ক্যাবলার চশমাটা যেন এক লাফে নাকের নীচে ঝুলে পড়ল। হাবুল যেন আঁক করে একটা শব্দ করল। আমি একটা বিষম খেলুম।
ক্যাবলাই সামলে নিয়ে বললে– কী বললে?
স্তোরিয়া দে মোগোরা পুঁদিচ্চেরি—
থাক—থাক। এতেই যথেষ্ট। যতদূর বুঝছি দারুণ পুঁদিচ্চেরি।
আলবাত পুঁদিচ্চেরি! যাকে বাংলায় বলে ডেনজারাস। ল্যাটিন ভাষায় লেখা কিনা।
কুঁচো চিংড়ির মত মুখ করে হাবুল জিজ্ঞেস করলে, তুমি আবার ল্যাটিন ভাষা শিখলা কবে? শুনি নাই তো কোনওদিন।
খুশিতে টেনিদার নাকটা আট আনার সিঙাড়ার মতো ফুলে উঠল : নিজের গুণের কথা সব কী বলতে আছে রে। লজ্জা করে না? আমি আবার এ ব্যাপারে একটু—মানে মেফিস্টোফিলিস-বাংলায় যাকে বলে বিনয়ী।
ক্যাবলা বললে, ধেৎ! মেফিস্টোফিলিস মানে হল—
টেনিদা বললে, চোপ!
পশ্চিমে থাকার অভ্যেসটা ক্যাবলার এখনও যায়নি। মিইয়ে গিয়ে বললে, তব ঠিক হ্যায়, কোই বাত নেহি।
হ্যাঁ—কোই বাত নেহি।
এর মধ্যে হাবলা আমার কানে কানে বলছিল, হ ঘোড়ার ডিম, বিনয়ী না কচুর ঘণ্ট–কিন্তু টেনিদার চোখ এড়াল না। বাঘা গলায় জিজ্ঞেস করলে, হাবলা, হোয়াট সেয়িং? ইন প্যালাজ ইয়ার?
কিচ্ছু না টেনিদা, কিছু না।
কিচ্ছু না?—টেনিদা বিকট ভেংচি কাটল একটা : চালাকি পায়া হ্যায়? আমি তোকে চিনিনে? নিশ্চয়ই আমার বদনাম করছিলি। এক টাকার তেলেভাজা নিয়ে আয় এক্ষুনি।
আমার কাছে পয়সা নাই।
পয়সা নেই? ইয়ার্কি? ওই যে পকেট থেকে একটাকার নোট উঁকি মারছে একখানা? গো–কুইক—ভেরি কুইক—
.
তেলেভাজা শেষ করে টেনিদা বললে, দুঃখ করিসনি হাবলা এই যে ব্রাহ্মণ ভোজন করালি, তাতে বিস্তর পুণ্যি হবে তোর। আর সেই ব্যাটিন বইটা থেকে এখন এমন একখানা গপ্পো বলব না, যে তোর একটাকার তেলেভাজার ব্যথা বেমালুম ভুলে যাবি।
