১ম খণ্ড : পটভূমি । ১ম পরিচ্ছেদ : লোকায়তর অর্থবিচার

ভারতীয় দার্শনিক পরিভাষার একটি বৈশিষ্ট্য আছে। বৈশিষ্ট্যটির তাৎপর্য সত্যিই বিস্ময়কর।

আমাদের দেশে জনসাধারণের দর্শণ আর বস্তুবাদী দর্শন—এই দুটি কথা বোঝাবার জন্যে দুটি স্বতন্ত্র নামের প্রয়োজন হয় নি। নাম পাওয়া যায় একটিই : লোকায়ত। লোকায়ত মানে জনসাধারণের দর্শন, লোকায়ত মানেই আবার বস্তুবাদী দর্শন। অবশ্যই জনসাধারণের দর্শন যখন বলা হচ্ছে তখন পুরোটাই যেন ঠেস দিয়ে বলবার চেষ্টা : সাধারণ মানুষের বুদ্ধিটা তেমন সরেস নয়, তার জন্যেই এই মাটির পৃথিবীটাকেই তারা চরম সত্য মনে করে। তবু ছোটো করবার উৎসাহে বলা হলেও কথাটা ছোটো নয়; জনসাধারণের সঙ্গে বস্তুবাদের সম্পর্ক যে এতো নিবিড় তার ইঙ্গিত আর কোনো দেশের দার্শনিক পরিভাষার মধ্যে টিকে আছে কি না খুবই সন্দেহের কথা। তাই লোকায়ত-দর্শনের আলোচনার শুরুতে এই ইঙ্গিতটিকেই স্পষ্টভাবে বোঝবার চেষ্টা করবে হবে।

০১. জনগণের দর্শন ও বস্তুবাদী দর্শন

লোকায়ত বলতে বোঝায় সাধারণ লোকের দর্শন, জনসাধারণের দর্শন। লোকেষু আয়তো লোকয়তঃ। অর্থাৎ কিনা, সাধারণ লোকের মধ্যে পরিব্যাপ্ত বলেই এ-দর্শনের ওই রকম নাম। মাধবাচার্যের লেখা সর্বদর্শনসংগ্রহ বলে সংস্কৃত পুঁথির ইংরেজী তর্জমা করবার সময় অধ্যাপক কাওয়েল(১) লোকায়ত শব্দটিকে এই এই রকমই একটা ব্যুৎপত্তিগত অর্থে গ্রহণ করবার চেষ্টা করেছেন। তাঁর সে-চেষ্টার পিছনে প্রাচীনদের সম্মতিরও অভাব নেই। দিব্যবিধান(২) নামের বৌদ্ধ পুঁথির স্থানবিশেষে লোকায়ত শব্দের সোজাসুজি এই অর্থই ধরা হয়েছে। জৈন লেখক বুদ্ধিজনের ষড় দর্শনসমুচ্চরের উপর টীকা রচনা করবার সময় গুণরত্ন(৩) বলছেন, যারা সাধারণ লোকের মতো নির্বিচার আচরণ করে তাদেরই বলে লোকায়ত। কিন্তু শুধুমাত্র নাস্তিকদের নজিরই নয়; লোকায়ত বলতে যে জনগণেরই দার্শনিক চেতনা বুঝতে হবে এ-কথা অগ্রণী আস্তিকরাও বারবার স্বীকার করেছেন। স্বয়ং মাধবাচার্য(৪) বলেছেন, এই সম্প্রদায়ের পক্ষে লোকায়ত নামটি বেশ মানানসই হয়েছে, কেননা সাধারণ লোক নীতিকামশাস্ত্র নিয়ে বিভোর হয়ে অর্থ ও কামকেই পরম পুরুষার্থ মনে করে আর তাই আমল দেয় না পরলোকের কথাকে,—ফলে তাদের চার্বাক-মতানুসারী মনে করাই ঠিক। মাধবাচার্যের ঢের আগে শঙ্করাচার্যও(৫) লোকায়তিক ও প্রাকৃতজন—এই দুটি শব্দকে একসঙ্গে আর একনিশ্বাসে উল্লেখ করে ইঙ্গিত দিয়েছেন দু’-এর মধ্যে সম্পর্ক কতো ঘনিষ্ঠ!

কিন্তু ওই লোকায়ত নামেরই আরো মানে হয়। লোকায়ত হলো ইহকাল-সংক্রান্ত দর্শন : যারা পরকাল মানে না, আত্মা মানে না, ধর্ম মানে না, মোক্ষ মানে না, তাদেরই বলে লোকায়তিক। তারা মনে করে জল-মাটি-আগুন-হাওয়া দিয়ে গড়া এই মূর্ত পৃথিবীটাই একমাত্র সত্য, আত্মা বলতে দেহ ছাড়া আর কিছুই বোঝায় না। কথায় বলি বটে আমার দেহ, যেন আমি আর দেহ দুটো আলাদা কিছু। কিন্তু এ হলো নেহাতই কথার কথা। যেমন কিনা বলা হয় রাহুর মাথা। আসলে রাহু তো আর সত্যিই মাথাটুকু ছাড়া কিছুই নয়।

তাহলে এই মানে অনুসারে লোকায়ত হলো দেহাত্মবাদ, বস্তুবাদ। ইংরেজী পরিভাষায় যাকে বলে মেটিরিয়ালিস্‌ম্‌।

অধ্যাপক তুচি(৬) দেখাবার চেষ্টা করেছেন, ব্যুৎপত্তির দিক থেকেও লোকায়ত শব্দ এই রকমই একটা অর্থের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অবশ্য বৃদ্ধসম্মতি হিসাবে এ-কথার পক্ষে তিনি যে-নজিরটি দিচ্ছেন তা কিছুটা জটিল : বুদ্ধঘোষ(৭) বুঝি আয়াত শব্দটাকে আয়তন অর্থে ব্যবহার করেছেন—আয়তন বলতে বোঝায় ভিত্তি। তাই যে-মতবাদের ভিত্তি হলো এই ইহলোক,—মাটির পৃথিবী,—তাকেই বলে লোকায়ত।

বলাই বাহুল্য, অধ্যাপক তুচির পক্ষে এই অর্থটি প্রতিষ্ঠা করবার প্রচেষ্টা যতোখানিই কষ্টকল্পিত হোক না কেন, লোকায়ত নামটিকে আমরা সাধারণত বস্তুবাদ-সূচক অর্থেই গ্রহণ করে থাকি। লোকায়ত বলতে বস্তুবাদই বোঝায়। আর তা বোঝবার জন্যে খুব একটা ঘোরালো প্রমাণের সত্যিই দরকার নেই। কেননা, হরিভদ্র(৮) ষড়দর্শনসমুচ্চয়ে লোকায়তমত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, লোক বলতে শুধু সেইটুকুই যা কি না ইন্দ্রিয়গোচর : এতাবানেবলোকেহয়ং বারানিন্দ্রিয়গোচরঃ। টীকাকার মণিভদ্র(৯) কথাটাকে আরো পরিষ্কার করে বলছেন, লোক মানে নিছক পদার্থসার্থ বা পদার্থসমূহ।

তার মানে, প্রত্যক্ষে যেটুক ধরা পড়ে লোকায়তিকরা শুধুমাত্র সেইটুকুকেই সত্যি বলে স্বীকার করেন। তারই নাম লোক। লোকই একমাত্র সত্য।

——————————–
১. E. B. Cowell SDS 2n. cf. S. N. Dasgupta. HIP 3:515 cf. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী : বৌদ্ধধর্ম ৩৭
২. S. N. Dasgupta op. cit. 3:514.
৩. গুণরত্ন : তর্কন্যায়দীপিকা ৩০০—“লোকা নির্বিচারাঃ সামান্যা লোকাস্তদ্বদাচরন্তিম্মেতি লোকায়তা লোকায়তিকা ইত্যপি”।
৪. মাধবাচার্য : সর্বদর্শনসংগ্রহ ১।
৫. শঙ্করাচার্য : ব্রহ্মসূত্রভাষ্য : ১.১.১ : “দেহমাত্রং চৈতন্যবিশিষ্টমাত্মোতি প্রাকৃতজনা লোকায়তিকাশ্চ প্রতিপন্নাঃ”।
৬. S. N. Dasgupta op. cit. 3:514-5.
৭. Ibid 3:515n.
৮. হরিভদ্র : ষড়্‌দর্শনসমুচ্চয় ৮১ শ্লোক।
৯. St. Petersburg Dictionary-তেও লোকায়ত শব্দের অর্থ করা হয়েছে materialism. cf. রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় : বঙ্গদর্শন—শ্রাবণ ১২৮১, “ইহলোক ঐ দর্শনের সর্বস্ব, তজ্জন্যই উহার ঐরূপ নামকরণ হয়”।

 ০২. প্রত্যক্ষ ও প্রবঞ্চনার প্রতিষেধক

কিন্তু কেন? যেটুকুকে প্রত্যক্ষভাবে জানা যাচ্ছে সেটুকু ছাড়া আর কিছুই ওঁরা সত্যি বলে মানতে চাননি কেন? এ-প্রশ্নের জবাব হিসাবে মণিভদ্র দুটি যুক্তি উল্লেখ করছেন, দুটিরই তাৎপর্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, অবশ্যই ধর্মের প্রবঞ্চনাটা এড়াবার জন্যে। অনুমান, আগম ইত্যাদি জ্ঞানের তথাকথিত অন্যান্য উৎসের দোহাই দিয়ে পরবঞ্চনপ্রবণ ধর্মছদ্মধূর্তের দলে সাধারণ মানুষের মনে স্বর্গাদি প্রাপ্তি সম্বন্ধে একটা মোহের সঞ্চার করে। এই সংকট থেকে বাঁচতে হলে সাধারণ লোকের পক্ষে প্রত্যক্ষ ছাড়া আর কোনো প্রমাণকে স্বীকার করা নিরাপদ নয়। মণিভদ্রের ভাষায় :

এবম্‌ অমী অপি ধর্মচ্ছদ্মধূর্তাঃ পরবঞ্চনপ্রবণা যৎ কিঞ্চিৎ অনুমানাগমাদিদার্ঢ্যম্‌ আদর্শ্য ব্যর্থম্‌ মুগ্ধজনান্‌ স্বর্গাদিপ্রাপ্তিলভ্যভোগাভোগপ্রলোভনয়া ভক্ষ্যতক্ষ্যগম্যাগম্যহেয়োপাদদেয়াদিসংকটে পাতয়ন্তি, মুগ্ধধার্মিকান্ধম্‌ চ উৎপাদয়ন্তি…(১০)

দ্বিতীয়ত,—এবং ওই দ্বিতীয় যুক্তিটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ—লোকায়তিকেরা নাকি বলতেন, অপ্রত্যক্ষকে (অর্থাৎ কি না যা প্রত্যক্ষভাবে জানা যাচ্ছে না তাকেও) যদি সত্যের সম্ভাবনা দিতে হয় তাহলে দরিদ্রের পক্ষে তার দারিদ্র্যের কথা ভুলে যাওয়া অসম্ভব নয়, অসম্ভব নয় দাসের পক্ষে দাসত্বের কথা ভুলে যাওয়া। কেননা যে দরিদ্র তার পক্ষে দারিদ্র্যটুকুই প্রত্যক্ষ, যে দাস তার কাছে দাসত্বটুকুই প্রত্যক্ষ। কিন্তু যদি অপ্রত্যক্ষকেও অস্তিত্বের সম্ভাবনা দিতে হয় তাহলে দরিদ্রও ‘স্বর্ণরাশির মালিক হয়েছি’ এমন কথা কল্পনা করে নিজের দুস্থ অবস্থাকে অবহেলায় দলন করতে পারে, দাস মনে করতে পারে সে আর দাস নয়, স্বামী। এক কথায়, এইভাবে দরিদ্র-ধনিভাব ও সেব্য-সেবকভাব সব কিছু নস্যাৎ হয়ে যায়। মণিভদ্রের ভাষায় :

কিদ্‌ চ অপ্রত্যক্ষম্‌ অপি অস্তিত্বতয়া অত্যুপগম্যতে চেৎ জগৎ অনপহ্নুতম্‌ এব তাৎ, দরিদ্রঃ হি স্বর্ণরাশীঃ মে অভি ইতি অদ্ভুধ্যায় হেলয়া এব দৌঃস্থ্যম্‌ দলয়েৎ, দাসঃ অপি দ্বচেতসি স্বামিতাম্‌ অবলম্ব্য কিংকরতাম্‌ নিরাকূর্য্যাৎ ইতি।…এবং ন কশ্চিৎ সেব্য-সেবকভাবঃ দরিদ্রধনিতাবঃ বা স্যাৎ।(১১) (টাইপে কিঞ্চিত ভুল থাকতে পারে)

তার মানে কি এই এ লোকায়তিকেরা প্রত্যেক্ষের উপর এতোখানি জোরে যে দিতে চেয়েছিলেন তার কারণ তাঁরা মনে করেছিলেন এইভাবেই দরিদ্রকে তার দারিদ্র্য সম্বন্ধে সচেতন রাখা যাবে, দাসকে সচেতন রাখা যাবে দাসত্ব সম্বন্ধে? এই প্রসঙ্গেই মনে পড়ে, অজিত কেশকম্বলী, মক্ষলি গোসাল, পূর্ণ কস্যপ প্রমুখ যে-ক’জন দার্শনিককে সাধারণত বস্তুবাদী বা লোকায়তিক বলে স্বীকার করা হয় তাঁরা শুধু যে ক্রীতদাস ছিলেন তাই নয়, দাসত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করেছিলেন! দাসত্ব-চেতনা মন থেকে মুছে গেলে এ-বিদ্রোহ নিশ্চয়ই সম্ভবপর নয়।

অবশ্যই মণিভদ্র কোথা থেকে লোকায়তিকদের এই যুক্তিগুলি সংগ্রহন করেছিলেন তা জানতে পারলে ওই প্রশ্নের জবাব ভালো করে বুঝতে পারা যেতো। কিন্তু তা জানবার কোনো উপায় নেই। কেননা, লোকায়তিকদের লেখা সমস্ত পুঁথিই বিলুপ্ত হয়েছে।

 ————————————
১০. মণিভদ্র : : ষড়্‌দর্শনসমুচ্চয়ের টীকা, ৮১ শ্লোক।
১১. Ibid.

 ০৩. বিলুপ্ত পুঁথির কথা

কোনো কালে লোকায়তিকদের লেখা পুঁথিপত্র বলতে সত্যিই কি কিছু ছিলো? ছিলো। তার প্রমাণ, ওই বৌদ্ধ পুঁথি বিদ্যবদান। তার প্রমাণ, পতঞ্জলির মহাভাষ্য। খোঁজ করলে হয়তো আরো প্রমাণ পাওয়া যাবে। কিন্তু এ-দুটি প্রমাণই বা কম কিসের?

দিব্যাবদানে(১২) স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে : লোকায়তং ভাষ্য-প্রবচনম্‌। লোকায়তের উপর এমন কি ভাষ্য ছিলো, প্রবচনও ছিলো। কতোদিন আগে ছিলো? কী নাম সেই ভাষ্যের? এই দুটি প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়। কোথা থেকে। পতঞ্জলির মহাভাষ্য থেকে। আধুনিক পণ্ডিতেরা অনুমান করেন, যিশুখ্রীষ্ট জন্মাবার অন্তত দেড় শ’ বছর আগে পতঞ্জলি তাঁর এই বিখ্যাত বইটি লিখেছিলেন। আর ওই বইতেই(১৩) ব্যাকরণের একটি নিয়ম ব্যাখ্যা করবার প্রসঙ্গে তিনি লোকায়তের উপর ভাগুরি নামের বর্ত্তিকা বা ভাষ্যের উল্লেখ করেছেন : বর্নিকা শব্দ স্ত্রী লিঙ্গে নাকি বর্ত্তিকাও বোঝাতে পারে, যেমন, ‘বর্নিকা ভাগুরি লোকায়তস্য, বর্ত্তিকা ভাগুরি লোকায়তস্য’। এর থেকে নিঃসন্দেহেই প্রমাণ হয় যে যীশুখ্রীষ্ট জন্মাবার অন্তত দেড় শ’ বছর আগে পর্যন্ত লোকায়ত-শাস্ত্র নিশ্চয়ই ছিলো, এবং তার উপর অন্তত একটি ভাষ্যও নিশ্চয়ই ছিলো, সে ভাষ্যের নাম ভাগুরি।(১৪)

কিন্তু এই নামটাই টিকে আছে। পুঁথিগুলি বিলুপ্ত হয়েছে।

কেন বিলুপ্ত হলো? সত্যি বলতে, তেমন জোর গলায় এ-প্রশ্নের কোনো জবাব দেবার উপায় নেই। তবে পণ্ডিত জবাহরলাল নেহেরু(১৫) বলছেন, খুব সম্ভব উত্তরযুগে পুরোহিতদল এবং সনাতন ধর্মে বিশ্বাসীয়া ভারতবর্ষে বস্তুবাদীদের অনেক পুঁথিপত্র ইচ্ছে করে নষ্ট করেছিলো। যদি তাই হয় তাহলে নিশ্চয়ই মানতে হবে সেকালেও যে-মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে দেশশাসনের ক্ষমতা ছিলো তারাও জনগণের এই দর্শনটি সম্বন্ধে—অর্থাত লোকায়ত বা বস্তুবাদী দর্শন সম্বন্ধে,—খুব সহনশীলতার পরিচয় দেন নি। তার মানে, একালের সঙ্গে সেকালের যতো তফাতই থাক না কেন, অন্তত একটা বিষয়ে মিল আছে : জনসাধারণের ধ্যানধারণার বিরুদ্ধে শাসক-সম্প্রদায়ের কঠিন বিধান।

অথচ ওই কথাটিই আবার পণ্ডিত জবাহরলাল নেহেরু মানতে রাজী নন, তাই তাঁর উক্তি স্ববিরোধী। প্রাচীন ভারতকে আবিষ্কার করতে এগিয়ে তিনি সেকালের যে-ছবিটি আমাদের সামনে তুলে ধরতে চান তার মূল কথা হলো,

I imagine, however, that in spite of the vast mental and cultural difference between the small thinking minority and the unthinking masses, there was a bond between them or, at any rate, there was no obvious gulf. The graded society in which they lived had its mental gradation also and these were accepted and provided for. This led to some kind of social harmony and conflicts were avoided.(১৬)

মোদ্দা কথায়, চিন্তাশীল বলতে সেকালে ছিলো মাত্র মুষ্টিমেয় মানুষ। বাকি মূঢ় জনতার মধ্যে কোনো রকম চিন্তার বালাই ছিলো না। কিন্তু এ-দু’-এর মধ্যে মানসিক ও সাংস্কৃতিক তফাতটা বিরাট হলেও একটা বন্ধনও ছিলো। অন্তত কোনো প্রফট খাদ ছিলো না। ক্রমানুসারে সাজানো যে-সমাজটিতে তারা বাস করতো সে-সমাজে মানসিক ক্রমানুসারও ছিলো। সেগুলি স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিলো এবং তার জন্যে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিলো। এরই দরুন দেখা দিয়েছিলো একটা সামাজিক সামঞ্জস্য এবং সম্ভব হয়েছিল সংঘাত এড়িয়ে যাওয়া।

চিত্রটি মনোরম। সন্দেহ নেই। একালের বাস্তবটা যদি ওই কাল্পনিক অতীতের অনুরূপ হতো—যদি সংঘাত না থাকতো, যদি শুধু সামঞ্জস্যই থাকতো—তাহলে আজকে অনেকে নিশ্চয়ই নিশ্চিন্ত হতে পারতেন। কিন্তু সেকালের ওই সরল-সুন্দর ছবিটি এঁকে পণ্ডিত জবাহরলালা নেহেরু আমাদের মনে যেটুকু নেশা ধরিয়েছিলেন তা তিনিই এক মুহূর্তে ভেঙে দিলেন লোকায়তিকদের লেখা পুঁথিপত্রগুলি ধংস করবার কথা উল্লেখ করে।

 ————————————
১২. S. N. Dasgupta op, cit. 3:514.
১৩. পাণিনি ৭.৩.৪৫।
১৪. G. Tucci (in PFIPC-1925 : 35)  এ-বিষয়ে আরো তথ্য উল্লেখ করেছেন। R. Garbe (ERE 8.138) আরো একটি প্রমাণ হিসাবে ভাষ্করাচার্যের ব্রহ্মসূত্রভাষ্য (৩.৩.৫৩) উল্লেখ করেছেন।
১৫. J. Nehru DI 80.
১৬. Ibid 77.

০৪. বিতণ্ডাবাদী

পণ্ডিত জবাহরলাল নেহেরু যাদের মূঢ় জনতা বলে বর্ণনা করেছেন তাদেরই দার্শনিক চেতনাটুকু নিয়ে আমরা আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছি। কেননা, প্রাচীনেরা বারবার লিখে গিয়েছেন যে লোকায়ত বলতে শুধুই বস্তুবাদী দর্শন মনে করা চলবে না, মনে রাখতে হবে এই হলো দেশের জনসাধারণের দর্শন।

অবশ্যই এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে মাধবাচার্যই বলুন আর শঙ্করাচার্যই বলুন—লোকায়ত দর্শনকে যখন তাঁরা সাধারণ লোকের দর্শন বলে উল্লেখ করেছেন তখন তাঁদের আসল উদ্দেশ্যটা নিশ্চয়ই জনসাধারণকে তাদের প্রকৃত দার্শনিক ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়া নয়; তার বদলে লোকায়ত-দর্শনকে ওই বলে খাটো করবার বা ছোটো করবার চেষ্টাই।

মূঢ় জনতা। তাদের বোধটা নেহাতই স্থূল, তাই তারা মনে করেছে দেহ ছাড়া আত্মা বলে কিছুই নেই। তাদের দৃষ্টিটা নেহাতই সংকীর্ণ, তাই তারা ইহলোক ছাড়িয়ে পরলোক বা পরকালকে দেখতে পায় নি। তাদের রুচিটা নেহাতই কদর্য, তাই তারা মনে করেছে অর্থ ও কামই পরম পুরুষার্থ—ধর্ম ও মোক্ষের কথা শুনলে তারা ভয় পেয়েছে, ভেবেছে মাথায় হাত বোলেতে এসেছে বুঝি!

কিন্তু লোকায়তিকদের লেখা পুঁথিপত্রগুলি বিলুপ্ত হলেও তাঁদের বিদ্রুপ করবার জন্যেই বিপক্ষরা তাঁদের সম্বন্ধে যতটুকু টুকরো-টাকরা সংবাদ লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন সেগুলিকে পরীক্ষা করলে সন্দেহ হয়, লোকায়তিকেরা যে-সব যুক্তিতর্কের অবতারণা করতেন সেগুলির মধ্যে এই রকমের হাবাগোবা বোকাসোকা মনোভাবের পরিচয় ছিলো না। এমন কি, মনে রাখা দরকার, লোকায়তিকদের বর্ণনায় স্বয়ং বুদ্ধঘোষ(১৭) বিতণ্ডাবাদী বলে বিশেষণ ব্যবহার করে গিয়েছেন। অন্যান্য পুঁথিতেও হুবহু একই কথাই লেখা আছে(১৮)। এখন বিতণ্ডা আর বাদ—এই দুটি কথাই যে একসঙ্গে কেমন করে ব্যবহার করা যায় তাই নিয়ে আধুনিক পণ্ডিতেরা খুবই সমস্যায় পড়েন। কেননা, ন্যায়সূত্র(১৯) অনুসারে বিতণ্ডা মানে হলো নিছক নেতিবাচক তর্ক—একটা মত খণ্ডন করবার জন্যে তর্ক করা হচ্ছে কিন্তু কোনো পাল্টা-মন স্থাপন করবার উৎসাহে নয়। আর বাদ বলতে বোঝায় ঠিক এর উল্টো : একটা মত স্থাপন করবার উদ্দেশ্যেই বিরুদ্ধ মত খণ্ডন করবার চেষ্টায় তর্ক। তাই সমস্যা হলো, একই সঙ্গে লোকায়তিকদের সম্বন্ধে দুটো কথাই কেমন করে মেনে নেওয়া যায়? একালের পণ্ডিতেরা তাঁদের ওই সমস্যা নিয়ে থাকুন। আমাদের যুক্তির পক্ষে আপাতত যেটা খুবই জরুরী কথা সেটা হলো, লোকায়তিকেরা রীতিমত ভালো যুক্তিতর্ক করতে জানতেন। তাঁদের যুক্তিতর্কগুলি ছিলো খুবই ধারালো। সে-সব যুক্তিতর্কের কিছুকিছু নমুনা পাবেন মাধবাচার্যের সর্বদর্শনসংগ্রহে(২০), আরো নানান বইতে(২১)। এমনকি, আমরা পরে দেখবো, এ-কথা অনুমান করবারও অবকাশ রয়েছে যে প্রাচীন ভারতে যুক্তিবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেন লোকায়তিকেরাই।

তাই চিন্তার জড়তার দরুনই তাঁরা এই জড় জগৎটাকে একমাত্র সত্য মনে করেছেন, এ-কথা বললে তথ্যবলের চেয়েও দেহবলের পরিচয় দেওয়া হবে। লোকায়তিকদের বিপক্ষরাই তাঁদের সম্বন্ধে যে-সব কথা লিখে গিয়েছেন তা থেকেই বোঝা যায় তাঁরা চিন্তা করতে জানতেন, এবং সে-চিন্তা খুবই তীক্ষ্ণ। লোকায়ত-দর্শনের ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন তার পুনর্গঠন করবার চেষ্টা করবো তখন এ-কথার আরো ভালো নজির দেখানো সম্ভব হবে।

কিন্তু সে-সব কথা না হয় আপাতত ছেড়েই দিলাম। আপাতত না হয় মেনেই নিলাম যে জনসাধারণ মূঢ়, প্রাকৃত, উচ্চাঙ্গের চিন্তার অযোগ্য। আর তার জন্যেই তারা ও-রকম স্থূল কথাবার্তাকেই,–বস্তুবাদকেই,–সত্য বলে মনে করেছে। তাহলেও, অন্তত এটুকু তো মানতেই হবে যে, যে-কোনো কারণেই হোক না কেন, আমাদের দেশে বস্তুবাদী দর্শন আর জনসাধারণের দর্শন—দুটো কথা আলাদা কথা নয়। তার বদলে, একই কথার এপিঠ-ওপিঠ। কেননা, প্রাচীনেরাও বারবার লিখে গিয়েছেন, আর আধুনিক পণ্ডিতেরাও স্বীকার করছেন, লোকায়ত কথার মানে একটা নয়। জনসাধারণের দর্শন। বস্তুবাদী দর্শন। দুই-ই।

—————
১৭. T. W. Rhys Davids DB 2:167. cf. S. N. Dasgupta op. cit. 3:513
১৮. S. N. Dasgupta op. cit. 3:512n
১৯. Ibid 3:512
২০. সর্বদর্শনসংগ্রহ ৫।
২১. হরিভদ্রের ষড়্‌দর্শনসমুচ্চয়ের গুণরত্ন ও মণিভদ্রের টীকা দ্রষ্টব্য।

০৫. ভারতের ঐতিহ্য

সেখান থেকে একালের কথায় আসা যাক। একালের কথাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। কেননা, লোকায়ত দর্শনের পুঁথিপত্রগুলি যতোকাল আগেই বিলুপ্ত হয়ে যাক না কেন, হাজার হোক আমরা তো আজকের দিনে এ-আলোচনার তাৎপর্য কতোখানি সে-কথাও ভেবে দেখা দরকার বই কি।

আজকের দিনে আমরা বারবার শুনতে পাই, বস্তুবাদী দর্শনটার সঙ্গে আমাদের দেশের প্রাচীন সভ্যতার কোনো সম্পর্ক নেই। এ-দর্শন নেহাতই বিদেশী ব্যাপার, পশ্চিমী ব্যাপার—দেশের জমিতে এর কোনো শিকড় ছিলো না। আমাদের দেশের ইতিহাস আলাদা, জীবনের আদর্শ আলাদা,–সব কিছুই অন্য রকমের। পশ্চিমের আদর্শটা হলো বস্তুবাদী আদর্শ, ভোগের আদর্শ,–ভুল আদর্শ। তারই মোহে পড়ে আজকের পশ্চিমী সভ্যতা কী রকম উন্মাদের মতো আত্মনাশের পথে এগিয়ে চলেছে! তার বদলে, আমাদের দেশের আদর্শ হলো ত্যাগের আদর্শ, আধ্যাত্ম-চেতনার আদর্শ। আজ বরং আমাদের দেশের এই আদর্শকেই গ্রহণ করতে পারলে পশ্চিমী সভ্যতা অমন ভয়াবহ ধ্বংসের পথ থেকে ফিরে আসতে পারবে। কিন্তু তার বদলে আমরা যদি আমাদের নিজস্ব আদর্শটিকে ছেড়ে এই প্রাচ্যের জমিতে ওই পশ্চিমী বস্তুবাদের বীজ বুনতে যাই তাহলে অঘটন ঘটবে, জন্মাবে এক বিষবৃক্ষ,–তার ফল আমাদের কল্যাণ করবে না।

এই কথাগুলিই এতোবার, এতোভাবে(২২), আমাদের বলা হয়েছে যে শুনতে শুনতে অনেকেই মনে করেছেন, সত্যিই হয়তো বা তাই। সত্যিও বুঝি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের মধ্যে বস্তুবাদী দর্শনের কোনো স্থান নেই, সত্যিই বুঝি আমাদের দেশের জমিতে শুধু অনাবিল অধ্যাত্মবাদেরই বিকাশ ঘটেছে।

অথচ এতোগুলি কথার মধ্যে একটিও সত্যি কথা নয়।

প্রথমত, পাশ্চাত্য দর্শন যে বস্তুবাদী দর্শন, এই কথাটাই ভুল। আজকের পাশ্চাত্য দেশগুলি যে বস্তুবাদের মোহে পড়েই অমন আত্মনাশের পথে এগিয়ে চলেছে, সে-কথাটা আরো বেশি ভুল। আত্মনাশের আয়োজন যে নেই তা নয় : পৃথিবীর বুক থেকে একটা মহাযুদ্ধের ক্ষত শুকোতে না শুকোতে শোনা যায় আর একটা মহাযুদ্ধের দামামা বেজে উঠছে। কিন্তু তার সঙ্গে বস্তুবাদী দর্শনের সম্পর্কটা কী রকম? ঐকান্তিক বিরোধের সম্পর্কই। কেননা আজকের দিনে যাঁরা সত্যিই এই মৃত্যুর মহাযজ্ঞের বড়ো বড়ো যজমান তাঁদের কাছে বস্তুবাদ দর্শনই বিরাট বিভীষিকার মতো। তাই তাঁদের মুখপাত্ররা বস্তুবাদকে হাজারবার খণ্ডন করেও স্বস্তি পান না, আবার নতুন করে খণ্ডন করবার জন্যে উদ্‌গ্রীব হয়ে ওঠেন(২৩)। এবং বস্তুবাদকে খণ্ডন করে অধ্যাত্মবাদী আর ভাববাদী মতবাদকে রকমারি মুখোস পরিয়ে রকমারি উপায়ে প্রচার করতেই তাঁরা আজ ব্যস্ত। অবশ্যই, আজকের ইয়োরোপের দার্শনিক পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করবার অবকাশ আমরা এই বইতে পাবো না। যাঁরা সে-বিষয়ে আলোচনা করেছেন, এবং দেখাচ্ছেন আজকের দিনে স্বার্থান্ধ যুদ্ধবাদীরা কী ভাবে বস্তুবাদকে ধূলিস্যাৎ করে তারই ধ্বংসস্তুপের উপর অধ্যাত্মবাদ আর ভাববাদকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়,–পাদটীকায় তাঁদের বই-এর নাম উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হতে হলো(২৪)।

আমাদের বর্তমান আলোচনায় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হলো অপর প্রশ্নটি : ভারতীয় দর্শন সত্যই কি অনাবিল অধ্যাত্মবাদী ও ভাববাদী দর্শন?

————–
২২. যথা… “the fundamental characteristic of Indian thought was an idealistic one” : G. Tucci PFIPC-1925, 35.
২৩. Philosophy for the Future দ্রষ্টব্য।

২৪. H. K. Wells – Pragmatism of Imperialism ইত্যাদি

০৬. কাদের ধ্যানধারণা?

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে দর্শন-বিষয়ে একটি দু’খণ্ডের বই প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেশ-বিদেশের নানা দার্শনিক মতবাদ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ভূমিকা লিখেছেন স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী মাননীয় মৌলানা আবুল কালাম আজাদ। এই ভূমিকায় তিনি ঘোষণা করেছেন, ভারতীয় চিন্তাধারার বৈশিষ্ট্য হলো বহির্জগতের চেয়ে মানুষের অধ্যাত্মজগতের প্রতিই অনেক বেশি মনোযোগ দেওয়া।

The characteristic of Indian thought is that it has paid greater attention to the inner world of man than to the outer world.(২৫)

ভারতবর্ষে যে বস্তুবাদী চিন্তাধারার কোনো রকম পরিচয়ই ছিলো না এ-কথা অবশ্য ও-বইতে সরাসরি বলা হয় নি। চার্বাক বা লোকায়ত দর্শন বলে একটা কিছু ছিলো বই কি। এমন কি আলোচ্য গ্রন্থে লোকায়ত দর্শনের জন্যে ১০৭৯ পাতার মধ্যে রীতিমতো ৬ পাতা জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবু প্রশ্ন ওঠে, এই লোকায়ত দর্শনের মর্যাদাটা নিয়ে। আমাদের দেশে সত্যের সন্ধানে মানুষের যে-বিচিত্র অভিযান তার মধ্যে লোকায়ত-দর্শনের তাৎপর্য ঠিক কতোটুকু? এ-দর্শন কাদের দর্শন ছিলো?

ভারতীয় দর্শনের যে-কোনো একটি পাঠ্যপুস্তক উল্টে দেখতে পারেন। দেখবেন লেখা আছে, লোকায়ত দর্শন ছিলো মাত্র মুষ্টিমেয় অধঃপাতে-যাওয়া সুখান্বেষীর মনের কথা। নিছক নিজেদের ভোগবিলাস ছাড়া তারা আর কোনো আদর্শকেই আদর্শ বলে মানতো না। তারা শুধু ঘি খাবার তালেই ঘুরতো,—তা সে ধার করেই হোক আর যে করেই হোক!

এ-হেন মতবাদ যে নৈতিক চরিত্রের পতন ঘটাবে, সে-কথা কি আর খুলে বলবার দরকার আছে? তবু দেখবেন, ভারতীয় দর্শনের বেশির ভাগ বইতে লেখা আছে, সেকালের ঋষিরা লোকায়ত দর্শনের এই ভয়াবহ পরিণামটির কথা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবার ব্যাপারেরো আলস্যের পরিচয় দেন নি। কেননা, লোকায়ত দর্শনের উৎপত্তি নিয়ে মৈত্রায়ণ উপনিষদে(২৬) একটি অদ্ভুত গল্প আছে। একবার নাকি অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধে দেবতারা কিছুতেই পেরে উঠছিলেন না। তখন দেবগুরু বৃহস্পতি এক ফন্দি আঁটলেন। তিনি অসুরগুরু শুক্রের ছদ্মবেশ ধরে অসুরশিবিরে প্রবেশ করে প্রচার করলেন এই বস্তুবাদী মতবাদ। ফলে অসুরদের নৈতিক পতন ঘটলো, আর তারই দরুন তারা দেবতাদের কাছে পরাজিত হলো।

লোকায়ত দর্শনকে দেশের লোকের সামনে এই ভাবে এক ভয়াবহ ব্যাপার বলে প্রকার করবার চেষ্টা শুধু উপনিষদে নয়, পৌরাণিক সাহিত্যেও। কাহিনীটা মোটের উপর একই(২৭)।

অবশ্যই এই কাহিনীর মধ্যে দেবগুরুর নিজস্ব যে-নীতিবোধের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে তা সত্যিই ভালো না মন্দ, সে-প্রশ্নের আলোচনা উপনিষদাদির পক্ষে প্রাসঙ্গিক নয়। কেননা কাহিনীটির মূল উদ্দেশ্য হলো, লোকায়ত দর্শন সম্বন্ধে একটি ভীতি প্রচার করা। শুধুমাত্র এই ভীতিপ্রচারই নয়। এমন কি, সেকালের আইন-কর্তারাও এ-দর্শনের বিরুদ্ধে রীতিমতো আইনগত ব্যবস্থা অবলম্বন করতে চেয়েছিলেন। প্রমাণ মনুস্মৃতি। মনু(২৮) বলেছেন, অতিথিযোগ্য কালেও লোকায়তিকেরা (হৈতুকাঃ = বেদবিরোধিতর্কব্যবহারিণঃ) উপস্থিত হয় তাহলে এমন কি বাক্যদ্বারাও এদের সম্ভাষণ করা চলবে না। লোকায়তিকদের বিরুদ্ধে মনুর আরো নানারকম কঠিন কঠিন বিধান(২৯) আছে।

তবুও, লোকায়ত নামটির অর্থ বিচার করতে গিয়েই দেখা গেলো, আতঙ্কজনক গল্প প্রচার করে, আইন করে, বই পুড়িয়ে—আরো হাজারো অকম ব্যবস্থা অবলম্বন করে সাধারণ মানুষের মন থেকে সেকালের শাসকেরা এই দর্শনটি সত্যিই সরাতে পারে নি। লোকায়ত দর্শন মানে শুধু বস্তুবাদ নয়, জনগনের দর্শনও। জনসাধারণের সঙ্গে বস্তুবাদী দর্শনের সম্পর্ক যে কতো নিবিড় সে কথা আজো আমাদের দেশে এই নামটির মধ্যেই পরিষ্কার ভাবে টিকে রয়েছে।

তাই এ-কথা বলা মোটেই ঠিক নয় যে ভারতীয় দর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বাস্তব জগৎটাকে ছেড়ে মানুষের অধ্যাত্ম জগৎটির দিকেই মনোযোগ দেবার চেষ্টা।

তার মানে নিশ্চয়ই এই নয় যে ভারতবর্ষে অধ্যাত্মবাদী দর্শনের বিকাশ ঘটে নি। নিশ্চয়ই ঘটেছিল। কিন্তু সে-দর্শন ছিলো একটি সংকীর্ণ শ্রেণীর মধ্যে আবদ্ধ, দেশের জনসাধারণের সঙ্গে তার নাড়ির যোগ ছিলো না। সেই সংকীর্ণ শ্রেণীর হাতে দেশের শাসন-ক্ষমতা ছিলো বলেই ওই অধ্যাত্মবাদী দর্শনের পুঁথিপত্রগুলিকে পুড়িয়ে ফেলবার কোনো কারণ তো ঘটেই নি; বরং এ-জাতীয় দার্শনিক রচনার প্রচার যাতে প্রশস্ত হয় তার জন্যেও দেশে নানাবিধ ব্যবস্থা ছিলো। কিন্তু তাই বলে শুধুমাত্র ওই ধরনের পুঁথিপত্রগুলিকেই দেশের দার্শনিক চিন্তাধারার একমাত্র পরিচায়ক মনে করাটা কি ঠিক? যে-সব পুঁথি বিলুপ্ত হয়েছে সেগুলির সাক্ষ্যকেও তো উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।

আমাদের দেশে অধ্যাত্মবাদী দর্শন যে শুরুতে শুধুমাত্র শাসন-শ্রেণীর চেতনাদেই প্রতিভাত হয়েছিলো এ-কথা উপনিষদের ঋষিরা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষাতেই বলে গিয়েছেন। প্রমাণ : ছান্দোগ্য উপনিষদের শ্বেতকেতু-প্রবাহণ-সংবাদ (।।৫।৩।।)। এখানে উপনিষদের গল্পটির মূল কথাটুকু উল্লেখ করা যাক :

শ্বেতকেতু আরুণেয় এক সময়ে পাঞ্চাল সমিতিতে গিয়েছিলেন। সেখানে প্রবাহণ জৈবলি তাঁকে প্রশ্ন করলেন : হে কুমার, তোমার পিতা তোমাকে উপদেশ দিয়েছেন কি? শ্বেতকেতু বললেন, নিশ্চয়ই দিয়েছেন। প্রবাহণ তখন শ্বেতকেতুকে পরলোকতত্ত্ব ও অধ্যাত্মবিদ্যা-সংক্রান্ত পরের পর পাঁচটি প্রশ্ন করলেন। শ্বেতকেতু একটিরও জবাব দিতে পারলেন না। তখন প্রবাহণ বললেন, তবে কেন বলছিলে যে তুমি উপদিষ্ট হয়েছো? ফলে মনের দুঃখে শ্বেতকেতু পিতার কাছে ফিরে গিয়ে বললেন, সেই রাজন্যবন্ধু আমাকে পাঁচটি প্রশ্ন করেছিলেন, আমি তার একটিরও জবাব দিতে পারি নি। পিতা স্বীকার করলেন, তিনি নিজেও এ-সব প্রশ্নের উত্তর জানেন না—জানলে নিশ্চয়ই উপদেশ দিতেন।

তারপর গৌতম (শ্বেতকেতুর পিতা) নিজেই রাজভবনে গেলেন। রাজা অভ্যাগতকে সমাদর করলেন। সকলে রাজা সভায় উপস্থিত হলে গৌতমও সেখানে গেলেন। রাজা তাঁকে বললেন, মনুষ্যসম্বন্ধী বিত্ত আপনারই থাকুক। আপনি আমার ছেলের কাছে যে-কথা বলেছিলেন আমাকে তাই বলুন। শুনে রাজা বিষণ্ণ হলেন।

রাজায় আজ্ঞায় গৌতম সেখানে দীর্ঘকাল বাস করলেন। তারপর রাজা তাঁকে বললেন, আপনি যে আমাকে সেই বিষয় জিজ্ঞাসা করেছিলেন—আপনার পূর্বে পুরাকালে কোনো ব্রাহ্মণই এই বিদ্যা লাভ করে নি। (এ-বিদ্যা কেবলমাত্র ক্ষত্রিয়গণেরই জানা ছিলো)। এই জন্যেই সর্বত্র রাজ্যশাসন করবার ক্ষমতা ক্ষত্রিয়দের হাতেই রয়েছে।

“তন্মাধ্য সর্ব্বেষু লোকেষু ক্ষত্রস্যৈব প্রশাসনমভূৎ”—ওই অধ্যাত্মবিদ্যার দরুনই সর্বত্র ক্ষত্রিয়দের শাসনক্ষমতা ছিলো। ক্ষত্রিয় বলতে সে কালের শাসক-শ্রেণী এ-বিষয়ে নিশ্চয়ই সন্দেহ নেই। প্রশাসন বলতে যে রাজ্য শাসনই বোঝাচ্ছে এ-কথা ডয়সন স্পষ্ট ভাবেই প্রমাণ করেছেন। ভাববাদ বা অধ্যাত্মবাদের সঙ্গে শাসক-শ্রেণীর সম্পর্ক শাসক-শ্রেণীরই সাহিত্যে আর কোথাও এমন স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে কিনা খুবই সন্দেহের কথা।

ভেবে দেখা দরকার বিশেষ করে একটি বিষয়ের কথা : অধ্যাত্মবাদের সঙ্গে শাসনক্ষমতার সম্পর্কটা শাসক-শ্রেণীর সাহিত্যে উলটো ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কিনা? অর্থাৎ, প্রশ্ন হলো, অধ্যাত্মবাদের দরুনই শাসনক্ষমতা, না, শাসনক্ষমতার দরুনই অধ্যাত্মবাদ? এ-বিষয়ে শেষ পর্যন্ত মীমাংসা যাই হোক না কেন, অন্তত উপনিষদে যেটুকু কথা লেখা রয়েছে সেটুকুকেও কেউই উড়িয়ে দিতে পারবে না : অধ্যাত্মবাদ শুধুমাত্র শাসক-শ্রেণীর দর্শনই নয়, সেই শ্রেণীর কাছে শাসনের হাতিয়ারও।

 

————-
২৫. S. Radhakrishnan HPEW 1:21.
২৬. মৈত্রী উপনিষদ ৭.৮.৯।
২৭. বিষ্ণুপুরাণ ৩.১৮।
২৮. মনু ৪.৩০।
২৯. মনু ২.১১ ইত্যাদি।

০৭. অধ্যাত্মবাদের উৎস

অধ্যাত্মবাদী দর্শনের উৎস কেন শুধুমাত্র শাসক-শ্রেণীর মানুষের চেতনায়?—এ-প্রশ্ন পরে তোলা যাবে। আপাতত তার চেয়েও জরুরী প্রশ্ন হলো, বস্তুবাদী দর্শনের সঙ্গে জনসাধারণের নাড়ির যোগটা নিয়ে। এই যোগাযোগ সম্ভব হলো কেমন করে?

ভারতীয় দর্শনের দলিলপত্র থেকেই এ-প্রশ্নের একটা ভারি আশ্চর্য জবাব পাওয়া যাচ্ছে। খুব মোটা ভাষায় বললে বলা যায়, দেশের সাধারণ মানুষ খেটে খাওয়ায় বিশ্বাস হারায় নি, তাই।

কিন্তু খেটে খাবার প্রশ্ন উঠছে কেন? দার্শনিক আলোচনার আসরে এ-ধরনের প্রসঙ্গ খুবই স্থূল আর খাপছাড়া শোনায় না কি?

তবু উপায় নেই। লোকায়ত দর্শনের ধ্বংসস্তুপ থেকে যে-দু’চারটে ভাঙা-চোরা চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে তার থেকেই ও-দর্শনের আসল রূপটিকে চেনবার চেষ্টা করতে হবে। আর এই সব চিহ্নের মধ্যে একটি চিহ্ন সত্যিই ওই খেটে খাবার প্রসঙ্গই তুলছে!

চিহ্নটা কী রকম?

বার্হস্পত্যসূত্রম(৩০), প্রবোধচন্দ্রোদয়(৩১) ইত্যাদি পুরোনো কালের একাধিক পুঁথিপত্রে লেখা আছে, লোকায়ত মত অনুসারে বার্ত্তাই হলো একমাত্র বিদ্যা। (অবশ্যই, শুধু বার্ত্তার কথাই নয়, তার সঙ্গে দণ্ডনীতিও।) লোকায়ত দর্শনের রহস্য উদঘাটন করবার ব্যাপারে এই সূক্ষ্ম সূত্রটি যে কতো জরুরী সে-কথায় আমরা বারবার ফিরতে বাধ্য হবো। আপাতত দেখা যাক, এই কথাটি থেকেই খেটে খাবার প্রসঙ্গ কেন উঠতে বাধ্য।

বার্ত্তা মানে কী? কৌটিল্য(৩২) বলছেন, বার্ত্তা মানে হলো কৃষি, পশুপালন আর বাণিজ্য। অবশ্যই, বাণিজ্য বলতে আজকাল আমরা যা বুঝি কৌটিল্যের যুগেও,–অর্থাৎ যীশুখ্রীষ্ট জন্মাবার প্রায় সোয়া তিন শ’ বছর আগেও,–তাই বোঝাতো কিনা খুবই সন্দেহের কথা। কিন্তু সে-কথা ছেড়ে দিলেও এ-বিষয়ে নিশ্চয়ই কোনো তর্ক উঠবে না যে বার্ত্তা শব্দের মুখ্য অর্থ হলো চাষবাস।

তাহলে, লোকায়তিকদের কাছে চাষবাসের কথাটাই ছিলো সবচেয়ে জরুরী।

এই মনোভাবটির সঙ্গে দেশের শাসকশ্রেণীর মনোভাবটির যে কতোখানি তফাত তা স্পষ্টভাবে মনে রাখা দরকার। মনু(৩৩) বলছেন, ব্রাহ্মণের পক্ষে কৃষিকাজ নিষিদ্ধ। একবার নয় আধবার নয়, বারবার বলছেন। আর শুধু মনুর আইনই নয়, পুরোনো কালের অন্যান্য আইনের বইতেও(৩৪) সরাসরি লেখা আছে যে বেদজ্ঞানের সঙ্গে কৃষিকর্মের সঙ্গতি নেই।

শ্রম বা কর্মজীবন সম্বন্ধে শাসক-সমাজের মনোভাবটা এই জাতীয় আইন-কানুন থেকেই আন্দাজ করা যাবে। এবং এইখান থেকে মূলসূত্র পেয়েই আরো একটি কথা বুঝতে পারা যাবে : ওই শাসক সমাজের দার্শনিক চেতনা যখন চূড়ান্ত ভাববাদের রূপ পেলো তখন কেন ঘোষিত হলো যে, যে-কোনো রকম কর্মই প্রকৃত দার্শনিক জ্ঞানের পক্ষে অন্তরায় মাত্র(৩৫)।

—————————–
৩০. S. N. Dasgupta HIP 3.532.
৩১. Ibid.
৩২. অর্থশাস্ত্র (রাধাগোবিন্দ বসাক) ১:৬।
৩৩. মনু ১০.১১৬।। cf. SBE 25:86, 106sq., 420sq., 420n.
৩৪. SBE 14:176
৩৫. শঙ্করভাষ্য ব্রহ্মসূত্র : ১.১.১।

০৮. ওরা কাজ করে

জ্ঞানের সঙ্গে কর্মের সম্পর্ক নিয়ে ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে সুদীর্ঘ আলোচনা হয়েছিলো। তার বিস্তারিত দলিলপত্র সংগ্রহ করা কঠিন নয়। সাধারণভাবে, দর্শনের একটি মূল সমস্যাকে বোঝবার জন্যে এই দলিলগুলি মহামূল্যবাদ। দর্শনের ওই মূল সমস্যাটি হলো বস্তুবাদ-বনাম-ভাববাদের সমস্যা : চেতনা আগে না বস্তুজগৎ আগে, চেতনা প্রাথমিক না বস্তু প্রাথমিক? আমাদের দেশের দার্শনিক পরিভাষায় সমস্যাটা অনেক সময় চেতনকারণবাদ-বনাম-অচেতনকারণবাদ হিসাবে দেখা দিয়েছে : চেতনপদার্থকেই বা চৈতন্যস্বরূপ ব্রহ্মকেই পরম সত্য বলবো, না, অচেতন পদার্থকেই পরম সত্য বলা হবে?

আমাদের দেশের দার্শনিক দলিলগুলিকে বিচার করলে দেখা যায়, চিন্তানায়কদের সঙ্গে স্বাভাবিক কর্মজীবনের যোগসূত্র যতোই বিচ্ছিন্ন হয়েছে ততোই তাদের চেতনা থেকে বিপুপ্ত হয়েছে বহির্বাস্তবের অমোঘ যাথার্থের কথা। অর্থাৎ কিনা, কর্মকে নীচবৃত্তি মনে করতে পারবার দরুনই মানুষ ভাববাদের দিকে অগ্রসর হতে পেরেছে। কিন্তু সব মানুষই তো আর কর্মকে খাটো করতে পারে না। তাহলে যে সমাজ টিকবে না, পৃথিবীর বুক থেকে মানুষের চিহ্ন মুছে যাবে। অন্ন-উৎপাদনের দায়িত্বটা অন্তত একদল মানুষকে গ্রহণ করতেই হবে। বস্তুত, যতোক্ষণ না একদল মানুষ ওইভাবে অন্ন উৎপাদনের দায়িত্বটা পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে ততোক্ষণ পর্যন্ত আর একদলের পক্ষে এ-কাজকে হীন, অধমের লক্ষণ বলে মনে করা সম্ভবই নয়। তাই কর্মকে শুধু সেই শ্রেণীর মানুষই খাটো করতে পারে যে-শ্রেণী কিনা কর্মের প্রত্যক্ষ দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই ভাববাদী বা অধ্যাত্মবাদী দর্শনে সমাজের সব-শ্রেণীর মানুষের চেতনাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তার বদলে পাওয়া যায় শুধু মাত্র সেই শ্রেণীর চেতনা যে শ্রেণী কর্মের দায়িত্ব গ্রহণ না করেও অপরের কর্মফলটুকু উপভোগ করবার অধিকার পেয়েছিলো।

এই তত্ত্বটিকে বোঝবার জন্যে ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে দলিলপত্র এতো রয়েছে যে অন্য কোনো দেশে তা খুঁজে পাওয়া সম্ভবই নয়। তার কারণ, আমাদের দেশে সমাজ-ইতিহাসের ওই পর্যায়ের বিকাশ—যে-পর্যায়ে ধীরে ধীরে পরান্নজীবী শ্রেণীর উৎপত্তি—খুবই দীর্ঘদিনস্থায়ী হয়েছিলো। ফলে অজস্র রচনায় তা প্রতিফলিত হয়েছে। অন্য কোনো দেশে এমনটা হয়েছে কিনা খুবই সন্দেহের কথা। আর সেই কারণেই দলিলগুলি সত্যিই মহামূল্যবান। কেননা, ভারতীয় ইতিহাসে যে-কথা স্পষ্ট ও প্রকট ভাবে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে তারই সাহায্যে অন্যান্য দেশের ইতিহাসে যে-কথা অস্পষ্ট আর আবছা হয়ে গিয়েছে তা বুঝতে পারবার সুযোগ হতে পারে।

ভাববাদের উৎস নিয়ে আলোচনা তুলতে হবে। কিন্তু আমাদের যুক্তির এই অবসথায় যেটুকু কথা একান্ত প্রাসঙ্গিক সেটুকু হলো, জনসাধারণের দর্শন আর বস্তুবাদী দর্শ্ন এই দুটি কথা আমাদের দেশে কেন দুটো আলাদা নাম পায় নি।

যারা মাটি কামড়ে পড়ে ছিলো মাটির পৃথিবীটাকেই তারা সত্যি বলে মেনেছে। লোকায়তিকদের কাছে বার্ত্তা বা চাষবাসের চেয়ে বড়ো বিদ্যা আর কিছুই ছিলো না। আর তাই জন্যেই তাদের চেতনায় এই মূর্ত মাটির পৃথিবীই সবচেয়ে বড়ো সত্যি।

তাই বলেছিলাম, খুব মোটা কথায় বললে বলা যায়, দেশের সাধারণ মানুষ খেটে খাওয়ায় বিশ্বাস হারায় নি। আর তাই জন্যেই তারা বস্তুবাদী দর্শনকে অমনভাবে আপন করে নিয়েছিলো।

সত্যিই কী আশ্চর্য ওই ‘লোকায়ত’ নামটি! এই নামের মধ্যেই খেটে খাওয়ার ইঙ্গিতটুকুও খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়। কেননা, নামটার মূলে রয়েছে দুটি শব্দ : লোক + আয়ত। তার মধ্যে আয়ত কথাটা কী করে পাওয়া সম্ভব তাই ভাবতে ভাবতে অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত(৩৬) বলছেন ‘আ+যৎ+অ’ করে কথাটা সিদ্ধ হওয়া অসম্ভব নয়। এখন ‘আ’ উপসর্গের অর্থ হলো ‘সম্যক ভাবে’। আর ‘যৎ’ ধাতুর  মানে হলো চেষ্টা করা, উদ্যম করা, কাজ করা। তাই আয়ত বলতে ‘সম্যকভাবে চেষ্টা করবার’ অর্থও বোঝাতে পারে বই কি। এই তো গেলো ‘আয়ত’ শব্দের মানে। আর ওই ‘লোক’ বলে কথাটার মানে কী? এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার যে মনিয়ার-উইলিয়াম্‌স্‌(৩৭) বলছেন, ‘লোক’ কথাটির সঙ্গে লাতিন শব্দ locus এবং লিথুনিয়ান laukas শব্দের তুলনা করা যায়। লিথুনিয়ান শব্দটির মানে, চাষের জমিই। আর লাতিন শব্দটির মানে, a clearing of forest—চাষের জন্য জঙ্গল-সাফ-করা জায়গা। সংস্কৃততেও ‘লোক’ শব্দের আদি ও অকৃত্রিম অর্থের সঙ্গে যে চাষের-জমির সম্পর্ক ছিলো না, এমন কথাও খুব জোর করে বলা যায় না। কেননা মনিয়ার-উইলিয়াম্‌স্‌-ই বলছেন, শুরুতে লোক শব্দের আগে একটা উ থাকতো—উলোক। এই উলোক=উরুলোক। এবং তার মানেই হলো জমি, মাঠ ইত্যাদি।

তাই লোকায়ত মানেও যা, বার্ত্তাকেই একমাত্র বিদ্যা মনে করাও তাই। একই কথা। কৃষকদের কথা।

ওরা কাজ করে। ওরা মাটির বুকে ফসল ফলায়। তাই ওদের চেতনার নাম হলো লোকায়ত।

 ——————————
৩৬. S. N. Dasgupta op. cit. 3:514

০৯. লোকায়ত-দর্শন আজো বিলুপ্ত হয় নি

বিপক্ষের লেখায় ঘৃণা আর বিদ্রুপের খোরাক যোগাবার মতো দু’চারটে টুকরো কথা বাকি রেখে এই বার্ত্তা-বাদী সম্প্রদায়টির সমস্ত পুঁথি দেশ থেকে বিলুপ্ত করা হয়েছে। কিন্তু ওই বার্ত্তা-নিয়ত মানুষগুলি? তারা তো আর সত্যিই সেই সঙ্গে দেশ থেকে বিলুপ্ত হয় নি। তাই লোকায়তিক পুঁথিপত্র দেশ থেকে বিলুপ্ত হলেও লোকায়তিক চেতনাটি বিলুপ্ত হবার কথা নয়।

আর সত্যিই তা হয় নি।

এই সত্যটি আবিষ্কার করলেন, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তাঁর আবিষ্কার সাম্প্রতিক ভারততত্ত্বে এক প্রকাণ্ড বিস্ময়।

তিনি,–এবং বোধহয় তাঁর মতো বড়ো ভারততাত্বিকদের মধ্যে তিনিই প্রথম,–অনুভব করলেন যে শুধুমাত্র লিখিত দলিলের রাজ্যে বাস করে দেশের চিন্তাধারার পুরো পরিচয় পাওয়া যাবে না। শুধু তাই নয়। তাছাড়াও তিনি বুঝেছিলেন যে, যে-মুষ্টিমেয় মানুষ সমাজের সদর-মহলকে আলো করে রেখেছেন,–যাঁরা জ্ঞানী, যাঁরা গুণী, যাঁরা বিদ্বান, যাঁরা বিদগ্ধ,–শুধুমাত্র তাঁদের ধ্যানধারণার খবর পেলেই দেশের ধ্যানধারণাগুলিকে পুরোপুরি জানা সম্ভব হবে না। কেননা, দেশের পিছিয়ে-পড়া অঞ্চলগুলিতে এবং সমাজের নিচের তলায় মানুষদের মধ্যে আজো বেঁচে রয়েছে এমন সব ধ্যানধারণা যার সঙ্গে উপরতলার আভিজাতিক ধ্যানধারণাগুলির মিল হয় না। এবং মহামহোপাধ্যায়ের পক্ষে যেটা সবচেয়ে আশ্চর্য আবিষ্কার সেটা হলো, দেশের ওই পিছিয়ে-পড়া অঞ্চলগুলিতে, ওই ছোটো জাতের মানুষদের মনে, যে-চেতনা আজো সত্যিই বেঁচে রয়েছে তা আসলে লোকায়তিক চেতনাই। মহামহোপাধ্যায় লিখছেন :

The influence the Lokayatikas and of the Kapalikas is still strong in India. There is a sect, and a large one too, the followers of which believe that deha or the material human body is all that should be care for; their religious practices are concerned with the union of men and women and their success (siddhi) varies according to the duration of the union. These call themselves Vaisnavas, but they do not believe in Vishnu or Krishna or his incarnations. They believe in deha. They have another name, Sahajia, which is the name of a sect of Buddhists which arose from Mahayana in the last four centuries of their existence in India.(৩৮)

অর্থাৎ, ভারতবর্ষে আজো লোকায়তিক আর কাপালিকদের প্রভাব খুব প্রবল। আজো এমন অনেক সম্প্রদায় টেকে রয়েছে যার অনুগামীরা মনে করে দেহই হলো একমাত্র সত্য; তাদের ধর্মে স্ত্রী-পুরুষের মিলনই একমাত্র অনুষ্ঠান এবং তাদের মতে সিদ্ধি নির্ভর করছে এই মিলনের দীর্ঘস্থায়িত্বের উপর। তারা নিজেদের বৈষ্ণব বলে; কিন্তু বিষ্ণু বা কৃষ্ণ বা তাঁর কোনো অবতার তারা মানে না। তারা বিশ্বাস করে শুধু দেহতে। তাদের আর একটা নাম হলো সহজিয়া, ভারতবর্ষে শেষ চার শতাব্দী ধরে মহাযান বৌদ্ধদের যে-অস্তিত্ব ছিলো তার থেকেই এ-নামের সম্প্রদায় দেখা দিয়েছিলো।

মহামহোপাধ্যায়ের-এর এই শেষ মন্তব্যটি স্পষ্টভাবে বোঝা গেলো না। তিনি বলছেন, লোকায়ত মত-ই আজো নানান নামের অন্তরালে, নানান সম্প্রদায় হিসাবে, আমাদের দেশে টেকে রয়েছে। তার মধ্যে একটির নাম হলো সহজিয়া। আবার, সেই সঙ্গেই তিনি বলছেন, এই সহজিয়া নামটিই মহাযান বৌদ্ধদের একটি সম্প্রদায়ের নাম। এ-কথা কেমনভাবে সম্ভব হতে পারে? কিংবা, যদি সত্যিই তাই হয় তাহলে বৌদ্ধদের সঙ্গে লোকায়তিকদের সম্পর্কটা ঠিক কী রকম? মহামহোপাধ্যায়ের মন্তব্য থেকে এই জাতীয় নানান প্রশ্ন ওঠে।

কিন্তু এ-সব প্রশ্নের চেয়ে ঢের আকস্মিক মনে হবে ওই ভাবে একনিশ্বেসে লোকায়তিকদের নামের সঙ্গে কাপালিকদের নাম উল্লেখ করা। শুধু তাই নয়, মহামহোপাধ্যায় বলছেন, লোকায়তিক সম্প্রদায়গুলি যে-ভাবে আজো আমাদের দেশে টেকে আছে, তারা শুধুই যে দেহতত্ত্বে আস্থাবান তাই নয়, তাদের আর একটি পরিচয় হলো কামসাধনা : স্ত্রী-পুরুষে মিলন!

