একবার ভাবলাম, উঠে ওটাকে তাড়াই। কিন্তু যা শীতকম্বল ছেড়ে নড়ে কার সাধ্যি। তা ছাড়া উঠতে গেলে পেট ফুঁড়ে শিং-টিং সুষ্ঠু পাঁঠাটাই বেরিয়ে আসবে হয়তো বা। তারপর আবার যখন সাঁ করে নাকের কাছে এল, তখন বসে পড়ে আর কি। আমার খাড়া নাকটা দেখে মনুমেন্টের ডগাই ভাবল বোধ হয়।
আমি বিচ্ছিরি মুখ করে বললাম, ফর-র-ফুস!–মানে চামচিকেটিকে ভয় দেখালাম। তাইতেই আঁতকে গেল কি না কে জানে সাঁ করে গিয়ে ঝুলে রইল একটা কোট-হ্যাঙ্গারের সঙ্গে। ঠিক মনে হল, ছোট একটা কালো পুঁটলি ঝুলছে!
ঠিক অমনি সময় ঘটাঘট শব্দে কামরার দরজা নড়ে উঠল।
এত রাত্তিরে কে আবার জ্বালাতে এল? নিশ্চয় কোনও প্যাসেঞ্জার। প্রথমটায় ভাবলাম, পড়ে থাকি ঘাপটি মেরে। যতক্ষণ খুশি খটখটিয়ে কেটে পড়ুক লোকটা। আমি কম্বলের ভেতরে মুখ ঢোকালাম।
কিন্তু কী একটা যাচ্ছেতাই স্টেশনে যে গাড়িটা থেমেছে কে জানে! সেই যে দাঁড়িয়ে আছে–একদম নট নড়নচড়ন! যেন নেমন্তন্ন খেতে বসেছে! ওদিকে দরজায় খটখটানি সমানে চলতে লাগল। ভেঙে ফেলে আর কি!
এমন বেয়াক্কেলে তোক তো কখনও দেখিনি! ট্রেনে কি আর কামরা নেই যে এখানে এসে মাথা খুঁড়ে মরছে! ভারি রাগ হল। দরজা না খুলেও উপায় নেই- রিজার্ভ গাড়ি তো নয় আর। খুব কড়া গলায় হিন্দীতে একটা গালাগাল দেব মনে করে উঠে পড়লাম।
ক্যাবলা হঠাৎ বাধা দিয়ে বললে, তুমি মোটেই হিন্দী জানো না টেনিদা!
–মানে?
–তুমি যা বললো তা একেবারেই হিন্দী হয় না। আমি ছেলেবেলা থেকে পশ্চিমে ছিলাম
-চুপ কর বলছি ক্যাবলা!–টেনিদা হুঙ্কার ছাড়ল; ফের যদি ভুল ধরতে এসেছিস তো এক চাঁটিতে তোকে চাপাটি বানিয়ে ফেলব! আমার হিন্দী শুনে বাড়ির ঠাকুর পর্যন্ত ছাপরায় পালিয়ে গেল, তা জানিস?
হাবুল বললে, ছাইড়্যা দাও– চ্যাংড়ার কথা কি ধরতে আছে?
–চ্যাংড়া! চিংড়িমাছের মতো ভেজে খেয়ে ফেলব। আমি বললাম, ওটা অখাদ্য জীব– খেলে পেট কামড়াবে, হজম করতে পারবে না। তার চেয়ে গল্পটা বলে যাও।
–হুঁ, শোন! টেনিদা ক্যাবলার ছ্যাবলামি দমন করে আবার বলে চলল :
উঠে দরজা খুলে যেই বলতে গেছি এই আপ কেইসা আদমি হ্যায় সঙ্গে সঙ্গে গাঁক গাঁক করে আওয়াজ।
–গাঁক—গাঁক?
