কিন্তু তখন কি আর মাছ, তাল কিছু আছে? খেলা ফিনিশের সঙ্গে তাও ফিনিশ। অতগুলো লোক!
টেনিদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল : তখন প্রাণের আনন্দে মাছ ধরে আর তাল কুড়িয়ে বিচালিগ্রাম চিল্লোতে লাগল : থ্রি চিয়ার্স ফর বিচালিগ্রাম, আর ঘুঁটেপাড়া চ্যাঁচাতে লাগল : থ্রি টিয়ার্স ফর ঘুঁটেপাড়া!
টিয়ার্স? মানে চোখের জল?-ক্যাবলা আবার বিস্মিত হল। হ্যাঁ–টিয়ার্স। পালটা জবাব দিতে হবে না? সে যাক। কিন্তু একটা ম্যাচে একাই বত্রিশটা গোল দিলুম, পেলে-ইউসেবিয়ো-রিভেরা-চার্লটন কাত করে দিলুম, কিন্তু একটা কই মাছ, একটা তালও পেলুম না–এ-দুঃখ মরলেও আমার যাবে না রে। –আবার বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলল টেনিদা।
চামচিকে আর টিকিট চেকার
বুঝলি প্যালা, চামচিকে ভীষণ ডেঞ্জারাস!…
একটা ফুটো শাল পাতায় করে পটলডাঙার টেনিদা ঘুগনি খাচ্ছিল। শালপাতার তলা দিয়ে হাতে খানিক ঘুগনির রস পড়েছিল, চট করে সেটা চেটে নিয়ে পাতাটা তালগোল পাকিয়ে ছুঁড়ে দিলে ক্যাবলার নাকের ওপর। তারপর আবার বললে, হুঁ হুঁ, ভীষণ ডেঞ্জারাস চামচিকে।
কী কইর্যা বোঝলা-কও দেখি?
বিশুদ্ধ ঢাকাই ভাষায় জানতে চাইল হাবুল সেন।
–আচ্ছা, বল চামচিকের ইংরেজী কী?
আমি, ক্যাবলা আর হাবুল সেন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম।
বল না।
শেষকালে ভেবে-চিন্তে ক্যাবলা বললে, স্মল ব্যাট। মানে ছোট বাদুড়!
–তোর মুণ্ডু।
আমি বললাম, তবে ব্যাটলেট। তা-ও নয়? তা হলে? ব্যাটস সান–মানে, বাদুড়ের ছেলে? হল না? আচ্ছা, ব্রিক ব্যাট কাকে বলে?
টেনিদা বললে থাম উল্লুক! ব্রিক ব্যাট হল থান ইট। এবার তাই একটা তোর মাথায় ভাঙব।
হাবুল সেন গম্ভীর মুখে বললে, হইছে।
কী হল?
–স্কিন মোল।
–স্কিন মোল?…টেনিদা খাঁড়ার মতো নাকটাকে মনুমেন্টের মতো উঁচু করে ধরল, সে আবার কী?
স্কিন মানে হইল চাম– অর্থাৎ কিনা চামড়া। আর আমাগো দ্যাশে ছুঁচারে কয় চিকা– মোল। দুইটা মিলাইয়া স্কিন মোল।
টেনিদা খেপে গেল : দ্যাখ হাবুল, ইয়ার্কির একটা মাত্রা আছে, বুঝলি? স্কিন মোল। ইঃ–গবেষণার দৌড়টা দেখ একবার।
আমি বললাম, চামচিকের ইংরেজী কী তা নিয়ে আমাদের জ্বালাচ্ছ কেন? ডিক্সনারি দ্যাখো গে!
–ডিক্সনারিতেও নেই। টেনিদা জয়ের হাসি হাসল।
তা হলে?