তার মানে, খুব ব্যাপকভাবে আমরা যে-মতবাদগুলিকে বলি তান্ত্রিক মতবাদ। বামাচার।

কিন্তু বস্তুবাদের সঙ্গে এই বামাচারের সম্পর্ক কী? এ-প্রশ্নকে এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। কেননা, মহামহোপাধ্যায় যে ওইভাবে বামাচারী কাপালিকদের সঙ্গে লোকায়তিকদের এক করে দিচ্ছেন তার পেছনে রয়েছে পুরোনো পুঁথির নজির। পুরোনো পুঁথিতে লেখা আছে, লোকায়ত আর কাপালিক একই।(৩৯) এ-নজিরকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

———————-
৩৭. M. Monier-Williams SED 906.
৩৮. H. P. Shastri L 6.
৩৯. Ibid.

১০. বামাচার-এর তাৎপর্য

তাহলে লোকায়ত দর্শন নিয়ে আলোচনা করতে হলে নানান রকমের প্রশ্ন না তুলে উপায় নেই। প্রথমত, বিপক্ষের লেখায় লোকায়তিকদের সম্বন্ধে যে সব ছোটো ছোটো বিচ্ছিন্ন সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে শুধুমাত্র সেগুলি থেকেই লোকায়ত দর্শনের বিলুপ্ত রূপটিকে খুঁজে পাবার আশা নেই। পুঁথিত গণ্ডি পেরিয়ে দেশের মানুষদের দিকেও চেয়ে দেখতে হবে—বিশেষ করে সেই সব মানুষদের, যারা চাষ করে। কেননা, তাদের মধ্যে লোকায়ত দর্শন আজো বেঁচে রয়েছে,–যদিও সমাজের সদরমহলের বিদগ্ধ পুঁথিপত্রের আসরে কোনো এককালে তার যে-স্থান ছিলো সে-স্থান আজ আর নেই!

এইভাবে লোকায়ত-দর্শনের উৎস সন্ধানে বেরুলে দেখা যায় বামাচারী মতামত ও আচার-আচরণের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। আর ঠিক এইখানটিতে এসেই যেন ঠেকে যেতে হয়। কেননা, আমাদের আজকালকার শিক্ষিত ও মার্জিত রুচিবোধের কাছে ওই সব মতবাদ ও আচরণের মতো কদর্য ও বিকৃত ব্যাপার আর কিছুই হতে পারে না!

তাহলে উপায়? আমাদের আধুনিক রুচিবোধের খাতিরে লোকায়তের উৎস অনুসন্ধানটাকে কি ছেড়ে দিতে হবে?

অবশ্য, আর একটা সম্ভাবনাও বাকি থাকে। এমন তো হতেই পারে যে আমাদের রুচিবোধ, নীতিবোধ নেহাতই একালের ব্যাপার। অর্থাৎ কিনা, সমাজ-বিকাশের উন্নততর পর্যায়ের অবদান। অপরপক্ষে, বামাচারী মতাদর্শ সেকালের ব্যাপার। যদিও আজকের দিনেও তা টেকে রয়েছে তবুও তা অনেকাংশেই আজকের পৃথিবীরই আনাচে-কানাচে আদিম মানুষদের পক্ষে টেকে থাকবার মতোই। তার মানে এ-ধরনের ধ্যানধারণার উৎস সমাজ-বিকাশের অনেক পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ের মধ্যে। একালের রুচিবোধ ও নীতিবোধকে সেকালের পক্ষেও সত্য বলে মনে করবার কোনো কারণ নেই। আর যদি তাই হয় তাহলে এমনটা হওয়া সত্যিই অসম্ভব নয় যে, যে-উদ্দেশ্য থেকে সমাজের ওই পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ে বামাচারী ধ্যানধারণার জন্ম হয়েছিল তা বুঝতে পারা যাবে না শুধুমাত্র আধুনিক কালের লাম্পট্য-ব্যবহারকে মনে রাখলে।

কিন্তু এই বামাচারী ধ্যানধারণাগুলির উৎস সন্ধান করা যাবে কী ভাবে? কোন সূত্রে এগিয়ে?

১১. সিদ্ধিদাতার অনুসরণে

খবর পাওয়া গেলো, তান্ত্রিক সাহিত্যের আসর জমিয়ে রয়েছেন খোদ গণেশ বা গণপতি। তন্ত্ররাজ্যে তাঁর এমনই খ্যাতি যে অষ্টশতনামের মহিমা না জুটলেও অন্তত পঞ্চাশটি(৪০) চিত্তাকর্ষক নাম তাঁর ঠিকই জুটেছিলো।

তাই আশা হলো, সিদ্ধিদাতার শরণাপন্ন অলে হয়তো তন্ত্র-রহস্যও বুঝতে পারা অসম্ভব হবে না।

আর সত্যিই যেন সিদ্ধিদাতা! আপনি যদি গণপতির পদচিহ্ন অনুসরণ করে এগোতে থাকেন তাহলে সেকালের ভারতবর্ষের কতো অপরূপ দৃশ্যই না দেখতে পাবেন—দেখতে পাবেন কতো সব আশ্চর্য মানুষ, কতোই না তাদের আশ্চর্য বিশ্বাস!

এমনকি, ভারতীয়-দর্শনের অনেক জটিল রহস্যের কিনারা পাবার চেষ্টাকে এই গণপতিই হয়তো শেষ পর্যন্ত সফল করতে পারেন।

শুধুমাত্র সংকীর্ণ অর্থে লোকায়তিক বা চার্বাক দর্শনের সমস্যার কথাই বলছি না। বামাচারী ধ্যানধারণার উৎস নিয়ে সমস্যাটুকুও নয়। সিদ্ধিদাতার শরণাপন্ন হলে ভারতীয় দর্শনের আরো অনেক জটিল প্রশ্নের কিনারা হতে পারে।

ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে বিশেষ করে দুটি বিষয়ে সবচেয়ে বিস্ময়কর মনে হয়েছে।

প্রথমত, লোকায়তিকদের সঙ্গে সাংখ্য-দর্শনের সম্পর্ক।

দ্বিতীয়ত, লোকায়তের সঙ্গে বৈদিক ঐতিহ্যের সম্পর্ক।

বিষয় দুটি কেন অতো বিস্ময়কর মনে হয়েছে এখানে তার সামান্য পরিচয় দেবার চেষ্টা করা যায়।

—————
৪০. বিশ্বকোষ ৫: ২০২।

১২. লোকায়ত ও সাংখ্য

এক : সাংখ্য। সাংখ্য-দর্শনের মূল কথাগুলি সামগ্রিকভাবে ভারতীয় চিন্তাধারাকে কতোখানি প্রভাবিত করেছে সে-কথা ভারতীয় দর্শনের ছাত্রমাত্রেই অবগত আছেন। কিন্ত এর জন্মবৃত্তান্ত আজো অস্পষ্ট—বেলভেলকার(৪১), রানাডে(৪২), জনস্টন(৪৩) প্রমুখ আধুনিক পণ্ডিতেরা সে-বৃত্তান্তের সন্ধানে এগিয়ে শেষ পর্যন্ত কী রকম যেন দিশেহারা হয়ে গিয়েছেন,–খুব জোর গলায় কোনো কথা বলতে পারছেন না। তার প্রধাণ কারণ হলো, এ-বিষয়ে প্রাচীন পুঁথিপত্রের কয়েকটি মূল্যবান নির্দেশকে এঁরা সকলেই অগ্রাহ্য করছেন। একটি নির্দেশ পাওয়া যাচ্ছে, জৈনদের লেখা থেকে। সূত্র-কৃতাঙ্গ-সূত্র(৪৪) নামের জৈন পুঁথিতে লোকায়ত নাস্তিকদের ঠিক পরেই সাংখ্য মতের আলোচনা তোলা হয়েছে এবং সেই প্রসঙ্গেই ভাষ্যকার শীলাঙ্ক(৪৫) বলছেন, লোকায়ত ও সাংখ্যের মধ্যে খুব কিছু তফাত নেই।

কথাটা উড়িয়ে দেবার মতো নয়। কেননা এই নিরীশ্বর প্রধানকারণবাদের সঙ্গে পরের যুগে ঈশ্বরতত্ত্ব জুড়ে দিয়ে একে যতোই আস্তিক সাজাবার চেষ্টা করা হোক না কেন, আদি অকৃত্রিম অবস্থায় এর সঙ্গে অধ্যাত্মবাদের সম্পর্ক যে ছিলোই না এ-কথা আশা করি ভারতীয় দর্শনের ছাত্রমাত্রেই স্বীকার করবেন। মূল সাংখ্যের সঙ্গে লোকায়তিকদের ঘনিষ্ঠতার কথা পুরোনো কালেরই আরো কিছু কিছু বইতে স্পষ্টভাবে রয়েছে। সেগুলির আলোচনা পরে তোলা হবে।

আপাতত যে-কথা হচ্ছিলো : সিদ্ধিদাতা গণেশই আমাদের মনে করিয়ে দেন, আজ আমরা ব্যাপক অর্থে যে-সব ধ্যানধারণাকে বামাচারী বলে উল্লেখ করে থাকি তার সঙ্গে মৌলিক সাংখ্যের সম্পর্ক ছিলো কি না তা ভালো করে ভেবে দেখা দরকার।

প্রথমে দেখা যাক, তান্ত্রিক শক্তিবাদের সঙ্গে সিদ্ধিদাতার সম্পর্কটা কী রকম?

গোপীনাথ রাও-এর(৪৬) ‘এলিমেণ্টস্‌ অব হিন্দু আইকনোগ্রাফি’-র পাতা ওল্টালেই চোখে পড়বে ভারতবর্ষের কতো জায়গায় কতো দেবালয়ে আজো গণেশকে দেখতে পাওয়া যায় এক নগ্ন নারীমূর্তির সঙ্গে মৈথুনরত অবস্থায়। এই মূর্তিগুলির নাম শক্তি-গণপতি। অবশ্যই আজকের দিনে আমি-আপনি গণেশকে ওই অবস্থায় দেখে চোখ নামিয়ে নেবো, কিন্তু যাঁরা ওই মূর্তি রচনা করেছিলেন তাঁদের মনে আধুনিক যুগের, আধুনিক সমাজের, রুচিবোধ বা নীতিবোধ নিশ্চয়ই ছিলো না। কেননা তাহলে তাঁরা এ-জাতীয় মূর্তিকে অন্তত দেবালয়ে স্থান দিতে পারতেন না। তাই প্রাচীন কালের,–অর্থাৎ কিনা, সমাজবিকাশের অতি প্রাচীন স্তরের—ধ্যানধারণাগুলিকে বুঝতে হলে এই শক্তি-গণপতির সাক্ষ্যকেও তো সত্যিই উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। শক্তিকে ওইভাবে আঁকড়ে ধরে গণপতি যেন বলছেন : এই হলো সৃষ্টির মূলতত্ত্ব,–সৃষ্টিরহস্য যদি জানতে চাও তাহলে এই শক্তিকে চেনো।

সৃষ্টির মূলে শক্তি। নারী। প্রকৃতি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ওই শক্তির সঙ্গে সাংখ্যের প্রকৃতির কি কোনো মিল নেই? আপনি বলবেন, সাংখ্যের প্রকৃতি নেহাতই অমূর্ত দার্শনিক ধারণামাত্র, আমাদের দেশের মানুষ তাকে কখনোই তান্ত্রিক শক্তির মতো মূর্ত নারীমূর্তি হিসাবে কল্পনা করে নি।

কিন্তু আজকের দিনে এ-কথাও আপনি খুব জোর গলায় বলতে পারবেন না। কেননা, সিন্ধু আর ইরাবতীর কিনারা থেকে হাজার কয়েক বছরের পুরোনো ধুলো সরিয়ে সম্প্রতি নানারকম নারীমূর্তি পাওয়া গিয়েছে। এবং অন্তত স্যর জন মার্সাল(৪৭) তো দাবি করছেন, এগুলিকে প্রকৃতিমূর্তি বলেই সনাক্ত করতে হবে। তছাড়া মনে রাখবেন, ভারতবর্ষে প্রত্নতত্ত্বমূলক কাজ যতোখানি হওয়া দরকার তার তুলনায় কিছুই যেন হয় নি। তাই কোনখানে মাটির তলায় যে কোন ধরনের সাক্ষী গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে তার হদিস সত্যি আমরা জানি না। দেশে যে ঠিক কী নেই এ-কথা বলবার আগে কিছুটা হুঁশিয়ার হওয়ার দরকার।

————–
৪১-৪৩. আমরা দ্বিতীয় খণ্ডের ‘সাংখ্য দর্শনের উৎস’ অধ্যায়ে এই মতগুলির উল্লেখ করেছি
৪৪. S. N. Dasgupta op. cit. 3:527.
৪৫. Ibid
৪৬. T. A. G. Rao EHI Vol. I. Part I.
৪৭. J. Marshall MIC 1:51.

১৩. লোকায়ত ও বৈদিক ঐতিহ্য

দুই : লোকায়তিক চেতনার সঙ্গে বৈদিক ঐতিহ্যের সম্পর্ক। সিদ্ধিদাতাকে অনুসরণ করতে করতেই এ-বিষয়ে যে-তথ্য পাওয়া যায় তা সত্যিই পরমাশ্চর্য। কথাটা একটু খুলেই বলি।

বৈদিক ঐতিহ্য অতি প্রাচীন। উত্তর যুগে যাঁরা এ-ঐতিহ্যের বাহক বলে নিজেদের পরিচয় দিলেন তাঁরা লোকায়তিক চিন্তাধারা সম্বন্ধে ঘৃণায়-বিদ্বেষে মুখর। এবং লোকায়তিকদের পক্ষ থেকেও বৈদিক যাগযজ্ঞের বিরুদ্ধে যে বিদ্রুপ তাও কম তীক্ষ্ণ নয়। উত্তরকালের এই পরিস্থিতি দেখে মনে হয় লোকায়তের সঙ্গে বৈদিক ঐতিহ্যের কোনো সম্পর্কই নেই। কিংবা যা একই কথা, সম্পর্ক্টা নেহাতই অহিনকুলের মতো।

কিন্তু সিদ্ধিদাতার পদচিহ্ন অনুসরণ করে এগোতে এগোতে দেখা গেলো, উত্তরকালের এই পরিস্থিতিটি সনাতন নয়,–নিছক উত্তরকালেরই ব্যাপার। তার মানে, সুদূর অতীতে লোকায়তিক চিন্তাধারার সঙ্গে বৈদিক ঐতিহ্যের বিরোধ ছিলো কিনা তা একান্তই সন্দেহের কথা। কেননা, বৈদিক সাহিত্যের মধ্যেই লোকায়তিক ধ্যানধারণার রাশিরাশি চিহ্ন থেকে গিয়েছে। তার মানে, বৈদিক চিন্তাধারারও একটা ইতিহাস আছে। এবং সে-ইতিহাস দেখলে বোঝা যায় উত্তর যুগে এ-ঐতিহ্যের বাহকেরা যে-সব ধ্যানধারণাকে ঘৃণার চোখে দেখতে শিখেছিলেন, আদিকালে তাঁদেরই পূর্বপুরুষেরা ওই সব ধ্যানধারণাকেই সত্য বলে মনে করেছেন!

সংহিতা, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ নামের যে সাহিত্যরাশি তা রাতারাতি রচিত হয় নি, অনেক যুগ সময় লেগেছিলো,–ঠিক যে কতো শতাব্দী তার নিখুঁত হিসেব দেবার মতো ঐতিহাসিক গবেষণা এখনো বাকি আছে। কিন্তু সন-তারিখের হিসাব নিয়ে সুনিশ্চিত হতে না পারলেও অন্তত এটুকু কথা জোর গলায় বলবার মতো দলিল রয়েছে যে ওই কয়েক শতাব্দী ধরে বৈদিক মানুষেরা একই রকমের সমাজ-ব্যবস্থায় বাস করেন নি। তাঁদের সমাজজীবনে অনেক অদলবদল হয়েছে এবং সেই অদলবদলের পরিণাম হিসাবেই তাঁদের ধ্যানধারণাতেও অনেক রকম মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে, এইভাবে বদলাতে বদলাতে বৈদিক ঐতিহ্য শেষ পর্যন্ত উপনিষদের অধ্যাত্মবাদের রূপ পেলো, এবং তারো অনেক পরের যুগে শঙ্করাচার্য প্রমুখ দার্শনিকেরা নিজেদের চূড়ান্ত ভাববাদী দর্শনকে পেশ করবার সময় প্রচার করবার প্রাণপাত চেষ্টা করলেন যে তাঁদের ভাববাদটা নিষক ঔপনিষদিক বা বৈদান্তিক চিন্তাই। বেদের শেষে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল বলেই উপনিষদের আর একটি নাম বেদান্ত। এবং, শঙ্কর প্রমুখ দার্শনিকদের রচনা সাধারণভাবে দেশে এই ধারণাই সৃষ্টি করেছে যে বৈদিক সাহিত্যের আগাগোড়াই বুঝি ওই রকমের নিটোল অধ্যাত্মবাদ ও ভাববাদ।

সিদ্ধিদাতা কিন্তু এই ধারণাটিকে সন্দেহ করতে শেখান। কেননা গণপতিকে দেখতে পাবেন খোদ সংহিতাসাহিত্যের মধ্যেই। ঋগ্বেদ(৪৮)-এ পাবেন। যজুর্ব্বেদ(৪৯)-এ পাবেন। এবং, যেটা আরো বিস্ময়কর ব্যাপার, ঋগ্বেদ(৫০)-এ দেখবেন স্বয়ং বৃহস্পতির সঙ্গে গণপতির কোনো তফাত নেই। কথাটা জরুরী। কেননা, লোকায়ত দর্শনের আদিগুরু বলে যাঁর খ্যাতি তাঁর নামও বৃহস্পতিই।

আপত্তি উঠবে, নামে কী এসে যায়? ঋগ্বেদের ওই বৃহস্পতির সঙ্গে লোকায়ত-দর্শনের সত্যিই কোনো সম্পর্ক আছে কিনা তা খুবই সন্দেহের কথা। অন্তত কোনো রকম বাস্তব সম্পর্ক আজো ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হয় নি।

তা অবশ্য হয় নি। কিন্তু এতোদিন ধরে দেশে যে-ঐতিহ্যটা চলে আসছে তাকেও এক কথায় উড়িয়ে দেওয়া তো যায় না!

তাছাড়া, কথা হলো বৈদিক ঐতিহ্যের সঙ্গে লোকায়তিক ধ্যানধারণার সম্পর্ক শুধুমাত্র ওই নামটিকে আশ্রয় করেই নেই। বস্তুবাদী চেতনার,–এমনকি ওই বামাচারী চেতনারও,–অজস্র স্মারক বৈদিক সাহিত্যে ছড়ানো রয়েছে। এতো অজস্র যে সেগুলিকে খুঁজে পাবার জন্যে খুব বড়োসড়ো বেদজ্ঞ পণ্ডিত হবারও প্রয়োজন নেই। এই বই-এর দ্বিতীয় পরিচ্ছেদেই এ-ধরনের কিছু কিছু চিহ্ন বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করেছি।

—————————
৪৮. ঋগ্বেদ ২.২৩.১।
৪৯. বাজসনেয়ী সংহিতা ২৩.১৯।
৫০. ঋগ্বেদ ২.২৩.১ cf. R. G. Bhandarkar VS 147ff.

১৪. ভাষাজ্ঞান ও হিন্দুশাস্ত্র

অথচ, আশ্চর্যের ব্যাপার বলতে হবে, দেশবিদেশের এতো বড়ো বড়ো সংস্কৃতজ্ঞরা বৈদিক সাহিত্যের সঙ্গে অমন নিবিড়ভাবে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও এই জাতীয় চিহ্নগুলিত তাৎপর্য নিয়ে বিশেষ কোনো আলোচনাই তোলেন নি। অনুমানে মনে হয়, তার আসল কারণ হলো তাঁরা একালের ধ্যানধারণাকেই একমাত্র সম্বল করে বৈদিক-সাহিত্য পাঠ করেছেন। ফলে, স্মারকগুলির—বিশেষ করে বামাচারের স্মারকগুলি,–কোনো রকম তাৎপর্য নির্ণয় করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় নি : অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা বৈদিক সাহিত্যের শুধু শব্দ-রাশিই গ্রহণ করেছেন। কেননা, বৈদিক সাহিত্য আর যাই হোক একালের ব্যাপার নয়। তাই শুধুমাত্র একালের ধ্যানধারণার সাহায্য নিলেই বৈদিক শব্দরাশি সম্বন্ধে হাজার স্পষ্ট জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বৈদিক চিন্তাজগতের পুরো খবরটা পাওয়া সম্ভব হবে না। আর্থার এ্যাভেলন, ওরফে স্যর জন উড্রফ্‌(৫১), তন্ত্র-প্রসঙ্গেই বলেছিলেন, শুধুমাত্র ভাষাজ্ঞানের সাহায্যে হিন্দুশাস্ত্র বুঝতে পারা যাবে না, ভাষাজ্ঞান ছাড়াও আরো কিছুর দরকার আছে :

…more is required for the understanding of a Hindu Shastra than linguistic talent, however great.

বলাই বাহুল্য ভাষাজ্ঞানকে কোনো ভাবে ছোটো করবার চেষ্টায় তাঁর এই উক্তি উদ্ধৃত করছি না। বস্তুত, ভারতীয় পুঁথিপত্র বোঝবার ব্যাপার দেশ-বিদেশের দিকপাল বিদ্বানেরা গত কয়েক শতাব্দী ধরে যে অসামান্য পরিশ্রম এবং অতুলনীয় প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন তার উপর নির্ভর করতে না পারলে আজ আমরা অনেকাংশেই অন্ধ হয়ে থাকতাম। কিন্তু প্রাচীনেরাই বলেছেন, বেদবেদান্তের প্রকৃত তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করবার পথে শব্দার্থরাশি-গ্রহণ প্রথম সোপান হলেও সব নয়(৫২), তারপর আরো কিছুর দরকার পড়ে।

বৈদিক সাহিত্য বিচারে এ-কথা যে কতোখানি গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা প্রতিপদেই দেখতে পাবো। আর সেই সঙ্গে দেখতে পাবো, ঠিক কোন অর্থে কথাটা সত্যি। কেননা, প্রাচীনেরা যে-অর্থে কথাটা বলতেন তা ঠিক নয়।

এখানে অবশ্যই সব কথা আলোচনা করা যাবে না : বাক্যজন্য-জ্ঞান ছাড়াও প্রাচীন পুঁথিপত্রকে বোঝবার জন্যে আরো কী প্রয়োজন, শুধুমাত্র তার ইঙ্গিতটুকু দেওয়া যায়।

কিসের প্রয়োজন? একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির। তাই সমস্যা হলো, কোথা থেকে তা পাওয়া যাবে?

সমস্যাটা যদি কেবল আমাদের দেশের পুরানো পুঁথিপত্রের তাৎপর্য খোঁজবার সমস্যা হতো তাহলে না হয় অন্য কথা ছিলো। কিন্তু তা নয়। যে-কোনো দেশেরই পুরোনো কালের পুঁথিপত্র বোঝবার ব্যাপারে সমস্যা ওঠে, এবং মানবজাতির অভিজ্ঞতা যেহেতু সবদেশেই মোটের উপর এক ধরনের সেইহেতু সব দেশের বেলাতেই এ-সমস্যা মোটামুটি একই।

সমস্যাটা মোটের উপর সমান বলে এমন তো হতেই পারে যে আমাদের দেশের পুরোনো পুঁথিপত্র নিয়ে আলোচনা খুবই জরুরী হবে। কেননা যদি কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্যে অন্য কোনো দেশের পুরোনো দলিল নিয়ে আলোচনা সার্থক হয়ে থাকে তাহলে সেই পদ্ধতির প্রয়োগ করেই প্রাচীন ভারতীয় চিন্তাধারার অনেক দুর্বোধ্য বিষয় আমরা হয়তো বুঝতে পারবো।

আর এইদিক থেকেই আমার সবচেয়ে বড়ো ঋণ অধ্যাপক জর্জ টম্‌সনের কাছে। যদিও তিনি ভারততত্ত্ববিদ্‌ নন, সংস্কৃতজ্ঞ নন,–গ্রীক ও লাতিন সাহিত্যে বিশেষজ্ঞ। বস্তুত আজকের পৃথিবীতে তাঁর মতো বড়ো গ্রীকতত্ত্ববিদ খুব কমই আছেন।

বৈদিক সাহিত্য নিয়ে আমরা যে-সব সমস্যার সম্মুখীন হই অধ্যাপক জর্জ টম্‌সন গ্রীক সাহিত্যে নিয়েও মোটের উপর তার অনুরূপ সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। এবং শেষ পর্যন্ত কোন পদ্ধতির সাহায্যে তিনি এ-সব সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছেন তার আলোচনা দ্বিতীয় পরিচ্ছেদেই করেছি। কেননা, এই পদ্ধতির কথাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এবং আমার স্থির বিশ্বাস, একালের ওই গ্রীকতত্ত্ববিদের অভিজ্ঞতা থেকে ভারততত্ত্ববিদরাও যদি লাভবান হতে রাজী হন তাহলে ভারততত্ত্বের আলোচনাতেও যুগান্তর আসবে। ব্যক্তিগত সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে সচেতন হয়েও আমি প্রাচীন পুঁথিপত্রের নানান রকম দুর্বোধ্য কথাবার্তার অর্থ নির্ণয়ে সাহসী হয়েছে তা প্রধাণত এই পদ্ধতির সাহসেই।

কিন্তু যে-কথা হচ্ছিলো : বৈদিক সাহিত্যে লোকায়তিক চেতনা এবং এমন কি বামাচারী ধ্যানধারণার স্মারক নিয়ে কথা। এ-ধরনের স্মারক যে অজস্র রয়েছে তার প্রমাণ হল বৈদিক সাহিত্যই, নমুনা দেখা যাবে পরের পরিচ্ছেদে। অথচ, উত্তরকালে আমাদের দেশে বৈদিক ও লোকায়তিক ঐতিহ্য এমনই বিরুদ্ধ হয়েছে যে খোদ বৈদিক সাহিত্যেই এ-জাতীয় স্মারক শর্ষের মধ্যে ভূতের মতো মনে হতে পারে। এমন ব্যাপার কী করে সম্ভবপর হলো?

————————-
৫১. A. Avalon PT preface x

১৫. মানুষ আর মানুষের ধ্যানধারণা

আপনি যদি মানুষের কথা বাদ দিয়ে মানুষের ধ্যানধারণাগুলিকে বোঝবার চেষ্টা করেন তাহলে এ-সমস্যার, এবং এই জাতীয় আরো অনেক সমস্যার, কোনোদিনই কোনো রকম কিনারা খুঁজে পাবেন না।

আপনি যদি মানুষের কথা মনে রেখে মানুষের ধ্যানধারণাগুলিকে বুঝতে রাজী হন তাহলে এ-সমস্যার, এবং এই রকম আরো অনেক সমস্যার, কিনারা খুঁজে পাবেন।

তাহলে শুরুতেই ঠিক করা দরকার, কোন পথে এগোবার চেষ্টা করবো।

 

আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই বলা হয়েছে, বেদ অপৌরুষেয়। অর্থাৎ কিনা, কোনো মানুষের রচনা নয়। এই কথা যে ঠিক নয় আশা করি তা খুব বড়ো করে আলোচনা করবার দরকার নেই। আধুনিক পণ্ডিতেরা নিশ্চয়ই একমত হয়ে বলবেন, এটা নেহাতই সেকেলে কুসংস্কার। কেননা খ্রীষ্টান পৃথিবীতেও আজকাল যে-রকম মেরী মাতার বিশুদ্ধ গর্ভধারণের বিস্ময়কর কাহিনীতে বিশ্বাস ক্ষয়ে গিয়েছে হিন্দু পৃথিবীতেও সেই রকম বেদের অপৌরুষত্বে বিশ্বাস শুলিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু ওই একই কুসংস্কার কী ভাবে অন্য মূর্তিতে আজকের দিনেও অনেক বিদ্বানের দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে রেখেছে তা ভালো করে দেখা দরকার।

কেউ কেউ মনে করেন, ধ্যানধারণার আলোচনায় শুধু মাত্র ধ্যানধারণার কথাটুকুই প্রাসঙ্গিক। তাই যাদের মাথায় এই ধ্যানধারণাগুলি এসেছিলো তারা কী খেতো, কী পরতো, কেমনভাবে বাঁচতো, অন্যান্য মানুষদের কোন চোখে দেখতে,–এই জাতীয় প্রশ্ন তোলা অবান্তর। যাঁরা আজো এ-কথা বলেন তাঁরা আসলে ওই পুরোনো কুসংস্কারেরই এক আধুনিক সংস্করণে আস্থাবান। কেননা ধ্যানধারণাগুলিকে এই চোখে দেখতে গেলে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতেই হবে ওগুলি যেন স্বয়ম্ভু, নিরালম্ব—আকাশে ফোটা ফুলের মতো। কিন্তু আকাশকুসুমটা ঠাট্টার কথা, বাস্তবের বর্ণনা নয়। কেননা আকাশে সত্যিই ফুল ফোটে না। তেমনি, আসমান থেকে ধ্যানধারণার জন্ম হয় না, শুধুমাত্র মানুষের মাথাটেই ধ্যানধারণার বিকাশ হয়। এবং সেগুলির উৎসে রয়েছে মানুষের পারিপার্শ্বিক। ধ্যানধারণার আলোচনা তাই যাদের ধ্যানধারণা তাদের কথা এবং মূর্ত পারিপার্শ্বিকের কথা বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

ধ্যানধারণাগুলিকে খিলানের সঙ্গে তুলনা করা হয়। খিলান শূন্যে ভর করে থাকতে পারে না, তার জন্যে ভিত্তিস্তম্ভ প্রয়োজন। এই ভিত্তিস্তম্ভ হলো মানুষের মূর্ত সমাজজীবন। ধ্যানধারণাকে এইভাবে বোঝবার চেষ্টার নাম দেওয়া হয় ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা(৫৩)। আজকের দিনে অবশ্য নানা কারণে এবং নানাভাবে এই ব্যাখ্যাকে ভুল বলে প্রতিপন্ন করবার চেষ্টা করা হয়।

অথচ, এ-ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করাও যা বেদকে অপৌরুষেয় মনে করাও তাই। একই কুসংস্কার, শুধু রূপের তফাত—একটা সেকেলে, অপরটা একেলে। কিন্তু দু’-এরই মূল কথাটা হলো মানুষকে বাদ দিয়েও মানুষের ধ্যানধারণাকে বোঝা সম্ভবপর—ধ্যানধারণাগুলো সেন স্বয়ম্ভু, গগনকুসুমের মতো।

দ্বিতীয়ত, ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যাকে সত্য বলে মেনে অগ্রসর না হলে ভারতীয় দর্শনের নানা দুর্বোধ্য সমস্যার কোনো কিনারা করার চেষ্টাই অসম্ভব। কেন? তা বলবার অবকাশ পাবো পুরো বইটি জুড়েই। আপাতত, বৈদিক সাহিত্যে লোকায়ত ও বামাচারী চিন্তাধারার বিস্ময়কর স্মারকগুলির প্রসঙ্গে কথাটা যতোটুকু ওঠে শুধু সেইটুকুর উল্লেখ করা যায়।

——————-
৫২. ব্রহ্মসূত্র ১.১.১ ।। “অথ” শব্দের অর্থপ্রসঙ্গে শঙ্কর রামানুজ প্রমুখের মন্তব্য দ্রষ্টব্য।
৫৩. K. Marx and F. Engels GI ইত্যাদি।

১৬. ধর্মবিশ্বাসের আগে

আপাত দৃষ্টিতে দেখলে এই স্মারকগুলিকে যতো বিস্ময়করই মনে হোক না কেন, ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যায় আস্থা নিয়ে অগ্রসর হলে আর তেমন বিস্ময়কর মনে হয় না। কেননা, ওই বৈদিক ধ্যানধারণার মতোই লোকায়তিক ও বামাচারী ধ্যানধারণাগুলিঈ সত্যিই অপৌরুষেয় নয়—সমাজ-বিকাশের একটি নির্দিষ্ট স্তরে মানুষের মাথায় এগুলি দেখা দিয়েছিলো। বামাচারের কথাই বিশেষ করে বলি। আধুনিক চোখে দেখলে মনে হয়, শুধুমাত্র বীভৎস কামবিকার। কিন্তু সমাজ-ব্যবস্থার ঠিক কোন পর্যায়ে এগুলির উৎস তা যদি খুঁজে পাওয়া সম্ভবপর হয় তাহলে আর এগুলিকে কামবিকার বা লাম্পট্য-ব্যবহার বলে মনে করবার কোনো অবকাশই থাকে না। কেননা, সমাজ-ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে বোঝা যায় এগুলি সেই সমাজের মানুষের কাছে শুধুই যে উদ্দেশ্যমূলক তাই নয়, বাঁচা-মরার সমস্যার সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। সমাজ-বিকাএর সেই পর্যায় থেকে এগুলিকে উপড়ে যদি আজকের সমাজে, কিংবা সমাজ-বিকাশের কোনো পরবর্তী পর্যায়ের আবহাওয়ায়, নিয়ে আসবার চেষ্টা করা হয় তাহলে অবশ্যই ওই আদিম-গুরুত্বের দিকটা মরে যাবে, মুছে যাবে—যা ছিলো উদ্দেশ্যমূলক তাই হয়ে দাঁড়াবে উদ্দেশ্য-বিরোধী কামবিকার। অর্থাৎ কিনা ধ্যানধারণাগুলি বিপরীতে পরিণত হবে। যেমনটা হয়েছে তন্ত্রশাস্ত্রের অধিকাংশ লিখিত পুঁথিপত্রের বেলায়। কিন্তু ওই বামাচারী ধ্যানধারণাগুলির উৎস সমাজ-বিকাশের যে-পর্যায়ে তা লেখার হরফ আবিষ্কার হবে আগেকার পর্যায়। তাই বামাচারকে বোঝবার জন্যে তন্ত্রশাস্ত্রের লিখিত পুঁথিপত্রগুলিকে একমাত্র সম্বল মনে করলে আধুনিক গবেষক ভুল করবেন।

আরো কথা আছে। সমাজ-বিকাশের সেই প্রাচীন পর্যায়টির কথা স্পষ্টভাবে মনে রাখলে বোঝা যায়, সে-অবস্থায় মানুষের মাথায় ভাববাদী বা অধ্যাত্মবাদী চিন্তাধারা জন্মাবার অবকাশই পায় নি। হয়তো, সেই স্তরের চিন্তাধারাকে কোনো রকম দার্শনিক সংজ্ঞা দিতে যাওয়া ভুল হবে। কেননা, এ-চেতনা বহুলাংশেই অস্ফুট ও অব্যক্ত। এই স্তরের চেতনায় বাস্তব প্রকৃতির বাস্তব নিয়মকানুন সম্বন্ধে মানুষের প্রকৃত জ্ঞান নেহাতই তুচ্ছ ও অকিঞ্চিৎ : জ্ঞানের ওই দৈন্য সে-অবসথায় মানুষের বাস্তব দৈন্যেরই অনুরূপ। সমান করুণ। তবুও, যেটা হলো আসলে জরুরী কথা, এ-অবস্থায় মানুষের চেতনায় ভাববাদী বা অধ্যাত্মবাদী চিন্তাধারার জন্মই সম্ভবপর হয় নি। মানুষ তখনো দেবতার পায়ে মাথা কুটতে শেখে নি, পরলোকতত্ত্বের আলেয়ায় ভুলে সংসারকে অসার মনে করবার অবকাশ পায় নি, অবসর পায় নি দুনিয়াটা মনগড়া কিনা তাই নিয়ে মাথা ঘামাবার। তাই যতো মূক, যতো অস্পষ্ট, যতো অব্যক্তই হোক না কেন,–সমাজ-বিকাশের এই স্তরে মানুষের চেতনাটা লোকায়তিকই, দেহাত্মবাদীই।

কিন্তু, সমাজ-বিকাশের এ-রকম কোনো পর্যায়ের কথা কি সত্যিই বাস্তব? এ-রকম কোনো পর্যায়ের কথা কি সত্যিই জানা গিয়েছে?

গিয়েছে। কেননা, পুরো পৃথিবীর বুক জুড়ে সমস্ত মানুষই সমান তালে উন্নত হতে পারে নি। আজো পৃথিবীর আনাচে-কানাচে নানা জায়গায় মানুষের দল আদিম দশাতেই পড়ে রয়েছে। এবং তাদের দিকে দেখলে বোঝা যায় তাদের মাথায় ঈশ্বরের ধারণা জন্মায় নি, তারা প্রার্থনা করতে শেখে নি,–এক কথায় তারা এখনো অধ্যাত্মবাদ ও ভাববাদী চিন্তাধারার পরিচয় পায় নি।

Religion is characterized by belief in God and the practice of prayer or sacrifice. The lowest savages known to us have no gods and know nothing of prayer or sacrifice. Similarly whenever we can penetrate the prehistory of civilized peoples we reach a level at which again there are no gods and no prayer of sacrifice.(৫৪)

ধর্মের লক্ষণ হইলো ঈশ্বরের বিশ্বাস এবং উপাসনা ও বলিদান-মূলক ক্রিয়াকাণ্ড। যে-সব মানবদলকে সবচেয়ে আদিম অবস্থায় থাকতে দেখা গিয়েছে তাদের কোনো ঈশ্বর নেই এবং তারা প্রার্থনা বা বলিদানের কথা কিছুই জানে না। তেমনি, সভ্য মানুষদের প্রাক্‌-ইতিহাস পর্যন্ত যখনই পৌঁছোনো যায় তখন আমরা এমন করে স্তরে পৌঁছুই যেখানে ঈশ্বর নেই, উপাসনা নেই, বলিদান নেই।

ভারতীয় ধ্যানধারণার ইতিহাসে যদি লোকায়তিক চেতনার উৎস সন্ধান করা যায় তাহলে শেষ পর্যন্ত সমাজ-বিকাশের একটি এই রকম স্তরেই গিয়ে পৌঁছতে হয়। তার সাক্ষী স্বয়ং সিদ্ধিদাতা গণেশ।

তার মানে নিশ্চয়ই এই নয় যে ভারতবর্ষের ইতিহাসে লোকায়তিক চিন্তাধারা চিরকালই ওই রকম মূক, অব্যক্ত ও অচেতন অবস্থায় পড়েছিলো। বস্তুত, ওই রকমই একটা অস্ফুট ও অচেতন দেহতত্ত্ব হিসাবে তার জন্ম হলেও ভারতীয় দর্শনের আলোচনায় দেখা যায়, কোনো একটা যুগে এই লোকায়তিক চেতনাই রীতিমতো সচেতন বস্তুবাদী দর্শনে পরিণত হয়। পুঁথি লেখা হয়েছিলো, ভাষ্য রচনা হয়েছিলো এবং তার সে-সব ভাঙাচোরা টুকরো আজো পাওয়া যাচ্ছে তা দেখে বোঝা যায় লোকায়তিকদের যুক্তিতর্ক একটা যুগে কী রকম শানানো-সবল হয়ে উঠেছিলো। কি করে যে তা সম্ভবপর হয়েছিলো তা আজো আমরা পুরোপুরি জানতে পারি নি। প্রাচীন ভারতের ইতিহাস-সংক্রান্ত মৌলিক গবেষণা আজো অনেক বাকি আছে।

কিন্তু তার আগে, যে-প্রসঙ্গ থেকে এতো কথা উঠেছে সেটুকুর আলোচনা সেরে নেবার চেষ্টা করা যাক।

বৈদিক ঐতিহ্যের সঙ্গে লোকায়তিক ঐতিহ্যের তফাতটা উত্তর যুগে এতো প্রকট হওয়া সত্ত্বেও বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে বামাচারী ও এমনকি লোকায়তিক চেতনার এত অজস্র স্মারক কি করে টেকে রয়েছে?

তার কারণ নিশ্চয়ই লোকায়তিক ধ্যানধারণাও যে-রকম আকাশ থেকে জন্মায় নি, উত্তর যুগের বৈদিক অধ্যাত্মবাদ ও ভাববাদী ধ্যানধারণাও সেই রকমই আকাশ থেকে জন্মায় নি। উভয়ের উৎসই হলো সমাজ-বিকাশের নির্দিষ্ট পর্যায়ের মধ্যে। এখন, সমাজ-বিকাশের যে-সব বিভিন্ন পর্যায় সেগুলির মধ্যে বাঁধাধরা সম্পর্ক আছে : কোন পর্যায় আগের এবং কোন পর্যায় পরের, শুধু এইটুকুই সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় নয়, এমন কি কোনো দেশের কোনো মানুষই আগের পর্যায়কে লঙ্ঘন করে একেবারে পরের পর্যায়ে উঠে যেতে পারে নি। তার মানে, পশুর রাজ্যে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলতে চলতে মানুষ যে শেষ পর্যন্ত সভ্যতার আওতায় এসে পৌঁছলো তা একটি নির্দিষ্ট পথ ধরে এগিয়েই, কয়েকটি নির্দিষ্ট ধাপ পেরিয়েই। এই দিক থেকে সব দেশের মানুষের অভিজ্ঞতাই মোটের উপর এক রকমের। তাই আজকের দিনেও পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষেরা যে-অবস্থায় পড়ে রয়েছে সেই দিকে চেয়ে দেখলে এগিয়ে-যাওয়া মানুষের দল তাদের বিস্মৃত অতীতটাকে খুঁজে পাবে। কেননা, এগিয়ে-যাওয়া মানুষেরাও এককালে ঠিক ওই রকমেই পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ে ছিলো—সে-পর্যায় না পেরিয়ে একেবারে সরাসরি উন্নত পর্যায়ে উঠে আসা কোনো দেশের বা কোনো জাতের মানুষের পক্ষে সম্ভবপর হয় নি।

এ-কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করলেন লুইস্‌ হেনরি মর্গান। তার ‘প্রাচীন সমাজ’ নামের বই শুধুই যে বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারে অমূল্য সম্পদ তাই নয়, যে-কোনো দেশের প্রাচীন পুঁথিপত্রের প্রকৃত তাৎপর্য-নির্ণয়ে অপরিহার্য হাতিয়ারও।

মানুষের ধ্যানধারণার সঙ্গে সমাজ-বিকাশের পর্যায়-বিশেষের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্কের কথা এবং এই পর্যায়-পরস্পরায় অনিবার্য ধারাবাহিকতার কথা মনে রাখলে বৈদিক সাহিত্যে বামাচারী ও লোকায়তিক ধ্যানধারণার স্মারকগুলি দেখে খুব বেশি বিস্ময়ের অবকাশ থাকবে না। কেননা, সমাজ-বিকাশের যে-পর্যায়ে লোকায়তিক ও বামাচারী ধ্যানধারণার উৎস, বৈদিক মানুষেরাও এককালে তার মধ্যে দিয়েই অগ্রসর হয়েছিলেন এবং সে-পর্যায়কে পিছনে ফেলে এলেও তাঁদের সাহিত্য থেকে তার স্মৃতি সম্পূর্ণভাবে মুছে যায় নি। এই স্মৃতি হিসেবেই সে-পর্যায়ের ধ্যানধারণার অনেক চিহ্ন বৈদিক সাহিত্যে টেকে গিয়েছে। তার মানে, বৈদিক ঐতিহ্যের বাহকরা উত্তর যুগে যে-সব ধ্যানধারণাকে অমন ঘৃণার চোখে দেখতে শিখেছিলেন, এককালে তাঁদের নিজেদের মনেই—অর্থাৎ তাঁদেরই পূর্বপুরুষদের মনে—সেগুলি চরম সত্যের মর্যাদা পেতো।

——————–
৫৪. G. Thomson R 9

১৭. আর্য-অনার্য মতবাদের সংকট

আর ঠিক এই কথাটিকে স্পষ্টভাবে চেনবার পথে বিঘ্ন ঘটায় আধুনিক পণ্ডিত মহলে অত্যন্ত ব্যাপকভাবে প্রচলিত একটি মতবাদ। মতবাদটি হলো, আর্য-অনার্য বা আর্য-দ্রাবিড়-সংক্রান্ত মতবাদ : অনার্যদের এই দেশে প্রবেশ করবার পর শিক্ষিত ও সংস্কৃত আর্যদের চিন্তাধারার মধ্যে কিছু কিছু অসংস্কৃত অনার্য-বিশ্বাস প্রবেশ করেছিলো। কী করে করলো? তাই নিয়ে অবশ্য নানা মুনির নানা মত। ক্ষিতিমোহন সেন(৫৫) বলছেন, এ হলো করুণাময়ের লীলা। পণ্ডিত জবাহরলাল নেহেরু(৫৬) বলছেন, এর কারণ হলো আগন্তুক আর্যদের অসীম সহনশীলতা। এ. বি. কীথ(৫৭) অতো ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টাই করছেন না, শুধু ঘোষণা করছেন যে স্থানীয় অসভ্য মানুষদের নানান ধ্যানধারণা আর্যদের ধ্যানধারণার রাজ্যে ‘সেঁদিয়ে’ গিয়েছিলো।

এখন এই আর্য-অনার্য মতবাদ যে শেষ পর্যন্ত ধোপে কতোখানি টেকবে তা খুব সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এককালে বিদগ্ধ সমাজ এ-মতবাদ নিয়ে যতোখানি উৎসাহ দেখিয়েছিলো আজদের দিনে তার তুলনায় উৎসাহ অনেক কমেছে(৫৮)। এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় পণ্ডিতমহলের ঝোঁকটা দিক বদল করছে : এককালে ঝোঁক ছিলো যা কিছু উন্নত ধরনের চিন্তা তাকেই আর্য আখ্যা দেবার, একালে যেন তথাকথিত দ্রাবিড়দের প্রতিই শ্রদ্ধা ও পক্ষপাতটা বেশি(৫৯)।

অবশ্যই আমাদের পক্ষে এ-জাতীয় তর্কবিতর্কের মধ্যে প্রবেশ করবার সুযোগ হবে না, প্রয়োজনও নেই। আমাদের পক্ষে যেটুকু কথা প্রাসঙ্গিক সেটুকু হলো ভবিষ্যতে এই আর্য-অনার্য মতবাদের কপালে যাই থাকুক না কেন বর্তমানে এ-মতবাদ সত্য নির্ণয় প্রচেষ্টার যে বাধা সৃষ্টি করতে পারে সে-সম্বন্ধে সচেতন হওয়া। আসলে আর্যই বলুন, বৈদিক মানুষই বলুন, বা যাই বলুন না কেন—তাদের নিজেদেরও একটা অসভ্য অতীত ছিলো, এবং সে-অতীতের নানা স্মারক পরের যুগের বৈদিক সাহিত্যেও টেকে থাকতে বাধ্য; তাই সেগুলিকে নির্বিচারে অনার্য বা দ্রাবিড়দের কাছ থেকে গৃহীত মনে করা চলবে না। অর্থাৎ কিনা, এই আর্য-অনার্য মতবাদ সত্যই হোক আর ভ্রান্তই হোক—তারই মোহে আমরা যেন বৈদিক মানুষদেরই নিজস্ব অতীতটার সন্ধান প্রচেষ্টায় উদাসীন না হই।
—————
৫৫. ক্ষিতিমোহন সেন : ভারতের সংস্কৃতি, ভূমিকা।
৫৬. J. Nehoru DI 57, 60, 68, 78.
৫৭. A. B. Keith RPVU 18, 24, 33, 54, 91, 92 ইত্যাদি
৫৮. বাঙালীর ইতিহাস : নীহাররঞ্জন রায়। ভারতের সংস্কৃতি : ক্ষিতিমোহন সেন। S. Radhakrishnan HPEW, ইত্যাদি, ইত্যাদি।
৫৯. Ibid.

 

.১৮. সমাজ-বিকাশের ধারা

 

লোকায়তিক ধ্যানধারণার উৎস-সন্ধানে অগ্রসর হয়ে আমরা সমাজ-বিকাশের কোনো এক প্রাক্‌-সভা পর্যায়ে গিয়ে পড়েছি। কিন্তু সে-কথার তাৎপর্য ঠিক কী? তার মানে কি এই যে প্রাচীন সমাজের সেই মানুষেরা বুদ্ধিশুদ্ধির দিক থেকে এমনই খাটো বা নিকৃষ্ট ধরনের ছিলো যে অধ্যাত্মবাদী চিন্তাধারার মহিমাটা তারা বুঝতেই পারে নি? এক কথায় প্রশ্ন হলো,—এর কারণটা কি এই যে তাদের মগজের গড়নটাই বাজে রকমের ছিলো, তাই তারা ইহলোক ছাড়া আর কিছুই সত্যি বলে ভাবতে পারেনি? তাদের লোকায়তিক চেতনাটা কি শুধুই স্থূলবুদ্ধির পরিচায়ক?

