পাখিটা ঐ পাথর থেকে উড়ে আবার এই পাথরে আসতে পারে। বা, আবার, নদীখান ধরি ফিরি যাবার পারে জঙ্গলে। পেছনের ঘাসবনেও নেমে যেতে পারে। না-হয়, না-হয়। ঐ পাখিটার এ্যালায় খোয়ায় মন নাই। দোসর চাহে, দোসর চাহে।
তা হলে ত ডেকে উঠতেও পারে, এখন বাঘারুর সামনে ঐ ছায়ামূর্তিতেই। তা হলে বাঘারু অন্তত একবার বুঝতে পারবে, গত তিন দিন যে-ডাকটা এই রাতশেষে আর সেই দিনশেষে পাগল করি দিবার ধইচেছে, সেউ ডাকটা এই পাখি কেনং করি ডাকে। তিন দিন ধরে পাখিটার ডাকের সাড়ায় বাঘারু ডেকে ওঠে। বাঘারু ডেকে উঠলেই পাখিটা চুপ করে যায়। তার পর চুপ করে থাকে অনেকক্ষণ। সেই অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পর, রাগে জ্বলতে-জ্বলতে তীক্ষ্ণতর স্বরে, ঘন-ঘন ডেকে ওঠে। পাখোয়াল (পাখি) বুঝিবার ধইচছে, অর দোসর এইঠে আছে, ডাকিবার ধইচছে, কিন্তু আসিছে না কেনে? পাখিটার সারা শরীরে সঙ্গীর জন্যে ডাক উঠেছে। যখন ও ডাকে তখন ওর ডাকের কাপনে ওর শরীরে কাপন বোঝা যায়। শরীরের সেই কাঁপনে এমনই বিহ্বল যে বাঘারুর ডাককেই ভাবে সঙ্গীর ডাক?
কিন্তু সত্যি কি তাই ভাবে? বাঘারুকে যদি সত্যিই সঙ্গী ভাবত তা হলে আরো আউরায়বাউরায় চলি আসিত বনের ভিতরঠে। বাঘারু যে ওর সঙ্গী নয়, সেটা বুঝতে পেরেই কি বাঘারুর ডাকের শেষে অত চুপ করে থেকে অত তীক্ষ্ণতর ঘন-ঘন ডেকে ওঠে?, রাত ভাঙতে না-ভাঙতেই পাখি এসে এই ফাঁকটায় উড়ে-উড়ে বেড়ায়। ফরসা হওয়ার আগেই পাখা ঝটপটিয়ে চলে যাবে, জঙ্গলের ভেতর থেকে আরো ভেতরে যেখানে সব সময়েই অন্ধকার। বিকেলের রোদ সরে গেলে আবার পাখি ঝটপটিয়ে উড়ে আসবে এইখানকার আঁধারে। জঙ্গল থেকে নদীতে, পাথরে, আঁধারে-আঁধারে, পাখি তার সঙ্গীতে খুঁজছে। বাঘারুর জকে সেই সঙ্গীর ইশারা পেয়ে, খোঁজে?
বাঘারুর গলার ভেতরটায় একটা ডাক গুরগুর উঠে আবার ভেতরে চলে যায়। ডাকি উঠিবে? বাঘারু ভাবে, পাখি কি তাকেই সঙ্গী ভেবেছে, পাখি ভাবে নাকি তার সঙ্গীটা ডাকে অথচ আসে না কেন? ঐ বাশের নাখান চোখা পাথরের মাথায় বসি নদীর পাথর বুকখান দেখিবার ধইচছে কতক্ষণ ধরি ধরি.ঐ বড় পাথরটার পুরো শরীর একটা পাখির। উড়ে গেলে ঐ জায়গাটা ফাঁকা পড়ে থাকবে।
পাখিটা এখন সোজাসুজি বাঘারুর এই পাথরটার দিকে তাকিয়ে। তাই ওর ঠোঁট-মাথা ঝুঁটির আভাস আর আলাদা-আলাদা চেনা যায় না। পাখিটার পাথরটা থেকে বাঘারুর পাথরের মাথাটা সম্পূর্ণ দেখা যাবে না। তা হলে পাখিটা বাঘারুকে দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু পাথরটাকে দেখছে। এখন হঠাৎ উড়াল দিয়ে এই পাথরটাতে এসে যেতে পারে। বাঘারু স্থির হয়ে থাকে, নড়ে না। থুতনির নীচে তার হাত দুটো। কনুই পর্যন্ত দুই দিকে সমানভাবে ছড়ানো। বাঘারু