–তা হলে এইটাই প্রমাণ হল চামচিকে কী ভীষণ জিনিস! অর্থাৎ এমন ভয়ানক যে চামচিকেকে সাহেবরাও ভয় পায়! মনে কর না- যারা আফ্রিকার জঙ্গলে গিয়ে সিংহ আর গরিলা মারে, যারা যুদ্ধে গিয়ে দমাদম বোমা আর কামান ছোড়ে, তারা সুদ্ধ চামচিকের নাম করতে ভয় পায়। আমি নিজের চোখেই সেই ভীষণ ব্যাপারটা দেখেছি।
কী ভীষণ ব্যাপার?–গল্পের গন্ধে আমরা তিনজনে টেনিদাকে চেপে ধরলাম : বলল এক্ষুনি।
ক্যাবলা, তাহলে চটপট যা। গলির মোড় থেকে আরও দুআনার পাঁঠার ঘুগনি নিয়ে আয়। রসদ না হলে গল্প জমবে না।
ব্যাজার মুখে ক্যাবলা ঘুগনি আনতে গেল। দুআনার ঘুগনি একাই সবটা চেটেপুটে খেয়ে, মানে আমাদের এক ফোঁটাও ভাগ না দিয়ে, টেনিদা শুরু করলে : তবে শোন
সেবার পাটনায় গেছি ছোটমামার ওখানে বেড়াতে। ছোটমামা রেলে চাকরি করে– আসার সময় আমাকে বিনা টিকিটেই তুলে দিলে দিল্লি এক্সপ্রেসে। বললে, গাড়িতে চ্যাটার্জি যাচ্ছে ইনচার্জ– আমার বন্ধু। কোনও ভাবনা নেই–সেই-ই তোকে হাওড়া স্টেশনের গেট পর্যন্ত পার করে দেবে!
নিশ্চিন্ত মনে আমি একটা ফাঁকা সেকেন্ড ক্লাস কামরায় চড়ে লম্বা হয়ে পড়লাম।
শীতের রাত। তার ওপর পশ্চিমের ঠাণ্ডা-হাড়ে পর্যন্ত কাঁপুনি ধরায়।
কিন্তু কে জানত সেদিন হঠাৎ মাঝপথেই চ্যাটার্জির ডিউটি বদলে যাবে। আর তার জায়গায় আসবে কী নাম ওর– মিস্টার রাইনোসেরাস।
ক্যাবলা বললে, রাইনোসেরাস মানে গণ্ডার।
-থাম, বেশি বিদ্যে ফলাসনি।…টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে উঠল, যেন ডিক্সনারি একেবারে। সায়েবের বাপ-মা যদি ছেলের নাম গণ্ডার রাখে তাতে তোর কী র্যা? তোর নাম যে কিশলয় কুমার না হয়ে ক্যাবলা হয়েছে, তাতে করে কী ক্ষতি হয়েছে শুনি?
হাবুল সেন বললে, ছাড়ান দাও- ছাড়ান দাও। পোলাপান!
–হুঁ, পোলাপান! আবার যদি বকবক করে তো: জলপান করে ছাড়ব! যাক শোন। আমি তো বেশ করে গাড়ির দরজা-জানালা এঁটে শুয়ে পড়েছি। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। একে দুখানা কম্বলে শীত কাটছে না, তার ওপরে আবার খাওয়াটাও হয়ে গেছে বড্ড বেশি। মামাবাড়ির কালিয়ার পাঁঠাটা যেন জ্যান্ত হয়ে উঠে গাড়ির তালে তালে পেটের ভেতর শিং দিয়ে ঢুঁ মারছে। লোভে পড়ে অতটা না খেয়ে ফেলেই চলত।
পেট গরম হয়ে গেলেই লোকে নানা রকম দুঃস্বপ্ন দেখে– জানিস তো? আমিও স্বপ্ন দেখতে লাগলাম, আমার পেটের ভেতরে সেই যে বাতাপি না ইম্বল কে একটা ছিল– সেইটে পাঁঠা হয়ে ঢুকেছে। একটা রাক্ষস হিন্দী করে বলছে : এ ইম্বল– আভি ইসকো পেট ফাটাকে নিকাল আও–
বাপরে বলে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম! চোখ চেয়ে দেখি, গাড়ির ভেতরে বাতাপি বা ইম্বল কেউ নেই– শুধু ফরফর করে একটা চামচিকে উড়ছে। একেবারে বোঁ করে আমার মুখের সামনে দিয়ে উড়ে চলে গেল–নাকটাই খিমচে ধরে আর কি!
এ তো আচ্ছা উৎপাত।
কোন দিক দিয়ে এল কে জানে? চারিদিকে তো দরজা-জানালা সবই বন্ধ। তবে চামচিকের পক্ষে সবই সম্ভব। মানে অসাধ্য কিছু নেই।