তা নয়। আসল কারণটা মগজের গড়ন নয়, সমাজের গড়ন। সমাজের গড়নটা বদলেছে বলেই মানুষের মাথায় এক ধরনের ধ্যানধারণার বদলে আর এক ধ্যানধারণার উদয় হয়েছে।

আধুনিক বিজ্ঞান(৬০) অনুসারে গত হাজার তিন-চার বছরের মধ্যে মাপ বা গড়ন কোনো দিক থেকেই মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের খুব উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন ঘটে নি। তবুও তার চিন্তাচেতনায় আকাশ-পাতাল তফাত দেখা দিয়েছে। কী করে তা সম্ভব হলো? তার কারণ, যদিও মানুষের চিন্তাচেতনা তার স্নায়ুতন্ত্রের উপরই নির্ভরশীল, তবুও এই স্নায়ুতন্ত্রের উপরই পারিপার্শ্বিকের যে-অবিরাম ঘাত-প্রতিঘাত চলেছে তার কথা বাদ দিলে স্নায়ুতন্ত্রের স্বরূপটাই বুঝতে পারা সম্ভব নয়। এ-কথায় যাঁদের মনে সন্দেহ আছে তাঁরা পাভ্‌লভের(৬১) রচনাবলী থেকে প্রমাণগুলি দেখে নেবেন।

লোকায়তিক ধ্যানধারণাকে পিছনে ফেলে মানুষ যে এককালে অধ্যাত্মবাদী ও ভাববাদী ধ্যানধারণা্র আওতায় এসে পৌঁছেছিলো তার আসল কারণ তার স্নায়ুতন্ত্রে কোনো রকম আকস্মিক পরিবর্তন নয়,—আসলে তার সমাজ-সংগঠনের ক্ষেত্রে এ আমূল পরিবর্তন। অধ্যাত্মবাদের জন্মবৃত্তান্ত জানতে হলে এই পরিবর্তনটাকে ভালো করে বোঝা দরকার।

মানবসমাজের ইতিহাসটা একবার আগাগোড়া দেখবার চেষ্টা করা যাক।

আজ পর্যন্ত মানবসমাজের যে-ইতিহাস তাকে আমরা মোটের উপর তিনটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি :

এক : আদিম প্রাক-বিভক্ত সমাজ
দুই : বর্তমান শ্রেণী-সমাজ
তিন : আগামী কালের শ্রেণীহীন সমাজ

প্রাক-বিভক্ত সমাজটাকে বলা হয় আদিম সাম্যসমাজ। তার কারণ, এ-সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিচয় নেই, পরিচয় নেই রাষ্ট্রব্যবস্থার। শোষক নেই, শোষিত নেই, শাসক নেই, শাসিত নেই। সবাই স্বাধীন, সবাই সমান, মানুষে-মানুষে সত্যিই ভাই-ভাই ভাব। এ-রকম সমাজ যে কল্পনা নয়, বাস্তব—তার প্রমাণ? প্রমাণ হলো, আজো পৃথিবীর নানান জায়গায় এ-রকম সমাজ সত্যিই রয়েছে, তাই সে-সমাজ স্বচক্ষে দেখা যায়। লুইস্‌ হেনরি মর্গান এ-সমাজ সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান পাবার জন্যেই জীবনের বেশির ভাগ সময়টাই এ-হেন সমাজের মধ্যে কাটিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, এ-কয়জাও তিনি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করলেন যে পৃথিবীর যে-কোনো দেশের মানুষ আজ সভ্যতার যতো উচ্চ-স্তরেই পৌঁছোক না কেন, কোনো এক অস্পষ্ট অতীতে তারাও এই সমাজেই বাস করেছিলো।

এ-হেন প্রাচীন সমাজ সাম্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য কেন? কেননা, এ-অবস্থায় মানুষের উৎপাদন-শক্তি এতো অনুন্নত যে সকলে মিলে প্রাণপণ পরিশ্রম করে দলের সকলের জন্যে কোনোমতে নিছক প্রাণ-ধারণের উপাদানগুলি প্রকৃতির কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারে। হাতিয়ার যদি উন্নত হয় তাহলে একজন মানুষের পক্ষে প্রচুর পরিমান জিনিস উৎপাদিন করা সম্ভব। কিন্তু হাতিয়ার যখন স্থূল ও প্রাকৃত তখন একজন মানুষ প্রাণপাত পরিশ্রম করে যেটুকু জিনিস উৎপাদন করতে পারে তাই দিয়ে কোনোমতে শুধু নিজেকে বাঁচানো সম্ভব। এ-অবস্থায় মানুষের শ্রম উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করতে শেখে নি, তাই এ-সমাজ উদ্বৃত্তজীবী বলে কোনো শ্রেণীর আবির্ভাবও সম্ভব নয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সমানে-সমান সম্পর্ক। শুধু তাই নয়। এ-অবস্থায় কারুর পক্ষে একা একা বাঁচবার চেষ্টাও অসম্ভব : প্রকৃতিরাজ্যে বিঘ্ন বিপর্যয়ের অন্ত নেই, স্থূল হাতিয়ার হাতে দুর্বল মানুষদের একমাত্র ভরসা হলো সংখ্যা। মানুষের চেতনারও তাই ঝোঁকটা একের উপরে নয়, ব্যক্তির উপরে নয়, ব্যষ্টির উপরে নয়। তার বদলে, পুরো দলের উপর, সকলের উপর, সমষ্টির উপর। সমষ্টির চেষ্টাতেই মানুষের পক্ষে এ-অবস্থায় বাঁচা সম্ভবপর। তাই শ্রমে অংশ গ্রহণ করবার দিক থেকে সকলের সঙ্গে সকলের সমান, শ্রমের ফল ভোগ করবার দিক থেকেও সকলের সঙ্গে সকলে সমান।

কিন্তু মানুষের উৎপাদন-কৌশল চিরকার একই অবস্থায় টেকে থাকে নি। প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করতে করতেই মানুষের হাতিয়ার শানিত হয়েছে, উন্নত হয়েছে। এবং এইভাবে উন্নত হতে হতে একটা অবস্থায় পৌঁছে দেখা গেলো মানুষকে কোনোমতে টায়েটুয়ে বাঁচিয়ে রাখবার পক্ষে যতটুকু দরকার তার চেয়েও বেশি জিনিস মানুষ উৎপাদন করতে পারছে। এই অবস্থাতেই প্রথম দেখা দিলো শ্রম-বিভাগ : কিছু মানুষ শুধুমাত্র কারিগরি কাজ নিয়ে থাকবে, অন্ন-উৎপাদনের প্রত্যক্ষ দায়িত্বটা আর তাদের নিজেদের উপর থাকবে না, কেননা বাকি মানুষের উৎপন্ন অন্নের উদ্বৃত অংশটুকু থেকে তাদের খাবার যোগান দেওয়া হবে। এই শ্রমবিভাগের দরুনই মানুষের উৎপাদন-কৌশল দ্রুত উন্নত হতে লাগলো, কেননা, অন্ন উৎপাদনের প্রত্যক্ষ দায়িত্ব থেকে যারা মুক্তি পেলো তারা উন্নততর উৎপাদন-যন্ত্র উৎপাদনে আত্মনিয়োগ করতে পারলো।

তারপর এইভাবে এগোতে এগোতে মানুষ এসে পৌঁছলো একেবারে নতুন ধরনের এক অবস্থায়। শ্রমবিভাগের এমন এক নতুন পর্যায় দেখা দিলো যার সঙ্গে আগেরকার শ্রমবিভাগের গুণগত ও মৌলিক প্রভেদ। নতুন পরিস্থিতিটা কী রকম? একদিকে উৎপাদন-কর্মের সংগঠন আর একদিকে যারা বাস্তবিকই উৎপাদিন করবে তারা। যারা সংগঠক তারা নিজেরা উৎপাদনকাজে অংশগ্রহণ করবে না, নিজেরা পরিশ্রম করবে না, গতর খাটাবে না। তার বদলে তারা মাথা খাটাবে—সংগঠনের জন্যে শুধু মাথা খাটানোরই প্রয়োজন।

এই সংগঠকশ্রেণী থেকেই ক্রমশ দেখা দিলো পুরোহিত-শ্রেণী(৬২)। শুরুতেই তারা নিশ্চয়ই উৎপাদনের উপায়গুলির মালিক হয়ে বসে নি : তার বদলে তাদের দায়িত্ব ছিলো উৎপাদন কাজের তদারক করা এবং উৎপাদনের ওই উপায়গুলির রক্ষণাবেক্ষন করা—মাথা খাটিয়ে, ভেবেচিন্তে, পুতো সমাজের উৎপাদন কাজটির পরিচালনা করা। এ-দায়িত্ব তাদের স্বভাবতই অনেকখানি কর্তৃত্বের অধিকারী করেছিলো। কর্তৃত্বশক্তি না থাকলে পুরো সমাজটার কাজকর্ম পরিচালনা করা সম্ভবপর নয়।

এই কর্তৃত্বশক্তির প্রভাবেই কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত আর উৎপাদিন কাজের পরিচালক রইলো না, উৎপাদিনের উপায়গুলির শুধুমাত্র রক্ষক রইলো না। তারা ক্রমশই এগুলির মালিক হয়ে দাঁড়ালো। আর এইভাবেই আদিম প্রাক-বিভক্ত সাম্যসমাজ ভেঙে গিয়ে দেখা দিলো নতুন ধরনের সমাজ, শ্রেণীবিভক্ত সমাজ। একদিকে মালিক-শ্রেণী,—তারা মাথা ঘামাবে, কিন্তু গতর খাটাবে না। অপর দিকে শ্রমিক-শ্রেণী,—তারা শুধুই গতর খাটাবে, কিন্তু মাথা ঘামাবার সুযোগ-সুবিধে তাদের জন্যে নয়(৬৩)।

অর্থাৎ কিনা, সমাজে শ্রেণীবিভাগ দেখা দেবার দরুন শুধুই যে মালিকে-শ্রমিকে তফাত দেখা দিলো তাই নয়, তারই অনিবার্য অঙ্গ হিসাবে দেখা দিলো শ্রমের সঙ্গে চিন্তার বিচ্ছেদ, গতর খাটানোর সঙ্গে মাথা খাটানোর বিচ্ছেদ, কায়িক শ্রমের সঙ্গে মানসিক শ্রমের বিচ্ছেদ।

আর এই তথ্যটুকু মনে না রাখলে অধ্যাত্মবাদী ও ভাববাদী ধ্যানধারণার জন্মকাহিনী সত্যই বুঝতে পারা যাবে না। এঙ্গেলস্‌(৬৪) বলছেন :

With each generation, labour itself different, more perfect, more diversified. Agriculture was added to hunting and cattle-breeding, then spinning, weaving, metal-working, pottery, and navigation. Along with trade and industry, there appeared finally art and science. From tribes there developed nations and states. Law and politics arose, and with them the fantastic reflection of human things in the human mind: religion. In the face of all these creations, which appeared in the first place to be products of the mind, and which seemed to dominate human society, the more modest productions of the working hand retreated into the background, the more so since the mind that plans the labour process already at a very early stage of development of society (e.g. already in the simply family), was able to have the labour that had been planned carried out by other hands than its own. All merit for the swift advance of civilisation was ascribed to the mind, to the development and activity of the brain. Men became accustomed to explain their actions from their thoughts, instead of from their needs – (which in any case are reflected and come to consciousness in the mind) – and so there arose in the course of time that idealistic outlook on the world which, especially since the decline of the ancient world, has dominated men’s minds.

অর্থাৎ, বংশপরস্পরায় শ্রমের রূপান্তর হতে লাগলো; শ্রম আরো নিখুঁত আরো বিচিত্র হয়ে উঠতে লাগলো। শিকার ও পশুপাওনের সঙ্গে সংযুক্ত হল কৃষি; তারপর সুতোকাটা, কাপড় বোনা, ধাতুর কাজ। মৃৎশিল্প, নৌচালনা। বাণিজ্য ও শিল্পের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত আবির্ভাব  হলো চারুকলা ও বিজ্ঞানের। গোষ্ঠী বদলে দেখা দিলো জাতি ও রাষ্ট্র। আইন এবং রাজনীতির আবির্ভাব হলো, আর সেই সঙ্গে মানব-মনে মানব-ব্যাপারেরই কাল্পনিক প্রতিবিম্ব : ধর্ম। এইসব সৃষ্টির পাশে,—যেগুলি কিনা মুখ্যত মনের সৃষ্টি বলেই প্রতীয়মান হয়েছিলো এবং মানবসমাজ নিয়ন্ত্রণে যেগুলির প্রভাবই সবচেয়ে বেশি মনে হয়েছিলো,—মানবহাতের অপেক্ষাকৃত সাদাসিধে কীর্তিগুলি পিছিয়ে পড়তে লাগলো, এবং ততোই বেশি পিছিয়ে পড়তে লাগলো যতোই কিনা যে-মন শ্রমের পরিকল্পনা করেছে সেই মনই নিজের হাত ছাড়াও অপরের হাতের সাহায্যে এই পরিকল্পিত শ্রমকে সফল করিয়ে নিতে শিখেছে—সমাজবিকাশের খুব পুরোনো পর্যায় থেকেই এ-ব্যবস্থার সূত্রপাত হয়েছে। সভ্যতার দ্রুত অগ্রগতির সমস্ত কৃতিত্ব গিয়ে পড়তে লাগলো মনের উপর, মগজের বিকাশ ও ক্রিয়ার উপর। প্রয়োজনের দিক থেকে চিন্তার ব্যাখ্যা করবার বদলে মানুষ ধ্যানধারণা দিয়েই চিন্তার ব্যাখ্যা করতে শিখলো (শেষ পর্যন্ত যদিও প্রয়োজনই ধ্যানধারণা হিসেবে মনের উপর প্রতিবিম্বিত হয়েছে ও চেতনায় ধরা দিয়েছে);—এইভাবেই কালক্রমে প্রকৃতি সম্বন্ধে ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম হলো, এবং বিশেষ করে প্রাচীন যুগ শেষ হবার পর থেকে দৃষ্টিভঙ্গিই মানবমনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

ভাববাদ ও অধ্যাত্মবাদের জন্মকাহিনী আর কোথাও এর চেয়ে স্পষ্ট ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে কিনা খুবই সন্দেহের কথা। এবং, ভবিষ্যতে “বরুণ” নামের পরিচ্ছেদে আমরা দেখতে পাবো ভারতীয় দর্শনের দলিলপত্র কতো অভ্রান্তভাবে এই কথাগুলিই প্রমাণিত করে : আমাদের দেশে সমাজের সদরমহল থেকে কায়িক শ্রমের মর্যাদা যতোই মুছে গিয়েছে ততোই মানুষের চেতনায় জন্ম হয়েছে ভাববাদী ও অধ্যাত্মবাদী ধ্যানধারণার।

তাই এ-কথা মনে করলে ভুল করা হবে যে সমাজে শ্রেণীবিভাগ দেখা দেবার আগে পর্যন্ত মানুষের মাথায় অধ্যাত্মবাদী বা ভাববাদী ধ্যানধারণার আবির্ভাব হবে কোনো অবকাশ ছিলো। শ্রম বা কর্ম বস্তুতন্ত্র। শঙ্করাচার্যের(৬৫) সমস্ত শক্তির যুক্তি সত্ত্বেও তাই। এ-কথা পরে প্রতিপন্ন করবার অবকাশ পাবো। আপাতত, যে-প্রশ্ন সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক সেটা হলো আদিম সাম্যসমাজের—প্রাক-বিভক্ত সমাজের—মানুষদের ধ্যানধারণার কথা।

যে-সমাজে উৎপাদন-কর্মের সঙ্গে,—শ্রমের সঙ্গে,—সমস্ত মানুষেরই প্রত্যক্ষ যোগাযোগ সে-সমাজের চিন্তাচেতনাটা,—যতোই মুক ও অস্ফুট হোক না কেন,—প্রাক-অধ্যাত্মবাদী, অতএব  লোকায়তিকই হওয়া স্বাভাবিক নয় কি? ভারতীয় দর্শনের দলিলপত্র তো তাই-ই প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু এখানে সমস্ত দলিল পেশ করবার অবকাশ নেই। তার বদলে সমস্যাটাকে আর একদিক থেকে দেখবার চেষ্টা করা যাক।

মানুষের উৎপাদন পদ্ধতিই তাকে আদিম প্রাক-বিভক্ত সমাজ থেকে শ্রেণীসমাজের আওতায় নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু উৎপাদন পদ্ধতির উন্নতি সেইখানেই শেষ হয় নি। এই উন্নতিই মানুষকে শ্রেণীসমাজের কাঠামোর মধ্যেই একের পর এক পর্যায় পার করে গিয়ে নিয়ে চলছে : দাস-সমাজ, সাম্নত-সমাজ, ধনতান্ত্রিক-সমাজ। ধনতান্ত্রিক-সমাজের পূর্ণ বিকাশই শ্রেণীবিভাগের শেষ সীমানা। কেননা, এই অবস্থায় পৌঁছে মানুষ দেখছে তার উৎপাদন শক্তি এমন অবিশাস্য হয়ে উঠেছে যে শ্রেণীসমাজের কাঠামোত মধ্যে একে আর কিছুতেই ধরে রাখা সম্ভব নয়। মানুষের উৎপাদন শক্তি যেন বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে মানুষে-মানুষে বর্তমান সম্পর্কের বিরুদ্ধে, শ্রেণী-সম্পর্কের বিরুদ্ধে(৬৬)। আজকের দিনে ধনতান্ত্রিক সমাজে যে সংকট প্রকট হয়েছে তার সমাধান আগামীকালের শ্রেণীহীন সমাজ। এই শ্রেণীহীন সমাজের কথা আজ আর স্বপ্নকথা নয়, পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ মানুষ আজ সচেতনভাবে সেইদিকে এগিয়ে চলেছে।

এই হলো মানব সমাজের তিনটি মূল স্তর : অতীতের প্রাক-বিভক্ত সমাজ, বর্তমানের শ্রেণীবিভক্ত সমাজ, আগামীকালের শ্রেণীহীন সমাজ।

অতীতের সেই প্রাক-বিভক্ত সমাজের সঙ্গে আগামীকালের শ্রেণীহীন সমাজের সম্পর্কটা কী রকম? আজকের মানুষ কি শ্রেণীসমাজের জ্বালায় যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে অতীতের প্রাক-বিভক্ত সমাজে ফিরে যেতে চাইবে নাকি?

—দাও ফিরে সে-অরণ্য, লও এ-নগর?

নিশ্চয়ই নয়।

আদিম সাম্যসমাজের আসল ভিত্তি ছিলো দারিদ্র্যের। সবাই সমান, কেননা, সবাই সমান গরিব। আর সবাই সমান গরিব, কেননা, উৎপাদনের পদ্ধতি তখন এমনই করুণ যে সবাই মিলে প্রাণপাত পরিশ্রম করে কোনোমতে সবাইকে টায়ে-টুয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

আগামীকালের সাম্যসমাজের ভিত্তিতে প্রাচুর্য। কেননা, গত কয়েক হাজার বছরের অক্লান্ত চেষ্টায় মানুষ তার উৎপাদন শক্তিকে এমন অবিশ্বাস্য ভাবে বাড়িয়ে ফেলেছে যে তারই সাহায্যে আজ অভাবনীয় ধনসম্পদ সৃষ্টি করা সম্ভব। তা সত্ত্বেও আজকের দিনে মানুষের দুঃখদৈন্য ঘুচছে না। তার কারণ ওই ধনসম্পদ আজ মানুষের অভাবমোচনে নিযুক্ত নয়। লাভ বিক্রি করবার জন্যেওই এগুলি তৈরি করা হয়। তার বদলে, মানুষের অভাব মোচনের উদ্দেশ্য নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা অনুসারে এই অবিশ্বাস্য উৎপাদন শক্তিকে কাজে লাগালে আজ যার-যা-দরকার তাই পাওয়া সম্ভব হবে। অভাব বলে কথাটিকে মানুষ ভুলে যাবে।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে, পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা তোলবার সময় আমরা দেখবো, ঠিক এই প্রসঙ্গেই কার্ল মার্কস্‌ বলছেন, finding what is newest in what is oldest,—যা কিনা সবচেয়ে পুরোনো তারই মধ্যে যা সবচেয়ে নতুন তাকে দেখতে পাওয়া। সবচেয়ে নতুন মানে?—ব্যক্তিগত সম্পত্তির অভাব। শ্রেণীশোষণের অভাব। সবচেয়ে পুরানোর মধ্যেও—আদিম সাম্যসমাজেও—তাই-ই চোখে পড়ে।

কার্ল মার্কস্‌-ই প্রথম প্রমাণ করলেন, মানুষের ধ্যানধারণার চরম উৎদ হলো তার সমাজ-ব্যবস্থায়। তার তাই, সমাজ-বিকাশ সম্বন্ধে যে-কথা ধ্যানধারণার ইতিহাস সম্বন্ধেও তাই হওয়াই শুধু স্বাভাবিক নয়, অনিবার্যও।

তার মানে?

আগামীকালের সাম্যসমাজ অতীতের সাম্যসমাজটার দিকে ফিরে যাবার চেষ্টা নয়। কিন্তু তবুও অতীত যুগের সেই সমান-সহজ সম্পর্কটাকে ফিরে পাবার চেষ্টা নিশ্চয়ই : অভাবের ভিত্তিতে নয়, প্রাচুর্যের ভিত্তিতে; নিচুস্তরে নেমে গিয়ে নয়, অতীত যুগের সমান সম্পর্কটাকে উচ্চস্তরে তুলে এনে। মর্গান(৬৭) বলছেন :

It will be a revival, in a higher form, of the liberty, equality and fraternity of the ancient gentes.
অর্থাৎ, সেই প্রাচীন সমাজের গোষ্ঠীগুলিতে যে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা ছিলো আগামী কালের সমাজে, উচ্চতর পর্যায়ে, তার পুনরাবির্ভাব হবে।

দার্শনিক ধ্যানধারণার আলোচনায় ফিরে আসা যাক।

মানুষের কথা বাদ দিয়ে মানুষের ধ্যানধারণাকে বোঝবার অবকাশ যদি সত্যিই থাকতো তাহলে দর্শনের ইতিহাস প্রসঙ্গে সমাজ ইতিহাসের এই বহিঃরেখার অবতারণা অপ্রাসঙ্গিক হতো। কিন্তু অবান্তর নয়। ধ্যানধারণার কথা জানতে গেলে যাদের মাথায় ধ্যানধারণার আবির্ভাব হয়েছে তাদের কথাও জানা দরকার।

শ্রেণীবিভক্ত সমাজের গণ্ডি ছেড়ে আজকের মানুষ শ্রেণীহীন সমাজের দিকে এগিয়ে যাবার সময় সচেতনভাবে অধ্যাত্মবাদী ও ভাববাদী ধ্যানধারণাকে পরিত্যাগ করে বস্তুবাদী দর্শনে প্রতিষ্ঠা খুঁজছে। ওই শ্রেণীহীন সমাজের ভিত্তিতে কায়িক শ্রম ও মানসিক শ্রম,—কর্ম আর জ্ঞান,—দু’-এর ভিতরকার হারানো সম্পর্ক আবার ফিরে আসবে, আর সেই সঙ্গেই দূর হবে ভাববাদের বাস্তব ভিত্তি। মানুষ আর অধ্যাত্মবাদের আলেয়ায় ভুলে প্রবঞ্চনার জলাভূমিতে গিয়ে ডুবে মরবে না, ভাববাদের কথায় মোহগ্রস্ত হয়ে অবাস্তবের পায়ে মাথা কুটতে কুটতে বাস্তব সুখদুঃখগুলোকে ভুলে থাকবে না। তার বদলে, বাস্তব দুনিয়াকে একমাত্র সত্য বলে জেনে দিনের পর দিন একে এমন ভাবে বদল করে চলবে যাতে মানুষের সামনে খুলে যায় প্রকৃত কল্যাণের অসীম দিগন্ত।

আর এই দিক থেকে ভারতীয় দর্শনের দলিলপত্রগুলিকে সত্যিই পরমাশ্চর্য মনে হয়। কেননা, সেগুলি থেকে আমরা স্পষ্টই দেখতে পাই, সমাজ ইতিহাসের আবর্তনের সঙ্গে দার্শনিক চেতনার আবর্তনটি কতো ঘনিষ্ঠ ভাবে সংযুক্ত : কেননা, প্রাক-বিভক্ত সমাজের ধ্যানধারণা যে প্রাক-অধ্যাত্মবাদীই এ-কথা ভারতীয় দার্শনিক পুঁথিপত্রের মধ্যে স্পষ্টভাবে পরিস্ফুট দেখতে পাওয়া যায়।

আগামীকালের নিঃশ্রেণীক সমাজের মধ্যে অতীতের সাম্যসম্পর্ককে অনেক উন্নত পর্যায়ে তুলে আনবার পরিচয়; আগামীকালের বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদও সেই রকমই প্রাক্‌-বিভক্ত সমাজের লোকায়তিক চেতনাকেই উচ্চতর পর্যায়ে ফিরিয়ে আনবে,—অবশ্যই মূক ও অচেতন দেহতত্ত্ব হিসেবে নয়, সচেতন ও সমৃদ্ধ বস্তুবাদী দর্শন হিসাবে!

জানি, সমাজ-ইতিহাসের সঙ্গে দর্শনের ইতিহাসকে ইতিভাবে মিলিয়ে বোঝবার চেষ্টার বিরুদ্ধে নানা রকম আপত্তি উঠবে। বিশেষত এই কারণে উঠবে যে শ্রেণীসমাজের কাঠামোর মধ্যেই বস্তুবাদী চিন্তাধারার বিকাশ ঐতিহাসিক ভাবে ঘটেছে। ভবিষ্যতে এই আপত্তি নিয়ে আলোচনা তোলবার অবকাশ পাবো। আপাতত, লোকায়ত-দর্শনের আলোচনায় এগিয়ে যে-অভিজ্ঞতাটিকে খুবই বিস্ময়কর মনে হয়েছে সেটুকুই বর্ণনা করা যাক।

ভাববাদী চিন্তার জন্মবৃত্তান্ত প্রসঙ্গে ইতিপূর্বে এঙ্গেল্‌স্‌-এর যে-উক্তিটি উদ্ধৃত করেছি তার থেকেই একটা সমস্যার সূত্রপাত হয় : সমাজের সদরমহল থেকে শ্রমনিরত মানুষগুলির মর্যাদা ক্ষোয়া যাবার দরুনই যদি ভাববাদী ও অধ্যাত্মবাদী ধ্যানধারণার জন্ম হয় তাহলে প্রাগ-বিভক্ত সমাজের,—যৌথ শ্রমের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সমাজের—মানুষদের মাথায় নিশ্চয়ই ভাববাদী বা অধ্যাত্মবাদী ধ্যানধারণা বিকশিত হবার কোনো অবকাশই ছিলো না। আর তা যদি না থাকে তাহলে সে-পর্যায়ের ধ্যানধারণাগুলি বস্তুবাদী হওয়াই সম্ভবপর,—এ-বস্তুবাদ যতো মূক ও অব্যক্তই হোক না কেন। কেননা, সাম্প্রতিক দার্শনিকদের হাজার রকম বাঙময় বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও মানতেই হবে, ভাববাদ বা অধ্যাত্মবাদের একমাত্র পাল্টা-চেতনা হলো বস্তুবাদ।

লোকায়তিক চেতনার উৎস সন্ধানে এগিয়ে দেখা গেলো, সত্যিই তাই। নানান দিক থেকে এ-বস্তুবাদের দারিদ্র অসহ্য ও এমন কি অভাবনীয়। তবুও এ-চেতনা প্রাক-অধ্যাত্মবাদী, কেননা, এর উৎসে প্রাগ-বিভক্ত যৌথ শ্রমের সমাজ!

————————
৬০. B. H. Kirman TMM 29.
৬১. I. P. Pavlov LCR Chapters 11, 20, 21 ইত্যাদি।
৬২. G. Thomson R 7.
৬৩. K. Marx and F. Engels GI 20 : “Division of labour only becomes truly such from the moment when a division of material and mental labour appears. (The first form of ideologists, priests, is concurrent.) From this moment onwards consciousness can really flatter itself that it is something other than consciousness of existing practice, that it really represents something without representing something real; from now on consciousness is in a position to emancipate itself from the world and to proceed to the formation of “pure” theory, theology, philosophy, ethics, etc. But even if this theory, theology, philosophy, ethics, etc.”
৬৪. F. Engels DN 288-9.
৬৫. শঙ্করমতে জ্ঞান বস্তুতন্ত্র, কর্ম পরুষতন্ত্র। ব্রহ্মসূত্রভাষ্য ১.১.৮।
কালীবর বেদান্তবাগীশের তর্জমা ১:১০৫-৮ দ্রষ্টব্য।
৬৬. F. Engels SUS (Karl Marx, Selected Works 1:179)
৬৭. H. L. Morgan AS 562.

১৯. প্রয়োজন

এই পরিচ্ছেদ শেষ করবার আগে আর মাত্র দু’-একটা কথা তোলা দরকার।

আমাদের দেশে বহুদিন ধরেই প্রথা চলে আসছে, দার্শনিক আলোচনার শুরুতে চারটি কথা খুব খোলাখুলিভাবে বলে নেওয়া : অধিকার, বিষয়, সম্বন্ধ, প্রয়োজন। বিষয় ও সম্বন্ধের কথা কিছুটা বলা হয়েছে। প্রয়োজন ও অধিকারের কথাও তোলা দরকার।

লোকায়ত দর্শন নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনটা কী? প্রয়োজনের প্রসঙ্গ নিশ্চয়ই স্থান-কাল নিরপেক্ষ হতে পারে না। তাই, প্রশ্নটা হবে, আজকের দিনে আমাদের দেশে লোকায়ত দর্শনের চর্চার কী প্রয়োজন?

দেশের বাস্তব পরিস্থিতির কথা থেকেই শুরু করা দরকার।

সাধারণ মানুষ,—কাজ করে, আমাদের দেশে সে-শ্রেণীর মানুষের ধ্যানধারণারই নাম লোকায়তিক,—তারা নানা রকম সমস্যার ঘূর্ণিতে পড়ে শেষ পর্যন্ত সমাজতান্ত্রিক সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে চেয়েছে। ফলে, অধ্যাত্মবাদী ও ভাববাদী ধ্যানধারণা বর্জন করে তারা চাইছে বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের কাছ থেকেই পথনির্দেশ পেতে। কিন্তু সেই সঙ্গেই শোনা যায় আর একদল বলছেন, এ সবই শুধু বিদেশ থেকে আমদানি করা মতবাদ। আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সাম্যবাদেরও সম্পর্ক নেই, বস্তুবাদেরও নয়।

সাধারণ মানুষের পক্ষে তাই আজ ভেবে দেখা প্রয়োজন, এই আপত্তিগুলি সত্যি কিনা। প্রয়োজনটা শুধুমাত্র জ্ঞানের খাতিরে নয়। জীবনের তাগিদেও।

সাম্যসমাজের সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন অতীত কোনো দেশের বা কোনো জাতিরই হতে পারে না। তার কারণ, আগেই বলা হয়েছে, পশুর রাজ্য পিছনে ফেলে এগিয়ে আসবার পথটা পৃথিবীর সব-দেশের সব-মানুষের পক্ষেই এক। আজকের দিনের যে-কোনো জাতি সভ্যতার যতো উঁচু শিখরেই পৌঁছুক না কেন, এককালে তাকে আদিম সাম্য-সমাজেই বাস করতে হয়েছে। এদিক থেকে অন্যান্য দেশের সংগে আমাদের দেশের তফাত প্রধানত দুটো। প্রথমত, আমাদের দেশের আনাচে-কানাচে আজো নানান রকম মানুষ সেই পিছিয়ে-পড়া অবস্থায় টিকে আছে, এ-ঘটনা পৃথিবীর সমস্ত দেশে দেখা যায় না। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশের উন্নত ও সংস্কৃত মানুষদের রচনাতেও এমন অনেক চিহ্ন থেকে গিয়েছে যেগুলিকে এই আদিম সাম্যসমাজের স্মারক ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।

কিন্তু বস্তুবাদ? বস্তুবাদের কথা তো আগেই তুলেছি। এমন কথা একবার নয়, বহুবার বহুভাবে বলা হয়েছে যে আমাদের দেশের ঐতিহ্যটা বিশুদ্ধ অধ্যাত্মবাদ—এ-দেশে অধ্যাত্মবাদী চিন্তা যেন তৈলধারার মতোই অবিচ্ছিন্ন।

কিন্তু এ-কথা কি ঠিক? উত্তরটা নিশ্চয়ই নির্ভর করবে, দেশের ঐতিহ্য বলতে ঠিক কী বোঝায়, এই প্রশ্নের উপর। কার চিন্তাধারা,—কোন শ্রেণীর মানুষের? যদি শোষক-শ্রেণীর চেতনাকেই দেশের একমাত্র দার্শনিক ঐতিহ্য বলে মনে করেন তাহলে মানতেই হবে দেশের ঐতিহ্যে বস্তুবাদী চেতনার কোনো স্থান ছিলো না। কিন্তু সাধারণ মানুষ কোন ধরনের ধ্যানধারণায় বিশ্বাস করেছে?—এ-প্রশ্ন যদি দেশের দার্শনিক ঐতিহ্য নির্ণয় করবার সময় প্রাসঙ্গিক হয় তাহলে মানতেই হবে বস্তুবাদী চেতনা আমাদের দেশের দার্শনিক ঐত্যহ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিলো। কেননা, সাধারণ মানুষ ভাববাদে বিশ্বাস করে নি, বিশ্বাস করেছে দেহাত্ববাদেই, বস্তুবাদেই। প্রমাণ, প্রচীনদের অজস্র উক্তি। তাঁরা বলেছেন,—বারবার বলেছেন,—লোকায়ত মানে হলো সাধারণ মানুষের দর্শন, আর এই দর্শন অনুসারে মূর্ত জড় জগৎটাই একমাত্র সত্য : আত্মা নেই, ঈশ্বর নেই, পরলোক নেই, পুরুষার্থ বলতে শুধু অর্থ ও কাম।

তাই দেশের সাধারণ মানুষ যদি তাদের দার্শনিক ঐতিহ্যটি চিনতে চায় তাহলে লোকায়ত দর্শনের আলোচনা বাদ দিয়ে চলবে কী করে?

কিন্তু লোকায়ত দর্শন নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন শুধুমাত্র এই নয় যে দেশের জনসাধারণ নিজেদের দার্শনিক ঐতিহ্যটিকে স্পষ্টভাবে জানতে ও চিনতে পারবে। প্রয়োজন আরো আছে। আরো একটি বড় প্রয়োজন হলো আজকের দিনে ওই লোকায়তিক চিন্তাধারার সংকীর্ণতাকে স্পষ্টভাবে জানতে হবে, এবং তাকে বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের পর্যায়ে তুলে আনবার চেষ্টা করতে হবে।

যেমন ধরুন, আদিম সাম্যবাদের নজিরের উপর আধুনিক সাম্যবাদী অতোখানি জোর দেন কেন? তা কি এই কারণে যে আজকের দিনে সেই সাম্যসমাজে ফিরে যাবার কোনো তাগিদ আছে? নিশ্চয়ই নয়। তার বদলে আসলে প্রয়োজন হলো, বিরুদ্ধ-প্রচারকে খণ্ডন করে এইটুকুই দেখানো যে ব্যক্তিগত-সম্পত্তি, রাষ্ট্রব্যবস্থা ইত্যাদি সনাতন নয়। মানুষের ইতিহাসে একটা সময় ছিলো যখন এগুলির জন্মই হয়নি। মানুষের ইতিহাসে এমন একটা সময় আসছে যখন এগুলির কোনো প্রয়োজন থাকবে না।

আমেরিকার নৃতত্ত্ববিদ লুইস হেনরী মর্গানকে কেউই অবশ্য সাম্যবাদের প্রচারক বলবেন না। তার বদলে তাঁকে বৈজ্ঞানিক নৃতত্ত্বের প্রবর্তকই বলতে হবে। কিন্তু ভূয়োদর্শনের প্রভাবে তিনি স্পষ্টভাবেই না এই সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন(৬৮) :

A mere property career is not the final destiny of mankind, if progress is to be the law of the future as it has been of the past. The time which has passed away since civilization began is but a fragment of the past duration of man’s existence; and but a fragment of the ages yet to come. The dissolution of society bids fair to become the termination of a career of which property is the end and aim; because such a career contains the elements of self-destruction.

অর্থাৎ, অতীতের মতোই ভবিষ্যতেও যদি প্রগতির নিয়মই সত্য হয় তাহলে মানতেই হবে যে ব্যক্তিগত সম্পত্তিই মানুষের চরম নিয়তি হতে পারে না। সভ্যতার শুরু থেকে যেটুকু সময় কেটেছে তা মানুষের পুরো অতীতটার তুলনায় যে-রকম চোখের পলক সেই রকমই চোখের পলক হলো পুরো ভবিষ্যৎটার তুলনায়। যে-সমাজের একমাত্র উদ্দেশ্য শুধু সম্পত্তিই তার শেষ ঘনিয়ে এসেছে; কেননা, সে-উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে আত্মনাশের বীজ।

ব্যক্তিগত সম্পত্তি সনাতন নয়—আদিম সমাজের দিকে চেয়ে দেখলে এই কথাটি আমরা স্পষ্ট ভাবে জানতে পারি। জানতে পারবার দরকার আছে। সেইদিকে পিছু হটবার জন্যে নিশ্চয়ই নয়, ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রভাবমুক্ত আগামীকালের সমাজ-ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে চলবার জন্যেই।

আমাদের দেশের লোকায়তিক চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হবার প্রয়োজনও প্রায় অনুরূপ। এই পরিচয়ের ভিত্তিতেই আমরা বুঝতে পারবো যে ভাববাদী ও অধ্যাত্মবাদী চিন্তার ঐতিহ্যই দেশের একমাত্র দার্শনিক ঐতিহ্য নয়। কিন্তু তাই বলে, ওই লোকায়তিক ধ্যানধারণার দিকে পিছু হটবার কোনো তাদিগই থাকতে পারে না। মনে রাখবে হবে, উৎপাদন-পদ্ধতির এক অতি অনুন্নত পর্যায়ে এই ধ্যানধারণার জন্ম হয়েছিলো। মনে রাখতে হবে, সে অবস্থায় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যেটুকু সম্যক পরিচয় তা অতি নগণ্য। তাই, বৈজ্ঞানিক তথ্যের দিক থেকে এই লোকায়ত-দর্শনের একেবারেই দীনহীন দশা, প্রকৃতি সম্বন্ধে যে সংবাদ লোকায়তিকেরা উদ্ধার করতে পারেন নি, সেটুকুকে কল্পনা দিয়ে পূরণ করে নেবার চেষ্টা ছাড়া তাঁদের পক্ষে আর কোনো উপায় ছিলো না। ওই রকম একটা কল্পনা থেকে বামাচারী বিশ্বাসের জন্ম। এবং, ওই অবস্থায় প্রকৃতি সম্বন্ধে জ্ঞানের দৈন্য যে কী ভয়াবহ তা ওই বামাচারী বিশ্বাস থেকেই প্রমাণ হয়।

আজকের দিনে বৈজ্ঞানিক তথ্যে সম্বৃদ্ধ যে-বস্তুবাদের দিকে মানুষ এগিয়ে যাবে তার তাৎপর্যের সঙ্গে নিশ্চয়ই অতীতের ওই লোকায়তিক চেতনার কোনো তুলনাই হয় নাই। তাই সেদিকে ফেরা নয়, বস্তুবাদী চেতনাকেই উন্নত পর্যায়ে নিয়ে আসা—এই প্রয়োজনটির কথা মনে রেখে লোকায়ত দর্শনের আলোচনা করতে হবে।

———————————-
৬৮. Ibid 561; cf. G. Thomson AA 426 “…such a study must be undertaken by scholars, who, like Morgan, believe that ‘a mere property career is not the final destiny of mankind’.”

২০. অধিকার

প্রয়োজন ছাড়াও অধিকারীর কথা।

লোকায়ত-দর্শনের আলোচনায় কি অধিকার-ভেদের কথা সত্যিই তোলা উচিত? প্রশ্নটাকে সোজাসুজি এইভাবে পাড়লে নিশ্চয়ই জবাব দেবার অসুবিধে হবে। কিন্তু এই প্রসঙ্গেই একটি কথা উত্থাপন করবার অবকাশ পাওয়া যায়। কথাটা জরুরী।

লোকায়ত-দর্শনের আলোচয়ায় আমরা যতোই অগ্রসর হবো ততোই স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর ভাবে দেখতে পাবো যে আলোচনার অনেক দলিলই সমাজ-বিকাশের এমন এক পর্যায়ের সঙ্গে জড়িত যে-পর্যায়ে পর্যায়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা রাষ্ট্রব্যবস্থার আবির্ভাব হয় নি। তাই ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা রাষ্ট্রব্যবস্থা অনাদি, সনাতন—এ-রকম কোনো ধারণা নিয়ে এগোলে দলিলগুলির তাৎপর্য চোখে পড়া কঠিন হবে। সাম্প্রতিক যুগে আমাদের দেশে এবং বিদেশেও দিকপাল ভারততত্ত্ববিদ তো বড়ো কম জন্মান নি। বরং, দলিলপত্র বলতে আমরা যেটুকু সংগ্রহ করেছি তার সবটুকুর সঙ্গেই তাঁদের পরিচিয় ছিলো। কিন্তু তবুও ব্যক্তিগত-সম্পত্তিকে তাঁরা সনাতন মনে করেছেন আর এই কুসংস্কাররের দরুনই তাঁদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ণ হয়েছে। ফলে দলিলগুলি চোখের সামনে থাকলেও সেগুলির প্রকৃত তাৎপর্য দেখতে পাওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। কার্ল মার্কস্‌(৬৯) এক জায়গায় এই সীমাবদ্ধতার উল্লেখ করেই বলেছেন,

Owing to certain judicial blindness even the best intelligences absolutely fail to see the things which lie in front of their noses.

একরকমের আইনগত অন্ধতার দরুনই এমন কি সবচেয়ে উঁচুদরের বুদ্ধিমানেরাও একেবারে নাকের গোড়ায় যা রয়েছে তা মোটেই দেখতে পান না।

মার্কস্‌-এর কথায় পরে ফিরতে হবে। আপাতত শুধু এইটুকুই বলা দরকার যে মানব সমাজে যা কিনা নিছক আধুনিক যুগের অবদান সেইটুকুকে সনাতন বলে ভুল করলে প্রাচীন ভারতীয় পুঁথিপত্রের অনেক তাৎপর্যই চোখে পড়বে না। ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে যিনি চিরন্তন মনে করেন তিনি লোকায়ত দর্শনের তাৎপর্য কোনোদিনই বুঝতে পারবে কিনা সন্দেহ।

—————–
৬৯. K. Marx and F. Engels C 209.

১ম খণ্ড : পটভূমি । ২য় পরিচ্ছেদ : পদ্ধতি প্রসঙ্গে

লোকায়ত দর্শন – প্রথম খণ্ড : পটভূমি । দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : পদ্ধতি প্রসঙ্গে- দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

লোকায়ত দর্শনের আলোচনায় যে-পদ্ধতি অনুসরণ করেছি তার জন্যে আমি একান্তভাবেই অধ্যাপক জর্জ টম্‌সনের কাছে ঋণী। তাঁর নাম আমাদের পণ্ডিতমহলে মোটেই সুপরিচিত নয়, তাই শুরুতেই আমি তাঁর সামান্য পরিচয় দেবার চেষ্টা করবো।

 ০১. অধ্যাপক জর্জ টম্‌সন

অবশ্যই, তিনি ভারততত্ত্ববিদ নন, বর্তমানে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রীক-এর অধ্যাপক। প্রাচীন গ্রীক বিষয়ে ব্যুৎপত্তির দিক থেকে আজকের ইয়োরোপে তাঁর সমকক্ষ পণ্ডিত সত্যিই মুষ্টিমেয়। এ-কথা যাঁরা অধ্যাপক টম্‌সনের সবচেয়ে বড়ো নিন্দুক তাঁরাও নিঃসংকোচে স্বীকার করেন। কিন্তু শুধু এইটুকু বললে তাঁর সম্বন্ধে কিছুই বলা হয় না।

কেননা, অধ্যাপক জীবনের প্রথমার্ধেই তিনি প্রাচীন গ্রীকতত্ত্বে অসামান্য ব্যুৎপত্তির পরিচয় দিয়েছিলেন। তখনই তিনি প্রাচীন গ্রীক পুঁথিপত্রের উপর য-সব টীকাভাষ্য রচনা করেছিলেন সেগুলি বিদগ্ধ সমাজে প্রামাণ্য বলে স্বীকৃত হয়েছিলো। অথচ, অমন প্রামাণ্য রচনার স্রষ্টা হয়েও উত্তর-জীবনে তিনি অনুভব করলেন, প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলিকে সত্যিই ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। ইয়োরোপে বহুদিন ধরে গ্রীক-বিষয়ে উচ্চাঙ্গের গবেষণা হওয়া সত্ত্বেও যে-যুগের পুঁথিপত্রগুলির প্রকৃত তাৎপর্য উদ্ধার করবার সবচেয়ে মৌলিক কাজটি তখনো বাকি থেকে গিয়েছে। এই চেতনা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে হতে শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনে এক গভীর সংকটের রূপ নেয়। দিনের পর দিন তিনি অম্বেষণ করে চলেন এমন কোনো পদ্ধতির যার সাহায্যে ওই সুদূর অতীতকে সম্যকভাবে চিনতে পারা সম্ভব হবে। শেষ পর্যন্ত সে-পদ্ধতি তিনি খুঁজে পেলেন। প্রাচীন গ্রীস তাঁর সামনে একেবারে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো।

এ-বিস্ময় বড়ো কম নয়। তাঁর ওই আবিষ্কারের কাহিনী তাঁর মুখেই শুনেছিলাম।

 

সে-রাতটার কথা আমি কোনোদিন ভুলবো না। চোখ বন্ধ করলে পুরো দৃশ্যটি আজো স্পষ্ট দেখতে পারি।

রাত এতো গভীর হয়েছে যে কর্মমুখর বার্মিংহাম শহর নিস্তব্ধ, নিঝুম। আগুনের সামনে পা-দুটো এগিয়ে দিয়ে অধ্যাপক টম্‌সন কথা বলে চলেছেন। কথা বলতে বলতে একজন মানুষ কী তন্ময়ই না হয়ে যেতে পারেন! অথচ কল্পনা নয়, কবিত্ব নয়—বিজ্ঞানের ধারালো বিশ্লেষণ। যেন দুই আর দুই মিলে চার হচ্ছে, তারই হিসেব। এতো স্বচ্ছ, এতো তীক্ষ্ণ তাঁর প্রত্যেকটি কথা যে শুনতে শুনতে মনে হয়ে মাথার ভিতর একটার পর একটা কপাট খুলে যাচ্ছে। যে-সব কথার মানে থাকতে পারে বলে আগে কোনোদিনই ভাবতে পারি নি,—ভাববার মতো চিন্তার সঙ্গতি ছিল না,—সে-সব কথার সহজ তাৎপর্যটা তিনি যেন একেবারে চোখের সামনে তুলে ধরেন। বলেন, এই দিক থেকে ভেবে দেখো, দেখবে এতোটুকুও অস্পষ্ট নয়।

কথায় কথায় নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুললেন। নিজেকে বাদ দিয়ে নিজের অভিজ্ঞতাটিকে মানুষ কতো স্পষ্ট ভাবেই না বর্ণনা করতে পারে!

প্রাচীন পুঁথিপত্রে যা লেখা আছে তার মানে হয়, প্রতিটি কথার মানে হয়। সে-তাৎপর্য উদ্ধার করা সম্ভব,—এবং উদ্ধার বলতে একালের ধ্যানধারণাকে সেকালের লেখার ওপর চাপিয়ে দিয়ে আত্মপ্রবঞ্চনা করা নয়। তার বদলে কোনো-না-কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে, যার সাহায্যে বুঝতে পারবো সেকালের মানুষে ঠিক কেন, ঠিক কী ভেবে, সেকালের ওই সব পুঁথিপত্র রচনা করেছিলো। এই চেতনাই ক্রমশ তাঁর ব্যক্তিগত সমস্যার পুরো ষোলো আনা হয়ে দাঁড়ালো।

সে যেন এক চরম সংকট। গ্রীক সাহিত্যের ঠিক যে-বিষয়টি সম্বন্ধেই তাঁর তখন অমন খ্যাতি সেই বিষয়টিরই প্রকৃত তাৎপর্য কিনা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! বিষয়টি হলো, এস্কাইলাসের নাটক। অধ্যাপক টমসন বলতে লাগলেন, একটা এস্পার-ওস্পার না-হলেই নয়। শেষ পর্যন্ত ঠিই করলাম, হয় এস্কাইলাস বুঝবো আর না হয় তো ছেড়ে দেবো। এমন সময় হাতে এলো একটি বই, ক্রিস্টোফার কড্‌ওয়েল-এর ‘ইলিউশ্‌ন্‌ এ্যাণ্ড রিয়ালিটি’(১)।  মনে হলো, অকূলে কূল পাওয়া যাচ্ছে। কড্‌ওয়েল-এর বই আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেলো ম্যাক্সবাদ-এর দিকে। পড়লাম এঙ্গেল্‌স্‌-এর ‘দি ওরিজিন অব্‌ ফ্যামিলি’—‘পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’(২)। এঙ্গেল্‌স্‌-এর বই আমাকে পৌঁছে দিলো মর্গান-এর ‘এন্সেণ্ট সোসাইটি’ বা ‘প্রাচীন সমাজ’(৩) পর্যন্ত। কূল পেলাম। এস্কাইলাস্‌ আর ছাড়তে হলো না।

এর পর গ্রীক বিষয়ে তিনি যে-দুটি বই লিখেছেন বিশ্বের জ্ঞান-ভাণ্ডারে তা অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। বই দুটির নাম : ‘এস্কাইলাস্‌ এ্যাণ্ড এথেন্স’ এবং ‘স্টাডিস্‌ ইন্‌ এন্সেণ্ট গ্রীক সোসাইটি’(৪)।

অবশ্যই, মর্গান নিজে গ্রীক সাহিত্যে সুপণ্ডিত ছিলেন। কিন্তু ‘প্রাচীন সমাজ’ বলে তাঁর ওই বই-এর প্রধান আলোচনাটা আমেরিকার আদিবাসীদের নিয়ে। আদিবাসী-সংক্রান্ত এই গবেষণা কেমন ভাবে আজকের দিনে একজন শ্রেষ্ঠ গ্রীকতত্ত্ববিদের হাতে গ্রীক সাহিত্য-জগতের তোরণদ্বার উদ্ঘাটন করবার চাবিকাঠি যুগিয়েছে সে-অভিজ্ঞতার কথা শুনতে শুনতে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হতে হয়। তাঁর দিকে চেয়ে দেখলে আপনার মনে হতোম সেকালের গ্রীক-সমাজ তিনি স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছেন, দেখতে পাচ্ছেন সে-সমাজের প্রতিটি ঘাত-প্রতিঘাত, টাল-বেটাল। আর তারই আবর্তে পড়ে তখনকার জনৈক নাট্যকার কেন এক নির্দিষ্ট মতাদর্শে মেতে উঠলেন,—অন্য কোনো রকম রচনা কেন তাঁর পক্ষে সম্ভবপর হলো না,—অধ্যাপক টম্‌সনের মুখে সে-কথা শুনলে আপনার মনে হতো, তিনি কথা বলছেন না—ছবি আঁকছেন! এমনই নির্মল, এমনই প্রত্যক্ষ তাঁর অনুভূতি!

আমার জীবনে এর চেয়ে বড়ো বিস্ময় সত্যিই ঘটেনি।

বিস্ময় শুধু এই কারণে নয় যে এ-যুগের একজন শ্রেষ্ঠ মনীষীর মুখে থেকে তাঁর এই অসামান্য অভিজ্ঞতার কথাটা শুনতে পেয়েছিলাম। আরো বড়ো বিস্ময় এই কারণে যে আমার নিজের কাছে প্রাচীন ভারতীয় দর্শন নিয়ে যেগুলি ছিলো সবচেয়ে কঠিন আর সবচেয়ে জটিল সমস্যা তাঁর ওই উপলব্ধি আমাকে সেগুলির সমাধান খোঁজবার পথ দেখিয়ে দিলো।

সেদিন রাতে মনে হয়েছিলো, কাঁচের একটু কুঁচো খুঁজতে এ-দেশে,—এতোদূরে,—এসেছিলাম। তার বদলে পেয়ে গেলাম একেবারে হীরের টুকরো। এ-হীরে জীবনভোর আমার সমস্ত প্রচেষ্টার মূলধন হতে পারবে।

 

মর্গান-এর মূলসূত্র অনুসরণ করে কী ভাবে প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলির প্রকৃত তাৎপর্য উদ্ধার করা সম্ভব তার নির্দেশ পাওয়া যায় অধ্যাপক জর্জ টম্‌সনের সাম্প্রতিক গ্রন্থাবলী থেকে। তাঁরই পদ্ধতি অনুসরণ করে লোকায়ত-দর্শনের কয়েকটি সমস্যা নিয়ে আমি এই আলোচনার খসড়া তৈরি করেছি। বলাই বাহুল্য, প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যে তাঁর অসমান্য পাণ্ডিত্যের তুলনায় প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য সম্বন্ধে আমার জ্ঞান নেহাতই নগণ্য। এদিক থেকে আমার সম্বল হলো পূর্বগামী ভারততত্ত্ববিদদের মৌলিক গবেষণা। মণৌ বজ্র-সমুৎকীর্ণে সূত্রস্যেবাস্তি মে গতিঃ। কালিদাসের কাছে এ-কথা অতিরঞ্জিত বিনয় হোক আর নাই হোক, আমার কাছে নিছক আত্মোপলব্ধি।

তবু সাহসী যে হয়েছি তার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। একটি সংকীর্ণ ক্ষেত্রে, এবং প্রাচীন পুঁথিপত্রের সঙ্গে অনেক সময় পরোক্ষ পরিচয়ের ভিত্তিতেই, আমি এই পদ্ধতি প্রয়োগ নিয়ে যে-পরীক্ষা করেছি তার পিছনে প্রধান উৎসাহ অবশ্যই পদ্ধতিটির সম্বাবনা সম্বন্ধে দক্ষতর বিদ্বানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। আমাদের বিদগ্ব-সমাজে এ-পদ্ধতি সুপরিচিত নয়। অথচ, এর সম্ভাবনা যেন সীমাহীন। যোগ্যতর বিদ্বান বিস্তৃততর ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ করে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির সবচেয়ে দুর্বোধ্য কোণগুলিকে উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত করতে পারবেন। শুধু তাই নয়। সামগ্রিক ভাবে মানবজাতির ইতিহাস রচনায় প্রাচীন ভারতীয় পুঁথিপত্রগুলির সাক্ষ্য অসামান্য গুরুত্বপূর্ণ। তার কারণ, মানবজাতির অগ্রগতি-পথের একটি বিশেষ স্তরের লিখিত দলিলপত্র ভারতবর্ষে এমন ভাবে টিকে আছে যা একমাত্র চীন ছাড়া আর কোনো দেশে খুঁজে পাওয়া যায় কিনা খুবই সন্দেহের কথা। তাই অন্যান্য দেশের ইতিহাসে যে-কথা আবছা আর অস্পষ্ট হয়ে এসেছে সেগুলিকে বোঝা যেতে পারে ভারতীয় ইতিহাসে আজো যা স্পষ্ট ভাবে বেঁচে রয়েছে তারই সাহায্যে।

বলাই বাহুল্য, লোকায়ত-দর্শনের এই আলোচনায় যদি কোনো ভুল-ভ্রান্তি ঘটে থাকে তাহলেই প্রমাণ হবে না পদ্ধতিটি ভ্রান্ত। কেননা, পদ্ধতি ফলপ্রসূতা ছাড়াও প্রয়োগ-পটুত্বের কথা রয়েছে। তবু, আত্মশক্তি সম্বন্ধে মনে কোনো মোহকে প্রশ্রয় না দিয়েও এটুকু ভেবেছি যে, ভুলের ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকলে আমরা কোনোদিনই সত্যে পৌঁছতে পারবো না। এ-বিষয়ে অধ্যাপক টম্‌সনেরই একটি উক্তি(৫) মনে পড়ে :
We cannot reach truth unless we risk error.
হঠকারিতার বরাভয় নয়, অম্বেষীর কাছে আশ্বাসবাণী।

অধ্যাপক টম্‌সনের পদ্ধতিটি ঠিক কী এই পরিচ্ছেদে তার পরিচয় দিতে চাই। তার আগে দেখা দরকার লোকায়ত-দর্শন প্রসঙ্গে সত্যিই এমন সমস্যা ওঠে যার সমাধান পাবার জন্যে একটি কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োজন আছে।

————————-
১. C. Caudwell IL.
২. F. Engels OFPPS.
৩. H. L. Morgan AS.
৪. G. Thomson AA এবং SAGS.
৫. G. Thomson SAGS 36.

০২. লোকায়ত-প্রসঙ্গে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

লোকায়তিকদের নিয়ে কী এমন সমস্যা উঠছে যে সমাধানের খোঁজে এইভাবে কালাপানি পার হতে হবে?

আমাদের যুগের একজন শ্রেষ্ঠ ভারততত্ত্ববিদের রচনা থেকেই আলোচনা শুরু করা যাক।

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ‘লোকায়ত’ নামে ইংরেজীতে একটি ছোট্ট প্রবন্ধ লিখেছিলেন। ১৯২৫-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রবন্ধটি স্বতন্ত্র পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধে তিনি প্রাচীন পুঁথিপত্র থেকে লোকায়তিকদের সম্বন্ধে এমন কয়েকটি উক্তি সংগ্রহ করেন যার সঙ্গে লোকায়ত-দর্শন সংক্রান্ত আমাদের সাধারণ ধারণার সঙ্গতি খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। এ-জাতীয় তথ্য তাই ভারতীয় দর্শনের ছাত্রের কাছে সমস্যা সৃষ্টি না করে পারে না। আপাতদৃষ্টিতে হয়তো সে-সমস্যাকে তুচ্ছ মনে হবে; কিন্তু ভেবে দেখলে দেখা যায়, তা নয়।

সমস্যা যে ওঠে এ-বিষয়ে তিনি নিজেও সচেতন। বস্তুত, সে-সমস্যার সমাধান দেবার চেষ্টা তিনি নিজেই করেছেন। তাছাড়া, তাঁর ওই ছোট্ট পুস্তিকাটির ভিত্তিতেই শ্রীযুক্ত দক্ষিণারঞ্জন শাস্ত্রী ‘ভারতীয় বস্তুবাদ, ইন্দ্রিয়ানুভূতিবাদ ও ভোগবাদ’(৭) নামের ইংরেজী বইতে লোকায়তিকদের সম্বন্ধে কিছু কিছু সিদ্ধান্তে পৌঁছবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একটুখানি এদিক-ওদিক তাকালেই,—অর্থাৎ কিনা, ভারতবর্ষের অন্যান্য কিছুকিছু প্রাচীন পুঁথিপত্রের সাক্ষ্য গ্রহণ করলেই,—বোঝা যায় এ-জাতীয় সিদ্ধান্ত জিজ্ঞাসু মনকে সত্যিই সন্তুষ্ট করতে পারে না। সমাধান হিসাবে স্বীকৃত হওয়ার বদলে এ-জাতীয় সিদ্ধান্ত কিছু কিছু নতুন সমস্যারই সৃষ্টি করে।

মহামহোপাধ্যায় লোকায়তিকদের সম্বন্ধে কী রকম তথ্য সংগ্রহ করেছেন? তার থেকে কোন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়? সে-সমস্যার সমাধান হিসাবে তিনি, বা তাঁকে অনুসরণ করে শ্রীযুক্ত দক্ষিণারঞ্জন শাস্ত্রী, যা বলেছেন তা কেন সন্তোষজনক মনে হয় না?