ধীরে-ধীরে তার শ্বাসপ্রশ্বসটাও কমিয়ে আনে। আর সেই স্থিরতার অপেক্ষা করে, শরীরটাকে কেমন এগিয়ে, গলাটাকে বাড়িয়ে, পাখা দুটো ছড়িয়ে, মাঝখানের এই ফাঁকটুকু ভরে, পাখিটা ঐ পাথর থেকে এই পাথরের মাথায় কোনাকুনি উড়ে এসে বসবে। বাঘারু তার সেই পুরো ওড়াটুকু দেখতে পাবে–এই প্রথম। পাখার ছড়ান দেখে বুঝতে পারবে কত লম্বা, ঠোঁটের চোখ দেখে বুঝতে পারবে পাতলা না মোটা। আর যদি এই পাথরের ওপর বাঘারুর চোখের সামনে এসে বসে–ঘুরে-ঘুরে দাঁড়ায়! বাঘারু পাথরের মত স্থির থেকে যেন, পাথরের চোখ দিয়ে পাখিটাকে সম্পূর্ণ দেখে নিতে পারবে। সেই দেখে নেয়া শেষ হওয়ার পরও যদি পাখিটা বাঘারুর চোখের সামনেই বসে থাকে, তা হলে, বাঘারু খুব নিচু গলায় সেই ডাকটা ধীরে-ধীরে ডাকি উঠিবে। দেখিবার পাবে, তার ডাক শুনি পাখিটা কী করি, ক্যানং করি চুপ করি থাকে, কোন দিকে তাকায়, ঘাড়টা ক্যানং হেলায়। বাঘারু বুঝতে পারে, গুরগুর একটা ডাক তার গলার ভেতরে উঠে শরীরের আরো ভেতরে চলে যাচ্ছে। প্রায় দম আটকে বাঘারু ভাবে–ভোখাটা এখন ভুখে না ওঠে। কোথায় আছে, কে জানে। যদি বাঘারুর পায়ের দিকে নীচের পাথরে থাকে, ডাকবে না। কিন্তু যদি এমন জায়গায় থাকে, যে, পাখিটাকে দেখা যায়?
পাখিটা হঠাৎ উড়ল, কিন্তু সোজা একেবারে আকাশে, যেন কেউ ওটাকে দড়ি বেঁধে টেনে তুলল, প্রায় বাঘারুর সমান উঁচুতে এখন। বাঘারু উপুড় বলে দেখতে পায় না এদিকে আসছে কি না। তার পরই বাতাসে ঝাঁপট তুলে নদীর ওপারটা ধরে বনের সেই ভেতর দিকে চলে যায়–বাঘারুর চোখের সামনে ওর উড়াল শরীরটা পেছনের বনের সঙ্গে মিশে যায়। বাঘারু নড়ে না। আবার ফিরে আসবে। ভাবতে-ভাবতেই আবার নদী ধরেই ফিরে এল। এবার যেন জলে ঝাঁপ দিয়ে, আবার উঠে, বাঘারুর বায়ের ফরেস্টের দিকে উড়ে, মিশে, আবার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে, বাঘারুর পাথরটার ওপর দিয়ে, ঘুরে, নেমে গেল। শালো। পাথরের বনত দোসর খুঁজিবার ধইচছিস? মানষিক দেখিবার পারিস না?
.
০৭২.
নদী জাগে
বাঘারু এতক্ষণ যেন জেগেও জাগে নি, এখন জাগছে। পাখিটার জন্যে শরীরটাকে এতক্ষণ স্থির করে রাখায় টান ধরেছিল, চিত হয়েপড়ে দুই হাত দুই পা পাথরময় ছড়িয়ে, তার পর দুটো হাত মুঠো পাকিয়ে মাথার পেছনে ছুঁড়ে, ঘাড়টা একটু মুচড়ে, বুকটা পাথর থেকে তুলে, বাঘারু অনেকক্ষণ ধরে আড়মুড়ি ভাঙে। সেই আড়মুড়ি ভাঙার গড়াগড়িতে শরীরটা শিথিল হয়ে যায়। বাঘারু ডান পা-টা টেনে তুলে আনে। বা-হাতটা ছড়িয়ে দেয়। বা ঘাড়টা কাত হয়ে থাকে। পাখিটা যেন বাঘারুর শেষতম ঘুমের ভেতর এসেছিল ও চলে গেছে। বাঘারু নতুন করে দেখে, আকাশে একটাও তারা নেই। বাঘারু নতুন করে ডেকে ওঠে, ভোখা।