–মানে সায়েব। মানে টিকিট চেকার।
–সেই রাইনোসেরাস? বকুনি খেয়েও ক্যাবলা সামলাতে পারল না।
–আবার কে? একদম খাঁটি সায়েব-পা থেকে মাথা ইস্তক।
সেই যে একরকম সায়েব আছে না? গায়ের রং মোষের মতো কালো, ঘামলে গা দিয়ে কালি বেরোয় তাদের দেখলে সায়েবের ওপরে ঘেন্না ধরে যায় মোটেই সেরকমটি নয়। চুনকাম করা ফর্সা রঙ হাঁড়ির মতো মুখ, মোটা নাকের ছ্যাঁদায় বড় বড় লালচে লোম হাসলে মুখ ভর্তি মুলো দেখা যায়, আর গলার আওয়াজ শুনলে মনে হয় ষাঁড় ডাকছে একেবারে সেই জিনিসটি। ঢুকেই চোস্ত ইংরেজীতে আমাকে বললে, এই সন্ধেবেলাতেই এমন করে ঘুমোচ্ছ কেন? এইটেই সবচেয়ে বিচ্ছিরি হ্যাবিট।
কী রকম চোস্ত ইংরেজী টেনিদা? আমি জানতে চাইলাম।
–সেসব শুনে কী করবি?…টেনিদা উঁচু দরের হাসি হাসল! শুনেও কিছু বুঝতে পারবি না–সায়েবের ইংরেজী কিনা! সে যাক। সায়েবের কথা শুনে আমার তো চোখ কপালে উঠল রাত বারোটাকে বলছে সন্ধেবেলা। তা হলে ওদের রাত্তির হয় কখন? সকালে নাকি?
তারপরেই সায়েব বললে, তোমার টিকিট কই?
আমার তো তৈরি জবাব ছিলই। বললাম, আমি পাটনার বাঁড়ুজ্যে মশাইয়ের ভাগনে। আমার কথা ক্রু-ইন-চার্জ চাটুজ্যেকে বলা আছে।
তাই শুনে সায়েবটা এমনি দাঁত খিচোল যে, মনে হল মুলোর দোকান খুলে বসেছে। নাকের লোমের ভেতরে যেন ঝড় উঠল, আর বেরিয়ে এল খানিকটা গরগরে আওয়াজ।
যা বললে, শুনে তো আমার চোখ চড়ক গাছ।
–তোমার বাঁড়ুজ্যে মামাকে আমি থোরাই পরোয়া করি। এসব ডাবলুটিরা ওরকম ঢের মামা পাতায়। তা ছাড়া চাটুজ্যের ডিউটি বদল হয়ে গেছে আমিই এই ট্রেনের ক্রু-ইন-চার্জ। অতএব চালাকি রেখে পাটনা-টু-হাওড়া সেকেন্ড ক্লাস ফেয়ার আর বাড়তি জরিমানা বের করো।
পকেটে সব সুদ্ধ পাঁচটা টাকা আছে- সেকেন্ড ক্লাস দূরে থাক, থার্ড ক্লাসের ভাড়াও হয় না; সর্ষের ফুল এর আগে দেখিনি এবার দেখতে পেলাম। আর আমার গা দিয়ে সেই শীতেও দরদর করে সর্ষের তেল পড়তে লাগল।
আমি বলতে গেলাম, দ্যাখো সায়েব–
-সায়েব সায়েব বোলো না–আমার নাম মিস্টার রাইনোসেরাস। আমার গণ্ডারের মতো গোঁ। ভাড়া যদি না দাও- হাওড়ায় নেমে তোমায় পুলিশে দেব। ততক্ষণে আমি গাড়িতে চাবি বন্ধ করে রেখে যাচ্ছি।
কী বলব জানিস প্যালা– আমি পটলডাঙার টেনিরাম- অমন ঢের সায়েব দেখেছি। ইচ্ছে করলেই সায়েবকে ধরে চলতি গাড়ির জানলা দিয়ে ফেলে দিতে পারতাম। কিন্তু আমরা বোষ্টুম–জীবহিংসা করতে নেই, তাই অনেক কষ্টে রাগটা সামলে নিলাম।
হাবুল সেন বলে বসল : জীবহিংসা কর না, তবে পাঁঠা খাও ক্যান?
–আরে পাঁঠার কথা আলাদা। ওরা হল অবোলা জীব, বামুনের পেটে গেলে স্বর্গে যায়। পাঁঠা খাওয়া মানেই জীবে দয়া করা! সে যাক। কিন্তু সায়েবকে নিয়ে এখন আমি করি কী? এ তো আচ্ছা প্যাঁচ কষে বসেছে! শেষকালে সত্যিই জেলে যেতে না হয়।
কিন্তু ভগবান ভরসা!
পকেট থেকে একটা ছোট খাতা বের করে সায়েব কী লিখতে যাচ্ছিল পেনসিল দিয়ে হঠাৎ সেই শব্দ—ফর-ফর-ফরাৎ!