তথ্যগুলির বর্ণনা থেকেই শুরু করা যাক।

প্রথমত, বার্হস্পত্যসূত্রম্‌-এর(৮) সাক্ষ্য। স্বয়ং বৃহস্পতির নামের সংগে জড়িত এই পুঁথিটির সঙ্গে আধুনিক পণ্ডিতমহলের পরিচয় খুব বেশি দিনকার নয়। সম্প্রতি কালে ডক্টর এফ. ডব্লিউ. টমাস এটি সংগ্রহ করেন এবং তাঁরই লেখা দীর্ঘ ভূমিকা ও ইংরেজী তর্জমা সম্বলিত হয়ে ১৯২১-এ পাঞ্জাব থেকে এটি প্রথম ছাপানো হয়। ভূমিকায় ডক্টর টমাস আলোচনা করেছেন, পুঁথিটিকে যে-অবস্থায় আমরা পাচ্ছি তার কোনো কোনো অংশ যেমনই প্রাচীন আবার কোনো কোনো অংশ তেমনি অর্বাচীন। ডক্টর টমাসের মতে, প্রাচীনতম অংশগুলিতে লোকায়ত-দর্শনের আদি ও অকৃত্রিম রূপটি খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু মহামহোপাধ্যায় বলছেন, পুঁথিটির যে-অংশগুলিকে ডক্টর অর্বাচীন মনে করেন তার সাক্ষ্যও কম মূল্যবান নয়।

এখানে পুঁথিটির স্তর-বিচার করবার চেষ্টা করলে আলোচনা অনেকখানি বিক্ষিপ্ত হবার সম্ভাবনা। তাই, সে-আলোচনা মূলতবী রেখে দেখা যাক, পুঁথিটির ঠিক কোন সাক্ষ্যের দিকে মহামহোপাধ্যায় আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান।

এই পুঁথির দ্বিতীয় অধ্যায়ে পরের পর দুটি সূত্রে,—তাই মহামহোপাধ্যায়ের ভাষায়, যেন এক-নিশ্বাসে,—লোকায়তিক এবং কপালিকদের সম্বন্ধে দুটি কথা বলা হয়েছে :

সর্বথা লোকায়তিকমেব শাস্ত্রমর্থসাধনকালে।।২।।৫
কাপালিকমেব কাম সাধনে।।২।।৬
–অর্থাৎ, অর্থসাধনকালে সর্বত্র লোকায়তিকই হলো শাস্ত্র, কামসাধনে সর্বত্র কাপালিকই শাস্ত্র।

মহামহোমাধ্যায় বলছেন, এই ভাবে এক-নিশ্বাসে দুটি কথা বলা থেকেই বোঝা যায় কথা দুটি আলাদা নয়। অর্থাৎ, লোকায়তিক ও কাপালিক আলাদা নয়। তাঁর এই উক্তির পক্ষে অবশ্যই আরো একটি যুক্তি দেখানো যায়। তাঁর এই উক্তির পক্ষে অবশ্যই স্বীকার করেন যে কামসাধনার শাস্ত্র বলতে একমাত্র কাপালিকই, তাহলে তাঁর পক্ষে লোকায়তিকদের সঙ্গে কাপালিকদের কোনো বড়ো রকমের তফাত স্বীকার করা সম্ভব হবে না। কেননা, মাধবাচার্য প্রমূখ সমস্ত লেখকদের মতেই, লোকায়তিকেরা পুরুষার্থ বলতে স্বীকার করেন শুধু অর্থ এবং কাম(৯)। আর, যদি তাই হয় তাহলে কাপালিক বা কামসাধনশাস্ত্র লোকায়তের সঙ্গে অভিন্ন হবারই কথা।

কিন্তু লোকায়তের সঙ্গে কাপালিকদের অভিন্নতা প্রমাণ করবার জন্যে বৃহস্পতি-সূত্রের সাক্ষ্যই একমাত্র নয়। শাস্ত্রী মহাশয় আরো একটি সাক্ষ্যের কথা তুলছেন এবং এই দ্বিতীয় সাক্ষ্যের সনতারিখ সম্বন্ধেও স্পষ্ট মত ব্যক্ত করছেন।

হরিভদ্র ছিলেন অনুমানিক খ্রীষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর জৈন লেখক। তাঁর লেখা ষড়দর্শনসমুচ্চয়-এর উল্লেখ প্রথম পরিচ্ছেদে করা হয়েছে। এ-বইতে তিনি লোকায়তমতের ব্যাখায় করেছেন এবং সেই প্রসঙ্গেই তাঁর টীকাকার গুণরত্ন লোকায়তিকদের সম্বন্ধে অনেক কিছু বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন। অবশ্যই, মহামহোমাধ্যায় তাঁর প্রবন্ধে গুণরত্নের কথাগুলি বিস্তৃত বিবরণ বা বিশ্লেষণ দেন নি। সে-আলোচনায় আমরা পরে ফিরবো। আপাতত, গুণরত্নের মন্তব্যের ঠিক যতোটুকু মহামহোমাধ্যায় নিজে উল্লেখ করেছেন ততোটুকুর উপরই দৃষ্টি নিবন্ধ রাখা যাক।

মহামহোমাধ্যায় বলছেন, যদিও বৃহস্পতির রচনায় লোকায়তিক ও কাপালিকদের কথা স্বতন্ত্র ভাবে উল্লেখিত হয়েছে তবুও গুণরত্নের মতে এ-দু’-এর মধ্যে কোনোই তফাত নেই(১০)। মহামহোপাধ্যায়ের হিসেবে গুণরত্ন ছিলেন খ্রীষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর লেখক। এবং মহামহোপাধ্যায় বলছেন, তাঁর লেখা পড়লে স্পষ্টই বোঝা যায় যে তাঁর সময়েও লোকায়তিক সম্প্রদায় দেশ থেকে বিলুপ্ত হয় নি। কথাটি বিশেষ করে উল্লেখ করলাম এই কারণে যে মহামহোপাধ্যায়ের নিজের লেখা সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ, তাঁর ধারণায় তাঁর নিজের যুগেও অন্তত বাংলা দেশে নামান্তরের আড়ালে লোকায়তিকের দল সত্যিই টিকে রয়েছে। এই চিত্তাকর্ষক ও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যের আলোচনায় আমরা একটু পরেই ফিরবো। আপাতত, কাপালিকদের কথাটা ভালো করে দেখে নেওয়া যাক। কেননা, গুণরত্ন লোকায়তিকদের সঙ্গে এদের অভিন্নতা উল্লেখ করেই ক্ষান্ত নন, লোকায়তিকদের এমন বর্ণনা দিচ্ছেন যা ওই কাপালিকদের বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যায় : লোকায়তিকেরা নাকি গায়ে ভস্ম মাখে, মদ খায়, মাংস খায়, তারা মৈথুনাশক্ত ও যোগী(১১)।

সর্বশেষ বিশেষণটি সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক। লোকায়তিকদের সম্বন্ধে আমাদের যেটুকু সাধারণ ধারণা তার সঙ্গে আর যাই হোক যোগী শব্দটা কিছুতেই খাপ খায় না। অথচ পুঁথিতে লেখা রয়েছে,—কথাটাকে তো একেবারে উড়িয়ে দেওয়াও চলবে না! তাহলে পুঁথিতে যা লেখা রয়েছে তাকে গুরুত্ব দিতে হলে শুধু লোকায়ত নয়, ‘যোগী’ সম্বন্ধেও আমাদের সাধারণ ধারণাকে শুধরে নেবার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু শুধরে যে নেবো তা তো দলিল-দস্তাবেজের উপর নির্ভর করেই। অবশ্যই, দলিলের অভাব নেই। আমরা যতোই অগ্রসর হবো ততোই দেখতে পাবো ভারতীয় দর্শন সম্বন্ধে বহুদিন ধরে প্রচলিত আমাদের সাধারণ ধারণার সঙ্গে খাপ-খায় না এমনতরো দলিল রয়েছে রাশি রাশি। কিন্তু শুধু দলিল থাকলেই হয় না। দলিলগুলির প্রকৃত অর্থ নির্ণয় করার জন্যে একটা কোনো অভ্রান্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিরও প্রয়োজন। আমি বলতে চাই, সে-পদ্ধতির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে অধ্যাপক জর্জ টম্‌সনের গ্রন্থাবলী থেকে। উক্ত পদ্ধতির সাহায্যে লোকায়ত ও যোগী উভয় শব্দকেই কী রকম নতুন আলোয় দেখা সম্বব তার আলোচনা পরে তুলবো। আপাতত, শুধু এইটুকুই দেখাতে চাইছি যে ভারতীয় দর্শন সম্বন্ধে আমাদের সাধারণ যে সব ধারণা তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা কোনো কাজের কথা নয়। কেননা, তাহলে ভারতীয় দর্শনের পুঁথিপত্রগুলিতেই যা লেখা আছে তাও অস্বীকার করা দরকার।

————————
৭. D. R. Shastri SMIMSH
৮. H. P. Shastri op. cit. 5.
৯. এই গ্রন্থের প্রথম পরিচ্ছেদের চতুর্থ পাদটীকা দ্রষ্টব্য।
১০. H. P. Shastri op. cit. 6.
১১. এই গ্রন্থের ৪৩৫-৬ পৃষ্ঠ দ্রষ্টব্য [“লোকায়তিক ধ্যানধারণার উৎস-প্রসঙ্গে : অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত]

০৩. লোকায়ত ও কাপালিক

যোগীর কথা ছেড়ে দিলেও কাপালিক নামটিকেই দেখুন না। প্রাচীনেরা বলছেন, লোকায়ত আর কাপালিক একই কথা। কিন্তু আমাদের মনে কাপালিক ও লোকায়ত সম্বন্ধে যেটুকু সাধারণ ধারণা তার সঙ্গে এ-কথার কোনো রকম সঙ্গতি কি খুঁজে পাওয়া যায়?

লোকায়তিকদের সম্বন্ধে আমাদের যেটুকু সাধারণ ধারণা তার প্রায় চোদ্দ আনাই মাধবাচার্যের লেখা সর্ব্বদর্শনসংগ্রহ থেকে সংগৃহীত। এই বইতে লেখা আছে, লোকায়তিকেরা অনুমান মানে না, আত্মা মানে না, পরলোক মানে না, ঈশ্বর মানে না। তার বদলে তারা মনে করে প্রত্যক্ষই হলো একমাত্র প্রমাণ, দেহই আত্ময়া, ইহলোকই সব, সুখভোগ ছাড়া কোনো পুরুষার্থ নেই। মাধবাচার্যের এই লেখা থেকে লোকায়তিকদের সম্বন্ধে একটা ধারণা হয়। কিন্তু তার সঙ্গে কাপালিক-সংক্রান্ত ধারণার যোগাযোগ কোথায়? অবশ্যই, কাপালিক সম্বন্ধে আমাদের ধারণাটুকু সত্যিই খুব স্পষ্ট নয়—যেটুক স্পষ্ট তা শুধুমাত্র ভয়াবহ বীভৎসতার একটা ছবি। চীন পর্যটক হুয়েন্‌সাঙ(১২) ভারতবর্ষে বহু কাপালিক দেখেছিলেন—তাদের গলায় মড়ার খুলির মালা, মড়ার খুলি ভরে তারা মদ খায়। হুয়েন্‌সাঙ-এর ঢের আগেই বরাহমিহির(১৩) (ষষ্ঠ শতাব্দীতে) তাঁর বৃহৎসংহিতায় কাপালিকদের কথা যেটুকু উল্লেখ করেছেন তার থেকে এর চেয়ে স্পষ্ট আর কোনো ছবি পাওয়া যায় না। অবশ্যই, কাপালিক সম্বন্ধে আমাদের চলতি ধারণাটা প্রধানতই নাটক-নভেল থেকে পাওয়া। বঙ্কিমচন্ত্রের কপালকুণ্ডলা(১৩) মনে আছে? মনে আছে, কাপালিকদের সেই নিষ্ঠুর বীভৎসতার চিত্র? কাপালিকদের সম্বন্ধে এই রকম ঘৃণার ভাব শুধুই বঙ্কিমচন্দ্রের নভেল-এ নয়; তাঁর ঢের আগেকার যুগের নাটকেও। একাদশ শতাব্দীতে লেখা কৃষ্ণমিশ্রের(১৫) প্রবোধচন্দ্রোদয়-এ দেখতে পাই একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু ও একজন দিগম্বর জৈন সাধুর সংযম পরীক্ষা করবার জন্যে এক কাপালিক আর এক কাপালিকার চরিত্র সৃষ্টি করা হয়েছে; অবশ্যই, তাদের স্বভাবচরিত্রের কোনো বালাই নেই—তাই মঞ্চের উপরেই তারা কামসাধনা শুরু করে দিলো! তারও আগে, সম্ভবট খ্রীষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে লেখা ভবভূতির মালতীমাধব(১৬) নাটকে দেখা যায় নায়িকা মালতীকে প্রলুব্ধ করার, এবং শেষ পর্যন্ত তার সর্বনাশ সাধন করার, দায়িত্ব এক কাপালিকার উপরই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই জাতীয় নাটক-নভেল পড়েশুনে কাপালিকদের সম্বন্ধে আমাদের মনে কোনো রকম স্পষ্ট ধারণা হোক আর নাই হোক অন্তত একটা তীব্র ঘৃণা বিদ্বেষের ভাব যে জন্মায় সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অবশ্যই, লোকায়তিকদের সম্বন্ধেও যেটুকু খাপছাড়া খবর পাওয়া যায় তার মধ্যেও বিদ্বেষের ভাবটা খুবই প্রকট। দার্শনিক পুঁথিপত্রের কথা ছাড়াও এমনকি দেশের খোদ আইনকার্তা বিধান দিয়েছেন, সাধু-সমাজ থেকে লোকায়তিকদের দূর করে দিতে হবে। কিন্তু শুধু সেই কারণেই,—দুই-এর বিরুদ্ধেই বিদ্বেষের ভাব রয়েছে বলেই,—লোকায়ত ও কাপালিক যে এক এ-কথা বলাও বুদ্ধিমানের লক্ষণ হবে না।

————————
১২. A. Barth RI 214.
১৩. Ibid.
১৪. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় : কপালকুণ্ডলা।
১৫. প্রবোধচন্দ্রোদয়।
১৬. R. G. Bhandarkar VS 128.

০৪. হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সমাধান

তাহলে, লোকায়তিকদের সঙ্গে কাপালিকদের সম্পর্ক নিয়ে একটা সমস্যা উঠছে। অবশ্যই, ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসের সাধারণ বইতে এ-সমস্যার স্বীকৃতি নেই। কিন্তু মহামহোপাধ্যায় সাধারণ লেখক নন। তাই তাঁর চোখে এই সমস্যাটি ধরা পড়েছে এবং তিনি এর একটা সমাধান দেবারও চেষ্টা করেছেন।

কী রকম সমাধান?

কাপালিক মানে ঠিক কী,—এ-প্রশ্ন নিয়ে খুব বেশি আলোচনা না তুলেও মোটের উপর বার্হস্পত্যসূত্রম্‌ অনুসরণ করেই তিনি ধরে নিচ্ছেন কাপালিক বলতে কামসাধকই বোঝায়। বলাই বাহুল্য, এ-কথায় খু বেশি তর্কের অবকাশ নেই। কেননা, কাপালিকেরা যে একরকমের বামাচারী তান্ত্রিক তা সকলেই স্বীকার করবেন। এবং বামাচারী মানেই হলো কামাচারী। কেননা, বাম কথাটির রকমারি অর্থ সম্ভব বলেও অন্তত এই প্রসঙ্গে বাম মানে ‘কাম’—বাঁ-হাত বা বাঁ-দিকের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। প্রমাণ, আনন্দগিরির শঙ্কর-বিজয়(১৭)। বামাচারীদের বর্ণনায় তিনি বলছেন ‘বামবাহুল্যাৎ’, এবং এই বামবাহুল্যের যে-বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তা কামবাহুল্য ছাড়া আর কিছুই নয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বামাচাঈ বা কামাচারীর অর্থ কি? কাম শব্দটিকে আধুনিক কালে যে-অর্থে গ্রহণ করা হয় বামাচার প্রসঙ্গেও কি সেই অর্থটুকুই পর্যাপ্ত হবে?

এই কাম শব্দটিকে আজকাল আমরা যে-অর্থে বুঝি মহামহোপাধ্যায় কাপালিক-প্রসঙ্গেও সেই অর্থেই বুঝতে চান।

আজকালকার দিনে কাম নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন আমরা তাঁদের বলি কামবিজ্ঞানী বা কামশাস্ত্রজ্ঞ। বাৎসায়নের রচনা এই কর্থেই কামশাস্ত্র। কিন্তু ওই কাপালিক সম্প্রদায় বাৎসায়নের চেয়ে অনেক কালের পুরোনো। মহামহোপাধ্যায় তাই সিদ্ধান্ত করছেন, কাপালিকরাই হলো প্রাচীন ভারতে কামবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা।

কিন্তু তাহলে লোকায়তিকদের সঙ্গে কাপালিকদের সম্পর্কটা কী রকম? মহামহোপাধ্যায় আবার বার্হস্পত্যসূত্রম্‌-এর সাক্ষ্যই উদ্ধৃত করছেন : এ-বইতেই বলা হয়েছে লোকায়তিকদের মতে বার্ত্তাই একমাত্র বিদ্যা। বার্ত্তা মানে? কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে(১৮) কথাটার সংজ্ঞা পাওয়া যায় : কৃষি পশুপাল্যে বানিজ্যা চ বার্ত্তা। অর্থাৎ, বার্ত্তা বলতে বোঝায় কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্য। অবশ্যই, এখানে বাণিজ্য মানে ঠিক কী তা নিয়ে তর্ক উঠতে পারে, কেননা, কৌটিল্য ছিলেন চতুর্থ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের লেখক এবং তখনকার কালে বাণিজ্য বলতে অন্তত আজকাল যা বোঝায় তা বোঝাতো কিনা খুবই সন্দেহের কথা। তাছাড়া, গণ বা সঙ্ঘের আলোচনা প্রসঙ্গে পরে দেখতে পাবো বার্ত্তা শব্দের প্রধানতম অর্থ শুধু কৃষিই। সে যাই হোক, মহামহোপাধ্যায় বলছেন, লোকায়তিকেরা যদি কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্যকেই একমাত্র বিজ্ঞান মনে করে থাকেন তাহলে মানতেই হবে এরাই ভারতবর্ষের আদি ‘ইকনোমিস্ট’ বা অর্থনীতি-বিজ্ঞানী।

এই হলো মহামহোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্ত : “লোকায়তিকেরা যেমন তাঁদের বস্তুবাদী দর্শনের সাহায্যে অর্থনীতি-বিজ্ঞানের সূত্রপাত করেছিলেন, তেমনই কাপালিকেরা,—কী ধরনের দর্শনের সাহায্যে তা অবশ্য জানা নেই,—ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন কাম-বিজ্ঞানের।”

…as the Lokayata; and that as the Lokayatas, with their Materialistic Philosophy, marked the beginning of the science of Economics, so the Kapalikas, with what system of philosophy we do not know, marked the beginning of the science of Erotics.(১৯)’

কিন্তু এই উক্তিকেই তাঁর চরম সিদ্ধান্ত হিসাবে স্বীকার করতে হলে একের পর এক সমস্যা উঠবে। প্রথমত, কামশাস্ত্রপ্রণেতা স্বয়ং বাৎসায়ন(২০) লোকায়তিকদের তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা করেছেন; তাই লোকায়তিকদের সঙ্গে কাপালিকদের সম্পর্ক যদি সত্যিই গভীর হয় তাহলে কাপালিকদের আর যাই বলা যাক কামশাস্ত্রের আদি-গুরু বলা নেহাতই অসংগত হবে। আদিগুরুকে গালমন্দ করার দৃষ্টান্ত ভারতীয় ঐতিহ্যে চোখে পড়ে না। কিন্তু এ-ছাড়াও মহামহোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আরো মৌলিক সমালোচনা ওঠে। তিনি শুরু করলেন এই বলে যে প্রাচীন-পুঁথিপত্রে লেখা রয়েছে লোকায়ত ও কাপালিক আলাদা নয়, কিন্তু সিদ্ধান্ত যখন করছেন তখন বলছেন একটি সম্প্রদায় হলো অর্থনীতি-বিজ্ঞানের প্রবর্তক এবং দ্বিতীয় সম্প্রদায় হলো যৌনবিজ্ঞানের প্রবর্তক। এই দুটি কথাকে যদি এক করতে হয়ে তাহলে মানতেই হবে অর্থনীতির আলোচ্য—অর্থাৎ ধন-উৎপাদন—এবং কামবিজ্ঞানের আলোচ্য—অর্থাৎ মৈথুন ও প্রজনন—অন্তত প্রাচীন যুগের চেতনা অনুসারে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত ছিলো। আমাদের আধুনিক ধ্যান-ধারণা অনুসারে কথাটা নিশ্চয় হাস্যকর শোনাবে : ধন-উৎপাদনের সঙ্গে সন্তান-উৎপাদনের সম্পর্ক আবার কী? কিন্তু যে-পুঁথিপত্র নিয়ে আলোচনা তা একালের নয়, সেকালের। এবং সেকালের ধারণা যে হুবহু একালের মতোই হবে তা ভাববার কারণ নেই। বরং প্রাচীনেরা যখন বার্ত্তা-বাদী লোকায়তিকদের সঙ্গে কামাচারী কাপালিকদের এক করতে চাইছেন তখন আধুনিক গবেষকের কাছে নিশ্চয়ই প্রধান প্রশ্ন এই হবে যে একালের ধ্যানধারণাটা যতো পৃথকই হোক না কেন, মানবজাতির ক্রমোন্নতি-পথে সত্যিই কি এমন কোনো স্তরের কথা জানা আছে যখন মানুষের ধারণায় ধন-উৎপাদনের সঙ্গে মিথুনের ও সন্তান-উৎপাদনের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক ছিলো? যদি তা জানা থাকে তাহলে নিশ্চয়ই দ্বিতীয় প্রশ্ন হবে : কাপালিকদের সঙ্গে বা লোকায়তিকদের সঙ্গে মানব-ইতিহাসের সে-রকম কোনো স্তরের যোগাযোগ আছে কি না?

মহামহোপাধ্যায়ের কাছে কিন্তু এ-জাতীয় কোনো প্রশ্ন ওঠবার অবকাশ ছিলো না। তার কারণ তিনি ধরেই নিয়েছেন, কাম বা মৈথুনকে আজকের দিনে আমরা যে-চোখে দেখি প্রাচীনেরাও ঠিক সেই চোখেই দেখতেন এবং আজকের দিনে আমরা যৌন-আচরণের উদ্দেশ্য বলতে যা বুঝি প্রাচীনেরাও ঠিক তাই বুঝতেন। ফলে কামবিষয়ে অত্যধিক উৎসাহ হয় লাম্পট্য, না হয়তো নিছক ভোগাসক্তি,—খুব বেশি সমীহ করে বললে বড়ো জোর বলা যায় কামবিজ্ঞানের ভিত্তি-স্থাপনা। বস্তুত, কাপালিকদের সম্বন্ধে—তথা, সমস্ত রকম বামাচারী সম্প্রদায় সম্বন্ধেই,—আধুনিক কালে যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ তার মূলে প্রধানতই হলো এদের কামবাহুল্য।

আর ঠিক ওই কথাটাই ভুল। কেননা, প্রাচীনেরা কাম ও মৈথুনকে যে-চোখে দেখেছেন, এই ক্রিয়ার যে-উদ্দেশ্য কল্পনা করেছেন, তার সঙ্গে আমাদের আজকালকার ধ্যানধারণার মিল হয় না। তার কারণ খুব সহজ : প্রাচীনেরা ছিলেন প্রাচীন, আধুনিক নন। তাই আধুনিক ধ্যানধারণাও তাঁদের মধ্যে থাকবার কথা নয়।

ভারতবর্ষের প্রাচীন পুঁথিপত্রেই এ-কথার রাশি রাশি প্রমাণ আছে। যেহেতু পরের যুগে আস্তিকেরা, অর্থাৎ বেদপন্থীরা, নাস্তিকদের বিরুদ্ধে, অর্থাৎ বেদনিন্দুকদের বিরুদ্ধে, বিদ্বেষ প্রচার করবার জন্যে এই কামবাহুল্যের নজিরটাকেই অতো বড়ো করে দেখিয়েছিলেন সেইহেতুই এখানে এ-বিষয়ে বৈদিক সাহিত্যের সাক্ষ্যটুকুই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হবে। বলাই বাহুল্য, বৈদিক সাহিত্যে ভালো কি মন্দ, সুনীতিপরায়ন কি দুর্নীতিপরায়ণ—এই জাতীয় প্রশ্ন তোলা আমাদের যুক্তির পক্ষে অবান্তর। আমরা শুধু এইটুকুই দেখাতে চাই, যৌনব্যবহার সম্বন্ধে আধুনিক কালের ধারণা দিয়ে প্রাচীন কালের ধারণাকে বোঝবার কোনো উপায় নেই, এবং এ-বিষয়ে প্রাচীনকালের ধ্যানধারণাগুলির চিহ্ন শুধুই যে বেদনিন্দুক ও বৈদিক-ঐতিহ্য-নিন্দিত সম্প্রদায়গুলির মধ্যে টিকে আছে তাই নয়, এমনকি বৈদিকসাহিত্যের মধ্যেই তার অজস্র নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। বস্তুত, বামাচারের প্রকৃত তাৎপর্য বোঝবার পক্ষে বৈদিক সাহিত্যের এই নিদর্শনগুলির গুরুত্বই যেন বেশি : বেদ-ব্রাহ্মণ-উপনিষদে যে-কথা লেখা আছে তারই সাহায্যে কাপালিকাদির মধ্যে প্রচলিত ব্যবহারের অলিখিত তাৎপর্য অনুমান করা সম্ভব হতে পারে।

———————
১৭. আনন্দগিরি : শঙ্করবিজয় ।। সপ্তদশ প্রকরণ, পৃ. ১১৫।।
১৮. অর্থশাস্ত্র (রাধাগোবিন্দ বসাক) ১:৮।
১৯. H. P. Shastri op. cit. 6.

০৫. বৈদিক সাহিত্যে বামাচার

…all understanding of primitive conditions remains impossible so long as we regard them through brothel spectacles(২১) : Engels
অর্থাৎ গণিকালয়ের ঠুলি পরে আদিম অবস্থায় তাৎপর্য বোঝা অসম্ভব।

আধুনিক যুগের রুচিবোধের কাছে বামাচার যে কী সাংঘাতিক বিদ্বেষ-বিতৃষ্ণার উদ্রেক করে তার নিদর্শন হিসেবে রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্রের একটি মন্তব্য উদ্বৃত করা যায়। গুহ্যসমাজ বা তথাগত গুহ্যক নামে একটি বৌদ্ধ বামাচারী পুঁথি সম্বন্ধে তিনি বলছেন, এই পুঁথিতে এমন সব মতবাদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং এমন সব ক্রিয়াকর্মের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে মানুষের জঘন্যতম প্রবৃত্তিও এর চেয়ে ঘৃণিত ও ভয়াবহ কিছুই কল্পনা করতে পারে না এবং তার পাশে গত শতাব্দীর বিলিতি বটতলা বা হলিওয়েল স্ট্রিটের অশ্লীল সাহিত্যেও একান্ত পবিত্র মনে হবে।

…theories are indulged in, and practices enjoined which are at once the most revolting and horrible that human depravity could think of, and compared to which the words and specimens of Holiwell Street literature of the last century would appear absolutely pure.(২২)

কথাগুলি নিশ্চয়ই মিথ্যে নয়। তবুও কিন্তু এ-জাতীয় মনোভাব নিয়ে অগ্রসর হলে প্রাচীন সাহিত্যের প্রকৃত তাৎপর্য উদ্ধার করা অসম্ভব। তার কারণ, যে-নীতিবোধ ও রুচিবোধের মধ্যে এ-জাতীয় মন্তব্যের উৎস সেটা একান্তই আধুনিক কালের, আধুনিক যুগের অবদান। প্রাচীনেরা ছিলেন প্রাচীন, তাই আমাদের নীতিবোধ বা রুচিবোধের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় ছিলো না। তাঁরা যে-সাহিত্য রচনা করে গিয়েছেন তা তাঁদের রুচিবোধের অনুপাতেই। তাই আমরা যদি একালের নীতিবোধ নিয়ে তাঁদের সাহিত্যের দিকে চেয়ে দেখি এবং বিদ্বেষ-বিতৃষ্ণায় একেবারে বিরক্ত হয়ে উঠি তাহলে তাঁদের কথার প্রকৃত তাৎপর্য কিছুতেই খুঁজে পাবো না। তাঁরা ঠিক কী ভেবে এ-জাতীয় কথাবার্তা লিখেছিলেন তা জানতে হবে, এবং সে-কথা জানতে হলে অন্তত সাময়িক ভাবে আমাদের রুচিবোধকে মূলতবী রেখে ভেবে দেখতে হবে তাঁদের উদ্দেশ্যটা কী হওয়া সম্ভব।

বৈদিক সাহিত্যে বামাচারের নিদর্শন নিয়ে আলোচনা তোলবার আগে কথাগুলি বিশেষ করে তুলছি; কেননা, একালের ধ্যানধারণাগুলিকে সম্বল করে এগোলে বৈদিক সাহিত্যে বামাচারের নিদর্শনগুলিকে অত্যন্ত বীভৎস কামবিকার ও কুৎসিৎ লাম্পট্যের নমুনা বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। অথচ বৈদিক ঋষিদের কাছে কথাগুলি ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমূলক। তাই একালের লাম্পট্য-ব্যবহারটার পটভূমিতে সেকালের ঋষিদের এই সব কথাবার্তার প্রকৃত তাৎপর্য অনুমান করা সমম্ভব।

বেদ-ব্রাহ্মণ-উপনিষদের তাৎপর্য খুঁজতে হলে আজকালকার বটতলাসাহিত্য থেকে কোনোরকম মূলসূত্র পাওয়া সম্ভব নয়—এক কথাটি স্পষ্টভাবে মনে রেখেই বৈদিক সাহিত্যে বামাচার ও কামাচারের নিদর্শনগুলিকে বোঝবার চেষ্টা করা যাক।

একটি নিদর্শন : শুক্ল-যজুর্বেদ (বাজসনেয়ী সংহিতার) ২৩।।২২ থেকে ২৩।।৩১। এই দশটি বেদমন্ত্রেরই আক্ষরিক অনুবাদ দেবার দরকার নেই। আমরা শুধুমাত্র দুটি মন্ত্রের তর্জমা উদ্বৃত করবো, কেননা, ওই দুটির মধ্যেই খুব প্রয়োজনীয় একটি ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে—বাকি আটটি মন্ত্রে বারবার একঘেঁয়ে ভাবে, একই কথাবার্তা পাওয়া যাচ্ছে। কিসের কথাবার্তা? মৈথুনের। কেবল মনে রাখবেন, এই মৈথুন-দৃশ্যে ও মৈথুন-সংলাপে যাঁরা অংশগ্রহণ করছেন তাঁরা কেউই আজকালকার লম্পটের মতো লোক নন। তার বদলে পাঁচজন যজ্ঞীয় ঋত্বিক : অধ্বর্য্যু, ব্রহ্মা, উদ্গাতা, ইত্যাদি। ২৩।।২২ এবং ২৩।।২৩ : অধ্বর্য্যু কুমারীকে অভিমেথন করছেন—দুটি মন্ত্রে অধ্বয্যু ও কুমারীর মধ্যে মৈথুন-সংলাপ। ২৩।।২৪ এবং ২৩।।২৫ : ব্রহ্মা মহিষীকে অভিমেথন করছেন—মন্ত্র দুটিতে ব্রহ্মা ও মহিষীর মধ্যে মৈথুন-সংলাপ। ইত্যাদি, ইত্যাদি।

আমাদের আলোচনার পক্ষে ২৩।।২৬ এবং ২৩।।২৭ সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হবে। তাই শুধু এই দুটি বেদমন্ত্রই উদ্বৃত করলাম।

উর্ধ্বামেনামুচ্ছ্রাপয় গিরৌ ভারং হরন্নিব।
অথাস্যৈ মধ্যমেধতাং শীতে বাতে পুনান্নিব।।২৩।২৬।।
উবটভাষ্য :–উদ্গাতা বাবাতাম্‌ অভিমেথয়তি উর্ধ্বাম্‌ এনাম্‌ কম্‌ চিৎ পুরুষম্‌ আহ। উর্ধ্বাম্‌ এনাম্‌ বাবাতাম্‌ উচ্ছ্রিতাম্‌কুরু। কথম্‌ ইব। গিরৌ ভারম্‌ মধ্যে নিগৃহ্য হরেৎ এবম্‌ মধ্যে নিগৃহ্য উর্ধ্বাম্‌ উচ্ছ্রাপয়। অথ যথা ইতি এতস্য স্থানে। অথাচ উচ্ছ্রাপয় যথা অস্যা বাবাতায়া মধ্যম্‌ যোনিপ্রদেশঃ এধতাম্‌। ‘এধ্‌ বৃদ্ধৌ’ বৃদ্ধিম্‌ যায়াৎ অথ এনাম্‌ গৃহ্নীয়াঃ। শীতে বাতে পুনন্‌ ইব। যথা কৃষীবলঃ ধান্যম্‌ বাতে শুদ্ধম্‌ কুর্বন্‌ গ্রহণমোক্ষৌ ঝটিতি করোতি।
উর্ধ্বামেনমুচ্ছ্রয়োতাদিগিরৌ ভারং হরন্নিব।
অথাস্য মধ্যমেজতু শীতে বাতে পুনন্নিব।।২৩.২৭।।
উবটভাষ্য :–বাবাতা প্রত্যাহ উদ্‌গাতারম্‌। ভবতঃ অপি এতৎ এবম্‌। উর্ধ্বম্‌ এনম্‌। উদ্‌গাতারম্‌ উচ্ছ্রয়তাম্‌ উচ্ছ্রাপয়। অত্র স্ত্রী পুরুষায়তে। গিরৌ ভাবম্‌ হরন্‌ ইব। অথ এবম্‌ ক্রিয়মাণস্য অস্য মধ্যম প্রজননম্‌ এজতু চলতু। অথ এনম্‌ নিগৃহীব শীতে বাতে পুনন্‌ ইব যবান্‌।
২৩।।২৬ : এই স্ত্রীকে উর্ধ্বে তুলিয়া ধরো। পর্বতে যেমন করিয়া তার উত্তোলন করে। অনন্তর ইহার মধ্যদেশ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হউক। বায়ুকে শুদ্ধ করিতে করিতে…
উবট : উদ্গাতা বাবাতাকে অভিমেথন করিলেন। কোনো পুরুষকে বলিলেন, এই বাবাতাকে উর্ধ্বে তুলিয়া উষ্প্রিত করো। কেমন করিয়া? পর্বতে ভারবস্তুকে মধ্যস্থানে ধরিয়া যেমন ভাবে উত্তোলন করা হয় তেমনি ইহাকে মধ্যে ধরিয়া উত্তোলন করো। যেমন কৃষক বায়ুতে ধান্য শুদ্ধ করিতে করিতে ঝটিতে গ্রহণ করে ও বপন করে…
২৩।।২৭ : উর্ধ্বে এই পুরুষকে তুলিয়া ধরো। যেমন করিয়া পর্বতে ভারবস্তুকে উত্তোলন করা হয়। অনন্তর ইহার মধ্যপ্রদেশ চলিতে থাকুক। শীতল বায়ুতে যব শস্য শুদ্ধ করিতে করিতে…
উবট : প্রত্যুত্তরে বাবাতা উদ্গাতাকে বলিল, তোমা কর্তৃকও এই রকমই করা হউক। এই পুরুষকে, অর্থাৎ উদ্গাতাকে, উর্ধ্বে তুলিয়া ধরো। এইখানে স্ত্রীলোক পুরুষের ন্যায় আচরণ করিতেছে। পর্বতে যেমন করিয়া ভার তোলে। অনন্তর এইরূপ ক্রিয়মান ইহার মধ্যেপ্রদেশ চলিতে থাকুক, অর্থাৎ মৈথুন চলিতে থাকুক। অনন্তর ইহাকে চালিয়া ধরো। যেমন কৃষক শীতল বায়ুতে যব শুদ্ধ করিতে করিতে ঝাটিতে গ্রহণ এবং বপন করে…

উদ্ধৃত অংশের বিশেষ করে একটি বিষয়ের দিকে নজর রাখা দরকার : মৈথুন-সংলাপের মধ্যে কী ভাবে ক্ষেত্রে বীজ বপনের কথাটা এলো! তাহলে বামাচারের সঙ্গে বার্ত্তা-বিদ্যার সংযোগটা মনে হচ্ছে শুধুমাত্র কাপালিক-লোকায়তিক সম্প্রদায়ের মধ্যেই নয়, খোদ বৈদিক ঐতিহ্যের যেন একই ইঙ্গিত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে!

এ-আলোচনায় পরে ফেরা যাবে।

আপাতত, বড়ো সমস্যাটাই দেখা যাক। সমস্যা হলো : যজুর্বেদে পরের পর দশ দশটি এই রকম  মন্ত্র আছে, এবং আধুনিক কোনো পণ্ডিতই বলতে পারছেন না যে উত্তরযুগের লম্পটেরা এগুলি রচনা করে বেদের মধ্যে গুঁজে দিয়েছে। অর্থাৎ, রচনাটি খোদ বৈদিক ঋষিদেরই।

অবশ্যই, পরের যুগের বেদপন্থীরা এই মন্ত্রগুলি নিয়ে খুবই বিপদে পড়েছেন। তার কারণ, তাঁদের উত্তরযুগের রুচির সঙ্গে এগুলি কিছুতেই খাপ খায় না। তাই পরের যুগে এমনকি বিধান দেওয়া হয়েছে, এই বৈদিক মন্ত্রগুলি উচ্চারণ করবার জন্যই প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে(২৩)। প্রায়শ্চিত্তবিধানের মূলে নিশ্চয়ই পাপ-বোধ। অথচ, পুরাকালের বৈদিক ঋষিরা যদি সত্যিই একে পাপাচরণ মনে করতেন তাহলে নিশ্চয়ই তার জন্য পাঁচ-পাঁচজন যজ্ঞীয় ঋত্বিককে নিয়োগ করতে চাইতেন না। তাই তাঁদের কাছে পুরো ব্যাপারটাই যে একটি বৈদিক যজ্ঞ-বিশেষ সে-বিষয়ে কোনো রকম সন্দেহের অবকাশ নেই। বস্তুত, বেদের ছাত্রমাত্রই জানেন এই মন্ত্রগুলির সঙ্গে অশ্বমেধ যজ্ঞের কী রকম ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

কিন্তু মৈথুনের সঙ্গে বৈদিক যজ্ঞের সম্বন্ধ আবার কী? ঠিক কী সম্পর্ক এ-কথার জবাব এখুনি দেওয়া যাবে না। কেননা, যজ্ঞ বলে ব্যাপারটির আসল তাৎপর্য নিয়েই প্রচুর আলোচনার অবকাশ রয়েছে। আপাতত, আমরা শুধু এইটুকুই বলতে চাইছি যে যজ্ঞ মানে যাই হোক না কেন, অনেক জায়গায় দেখা যায় প্রাচীনেরা মৈথুনকেও সরাসরি যজ্ঞের মতোই মনে করেছিলেন।

এ-কথার প্রমাণ রয়েছে বৃহদারণ্যক উপনিষদে একেবারে শেষের দিকে:

স হ প্রজাপতিরীক্ষাংচক্রে হস্তাস্মৈ প্রতিষ্ঠাং কল্পযানীতি স স্ত্রিয়ং সসৃজে তাং সৃষ্ট্বাহধ উপাস্ত তস্মাৎ স্ত্রিয়মধ উপাসীত স এতং প্রাঞ্চং গ্রাবাণমাত্মন এব সমুদপারয়ত্তে নৈনামভ্যসৃজৎ।।৬।৪।২।।
তস্যা বেদিরুপস্থো লোমানি বর্হিশ্চর্মাধিষবণে সমিদ্ধো মধ্যতস্তৌ মুষ্কৌ স যাচান্‌ হ বৈ বাজপেয়েন যজমানস্য লোকো ভবতি তাবানস্য লোকো ভবতি য এবং বিদ্বানধোপহাসংচরত্যাসাং স্ত্রীণাং সুকৃতং বৃঙক্তেহথ য ইদমবিদ্যানধোপহাসংচরত্যস্য স্ত্রিয়ঃ সুকৃতং বৃঞ্জতে।।৬।৪।৩।।
প্রজাপতি মনে-মনে চিন্তা করলেন, ‘এসো আমি এর জন্যে একটি প্রতিষ্ঠা সৃষ্টি করি। তিনি স্ত্রী সৃষ্টি করলেন। তাকে সৃষ্টি করে তিনি তার অধোদেশে মিলিত হলেন (উপাস্ত=মিলিত হলেন। মনিয়ার উইলিয়ম্‌স-এর অভিধান দ্রষ্টব্য)। সেই কারণে স্ত্রীর অধোদেশে মিলিয়ে হওয়া উচিত (উপাসীত)। তিনি নিজের উর্ধ্বোত্থিত গ্রাবাণকে (আক্ষরিক অর্থে গ্রাবাণ যদিও সোমরস নিষ্কাশনের শিলাখণ্ড, তবুও এখানে শব্দটি স্পষ্টই শিশ্ন-ব্যঞ্জক) প্রসারিত করে দিলেন। তার দ্বারা তিনি তাকে গর্ভবতী করলেন।।৬।৪।২।।
তার (অর্থাৎ স্ত্রীলকটির) উপস্থ (=নিম্নাঙ্গ) বেদি (যজ্ঞবেদী); তার লোম (=চুল) যজ্ঞতৃণ; তার চর্ম অধিযবন (=সোমরস নিষ্কাশনের যন্ত্র); তার মুষ্কদ্বয় (=the two labia of the vulva : রাধাকৃষ্ণণ ও হিউমের তর্জমা দ্রষ্টব্য) মধ্যস্থ অগ্নি। বাজপেয়-যজ্ঞকারীর কাছে জগৎ যতো বৃহৎ, এই (তত্ত্ব) জেনে যে মৈথুন করে তার কাছেও জগৎ ততো বৃহৎ। যে স্ত্রী দ্বারা নিজে শক্তিমান হয়। যে এ (তত্ত্ব) না জেনে মৈথুন করে স্ত্রী তার সুকৃতকে…।।৬।৪।৩।। ইত্যাদি, ইত্যাদি।

এরকম প্রকট বামাচারী চিন্তা যদি উপনিষদের মধ্যে মাত্র একবারই উঁকি দিতো তাহলে না হয় আধুনিক পণ্ডিতদের পক্ষে একে দেখেও না দেখার ভাবটা অতোখানি দোষাবহ হতো না। কিন্তু উদ্বৃত অংশের মূল কথাটি শুধুমাত্র উদ্বৃত অংশটুকুর মধ্যেই আবদ্ধ নয়, অন্যত্রও তার স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়।

ছান্দোগ্যের ঋষি বলছেন :

যোযা বাব গৌতমাগ্নিস্তস্যা উপস্থ এব সমিধ্‌ যদুপমন্ত্রয়তে স ধূমো যোনিরর্চির্ষদন্তঃ করোতি তেহঙ্গারা অভিনন্দা বিস্ফুলিঙ্গাঃ।।৫।৮।১।।
তস্মিন্নেতস্মিন্নগ্নৌ দেবা রেতো জুহ্বতি তস্যা আহুতের্গর্ভঃ সম্ভবতি।।৫।৮।২।।
অর্থাৎ, হে গৌতম, স্ত্রীলোকই হলো যজ্ঞীয় অগ্নি। তার উপস্থই হলো সমিধ। ওই আহ্বানই হলো ধূম। যোনিই হলো অগ্নিশিখা। প্রবেশ-ক্রিয়াই হলো অঙ্গার। রতিসম্ভোগই হলো বিস্ফুলিঙ্গ।।৫।৮।১।।
এই অগ্নিতে দেবতারা রেতর আহুতি দেন। সেই আহুতি থেকেই গর্ভ সম্ভব হয়।।৫।৮।২।।

আবার বৃহদারণ্যকেও হুবহু এই কথাই দেখতে পাওয়া যায় :

যোযা বা অগ্নির্গৌতম তস্যা উপস্থ এব সমিল্লোমানি ধূমো যোনিরর্চির্ষদন্তঃ করোতি করোতি তেহঙ্গারা অভিনন্দা বিস্ফুলিঙ্গাস্তস্মিন্নেতস্মিন্নগৌ দেবা রেতো জুহ্বতি তস্যা আহুত্যৈঃ পুরুষঃ সংভবতি…।।৬।২।১৩।।

তর্জমা আগের উদ্বৃতিটির অনুরূপ হবে।

তাহলে, উপনিষদের ঋষি মৈথুন-ক্রিয়াকে খোলাখুলি ভাবেই যজ্ঞ বলে উল্লেখ করছেন। কথায় কথায় সোমযাগ থেকে উপমা নেবার চেষ্টাটাও লক্ষ্য করবার মতো। আমাদের আধুনিক রুচিতে এ-সব কথাবার্তা যতোই কদর্য লাগুক না কেন, উপনিষদের ঋষিরা এই তত্ত্বটির প্রতিই যে কতোখানি গুরুত্ব দিতে চান তার পরিচয় পাওয়া যায় নানান দিক থেকে। বৃহদারণ্যকে উক্ত তত্ত্ব বলবার পরই ঋষি তিনজন প্রাচীন জ্ঞানীর নজির দেখাচ্ছেন : বিদ্বান উদ্দালক আরুনি, বিদ্বান নাক মৌদ্গল্য, বিদ্বান কুমারহারিত—তিনজন বিদ্বানই নাকি এই তত্ত্ব জানতেন এবং সেই মর্মে উপদেশ দিয়েছেন এবং এই প্রসঙ্গেই এগিয়ে বৃহদারণ্যকের ঋষি বলছেন :

…বদ্যুদক আত্মানং পশ্যেত্তদতিমন্ত্রয়েত ময়ি তেজ ইন্দ্রিয়ং যশো দ্রবিনং সুকৃতমিতি শ্রীর্হ বা এবাং স্ত্রীপাং যন্মলোদ্বাসাস্তস্মান্নলোদ্বাসসং যশস্বিনীমভিক্রম্যোপমন্ত্রয়েত।।৬।৪।৬।।
সা চেদস্মৈ ন দন্তাৎ কামমেনামবক্রীণীয়াৎ সা চেদস্মৈ নৈব দস্যাৎ কামমেনাং যষ্ট্যা বা পাণিনা বোপহত্যাতিক্রামেদিন্দ্রিয়েণ তে যশসা যশ আদদ ইত্যযশা এব ভবতি।।৬।৪।৭।।
…কেউ যদি নিজেকে জলে দেখে তাহলে জপ করবে, ‘আমাতে তেজ, ইন্দ্রিয়সামর্থ্য, যশ, ধন, সুকৃত (আসুক)’।
এই হলো স্ত্রীলোকের মধ্যে শ্রী, যখন সে মলোদ্বাসা হয় (মল+উৎবাসাঃ, খুব সম্ভব, ঋতুর পর মলবস্ত্র ত্যাগ করবার উল্লেখ করা হচ্ছে)। অতএব মলোস্বাসা যশস্বিনী স্ত্রীলোকের নিকট গমন করে তাকে আহ্বান করবে।।৬।৪।৬।।
সে (স্ত্রীলোকটি) যদি তাকে কাম দিতে রাজী না হয় তাহলে তাকে (স্ত্রীলোকটিকে) নিজ বসে আনয়ন করবে। সে (স্ত্রীলোকটি) যদি তাকে (পুরুষকে) কাম দিতে রাজী না হয় তাহলে তাকে (স্ত্রীলোকটিকে) লাঠি দিয়ে বা হাত দিয়ে প্রহার করে অভিভূত করে বলবে, ‘আমার ইন্দ্রিয়শক্তি দ্বারা, আমার যশদ্বারা তোমার যশকে কেড়ে নিচ্ছি’। এই ভাবে সে (স্ত্রীলোকটি) যশহীনা হয়।।৬।৪।৭।। ইত্যাদি ইত্যাদি।

বলাই বাহুল্য, আজকের দিনে এ-ধরনের উপদেশ দিতে গেলে আমরা ঋষির গৌরব পাবার বদলে নিজেরাই লাঠিপেটা বা কিলচড় খাবো। কিন্তু বৃহদারণ্যক উপনিষদের লেখক মেয়েদের লাঠি-পিটে, কিলচড় লাগিয়ে কামভাব চরিতার্থ করিতে দিতে বাধ্য করবার উপদেশ দিয়েও মারধোর খেয়েছিলেন বলে কোথাও লেখা নেই। বরং তাঁর বইকে প্রাচীনেরা জ্ঞানের আকর বলেই মনে করছেন।

আর, এই থেকে কি প্রমাণ হয় যে মৈথুন ও কাম সম্বন্ধে আমাদের আজকের দিনের যা-ধারণা তার সঙ্গে সেকালের মানুষদের ধারণার একেবারে আকাশ-পাতাল তফাত?

তফাত যে হয়েছিলো এ-বিষয়ে সন্দেহের কোনো রকম অবকাশই নেই। কেননা, মহাভারতের যুগে দেখা যায় এ-বিষয়ে পুরোনো কালের ধ্যান-ধারণার সঙ্গে নতুন কালের ধ্যানধারণাগুলো আর মিল খাচ্ছে না। আদিপর্বের ১২২ অধ্যায় দেখুন(২৪) :

পূর্বকালে উদ্দালক নামে এক মহর্ষি ছিলেন। তাঁহার পুত্রের নাম শ্বেতকেতু। একদা তিনি পিতামাতার নিকট বসিয়া আছেন, এমন সময় এক ব্রাহ্মণ আসিয়া তাঁহার জননীর হস্ত ধারণপূর্বক কহিলেন, আইস আমরা যাই! ঋষিপুত্র পিতার সমক্ষেই মাতাকে বলপূর্বক (‘বলাৎ ইব’) লইয়া যাইতে দেখিয়া সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইলেন। মহর্ষি উদ্দালক পুত্রকে তদবস্থ দেখিয়া কহিলেন, বৎস ক্রোধ করিও না, ইহা নিত্যধর্ম। (এষঃ ধর্ম্মঃ সনাতনঃ ।।১।১২২।১৪।।)। গাভীগণের ন্যায় স্ত্রীগণ শত সহস্র পুরুষে আসক্ত হইলেও উহারা অধর্মলিপ্ত হয় না। ঋষিপুত্র পিতার বাক্য শ্রবণ করিয়াও ক্ষান্ত হইলেন না, প্রত্যূত পূর্বাপেক্ষা ক্রুদ্ধ হইয়া মনুষ্যমধ্যে বলপূর্বক এই নিয়ম স্থাপন করিয়া দিলেন যে, অদ্যাবধি যে স্ত্রী পতিভিন্ন পুরুষান্তর সংসর্গ করিবে এবং যে পুরুষ কৌমারব্রহ্মচারিনী বা পতিব্রতা স্ত্রীকে পরিত্যাগ করিয়া অন্য স্ত্রীতে আসক্ত হইবে, ইহাদের উভয়কেই ভ্রুণহত্যা সদৃশ ঘোরতর পাপপঙ্কে লিপ্ত হইতে হইবে। (কালিপ্রসন্ন সিংহের তর্জমা)

যৌনজীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিটা যে একটি বিশেষ যুগেই বদলেছে—আগে একরকম ছিলো, পরে অন্যরকম হলো—এ-কথার এর চেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ আর কী হবে? সেই যুগ বলতে ঠিক কোন যুগ,—কোন যুগ থেকে কামজীবন সম্বন্ধে আধুনিক ধ্যানধারণার শুরু,—এ-প্রশ্ন অবশ্যই স্বতন্ত্র।

আমাদের কাছে এখানে প্রধান সমস্যা হলো, সেকালের ধারণাটা ঠিক কী রকম? কোন রকম ধারণার বশবর্তী হলে পরে বৈদিক ঋষিদের পক্ষে কামজীবনকে অতোখানি গুরুত্বপূর্ণ, অতোখানি উদ্দেশ্যমূলক, মনে করা সম্ভবপর? এ-প্রশ্নের পুরো জবাবটা অবশ্যই শুধুমাত্র বৈদিক সাহিত্যের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। অন্য কোন দিক থেকে জবাবটা পাবার সম্ভাবনা সে-কথায় একটু পরে ফেরা যাবে। কিন্তু, যেটা খুবই বিস্ময়ের কথা, এ-বিষয়ে বৈদিক সাহিত্য আমাদের সম্পূর্ণ নিরাশ করে না। উপনিষদ এবং বিশেষ করে ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির কাছ থেকেই প্রশ্নটার অন্তত আংশিক উত্তর পাওয়া যাচ্ছে।

উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যায় ছান্দোগ্য-উপনিষদের বামদেব্য ব্রতের কথা। ‘বামদেব্য’ নামটার দিকে নজর রাখবেন। বৈদিক সাহিত্যেও বামাচারের স্মারক রয়েছে তার একটি স্পষ্ট নিদর্শন ওই নামের মধ্যেই।

ছান্দোগ্য-উপনিষদে লেখা আছে :

উপমন্ত্রয়তে স হিংকারো জ্ঞপয়তে স প্রস্তাবঃ স্ত্রিয়া সহ শেতে স উদ্গীথঃ প্রতি স্ত্রীং সহ শেতে স প্রতিহারঃ কালং গচ্ছতি তন্নিধনং পারং গচ্ছতি তন্নিধনমেতদ্বামদেব্যং মিথুনে প্রোতম্‌।।২।১৩।১।।
স য এবমেতদ্বামদেব্যং মিথুনে প্রোতং বেদ মিথুনীভবতি মিথুনান্মিথুনাৎ প্রজায়তে সর্ব্বমায়ুরেতি জ্যোগ্‌ জীবতি মহান্‌ প্রজয়া পশুভির্ভবতি মহান্‌ কীর্ত্ত্যা ন কাঞ্চন পরিহরেৎ তদ্‌ ব্রতম্‌।।২।১৩।২।।
আহ্বান করে, সেই হলো হিঙ্কার। প্রস্তাব করে, সেই হলো প্রস্তাব। স্ত্রী সঙ্গে সে শয়ন করে, সেই হলো উদ্‌গীথ। স্ত্রীর অভিমুখ হয়ে শয়ন করে, সেই হলো প্রতিহার। সময় অতিবাহিত হয়, তাই নিধন। এই বামদেব্য নামক সাম মিথুনে প্রতিষ্ঠিত। ।।২।১৩।১।।
যে এইভাবে বামদেব্য সামকে মিথুনে প্রতিষ্ঠিত বলে যে জানে সে মিথুনে মিলিত হয়। (তার) প্রত্যেক মিথুন থেকেই সন্তান উৎপন্ন হয়। সে পূর্ণজীবী হয়। সন্তান, পশু ও কীর্তিতে মহান হয়। কোনো স্ত্রীলোককেই পরিহার করবে না—এই-ই ব্রত।।২।১৩।২।।

“মিথুনাৎ মিথুনাৎ প্রজায়তে সর্ব্বম্‌ আয়ুঃ এতি জ্যোক্‌ জীবতি মহান্‌ প্রজয়া পশুভির্ভবতি মহান্‌ কীর্ত্ত্যা”—এই হলো আসল কথা।

মিথুন থেকে কী কী পাওয়া যাবে তার ফর্দ দেখুন :
সন্তান পাওয়া যাবে।
পূর্ণ জীবন পাওয়া যাবে।
পশু পাওয়া যাবে।
মহান্‌ কীর্তির নামডাক পাওয়া যাবে।

এখানে বিশেষ করে দে-দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি তা হলো, উপনিষদের ঋষি মৈথুনকে শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনেরই উপায় মনে করছেন না, সেই সঙ্গেই ধনউৎপাদনের উপায় বলেও বর্ণনা করছেন। উপনিষদের যুগেও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিটা অনেকখানিই পশুপালনমূলক; তাই ধনউৎপাদন বলতে প্রধানতই পশুবৃদ্ধি।

আর এই ধারণার দরুনই মিথুনকে এতোখানি জরুরী বলে মনে করা হচ্ছে যে ঋষি মিথুনের বিভিন্ন স্তরকে হিঙ্কার, প্রস্তাব, উদ্‌গীথ, প্রতিহার প্রভৃতি পঞ্চবিধ সামগানের সঙ্গে এক বলে বর্ণনা করছেন। শুধু তাই নয়, উপদেশ দেওয়া হচ্ছে, “ন কাঞ্চন (=কাম্‌+চন=কোনো স্ত্রীলোককে) পরিহরেৎ তদ্‌ ব্রতম”—কোনো স্ত্রীলোককেই পরিহার করবে না, তাহা-ই ব্রত।

তাহলে প্রাচীনদের মনে মিথুন সম্বন্ধে ধারণাটা ঠিক আমাদের মতো নয়।

আমাদের ধারণায় মিথুন থেকে কী পাওয়া যায়? সন্তান।

ঋষিদের ধারণায় মিথুন থেকে কী পাওয়া যায়? শুধু সন্তান নয়, ধনসম্পদও।

আমাদের ধারণায় সন্তান উৎপাদনের সঙ্গে ধনসম্পদ উৎপাদনের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁদের ধারণায়, ধনসম্পদ উৎপাদন ও সন্তান উৎপাদন—দু’-এর মধ্যে সম্পর্ক বড়ো গভীর।

এখন, আমাদের ধারণাটা ঠিক না তাঁদের ধারণাটা ঠিক, এ-নিয়ে তর্ক তোলবার দরকার নেই। অবশ্যই, এ-বিষয়ে আমাদের ধারণা তাঁদের চেয়ে অনেক স্পষ্ট, অনেক নির্ভুল। তার তুলনায়, তাঁদের ধারণাটার প্রায় পনেরো আনাই কল্পনা। কিন্তু যেটা আসলে ঢের বড়ো কথা, তাঁদের যুগে তাঁদের মনে এই রকমের একটা কল্পনা সত্যিই ছিলো, ছিলো ওই রকমের একটা ভুল ধারণা। তাই তাঁদের লেখা পুঁথিপত্র আমরা যদি বুঝতে চাই তাহলে আমাদের একালের ধ্যান-ধারণাগুলিকে তাঁদের লেখার উপর আরোপ করে বসলে প্রকাণ্ড ভুল হবে—ঠিক কী ভেবে তাঁরা কী লিখেছিলেন সে-কথা আমরা বুঝতেই পারবো না।

