বাঘারু না দেখেও বোঝে, ভোখা উঠে এসেছে, এখন তার পায়ের কাছে। ভাবতে-ভাবতেই ডান পায়ের আঙুলে লোখার ঠোঁটের ছোঁয়া পায়। পা-টা ছুঁড়ে বাতাসে লোখাকে খোঁজে। সেটা বুঝেই লোখা একটু এগিয়ে আসে। আর লোখার পিঠে বাঘারু তার বা পা-টা রাখে। সেটা নিয়ে একটু দাঁড়িয়ে লোখা বসে পড়ে। বাঘারুর পায়ের কাছে আবার কুণ্ডলী পাকিয়ে যায়। বাঘারু বহু ওপরের আকাশের দিকে তাকিয়ে খুক করে হাসে, শালো আলসিয়া।
রাত্রির শেষ আর ভোরের শুরুর মাঝখানের এই সময়টাতে সব চেয়ে বেশি অন্ধকার। চাঁদ আর তারার আলো আকাশে থাকে না। ভোরের আলো ফোটে না। ফরেস্টের বড় বড় গাছের মাথা আকাশে, ঝোপঝাড় মাটিতে লেপে যায়। ছায়ামূর্তিগুলোও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে না। অ্যালায়ও ছায়া জাগো নাই। ভোখার পিঠের ওপরে বাঁ পা-টা বাঘারু নাড়ায়–শালো, আলসিয়া। ভুখিবারও চাহে না–নিদ যাবার চাহে। এ ঘুমা। ঘুমা কেনে। শালো নিদুয়া কুত্তা, ঘুমা।
বাঘারু পা-টা টেনে নিয়ে উঠে বসে। দুই হাতে হাঁটু জড়িয়ে বসলে সে দেখে পাখিটা দুটো পালক খসিয়ে গেছে। হাত বাড়িয়ে পালক দুটো ধরতে বা পা-টা তার পড়ে যায়। এখন সে তার ডান হাঁটুর ওপর ডান হাতটা রেখে, বা হাতে পালক দুটো ধরে বা পায়ের ওপর রাখে। মনে রাখা, ভুলে যাওয়া, মনে করা, ভুলে থাকা–এইসব মানসিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়ায় ত বাঘারু খুব অভ্যস্ত নয়। পাখির সেই অনতিক্রম্য প্রমাণের দিকে তাকিয়ে শুধু সে মনে করতে পারে কালিও ফেলি গেইছে দুখান, তার আগের দিন সনঝাত আরো একখান ফেলি গেইছে। বাঘারু সেই পালক হাতে, এবার নদীর দিকে তাকায়। ঠিক নদীর দিকে নয়, তার বাথানের দিকে, বা বাথানসহ নদীর দিকে। আর, এই তাকানোর সঙ্গে-সঙ্গে তার কানে আসে জলের ছুটে যাওয়ার আওয়াজ আর জলের ভেতরে নুড়ি-পাথরের টুঙটাঙ। ঠিক এই সময়টাতে এই আওয়াজ ওঠে। রাত্রিতে বনের নানা আওয়াজ কানে আসে না। দিনের বেলাও তাই। রাত আর দিনের মাঝখানে এই সময়টাতে জলস্রোতের তলায় নুড়ি-পাথরের ধ্বনি কিছুক্ষণ ধরে বাজতে থাকে। এই ধ্বনি অনেক সময় ঘুম ভেঙেই কানে আসে। আর কানে এলেই বাঘারু বোঝে সকাল হতে শুরু করেছে।
আওয়াজগুলো একে-একে শুনে নিয়ে বাঘারু এবার নদী থেকে চোখ সরিয়ে তাকায় তার মোষগুলোর দিকে। এই পাথরটাকে এই জন্যেই বেছেছে বাঘারু। সব চেয়ে উঁচু পাথরটার তিন পাশে মোষগুলো ছড়িয়ে থাকে বালি আর পাথরের ওপর। তাকালেই প্রায় সবটা দেখা যায়। বৃষ্টিবাদলা মা থাকলে বাঘারু এই পাথরটাতেই শোয়। বৃষ্টিবাদলার জন্যে সামনের জঙ্গলের ভেতরে একটা গাম্ভারি গাছের সব চেয়ে তলার ডালটার ফেঁকড়িতে বাঁশ কঞ্চি-কাঠের টুকরো-টাকরা দিয়ে মাচান বানিয়েছে আর তার ওপরে সেই তরিকা পাতাগুলো বেঁধে-বেঁধে, ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে, জোড়া লাগিয়ে একটা ছাউনি বানিয়েছে। গাছটার ঠাসা পাতার ভেতরে তরিকা পাতার ঐ ছাউনির নীচে হাত-পা গুটিয়ে বাঘারু ঘুমোতেও পারে।