তাঁদের মনে যে সত্যিই ওই রকমের একটা ধারণা ছিলো এ-কথার প্রমাণ শুধুই উপনিষদ নয়, ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলিও। বরং ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলিতে এই কথা এতোবার এবং এতো স্পষ্টভাবে তাঁরা লিখে রেখেছেন যে সেদিকে চোখ না পড়াটাই বিস্ময়কর। স্থানসংকুলানের খাতিরে আমরা এখানে মাত্র একটি নমুনার উল্লেখ করতে পারবো; উৎসাহী পাঠক পাদটীকায় অন্যান্য বহু দৃষ্টান্তের উল্লেখ পাবেন(২৫)। আমাদের এই দৃষ্টান্তটি ঐতরেয় ব্রাহ্মণের প্রথম পঞ্চিকা প্রথম অধ্যায় থেকে সংগৃহীত, তর্জমা শ্রদ্ধেয় রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর(২৬) :

যে যজমান আপনাকে অপ্রতিষ্ঠিত মনে করে সে ঘৃতপক্ক চরু নির্বাপন করিবে। (অপ্রতিষ্ঠিত অর্থ, পুত্রাদিরহিত ও গবাদিরহিত)।
হে বৎস, যে এইরূপ প্রতিষ্ঠারহিত সে ইহজগতে প্রতিষ্ঠিত (শ্লাঘ্য) হয় না। (ঘৃতচরুর দ্বারা সেই অপ্রতিষ্ঠার পরিহার হয়।)
তাহাতে (সেই ঘৃতপক্ক চরুতে) যে ঘৃত আছে তাহা স্ত্রীর পয়ঃ (শোনিতস্বরূপ) আর যে তণ্ডুল আছে তাহা পুরুষের (রেতঃ স্বরূপ); সেই ঘৃততণ্ডুল মিথুন সদৃশ; সেই জন্য এই মিথুনদ্বারাই (ঘৃততণ্ডুলময় চরুপ্রদানদ্বারা) ইহাকে (যজমানকে) সন্ততিদ্বারা ও পশুদ্বারা বর্ধিত করা হয়। (সেই হেতু এই চরু) প্রতিষ্ঠারই হেতু।

এখানেও সেই একই ধারণা : মিথুন থেকে শুধুই যে সন্তান পাওয়া যাবে তাই নয়, ধনসম্পদও। মনে রাখবেন, সে-যুগে  ধনসম্পদ বলতে প্রধানত পশুই। তাহলে সে-যুগের যাঁরা জ্ঞানী তাঁদের ধারণায় ধনউৎপাদন আর প্রজনন এমন কিছু আলাদা ব্যাপার নয়। মিথুন থেকে শুধু সন্তান পাবার আশা নয়, পশুদ্বারা বর্ধিত হবার আশাও। আর এই কথায় যদি বিশ্বাস অটুট হয় তাহলে তাঁরা স্বভাবতই উপদেশ দেবেন : ‘ন কাঞ্চন পরিহরেৎ তদ্‌ ব্রতম্‌’, কোনো স্ত্রীলোককেই পরিত্যাগ করবে না—তাই-ই ব্রত।

আধুনিক কালের পণ্ডিতেরা বেদ-উপনিষদে এ-ধরনের কথা লেখা আছে দেখে বিলক্ষণ বিরক্তিবোধ করতে পারেন। তার কারণ, এ-ধরনের কথা বলবার পিছনে যেটা হলো নিছক আধুনিক যুগের উদ্দেশ্য সেটাকেই তাঁরা একমাত্র উৎসাহ মনে করেন। আর যদি তাই হয় তাহলে বেদ-উপনিষদের লেখকদের মধ্যে অত্যন্ত স্থূল আর কদর্য মনোবৃত্তি কল্পনা না করে উপায় থাকে না। কিন্তু তাই বা কী করে বলা যায়? হাজার হোক, তাঁরা ছিলেন সত্যদ্রষ্টা ঋষি! ক্রমে আধুনিক পণ্ডিতদের পক্ষে একমাত্র উপায় হলো ঋষিদের এই জাতীয় কথাবার্তাগুলিকে চেপে যাওয়া। আমরা বলতে চাই, ওই পদ্ধতিটাই ভুল। কেননা, প্রাচীনেরা কী ভেবে কী লিখেছেন তা ঠিকমতো বুঝতে হলে সর্বপ্রথম মনে রাখা দরকার যে প্রাচীনেরা ছিলেন প্রাচীন—তাই একালের ধ্যানধারণাগুলি তাঁদের মধ্যে কল্পনা করাটাই অসঙ্গত ও যুক্তিহীন।

——————
২১. F. Engels OFPPS 61.
২২. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী : বৌদ্ধধর্ম ৮২।
২৩. M. N. Dutta RVS 801n.
২৪. মহাভারত (কালীপ্রসন্ন সিংহ) ১০৯।
২৫. SBE 12:194, 257sq.,…
২৬. ঐতরেয় ব্রাহ্মণ (রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী) ৬-৭।

 ০৬. সন্তান উৎপাদন আর ধন-উৎপাদন

লোকায়তিকদের কথায় ফিরে আসা যাক। কাপালিকদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে যে সমস্যা উঠেছিলো বৈদিক সাহিত্যের নজির থেকেই তার যেন একটা কিনারা পাওয়া যাচ্ছে। বৃহস্পতি বলছেন, লোকায়ত আর কাপালিক দু’-এর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ। শুধু বৃহস্পতিই নন, গুণরত্নের লেখা বইতেও এই কথাই। এদিকে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দেখছেন, লোকায়ত হলো অর্থসাধনশাস্ত্র—আধুনিক ভাষায় ধনউৎপাদনের শাস্ত্র, সায়েন্স অব ইকনোমিক্স। অপর পক্ষে, কাপালিক হলো কামসাধনশাস্ত্র, মহামহোপাধ্যায়ের ভাষায় সায়েন্স অব ইরোটিক্স।

অবশ্যই, আমাদের আধুনিক ধারণা অনুসারে ইকনোমিক্স-এর সঙ্গে ইরোটিক্স-এর—ধনউৎপাদনের সঙ্গে কামসাধনের—কোনো সম্পর্ক নেই। আর যদি তা না থাকে তাহলে সেকালের পুঁথিপত্রে লোকায়তিকদের সঙ্গে কাপালিকদের অভেদ-সূচক যে-সব কথাবার্তা সেগুলির তাৎপর্য খোঁজবার কোনো মানে হয় না। মহামহোপাধ্যায়ের নিজের লেখার মধ্যে এই রকমেরই একটা পরাজয় স্বীকার করার ইঙ্গিত থেকে গিয়েছে। এক জায়গায় তিনি বলেছেন, প্রাচীনদের মত অনুসারে লোকায়ত ও কাপালিক আলাদা নয়। আর এক জায়গায় তিনি বলছেন, লোকায়তিকেরা ছিলেন অর্থনীতি বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা, কাপালিকেরা কামশাস্ত্রের : কিন্তু দু’-এর মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে তিনি কোনো কথাই তুললেন না। অথচ তা যদি না তোলা হয় তাহলে লোকায়ত আর কাপালিক যে কী করে এক হলো সে-সমস্যার সমাধান চেবার চেষ্টাই করা হলো না।

অথচ, আমরা দেখলাম বৈদিক সাহিত্যের আলোচনা এ-সমস্যার উপর কিছুটা আলোকপাত করতে পারে। কেননা, বৈদিক সাহিত্য থেকে অন্তত এটুকু বোঝা গেলো যে আজকালকার দিনে ধনউৎপাদন ও সন্তানউৎপাদনকে আমরা যতোখানিই সম্পর্কহীন ও বিচ্ছিন্ন চেষ্টা মনে করি না কেন প্রাচীনকালের কোনো একটা যুগের মানুষ তা মনে করতো না। আর তাহলে কি এমনটা হতে পারে না যে, যে-কালের বা যে-স্তরের ধ্যানধারণার স্মারক বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে টিকে রয়েছে সেই-স্তরের চেতনা থেকেই লোকায়ত ও কাপালিক মতের উৎপত্তি? সকলেই বলছেন, লোকায়তিকদের মতে অর্থ ও কামই হলো পরম-পুরুষার্থ; কিন্তু এমন কথা তো কেউই বলছেন না যে মানব-চেতনার একটি পুরানো স্তরে যেহেতু অর্থসাধন ও কামসাধন স্বতন্ত্র প্রচেষ্টা নয় সেই হেতু এমনটা হওয়া নিশ্চয়ই অসম্ভব নয় যে, সেই স্তরের চেতনাই লোকায়তিকদের মধ্যে প্রতিফলিত—তাদের কাছে হয়তো অর্থ ও কাম স্বতন্ত্র পুরুষার্থ নয়, একই পুরুষার্থের যেন এপিঠ-ওপিঠ।

অবশ্যই মানি, বৈদিক সাহিত্যে বামাচারের বা কামাচারের স্মারককে সূত্র হিসেবে অবলম্বন করে লোকায়তিকদের কথা বোঝবার চেষ্টা করলে রাশি রাশি প্রশ্ন উঠবে। কেননা, বেদনিন্দুক বা নাস্তিক বলেই যাদের প্রধান পরিচয় বেদমন্ত্রের সাহায্যে তাদের কথা বুঝতে পারবার দাবিটা সরাসরি অসম্ভব মনে হবারই কথা। বিশেষত, আর্য-অনার্য মতবাদ রয়েছে—পণ্ডিত মহলে অনেকেরই ধারণা বৈদিক সাহিত্যে যে রকম বিশুদ্ধ আর্য-সাহিত্য বামাচারাদি তেমনিই বিশুদ্ধ অনার্য-ব্যাপার। তাই, এই সাহায্যে ওকে বোঝবার চেষ্টা একান্তই অসম্ভব।

আমরা কিন্তু বলতে চাই, তা নয়। শুধুই যে কিছুকিছু বেদমন্ত্রের সাহায্যে বেদনিন্দুকদের কথা বুঝতে পারা যায় তাই নয়, বেদনিন্দুকদের কিছুকিছু কথা বিচার করেও বৈদিক সাহিত্যকে বোঝবার অবকাশ রয়েছে। তার কারণ আমরা প্রথম পরিচ্ছেদেই আলোচনা করেছি : বৈদিক বা অ-বৈদিক যে-কোনো ধ্যানধারণাই হোক না কেন, প্রত্যেকটিরই উৎসে রয়েছে সমাজ-বিকাশের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের কথা। এবং সমাজ-বিকাশের যে পর্যায়টির মধ্যে লোকায়তিক চেতনার উৎস বৈদিক মানুষেরাও এককালে সেই পর্যায়েই বাস করতেন, ফলে তাঁদের রচনায় সেই পর্যায়ের স্মারক টিকে থাকা নিশ্চয়ই অসম্ভব নয়। তাই, উত্তরকালে বেদপন্থী ও বেদনিন্দুকদের মতাদর্শে যতোই প্রভেদ দেখা দিক না কেন, বৈদিক সাহিত্যের স্মারকের সাহায্যেই ওই বেদনিন্দুকদের কিছুকিছু কথা বুঝতে পারার সম্ভাবনা সত্যিই রয়েছে। অবশ্যই এ-কথা বলতে গেলে বিদগ্ধ সমাজে যে-মতবাদ প্রায় স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে—অর্থাৎ আর্য-অনার্য বা আর্য-দ্রাবিড় মতবাদ—তার সংঙ্কীর্ণতা ঠিক কোথায় সে-প্রশ্ন নিয়েও আলোচনা তোলা দরকার। কিন্তু শুরুতেই যদি এতো রকম সমস্যার জোটে জড়িয়ে পড়তে হয় তাহলে আর অগ্রসর হবার সম্ভাবনা থাকে না। তাই, আপাতত শুধু বামাচার বা কামাচারের কথাটা আরো একটু তলিয়ে দেখা যাক।

কথা হলো, কোনো এক যুগে,—কিংবা আরো সাবধানে বললে বলা উচিত মানব সমাজের ক্রমোন্নতির কোনো এক পর্যায়ে,–সন্তান উৎপাদন ও ধন-উৎপাদনকে মানুষ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দুটি ক্রিয়া বলে চিনতে শেখে নি। সে-যুগটা যাই হোক না কেন, সে-পর্যায়টা যাই হোক না কেন, বৈদিক সাহিত্যের সাক্ষ্যকে যদি আপনি গুরুত্ব দিতে রাজী হন তাহলে আপনাকে মানতেই হবে যে, বৈদিক মানুষেরাই এককালে ক্রমোন্নতির এ-রকম একটা পর্যায়ে বেঁচে ছিলো। তারই রাশি রাশি স্মারক রয়েছে বৈদিক সাহিত্যে। এ-কথা যদি আপনি না মানেন তাহলে আপনাকে বলতে হবে মৈথুন নিয়ে অমন প্রচণ্ড উৎসাহটা বৈদিক ঋষিদের পক্ষে অতি কদর্য কামবিকারেরই পরিচয়। আমরা আপনার কথায় সায় দিতে পারবো না। কেননা, আমরা দেখছি বৈদিক রচনায় যেখানে কামাচারের কথা সেখানে রসালো অশ্লীলতা উপভোগ করবার কোনো রকম লক্ষণই নেই। বরং এই বামাচার যে তাঁদের কাছে কতোখানি গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমূলক ব্যাপার তার পরিচয় তাঁরা দিয়েছেন একে যজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করে, সামগানের সঙ্গে তুলনা করে। যজ্ঞ ও সামগানের সঙ্গে তুলনা করে। যজ্ঞ ও সামগান সম্বন্ধে আজকের দিনে আমরা যতো হালকা কথাবার্তাই বলতে শিখি না কেন, তাঁদের কাছে এগুলিই ছিলো জীবনের সর্বস্ব।

বেদে লেখা আছে,–কথাটা তাই মানতেই হবে। মানতেই হবে, ক্রমোনতির কোনো এক পর্যায়ে মানুষ সত্যিই মনে করেছিলো, মিথুনের দরুন শুধু সন্তান উৎপাদনই নয়, ধন উৎপাদনও সম্ভবপর। তাই, সমস্যা হলো : এ-পর্যায় সম্বন্ধে সংবাদ সংগ্রহ করা যাবে কোথা থেকে?

একবার উল্টো দিক থেকে চেষ্টা করা যাক। বেদনিন্দুকদের কথা বোঝবার আশায় বৈদিক সাহিত্যের সাহায্য নেওয়া গিয়েছে। এবার দেখা যাক বৈদিক সাহিত্যে বামাচারে ওই স্মারকগুলি মানব চেতনার ঠিক কোন স্তরের পরিচায়ক সে-কথা বোঝবার ব্যাপারে বেদনিন্দুকদের দিক থেকে এগোলে কি কোনো সুবিধে হতে পারে?

গুণরত্নের কথা বলেছি। লোকায়ত-সংক্রান্ত তাঁর কিছুকিছু মন্তব্যের উল্লেখ করেছেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী : লোকায়তিকেরা যোগী, তারা গায়ে ভস্ম মাখে, তারা বামাচারী, তারা কাপালিক। গুণরত্ন কিন্তু লোকায়তিকদের সম্বন্ধেই আরো কিছু কথা বলেছেন, মহামহোপাধ্যায় তার উল্লেখ করেন নি।

গুণরত্ন বলেছেন, বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে লোকায়তিকেরা একত্র সমবেত হয়। তারা একত্রে মিলিত হয় এবং প্রমত্ত হয় নির্বিচার মৈথুনে।

বর্ষে বর্ষে কস্মিন যপি দিবসে সর্ব্বে সংভূত যথানাম নির্গমম্‌ স্ত্রীতিঃ অভিরম্যস্তে(২৭)…

বলাই বাহুল্য, লোকায়তিকদের সম্বন্ধে এই সংবাদটি দেবার পিছনেও গুণরত্নের আসল উদ্দেশ্যটা হলো তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচার করা। কিন্তু তা হোক। তবুও গুণরত্ন লোকায়তিকদের সম্বন্ধে এই যে খবরটি দিলেন এর জন্যে ভারতীয় দর্শনের প্রত্যেক ছাত্রই তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে। কেননা, এটুকু সংবাদের মধ্যে শুধুই যে লোকায়তিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎস সম্বন্ধে মূল্যবান ইঙ্গিত পাওয়া গেলো তাই নয়, বামাচাঈ ক্রিয়াকাণ্ডগুলি মানব সমাজের ঠিক কোন স্তরের পরিচায়ক সে-কথা অনুমান করবারও একটি সুযোগ পাওয়া গেলো।

গুণরত্নের দেওয়া এই তথ্যটি সম্বন্ধে ভালো করে ভেবে দেখুন। ব্যাপারটা কী? মানুষগুলো এক জায়গায় জড়ো হচ্ছে, একত্রে পানাহার করছে, প্রমত্ত হয়ে উঠছে অবারিত মৈথুনে! একে কি কোন একরকম দলগত কামবিকার বলতে হবে নাকি? এখানেও সেই একই কথা। শুধুমাত্র একালের লাম্পট্য-ব্যবহারকে সম্বল করলে সেকালের আচরণকে বুঝতে পারা যাবে না।

তাহলে? বুঝতে পারবার আশায় কোন পথ ধরে এগোবো?

ভেবে দেখতে হবে, পৃথিবীর আনাচে-কানাচে আজ যে-সব পেছিয়ে-পড়া মানুষের দল টিকে রয়েছে তাদের মধ্যে এ-ধরনের আচরণ সত্যিই দেখতে পাওয়া যায় কি না। যদি সত্যিই দেখতে পাওয়া যায় তাহলে প্রশ্ন তুলতে হবে, ঠিক কী ভেবে তারা এ-ধরনের আচরণ করছে? তাদের চেতনাতেও কি এ-আচরণ শুধু লাম্পট্য, না, এরই সাহায্যে তারা কোনো রকম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য সাধন করবার চেষ্টা করছে? হয়তো তাদের সে-চেষ্টাটা শুধুই কল্পনা, বাস্তব তথ্যের দিক থেকে হয়তো তার পুরোটাই ভুল। তবুও আসল প্রশ্ন তা নয়। প্রশ্ন হলো, তাদের ধারণাটা ঠিক কী? সে-ধারণার সঙ্গে আমাদের ধারণার মিল আছে কি?

প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলির যে-সব কথার কোনো রকম মানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এইদিক থেকে এগোলে হয়তো তার মানে পাওয়া যেতে পারে। তার কারণ, পুঁথিগুলি প্রাচীন বলেই সেগুলির মধ্যে ওই পিছিয়ে-পড়া সমাজের মানুষদের চেতনার রেশ থেকে যাওয়া অসম্ভব নয়।

তাহলে প্রাচীন পুঁথির অর্থ অম্বেষণ করবার সময় শুধুমাত্র পুঁথির রাজ্যে আবদ্ধ থাকলেই চলবে না। পুঁথির রাজ্য ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হবে এই বাস্তব পৃথিবীতে—যে-পৃথিবীতে সব মানুষের সমান উন্নতি হয় নি, কেউ বা এগিয়ে গিয়েছে, উঠে এসেছে সভ্যতার হিমাদ্রিশিখরে, তাদের চেতনা থেকে অনেকাংশেই বিলুপ্ত হয়েছে নিজেদের অসভ্য অতীতের স্মৃতি; আর তাই, যারা পিছিয়ে পড়ে রয়েছে তাদের দিকে নজর করলে—ভালো করে নজর করলে—সভ্য মানুষদের এই ভুলে যাওয়া অতীতকে খুঁজে পাওয়া হয়তো অসম্ভব হবে না। আর এইদিক থেকে আলো পেয়েই আমরা হয়তো দেখতে পাবো আমাদের সুদূর পূর্বপুরুষেরা ঠিক কী ভেবে, কোন ধারণায় বিশ্বাস করে ওই জাতীয় কথাবার্তা লিখে গিয়েছেন।

কথাটা বিশেশ করে তুললাম, বৈদিক সাহিত্যে বামাচারের চিহ্নগুলি বোঝবার প্রসঙ্গে। কিন্তু, বৈদিক সাহত্যে আদিম চিন্তার স্বাক্ষর বলতে শুধু ওই বামাচার নয়। আরো নানা রকম চিহ্ন আছে। সেগুলিকেও বুঝতে হবে। তাই, কোন পদ্ধতিতে বোঝা সম্ভব এ-বিষয়েও একটা স্পষ্ট ধারণা পেতে হবে। আপাতত বামাচারী চেতনার উৎস নিয়েই অনুসন্ধান চালানো যাক। এ-অনুসন্ধান যদি সফল হয় তাহলে নিশ্চয়ই আশা করা ভুল হবে না যে, যে-পদ্ধতির অনুসরণে তা সফল হলো তারই সাহায্যে বৈদিক সাহিত্যে টিকে থাকা আদিম ধ্যানধারণার অন্যান্য চিহ্নই বুঝতে পারা যাবে। শুধু তাই নয়, মানবজাতির ক্রমোন্নতি-পথের ঠিক কোন স্তরের চেতনায় লোকায়তিক-বামাচারের উৎস সে-কথা নির্ণয় করা যদি সম্ভব হয় তাহলে হয়তো তারই সাহায্যে অনুমান করা যাবে, বৈদিক সাহিত্যের বামাচারের স্মারকগুলিও ঠিক কোন ধরনের সমাজবিকাশের পরিচায়ক। অর্থাৎ কিনা, বামাচারের ওই স্মারকগুলিই হয়ে দাঁড়াতে পারে একটি নির্দিষ্ট সমাজ-সংগঠনের সাক্ষ্য। তার মানে অবশ্যই এই নয় যে, বৈদিক বামাচার ও লোকায়তিক বামাচার হুবহু একই রকমের। দু’-এর মধ্যে তফাত আছে : বৈদিক বামাচার মূলতই পুরুষপ্রধান—ঝোঁকটা শুধুই পুরুষের উপর, যা কিছু ভাবা হচ্ছে বা বলা হচ্ছে তা পুরুষের তরফ থেকে। যেমন ধরুন, ছান্দোগ্যের ঋষি বলছেন : কোনো স্ত্রীলোককেই পরিহার করবে না। বৃহদারণ্যকের ঋষি আরো এক-পা এগিয়ে যাচ্ছেন; বলছেন, নারী যদি মৈথুনে রাজী না হয় তাহলে কিলঘুঁষি এমনকি লাঠি মেরে তাকে রাজী করাতে হবে। উপনিষদ থেকেই এই পুরুষ-প্রাধান্যের আরো অনেক নজির তোলা যায়। এর তুলনায়, লোকায়তিক বামাচার মূলতই স্ত্রী-প্রধান। স্ত্রীই শক্তি, শক্তিই সব। এই তফাতের কারণ কী?—সে বিষয়ে পরে দীর্ঘতর আলোচনা তুলতে হবে।

আপাতত, বামাচারী চেতনার উৎস-সন্ধানেই অগ্রসর হওয়া যাক। অগ্রসর হবার একটা সূত্র পাওয়া গিয়েছে : গুণরত্ন-বর্ণিত লোকায়তিকদের রতি-উৎসব(২৮)।

সে-বর্ণনাকে ঠিকমতো বুঝতে হলে, নিছক পুঁথিপত্রের বেড়াজালের মধ্যে আবদ্ধ থাকা চলবে না। তাহলে, পুঁথির গণ্ডি পিছনে ফেলে বাস্তব পৃথিবীতেই বেরিয়ে পড়া যাক। দেখা যাক, গুণরত্ন-বর্ণিত ওই লোকায়তিক আচরণের সঙ্গে হুবহু মিল আছে—এমন কোনো দৃশ্য সত্যিই চোখে পড়ে কি না।

পড়ে। আপনি যদি সত্যিই বেরিয়ে পড়তে রাজী হন তাহলে স্বচক্ষে দেখতে আসতে পারবেন। খুব বেশি দূরও যেতে হবে না। বাংলা দেশের সাঁওতাল-অঞ্চল পর্যন্ত গেলেই হবে। পৌষ মাসে যাবেন। ওই সময়টাতেই সাঁওতালদের ওই রকমের উৎসব। কিন্তু মজা হলো, উৎসবটার নামের সঙ্গে আষাঢ় মাসের যোগাযোগ রয়েছে। তার কারণ, উৎসবটা বুঝি আগেকার কালে আষাঢ় মাসেই হতো। সাঁওতালদের স্মৃতিতে আজো সে-কথা টিকে রয়েছে। এই সময়-বদলটা অবশ্যই অহেতুক নয়। আধুনিক গবেষক অনুমান করছেন, এর সঙ্গে চাষবাসের উন্নতির সম্পর্ক আছে(২৯)। অর্থাৎ কিনা, আগেকার কালে তাদের কাছে আউশই ছিলো একমাত্র ফসল। বর্ষার সেই ফলস উপলক্ষেই তাদের উৎসবটা ছিলো বর্ষাকালে। তারপর, আমন বা হৈমন্তিক ফসল ফলাতে শেখবার পরে উৎসবের সময়টা বর্ষা বদলে হেমন্ত হলো।

ছোটোনাগপুরের(৩০) দিকেও যেতে পারেন। এ-ধরনের উৎসব শুধুমাত্র সাঁওতালদের মধ্যেই টিকে নেই। ছোটোনাগপুরের দিকে দেখবেন মুণ্ডা, হো প্রভৃতিদের মধ্যেও এ-উৎসব আজো কী ভাবে বর্তমান। তবে, ওদের উৎসবটা যদি দেখতে চান তাহলে আষাঢ় মাসে বরাবরই যেতে হবে। তার কারণ কি এই যে ওরা এখনো আমন-ফসলটাকে বড়ো ফসল মনে করতে শেখে নি?

আরো নানান দিকে যাওয়া যায়। জয়পুরের দিকে গেলে পাঞ্জাবের মধ্যে এই উৎসব দেখা যায়, নিলগিরির দিকে গেলে দেখা যায় কোটারদের মধ্যে(৩১)। বিদেশ যেতে যদি রাজী হন তাহলে মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া বা ওই রকম আরো নানা জায়গায় এই উৎসবটাই আপনার চোখে পড়বে(৩২)। কিন্তু স্বদেশেই দেখুন আর বিদেশেই দেখুন, একটা ব্যাপার দেখে অবাক হতেই হবে : নির্বিচার মৈথুনের এই যে উৎসব, এর সঙ্গে ফসলের সম্পর্কটা সর্বত্রই ঘনিষ্ঠ।

সাঁওতালরাই সবচেয়ে কাছাকাছি রয়েছে। সাঁওতালদের মধ্যে এ-উৎসব কী ভাবে টিকে আছে তাই দেখা যাক :

Five days are spent in dancing, drinking and debauching. It is significant that at the commencement the village-headman gives a talk to the village people, in which he says that they may act as they like sexually, only being careful not to touch certain women : otherwise they may amuse themselves. The village people reply that they are putting twelve balls of cotton in their ears and will not pay any heed to, nor hear or see, anything. This festival is in many ways a disgrace to this people(৩৬).
অর্থাৎ নাচ, মদ্যপান ও ব্যাভিচারে কাটে পাঁচ দিন। লক্ষ্য করা দরকার যে, শুরুতে গ্রামের মোড়ল গ্রামের সবাইকে ডেকে একটি বক্তৃতায় বলে, মৈথুন ব্যাপারে যা খুসি তাই করতে পারো, কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি নারীকে স্পর্শ করা চলবে না, তাছাড়া মনের সুখে মজা করো। উত্তরে গ্রামের সবাই বলে যে, তারা কানের মধ্যে বারো গোলা তুলো পুরছে,–কোনো দিকে নজর দেবে না, কিছুই শুনবে না, কিছুই দেখবে না—কিছুই নয়। এ-উৎসব ওদের পক্ষে এক কলঙ্ক!

উদ্বৃতির শেষ কথাটি নজর করবেন : আধুনিক কালের লাম্পট্য-ব্যবহারের কাছ থেকে আলো পেয়ে ওদের আচরণটাকে বুঝতে গেলে এ-ধরনের একটা মন্তব্য করা ছাড়া উপায় নেই। ওদের শুধোন, একেবারে অন্য জবাব পাবেন। ডাল্টন(৩৪) সাহেব অনেককাল আগেই সে-জবাব সংগ্রহ করে গিয়েছেন : ফসলের এই সময়টায় ওরা অনুভব করে নিজেদের মধ্যে বীজের ভার। ক্ষেত্রে বীজ ছড়ানো আর নারীর মধ্যে সন্তানের বীজ স্থাপন করা—ওদের চেতনায় দুটো কথা সম্বন্ধহীন নয়।

বাজসনেয়ী সংহিতার মন্ত্রগুলিতেও কি সেই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়? উদ্গাতা বাবাতাকে অভিমেথন করবার সময় ওই বীজবপনের কথাটাই ভাবছে : যেমন কৃষক বায়ুতে ধান্য শুষ্ক করিতে করিতে অকস্মাৎ গ্রহণ এবং বপন করে!

তাহলে সমাজ-বিকাশের প্রাচীন স্তরে আটকে পড়ে-থাকা মানুষদের দিকে চেয়ে দেখলে প্রাচীন সাহিত্যের বামাচারকে বোঝবার সূত্র খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়।

এ-বিষয়ে রাশি রাশি তথ্য সংগ্রহ করেছেন স্যর জেম্‌স্‌ ফ্রেসার এবং তারই ভিত্তিতে তিনি সিদ্ধান্ত করছেন :

…the profligacy which notoriously attended these ceremonies was at one time not an accidental excess but an essential part of the rites, and that in the opinion of those who performed them the marriage of trees and plants could not be fertile without the real union of the human sexes. At the present day it might perhaps be vain to look in civilised Europe for customs of this sort observed for the explicit purpose of promoting the growth of vegetation. But ruder races in other parts of the world have consciously employed the intercourse of the sexes as a means to ensure the fruitfulness of the earth; and some rites which are still, or were till lately, kept up in Europe can be reasonably explained only as stunted relics of a similar practice(৩৫).
মোদ্দা কথায়, পিছিয়ে-পড়া মানুষদের কল্পনা অনুসারে প্রকৃতিকে ফলপ্রসূ করবার কৌশল হলো নরনারীর মৈথুন : মানুষ যদি ফলপ্রসূ হয় তাহলে প্রকৃতিও তাকে অনুকরণ করতে বাধ্য হবে।

বলাই বাহুল্য, আমাদের আজকালকার জ্ঞানের দিক থেকে পিছিয়ে-পড়া মানুষদের ওই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। আমরা আজ অনেক বেশি জেনেছি, অনেক ভালো করে বুঝতে পেরেছি প্রকৃতিকে বাস্তবিকই ফলপ্রসূ করবার প্রকৃত কৌশল কী। কিন্তু যারা পিছিয়ে পড়ে রয়েছে তাদের বেলায় একেবারে আলাদা কথা। আমাদের তুলনায় প্রকৃতির উপর তাদের দখলটা নেহাতই নগণ্য—বাস্তবভাবে তারা আর প্রকৃতিকে কতটুকুই বা জয় করতে শিখেছে? তাই বাস্তব জয়ের দিক থেকে প্রকাণ্ড অভাবটাকে একরকমের কাল্পনিক উপায়ে তারা মেটাতে চায়।

আকাশে বৃষ্টি চাইতে হলে তারা দলবেঁধে নাচতে নাচতে আকাশের দিকে জলের ছিটে ছোঁড়ে। কেন ছোঁড়ে? ওরা ভাবে, এইভাবে আকাশে বৃষ্টির একটা নকল তুললেই আসল বৃষ্টি ডেকে আনা যাবে।

আদিম মানুষের এ-জাতীয় বিশ্বাসকেই বলে ‘ম্যাজিক’ বা যাদুবিশ্বাস। মৈথুন সম্বন্ধে তার ধারণাটাও বুঝতে হবে এই যাদুবিশ্বাসের দিক থেকেই। স্যর জেম্‌স্‌ ফ্রেসার যেমন বলছেন : যে-পদ্ধতি অনুসারে মানুষ সন্তান উৎপাদন করে, আর, যে-পদ্ধতি অনুসারে গাছপালারাও ওই একই কাজ করে—আদিম মানুষ যেন এই দু’রকম পদ্ধতিকে গুলিয়ে ফেলছে, আর ভাবছে প্রথমটিকে যে নিজে সম্পাদন করে দ্বিতীয়টিকেও সম্পাদিত হবার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে(৩৬)।
স্যর জেম্‌স্‌ ফ্রেসারকে অনুসরণ করেই(৩৭) কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেখা যাক :
মধ্য-আমেরিকার পিপিলে বলে আদিবাসীদের কথা : বীজ বোনবার আগের রাতটিতে কামনাকে প্রচণ্ড ভাবে চরিতার্থ করা যায়। এমনকি, যে-মুহূর্তে জমিতে প্রথম বীজ বোনা হবে সেই মুহূর্তে মৈথুন করবার জন্যে কয়েকজনকে বিশেষ করে নিযুক্ত রাখা হয়। পুরোহিতদের নির্দেশ অনুসারে প্রত্যেকেই এই উপলক্ষে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হতে বাধ্য; এমনকি, উক্ত অনুশাসন না মেনে বীজ বুনতে যাওয়াটাকে আইন-গর্হিত মনে করা হয়।
জাভা-দ্বীপের কোনো কোনো গ্রামে ধান পাকবার সময়টিতে কৃষাণ-কৃষাণীরা রাত্রিবেলায় ক্ষেতে যায় ও ক্ষেতের উপরই সহবাস করে।
অস্ট্রেলিয়া আর নিউগিনির মাঝামাঝি দ্বীপপুঞ্জগুলিতে এই জাতীয় বিশ্বাসের সামান্য রকমফের দেখা যায়। ওখানের মানুষদের বিশ্বাস, সূর্য হলো পুরুষ, ধরিত্রী নারী। বছরে একবার করে, বর্ষার মুখে, সূর্য নাকি আকাশ থেকে নেমে আসে ধরণীকে গর্ভবতী করবার জন্যে। আর পুরো পৃথিবী জুড়ে উৎপাদনের যখন এ-রকম মহোৎসব তখন মানুষেরাও মেতে ওঠে ওই একই উৎসবে : নরনারীর মধ্যে অবাধ মিলন চলতে থাকে। ওদের ধারণায়, উৎসবটির উদ্দেশ্য হলো পিতামহ সূর্যের কাছ থেকে বহুল পরিমাণে বৃষ্টি, অন্ন, পশু ও প্রজা পাওয়া। ফ্রেসার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, এই ধরনের অবারিত যৌন-মিলনকে অসংযত যৌনক্ষুধার বিকাশমাত্র মনে করলে ভুল করা হবে। এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে পুরো উৎসবটিকে তারা সযত্নে ও রীতিমতো ভক্তিভরেই সম্পাদন করে, কেননা, তাদের ধারণায় এরই উপর নির্ভর করছে জমির উর্বরতা আর মানুষের মঙ্গল।

স্যার জেম্‌স্‌ ফ্রেসার আরো অজস্র দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আরো দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না—জায়গায় কুলোবে না। উদ্ধৃত করতে পারলে দেখা যেতো এ-জাতীয় বিশ্বাস পৃথিবীর শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একটি জায়গায় আবদ্ধ নয়; যেখানেই আজো মানুষ পিছিয়ে-পড়া দশায় আটকে রয়েছে সেখানেই টিকে আছে এই ধরনের বিশ্বাস। অর্থাৎ, আদিম মানুষের পক্ষে এ-বিশ্বাস সার্বভৌম : কিংবা, যা হয়তো একই কথা, মানুষের আদিম অবস্থার কোনো এক স্তরে এ-বিশ্বাস অনিবার্যও। কেন, তা পরের পরিচ্ছেদে আলোচনা করবো।

আর যদি তাই হয় তাহলে নিশ্চয়ই অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে, আমাদের পূর্বপুরুষেরাও যখন সবেমাত্র ওই রকম কোনো অবস্থা পিছনে ফেলে এগিয়ে এসেছেন তখন তাঁদের ধ্যানধারণা থেকে এ-জাতীয় বিশ্বাসের চিহ্ন সম্পূর্ণ ভাবে মুছে যায় নি। আর যেহেতু তাঁরা নিজেদের ধ্যানধারণাগুলিকে অমর করে রেখে গিয়েছেন পুঁথির পাতায় বা মন্দিরের ভাস্কর্যে সেইহেতুই আমরা আজো সেগুলির স্পষ্ট স্বাক্ষর স্বচক্ষে দেখতে পাই। কেবল ভুলে যাই, তাঁদের উদ্দেশ্য আর আমাদের উদ্দেশ্য এক হবার কথা নয়।

তাই, বেদের মন্ত্র শুনলে পরের যুগে প্রায়শ্চিত্ত করবার কথা ওঠে।

তাই, মন্দিরের গায়ে ভাস্কর্য(৩৮) দেখতে গিয়ে আজ চোখ নামিয়ে নিতে হয়।

একাল আর সেকালের তফাতটা তো সত্যিই বড়ো কম নয়! বলাই বাহুল্য, প্রাচীন বলেই সেকালের ধারণাকে নির্বিচারে শ্রদ্ধা করবার কথা উঠছে না। কিন্তু এ-কথাও মনে রাখা উচিত যে, একালের মনোভাব নিয়ে সেকালকে বিচার করলে প্রাচীনদের প্রতি অবিচার করা হবে।

বাজসনেয়ী সংহিতার বা উপনিষদের ঋষিরা যা বলেছেন তা ঠিক না ভুল সে-আলোচনা স্বতন্ত্র। আমরা শুধু এইটুকুই বলতে চাই যে, তাঁরা যা ভাবেন নি, সে-ভাবনাটা তাঁদের রচনায় আরোপ করাটা ভুল।

তাঁরা অশ্লীল সাহিত্য রচনা করেন নি। তাঁরা লাম্পট্য বর্ণনা করেন নি। তাঁরা নিজেদের জ্ঞান অনুসারে যা উদ্দেশ্যমূলক মনে করেছেন তাই লিখে গিয়েছেন। মৈথুন তাঁদের ধারণায় যজ্ঞের সমান, সামগানের সমান, একমাত্র ব্রতের সমান। কেননা, তাঁদের ধারণায় এরই উপর নির্ভর করছে শুধুমাত্র সন্তান পাবার সম্ভাবনা নয়, সব কিছুই : মিথুনাম্মিথুনাৎ প্রজায়তে সর্ব্বমায়ুরেতি জ্যোগ্‌ জীবতি মহান্‌ প্রজয়া পশুভির্ভিবতি মহান্‌ কীর্ত্ত্যা…

———————-
২৭. এই গ্রন্থের তৃতীয় পরিচ্ছেদের “লোকায়ত-প্রসঙ্গে সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত” শিরোনামের পর্ব।
২৮. ঐ।
২৯. JAS (s) XIX-1953 No. 1, Page 7.
৩০. E. T. Dalton DEB 196.
৩১. E. Westermarck HHM 30.
৩২. Ibid cf. J. Frazer GB ch. Xi.
৩৩. JAS (s) XIX-1953 No. 1, Page 7.
৩৪. E. T. Dalton op. cit. 196.
৩৫. J. Frazer GB 135-6.
৩৬. Ibid. cb. Xi.
৩৭. Ibid.
৩৮. এই গ্রন্থের তৃতীয় পরিচ্ছেদের “তন্ত্রের দেহতত্ত্ব” শিরোনামের পর্ব।

০৭. লোকায়ত, বৈষ্ণব, সহজিয়া

অবশ্যই, লোকায়ত নিয়ে সমস্যাটা শুধুমাত্র প্রাচীন ইতিহাসের সমস্যা নয়। কেননা, খুব পুরোনো কালের লেখায় লোকায়তিকদের উল্লেখ পাওয়া গেলেও, লোকায়ত বলতে শুধুমাত্র প্রাচীন কালের কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ বোঝা উচিত নয়।

এ-বিষয়ে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মন্তব্য উল্লেখ করেছি। তিনি দেখাচ্ছেন, আজো ভারতবর্ষের নানান জায়গায় নানান রকম নামের আড়ালে ওই লোকায়ত আর কাপালিক মতবাদ টিকে রয়েছে। বিশেষ করে তিনি দুটি সম্প্রদায়ের কথা তুলছেন, বৈষ্ণব আর সহজিয়া। এই যে বৈষ্ণব সম্প্রদায়, এ-হলো নামেই বৈষ্ণব—কেননা, বিষ্ণু কিংবা কৃষ্ণ অবতারের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কই নেই। তার বদলে, এ-জাতীয় সম্প্রদায়গুলির কাছে দেহতত্ত্বই হলো চরমতত্ত্ব, সাধনা বলতে সবটুকুই কামসাধনা।

অতএব, মহামহোপাধ্যায় বলছেন, এ-জাতীয় সম্প্রদায়গুলিকে লোকায়তিক আখ্যাই দিতে হবে।

কিন্তু যে-লোকায়ত চিন্তাধারা দেহতত্ত্বের গানে, সহজিয়া, তন্ত্র বা ওই ধরনের অজস্র নামের আড়ালে, দেশের পিছিয়ে-পড়া অঞ্চলে এবং সামাজিক মর্যাদাহীন নিচু স্তরের মানুষদের মধ্যে আজো এ-ভাবে টিক রয়েছে তার সঙ্গে মাধবাচার্য বর্ণিত ওই ধারালো, মার্জিত দার্শনিক মতবাদটির সম্পর্ক ঠিক কী?

সম্পর্কের একটা নমুনা দেখুন :

এ ব্রাহ্মণ বুঝি নদীতে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি ভরে জল নিয়ে তর্পণ করছিলো। তাই দেখে সহজিয়ারা গান(৩৯) গেয়ে বলছে : ওগো বামুন, এতো সহজেই যদি সুদূর পরলোক পর্যন্ত জল পাঠাতে পারো তাহলে কাছে পিঠে ওই যে চাষের ক্ষেত সেখানে জল পৌঁছে দেবার জন্যে আর হাঙ্গামা করা কেন?

যাগযজ্ঞ সম্বন্ধে লোকায়তিকদের যে-সব তীব্র বিদ্রুপের বর্ণনা মাধবাচার্য দিয়েছেন সহজিয়াদের এই গান প্রায় হুবহু সেই রকমের নয় কি? মাধবাচার্য(৪০) লিখেছেন, লোকায়তিকেরা বলে শ্রাদ্ধপিণ্ড যদি পরলোকে কারুর ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করতে পারে তাহলে গ্রামান্তরে যাবার সময় চিঁড়েমুড়ির পোঁটলাটাকে সঙ্গে নিয়ে যাবার দরকার কি?

কিন্তু শুধু সহজিয়াই নয়। দেহবাদী নানান সম্প্রদায় আজো আমাদের দেশে বেঁচে রয়েছে। লোকায়ত-দর্শন বুঝতে হলে এগুলিকেও ঠিকমতো বুঝতে হবে।

—————-
৩৯. H. P. Shastri op. cit, 4.
৪০. সর্বদর্শনসংগ্রহ ৫।

০৮. পদ্ধতির পরিচয়

শুরুতেই বলেছি, লোকায়ত দর্শন নিয়ে যতো রকমের সমস্যা ওঠে তা সবই সমাধান করা আমাদের যোগ্যতায় নেই। প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস সংক্রান্ত গবেষণার বর্তমান অবস্থায় তা কতোখানি সম্ভব তাও হয়তো অনেকটাই সন্দেহের কথা।

সমস্যা যে ওঠে এবং সমস্যা যে বহু রকমের, ভারতীয় দর্শনের সাধারণ ইতিহাসে সে-কথার স্বীকৃতি নেই। মহামহোপাধ্যায়ের রচনা অনুসরণ করে দেখাবার চেষ্টা করলাম সমস্যাগুলিকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে এবং সেগুলির সমাধান খোঁজ করা দরকার। এবং সমাধান খোঁজ করবার পদ্ধতিটি কী রকম হতে পারে তারও কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া গেলো সমস্যাগুলির সূত্র ধরে এগোতে-এগোতে : পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষের ধ্যানধারণা থেকে প্রাচীন পুঁথিপত্রের অনেক কথা এবং অনুন্নত মানুষদের অনেক ক্রিয়াকর্মকে বোঝবার সুযোগ হতে পারে।

এ-পদ্ধতি খুবই মূল্যবান।

এ-পদ্ধতি অনুসরণ শুধু যে লোকায়ত-দর্শন প্রসঙ্গেই প্রয়োজন তাই নয়, প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের অনেক অন্ধকার গুহা, প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের অনেক জটিল সমস্যা, প্রাচীন পুঁথিপত্রে লেখা অনেক দুর্বোধ্য কথা—এ-পদ্ধতির সাহায্যে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে।

শুরুতে তাই পদ্ধতির সম্যক পরিচয় প্রয়োজন।

কিন্তু পদ্ধতিটিকে বোঝবার ব্যাপার সুবিধে হবে এটির কোনো মূর্ত প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করলে। উপনিষদেরই একটি দুর্বোধ্য পরিচ্ছেদের উপর প্রয়োগ করে পদ্ধতিটির পরিচয় পাবার চেষ্টা করা যাক। লোকায়ত-দর্শনের দিক থেকেও উপনিষদের এই পরিচ্ছেদটি অবান্তর হবে না। কেননা, তার মধ্যে যে-দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে তাকে বস্তুবাদী বা লোকায়তিকই বলতে হবে

০৯. অথ কুকুরস-সম্বন্ধী সামগান

ছান্দোগ্য-উপনিষদের প্রথম অধ্যায়ের একাদশ খণ্ডে একটি অদ্ভুত, ও আপাতঃ- অর্থহীন, বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের ধারণায় এর অর্থনির্ণয় করা সম্ভব, কিন্তু তার জন্যে নতুন প্রদ্ধতির প্রয়োজন। সে-পদ্ধতির পরিচয় হিসেবে উপনিষদের এই অংশটুকুর উপর পদ্ধতিটির প্রয়োগ করবার চেষ্টা করা যাক। ছান্দ্যোগ্য লেখা আছে :

অতএব এখন কুকুর সম্বন্ধীয় সামগান (উদগীথ)। তখন বক দালত্য, ওরফে অতৃপ্ত (গ্লাব) মৈত্রেয়, স্বাধ্যায়ে (=বেদজ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে) বেরিয়েছিলেন।।১।১২।১।।
তাঁর কাছে শ্বেতবর্ণ কুকুর আবির্ভূত হলেন। অন্য কুকুরেরা তাঁর (=সেই শ্বেতবর্ণ কুকুরের) কাছে গিয়ে বললো, “ভগবান, আমাদের অন্নের জন্য গান করুন। আমরা ভোজন করতে চাই।।১।১২।২।।
সেই সাদা কুকুর অন্য কুকুরদের বললেন, “ভোর বেলায় এইখানে আমার কাছে সমাগত হয়ো।” বক দালভ্য, ওরফে অতৃপ্ত মৈত্রেয়, অপেক্ষা করে রইলেন।।১।১২।৩।।
বহিষ্পবমানের সাহায্যে স্তোষ্যমান অবস্থায় যেমন পরস্পরের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে সর্পিল গতিতে নড়াচড়া করা হয় (সর্পন্তি), তারা (=সেই কুকুরেরা) তেমনি গতিতে ঘুরলো (আসসৃপু)। তারপর তারা (=সেই কুকুরেরা) একত্রিত হলে ও হিং (হিংকার) করলো।।১।১২।৪।।
(তারা গান করতে লাগলো) “ওম, আমরা ভোজন করি। ওম্‌ আমরা পান করি। ওম্‌ দেবতা বরুণ, প্রজাপতি, সবিতা এইখানে অন্ন আহরণ করিতেছিলেন। হে অন্নপতি, এইখানে অন্ন আহরণ করো। ওম্‌।” ইতি।।১।১২।৫।।

শব্দার্থের দিক থেকে কয়েকটা কথা গোড়ায় বলে নেওয়া দরকার।

সামগানের পাঁচ ভাগে বা পাঁচ স্তরে ভাগ করা হয় : হিংকার, প্রস্তাব, উদগীথ, প্রতিহার ও নিধন। অধ্যাপক আর. ই. হিউমের(৪১) তর্জমা অনুসারে : হিংকার=preliminary vocalizing, প্রস্তাব=introductory praise, উদগীথ=loud chant, প্রতিহার=response, নিধন=conclusion।

বহিষ্পবমান স্তোত্র। প্রথমত, স্তোত্র : “যাহা গান করা যায় তাহার নাম স্তোত্র।”(৪২) দ্বিতীয়ত, বহিষ্পবমান : যজ্ঞবিশেষে ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলের একাদশ সূক্তটি গান করবার সময়, পাঁচজন ঋত্বিক (অধ্বষ্যু, প্রস্তোতা, প্রতিহর্তা, উদগাতা ও ব্রহ্মা) ও তারপরে যজমান হাত ধরাধরি করে চত্তাল অভিমুখে প্রসর্পণ করেন, সকলে উপবেশন করলে পর হোতা তাঁদের অনুমন্তন করেন।

স্বাধ্যায়। এ-কথার চলতি মানে হলো প্রাথমিক বেদজ্ঞান। সু+আ=অধ্যায়ম্‌। কিন্তু অন্য ভাবেও এই শব্দ নিষ্পন্ন হতে পারে : স্ব+অধ্যায়ম্‌, অর্থাৎ, নিজে নিজে অধ্যয়ন।

বক দালভ্য, ওরফে, গ্লাব মৈত্রেয়। বক মানে বক, যদিও কিনা মানুষের নাম যে কি করে বক হতে পারে এ-নিয়ে আধুনিক পণ্ডিতেরা কিছুটা মুস্কিলে পড়েছেন। তাই, তর্জমা করবার সময় মক্ষমুলার(৪৩) করছেন Vaka, “বাক”। অধ্যাপক হিউম(৪৪) করছেন Baka। কিন্তু যাঁরা উপনিষদ লিখেছিলেন তাঁরা Vakaও লেখেন নি, Bakaও লেখেন নি; শুধু “বক”ই লিখেছেন। দালভ্য : এ-নামটার শব্দার্থ যাই হোক না কেন, মহৎ পাণ্ডিত্যের সঙ্গে এর যোগাযোগ আছে। কেননা, ছান্দোগ্য-উপনিষদেই(৪৫) একটু আগে লেখা হয়েছে : মাত্র তিনজন উদগীথ-বিদ্যায় কুশল ছিলেন—শালাবত্য শিলক, দালভ্য চৈকিতায়ন এবং প্রবাহন জৈবলি। অবশ্যই, দালব্য বক এবং দালব্য চৈকিতায়ন—দু’-এর মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিলো কিনা সে-কথা উপনিষদে লেখা নেই। কিন্তু, তাহলেও, বক দালভ্যও খুব কম পণ্ডিত ছিলেন না। ছান্দোগ্য-উপনিষদের অন্যত্র সে-কথা লেখা আছে(৪৬)। গ্লাব মানে অতৃপ্ত—এই মানেটাই মনে রাখা ভালো। অতৃপ্ত বলেই তিনি স্বাধ্যায়ে বেরিয়েছিলেন।

 

এইবার শব্দার্থের কথা ছেড়ে পুরো বর্ণনাটুকুর তাৎপর্য সন্ধান করা যাক। মনে রাখবেন, এটি হলো ছান্দোগ্য-উপনিষদের প্রথম অধ্যাএর একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ খণ্ড এবং উপনিষদে এই পরমাশ্চর্য দৃশ্যটির কথা যেমনি খাপছাড়া ভাবে অবতারণা করা হলো তেমনি খাপছাড়া ভাবেই তা শেষ হয়ে গেলো।

কুকুরদের কথা হঠাৎ উঠলো, হঠাৎ শেষ হলো—সারা উপনিষদটিতে তাদের আর কোথাও খুঁজে পাবেন না! ব্যাপারটা কী? উপনিষদের আধুনিক টীকাকারেরা বলছেন, পুরো ব্যাপারটাই হলো প্রকাণ্ড পরিহাস। কাদের সম্বন্ধে পরিহাস? যজ্ঞের পুরোহিতদের সম্বন্ধে। পরিহাস কেন? কেননা, এঁরা ধর্মের নামে পানাহারে প্রমত্ত হয়ে উঠেছিলেন। বস্তুত, আধুনিক পণ্ডিতদের কাছে একটি প্রিয় মতবাদ হলো, বৈদিক যুগের পর দেশে যখন ব্রাহ্মণ-পুরোহিতেরা ক্রিয়াকাণ্ড নিয়ে প্রচণ্ড মাতামাতি করছেন তখনই উপনিষদের ঋষিরা তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ তোলেন(৪৭)। তাঁরা যজ্ঞীয় ক্রিয়াকর্মের নিন্দা করে ব্রহ্মজ্ঞানকেই পরম পুরুষার্থ বলে ঘোষণা করতে চাইলেন। ফলে, যজ্ঞীয় ক্রিয়াকর্মকে বিদ্রুপ করাই তাঁদের পক্ষে স্বাভাবিক।

আধুনিক কালে পণ্ডিত মহলে এই মতবাদটির জনপ্রিয়তা যতোই হোক না কেন, উপনিষদকে এই ভাবে বুঝতে যাওয়া সত্যিই চলে কিনা সে-বিষয়ে অজস্র প্রশ্ন ওঠে(৪৮)। আপাতত আমাদের পক্ষে সে-সব প্রশ্নের আলোচনায় প্রবেশ করা সম্ভব নয়। তার বদলে উপনিষদের আলোচ্য অংশটিকেই খুঁচিয়ে বিচার করবার চেষ্টা করা যাক।

আধুনিক পণ্ডিতদের মতবাদের নমুনা হিসেবে এই অংশ উপলক্ষেই স্যর সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণণ কী লিখেছেন দেখুন :

There are occasions when the sacrificial and priestly religion strikes them as superficial, and then they give vent to all their irony. They describe a procession of dogs to march like a procession of priests each holding the tail of the other in front and saying, “Om! Let us eat. Om, let us drink…”(৪৯) etc.
অর্থাৎ, তাঁদের কাছে মাঝে মাঝে যজ্ঞমূলক ব্রাহ্মণ্যধর্ম নেহাৎ বাহ্য ব্যাপার বলে মনে হয়েছে এবং তখন তাঁরা তাঁদের সবটুকু বিদ্রুপ উজোড় করে দিয়েছেন। পুরোহিতদের মিছিলকে তাঁরা একদল কুকুরের মিছিলের মতো বর্ণনা করেছেন,–ওই কুকুরদের প্রত্যেকেই সামনের কুকুরের লেজ কামড়ে ধরেছে আর বলছে : “ওম্‌ আমরা ভোজন করি। ওম্‌ আমরা পান করি”। ইত্যাদি

স্যর সর্বপল্লি ছাড়াও আধুনিক যুগের প্রায় সমস্ত পণ্ডিতই(৫০) একবাক্যে বলছেন : ছান্দোগ্যের এ-অংশ পুরোহিত-শ্রেণীর ক্রিয়াকাণ্ড নিয়ে বিদ্রুপ না হয়ে যায় না!

কিন্তু প্রশ্ন হলো, উপনিষদের মানে করবার সময় উপনিষদে যা লেখা আছে শুধুমাত্র তার উপরই দৃষ্টি আবদ্ধ রাখতে হবে, না, অজস্র আধুনিক কল্পনাকে উপনিষদের উপর চাপিয়ে দেওয়া চলবে? ওঁরা বলছেন, বিদ্রুপ। কিন্তু বিদ্রুপের ছিটে-ফোঁটাও কি আপনি উপনিষদে যা লেখা আছে তার মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন? উদ্ধৃত অংশটিকে ভালো করে পরীক্ষা করুন; দেখবেন, বিদ্রুপ তো দূরের কথা লেখকের কাছে পুরো অংশটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমূলক। মনে রাখবেন, দালভ্য একজন প্রকাণ্ড পণ্ডিত লোক এবং তিনি অতৃপ্ত হয়ে জ্ঞানান্বেষণে বেরিয়েছিলেন। আর তাঁকে বেদজ্ঞান দেবার প্রসঙ্গেই পুরো দৃশ্যটির অবতারণা করা হয়েছে।

বিদ্রুপ তো আর বললেই হলো না।

ওঁরা বলবেন, তা কেন? বিদ্রুপ না হলে যারা বহিষ্পবমান স্তোত্রের মতো করে গান গাইছে তাদের কুকুর বলে বর্ণনা করা হবে কী করে? উপনিষদে লেখা আছে : কুকুর। সে-বিষয়ে তো আর সন্দেহ নেই! আর, আমি-আপনি যদি কাউকে কুকুর বলি তাহলে নিশ্চয়ই খুব খাতির দেখাবার উদ্দেশ্যে বলি না!

————–
৪১. R. E. Hume TPU 191
৪২. ঐতরেয় ব্রাহ্মণ (রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী) ১৩৮।
৪৩. SBE. 1:21.
৪৪. R. E. Hume op. cit. 188.
৪৫. ছান্দোগ্য উপনিষদ : ১.৮.১।
৪৬. ঐ : ১.২.১৩।
৪৭. S. Radhakrishnan IP 1:149.

১০. কুকুর মানে কী?

তাহলে, ওই হল আসল প্রশ্ন : উপনিষদের ওই কুকুর কথাটির মানে কী!

কুকুর মানে কুকুর। আবার কী?—এই হলো আধুনিক পণ্ডিতদের বলবার কথা। আর, কুকুরই যদি হয় তাহলে তাদের লেজ থাকবে না কেন? অবশ্যই, উপনিষদের ঋষিরা লেজের কথা লিখতে ভুলে গিয়েছিলেন। আধুনিক টীকাকারেরা যেন ভ্রম-সংশোধন হিসেবেই লেজের কথাটুকু জুড়ে দিচ্ছেন : পেছনের কুকুর তার সামনের কুকুরের লেজ কামড়ে ধরলো, ইত্যাদি।

লেজের উপাখ্যানটি ছোটো নয় ; এ-লেজ শঙ্কর-ভাষ্য(৫১) থেকে গজাতে শুরু করে মক্ষ্মূলারের গ্রন্থাবলী হয়ে স্যর সর্বপল্লীর “ভারতীয় দর্শন” পর্যন্ত এসে পৌঁচেছে।

কিন্তু আমাদের ওই একই মন্তব্য : উপনিষদের ব্যাখ্যা করা মানে উপনিষদ রচনা করা নয়। লেজের উল্লেখ যদি উপনিষদে না থাকে তাহলে তর্জমা করতে গিয়ে, কিংবা, টীকা করতে গিয়ে লেজ রচনা করার সুযোগ নেই। তার বদলে, উপনিষদে ঠিক কী লেখা আছে? লেখা আছে, কুকুরেরা এক সাদা কুকুরের কাছে গিয়ে বললো, আমরা ভোজন করতে চাই, আমাদের অন্নার্থে গান দিন। অন্নং নঃ ভগবান আগায়তু, আশনায়াম্‌ ইতি। আর শেষ পর্যন্ত সত্যিই তারা দল বেঁধে গান করতে শুরু করলো : আমরা ভোজন করি, আমরা পান করি, ইত্যাদি।

এখন এতো ব্যাপার কি সত্যিই কুকুরের পক্ষে সম্ভব? নিশ্চয়ই নয়। পুরাকালেও নয়। সেকালের কুকুরেরা যে অন্ন চাইতো এবং অন্নের উদ্দেশ্যেই দল বেঁধে গান গাইতো—এমন কথা নিশ্চয়ই কেউই বিশ্বাস করবেন না।

আর একটা সম্ভাবনা আছে। উপনিষদের এই অংশে যাদের কথা বলা হয়েছে তারা আসলে সত্যিকারের কুকুরই নয়। তার বদলে মানুষ।

এবং মানুষ হলেও তাদের কুকুর বলে উল্লেখ করবার পেছনে কোনো রকম ঠাট্টা-বিদ্রুপের উদ্দেশ্য নেই।

কিন্তু তাও কি সম্ভব? মানুষকে নিছক জন্তু-জানোয়ার মনে করা হচ্ছে, অথচ তা স্বাভাবিক ভাবেই! তার মূলে কোনো রকম বিদ্রুপ-বিতৃষ্ণার লক্ষণ নেই?

আজকের দিনে অবশ্যই তা সম্ভব নয়। কিন্তু উপনিষদের এ-অংশ তো আজকের দিনের লেখা নয়। উপনিষদের এই অংশে যাদের উল্লেখ করা হচ্ছে তারাও কেউ আধুনিক কালের মানুষ নয়। অপরপক্ষে, বৈদিক সাহিত্যের দিকে ভালো করে নজর করুন। দেখবেন, জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকে কতো স্বাভাবিক ভাবেই একান্ত মানবীয় ব্যাপারগুলির নামকরণ করবার নমুনা পাওয়া যাচ্ছে। তাই, আধুনিক মনোভাবটাকেই আপনি যদি একমাত্র মনোভাব মনে করেন তাহলে প্রাচীনদের ওই ব্যবহারটির কোনো অর্থ খুঁজে পাবেন না।

কয়েকটা নমুনা দেখা যাক।

সাদা খচ্চোর : আজকের দিন আমি-আপনি নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তি বা কোনো বস্তু সম্বন্ধে সমীহ দেখাবার মনোভাব নিয়ে এমনতরো নাম ব্যবহার করবো না। কিন্তু একটা বই-এর নাম যদি তাই দেওয়া হয়? তাহলে আজকের দিনে নিশ্চয়ই সরাসরি বলে দেওয়া যাবে, বইটার বিরুদ্ধে বিদ্রুপমূলক মনোভাবের বিকাশ হিসেবেই এ-রকম নাম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রাচীন কালের ব্যাপারই আলাদা। একটি উপনিষদের নাম সত্যিই সাদা খচ্চোর : শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ। অথচ ঠাট্টা নয়, বিদ্রুপ নয়,–নামকরণের মধ্যে কোনো রকম বিরূপ ভাবের প্রকাশই নেই।

আর শুধু খচ্চোরই বা কেন। প্রাণীজগতের আরো সব অদ্ভুত অদ্ভুত বাসিন্দাদের খুঁজে পাবেন বৈদিক-সাহিত্যের রকমারি নামের মধ্যে। অপর একটি উপনিষদের নাম গ্রহণ করা হয়েছে ব্যাঙ থেকে : মাণ্ডুক্য উপনিষদ। কিন্তু এই নামের জন্যে উপনিষদ-সাহিত্যে তার মর্যাদা এতোটুকুও কম নয়। শঙ্করাচার্যের গুরু গৌড়পাদ এরই কারিকা রচনা করে অমর হয়েছেন।

উপনিষদ থেকে আরো এক-পা পিছু হটে যদি সংহিতার রাজ্যে প্রবেশ করেন তাহলে আপনার মনে হতে পারে নামজগতের এক অদ্ভুত চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করেছেন বুঝি! নমুনা দেখুন :

সংহিতাগুলির নানান শাখা-উপশাখার নাম পাওয়া যায়, যদিও অবশ্য অনেক শাখাই আজ বিপুপ্ত হয়েছে এবং যে-সব নাম টিকে রয়েছে তার মধ্যে অনেক নামেরই কোনো রকম মানে খুঁজে পাওয়া জা দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একটা ব্যাপার দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই : এতো সব নামের মধ্যে যে-গুলির মানে ঠাহর করা আজো সম্ভবপর সেগুলির প্রায় প্রত্যেকটির পশুজগৎ বা উদ্ভিদ-জগৎ থেকে পাওয়া।

ঋগ্বেদের যে-একমাত্র শাখা আজো বিলুপ্ত হয় নি তার নাম হলো শাকল। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে(৫২) লেখা আছে, শাকল হলো এক রকম সাপের সেকেলে নাম। শৌনক প্রণীত প্রাতিশাখ্য(৫৩) অনুসারে, এ-ছাড়াও ঋগ্বেদের আরো চারটি শাখা ছিলো : বাস্কল, আশ্বলায়ন, সাঙ্খ্যায়ন ও মাণ্ডুক। এর মধ্যে মাণ্ডুক নামটিকে বুঝতে অসুবিধে হয় না। বেদজ্ঞরা ভেবে দেখতে পারেন, দুটি শাখার নামের যে-মানে পাওয়া যায় তারই আলোয় বাকি তিনটির কোনো মানে উদ্ধার করা সম্ভব কিনা।

পুরাণে(৫৫) আছে, এককালে সামবেদের সহস্রাধিক শাখা ছিলো। ইন্দ্র বজ্রাঘাতে সেই শাখাগুলি বিনষ্ট করেন। ইন্দ্রের এই অদ্ভুত আচরণের তাৎপর্য খোঁজা আপাতত আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তার বদলে দেখা যাক, ইন্দ্রের বজ্রাঘাত সত্ত্বেও যে-সাতটি শাখা টিকে থাকলো বলে বলা হয়েছে সেগুলির নাম কী রকম : কৌথুমী (বা কৌথুম), রাণ্যায়ণীয় (বা রাণ্যায়ণ), শাট্যমুগ্র, কাপোল, মহাকাপোল, লাঙ্গলিক, শার্দূলীয়। এই সপ্তম নামটি যে বাঘ থেকেই এসেছে তা বোঝবার জন্যে স্যর মনিয়ার-উইলিয়ম্‌স্‌-এর অভিধান ঘাঁটতে হবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাঁর ওই মহামূল্যবান অভিধানটিকে তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও এক লাঙ্গলিক ছাড়া আর কোনো নামের শব্দার্থ পাওয়া যায় না। কিন্তু এ-নামটির যে-অর্থ পাওয়া যায় তা চিত্তাকর্ষক : লাঙ্গলিক মানে নাকি একরকম ভেষজ(৫৫)।

কৃষ্ণ-যজুর্ব্বেদের একটি শাখার নাম তৈত্তিরীয় সংহিতা। এ-নাম যে তিতির পাখি থেকে এসেছে সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। শুক্ল-যজুর্ব্বেদের যে-শাখার নাম বাজসনেয়ী সংহিতা তা বাজ বা তেজি ঘোড়া থেকে এসেছে কিনা ভেবে দেখা দরকার। কৃষ্ণ-যজুর্ব্বেদের অপর শাখার নাম মৈত্রায়ণী সংহিতা, তার কয়েকটি উপশাখার নাম খুবই চিত্তাকর্ষক : মানব, বরাহ, ছাগলেয়, হারদ্রবীয়, দুন্দুভ, শ্যামায়ণীয়।

অথর্ব্ববেদের কয়েকটি শাখার নাম : পৈপ্পল, শৌনকীয়, তোত্তায়ন, ব্রহ্মপালাশ। এগুলির মধ্যে পৈপ্পল নামটি যে পিপুল গাছ থেকে এসেছে সে-বিষয়ে কোনো রকমই সন্দেহের অবকাশ নেই। বাকিগুলির কোনোটি কোনো জন্তু-জানোয়ারের বা কোনো গাছগাছড়ার কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে কিনা ভালো করে ভেবে দেখা দরকার।

আমরা বলতে চাই, পাঁচটা দৃষ্টান্তের মধ্যে যদি একটাকেও স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায় আর বাকি ক’টাকে বোঝা না যায় তাহলে যেটা বোঝা যাচ্ছে তারই সাহায্যে যে-ক’টাকে বোঝা না সেই ক’টাকে বোঝবার চেষ্টা করতে হবে। কিংবা, অন্তত এটুকু তো নিশ্চয়ই দাবী করা যায় যে, যা-অস্পষ্ট তার সাক্ষ্য যা-স্পষ্ট তার সাক্ষ্যকে উড়িয়ে দিতে পারে না। সংহিতা-সাহিত্যের অন্তত কয়েকটি দৃষ্টান্তের বেলায় আমরা স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি যে, নামগুলি সরাসরি জন্তু-জানোয়ার, কিংবা, গাছগাছড়া থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে। বাকিগুলির অর্থ যদি এমন বোঝা না-ও যায় তাহলেও কি সেগুলির পক্ষে একই রকম উৎপত্তি হওয়া স্বাভাবিক নয়?

আর, এই কথাটি মনে রেখে আধুনিক পণ্ডিতদের যুক্তিটাকে বিচার করে দেখুন  : ছান্দোগ্যের ঋষি যে-হেতু আলোচ্য দৃশ্যটিকে কুকুর-সম্বন্ধীয় সামগান বলে বর্ণনা করছেন সেই হেতু উদ্দেশ্যটা ঠাট্টা-তামাসা ছাড়া আর কী হতে পারে? এ-যুক্তি নেহাতই অচল এবং মূলে রয়েছে সেকালের রচনাতেও একালের মনোভাব কল্পনা করার চেষ্টা। কিন্তু সেকালের রচনায় একালের মনোভাব যে কল্পনা করা চলবে না তার প্রমাণ হলো, সেকালের ঋষিরা যে-গ্রন্থগুলিতে নিজেদের চূড়ান্ত জ্ঞান প্রকাশ করেছেন সেইগুলিরই নামকারণ করবার সময় সাপ, ব্যাঙ, বাঘ, ছাগল, তিতির, খচ্চোর ইত্যাদি নানান রকমের জানোয়ারেরই শরণাপন্ন হয়েছিলেন। এবং তার জন্যে যে তাঁদের কোনো রকম কুণ্ঠা ছিলো সে-কথা পুরোনো পুঁথির কোথাও লেখা নেই।

তাই, আধুনিক পণ্ডিতদের ওই যুক্তিটিকে যদি সত্যই গুরুত্ব দিতে হয় তাহলে মানতেই হবে, বৈদিক ঋষিরা নিজেদের যে কীর্তিগুলিকে সবচেয়ে মহান ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন সেগুলি সম্বন্ধেই তাঁরা বিদ্রুপ-পরিহাসে মুখর হয়ে উঠেছিলেন!

তাহলে, ছান্দোগ্য-উপনিষদের ওই অংশটিতে কতকগুলি মানুষকে যে কুকুর বলে উল্লেখ করা হয়েছে তার কারণ বিদ্রুপ বা পরিহাস নয়। আর বিদ্রুপ বা পরিহাস যদি নাই হয় তাহলে বর্ণনাটিকে সহজ ও স্বাভাবিক বলেই স্বীকার করতে হবে। তার মানে, স্বাধ্যায়ের আশায় বেরিয়ে গ্লাব মৈত্রেয়, ওরফে, বক দালভ্য নামের বিদ্বান ব্যক্তিটি যাদের সামগান শুনে এলেন তাদের সহজ ও স্বাভাবিক পরিচয় হলো : কুকুর।

কিন্তু সত্যিই কি কোনো মানবদলের সহজ ও স্বাভাবিক পরিচয় কুকুর হওয়া সম্ভব?

নিশ্চয়ই সম্ভব, যদিও অবশ্যই আমাদের আধুনিক সমাজে নয়,–প্রাচীন সমাজে।

আমাদের এই ভারতবর্ষেই এমন অনেক মানবদলের খবর পাওয়া যায় যাদের নাম কুকুর এবং শুধুই কুকুর।

সেকালের লেখা পুঁথিপত্রে এ-জাতীয় খবর পাওয়া যায়। এমন কি একালেও যারা পিছিয়ে-পড়া বা সেকেলে অবস্থায় আটকে রয়েছে তাদের যদি স্বচক্ষে দেখেন তো দেখবেন তাদের মধ্যেও এই নামটি একেবারেই দুর্লভ নয়।

প্রথমে দেখা যাক প্রাচীন পুঁথিতে কী লেখা আছে।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে(৫৬) খুবই সোজাসুজি কুকুর নামের মানুষদের কথা বলা হয়েছে : কৌটিল্য বলছেন, ‘রাজশব্দোপজীবী’ সংঘগুলির মধ্যে একটির নাম কুকুর। হরিবংশের(৫৭) অষ্টত্রিংশ অধ্যায়ের নামই হলো কুকুরবংশবর্ণন। মহাভারতের সভাপর্বে লেখা আছে, যাবদগণের একটি শাখার নাম কুকুর : “এইরূপে কুকুর, অন্ধক ও বৃষ্ণিগণ ‘দুর্বল ব্যক্তি বলবানের সহিত স্পর্ধা করিবে না’ এই নীতিবাক্যের অনুসরণ ক্রমে মহাবীর জরাসন্ধকে তৎকালে উপেক্ষা করিয়াছিলেন”(৫৮)। ভীষ্মপর্বের নবন অধ্যায়ে(৫৯) ধৃতরাষ্ট্রের কাছে ভারতবর্ষের নানারকম মানুষের বর্ণনা দিতে দিতে সঞ্জয় কুকুর নামের একদল মানুষের উল্লেখ করছেন। সভাপর্বে(৬০), যুধিষ্ঠিরের কাছে যারা উপহার বহন করে আনছে বলে বর্ণিত হয়েছে তাদের মধ্যে একদল মানুষকে স্বাভাবিক ভাবেই কুকুর বলা হয়েছে। তাহলে, প্রাচীন পুঁথিপত্রেই দেখা যায় মানবদলের নামও কুকুর হওয়া অসম্ভব নয়, এবং উল্লেখিত দৃষ্টান্তের কোথাও লোকগুলিকে হেয় প্রতিপন্ন করবার জন্যে ইচ্ছে করেই, গাল দিয়ে, কুকুর বলা হয়েছে—এমন নজির নিশ্চয়ই নেই। সর্বত্রই একদল মানুষের সহজ স্বাভাবিক পরিচয় হিসেবেই কুকুর শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

কিন্তু মানবদয়ের পরিচয় যে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই কুকুর হওয়া সম্ভবপর এ-কথার প্রমাণ হিসেবে শুধুমাত্র প্রাচীন পুঁথিপত্রের নজিরই আমাদের একমাত্র সম্বল নয়। আজো আমাদের দেশের নানা জায়গায় যে-সব মানুষের দল সমাজ-বিকাশের প্রাচীন স্তরে আটকা পড়ে রয়েছে তাদের দিকে দেখুন, দেখবেন কুকুর নামের কী রকম ছড়াছড়ি! এখানে মাত্র কয়েকটি নমুনা উল্লেখ করলেই হবে।

রিসলী(৬১) বলছেন, ওরাওঁদের  মধ্যে একদল মানুষের পরিচয় হলো খোয়েপা, খোয়েপা মানে বন্য কুকুর। অনন্তকৃষ্ণ আয়ার(৬২) বলছেন, আজো মহীশূর অঞ্চলে একাধিক দলের মানুষের পরিচয় কুকুর নাম দিয়েই। থার্স্টন(৬৩) দক্ষিণ ভারতের নানারকম মানুষের পরিচয়-প্রসঙ্গে বলছেন, একদলের নাম হলো ভোলিয়া, ভোলিয়া মানে বন্য কুকুর।

আরো অনেক দৃষ্টান্ত দেখানো যায়। আজো ভারতবর্ষের কতো জায়গায় কতো রকমের মানুষ যে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই কুকুর হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয় তার পূর্ণ তালিকা খুবই দীর্ঘ হবে।

এই ভাবে কুকুর বলে জীবন্ত মানুষগুলিকে দেখবার পর পুরোনো পুঁথির দিকে ফিরে যাওয়া যায়।

ছান্দোগ্য-উপনিষদে ওই যে যারা সামগান গাইলো ওরা কারা?

ওদের সত্যিকারের কুকুর মনে করে এবং সত্যিকারের কুকুরের ন্যায্য মর্যাদা দেবার জন্যে শঙ্করাচার্যের মতো লেজ সৃষ্টি করে উপনিষদের পিছনে জুড়ে দেবার দরকার নেই।

কিংবা, রাধাকৃষ্ণণ প্রমুখ আধুনিক বিদ্বানদের মতো এ-কথা কল্পনা করবারও কোনো দরকার নেই যে, উপনিষদের ঋষিরা যজ্ঞীয় ঋত্বিকদের বিদ্রুপ করে বা ঘৃণাভরে ওই রকম সাজিয়েছিলেন।

তার বদলে, এখানে একদল সত্যিকারের মানুষেরই বর্ণনা। সেই মানুষগুলির সহজ ও স্বাভাবিক পরিচয় হলো : কুকুর। যেমন সহজ স্বাভাবিক ভাবেই বেদের শাখাগুলিকে সাপ, ব্যাঙ, ছাগল ইত্যাদি নাম দেওয়া হয়েছিলো, কিংবা উপনিষদের কোনোটির নাম নেওয়া হয়েছে ব্যাঙ থেকে, কোনোটির খচ্চোর থেকে!

————————-
৫১. ছান্দোগ্য উপনিষদের শঙ্করভাষ্য দ্রষ্টব্য।
৫২. ঐতরেয় ব্রাহ্মণ (রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী) ২৩৫।
৫৩. দুর্গাদাস লাহিড়ী : ঋগ্বেদ সংহিতা ২৯।
৫৪. ঐ ৩১।
৫৫. M. Monier-Williams SED.
৫৬. অর্থশাস্ত্র (রাধাগোবিন্দ বসাক) ২:২০৯।
৫৭. হরিবংশ ৩৮ অধ্যায়।
৫৮. মহাভারত (কালীপ্রসন্ন সিংহ) ২১৫।
৫৯. ঐ ৭৫৬।
৬০. ঐ ২৩৮।
৬১. H. H. Risley PI 793.
৬২. A. K. Iyer MTC 1:248.
৬৩. E. Thurston and Rangacari CTSI 1:‘Bholia’

১১. জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকে মানুষের নাম

উপনিষদের ওই সামগায়কগুলিকে সম্যকভাবে চিনতে হলে দেশের প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলির ওপর ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিতে হবে।

পুরানো পুঁথিপত্রগুলিতে দেখবেন, পশুপাখি বা গাছগাছড়ার নামে মানুষের আত্মপরিচয় দেবার উদাহরণ কী রকম প্রচুর! মূল বইগুলি উল্টে দেখবারও দরকার নেই, কেননা আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে অনেকেই ইতিপূর্বে ওই পুঁথিপত্রগুলি থেকে এ-জাতীয় দৃষ্টান্তের দীর্ঘ তালিকা তৈরী করেছেন। অন্তত, ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়ের ‘জাতিভেদ’ বলে বইটি উল্টে দেখুন, দেখবেন, তাঁর তৈরি তালিকাটি প্রায় দশ পাতা জুড়ে রয়েছে।

ঋগ্বেদে একদল মানুষের(৬৫) উল্লেখ রয়েছে যাদের পরিচয় হলো অজ। অজ মানে ছাগল। আর একদল(৬৬) মানুষের খবর পাওয়া যাচ্ছে যাদের নাম হলো শিগ্রু বা সজনে। আবার একদলের(৬৭) নাম হলো মৎস্য। এ-হেন মাছ-নামধারী মানুষ নিশ্চয়ই ভারতবর্ষের নানান জায়গায় এবং নানান যুগে বাস করতো। কেননা, শতপথ ব্রাহ্মণে(৬৮) তাদের দেখতে পাওয়া যায়, তাদের দেখতে পাওয়া যায় কৌষীতকি ব্রাহ্মণে(৬৯), গোপথ ব্রাহ্মণে(৭০), মহাভারতে(৭১) ও নানা পুরাণে(৭২)। পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণে(৭৩) পারাবত (পায়রা) জাতির কথা আছে। শতপথ ব্রাহ্মণে(৭৫) ব্রহ্মাপ্রজাপতির কূর্মরূপের কথা আছে। ওই কাছিমই আবার কশ্যপ নামে ঋগ্বেদ(৭৫), অথর্ব্ববেদ(৭৬) থেকে শুরু করে পুরোনো যুগের নানান পুঁথিপত্র(৭৭) আলো করেছে।

হনুমান বা জাম্বুবানের সত্যিই লেজ ছিলো কিনা জানা নেই। কিন্তু ক্ষিতিমোহন সেন(৭৮) মহাশয় আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন “কাঠিয়াওয়ারের পোরবন্দর যা সুদামাপুরীর রাজারা হনুমানের বংশ।” তাছাড়াম ব্যাস-বাল্মিকীর রচনা পড়লে মনে হয় হেন জন্তু-জানোয়ার বা গাছাগাছড়ার নাম বুঝি আমাদের জানা নেই যার পরিচয়ে সেকালের কোনো না কোনো দল নিজেদের পরিচয় দিতে দ্বিধা করেছে। ক্ষিতিমোহন সেন(৭৯) মশায়ের বই পড়লে দেখবেন কতো রকমারি মানুষদের নাম তিনি মহাভারত থেকে সংগ্রহ করেছেন। নমুনা হিসেবে মাত্র দু’চারটের উল্লেখ করা যাক : প্যাঁচা, বিছে, কাক, আখ, বেল, শেয়াল, গাধা, গোসাপ, মুরগি, হাতি, ভেড়া, শূয়োর, বাঘ, পঙ্গপাল, হাঁস, মাগুরমাছ, খরগোস, ঘোড়া, তাল, শাল, বাঁশ, জাফ্রান—আরো কতো!

এতোসব দেখবার পর এ-কথা শুনে নিশ্চয়ই আর মন খারাপ হবে না যে বহুদিন ধরে আমাদের হিন্দুসমাজে যে-নামগুলিকে পরম পবিত্র মনে করা হয়েছিলো তার মধ্যে অনেক নামই খোদ জন্তু-জানোয়ার থেকে পাওয়া। ম্যাকডোন্যাল-এর(৮০) ‘বেদিক মাইথোলজি’ থেকেই কয়েকটা নমুনা দেখা যায়। বৈদিক সাহিত্যে প্রসিদ্ধ কয়েকটি ঋষি-নাম হলো : কৌশিক, মাণ্ডক্যেয়, গোতম, বৎস, শুনক, ইত্যাদি। কৌশিক মানে প্যাঁচা, মাণ্ডক্যেয় মানে ব্যাঙের বাচ্চা (ব্যাঙাচি?), গোতম মানে ষাঁড়, বৎস মানে বাছুর।

আর শুনক?

ঋষি-নাম হিসেবে ‘শুনক’ দেখে সত্যিই আর অবাক হবার অবকাশ নেই। কেননা, ছান্দ্যোগ্য-উপনিষদে আপনি এই নামেরই মানুষদের সামগান গাইতে দেখেছেন। শুনক মানে কুকুর। শুনক ঋষির লেক ছিলো এ-কথা কোনো শাস্ত্রগ্রন্থে লেখা নেই, যদিও অবশ্য কুকুরের লেজ থেকে ঋষির নামকরণ হয়েছিলো এ-কথা শাস্ত্রে লেখা আছে। শুনঃশেপ ঋষির কাহিনী আমরা পরে বড়ো করে আলোচনা করবো। ঋগ্বেদে তাঁর রচনা পাওয়া যায়, ঐতরেয় ব্রাহ্মণে তাঁর সুদীর্ঘ কাহিনী পাওয়া যায়। শুনঃশেপ মানে কুকুরের লেজ। কুকুরের লেজ থেকে যদি কোনো ঋষির নামকরণ সম্ভবপর হয় তাহলে কুকুরদের সামগান শুনে তাদের লেজ কল্পনা করবার দরকার কি?

—————
৬৪.  ক্ষিতিমোহন সেন : জাতিভেদ ৯৮-১০৭।
৬৫. ঋগ্বেদ : ৭.১৮.১৯।
৬৬. ঐ।
৬৭. ঋগ্বেদ : ৭.১৮.৬।
৬৮. শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩.৫.৪.৯।
৬৯.  কৌষীতকী ব্রাহ্মণ ৪.১।
৭০. ক্ষিতিমোহন সেন : জাতিভেদ ৯৮।
৭১. ঐ।
৭২. ঐ।
৭৩. ঐ ৯৯।
৭৪. ঐ।
৭৫. ঋগ্বেদ : ৯.১১৪.২।
৭৬. A. A. Macdonnel VM 153.
৭৭. Ibid.
৭৮. ক্ষিতিমোহন সেন : জাতিভেদ ৯৯।
৭৯. ঐ ৯৯-১০১।
৮০. A. A. Macdonnel op. cit. 153.

১২. টোটেম বিশ্বাস

জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকে মানবদলের নামকরণ করবার এই প্রথাটি আমাদের দেশে টিকে রয়েছে শুধুমাত্র প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলির মধ্যে নয়, দেশের পিছিয়ে-পড়ে অঞ্চলের বাস্তব সমাজ-ব্যবস্থার মধ্যেও। আপনি যদি থার্স্টন, রিসলী, রাসেল, কুক, আয়ার ইত্যাদির বই থেকে এ-বিষয়ে একটি তালিকা প্রস্তুত করতে রাজী হন তাহলে হয়তো দেখবেন কোনো রকম পরিচিত পোকামাকড়, গাছগাছড়া বা জন্তু-জানোয়ারের নামই বাদ পড়ছে না!

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যাপারটা কী? এই ভাবে পোকামাকড়, গাছগাছড়া আর জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকে মানবদলের নামকরণ করবার ব্যবস্থা কেন? এ কি শুধুই আমাদের দেশের মানুষদের একটা বৈশিষ্ট্য নাকি? আসল তা নয়। এ হলো মানবজাতিরই সমাজ-সংগঠনের এক আদিম পর্যায়ের বৈশিষ্ট্য। মর্গান(৮১) লক্ষ্য করেছিলেন যে, আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে সর্বত্র প্রথা হলো জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকে গোষ্ঠীর নামকরণ করা। কিন্তু এই প্রথাটিকে যদি আদি ও অকৃত্রিম অবস্থায় দেখতে চান তাহলে আপনাকে অস্ট্রেলিয়া যেতে হবে। কেননা, সে-দেশের আদিবাসীদের মধ্যেই কোনো কোনো দল আজো খুবই আদিম পর্যায়ে পড়ে রয়েছে এবং তাদের মধ্যে থেকে এই প্রথার একেবারে আদিম রূপটি আজো লুপ্ত হয়নি।

ওজিবওয়া নামের একদল আমেরিকান আদিবাসীদের ভাষা-ব্যবহার থেকে আধুনিক বৈজ্ঞানিকেরা এই প্রথাটির নাম গ্রহণ করেছেন। নামটা হলো টোটেম-বিশ্বাস(৮২)।

কী রকমের বিশ্বাস? পুরো একদল মানুষ মনে করছে কোনো এক জন্তু বা কোনো এক গাছ থেকে তাদের সকলের জন্ম : তারা সকলেই ওই জন্তুর বা গাছের বংশধর। আর তাই জন্যেই, তাদের কাঙারু-দলের সকলে ভাবছে, কাঙারু থেকেই তাদের দলের সবাইকার জন্ম, তাই তারা সবাই-ই কাঙারু। সূর্যমুখী-দলের সবাই ভাবছে, সূর্যমুখী থেকেই তাদের দলের সবাইকার জন্ম, তাই তারা সবাই সূর্যমুখী। ওজিবওয়াদের ভাষায়, কাঙারুদলের কাছে কাঙারুই হলো দলের টোটেম্‌, সূর্যমুখী দলের কাছে সূর্যমুখীই হলো দলের টোটেম্‌। আধুনিক বৈজ্ঞানিকরা তাই পুরো ব্যাপারটারই নাম দিচ্ছেন টোটেম-বিশ্বাস।

ছান্দোগ্য-উপনিষদের ওই সামগানরত কুকুরগুলির পরিচয়-প্রসঙ্গে এখানে বিশেষ করে দুটি প্রশ্ন আলোচনা করা দরকার।

প্রথমত, ভারতীয় প্রাচীন পুঁথিপত্রে সত্যিই এই টোটেম-বিশ্বাসের চিহ্ন পড়ে রয়েছে কিনা?

দ্বিতীয়ত, টোটেম-বিশ্বাসের চিহ্ন থেকে ঠিক কোন ধরনের সমাজ-সংগঠন অনুমান করা দরকার।

—————-
৮১. H. L. Morgan AS 86.
৮২. Ibid 170.

১৩. প্রাচীন ভারতীয় পুঁথিতে টোটেম-বিশ্বাসের চিহ্ন

বেদাদি প্রাচীন ভারতীয় পুঁথিপত্রে টোটেম-বিশ্বাসের চিহ্ন যে স্পষ্টভাবেই টিকে রয়েছে এ-কথা বোধ হয় হপকিন্স ছাড়া আর কোনো আধুনিক পণ্ডিত খুব জোর গলায় অস্বীকার করেন না। তাই, বিশেষ করে হপকিন্স-এর যুক্তিটাই এখানে বিচার করা দরকার। ওল্ডেনবার্গ-এর গ্রন্থ সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলছেন(৮৩) :

Our learned author, who is perhaps too well read in modern anthropology, seems to gibe the absolute dictum that animal names of persons and clans imply totemism. This is no longer a new theory. On the contrary, taken in so universal an application it is a theory already on the wane, and it seems to us injudicious to apply it at random to the Rigveda, As a means of explanation it requires great circumspection, as is evinced by the practice of American Indians, among whom it is a well known fact that animal names not of totemic origin are given, although many of the tribes do have totem-names. For example, in the Rigveda, Cucumber and Tortoise certainly appear to indicate totemism. But when we hear that Mr. Cucumber was so called because of his numerous family we must remain in doubt whether this was not the real reason. Such family events are apt to receive the mocking admiration of contemporaries. Again, Mr. Tortoise is the son of Gritsamada, a name smacking strongly of the sacrifice, a thoroughly priestly name, and it is not his ancestor but his son who is called Tortoise, very likely because he was slow. The descendents of his son will be called “sons of the tortoise”, but there is no proof of totemism; on the contrary, there is here direct evidence that totemistic appearance may be found without totemism. We can scarcely believe that Gritsamada’s ritualistic educated son ever worshipped the tortoise.

Clearly enough, it is in the later literature that one is brought into closest rapport with the anthropological data of the other peoples. This is due to the fact that the more the Hindus penetrated into India the more they absorbed the cult of the un-Aryan nations, and it is from this rather than the refined priestliness of the Rigvedic Aryans that one may get parallels to the conceptions of Cis-Indic Barbarism.

পুরো উদ্ধৃতিটির তর্জমা করবার দরকার নেই, উদ্ধৃতির প্রতিটি যুক্তি খুঁটিয়ে বিচার করবারও নয়। তার বদলে বিশেষ করে নজর করা যাক, বৈদিক সাহিত্যে টোটেম-বিশ্বাসের চিহ্ন অস্বীকার করবার আশায় হপকিন্স কোন ধরনের পাল্টা মতবাদ দাঁড় করবার চেষ্টা করছেন।

উদ্ধৃতির মধ্যেই দু’রকম চেষ্টার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে।

এক : বৈদিক সাহিত্যের যেখানে যেখানে জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকে মানুষের নামকরণ করবার ব্যবস্থা দেখা যায় সেখানেই আসল উদ্দেশ্যটা হলো ঠাট্টা-তামাসা। জন্তুটার কোনো একটা লক্ষণের সঙ্গে মানুষটির কোনো লক্ষণ মিলে গেলে মানুষটিকে সেই জন্তুর নাম দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন ধরুন, আজকালকার দিনে কেউ খুব লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটলে তাকে ঠাট্টা করে আমি-আপনি হয়তো বক বলবো, কিংবা প্রচণ্ড গলায় চিৎকার করবার স্বভাব থাকলে বলবো ষাঁড়! তেমনই, হপকিন্স বলছেন, গৃৎসমদের পুত্রটি নিশ্চয়ই গুটিগুটি নড়তেন, আর সম্ভবত সেই কারণেই তাঁকে কাছিম বলা হয়েছে।

কিন্তু, এই মতবাদ মানা সত্যিই মুস্কিল। বৈদিক ঋষিদের রসিকতার উৎসাহটা হপকিন্স-এর মতো প্রবল ছিলো কি না সে-বিষয়ে নিঃসন্দেহ না হলেও হপকিন্স-এর মত অনুসারে অন্তত এটুকু মানতেই হবে যে রসিকতার উদ্দেশ্যে তাঁরা একেবারেই পাত্রাপাত্রজ্ঞানহীন হয়ে পড়তেন এবং বহু ক্ষেত্রেই তাঁরা রসিকতা করতেন জানোয়ারটির সঙ্গে কোনো রকম আপাত-সাদৃশ্যের পরোয়া না করেই। গোতম ঋষির সঙ্গে গোরুর মিল কোথায়, বৎস-র সঙ্গে বাছুরের মিল কোথায়, শুনক ঋষির সঙ্গে কুকুরের মিল কোথায়, মাণ্ডক্যেয় ও কৌশিকের সঙ্গে বাঙাচি আর প্যাঁচার মিল কতটুকু—এ-সব প্রসঙ্গ অবশ্যই প্রাচীন পুঁথিপত্রের কোথাও আলোচনাই হয় নি। না হয় ধরেই নিলাম, উক্ত ঋষিদের সঙ্গে উক্ত জন্তু-জানোয়ারের লক্ষণগত সাদৃশ্য ছিলো এবং তারই প্রচ্ছন্ন উল্লেখ ঋষিদের সম্বন্ধে ওই রকম বিদ্রুপমূলক নামের আড়ালে। কিন্তু তাহলেও ঠিক কোন ধরনের পরিহাস-প্রিয়তায় মেতে সেকালের ঋষিরা বৈদিক শাখাগুলিকে সাপ, ব্যাঙ নাম দিয়েছিলেন, তা বোঝবার মতো কল্পনার দৌড় আমাদের সত্যিই নেই।

দুই : হপকিন্স যেন কিছুটা স্বস্তিবোধ করছেন পরবর্তী যুগের পুঁথিপরে পৌঁছে। কেননা, এখানে টোটেম-বিশ্বাসের চিহ্ন পাওয়া গেলেও তার কলঙ্ক থেকে বৈদিক আর্যদের বাঁচাবার একটা সহজ উপায়ও তিনি পাচ্ছেন : বৈদিক আর্যরা যতোই ভারতবর্ষের গভীরে প্রবেশ করেছিলেন ততোই স্থানীয় অনার্যদের অনেক রকম স্থূল ও প্রাকৃত বিশ্বাস তাদের সাহিত্যেও প্রবেশ লাভ করেছিলো। অর্থাৎ কিনা, টোটেম-বিশ্বাসটির জন্যে দায়ি করে দেওয়া গেলো শুধু ওই ছাই-ফেলতে-ভাঙা-কুলো স্থানীয় অনার্য জাতিগুলোকে।

আর ঠিক এইটেই হলো আর্য-অনার্য মতবাদের আসল ফাঁদ। ঐতিহাসিক ভাবে এ-মতবাদ যে শেষ পর্যন্ত কতোখানি দাঁড়াবে সে-বিষয়ে নিশ্চয়ই সন্দেহের অবকাশ আছে। কিন্তু এই মতবাদই যে বৈদিক মানুষগুলির ইতিহাসকে বুঝতে দারুণ বাধার সৃষ্টি করে সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। কেননা, বৈদিক সাহিত্যে এই বৈদিক মানুষগুলিকে সমাজ-বিকাশের যে-পর্যায়েই দেখা যাক না কেন, বৈজ্ঞানিক ভাবে এ-কথা মনে করা অসম্ভব যে তাদের কোনো অতীত ছিলো না—বুঝি শুরু থেকেই তারা সমাজ-বিকাশের ওই পর্যায়ের জীবনযাপন করতো। কেননা, মানবজাতির যে-কোনো শাখার কথাই ভাবা যাক না কেন, পশুর রাজ্য পিছনে ফেলে সভ্যতার পর্যায়ে উঠে আসবার পথে প্রত্যেককেই সমাজ-বিকাশের কয়েকটি নির্দিষ্ট ধাপ পার হতে হয়েছে। কিন্তু আর্য-অনার্য মতবাদ অনেক সময় বৈদিক মানুষদের ওই পিছনে-পড়ে-থাকা পর্যায়গুলিকে অস্বীকার করবার আয়োজন করে। কেননা, বৈদিক সাহিত্যে সে-পর্যায়ের কোনো চিহ্ন দেখলে উক্ত মতবাদের প্রভাবে এগুলিকে অনার্যদের কাছ থেকে গ্রহণ করা বিশ্বাস বলে ব্যাখা করবার প্রলোভন হয়। বৈদিকসাহিত্যে টোটেম-বিশ্বাসের চিহ্নগুলিকে ব্যাখ্যা করবার আশায় হপকিন্স যা বলেছেন তা এই প্রলোভনেরই প্রকৃষ্টতম উদাহরণ। যদিও, বৈদিক সাহিত্যের তুলনায় উত্তর যুগের সাহিত্যে টোটেম-বিশ্বাসের পরিচয় সত্যিই বেশি প্রকট, এ-কথা স্বতঃসিদ্ধ সত্য নয়—হপকিন্স-এর প্রতিজ্ঞাটিও খুব সম্ভব ভ্রান্ত।

কিন্তু হপকিন্স-এর সবচেয়ে হাস্যকর যুক্তি হলো : ঋষি গৃৎসমদের যাগযজ্ঞবিদ পুত্রটি কোনোদিন সত্যিই কাছিম পুজো করেছেন কিনা তা খুবই সন্দেহের কথা। বৈদিক সাহিত্যে টোটেম-বিশ্বাসের চিহ্ন অপ্রমাণ করবার আশায় হপকিন্স এটিকেও একটি মূল্যবান যুক্তি মনে করছেন! অথচ এ-কথা সত্যিই হাস্যকর; কেননা, টোটেম-বিশ্বাসকে ভুল বোঝবার—বা একেবারেই না-বোঝবার—এ হল প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এবং দুঃখের বিষয় যে-সব বিদ্বানেরা বৈদিক সাহিত্যে টোটেম-বিশ্বাসের চিহ্ন স্বীকার করেন তাঁরাও(৮৪) এ-বিশ্বাসের স্বরূপ সম্বন্ধে, এবং বৈদিক সাহিত্যে এ-বিশ্বাসের চিহ্ন খুঁজে পাবার তাৎপর্য সম্বন্ধে, খুব সুস্পষ্ট কোনো ধারণা পাবার চেষ্টা করেন নি।

———————
৮৩. E. W. Hopkins in PAOS-1894. CLIV.
৮৪. Oldenberg ইত্যাদি। A. B. Keith RPVU 46, 47, 49, 54, 74 ইত্যাদি দ্রষ্টব্য।

১৪. টোটেম বিশ্বাস ও আদিম সাম্যসমাজ

ভারতবর্ষের প্রাচীন পুঁথিপত্রে টোটেম-বিশ্বাসের চিহ্ন যে রয়েছে এ-কথা বলায় নিশ্চয়ই আজকের দিনে আর তেমন কোন অভিনবত্ব নেই। কেননা, বহু গবেষকই আজ এ-কথা স্বীকার করছেন। কিন্তু এ-জাতীয় চিহ্নের প্রকৃত তাৎপর্য কী? এই প্রশ্ন নিয়ে এখনো খুব স্পষ্ট আলোচনা হয় নি। তার কারণ, টোটেম-বিশ্বাস বলতে প্রায়ই একরকম আদিম ধর্মবিশ্বাস মনে করা হয়; অথচ টোটেম-চিহ্ন থেকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে যা প্রমাণিত হয় তা এক রকমের সমাজ-সংগঠন।

 Unfortunately, many writers have used the term totemism very loosely for any beliefs and practices dependent upon some supposed connection between animals and persons. The term should be restriction between animals and persons. The term should be restricted to those cases where a systematic association of groups of persons with species of animals (occasionally plants or inanimate objects) is connected with a certain element of social organizations.(৮৫)
দুঃখের বিষয় অনেক লেখকই টোটেম-বিশ্বাস বলে নামটি অসাবধান ভাবে ব্যবহার করেন। তাঁদের ধারণায় জন্তু-জাওয়ারের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক-সূচক যে-কোনো বিশ্বাস বা ক্রিয়াকর্মকেই এ-নাম দেওয়া যায়। শব্দটি শুধুমাত্র সেই সব দৃষ্টান্তের মধ্যে আবদ্ধ রাখা দরকার যেখানে মানবগোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির জানোয়ারের সুপরিকল্পিত সম্পর্কের কথা একরকম সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত।

ওই সমাজ-সংগঠনের কথাটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। টোটেম-বিশ্বাস থেকে সেই সমাজ-সংগঠনকে অনুমান করা দরকার।

কোনো ধরনের সমাজ-সংগঠন? একমাত্র উত্তর হলো : আদিম সাম্য-সমাজ, যে-সমাজে ছোটো-বড়োয়তফাত দেখা দেয় নি—সামাজিক শক্তির দিক থেকে নয়, ঐশ্বর্যের দিক থেকেও নয়। সবাই সমান, সবাই স্বাধীন, মানুষে মানুষে সত্যিই ভাই-ভাব ভাব। মনে রাখতে হবে, এই আদিম সাম্য-সমাজের ধ্বংসস্তূপের উপরই রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হয়েছে। অন্তত প্রাচীন মিশরের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রশক্তির এই অভ্যুত্থান-ইতিহাস স্পষ্ট ভাবে উদ্ধার করেছেন মরেট আর ডেভি(৮৬)। ছান্দোগ্য-বর্ণিত কুকুরদের সামগানটুকু বোঝবার জন্যে অবশ্যই ওই টোটেম-সমাজের ধ্বংসকাহিনী বা রাষ্ট্রশক্তির অভ্যুত্থান-কাহিনী নিয়ে আলোচনা তোলবার দরকার নেই। দরকার হলো, টোটেম-সমাজের স্বরূপটিকে চেনবার। এ-বিষয়ে মরেট এবং ডেভির সিদ্ধান্তই উদ্ধৃত করা যাক :

The true totemic society, remarks M. Moret, knows neither kings nor subjects. It is democratic or communistic; all the members of the clan live in it on a footing of equality with respect to their totem.(87)
অর্থাৎ, এম. মরেট বলছেন, প্রকৃত টোটেম-সমাজে না আছে রাজা না প্রজা। এ-সমাজ গনতান্ত্রিক, বা সাম্যবাদী; গোষ্ঠীর সমস্ত মানুষই টোটেমটির সম্পর্কে সমানে সমান।

কিংবা

The active and passive subjects of obligation are collective in the regime of the totemic clan. Power, like responsibility, still has therein in undivided character. We are in the presence of a communal and equalitarian society in the bosom of which participation in the same totem which constitutes the essence of each and the cohesion of all, places all members of the clan on the same footing.(৮৮)
অর্থাৎ, টোটেম-গোষ্ঠীর পর্যায়ে কর্তব্যের সক্রিয় এবং নিষ্ক্রিয় দুটো দিকই সমষ্টিগত। দায়িত্বের মতোই শক্তিরও তখন পর্যন্ত অবিভক্ত অবস্থা। আমরা এক সাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী সমাজের সম্মুখীন হই যার মধ্যে একই টোটেমে অংশগ্রহণ করবার দরুন সকলেরই সমান অবস্থা। এবং এই টোটেমের উভয়ই নির্ভর করছে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সত্তা এবং পরস্পরের মধ্যে অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক।

এই আদিম সাম্যসমাজের বর্ণনায় পরবর্তী পরিচ্ছেদে ফেরা যাবে। কিন্তু এখানে একটি সমস্যার অবতারণা করে রাখা যায় : টোটেম-সমাজ যদি সত্যিই এরকম অবিভক্ত সাম্যসমাজ হয় তাহলে তারই আওতায় কোনো রকম ধর্মচেতনা সত্যিই কি সম্ভবপর? মনে রাখা দরকার, ধর্মচেতনার মূল কথা হলো উপাস্য-উপাসকে প্রভেদ। যাঁরা ভুল করে টোটেম-বিশ্বাসকে ধর্মবিশ্বাস মনে করছেন তাঁদের ধারণায় সমাজ-বিকাশের ওই আদিম পর্যায়ে এক এক দল মানুষ এক একটি জন্তু-জানোয়ার বা গাছপালাকেই ভগবানের সামিল মনে করেছিলো : দলের সকলের কাছে দলের টোটেমটিই উপাস্যের স্থান দখল করেছিলো। কিন্তু টোটেম-বিশ্বাসকে ভাল করে পরীক্ষা করলেই বোঝা যায়, এ মতবাদ ঠীক নয়। যে-দলের টোটেম হলো সূর্যমুখী ফুল সে-দলের প্রত্যেকেই নিজেকে সূর্যমুখী ফুল মনে করছে। উপাস্য-উপাসকের তফাতটা কোথায়? আর যদি তাই হয়, তাহলে টোটেম-বিশ্বাসকে ধর্ম-বিশ্বাসেরই কোনো আদিম পর্যায় মনে করবার সত্যিই অবকাশ নেই। মনে রাখতে হবে, টোটেম-সমাজ ভেঙে যখন রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হচ্ছে,—যখন আদিম সাম্যের বদলে সমাজের সবটুকু শক্তি ও ঐশ্বর্য কেন্দ্রীভূত হচ্ছে শাসকের হাতে,—তখনই প্রকৃত অর্থে ধর্মবিশ্বাসের জন্ম। অবশ্যই, সমাজ-বিকাশের ওই নবপর্যায়ে আদিমকালের টোটেমটি যে বিলুপ্ত হতে বাধ্য এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু অন্তত তার জাতবদল হতে বাধ্য। তাই নতুন পর্যায়েও প্রায়ই সেই পুরোনো জানোয়ারটিকে খুঁজে পাওয়া যায়—কিন্তু তখন আর সে আদিম টোটেম নয়, তার বদলে এক নবজাত দেবতা। তফাতটা কম নয় : টোটেম-সমাজে যে-জানোয়ারটির সঙ্গে প্রত্যেক মানুষেরই একান্ত একাত্মবোধ ছিলো রাষ্ট্রের উৎপত্তির পর দেখা গেলো তারই সামনে মানুষেরা হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা-উপাসনা শুরু করেছে!

প্রাচীন মিশরের ইতিহাসকে উদ্ধার করবার প্রচেষ্টায় এই টোটেম-চিহ্নের গুরুত্ব মরেট এবং ডেভির গবেষণায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছে। রাষ্ট্রশক্তির উৎপত্তি এবং ধর্মবিশ্বাসের উৎপত্তি নিয়ে আমরা যখন আলোচনা তুলবো তখন স্পষ্টই দেখা যাবে এঁদের গবেষণা আমাদের পক্ষে কতোখানি সহায়ক। প্রাচীন মিশরের ইতিহাসে যা স্পষ্ট ভাবে জানা গিয়েছে, তারই সাহায্যে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে আজো যা অস্পষ্ট হয়ে রয়েছে তা বোঝবার পথ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু আপাতত আমাদের চেষ্টা হলো, ছান্দোগ্যের ওই সামগানরত “কুকুরগুলি”কে সনাক্ত করা। আশা করি টোটেম-বিশ্বাস নিয়ে যেটুকু আলোচনা তোলা হয়েছে তার সাহায্যে ওই কুকুরগুলিকে চিনতে আর কোনো অসুবিধা হবে না।

————-
৮৫.  W. E. Armstrong in EB 22.315.