মোঘগুলোর দিকে তাকাতেই কানে আসে রোমন্থনের সমবেত আওয়াজ। এই আওয়াজটাও সারারাত ধরে বাড়তে থাকে বটে কিন্তু ফরেস্টের অন্য সব আওয়াজ থেমে না গেলে শোনা যায় না আর যদি শোনা যায় তাহলে মনে হয় জঙ্গলের ভেতরে কোনো একটি জায়গাতে যেন কোনো মাটির গর্ত তৈরি হচ্ছে। এতগুলো মোষের এই নিজের গলার ঘাস, মুখ না খুলে, নিজেই চিবুনোর আওয়াজের এমনই একটা শরীর আছে যা ফরেস্টের ভেতর মিশে থাকে, ঝিঁঝির আওয়াজের মত। যতক্ষণ বাথান বেঁধে বনের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় ততক্ষণ এই বাথান ফরেস্ট থেকে আলাদা; যখনই বনের সীমার বাইরে এই চরে রাত ভোর করে তখনই ফরেস্টের সঙ্গে মিশে যায়।
বাথানটাকেই আর-একটু ভাল করে দেখতে বাঘারু উঠে দাঁড়ায়। মনে হয়, পাথরটা আরো খানিকটা লম্বা হয়ে গেল। বাঘারু যে ছায়ামূর্তি হয়ে উঠতে পারে, তার কারণ বাঘারুকে ঘিরে আকাশ ও অবকাশ ছাড়া আর-কিছু ছিল না।
এই বনে সারাদিন সারারাত ধরে আলোকপাত বদলায়, ছায়াপাত বদলায়। পাথরের, গাছের, কখনো বা মানুষের মাথা–যা কিছু আকাশ ছুঁড়ে ওঠে তারই আকার বদলায়। আকাশরেখার এমন বিরতিহীন বদলেই শুধু সময়ের প্রবাহ বোঝা যায়।, বাঘারু দেখে, বাথান ঠিকই আছে। ভোখা ডাকে নি মানেই, ঠিক আছে। তোখা ঘুমোচ্ছে মানেই, সব ঠিক আছে। বাঘারু ভোখর সামনে গিয়ে ভোখার নরম পেটে তার পায়ের আঙুলগুলো ঢুকিয়ে রোমগুলো একটু নাড়িয়ে দেয়, আদরে, শালো, আলসিয়া, নিদুয়া। লোখা একটুও আওয়াজ না-করে সেই পা-টা জড়িয়ে ধরে আরো কুণ্ডলী পাকিয়ে যায়। কাদায় পা গাড়লে যেমন করে পা তুলতে হয়, সেরকম টানতে গিয়ে বাঘারু হেসে ফেলে, তোখা ছাড়ছে না।ছাড়ি দে, নামিম। বাঘারু টের পায়, লোখার পেটের নরম রোমগুলো তার পায়ের পাতায় নরম লাগে আর গোড়ালির কাছে ভোখার নখ।
পা-টা টেনে বের করে, পাখির পালক ধরা হাতটা মাথার ওপর তুলে, বাঘারু, পাথরের মাথা থেকে লাফিয়ে তার নীচের পাথরে নামে। সেখানে ঘুরে দাঁড়িয়ে আরো নীচের পাথরে। আকাশে বাঘারুর ছায়ামূর্তিটা ধীরে-ধীরে ফরেস্টের অন্ধকারের ভেতরে ডুবে-ডুবে যায়। সব চেয়ে শেষে ডোবে তার হাতের পাখির পালক। বাঘারুর রাত শেষ হল। বাথান এখনো জাগে নি। ফরেস্টের ভেতরে অন্ধকার এখনই সব চেয়ে ঘন।