১৫. সামগান আর অন্নআহরণ

কুকুর মানে তাহলে সত্যিই কুকুর নয়। মানুষ। তবে আমার-আপনার মতো এ-কালের মানুষ নয়। টোটেম-সমাজের মানুষ। সে-সমাজের প্রধান লক্ষণ হলো, একান্ত দলগত বা গোষ্ঠীগত জীবন। ছোটোয়-বড়োয় তফাত নেই,–শক্তির দিক থেকে নয়, ঐশ্বর্যের দিক থেকেও নয়। তাই এই সমাজকে বলা হয় আদিম সাম্য-সমাজ। শ্রেণীবিভাগ দেখা দেবার আগেকার পর্যায়ের এই সমাজে পরান্নজীবী হিসেবে কারুরই স্থান নেই—দলের কাজে সবাইকেই যোগ দিতে হয়। অর্থাৎ, শ্রমের দায়িত্ব গ্রহণের দিক থেকেও সবাই সমান।

উপনিষদের মধ্যে এ-হেন একটা টোটেম-সমাজের স্পষ্ট ছবি কেমন ভাবে টিকে থেকেছে তা ভাবতে সত্যিই আশ্চর্য লাগে! কেননা, উপনিষদে মোটের উপর যে-সমাজের পরিচয় পাওয়া যায় তা আর যাই হোক সাম্যসমাজ নয়, শ্রেণীবিভক্ত সমাজই। অথচ মানতেই হবে, যেমন করেই হোক নতুন পর্যায়ের সাহিত্যেও পুরোনো পর্যায়ের স্মারক থেকে গিয়েছে। ঠিক কী করে টিকে থাকলো তার স্পষ্ট জবাব দিতে না পারলেও ওই সমাজের ছবি যে টিকে রয়েছে এ-কথা কোনো মতেই অস্বীকার করবার উপায় নেই।

সমাজ-বিকাশের ওই পুরোনো পর্যায়টির কথা মনে না রাখলে ছান্দোগ্য-বর্ণিত কুকুরগুলির বাকি আচরণটুকুও বোঝা যাবে না। অপর পক্ষে ওই সামাজিক পটভূমিটিতে বিচার করতে পারলে উপনিষদের এই অংশটির বাকি প্রায় প্রতিটি কথারই স্পষ্ট ও যুক্তিসঙ্গত অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়।

একে একে বাকি কথাগুলির আলোচনা তোলা যাক।

স্বাধ্যায়-অন্বেষী বক দালভ্য, ওরফে গ্লাব মৈত্রেয়, কী দেখলেন? প্রথমত একটি সাদা কুকুর : সাদা বিশেষণটি বয়স-ব্যঞ্জক কিনা তা বোঝবার উপায় নেই। হতেও পারে, না হতেও পারে। যদি প্রাচীনত্বসূচকই হয় তাহলে তাকে ওই কুকুরদলের মধ্যে প্রাচীন বলতে বাধা হবে না। তার প্রতি অন্য কুকুরদের আচরণটাও দলপতি-সূচক। তাই সাদা বলতে ‘সাদা চুল’—এমন অর্থ খুব বেশি অসম্ভব নাও হতে পারে।

কিন্তু তা হোক আর নাই হোক, তার প্রতি অন্য কুকুরদের অনুরোধটা আপাতদৃষ্টিতে একেবারেই অসম্ভব আর আজগুবি মনে হয় : তাদের ক্ষিদে পেয়েছে, তারা অন্ন চায়—এ-পর্যন্ত বুঝতে নিশ্চয়ই কোনো অসুবিধে হয় না। কিন্তু অন্নলাভের উপায় হিসেবে অপর কুকুরগুলি যা বললো তার কোনো রকম তাৎপর্য যে থাকতে পারে তা আমাদের পক্ষে ভাবাই কঠিন। সাদা কুকুরটিকে ঘিরে অন্য কুকুরেরা বললো : ক্ষিদে পেয়েছে, অন্ন চাই, অতএব একটা গান গাও।

অন্নং নো ভগবানাগায়ত্বশনায়াম্‌

কুকুরদের ছোটো মুখে এ-হেন একটা বড়ো কথা শুনে আধুনিক যুগের অনেক নন্দনতত্ত্ববিশারদ নিশ্চয়ই বিলক্ষণবিরক্ত হবেন। কেননা, তাঁদের মধ্যে আজ অনেকেই খুব জোর-গলায় ঘোষণা করছেন : Art for Art’s sake—শিল্প নিছক শিল্পের খাতিরেই। অনাশক্ত ও নির্লিপ্ত রসসম্ভোগ ছাড়াও শিল্পের যে আর কোনো রকম উপযোগিতা থাকতে পারে এ-কথা আজকের যুগে নানাভাবে অস্বীকার করা হয়।

অবশ্যই, নন্দনতত্ত্বের এ-জাতীয় মতবাদ হলো ভাববাদী মতবাদ—অভিনব গুপ্ত থেকে ক্রোচে পর্যন্ত যে-মতবাদের প্রচারক। কিন্তু ছান্দোগ্যের ওই কুকুরগুলি ভাববাদ কাকে বলে তা জানে না! তাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা আগাগোড়াই বস্তুবাদী।

নন্দনতত্ত্বের মতাদর্শের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। কিন্তু আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতার সঙ্গেও কুকুরদের ওই কথাগুলির যেন আকাশ-পাতাল তফাত। আমরা আজ এমন একটা যুগে বাস করছি যেখানে সংগীতের সঙ্গে অন্ন আহরণের কোনো রকম কার্যকারণ সম্পর্ক একেবারে অসম্ভব ও আজগুবি কল্পনা বলেই মনে হবার কথা।

তবু, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে, উপনিষদের ঋষিদের কাছে সম্পর্কটার সম্ভাবনা অতো অসম্ভব বা আজগুবি ছিলো না। এবং এর কারণটাও রহস্যজনক নয় : আমরা বাস করি আধুনিক সমাজে, এবং আধুনিক সমাজ-ব্যবস্থাই আমাদের ধ্যানধারণার উৎস। উপনিষদের ঋষিরা বাস করতেন প্রাচীন সমাজে, এবং সেই প্রাচীন সমাজ-ব্যবস্থাই তাঁদের ধ্যানধারণার উৎস ছিলো। তাঁদের ওই প্রাচীন সমাজের সঙ্গে আমাদের আধুনিক সমাজের অনেক তফাত, তাঁদের ধ্যানধারণার সঙ্গে আমাদের ধ্যানধারণারও অনেক তফাত। তাই, তাঁদের ধ্যানধারণার সঙ্গে আমাদের ধ্যানধারণারও অনেক তফাত। তাই, তাঁদের স্মৃতি থেকে সংগীতের সঙ্গে অন্ন-আহরনের সম্পর্কটা একেবারে বিলুপ্ত হয় নি, যে-রকম বিলুপ্ত হয়েছে আমাদের মন থেকে।

উপনিষদ-সাহিত্যে যদি শুধুমাত্র কুকুরদের ওই সামগানের দৃশ্যটিই সংগীতের সঙ্গে অন্নআহরণের কার্যকারণ-সম্পর্ক-সূচক হতো তাহলেও কথাটাকে উড়িয়ে দেবার উপায় থাকতো না। কিন্তু উপনিষদের সাক্ষীর জোর অনেক বেশি, কেননা, দেখা যায় ওই সম্পর্কের কথা বারবার ঋষিদের চিন্তায় উঁকি দিচ্ছে। এখানে দু’-একটা নমুনা উদ্ধৃত করা যায়। বৃহদারণ্যক উপনিষদে লেখা আছে :

অথাত্মনেহন্নাদ্যমাগায়দ্যদ্ধি কিংচান্নমদ্যতেহনেনৈব তদদ্যত ইহ প্রতিতিষ্ঠতি।।১।৩।১৭।।
অর্থাৎ, অনন্তর নিজের জন্য অন্নাদিকে গান করিয়া লাভ করিয়াছিলেন। কেননা, যে-কিছু অন্ন ভুক্ত হয় তা ইহার দ্বারাই ভুক্ত হয়, ইহাতে (অন্নতে) প্রতিষ্ঠিত থাকে।

গানের সাহায্যেই যে অন্ন লাভ করা গিয়েছে এ-কথা উপনিষদের ঋষিদের মনগড়া কথা নয়। তাঁরা লিখছেন, স্বয়ং দেবতারাও এই কথাটি স্বীকার করে গিয়েছেন। বৃহদারণ্যকে তাই বলা হয়েছে :

তে দেবা অব্রুবন্নেতাবদ্ধা ইদং যদন্নং তদাত্মন আগাসীরনু নোহস্মিন্নন্ন আভজস্বেতি…।।১।৩।১৮।।
অর্থাৎ, সেই দেবগণ বলিলেন, এ-পর্যন্ত এই যে অন্ন সেই অন্নকে নিজের জন্য গান করিয়া লাভ করিয়াছ। এখন (পশ্চাৎ) আমাদের সেই অন্নে অংশী করো…

তাহলে দেখা যাচ্ছে, উপনিষদের যুগ পর্যন্ত খোদ দেবতারাও মানতেন যে অন্নলাভার্থে গানের কার্যকারিতা আছে। গান শুধুমাত্র অবসর-বিনোদন নয়, উৎপাদন-পদ্ধতির অঙ্গও।

অন্নলাভের সঙ্গে গানের কোনো যোগ থাকা সম্ভব কিনা এ-বিষয়ে আজকের দিনে আমার-আপনার একটা মত থাকতে পারে, আছেও নিশ্চয়ই। কিন্তু আমাদের বর্তমান আলোচনা মোটেই তা নিয়ে নয়। আমরা শুধু দেখতে চাইছি, প্রাচীনদের ধারণা অনুসারে এ-রকম কোনো যোগাযোগ মানা দরকার কিনা।

প্রাচীনদের ধারণায় গানের সঙ্গে অন্নের যোগটা যে কতো ঘনিষ্ঠ তার অন্যান্য পরিচয় উপনিষদেই দেখতে পাওয়া যায়। উপনিষদের ঋষিরা উদ্গীথ শব্দটিকে কী ভাবে বিশ্লেষণ করতে চান তাই দেখুন। ছান্দোত্য-উপনিষদে বলা হয়েছে, তাই উদ্গীথের অক্ষরগুলিকে সম্যকভাবে বুঝতে হবে (উপাসীত) :

খলুদ্গীথাক্ষরাণ্যুপাসীতোদ্গীথ ইতি প্রাণ এবোং প্রাণেন হ্যত্তিষ্ঠতি বাগ্‌গীর্বাচো হ গির ইত্যাচক্ষতেহন্নং থমন্নে হীদং সর্বং স্থিতম্‌।।১।৩।৬।।
অর্থাৎ, অনন্তর উদ্গীথের অক্ষরসমূহকে উপাসীত। উদ্গীথ এই : প্রাণই হইল উৎ অক্ষর, কেননা, প্রাণের দ্বারাই উত্তিষ্ঠ হয়। বাক্‌-ই হইল গী অক্ষর, (কেননা) বাক্‌কেই গী বলা হয়। অন্নই হইল থম্‌ এই অক্ষর, (কেননা) এই সমুদয় অন্নেরই অবস্থিত।

তাহলে, সামগানের ওই উদ্গীথ বলে নামটিকে ভেঙে দেখলেই দেখতে পাবেন, তার মধ্যে অন্নের অভাব নেই! এবং এ-কথা একালের কোনো চিন্তাশীলের কল্পনা নয়—স্বয়ং ঋষিদের দস্তখৎ করা দলিল।

সামগানের সঙ্গে অন্নের সম্পর্ক নিয়ে উপনিষদে আরো কথা লেখা আছে। সামগানের চতুর্থ পর্যায়টিকে বলে প্রতিহার—আধুনিক পণ্ডিতদের তর্জমায় response। ছান্দোগ্য-উপনিষদেই প্রশ্ন উঠেছে, এই প্রতিহারের অনুগমনকারী দেবতাটির স্বরূপ নিয়ে। ঊষস্তি চাক্রায়নকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, কে সেই দেবতা? প্রশ্নের শর্তটা অবশ্যই খুব কঠিন : এই দেবতাকে না জেনে ঊষস্তি চাক্রায়ন যদি প্রতিহার-কর্ম করনে তাহলে তাঁর মাথা কাটা যাবে। উত্তরে ঊষস্তি চাক্রায়ন যা বলেছিলেন তা সত্যিই বিস্ময়কর :

অন্নমিতি হোবাচ সর্ব্বাণি হ বা ইমানি ভূতান্যন্নমেব প্রতিহরমাণানি জীবন্তি সৈষা দেবতা প্রতিহারমন্বায়ত্তা তাং চেদবিদ্বান্‌ প্রত্যহরিষ্যে মুর্দ্ধা তে ব্যপতিষ্যত্তথোক্তস্য ময়েতি তথোক্তস্য ময়েতি।।১।১।১৯।।
অর্থাৎ, তিনি বলিলেন, অন্নই সেই দেবতা। এই সমুদয় ভূতই অন্ন আনয়ন করিয়া (প্রতিহরমাণানি=প্রতি+হৃ+শানচ্‌=আনয়ন করিয়া) জীবনধারণ করে। সেই দেবতাই প্রতিহারের অনুগমন করেন। তাহাকে না জানিয়াই আপনি যদি প্রতিহার-কর্ম করিয়া থাকেন তাহা হইলে আপনারই শির নিপতিত হইবে।

ঊষস্তি চাক্রায়ণের শির নিপতিত হয়েছিলো—এমনতরো কোনো কথা উপনিষদে লেখা নেই। বরং, ঊষস্তি চাক্রায়ণের সংবাদ ওইখানেই শেষ হলো। তার থেকেই বোঝা যায়, উপনিষদের ওই অংশে তাঁর এই কথাগুলিই উপনিষদের ঋষিদের কাছে এ-বিষয়ে চরম প্রতিপাদ্য ছিলো।

তাহলে, উপনিষদের ওই কুকুরগুলি গানের সঙ্গে—সামগানের সঙ্গে—অন্ন-আহরণের সম্পর্ক উল্লেখ করে এমন কোনো কথা বলছে না যা কিনা সাধারণভাবে উপনিষদের ঋষিদের মতবাদের সঙ্গে খাপ খায় না। বরং, উপনিষদের ঋষিদের চেতনায় এই সম্পর্কের কথাটা যেন এই স্থির বিশ্বাসের মতো—বারবার তা ঘুরে আসছে দেখা যাক।

১৬. গান আর কাজ

কিন্তু ব্যাপারটা কী? আমাদের আধুনিককালের ধারণার সঙ্গে এই কথাগুলির সঙ্গতি নেই। আর তা যদি না থাকে তাহলে এগুলিকে বোঝবার একমাত্র উপায় হতে পারে আধুনিক যুগের সামাজিক পরিবেশটিকে ছেড়ে প্রাচীন সমাজের দিকে চেয়ে দেখা, সন্ধান করা যে এমন কোনো সমাজব্যবস্থা সত্যিই সম্ভব কিনা যেখানে গান আর খাদ্য-উৎপাদন সত্যিই অঙ্গাদি সম্পর্কে সংযুক্ত।

সত্যিই কি ওই রকম কোনো সমাজের খবর জানা আছে? আছে। সে-সমাজ অবশ্যই খুব পিছিয়ে-পড়া সমাজ—তার আদি ও অকৃত্রিম রূপ নিশ্চয়ই আদিম সাম্যসমাজ, যদিও আদিম সাম্যসমাজ ভেঙে যাবার পরও মানুষের চিন্তায় কাজের সঙ্গে গানের যোগাযোগটির রেশ বহুদিন ধরেই থেকে গিয়েছে।

বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে বুঝতে সুবিধে হবে অধ্যাপক জর্জ টম্‌সনের(৮৯) রচনা অনুসরণ করলে।

অধ্যাপক টম্‌সন শুরু করছেন একেবারে গোড়ার কথা থেকে। গান বা সংগীতের জন্ম হলো কী করে? এ-কথা বুঝতে হলে ভাষার জন্মবৃত্তান্তও মনে রাখা দরকার। কেননা, বাক বা ভাষা ছাড়া গান হয় না—অন্তত আধুনিক যুগের বিশুদ্ধ যন্ত্রসঙ্গীতের বেলায় যাই হোক না কেন, পুরোনো আমলে ভাষা বাদ দিয়ে গানের কথা ভাবা যায় না। উদ্গীথের শব্দার্থ-বিশ্লেষণে ঋষিরাও বলছেন, বাক্‌-ই গী(৯০)! কিন্তু ভাষার জন্মবৃত্তান্ত অনুসন্ধান করতে হলে মানুষের জন্মবৃত্তান্ত নিয়েও আলোচনা তুলতে হয়, কেননা, মানুষের পক্ষে পশুজগৎ ছেড়ে আসবার পরিচয় প্রধানত দু’দিক থেকে : হাতিয়ার আবিষ্কার ও ভাষা আবিষ্কার। জানোয়ারেরা হাতিয়ার বানাতে পারে না, কথা কইতে পারে না—পৃথিবীতে শুধুমাত্র মানুষই তা পারে।

মানুষের পক্ষে হাতিয়ার আবিষ্কার এবং ভাষা আবিষ্কার—দুটো খুব স্বতন্ত্র ঘটনা নয়। হাতিয়ারের সাহায্যে মানুষ উৎপাদন-কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারলো। কিন্তু গোড়ার দিকে কারুর পক্ষেই এই উৎপাদন-কাজ একাএকা সম্পাদন করা সম্ভব নয়—দশহাত এক হয়ে একসঙ্গে কাজ করেছে। আর এরই দরুন পরস্পরের মধ্যে চিন্তার আদান-প্রদানের প্রয়োজন দেখা দিলো—সেই তাগিদেই মানুষের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে সংযোজিত হতে লাগলো অর্থ : মানুষ আর জানোয়ারদের মতো চিৎকার করে না, রীতিমতো কথা বলে। পুরো দলের ওই একান্ত দলগত কাজটিকে সুনিয়ন্ত্রিত করবার তাগিদেই মানুষের ভাষা উন্নত হতে লাগলো। তাই গোড়ার দিকে হাতের কাজের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গি(৯১)।

শিশুরা কথা বলবার সময় খু বেশি অঙ্গভঙ্গি করে যদি মানবজাতিরও শৈশবকে পরীক্ষা করা যায় তাহলে চোখে পড়ে কথা বলার সঙ্গে হাত নাড়ানোর যোগাযোগটা কতো ঘনিষ্ঠ। আমরাও হয়তো মুখের কথাকে ভালো করে বোঝাবার জন্যে অল্পবিস্তর হাত নাড়াই—অঙ্গভঙ্গি করি। কিন্তু অসভ্য মানুষদের বেলায় ঠিক তা নয়—অন্যেরা যাতে কথাটাকে আরো ভালো করে বুঝতে পারে এইজন্যে তারা হাত নাড়ায় না। কেননা, বৈজ্ঞানিকেরা লক্ষ্য করেছেন যে, ওরা যখন আপন মনে কথা বলে তখনো প্রচুর অঙ্গভঙ্গি করে(৯২)। আমাদের কাছে কথাটাই মূখ্য, অঙ্গভঙ্গিটুকু গৌণ। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে তা নয়। কেননা, হাতের কাজের সংগেই তাদের মুখের ভাষা ফুটেছিল। আদিম মানুষদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে যাঁরাই গবেষণা করেছেন তাঁরাই বলছেন, ওদের বেলায় মুখের ভাষাটা অনেকাংশেই হাতের অঙ্গভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। অধ্যাপক টম্‌সন নজির দিচ্ছেন গ্রে, স্মাইথ, রট্টে প্রভৃতি বৈজ্ঞানিকদের(৯৩)। অর্ধশতাব্দী আগেই এই সব সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বূশের(৯৪) প্রমাণ করতে ছিলেন, হাতিয়ার-ব্যবহারের দরুন পেশীগুলিতে যে-জোর পড়ে তারই প্রতিবর্তী-ক্রিয়া হিসেবে স্বরতন্ত্রের প্রতিক্রিয়াটি থেকেই মানুষের গলায় ভাষা ফুটে উঠেছিলো। তারপর, হাতের কাজের যতো উন্নতি হয়েছে ততোই উন্নত হয়েছে স্বরতন্ত্র এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের চেতনাও উন্নত হতে হতে একটা পর্যায়ে পৌঁছে দেখা গেলো এই প্রতিবর্তী ক্রিয়াটিকেই তারা সচেতনভাবে ভাবের আদান-প্রদান কাজে নিযুক্ত করতে পারছে।

শ্রমের সঙ্গে ভাষার এই সংযোগটিকে আজো খুঁজে পাওয়া যায় শ্রম-সঙ্গীত বা ‘কাজের গান’-এর মধ্যে। যে-সব দেশে কলকারখানার শব্দে শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর একেবারে চাপা পড়ে যায় নি সেই সব দেশে কলকারখানার শব্দে শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর একেবারে চাপা পড়ে যায় নি। সেই সব দেশে ওই শ্রম-সঙ্গীত শুনতে পাওয়া একটুও কঠিন নয়(৯৫)। নৌকো বাওয়ার গান, ধান কাটার গান থেকে শুরু করে ছাদ পেটাবার গান বা শ্রমিকদের পক্ষে প্রকাণ্ড ভারি কিছু টানবার সময়কার গানগুলোকে একটুখানি নজর করলেই বোঝা যাবে, এ-সব ক্ষেত্রে কাজ শুধুমাত্র হাতের উপর নির্ভর করছে না, ভাষার উপরও নির্ভর করছে, অবশ্যই সে-ভাষার সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে সুর। তারই নাম গান। এ-গান মোটেই অবসর-বিনোদন নয়—কাজের অঙ্গ। বিশজন শ্রমিক মিলে যখন একটা ভারি কাজ করছে তখন সর্দার দাঁড়িয়ে গানের দায়িত্ব নিয়েছে এবং সে নিজে কাজে হাত লাগাচ্ছে না বলে বাকি শ্রমিকদের মনে কোনো বিক্ষোভ নেই। কেননা, তার ওই গানের দরুনই বাকি বিশজনের পক্ষে অমন শ্রমসাধ্য কাজটাও সহজসাধ্য হয়। গান এখানে শ্রমকে সাহায্য করছে—সবাইকেই একসঙ্গে একতালে একটি কাজ করবার অবস্থায় এনে প্রত্যেকেরই শ্রমলাঘব করছে।

অসভ্য মানুষদের মধ্যে এই শ্রম-সঙ্গীদের তাৎপর্য আরো অনেক স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। যখনই তারা কোনোরকম শ্রমসাধ্য কাজে লিপ্ত হয় তখনই যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাদের ম্যখে গান জেগে ওঠে। মেয়েরা দৈনন্দিন কাজ ছাড়া করতে পারে কিনা সন্দেহ(৯৬)!

বূশের প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, কাজের তাল থেকেই মানুষের ভাষায় ছন্দের জন্ম হয়েছে। তাঁর সিদ্ধান্ত আরো স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে পরবর্তী কালের গবেষনায়।

———————
৮৯. G. Thomson SAGS ch. Xiv.

৯০. ছান্দোগ্য উপনিষদ ১.৩.৬।
৯১. G. Thomson FP ch. I.
৯২. G. Thomson SAGS 445.
৯৩. Ibid 446.
৯৪. Ibid
৯৫. Ibid
৯৬. Ibid

১৭. গান-কাজ-নাচ

কিন্তু শ্রমসঙ্গীদের তাৎপর্য—গানের সঙ্গে কাজের আদিম যোগাযোগটির রহস্য—স্পষ্টভাবে বুঝতে হলে আরো কয়েকটি দিকে নজর রাখা দরকার।

প্রথমত, অসভ্য মানুষদের মধ্যে—এবং পিছিয়ে-পড়ে-থাকা সভ্য মানুষদের মধ্যেও—কাজের সঙ্গে শুধুমাত্র গানেরই যোগাযোগ নয়। তাছাড়াও নাচের যোগাযোগ। বস্তুত, আদিতে নাচ ছাড়া গান সম্ভবই নয়। কিংবা, ঘুরিয়ে বললে বলা যায়, আদিম মানুষদের মধ্যে নাচ-কাজ-গান—সবসুদ্ধু একসঙ্গে মিশে একাকার হয়ে রয়েছে(৯৭)। তার মধ্যে কতোটা ঠিক নাচ, কতোটুকু নিছক কাজ এবং কতোটুকু শুধুমাত্র সংগীত—এ-ধরনের তফাত করবার চেষ্টাই কৃত্রিম।

দ্বিতীয়ত, এই যে নাচ-কাজ-গান—এর তাৎপর্যটুকু বিচার করতে দেখতে পাওয়া যায় মানুষের পিছিয়ে-পড়া অবস্থায় উৎপাদন-কাজের পক্ষে নাচগান বাহুল্য তো নয়ই, বরং অনিবার্যভাবেই উদ্দেশ্যমূলক ও প্রয়োজনীয়(৯৮)।

এই দ্বিতীয় কথাটিকে মনে না রাখলে ছান্দোগ্য-বর্ণিত কুকুরদের সামগান কিছুতেই বোঝা যাবে না। তাই এ বিষয়টিকেই বিশ্লেষণ করে এগোবার চেষ্টা করা যাক।

উৎপাদন-কৌশনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে দশজন মিলে একসংগে একই কাজে হাত না লাগালে কাজটাই অসম্ভব। তার কারণ কাজের হাতিয়ার তখন এমনই স্থূল যে কারুর পক্ষেই একা একটি পুরো কাজ করবার উপায় নেই। তাই সে-অবস্থায় নিজে নিজে কোনো কাজ করবার কথা ওঠে না, কাজ যা তা ওই পুরো দলটিরই।

কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করতে করতেই মানুষের হাতিয়ার ধারালো হয়েছে, উন্নত হয়েছে তার উৎপাদন কৌশল।

উন্নতির একটি পর্যায়ে পৌঁছে দেখা গেলো একজন মানুষ নিজে একটা গোটা কাজ করতে শিখেছে। ওই একটি কাজের জন্যে দশজনে আর একসঙ্গে হাত লাগাতে বাধ্য নয়। প্রত্যেকেই যে-যার কাজ করতে পারে। কিন্তু তাই বলে যৌথ-প্রেরণার প্রয়োজন যে মিটলো তা নিশ্চয়ই নয়। প্রত্যেকেই নিজের নিজের কাজ করতে, কিন্তু সকলে মিলে দল হিসেবে কাজ করবে। বরং যে-যার নিজের কাজের দায়িত্ব নিতে পারবার দরুনই যৌথ-প্রেরণার প্রয়োজনটা বাড়বার কথা : এখন আর দশ-হাত প্রত্যক্ষভাবে এক জায়গায় মিলছে না, তাই মনের দিক থেকে প্রত্যেকের কাছেই সাহসের আর বিশ্বাসের চাহিদাটা বেশি হয়েছে।

কিসের সাহস? কোন ধরনের বিশ্বাস?

যদিও একজনের নিজের উপর গোটা কাজটার দায়িত্ব পড়েছে তবুও আসলে সে একা নয়—দলের সবাই তার সঙ্গেই রয়েছে। তারই সাহস।

কোন বিশ্বাস থেকে এ-ধরনের সাহস পাওয়া সম্ভব? যাদুবিশ্বাস।

কাজে বেরুবার আগে সবাই মিলে এক হয়ে একই কামনা করবে।

শুধু তাই নয়, সবাই মিলে এক হয়ে একসঙ্গে দেখবে ওই কামনাটি সফল হবার ছবি।

কাজ শুরু হবার আগেই কামনা সফল হবার এই ছবিটি কেমন করে দেখতে পাওয়া সম্ভব? বাস্তবে নয় নিশ্চয়ই। কল্পনায়। আর কল্পনার ছবিটি দেখবার জন্যেই আদিম মানুষের পক্ষে নাচ-গানের আয়োজন : পুরো দলকে ডাক দিয়ে তারা একসঙ্গে মিলা নাচবে আর গান করবে—নাচটার আগাগোড়াই হলো কামনা সফল হবার অনুকরণ, গানটার আগাগোড়াই হলো কামনা সফল হবার অনুকরণ। এইভাবে কামনা সফল হবার ছবিটি দেখতে দেখতে পুরো দল মেতে উঠবে, মেতে উঠে কাজে বেরুবে। দলের মাতন—সে তো আর যেমন-তেমন নয়। সেই সাহসে বুক বেঁধে বেরুতে পারলে কেউই আর নিরুপায় নয়, দুর্বল নয়। অর্থাৎ কিনা, ওই নিরুপায়-বোধ বা দুর্বলতা-বোধটি মন থেকে কেটে যায়।

আজো পৃথিবীর আনাচে-কানাচে যে-সব মানুষের দল পিছিয়ে-পড়া অবস্থায় টিকে রয়েছে তাদের চেতনায় কাজের সঙ্গে নাচ-গানের সম্পর্কটা কী রকম তাই দেখা যাক।

শ্রীমতি জেন হ্যারিশন বলছেন :

When a savage wants sun or wind or rain, he does not go to church and prostrate himself before a false god; he summons his tribe and dances a sun dance or a wind dance or a rain dance. When he would hunt and catch a bear, he does not pray to his god for strength to outwit and outmatch the bear, he rehearses his hunt in a bear dance.(৯৯)
আদিম মানুষ যখন রোদ, হাওয়া বা বৃষ্টি চায় তখন সে দেবালয়ে গিয়ে কোনো অলীক দেবতার পায়ে লুটিয়ে পড়ে না। সে ডাক দেয় নিজের গোষ্ঠীকে এবং রোদের নাচ বা হাওয়ার নাচ বা বৃষ্টির নাচ নাচতে শুরু করে। ভালুক  শিকার করবার আগে ভালুকটিকে হারিয়ে দেবার জন্যে সে তার দেবতার কাছে শক্তি ভিক্ষে করে না; ভালুক নাচ নেচে শিকারের মহড়া দিয়ে নেয়।

শ্রীমতি জেন হ্যারিশন(১০০) দেখিয়ে চলেছেন, মেক্সিকোর তারাহুমারে নামের মানুষদের মধ্যে ‘নাচা’ আর ‘কাজ-করা’—দুটি বিষয় বোঝাবার জন্যে দুটি স্বতন্ত্র শব্দ নেই। একই শব্দের ওই রকম দুটো মানে। দলের নাচে যোগ না দিয়ে যদি কোনো ছোকরা বসে থাকা তাহলে বুড়োরা তাকে ধমক দিয়ে বলবে, কুঁড়ের মতো বসে না থেকে কাজে লাগছো না কেন? বয়েস বাড়া বোঝাবার জন্যে ওরা বলে, নাচের সংখ্যা বাড়া। দলের নাচে যোগ না দিতে পারলে মানুষ কপাল চাপড়ে বলে, এ-রকম অকর্মণ্য হয়ে বেঁচে থেকে লাভ কী?

নাচ-গানের সঙ্গে কাজের এই যে যোগাযোগ এর মূলে রয়েছে আদিম মানুষদের একটি অদ্ভুত বিশ্বাস। তার নামে যাদুবিশ্বাস—ইংরেজীতে বলে ম্যাজিক। কী রকমের বিশ্বাস? কল্পনায় প্রকৃতিকে জয় করতে পারলে বাস্তব ভাবে প্রকৃতিকে জয় করাও সত্যিই সম্ভবপর হবে। কল্পনায় জয় করা মানে কী? জয়ের একটা নকল তোলা,—কামনা সফল হয়েছে তারই যেন অভিনয় করা। আকাশে বৃষ্টি চাইলে ওরা দলের সবাইকে ডাক দিয়ে শুরু করবে বৃষ্টির নাচ : আকাশে জলের ছিটে ছুঁড়ে বৃষ্টির নকল তুলবে, বাজনা বাজিয়ে নকল করবে মেঘের ডাক, আর ওরা ভাববে এইভাবে কামনা সফল হওয়ার নকল করে সত্যিই বুঝি কামনাকে সফল করা সম্ভব হবে।

ওদের কাছে, আসল কাজের সঙ্গে যাদুবিশ্বাসের তফাতটা তেমন স্পষ্ট নয়। যাদুবিশ্বাস ছাড়া ওদের পক্ষে বাঁচাই কঠিন—কেননা, ওদের হাতিয়ারের অবস্থা এমনই করুণ যে, মন থেকে অন্তত দুর্বলতা-বোধটুকুকে দূর করবার চেষ্টা দরকার। দুর্বলতা-বোধকে দূর করবার কৌশল ওই যাদুবিশ্বাস। আর এই যাদুবিশ্বাসই হলো ওদের নাচ-গানের ষোলো আনা।

মাওরিদের(১০১) মধ্যে এক রকমের নাচ আছে। তাকে বলে আলুর নাচ। ফসলের জন্যে পুব-হাওয়ার দরকার। তাই ওদের দলের তরুণী মেয়েরা ক্ষেতে গিয়ে নাচতে শুরু করে। নাচের আগাগোড়াই হলো ঝড় আর বৃষ্টি আর ফুলফোটা আর ফসল-ফলার অনুকরণ। নাচতে নাচতে তারা গান গাইতে শুরু করে, গানের মধ্যে কামনার প্রকাশ : চারাগুলি যেন তাদেরই অনুকরণ করে। অর্থাৎ, ওই মেয়েরা বাস্তবে যা চায় তাই কল্পনায় ফুটিয়ে তোলে নাচের দোলায়, গানের কথায়। দৃষ্টান্তটি সম্বন্ধে অধ্যাপক জর্জ টমসনের মন্তব্যটুকু ভালো করে দেখা দরকার। তিনি বলছেন, আলুর উপর ওই নাচের কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাব নিশ্চয়ই সম্ভব নয়, কিন্তু যে-মেয়েরা নাচছে তাদের নিজেদের উপর নাচটির যথেষ্ট প্রভাব পড়তে বাধ্য। নাচতে নাচতে তাদের মনে বিশ্বাস জন্মেছে যে এরই দরুন চারাগাছগুলি রক্ষা পাবে। তারপর ওই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে তারা যখন গাছগুলির পরিচর্যা করতে লাগলো তখন তাদের আত্মবিশ্বাস আর শক্তিসামর্থ ঢের বেড়ে গিয়েছে। তাই শেষ পর্যন্ত ফসলের উপরও নাচটার প্রভাব পড়ে বই কি। এই নাচেরই দরুন বহির্বাস্তবের প্রতি মেয়েদের মনের ভাবটা বদলায়, ফলে পরোক্ষভাবে এই নাচই বহির্বাস্তবকেও বদল করে(১০২)।

ঠিক একই বিষয় চোখে পড়ে বাংলা দেশের ব্রতগুলির মধ্যে—অবশ্যই, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেগুলিকে বলছেন খাঁটি মেয়েলি ব্রত, এবং যেগুলি কিনা, তাঁর ধারণায়, “পুরাণেরও পূর্বেকার বলে বোধ হয়”(১০৩)। অবনীন্দ্রনাথের একটি বর্ণনা দেখুন :

এমনি শস্‌পাতার ব্রত। সেখানে আমরা দেখি মানুষ শস্যের কামনা করছে; কিন্তু সেই কামনা সফল করবার জন্যে সে যে নিশ্চেষ্টভাবে কোনো দেবতার কাছে জোড়হাতে ‘দাও দাও’ করছে তা নয়; সে যে-ক্রিয়াটা করছে তাতে সত্যিই ফসল ফলিয়ে যাচ্ছে এবং ফলস ফলার যে আনন্দ সেটা নাচ গান এমনি নানা ক্রিয়ায় প্রকাশ করছে। বর্ধমান অঞ্চলের মেয়েদের মধ্যে এই শস্‌পাতার ব্রত বা ভাঁজো, ভাদ্রমাসের মন্থনষষ্ঠী থেকে আরম্ভ হয়ে পরবর্তী শুক্লাদ্বাদশীতে শেষ হয়। মন্থনষষ্ঠীর পূর্বদিন পঞ্চমী তিথিতে পাঁচ রকমের শষ্য—মটর, মুগ। অড়হর, কলাই, ছোলা—একটা পাত্রে ভিজিয়ে রাখা হয়; পরদিন ষষ্ঠীপূজায় এইগুলি নৈবেদ্য দিয়ে বাকি শস্য সরষে এবং ইঁদুরমাটির সঙ্গে মেখে একটি নতুন সরাতে রাখা হয়; দ্বাদশী পর্যন্ত মেয়েরা স্নান করে প্রতিদিন এই সরাতে অল্প অল্প জল দিয়ে চলে; চার-পাঁচদিন পরে যখন শস্য সব অঙ্কুরিত হতে থাকে তখন জানা যায় এ-বৎসর শস্য প্রচুর হবে এবং মেয়েরা তখন শস্য উৎসবের আয়োজন করে। ইন্দ্রদ্বাদশীতে এই উৎসব; চাঁদের আলোতে উঠানের মাঝখানে এই অনুষ্ঠান। নিকোনো বেদীর উপর ইন্দ্রের বজ্রচিহ্ন দেওয়া আলপনা; কোথাও মাটির ইন্দ্রমূর্তিও থাকে। এই বেদীর চারিদিকে, পাড়ার মেয়েরা সকলে আপন-আপন শস্‌পাতার সরাগুলি সাজিয়ে দেয়, তারপর সাত-আট থেকে কুঁড়ি-পঁচিশ বছরের মেয়েরা হাত ধরাধরি করে বেদীর চারদিক ঘিরে নাচগান শুরু করে। উঠানের এক অংশে পর্দার আড়ালে বাদ্যকর তাল দিতে থাকে :

ভাঁজো লো কনকলানী, মাটির লো সরা,
ভাঁজোর গলায় দেবো আমরা পঞ্চফুলের মালা।…

এরপর দুই দলে ভাগ হয়ে মুখেমুখে ছড়াকাটাকাটি করে।…সমস্ত রাত দুই দলের নাচগান ছড়াকাটাকাটির উপরে চাঁদের আলো, তারার ঝিকিমিকি।…

এরপর রাত্রিশেষ, মেয়েরা আপন-আপন শস্‌পাতার সরা মাথায় নিয়ে পুকুরে কিংবা নদীতে বিসর্জন দিয়ে ঘরে আসে। এখানে শস্যের উদ্গমের কামনা সরাতে শস্যবপন ক্রিয়া থেকে আরম্ভ হলো এবং অনুষ্ঠান শেষ হলো উৎসবের নৃত্যগীতে…(১০৪)

————–
৯৭. G. Thomson ch. xiv.
৯৮. Ibid.
৯৯. J. E. Harrison AAR 30.
১০০. Ibid 30f.
১০১. G. Thomson SAGS 440.
১০২. Ibid
১০৩. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর : বাংলার ব্রত ৩।
১০৪. ঐ ৫৩-৩।

১৮. ব্রত-প্রসঙ্গে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাস পুনর্গঠন করবার মালমসলা হিসেবে বাংলার এই ব্রতগুলি সত্যিই অমূল্য। এমনকি, এই একান্ত লোকায়তিক অনুষ্ঠানগুলির সাহায্যেই বৈদিক সাহিত্যের নানান দুর্বোধ্য তথ্য বোঝবার সম্ভাবনা রয়েছে। এ-বিষয়ে অননীন্দ্রনাথের মন্তব্য বিশেষ করে মনে রাখা দরকার :

খাঁটি মেয়েলি ব্রতগুলিতে তার ছড়ায় এবং আলপনায় একটা জাতির মনের, তাদের চিন্তার, তাদের চেষ্টার ছাপ পাই। বেদের সূক্তগুলিতেও সমগ্র আর্যজাতির একটা চিন্তা, তার উদ্যম উৎসাহ ফুটে উঠেছি দেখি। এ-দু’-এরই মধ্যে লোকের আশা আশঙ্কা চেষ্টা ও কামনা আপনাকে ব্যক্ত করেছে এবং দু’-এর মধ্যে এইজন্যে বেশ একটা মিল দেখা যাচ্ছে। নদী সূর্য এমনি অনেক বৈদিক দেবতা, মেয়েলি ব্রতেও দেখি এঁদেরই উদ্দেশ্যে ছড়া বলা হচ্ছে(১০৫)।

অবনীন্দ্রনাথ দেখাচ্ছেন, বৈদিক সূক্তে ঊষাকে, নদীসকলকে উদ্দেশ্য করে যে-রকম কবিতা রচনা হয়েছিলো খাঁটি মেয়েলি ব্রতগুলির মধ্যে প্রায় তারই পুনরুক্তি পাওয়া যায়(১০৬)। এবং এই প্রসঙ্গেই মনে রাখা দরকার আর্য-অনার্য মতবাদ সাধারণত আমাদের পণ্ডিতমহলে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে থাকে অবনীন্দ্রনাথের মন্তব্য তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত :

আর্য এবং আর্যপূর্ব দু’জনেরই সম্পর্ক যে-পৃথিবীতে তারা জন্মেছে তাকেই নিয়ে, এবং দু’জনেরই কামনা এই পৃথিবীতেই অনেকটা বদ্ধ ধন ধান সৌভাগ্য স্বাস্থ্য দীর্ঘজীবন এমন সব পার্থিব জিনিস; দু’জনে ব্রত করছে যা কামনা করে সেটা দেখলে এটা স্পষ্টই বোঝা যাবে, কেবল পুরুষের চাওয়া আর মেয়েদের চাওয়া, বৈদিক অনুষ্ঠান পুরুষদের আর ব্রত অনুষ্ঠান মেয়েদের, এই যা প্রভেদ। ঋষিরা চাচ্চেন—ইন্দ্র আমাদের সহান হোন, তিনি আমাদের বিজয় দিন, শত্রুরা দূরে পলায়ন করুক, ইত্যাদি; আর বাঙালির মেয়েরা চাইছে—‘রণে রণে এয়ো হব, জনে জনে সুয়ো হব, আকালে লক্ষ্মী হব, সময়ে পুত্রবতি হব’। এর সঙ্গে পৃথিবী-ব্রতের শাস্ত্রীয় প্রণাম-মন্ত্রটি দেখি—

বসুমাতা দেবী গো! করি নমস্কার।
পৃথিবীতে জন্ম যেন না হয় আমার।

এই যে পৃথিবীর যা-কিছু তার উপরে ঘোর বিতৃষ্ণা এবং ‘গোক’লে গোকূলে বাস, গরুর মুখে দিয়ে ঘাস আমার যেন হয় স্বর্গে বাস’—এই অস্বাভাবিক প্রার্থনা ও স্বপ্ন, এটা বেদেরও নয়, ব্রতেরও নয়। বৈদিক সূক্তগুলি আর ব্রতের ছড়াগুলিকে আমাদের রূপকথায় বিহঙ্গম বিহঙ্গম দুটির তুলনা করা যেতে পারে। দু’জনেই পৃথিবীর, কিন্তু বেদসূক্তগুলি ছাড়া ও স্বাধীন, উদার পৃথিবীর গান; আর ব্রতের ছড়াগুলি যেন নীড়ের ধারে বসে ঘন সবুজের আড়ালে পক্ষিমাতার কাকলি—কিন্তু দুই গানই পৃথিবীর সুরে বাঁধা(১০৭)।

অবনীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছেন, ব্রতের সঙ্গে বেদের সাদৃশ্য সত্ত্বেও একটি মৌলিক অমিল রয়েছে : বৈদিক অনুষ্ঠান পুরুষদের আর ব্রত অনুষ্ঠান মেয়েদের। বামাচার-প্রসঙ্গেও আমরা এই রকমই একটি প্রভেদ লক্ষ্য করেছি : বৈদিক সাহিত্যে বামাচারের স্মারকগুলি পুরুষপ্রধান, লোকায়তিক বামাচার স্ত্রীপ্রধান। এই প্রভেদের কারণ ঠিক কী—সে প্রশ্নের আলোচনায় পরে ফিরতে হবে। আপাতত, সাদৃশ্যের দিকটিতেই মনোযোগ দেওয়া যাক। অবনীন্দ্রনাথ বলছেন, দুই গানই পৃথিবীর সুরে বাঁধা, দু’-এর মূলেই কামনা হলো এই পৃথিবীতেই অনেকটা বদ্ধ ধন ধান সৌভাগ্যে স্বাস্থ্য দীর্ঘজীবন এমন সব পার্থিব জিনিস। দার্শনিক পরিভাষায়, দুই-ই প্রাক-অধ্যাত্মবাদ, প্রাক-ভাববাদ। আমাদের যুক্তি অনুসারে তার কারণ অস্পষ্ট নয় : দু’-এর উৎসেই রয়েছে প্রাগ-বিভক্ত সমাজ-জীবন। যে-চেতনায় প্রাগ-বিভক্ত সমাজ-জীবন প্রতিফলিত তার মধ্যে অধ্যাত্মবাদের বিকাশ হবার অবকাশ নেই।

ব্রতের মধ্যে সমাজ-জীবনের কোন পর্যায়ের প্রতিচ্ছবি, সে-প্রশ্ন অবশ্য অবনীন্দ্রনাথ তোলেন নি। কিন্তু তবুও তাঁরই নানা মন্তব্য আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায় ব্রতের সঙ্গে প্রাগ-বিভক্ত সমাজের যোগাযোগ অন্বেষণ করবার দিকে। প্রথমত, তিনি বলছেন, এই আদি অকৃত্রিম ব্রতগুলি অতি প্রাচীন—আর্যরা এ-দেশে আসবার আগে থাকতেই এ-দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত ছিলো(১০৮)। ব্রতগুলি যদি সত্যিই অতো পুরোনোকালের হয় তাহলে তার মধ্যে সমাজ-বিকাশের অতি প্রাচীন পর্যায়ের প্রতিচ্ছবিই খুঁজে পাওয়া স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, বাংলা দেশের এই ব্রতগুলিকে বোঝবার কৌশল হিসেবে তিনি যে-পদ্ধতির কথা বলছেন তারও ঈঙ্গিতটা একই রকম : পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আজো যে-সব মানুষ সমাজ-বিকাশের অনেক আদিম পর্যায়ে পড়ে রয়েছে তাদের আচরণ থেকে এগুলিকে বোঝবার সূত্র পাওয়া যাবে। বস্তুত, বাংলা দেশের লক্ষ্মীব্রতটি বোঝবার জন্যে অবনীন্দ্রনাথ প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারের মেক্সিকো, পেরু প্রভৃতি দেশের অনার্যদের(১০৯) আচরণ থেকেই আলো সংগ্রহ করছেন। বাংলার ব্রতের সঙ্গে এ-জাতীয় আদিবাসীদের ক্রিয়াকর্মের যদি মিল থাকে তাহলে নিশ্চয়ই অনুমান করবার সুযোগ থাকে যে, দু’-এর মূলেই অনুরূপ সমাজ-বাস্তব। তৃতীয়ত, ব্রতের সঙ্গে প্রাগ-বিভক্ত সমাজের সম্পর্কের ইঙ্গিত অবনীন্দ্রনাথের নিম্নোক্ত মন্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট ফুটে উঠতে দেখা যায় :

একজন মানুষের কামনা এবং তার চরিতার্থতার ক্রিয়া, ব্রত-অনুষ্ঠান বলে ধরা যায় না। যদিও ব্রতের মূলে কামনা এবং চরিতার্থতার জন্য ক্রিয়া, কিন্তু  ব্রত তখন যখন দশে মিলে এককাজ এক-উদ্দেশ্যে করছে। ব্রতের মোটামুটি আদর্শ এই হলো—এদের কামনা দশের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে একটা অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছে। একের সঙ্গে অন্য দশজনে কেন যে মিলছে, কেন যে একের অনুকরণ দশে করছে, সেটা দেখবার বিষয় হলেও আমরা সে-সব জটিল প্রশ্নের এখন যাবো না। একজনকে দিয়ে নাচ অলে কিন্তু নাটক চলে না, তেমনি একজনকে দিয়ে উপাস্য দেবতার উপাসনা চলে কিন্তু ব্রত অনুষ্ঠান চলে না। ব্রত ও উপাসনা দুই-ই ক্রিয়া—কামনার চরিতার্থতার জন্য; কিন্তু একটি একের মধ্যে বদ্ধ এবং উপাসনাই তার চরম, আর একটি দশের মধ্যে পরিব্যাপ্ত—কামনার সফলতাই তার শেষ—এই তফাত(১১০)।

একের সঙ্গে অন্য দশজনে কেন মিলছে—অবনীন্দ্রনাথ সেই জটিল প্রশ্নে গেলেন না; কিন্তু এ-সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ব্রতের সমস্যা জটিল হয়েই থাকবে। তিনিই যে পথের নির্দেশ দিয়েছেন সেই পথে অগ্রসর হলে আমরা হয়তো এই প্রশ্নেরও উত্তর পেয়ে যাবো। তাই আমরা এখানে আর একটি প্রশ্ন তুলতে চাই : পৃথিবীর আনাচে-কানাচে আজো যে-সব আদিম মানুষের দল বেঁচে রয়েছে তাদের সম্বন্ধে সাধারণতভাবে এমন কোনো কথা জানা আছে কিনা যার সাহায্যে ওই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে, বোঝা যাবে একের সঙ্গে অন্য দশজনে কেন মিলছে।

এ-বিষয়ে শ্রীমতি জেন হ্যারিশনের(১১১) গবেষণা থেকে মূলবান তথ্য পাওয়া যায় :

One element in the rite we have already observed, and that is that it be done collectively, by a number of persons feeling the same emotion. A meal digested alone is certainly no rite; a meal eaten in common under the influence of a common emotion, may, and often does tend to become a rite.
Collectivity and emotional tension, two elements that tend to turn the simple reaction into a rite, are–specially among primitive peoples–closely associated, indeed scarcely separable. The individual among savages has but a thin and meagre personality; high emotional tension is to him only caused and maintained by a thing felt socially; it is what the tribe feels that is sacred, that is matter for ritual. He may make by himself excited movements, he may leap for joy, for fear; but unless these movements are made by the tribe together they will not become rhythmical; they will probably lack intensity, and certainly permanence.
আদিম অনুষ্ঠানের (rite) একটি অঙ্গ আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি; সেটি হলো তার সম্পাদন যৌথভাবে করা দরকার,—একাধিক মানুষ একই আবেগ অনুভব করবে। একা একা খেতে বসলে তা কখনো অনুষ্ঠান হবে না; একই আবেগের বশে একসঙ্গে খেতে বসলে তা অনুষ্টান হতে পারে এবং প্রায়ই দেখা যায় তা অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছে।
বিশেষত, আদিম মানুষদের মধ্যে দেখা যায় যে-দুটি উপাদন সাধারণ ক্রিয়াকে অনুষ্ঠানে পরিণত করতে চায়,—অর্থাৎ, যৌথভাব আর আবেগের চাপ—ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে সংযুক্ত ও এমনকি অবিচ্ছেদ্য। আদিম মানুষদের মধ্যে ব্যষ্টির ব্যক্তিত্ব নেহাতই ক্ষীণ…। সে হয়তো একাএকা উত্তেজিত অঙ্গভঙ্গি করতে পারে, লাফিয়ে উঠতে পারে আনন্দে, ভয়ে; কিন্তু পুরো গোষ্ঠী যতোক্ষণ না এই ক্রিয়ায় মেতে ওঠে ততোক্ষণ তা ছন্দোময় হবে না; তার মধ্যে সম্ভবত তীব্রতা থাকবে না, স্থায়িত্ব তো নয়ই।

তাহলে ব্রতের ওই বৈশিষ্ট্যটিকে—একের সঙ্গে অন্য দশজনে কেন মিলছে তা—বুঝতে পারবার মূলসূত্র পাওয়া যাবে আদিম মানুষদের আচরণ থেকেই । আদিম সমাজে একের কোনো সত্তা নেই, একার পরিচয়টা নেহাতই ক্ষীণ। তার দশে মিলে একসঙ্গে এক হয়ে যখন কিছু করে তখনই কাজটি সঞ্জীবিত হয়ে ওঠে এবং এই দিক থেকেই বুঝতে পারা যায় আদিম সমাজ-জীবনে যাদুবিশ্বাসের উপযোগিতাটুকুও। মনে রাখতে হবে দশজন মিলে একই সঙ্গে একই কথা ভাবছে, একই কাজ করছে। তাদের চোখের সামনে দুলছে কামনা সফল হবার ছবি। একার সামনে নয়। একের সামনে নয়। দশজনে এক হয়েছে। একই কথা ভাবছে। একই ছবি দেখছে। দেখতে দেখতে মেতে উঠছে পুরো দশটা। দলের মাতন—সে তো আর যেমন-তেমন নয়। কামনা সফল হবার ছবিটা অবশ্যই কাল্পনিক, কিন্তু পুরো দলটির পক্ষে ওই ভাবে মেতে ওঠাটা নিশ্চয়ই কাল্পনিক নয়। আর তারই সাহায্যে কামনাকে বাস্তবভাবে সফল করবার চেষ্টাও অনেকখানি সফল হতে পারে বই কি।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রতের যে-সব দিকগুলির প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তার জন্যে আমরা নিশ্চয়ই তাঁর কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ থাকবো। কিন্তু যে-দিকগুলির আলোচনা তিনি তোলেন নি সেগুলি সম্বন্ধেও আমাদের পক্ষে উদাসীন থাকবার উপায় নেই। এই দিকগুলির মধ্যে প্রধাণতই, ওই যাদুবিশ্বাসের এবং জীবনধারণের পক্ষে সে-বিশ্বাসের উপযোগিতার দিকটি। ব্রতের প্রাণ-বস্তু হলো যাদুবিশ্বাস—মানুষ যা কামনা করে ব্রত করছে ব্রতের মধ্যে সেই কাজটিই সফল হবার একটা নকল করা হচ্ছে, এবং নকল যে করা হচ্ছে তা প্রধানত এই বিশ্বাস থেকেই যে, মানুষ যা করবে প্রকৃতিতে বাস্তবিকই তাই ঘটবে। “তাঁজো লো কলকলানী, মাটির লো সরা”—মেয়েরা এই গান করছে মনের আনন্দকে প্রকাশ করবার তাগিদে নয়, তাদের মনে মনে বিশ্বাস যে, ওই ভাবেই ভাঁজো সত্যিই কলকলিয়ে উঠবে, ফলবে প্রচুর শস্য। কিংবা, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই যেমন বলছেন, “মেক্সিকোতে কোজাগর লক্ষ্মীপূজোয় মেয়েরা এলোকেশী হয়,—শস্য যেন এই এলোকেশের মতো গোছাগোছা লম্বা হয়ে ওঠে, এই কামনায়”(১১২)। কিন্তু শুধু কামনাই নয়, কামনা সফল হওয়ায় বিশ্বাসও। সেই বিশ্বাস হলো যাদুবিশ্বাস।

প্রাচীন-সমাজে তাই নাচগান অবসর-বিনোদন নয়, সৌন্দর্য উপভোগ নয়। এগুলির উৎসে রয়েছে যাদুবিশ্বাস। এবং এই যাদুবিশ্বাসকে উদ্দেশ্যহীন অন্ধ সংস্কার মনে করাও ভুল হবে। কেননা, যতোদিন পর্যন্ত মানুষের উৎপাদন-কৌশল অনুন্নত ততোদিন কাজের জন্যেই যাদুবিশ্বাসের অতো প্রয়োজন। এই কারণেই আদিম যুগে গান আর অন্ন-আহরণ সত্যিই আলাদা হয় নি।

সমাজ-বিকাশের সেই রকমই এক প্রাচীন পর্যায়ের ছবি টিকে রয়েছে ছান্দোগ্য-উপনিষদের আলোচ্য অংশটিতে। ছবিটা যে প্রাচীন সমাজেরই তার প্রমাণ হলো মানুষগুলির ওই রকম অদ্ভূত বর্ণনা : কুকুর।

যে-মানবদলকে অমন সরাসরি কুকুর বলে বর্ণনা করা হচ্ছে তাদের কাছে গান অবসর-বিনোদন নয়; ক্ষুন্নিবৃত্তির—অতএব, অন্নপ্রাপ্তির—উপায়ই।

অন্নং নো ভগবানাগায়ত্বশনায়ম

কার কোনো দেশের আর কোনো প্রাচীন পুঁথির মধ্যে সংগীতের আদি-তাৎপর্য-সংক্রান্ত এমন স্পষ্ট ও অভ্রান্ত দলিল পাওয়া যায় কিনা খুবই সন্দেহের কথা(১১৩)। কিন্তু ছান্দোগ্য-উপনিষদের আলোচ্য অংশের তাৎপর্য শুধু এইটুকুই নয়। তাছাড়াও আরো কয়েকটি তাৎপর্য রয়েছে, সেগুলিকে বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করা দরকার।

—————

১০৫. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর : বাংলার ব্রত ২।
১০৬. ঐ ২-৩।
১০৭. ঐ ৪-৫।
১০৮. ঐ ৭।
১০৯. ঐ ২১ ইত্যাদি।
১১০. ঐ ৮।
১১১. J.E. Harrison AAR 37.
১১২. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর : বাংলার ব্রত ২১।
১১৩. প্রাচীন গ্রীক সাহিত্য সংক্রান্ত তথ্যাবলি অধ্যাপক জর্জ টমসনের রচনায় দ্রষ্টব্য।

১৯. কামনা ও যাদুবিশ্বাস

যাদুবিশ্বাস থেকেই সংগীতের জন্ম। যাদুবিশ্বাএর মূল কথা হলো, কোনো এক কামনা। এই কামনাকে কল্পনায় সফল করে প্রাচীন মানুষ মনে করেছে যে বাস্তবিকই তা বুঝি সফল হতে চললো।

উপনিষদের ঋষিদের স্মৃতি থেকেও এই আদিম সত্যের উপলব্ধি সত্যিই মুছে যায়নি। ছান্দোগ্য-উপনিষদে বলা হচ্ছে :

তস্মাদু হৈবংবিদুদ্গাতা ব্রূযাত্  ।।১।৭।৮।।
কং তে কামমাগাযানীত্যেষ হ্যেব কামাগানস্যেষ্ঠে য এবং বিদ্বান্সাম গাযতি সাম গাযতি ।।১।৭।৮।।
অর্থাৎ,…সেই জন্য এই প্রকার জ্ঞানসম্পন্ন উদ্গতা বলিবেন : ‘তোমার কোন্‌ কাম্যবস্তুকে গান করিব’? কেননা, যিনি এই প্রকার জানিয়া সামগান করেন তিনি কামগানকে শাসন করেন। হিউম্‌-এর তর্জমা অনুসারে : For truly he is the lord of the winning of desires by singing…(১১৪)

মূলে রয়েছে, ‘কামগানস্য’। শব্দটার মানে কী? মূলে রয়েছে, ‘কামম্‌ আগায়ানি’। কথাগুলির মানে কী? যদি গান সম্বন্ধে আধুনিক যুগের ধ্যানধারণাকেই একমাত্র সম্বল করে উপনিষদের এই ধরনের উক্তিগুলি বোঝবার চেষ্টা করা হয় তাহলে সে-চেষ্টা সফল হবার সম্ভবনা নেই। অপরপক্ষে, আজো পৃথিবীর আনাচে-কানাচে সে-সব মানুষের দল সমাজ-বিকাশের প্রাচীন পর্যায়ে আটকে পড়ে রয়েছে তাদের সম্বন্ধে সাধারণ ভাবে জানতে-পারা তথ্যকে অবলম্বন করে যদি এ-জাতীয় উক্তি বোঝবার চেষ্টা করা যায় তাহলে তার তাৎপর্য উদ্ধার করা এতোটুকুও কঠিন হবে না। কেননা, সমাজ-বিকাশের ওই প্রাচীন পর্যায়ে পড়ে-থাকা মানুষগুলির মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় গানের উৎসে যাদুবিশ্বাস। এবং এই যাদুবিশ্বাসের প্রাণ হলো তীব্র কামনার আবেগ।

গানের সঙ্গে যাদুবিশ্বাসের যোগ যে কতো নিবিড় তার স্মৃতি উপনিষদের ঋষিদের মন থেকে মোটেই মুছে যায় নি। ছান্দোগ্য থেকেই অনেক দৃষ্টান্ত আহরণ করা যায় :

বৃষ্টৌ পঞ্চবিধং সামোপাসীত পুরোবাতো হিঙ্কারো মেঘো জায়তে স প্রস্তাবো বর্ষতি স উদ্গীথো বিদ্যোততে স্তনয়তি স প্রতিহারঃ উদ্গৃহ্ণাতি তন্নিধনং ।।২।৩।১।।
বর্ষতি হাস্মৈ বর্ষযতি হ য এতদেবং বিদ্বান্‌ বৃষ্টৌ পঞ্চবিধং সামোপাস্তেন ।।২।৩।২।।
অর্থাৎ, বৃষ্টিতে পঞ্চবিধ সামকে উপাসনা করিবে : বৃষ্টির পূর্বে যে বায়ু উত্থিত হয় তাহাই হিঙ্কার, মেঘ উৎপন্ন হয় তাহাই প্রস্তাব, বৃষ্টি পতিত হয় তাহাই উদ্গীথ, বিদ্যুৎ চমকায় ও গর্জন করে তাহাই প্রতিহার, বৃষ্টিপাত শেষ হয় তাহাই নিধন। যিনি ইহাকে এইরূপ জানিয়া বৃষ্টিতে পঞ্চপ্রকাস সামের উপাসন করেন তাঁহার জন্য মেঘ বর্ষণ করে এবং বর্ষণ করাইতে পারেন।

‘উপাসীত’ কথাটার আদি অর্থ কী তা নিয়ে নিশ্চয়ই সুদীর্ঘ আলোচনা তোলবার অবকাশ আছে(১১৫)। কিন্তু সে-আলোচনা বাদ দিলেও অন্তত এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে উপনিষদের এখানে প্রাচীন সমাজে ভূয়ঃ-প্রচলিত বৃষ্টিযাদুরই স্বাক্ষর। সামগানের উৎসে যে যাদুবিশ্বাস তার প্রমাণ এর চেয়ে আর কতো স্পষ্ট হবে?

উপনিষদের ঋষিদের ধারণায় অন্ন প্রভৃতি একান্ত পার্থিব বস্তু লাভের সঙ্গে গানের—সামগানের—সম্পর্ক কতো ঘনিষ্ঠ তার আরো কয়েকটি নমুনা ছান্দোগ্য থেকেই উদ্ধৃত করা যাক। এই নমুনাগুলি মনে রাখলে বুঝতে পারা যাবে, কুকুরদের মুখে ‘অন্নং নঃ ভগবান আহায়তু’ কথাটি খাপছাড়া তো নয়ই, ঋষিদের চিন্তাধারার সঙ্গে এর সঙ্গতি খুবই স্পষ্ট :

…অন্নবানন্নাদো ভবতি য এতান্যেবং বিদ্বানুদ্গীথাক্ষরাণ্যুপাস্ত…।।১।৩।৭।।
অর্থাৎ, যিনি এই প্রকার জানিয়া উদ্গীথের অক্ষরসমূহকে উপাসনা করেন তিনি অন্নবান ও অন্নভোক্তা হন।

কিংবা,

তং হৈতমতিধন্বা শৌনক উদরশাণ্ডিল্যাযোক্ত্বোবাচ যাবত্ত এনং প্রজাযামুদ্গীথং বেদিষ্যন্তে পরোবরীযো হৈভ্যস্তাবদস্মিঁল্লোকে জীবনং ভবিষ্যতি ।।১।৯।৩।।
অর্থাৎ, শৌনক অতিধন্বা উদ্গীথবিষয়ে উপদেশ দিয়া উদরশাণ্ডিল্যকে বলিয়াছিলেন, যে-পর্যন্ত তোমার সন্তানদের মধ্যে এই উদ্গীথবিষয় জানা থাকিবে সেই-পর্যন্ত তাহাদিগের জীবন এই পৃথিবীতে এই সমুদয় লোকের অপেক্ষা সর্বশ্রেষ্ঠবস্তু-সম্পন্ন হইবে।

কিংবা,

পশুষু পঞ্চবিধং সামোপাসীত…।।২।৬।১।।
ভবন্তি হাস্য পশবঃ পশুমান্‌ ভবতি য এতদেবং বিদ্বান্‌ পশুষু পঞ্চবিধং সামোপাস্তে ।।২।৬।২।।
অর্থাত, পশুসমূহে পঞ্চবিধ সাম উপাসনা করিবে।…যিনি ইহাকে এই প্রকার জানিয়া পশুসমূহে পঞ্চবিধ সামের উপাসন করেন, পশুসমূহ তাঁহার ভোগ্যবস্তু হয় এবং তিনি পশুমান (পশুশালী) হন।

কিংবা,

দুগ্ধেঽস্মৈ বাগ্দোহং যো বাচো দোহোঽন্নবানন্নাদো ভবতি  য এতদেবং বিদ্বান্‌ বাচি সপ্তবিধং সামোপাস্তে ।।২।৮।৩।।
অর্থাৎ, যিনি ইহাকে এইরূপ জানিয়া বাক্যে সপ্তবিধ সামের উপাসনা করেন, তিনি অন্নবান ও অন্নভোক্তা হন। বাক্যের যাহা দুগ্ধ বাক্য স্বয়ং তাহা তাঁহার জন্য দোহন করে। ইত্যাদি। ইত্যাদি।

উপনিষদের ঋষিরা আর যাই হোন, Art for Art’s sake-এর থিয়োরি শেখেন নি। তাঁদের স্মৃতিতে সংগীতের আদি-উদ্দেশ্যের কথা রীতিমতো স্পষ্টভাবেই টেকে ছিলো। অবশ্যই, অনেক সময় ওই আদি-উদ্দেশ্যের সঙ্গে রকমারি পরবর্তী-সমাজের ধারণাকে মিশেল হতে দেখা যায়। কিন্তু সেইটেই বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা হলো, তাঁদের চেতনা থেকে সংগীতের ওই আদি-উদ্দেশ্যের কথা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয় নি। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, উপনিষদের স্থান-বিশেষে,—যেখানে যেখানে সমাজ-বিকাশের অতি-প্রাচীন পর্যায়ের স্পষ্টতর স্মারক পাওয়া যায়, সেখানে-সেখানে,—সংগীতের ওই আদি-উদ্দেশ্যের স্মৃতিটুকুকেও স্পষ্টতরভাবেই টিকে থাকতে দেখা যায়। যেমন, সামগানরত ওই টোটেম্‌-গোষ্ঠীটির বেলায়। তারা গান চাইলো,—মনের আনন্দ মেটাবার জন্যে নয়, পেটের জ্বালা মেটাবার কামনায়, অতএব অন্নের কামনাতেই।

—————-
১১৪. R. E. Hume TPU 184.
১১৫. আধুনিক আধ্যাত্মিক অর্থে উপাসনা নয়। এই গ্রন্থের চতুর্থ পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

২০. গান আর নাচ

সমাজের পুরোনো পর্যায়ে গান কিন্তু শুধু গান নয়। আর সঙ্গে নাচেরও সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ : কামনা সফল হবার ছবিটা মানুষ শুধু কথায় নয়, কাজের মধ্যেও ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছে। মাওরি মেয়েদের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছি : গান ছাড়াও ওরা নাচের মধ্যেই পুব-হাওয়ার আর ফুল ফোটার আর ফসল ফলার অনুকরণ করছে, আর ভাবছে এরই দরুন পাওয়া যাবে ফসল। শস্‌পাতার ব্রতের বেলাতেও একই কথা : ভাঁজোকে কলকলিয়ে তোলবার কামনায় মেয়েদের গান, কিন্তু শুধু গানই নয়—ইন্দ্রদ্বাদশীতে তোলবার কামনায় মেয়েদের গান, কিন্তু শুধু গানই নয়—ইন্দ্রদ্বাদশীতে রাতভোর চাঁচের আলোয় তাদের নাচও। বস্তুত, আজো পৃথিবীর আনাচে-কানাচে যে-সব মানুষের দল সমাজ-বিকাশের পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ে পড়ে রয়েছে তাদের মধ্যে নিছক গান বলে কিছুই চোখে পড়ে না। তার বদলে দেখা যায় গানে-নাচে মেশা এক অনুষ্ঠান, যার প্রেরণা যাদুবিশ্বাসে, যার উদ্দেশ্য কাজ। নাচের সঙ্গে গানের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে সমাজ-বিকাশের অনেক পরের পর্যায়ে, আরো পরের পর্যায়ে গানের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়েছে সুর—তখন থেকেই আজকালকার অর্থে কবিতার জন্ম। এ-বিষয়ে অধ্যাপক জর্জ টমসনের সিদ্ধান্তগুলি(১১৬) নিদিধ্যাসিতব্য। মনে রাখা দরকার, ভূয়োদর্শনের ভিত্তিতেই তাঁর ওই সিদ্ধান্তগুলি প্রতিষ্ঠিত।

কিন্তু ছান্দোগ্যের সামগান-রত কুকুরগুলির বেলায় কী রকম? সমাজ-বিকাশের যে-পর্যায়ের মানুষ বলে ওদের সনাক্ত করতে হলো সে-পর্যায়ে গান নিছক গান হবার কথা নয়। নিছক গান অবশ্য নয়; তার সঙ্গে কামনার যোগ রয়েছে, কাজের যোগ রয়েছে। কিন্তু নাচের যোগ? সে-বিষয়ে উপনিষদের লেখায় কি কোনোরকম ইঙ্গিত পাওয়া যায়?

উপনিষদে লেখা আছে, গান শুরু করবার ঠিক আগেই ওরা বহিষ্পবমানের অনুকরণে পরস্পরের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে সর্পিল গতিতে ঘুরেছিলো : তে হ যথৈবেদং বহিষ্পবমানেন স্তোষ্যমাণাঃ সংরব্ধাঃ সর্পিন্তীত্যেবম্‌আসসৃপুস্তে। এর মধ্যে ওই সংরব্ধা শব্দটিকে আশ্রয় করেই আধুনিক টীকাকারেরা খোদ মানুষগুলিকে কেমনভাবে একেবারে কুকুর বানিয়ে দেবার উপক্রম করেছিলেন সে-কথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। এবং অর্থবিপর্যয়ের এই আশঙ্কা দেখেই আমরা সিদ্ধান্ত করেছি, আধুনিক ধ্যানধারণাকে অবলম্বন করে প্রাচীন সাহিত্যের অর্থ নির্ণয় করতে অগ্রসর হবো না।

সে-অভিজ্ঞতার কথা মনে রাখলে কিন্তু ‘যথৈবেদং বহিষ্পবমানেন স্তোষ্যমাণাঃ’ শব্দগুলির অর্থবিচার করবার সময়েও আধুনিক কালের ধারণার উপর একান্তভাবে নির্ভর করতে যাওয়া ভুল হবে। অর্থাৎ, পরবর্তীকালে বহিষ্পবমানেন স্তোষ্যমাণাঃ বলতে কী বুঝিয়েছে তা জানা থাকলেই ছান্দোগ্যের আলোচ্য অংশে শব্দগুলি কী বোঝাচ্ছে সে-বিষয়ে নিঃসন্দেহে কোনো কথা বলবার জোর থাকবে না। কেননা, এমন তো হতেই পারে যে, আদিকালের অর্থটা অন্যরকম ছিলো এবং আলোচ্য চিত্রটিতে আদিকালের পরিস্থিতিই প্রতিবিম্বিত হয়েছে।

অবশ্যই, এ-বিষয়ে দীর্ঘতর আলোচনা তোলবার অবকাশ আমরা এখানে পাবো না। কেননা, তাহলে বৈদিক সাহিত্যে যজ্ঞ, ছন্দ ইত্যাদি কথাগুলির আদি তাৎপর্য অনুসন্ধানে অগ্রসর হতে হয়। ‘দ্বিজ’ নামের পরিচ্ছেদে সে-চেষ্টা করবার আগ্রহ রইলো। এখানে সামান্য কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করা যায়।

প্রথমত, পরের যুগে বহিষ্পবমান স্তোত্রের মানে যাই দাঁড়াক না কেন, আদিযুগে তা পার্থিব সম্পদের কামনার গান ছাড়া আর কিছুই নয়। “যাহা গান করা যায়, তাহার নাম স্তোত্র”। বহিষ্পবমান স্তোত্র কোন গান? সামগায়ী ঋত্বিকেরা ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলের একাদশ সূক্ত গান করেন; ওই সূক্তটি যখন গীত হয় তখন তার নাম বহিষ্পবমান স্তোত্র। এখন ঋগ্বেদের ওই সূক্তটি যখন গীত হয় তখন তার নাম বহিষ্পবমান স্তোত্র। এখন ঋগ্বেদের ওই সূক্তটি যদি পড়ে দেখেন তাহলে দেখবেন তার মধ্যে অধ্যাত্মবাদের ছিটেফোঁটাও নেই। এই সূক্তে নয়টি মন্ত্র রয়েছে, এবং নবম মন্ত্রটিতেই সূক্তের চরম কামনা প্রকাশ করে বলা হচ্ছে :

হে ক্লেদবিশিষ্ট পবমান সোম! তুমি ইন্দ্রের সহিত আমাদিগকে সুন্দর বীর্যযুক্ত ধন দান কর।

সূক্তটির আগাগোড়াই এই রকম পার্থিব কামনা।

অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে, এ-গান তো আর শুধু গলা ছেড়ে গাইবার গান নয়; সোমযজ্ঞের এক নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গাইবার গান এবং যজ্ঞ মানেই পরলোকতত্ত্ব, অধ্যাত্মবাদ। কিন্তু, মুশকিল হচ্ছে, প্রাচীনেরাই এ-ধরনের কথা জোর গলায় বলতে বারণ করে গিয়েছে। কেননা, যদিও উত্তরযুগে যজ্ঞ    বলতে স্বর্গাদির কামনামূলক ক্রিয়াকাণ্ডকেই বুঝিয়েছে তবুও যজ্ঞের আদি-অর্থ নিশ্চয়ই তা ছিলো না। একটি প্রমাণ উদ্ধৃতি করা যাক। ঐতরেয়-ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে,—এবং এক-আধবার নয়, বারবার বলা হয়েছে,—

যজ্ঞ দেবগণের নিকট হইতে, আমি তোমাদের অন্ন হইব না, ইহা বলিয়া চলিয়া গিয়াছিলেন। দেবতারা বলিলেন,—না, তুমি আমাদের অন্নই হইবে। দেবতারা তাঁহাকে (যজ্ঞকে) হিংসা করিয়াছিলেন…(১১৭)

কিংবা,—

একদা যজ্ঞ ভক্ষ্য অন্ন সমেত দেবগণের নিকট হইতে চলিয়া গিয়াছিলেন। দেবগণ বলিলেন, যজ্ঞ ভক্ষ্য অন্ন সমেত আমাদের নিকট হইতে চলিয়া গিয়াছেন এই যজ্ঞের অনুসরণ করিয়া আমরা অন্নেরও অনুসরণ করিব। তাঁহারা বলিলেন, কিরূপে অম্বেষণ করিব? ব্রাহ্মণদ্বারা ও ছন্দোদ্বারা (অম্বেষণ) করিব।…

ঐতরেয় ব্রাহ্মণেই দেখা যায় কী ভাবে ব্রহ্ম ও ক্ষত্র পলায়মান যজ্ঞের অনুসরণ করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মই (ব্রাহ্মণ-ই?) যজ্ঞকে ধরে ফেলেন।(১১৮)

এই উপাখ্যান এবং ব্রাহ্মণ-সাহিত্যের এই জাতীয় উক্তিগুলির তাৎপর্য অবশ্যই বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা দরকার। কেননা, এই ব্রাহ্মণ-সাহিত্যের যুগ থেকেই আদিম প্রাগ-বিভক্ত সমাজ বদলে শ্রেণীসমাজ ফুটে অঠবার লক্ষণ স্পষ্ট হতে দেখা যায়—এ-যুগে অনাহারের তাড়নায় মানুষ নিজের ছেলে বেচতে শুরু করেছে(১১৯)। আমরা এ-আলোচনায় পরে ফিরবো। আপাতত দেখা যাক উদ্ধৃত অংশগুলিতে কী কী কথা বলা হয়েছে :

এক : প্রাচীনেরাই লিখছেন, ব্রাহ্মণের পরবর্তী যুগে যজ্ঞ বলতে যা বুঝিয়েছে তা যজ্ঞের আদি-অর্থ নয়। পরবর্তী যুগের যজ্ঞ হলো আদি-যজ্ঞের নবাবিষ্কৃত সংস্করণ এবং এ-আবিষ্কার ব্রাহ্মণ-বর্ণের কীর্তি।

দুই : প্রাচীনেরাই লিখছেন, যজ্ঞের আদি-তাৎপর্য ছিলো দেবগণের পক্ষে অন্নের যোগান দেওয়া। তাই যজ্ঞের সঙ্গে পরলোকাদির যে-সংশ্রব তা নিশ্চয়ই পরবর্তী যুগের অবদান। আদি-যুগে যজ্ঞের তাৎপর্যটুকু নেহাতই পার্থিব। কেননা, ব্রাহ্মণগ্রন্থটিতে স্পষ্টই বলা হচ্ছে, দেবতাদের কাছে যজ্ঞই ছিলো ভক্ষ্য অন্ন লাভের উপায়। ‘ভক্ষ্য অন্নে’র অর্থ নিশ্চয়ই অস্পষ্ট নয়; প্রশ্ন হলো : যজ্ঞের আদি-অর্থ কী? যার সাহায্যে ভক্ষ্য অন্ন পাওয়া যায়, যা চলে গেলে ভক্ষ্য অন্নও চলে যায়, যাকে ফিরে পাবার চেষ্টার মধ্যেই ভক্ষ্য অন্নকেও ফিরে পাবার আশা, তারই নাম যজ্ঞ হয় তাহলে এই যজ্ঞকে অন্ন-উৎপাদনের বা অন্ন-আহরণের কৌশল ছাড়া আর কী হলা যেতে পারে? তাই, পরের যুগে যজ্ঞ শব্দের অর্থ যাই দাঁড়াক না কেন অন্তত ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সাক্ষ্য থেকে প্রমাণ হয়, কোনো এককালে যজ্ঞ বলতে উৎপাদন-পদ্ধতিই বোঝাতো। যজ্ঞ শব্দের এই আদি-তাৎপর্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি সর্বপ্রথম আকর্ষণ করেন এস. এ. দাঙ্গে : ব্যক্তিগত সম্পত্তি, শ্রেণীবিভাগ ও রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাবের আগে পর্যন্ত আর্যদের আদিম অবস্থায় যে যৌথ উৎপাদন-পদ্ধতি তারই নাম ছিলো যজ্ঞ(১২০)।

এই সিদ্ধান্তের পক্ষে অন্যান্য প্রমাণের আলোচনায় পরে ফেরা যাবে। আপাতত আমাদের যুক্তির পক্ষে যেটুকু কথা প্রাসঙ্গিক শুধু সেইটুকুই প্রতিই দৃষ্টি আবদ্ধ রাখা যাক। আমরা বলতে চাই, বহিষ্পবমান স্তোত্র সংযোগে আসর্পণ-ক্রিয়া যজ্ঞে-বিশেষের অঙ্গ,—শুধুমাত্র এই বিষয়ের নজির দেখালেই প্রমাণ হবে না ছান্দোগ্য-উপনিষদের আলোচ্য দৃশ্যে সামগাননিরত কুকুরগুলি অন্ন-উৎপাদন বা অন্ন-আহরণ ক্রিয়া ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপারে লিপ্ত ছিলো। বরং, আদিম পর্যায়ের এই দৃশ্যটিতে যজ্ঞ-ক্রিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের উল্লেখ থেকেই আরো অবধারিতভাবেই প্রমাণ হয় যে, এখানে আদিম সমাজের উৎপাদন-প্রক্রিয়ারই—বা আরো নিখুঁতভাবে বললে বলা উচিত, অন্ন-আহরণ-ক্রিয়ারই—বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে। কেননা, যজ্ঞের আদি-অর্থ উৎপাদন-পদ্ধতি ব্যঞ্জক।

ঐতরেয় ব্রাহ্মণের উদ্ধৃত অংশ থেকে আরো কিছুকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। দেবতারা বললেন, যজ্ঞকে অনুসরণ করেই ভক্ষ্য অন্নেরও অন্বেষণ করতে হবে। কিন্তু কী ভাবে তা করা যায়? ব্রাহ্মণদ্বারা ছন্দোদ্বারা। এই বলে তাঁরা ব্রাহ্মণকে ছন্দোদ্বারা দীক্ষিত করেছিলেন।

এখানে, ব্রাহ্মণ শব্দের আদি-অর্থ সন্ধানে এগোবার অবকাশ নেই।

কিন্তু যজ্ঞের সঙ্গে ছন্দের সম্পর্কমূলক ইঙ্গিতকেও অগ্রাহ্য করা অসম্ভব। কেননা, আধুনিক নৃতত্ত্ববিদেরা বলছেন, সমাজ-বিকাশের আদিম পর্যায়ে,—যৌথজীবনের আবহাওয়ায়,—ছন্দ ছাড়া উৎপাদন-পদ্ধতি সম্ভবই নয়(১২১)।

চলতি বাংলাতেই তার স্মৃতি নানান ভাবে থেকে গিয়েছে। ছন্নছাড়া বা ছন্দ-ছাড়া কথাটি কোথা থেকে এলো তা ভাষাতত্ত্ববিদেরা ভেবে দেখবেন। তাছাড়াও আমরা বলি : কাজের ছিরি-ছাঁদ। ছিরি হলো শ্রী, সৌন্দর্য। ছাঁদ হলো ছন্দ। তাই, সৌন্দর্য ও ছন্দ কী ভাবে ‘কাজ’-এর বিশেষণ হতে পারে তাও ভেবে দেখা দরকার : “ছিরি-ছাঁদ জিনিসটা আকাশ থেকে পড়েনি। এখানে সমাজের দরকারে। মানুষই তৈরী করেছে এই ছিরি-ছাঁদ। শ্রীর মধ্যে আছে সুন্দর আর মঙ্গল, বাহার আর ব্যবহার। ছন্দের দরুনই এসেছে শ্রী। ছন্দ হলো কাজ। কাজ থেকেই এসেছে সৌন্দর্য আর মঙ্গল”(১২২)।

এখানেও, লোকায়ত-ব্যবহারের সাহায্যে বৈদিক ঐতিহ্যকে বোঝবার সম্ভাবনা থেকে গিয়েছে : “বৈদিক সাতটি ছন্দে তারই পরিচয় পাওয়া যায়। প্রত্যেকটি ছন্দের নাম থেকেই বাঁচবার আয়োজন আর সেই সঙ্গে সকলে মিলে হাতে হাত লাগিয়ে বাঁচবার ভাবটা আন্দাজ করা শক্ত নয়। বৈদিক ছন্দ আছে সাতটি : গায়ত্রী, বৃহতী, জগতী, উষ্ণিক, পঙতি, ত্রিষ্টুপ, অনুষ্টুপ। এই নামগুলোর পিছনে উৎপাদন-সংক্রান্ত অর্থাৎ মানুষের বাঁচা-সংক্রান্ত কোনো-না-কোনো কাজ না থেকে পারে না!… ‘উষ্ণিক’ কি উড়কিধান না রবিফসল? ‘ত্রিষ্টুপ’ কি ধানকাটা? ‘জগতী’ মানে তো গোরু। ‘গায়ত্রী’ তো বাঁচাবার উপায়। ‘অনুষ্টুপ’ এসেছে সকলের পরে”…(১২৩)।

এই প্রসঙ্গেই আরো মনে রাখা দরকার, বৈদিক ছন্দ শুধুই কাজের ঢঙ নয়, নাচের তালও। মকাঁল্‌ তাঁর “চিন্তা ও ভাষার উৎপত্তি” নামের গ্রন্থে(১২৪) এ-বিষয়ে অজস্র প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। তার আলোচনায় পরে ফিরতে হবে। আপাতত আমাদের যুক্তি হলো, ছান্দোগ্য-উপনিষদের আলোচ্য অংশে “যথৈবেদং বহিষ্পবমানেন স্তোষ্যমাণাঃ সংরব্ধাঃ সর্পন্তীত্যেবম্‌ আসসৃপুন্তে”—প্রাচীন-সমাজ সম্বন্ধে সাধারণভাবে জানতে-পারা তথ্যের আলোয় এই বর্ণনাটুকু অনুসরণ করে কোনো দক্ষ সংস্কৃতজ্ঞ যদি বৈদিক সাহিত্যের আদি-তাৎপর্য সন্ধানে অগ্রসর হন তাহলে তাঁর পক্ষে এর মূলে কোনো নাচের স্মৃতি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব না হতেও পারে। কেননা, আধুনিক নৃতত্ত্বের বহুল তথ্য পর্যালোচনা করে অধ্যাপক জর্জ টমসন(১২৫) নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, যাকে মানব সংস্কৃতির আদি-পর্যায় সংক্রান্ত এক সাধারণ সত্য বলা যায়।

The three arts of dancing, music and poetry began as one. Their source was the rhythmical movement of the human bodies engaged in collective labour.
অর্থাৎ, নাচ গান আর কবিতা—এই তিন রকম চারুশিল্পই শুরুতে এক ছিলো। এ গুলির উৎসে ছিলো যৌথশ্রমে নিযুক্ত মানবদেহের ছন্দ-যুক্ত ক্রিয়া।

এই সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করেই অধ্যাপক জর্জ টমসন প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যের নানান দুর্বোধ্য সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর পদ্ধতি অনুসরন করেই প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের অনেক অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে। দক্ষ ভারততত্ত্ববিদেরা যেদিন সে-কাজে হাত দেবেন সেদিন ভারততত্ত্বের ক্ষেত্রে যুগান্তর আসবে। পদ্ধতিটির প্রতি তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার আশাতেই আমরা একটি সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে এ-পদ্ধতির উপযোগিতা দেখাবার চেষ্টা করেছি : দেখা যাচ্ছে ছান্দোগ্য-উপনিষদের ওই আপাত-অর্থহীন অংশটির অনেকখানিই স্পষ্টভাবে বোঝবার পথ পাওয়া যাচ্ছে। এই প্রসংগে বিশেষ করে আরো দুটি বিষয়ের আলোচনা তোলা দরকার : এক, কামগানের তাৎপর্য। দুই, বৈদিক দেবতাদের আদি-রূপ।

—————
১১৬. G. Thomas SAGS ch. 14.
১১৭. ঐতরেয় ব্রাহ্মণ (রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী) ৫৬।
১১৮. ঐ ২৩৮-৪০ এবং ৪৫০-৫১।
১১৯. ঐ শুনঃশেপের উপাখ্যান। এই গ্রন্থের চতুর্থ পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।
১২০. S. A. Dange IPCS ch. 2.
১২১. G. Thomas SAGS ch. 14
১২২. সুভাষ মুখোপাধ্যায় : জানবার কথা ৮:৫৮
১২৩. ঐ : ৮:৬৩-৬৪।
১২৪. Moncalm OTS.
১২৫. G. Thomas SAGS 451.

২১. কামগান মানে কী?

আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি, ছান্দোগ্যের ঋষি বলছেন…‘সেইজন্য এইরূপ জ্ঞানসম্পন্ন উদ্গতা বলবেন, তোমার কোন কাম্যবস্তু লাভের জন্য গান করবো? যিনি এই প্রকার জেনে সামগান করেন তিনি গানের দ্বারা কাম্যবস্তু লাভ করতে সমর্থ হন।’

প্রাচীন পুঁথিতে লেখা রয়েছে, কামম্‌ আগায়ানি।

প্রাচীন পুঁথিতে লেখা রয়েছে, কামগানস্য।

প্রাচীন সমাজের কোন লক্ষণ থেকে এই কথাগুলির তাৎপর্য উদ্ধার করা সম্ভব? এই জাতীয় উক্তি সমাজ-বিকাশের প্রাচীন পর্যায়ের কোন ধরনের স্মৃতি বহন করছে?

আজো পৃথিবীর নানা জায়গায় যে-সব মানুষের দল সমাজ-বিকাশের প্রাচীন পর্যায়ে পড়ে রয়েছে তাদের লক্ষ্য করলে এ-প্রশ্নের জবাব পাওয়া যেতে পারে। এবং তাদের দৃষ্টান্ত আলোচনা করে আধুনিক গবেষক বলছেন, প্রাচীন সমাজে নাচগানের মূলে ছিলো যাদুবিশ্বাস : মানুষ যে-কামনাকে সফল করতে চেয়েছে নাচের মধ্যে গানের ভাষায় তারই সফলতার ছবি ফুটিয়ে তোলবার চেষ্টা করেছে। মাওরি মেয়েদের আলু-নাচের সময় তাই পুবহাওয়ার আর ফুলফোটার আর ফসলফলার অনুকরণ; ফসল যাতে এলোচুলের মতো গোছাগোছা হয় সেই আশায় মেক্সিকোর মেয়েরা কোজাগর পূর্ণিমায় তাই এলোকেশী হয়। এই যাদুবিশ্বাসটির বর্ণনা হিসেবে অধ্যাপক জর্জ টমসন(১২৬) বলছেন :

The desired reality is described as though already present.
অর্থাৎ, এক কথায়, কামনা সফল হবার ছবিটি ফুটিয়ে তোলবার চেষ্টা।

প্রাচীন মানুষদের এই যাদুবিশ্বাসকেই মূলসূত্র হিসেবে গ্রহণ করে প্রাচীন সাহিত্যের ‘কামগান’ কথাটিকে বুঝতে হবে : প্রাচীন সমাজে কামনা ছাড়া গান হয় না, কেননা, ওই কামনাকে সফল করে তোলবার কল্পনাই হলো প্রাচীন সংগীতের প্রাণবস্তু।

ছান্দোগ্য-উপনিষদে কুকুরদের সামগান এই বিষয়টিরই মূর্ত উদাহরণ। তাদের ক্ষিদে পেয়েছিলো, তারা তাই অন্নের আশায় গান চেয়েছিলো। তাই, তাদের গানটিও হলো : ওম্‌ অদাম, ওম্‌ পিবাম…। আমরা ভোজন করি, আমরা পান করি…।

আজকালকার গানের মতো এ-গান একজনে গাইবে আর দশজনে শুনবে—তা নয়। দশজনে এক হয়ে একসঙ্গে গাইবে। কেননা, বাংলার প্রাচীন ব্রতগুলির মতোই এ-গানেরও মূল কথা হলো একটি কামনা এবং ‘একের কামনা দশের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে একটা অনুষ্ঠান হয়ে’ ওঠা।

———————-
১২৬. G. Thomas SAGS 453.

২২. আর্যদের আদিপর্ব

ছান্দোগ্যের ওই কুকুরগুলি সত্যিই বড়ো আশ্চর্য মানুষ! সমাজ-বিকাশের আদি-পর্যায় সম্বন্ধে ওরা আমাদের নানান তথ্য দিলো। শুধু তাই নয়। ওরাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, বৈদিক মানুষদেরও একটা আরো অতীত ইতিহাস আছে। সেই আদি-পর্যায়ের সঙ্গে উত্তর-পর্যায়ের আকাশ-পাতাল তফাত। কেননা, অন্নলাভার্থে তারা যে-গান জুড়ে দিলো তারই মধ্যে অতীতকালের স্মৃতিকে উদ্বুদ্ধ করবার আয়োজন রয়েছে আর সে আয়োজনের সাহায্যের আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে অতীতকালটা কতোই না অন্যরকম!

প্রাচীন ভারতের ঐতিহাসিক কান পেতে শুনুন :

দেবঃ বরুণঃ প্রজাপতিঃ সবিতা অন্নম্‌ ইহ আহরৎ
–দেবতা বরুণ, প্রজাপতি, সবিতা এইখানে অন্ন আহরণ করেছিলেন (বা, বৈদিক প্রয়োগ অনুসারে, আহরৎ=আহরতু, আহরণ করুন)।

উত্তরযুগে সংহিতায় প্রসিদ্ধ এই দেবতাগুলির মাহাত্ম্য যেভাবে বোঝাবার চেষ্টা করা হয়েছে তার সঙ্গে এই দৃশ্যের কোনো মিল নেই। কেননা, বেদের দেবতাগুলিকে এখানে দেখছি অন্ন-আহরণে নিযুক্ত; অথচ উত্তরকালে এঁদের সম্বন্ধে যে-ধারণা প্রচারিত হয়েছে তার সঙ্গে আর যাই হোক অন্ন-আহরণ প্রচেষ্টার কোনো সংশ্রব নেই! কিন্তু কুকুরদের গান থেকেই প্রমাণ হয় যে, এককালে তা ছিলো। মানবশ্রম দিয়ে সৃষ্ট অন্নের অংশ গ্রহণ করবার বদলে দেবতারাই অন্ন-আহরণ কাজে অংশ গ্রহণ করতেন! তার মানে, উত্তরকালে শুধুই যজ্ঞ ছন্দ আর সামগানের অর্থই বদলায়নি, বদলে গিয়েছে শ্রমের প্রতি মনোভাব আর তারই অঙ্গ হিসেবে দেবতা নামের তাৎপর্যও। ভবিষ্যতে এ-বিষয়ে দীর্ঘতর আলোচনার অবকাশ পাবো, এবং তখনই আমরা দেখবো উক্ত পরিবর্তন অকারণ নয়। কেননা, এর মূলে রয়েছে মানবসমাজে শ্রেণীবিভাগের বিকাশ।

কিন্তু শ্রেণীবিভাগের আগে, কোনো এক আদিম যুগে, বৈদিক মানুষেরাই যে প্রাগ-বিভক্ত সমাজে জীবন-যাপন করতো তার স্মৃতি বৈদিক সাহিত্যের অনেক তথ্যই অর্থহীন হয়ে থাকবে। উদাহরণ হিসেবে আমরা ছান্দোগ্য-উপনিষদের একটি অংশের উল্লেখ করলাম।  আধুনিক কালের ধ্যানধারণাকে যদি একমাত্র সম্বল মনে করা যায় তাহলে এই অংশটির কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়াই সম্ভব নয়, কিংবা, বড় জোর এর উপর একটি কাল্পনিক অর্থ আরোপ করে পাণ্ডিত্যের নামে আত্মপ্রবঞ্চনা করা যায়। অথচ, সমাজ বিকাশের আদিম পর্যায়ের কথা মনে রেখে এবং সে-পর্যায়ের মানুষদের জীবন ধারণ প্রণালী ও ধ্যানধারণা সম্বন্ধে সাধারণভাবে যা জানা গিয়েছে তার উপর নির্ভর করে এই অংশটির অর্থ অনুসন্ধান করলে এর পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ব্যাখায় খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়। তাই, আমরা এই পরিচ্ছেদে সামগাননিরত কুকুরগুলির কথা দীর্ঘভাবে আলোচনা করলাম এবং দেখাবার চেষ্টা করলাম এমন এক পদ্ধতি সত্যিই পাওয়া যাচ্ছে যার সাহায্যে প্রাচীন পুঁথিপত্রের অনেক আপাত-অর্থহীন অংশেরও অর্থ নির্ণয় করা অসম্ভব নয়। এবং এই পদ্ধতির উপর নির্ভর করে অগ্রসর হয়েই আমরা মানতে বাধ্য হলাম, উত্তরকালে বেদপন্থী ও বেদনিন্দুকদের মধ্যে মতাদর্শগত প্রভেদ যতো প্রকটই হোক না কেন বৈদিক সাহিত্যের অনেক স্মারকের সাহায্যে লোকায়তিক ধ্যানধারণা বুঝতে পারা অসম্ভব নয়। কেননা, বৈদিকই হোক আর লোকায়তিকই হোক, কোনো ধ্যানধারণাই মানবনিরপেক্ষ নয়—মানুষের জীবনযাপন প্রণালীর উপরই ধ্যানধারণাগুলি নির্ভর করে। এবং বৈদিকই হোক, আর অবৈদিকই হোক, মানবজাতির সমস্ত শাখাই সভ্যতার দিকে অগ্রসর হবে পথে একের পর এক কয়েকটি নির্দিষ্ট পর্যায় পেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। এই পর্যায়গুলির মধ্যে কোনো এক পিছিয়ে-পড়া পর্যায়েই হলো লোকায়তিক ধ্যানধারণার উৎস—বৈদিক ঐতিহ্যের বাহকেরা উত্তরযুগে সে-পর্যায়ের ধ্যানধারণাকে যতোই ঘৃণা করতে শিখুন না কেন তাঁদেরই পূর্বপুরুষেরা এককালে সেই পর্যায়েই জীবনধারণ করতেন আর তাই তাঁদের পরবর্তী কালের রচনাতেও সে-পর্যায়ের ধ্যানধারণার কিছুকিছু স্মারক থেকে গিয়েছে।

ছান্দোগ্য-উপনিষদের আলোচিত অংশটির কথাই ভেবে দেখুন। এর মধ্যে অধ্যাত্মবাদের ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাবেন না। পরম পুরুষার্থ হিসেবে এখানে যেটুকুর উল্লেখ তা ভক্ষ্য অন্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই, এখানের ধ্যানধারণাটা লোকায়তিক। কিংবা, চর্বণ বা খাওয়াদাওয়ার উৎসাহ থেকেই যদি চার্বাক নাম এসে থাকে(১২৭) তাহলে যারা ‘ওম্‌ অদাম, ওম্‌ পিবাম’ বলে গান জুড়ে দিলো তাদেরও চার্বাক ছাড়া আর কী নাম দেওয়া যায়? এবং আরো বিস্ময়কর কথা হলো, এরা শুধু নিজেরাই চার্বাক নয়—সংহিতায় প্রসিদ্ধ দেবতাদেরও নিজেদের দলে টানছে। বরুণ। প্রজাপতি। সবিতা। তার মানে, এককালে ওই দেবতাগুলিও লোকায়তিক ছিলেন নাকি? কিংবা, ঘুরিয়ে বললে বলা যায়, সমাজ-বিকাশের এমন কোনো পর্যায়ের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিলো যে-পর্যায়ে অধ্যাত্মবাদের উৎপত্তি হয়নি। এই সূত্রেই মনে রাখা দরকার, বৈদিক দেবতাদের সঙ্গে প্রাগ্‌-অধ্যাত্মবাদী বা লোকায়তিক ধ্যানধারণার সম্পর্ক দেখে আজকের দিনে আমরা যতোই বিস্মিত হই না কেন, প্রাচীনদের কাছে ঘটনাটি সত্যিই তেমন বিস্ময়কর নয়। কেননা, দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য অনুসারে বৃহস্পতিই হলেন লোকায়ত-দর্শনের আদিগুরু।

———————-
১২৭. চার্বাক নামের গুণরত্ন প্রদত্ত ব্যাখায় এই গ্রন্থের ৪৩৬ পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য।

২৩. মার্কসবাদ ও দৃষ্টিদান

এতোক্ষণে আমরা অধ্যাপক জর্জ টমসনের পদ্ধতির মোটামুটি পরিচয় পেলাম।

অধ্যাপক জর্জ টমসন মার্ক্‌স্‌বাদী। অধ্যাপক-জীবনের প্রথমার্ধে প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যে বিশেষজ্ঞ হবার গৌরব পেলেও তিনি কেমনভাবে অধ্যাপক-জীবনের দ্বিতীয়ার্ধে গ্রীক সাহিত্য বোধবার প্রকৃত পথ খুঁজে পেলেন সে-অভিজ্ঞতার কথা আগেই উল্লেখ করেছি।

এই পথই হলো মার্কসবাদের পথ। গ্রীক সাহিত্য বিচারে তিনি যে-পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন সে-পদ্ধতি হলো প্রাচীন দলিলগুলির উপর মার্কসীয় মূলসূত্রের প্রয়োগ। অবশ্যই, অধ্যাপক জর্জ টমসন আমেরিকার নৃতত্ত্ববিদ হেনরি লুইস মর্গানের গবেষণার উপরও নির্ভরশীল। এবং মর্গানকে নিশ্চয়ই কার্ল মার্কস-এর অনুগামী বলা চলে না, কেননা, সমসাময়িক হলেও মার্কস-এর রচনাবলীর সঙ্গে মর্গানের পরিচয় ছিলো না(১২৮)। তবুও মর্গান তাঁর নিজের পথে অগ্রসর হয়েও, এবং তাঁর নিজের গবেষণার সংকীর্ণ ক্ষেত্রটিতে স্বতন্ত্রভাবে, যে-সব সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন তার সঙ্গে মার্কস-এর সিদ্ধান্তের বিরোধ তো নেই-ই, এমনকি আশ্চর্য মিল থেকে গিয়েছে! তাই এঙ্গেল্‌স্‌(১২৯) বলছেন :

Morgan rediscovered in America, in his own way, the materialist conception of history that had been discovered by Marx forty years ago, and in his comparison of barbarism and civilization was led by this conception to the same conclusions, in the main points, as Marx had arrived at.
অর্থাৎ, চল্লিশ বছর আগে মার্ক্‌স্‌ ইতিহাসের যে-বস্তুবাদী ব্যাখ্যা আবিষ্কার করেন, মর্গানও তাঁর নিজের পথে আমেরিকায় তার পুনরাবিষ্কার করেছিলেন। এবং বর্বরতার সঙ্গে সভ্যতার তুলনা করবার সময় এই ধারণার সাহায্যে তিনি যে-সব সিদ্ধান্তে উপনীত হন সেগুলি মূলত মার্ক্‌স্‌-এর সিদ্ধান্তও।

অবশ্যই, মার্কসবাদেরই একটি মূল কথা হলো, চরম সত্য বা শেষ সত্য বলে কিছুই বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভবপর নয়,(১৩০) কেননা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা দিনের পর দিন নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহ করে সত্যকে সম্বৃদ্ধ করে তোলে। ফলে, অধ্যাপক জর্জ টমসনের পক্ষে মর্গানের মূল সিদ্ধান্তগুলিকে গ্রহণ করাও যে-রকম তাঁর মার্ক্‌স্‌বাদেরই পরিচয় তেমনিই মর্গানের কোনো কোনো সিদ্ধান্তকে পরবর্তী যুগের গবেষণা-লব্ধ তথ্য সমৃদ্ধ ও সংশোধিত(১৩১) করবার চেষ্টাতেও মার্কসবাদ-বিরোধের কোনো পরিচয় নেই।

তাই, অধ্যাপক জর্জ টমসনের পদ্ধতি বলতে প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলির উপর মার্কসবাএর প্রয়োগ ছাড়া আর কিছুই বোঝা উচিত নয়। এইভাবে প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যের উপর মার্কসবাদের মূল সিদ্ধান্তগুলির প্রয়োগ করে অধ্যাপক জর্জ টমসন মার্কসীয় বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধতর করেছেন। কেননা, মূর্ত প্রয়োগের সাহায্যেই মার্কসীয় মূল সিদ্ধান্তগুলির সমৃদ্ধি সম্ভবপর। মার্কসবাদ অনুসারে প্রয়োগ-নিরপেক্ষ জ্ঞান অর্থহীন ও অবান্তর।

অধ্যাপক টমসনের গবেষণা থেকে প্রেরণা পেয়ে আমরাও যে ভারতীয় দর্শনের একটি সমস্যার আলোচনা করবার চেষ্টা করেছি তার কারণ আমাদের ধারণাতেও মার্কসবাদের সাহায্য ছাড়া প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলির সাক্ষ্য সম্যকভাবে বুঝতে পারবার আর কোনো উপায় নেই। কেননা, পুরোনো পুঁথির তাৎপর্য স্পষ্ট হলেও অনেক সময় তা আমাদের চোখে পড়ে না। তার কারণ, আমাদেরই এক রকম অন্ধতা। একমাত্র মার্কসবাদের সাহায্যেই সে-অন্ধতা দূর করা সম্ভব।

এই কথাটা একটু ব্যাখ্যা করে বলা দরকার।

প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলি প্রায়ই আমাদের কাছে দুর্বোধ্য বলে প্রতীয়মান হয়। সে-দুর্বোধ্যতার নানা কারণ আছে। তার মধ্যে ভাষাগত কারণ নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভাষাগত কারণ ছাড়াও আরো গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে, কেননা, প্রাচীন-পুঁথিগুলি শুধুই যে প্রাচীন ভাষায় লেখা তাই নয়, এগুলির অন্তর্গত ধ্যানধারণাও প্রাচীন। এবং এইজাতীয় প্রাচীন ধারণার সঙ্গে আমাদের আধুনিক ধারণার অনেক সময় মৌলিক তফাত। ফলে, ভাষাগত সমস্যার সমাধান হবার পরও, ওই প্রাচীনকালের ধারণাকে সামনে পেয়ে আধুনিক বিদ্বানের পক্ষে তার তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করবার সমস্যাটা বাকি থেকে যেতে পারে। এই কারণেই, প্রাচীন পুঁথি বোঝবার ব্যাপারে ভাষাতত্ত্বগত-ব্যুৎপত্তিই পর্যাপ্ত নয়।

এই রকমেরই একটা যুক্তি দেখিয়ে সেকালে অধিকার-ভেদের(১৩২) কথা বলা হতো। আর আমাদের বলবার কথাটিও শুরু ঠিক এইখান থেকেই। এবং ওই কথাটি পাড়বার আশাতেই আমরা ছান্দোগ্য-উপনিষদের একটি আপাত-অর্থহীন অংশের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করেছি। সে-অংশের ভাষা অপেক্ষাকৃত সরল। কিন্তু শব্দার্থ পাবার পরও অংশটি অনেকাংশে দুর্বোধ্য বা অবোধ্য থেকে যায়।

কেননা, আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রাচীনদের এই রচনাটি বোঝবার কোনো উপায় নেই। বুঝতে হলে প্রাচীনদের দৃষ্টিভঙ্গিটা গ্রহণ করবার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা আধুনিক যুগে জন্মগ্রহণ করেছি, আধুনিক ধ্যানধারণায় লালিত হয়েছি—তার প্রভাব মুক্ত হয়ে প্রাচীনদের দৃষ্টিকোণটা গ্রহণ করবো কেমনে করে?

এই সমস্যারও সমাধান আছে। সমাধানটা বোঝবার জন্যে প্রধানত দুটি কথা মনে রাখা দরকার।

এক : মানুষের ধ্যানধারণা আকাশ থেকে জন্মায় না; সেগুলির উৎসে রয়েছে মানুষের বাস্তব সমাজ-জীবন। তাই প্রাচীনদের দৃষ্টিকোণটা বোঝবার ব্যাপার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথনির্দেশ পাওয়া যাবে প্রাচীন সমাজ-জীবন সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা থেকেই।

দুই : কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রাচীনকালের ঐ সমাজ-জীবন সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে কেমন করে? বহু শতাব্দী আগেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছেন। তাই, তাঁরা ঠিক কী ভাবে বাঁচতেন তা তো আর আমাদের পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে জানা সম্ভবপর নয়। এ-বিষয়ে বড়ো জোর কিছুকিছু পরোক্ষজ্ঞান পাওয়া যায়। বহু শতাব্দীর সঞ্চিত ধুলো সরিয়ে তাঁদের কীর্তির কিছুকিছু চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যেতে পারে এবং এই চিহ্নগুলি থেকে তাঁদের জীবনযাপন সম্বন্ধে কিছু কথা অনুমান করতে পারা অসম্ভব নয়। তাছাড়া, প্রাচীনেরা যে-সব সাহিত্যাদি রচনা করে গিয়েছেন সেগুলি থেকেও তাঁদের সমাজ-জীবনের কিছুটা চিত্র খুঁজে পাওয়া নিশ্চয়ই সম্ভবপর।

কিন্তু প্রত্নতত্ত্বমূলক উপাদানই হোক আর সাহিত্যিক উপাদানই হোক—শেষ পর্যন্ত তা পরোক্ষ। তাই, প্রত্যক্ষভাবে প্রাচীন সমাজকে চেনবার যদি কোনো পথ থাকতো তাহলে এই পরোক্ষ উপাদানগুলিকে তারই আলোয় আরো স্পষ্টভাবে, আরো নির্ভুল ও নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করবার উপায় পাওয়া যেতো।

এবং ঠিক এইখানেই হেনরি লুইস মর্গানের গবেষণা সত্যিই যুগান্তকারী। মর্গানের আবিষ্কারের একটা কথা হলো, আমাদের পক্ষে আজো ওই প্রাচীন সমাজকে স্বচক্ষে দেখতে পাওয়া সম্ভব। অনেক শতাব্দী আগেও আমাদের পূর্বপুরুষেরা ঠিক কী ভাবে জীবন-যাপন করতেন তা আজকের দিনেও আমাদের পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে জানবার একটা উপায় রয়েছে। আর, মর্গানের এই দাবি যদি সত্যি হয়, তাহলে এই প্রত্যক্ষ জ্ঞানের সাহায্যেই প্রত্নতত্ত্বমূলক বা সাহিত্যমূলক ওই পরোক্ষ দলিলগুলিকে আরো নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা করবার অবকাশ নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। তাই, মর্গানের মূল দাবিটিকে ভালো করে বোঝা দরকার।

সারা পৃথিবীর বুক জুড়ে সমস্ত মানুষের উন্নতিই সমান তালে হয়নি। কোথাও বা মানুষ এগিয়ে গিয়েছে অনেক দূরে, কোথাও বা মানুষ পড়ে রয়েছে অনেকখানি পিছনে। এবং মর্গান দাবি করলেন, ওই পিছিয়ে-পড়া মানুষদের বাস্তব অবস্থাকে পরীক্ষা করলে এগিয়ে-যাওয়া মানুষদের অতীত ইতিহাসটিকেও দেখতে পাওয়া যাবে। তার কারণ, মানুষের পক্ষে এগিয়ে চলবার পথে একের পর এক যে-সব পর্যায় সেগুলির মধ্যে স্বাভাবিক ও অনিবার্য পারস্পর্য রয়েছে। মর্গানের ভাষায়, natural as well as necessary sequence of progress(১৩৩)। যেন একের পর এক কয়েকটি নির্দিষ্ট ও অনিবার্য ধাপ বেয়ে এগোবার চেষ্টা—যেখানেই মানুষ এগিয়েছে সেখানেই এই ধাপগুলি ভেঙে এগোতে হয়েছে, যেখানে এগোতে পারে নি সেখানে ওই ধাপগুলির কোনো-না-কোনো একটি ধাপে আটকে রয়েছে আর সেই জন্যেই যারা এগোতে পারে নি তাদের দিকে চেয়ে দেখলেই বোঝা যায় যারা এগিয়ে গিয়েছে তারা ঠিক কোন কোন ধাপ ভেঙে এগিয়েছে।

এই ধাপগুলি ঠিক কী কী? কোন পথে এগিয়ে, ঠিক কোন কোন পর্যায় পার হয়ে, মানুষ শেষ পর্যন্ত সভ্যতার স্তরে উঠে এলো? মর্গানের পরিভাষা অনুসারে সভ্যতার স্তরে পৌঁছবার আগে পর্যন্ত মানুষের অবস্থাকে মোটের উপর দুটি অংশে ভাগ করা যায় : বন্য-দশা (savagery) ও বর্বর-দশা (barbarism)। এই দুটি দশারই আবার স্তরবিভাগ রয়েছে : নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ। অর্থাৎ মানুষ শুরু করেছে নিম্ন-বন্য-দশা থেকে, তারপর এগিয়ে এসেছে মধ্য-বন্য-দশায়, তারপর উচ্চ-বন্য-দশায়। তারপর মানুষ বন্য-দশা ছেড়ে বর্বর-দশায় উঠে এসেছে : প্রথমে নিম্ন-বর্বর-দশা, তারপর মধ্য-বর্বর-দশা, তারপর উচ্চ-বর্বর-দশা। আর, তারপর মানুষ বর্বর-দশা ছেড়ে সভ্যতার আওতায় এসে পৌঁছেছে।

এই সব বিভিন্ন পর্যায়ের পরিচয় কী কী রকম সে-আলোচনায় পরে ফিরতে হবে। আপাতত মর্গানের মূল যুক্তিটির অনুসরণ করা যাক। মর্গান বলছেন, আজকের পৃথিবীতে এমন কোনো মানবদলের পরিচয় অবশ্যই পাওয়া যায় না যারা একেবারে নিম্ন-বন্য-দশায় পড়ে রয়েছে। কিন্তু মধ্য-বন্য-দশায় নানা দলকে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

আবিষ্কৃত হবার সময় পলিনেশিয়া আর অস্ট্রেলিয়ার উপজাতিরা ছিলো মধ্য-বন্য-দশায়।
আমেরিকার ‘হাডসন-বে টেরিটরি’ ও ‘কলম্বিয়া উপত্যকা’র নানান উপজাতিরা ছিলো উচ্চ-বন্য-দশায়।

মিসিসিপি নদীর পূব-কিনারায় রেড-ইণ্ডিয়ানরা ছিলো নিম্ন-বর্বর-দশায়।
নিউ মেক্সিকো, মেক্সিকো, মধ্য-আমেরিকা ও পেরুর নানা উপজাতিদের দেখা গেলো মধ্য-বর্বর-দশায়(১৩৪)।

এরপর উচ্চ-বর্বর-দশার কথা। মর্গান বলছেন, সে-দশার পরিচয় পাওয়া যায় হোমারের যুগের গ্রীকদের মধ্যে, রোম স্থাপিত হবে মুখোমুখি সময়কার লাতিন জাতিগুলির মধ্যে এবং সিজারের সময়কার জার্মানদের মধ্যে। এই উচ্চ-বর্বর-দশার আওতা পেরিয়েই সভ্যতার শুরু। অতএব মর্গান সিদ্ধান্ত করছেন :

Commencing, then, with Australians and Polynesians following with the American Indian tribes, and concluding with the Roman and Grecian, who afford the highest exemplifications respectively of the six great stages of human progress, the sum of their united experiences may be supposed fairly to represent that of the human family from the Middle Status of savagery to the end of ancient civilization. Consequently, the Aryan nations will find the type of the condition of their remote ancestors, when in the Lower Status of barbarism, in that of the partially village Indians of America; and when in the Middle Status, in that of the Village Indians with which their own experience in the Upper Status directly connects. So essentially identical are the arts, institutions and mode of life in the same status, upon all the continents, that the archaic form of the principal domestic institutions of the Greeks and Romans must even now be sought in the corresponding institutions of the American aborigines,……
In studying the condition of tribes and nations in these several ethnical periods we dealing, substantially, with the ancient history and condition of our own remote ancestors.(১৩৫)
অর্থাৎ, মানুষের অগ্রগতির ছ’টি প্রধান স্তরের প্রকৃষ্টতম নিদর্শন পাওয়া যায় অস্ট্রেলিয় ও পলিনেশিয়দের থেকে শুরু করে আমেরিকার রেড ইণ্ডিয়ানদের অনুসরণ করে রোমান ও গ্রীকদের কথায় শেষ করলে; এদের মিলিত অভিজ্ঞতাকে মধ্য-বন্য-দশা থেকে শুরু করে প্রাচীন সভ্যতার শেষ পর্যন্ত মানবগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার পরিচায়ক বলা যায়। অতএব আর্যজাতিগুলি তাদের সুদূর পূর্বপুরুষদের বন্য-দশার অবস্থাটা দেখতে পাবে আমেরিকার আংশিকভাবে গ্রামবাসী রেড-ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে; মধ্য-বর্বর-দশার অবস্থাটা দেখতে পাবে গ্রামবাসী রেড-ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে—এদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আর্যজাতিগুলির উচ্চ-বর্বর-দশার অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। সমপর্যায়ের মানুষদের মধ্যে শিল্প, সমাজ-সংগঠন ও জীবন-যাপন পদ্ধতি সমস্ত মহাদেশের বেলাতেই এমন মৌলিকভাবে অভিন্ন যে, গ্রীক ও রোমানদের গার্হস্থ্য-ব্যবস্থার আদিম রূপটিকে এখনো খুঁজতে হবে আমেরিকার আদিবাসীদের অনুরূপ ব্যবস্থার মধ্যে…
নৃতত্ত্বমূলক এই বিভিন্ন পর্যায়গুলিতে যে-সব বিভিন্ন জাতি-উপজাতি রয়েছে তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে আমরা নিজেদের পূর্বপুরুষদের প্রাচীন ইতিহাস এবং অবস্থার কথাও পর্যালোচনা করবো।

তাই, আদিবাসী-সংগ্রান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য আহরণের কাজে নিজের প্রায় পুরো জীবনটিকে উৎসর্গ করে হেনরি লুইস মর্গান প্রাচীন সাহিত্যের তোরণদ্বার খোলবার চাবিকাঠি আমাদের হাতে দিয়ে গিয়েছেন।

মর্গানের এই মূল সিদ্ধান্তগুলি মরে রেখে প্রাচীন যুগের ইতিহাস-রচনা সংক্রান্ত সাধারণ সমস্যার আলোচনায় ফিরে আসা যাক।

পিছিয়ে-পড়া মানুষদের দিকে এইভাবে চেয়ে দেখলে যদি সত্যিই এগিয়ে-যাওয়া মানুষদের অতীত ইতিহাসটাকে প্রত্যক্ষভাবে জানতে পারা সম্ভবপর হয় তাহলে প্রাচীন ইতিহাস-সংক্রান্ত প্রত্নতত্ত্বমূলক ও সাহিত্যমূলক পরোক্ষ উপাদানগুলিকে এই প্রত্যক্ষ জ্ঞানের আলোয় যাচাই করে নিলে নিশ্চয়ই আমাদের সিদ্ধান্ত অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য হবে।

অধ্যাপক জর্জ টমসন(১৩৬) তাই বলছেন, পুরাতত্ত্ব ও নৃতত্ত্ব—বিজ্ঞানের এই দুটি শাখার মধ্যে সমন্বয় আনতে হবে। নৃতত্ত্বের সাহায্য পুরাতত্ত্বের আবিষ্কারকে কী ভাবে বুঝতে পারা সহজসাধ্য হয় তিনি তার একটি নমুনা দিচ্ছেন। পুরাতত্ত্ববিদেরা মাটি খুঁড়ে প্রাচীন ড্যানিউব-সংস্কৃতি সম্বন্ধে একটি তথ্য আবিষ্কার করলেন : দেখা গেলো সে-সংস্কৃতির মানুষেরা অনেকখানি এলাকা জুড়ে একের পর এক বাসস্থান গড়ে তুলেছিলো, কিন্তু কোনো বাসস্থানেই তারা বেশিদিন ধরে একটানা বাস করে নি। ঘটনাটির ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে আফ্রিকার নানা জায়গায় আজো যে-সব আদিবাসীরা রয়েছে তাদের কাছ থেকে। তারা আবাদী জমির পাশে বাসস্থান গড়ে এবং যতোদিন পর্যন্ত না জমির উর্বরতা একেবারে উজোড় হয়ে যায় ততোদিন তারা সেইখানেই চাষবাস করে। তারপর তারা সেই বাসস্থান পরিত্যাগ করে চলে যায়; অন্যত্র নতুন বাসস্থান গড়ে তোলে।

অবশ্যই, গর্ডন চাইল্ড(১৩৭) প্রমুখ কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, পুরাতত্ত্বের সঙ্গে এইভাবে নৃতত্ত্বের সমন্বয় ঘটিয়া প্রাচীন মানুষদের সমাজ-জীবন ও ধ্যানধারণার কথা অনুমান করবার চেষ্টা সঙ্গত নয়। সমস্যাটা কী, এবং এঁদের আপত্তিটা ঠিক কেন প্রথমে তাই দেখা যাক। ধরুন, পুরাতত্ত্বের গাঁইতি এক জায়গায় দশ হাজার বহচর আগেকার কোনো একদল মানুষ সম্বন্ধে এমন চিহ্ন আবিষ্কার করলো যা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় তাদের জীবন-যাপন নির্ভর করতো শিকারের উপর। এদিক, নৃতত্ত্ববিদ সংবাদ দিলেন শিকারজীবী মানুষের দল আজো পৃথিবীর এখানে-ওখানে টিকে রয়েছে এবং তাদের সমাজ-সংগঠন ও ধ্যানধারণা সংক্রান্ত তথ্য প্রত্যক্ষভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু, তাই বলে কি এ-কথা দাবি করা সঙ্গত হবে যে, ওই দশ হাজার বছর আগেকার মানুষদের সমাজ-জীবন ও ধ্যানধারণা আজকের এই মানুষদের অনুরূপই ছিলো? গর্ডন চাইল্ড বলেছিলেন, এ-জাতীয় অনুমান সঙ্গত নয়। কেননা, আজকের ওই শিকারজীবীরা যদিও উৎপাদন-পদ্ধতির দিক থেকে অতোখানি পেছিয়ে পড়ে রয়েছে তবুও তাই বলে এ-কথা নিশ্চয়ই প্রমাণ হয় না যে, তাদের মানসিক বিকাশও ওই দশ হাজার বছর আগেকার মানুষদের মনোবিকাশের পর্যায়েই একেবারে নিশ্চল হয়ে গিয়েছে।

উত্তরে অধ্যাপক জর্জ টমসন(১৩৮) বলেছেন, তা নিশ্চয়ই হয়ে যায়নি। যে-সব মানুষেরা আজো উৎপাদন-পদ্ধতির দিক থেকে ওই রকমের পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ে আটকে রয়েছে তাদের মানসিক পরিবর্তনও নিশ্চয়ই ঘটে চলেছে। কিন্তু এ-পরিবর্তন একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই ঘটেছে এবং সে-গণ্ডি নির্ভর করছে ঐ উৎপাদন-পদ্ধতির উপরই।

……the social institutions of these modern tribes have not remained stationary. They have continued to develop, but only the directions determined by the prevailing mode of production. This is the key to the problem. If, for example, we examine the Australian forms of tokenism, exogamy and initiation the Australian forms of totemism, exogamy, and initiation, and compare them with similar institutions elsewhere, we find that they are extraordinarily elaborate, pointing to a long period of development. But these are all institutions characteristic of a simple hunting economy. In other words, just as the economic development of these tribes is stunted, so their culture is ingrown. And consequently, while we cannot expert to find such institutions in Paleolithic Europe in the same form, we are likely to find them there in some form.
অর্থাৎ, এই সব আধুনিক উপজাতিগুলির সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেমে থাকে নি। সেগুলির বিকাশ ঘটে চলেছে, কিন্তু তা একান্তভাবেই প্রচলিত উৎপাদন-পদ্ধতিদ্বারা নিয়ন্ত্রিত অভিমুখেই। এই হলো সমস্যাটিকে বোঝবার মূল কথা। যেমন ধরুন, আমরা যদি টোটেম-বিশ্বাস, বহির্বিবাহ ও দীক্ষার অস্ট্রেলিয়ায় প্রচলিত রূপগুলিকে বিশ্লেষণ করি এবং তার সঙ্গে অন্যত্র প্রচলিত অনুরূপ অনুষ্ঠানের তুলনা করি তাহলে দেখবো অস্ট্রেলিয়ার অনুষ্ঠানগুলি অসাধারণ রকমের ফাঁপানো-ফোলানো—তার থেকেই দীর্ঘ যুগ ধরে বিকাশের নির্দেশ পাওয়া যায়। অর্থাৎ কিনা, এই উপজাতিগুলির অর্থনৈতিক উন্নতি যে-রকম খর্ব সেই রকমই তাদের সংস্কৃতির বিকাশও অন্তর্মুখি। তাই, পুরোনো-পাথর যুগের ইয়োরোপে যদিও আমরা এই অনুষ্ঠানগুলিকে এই রূপেই আশা করতে পারি না তবুও সেগুলিকে কোনো-একরূপে খুঁজে পাবার আশা করতে পারি।

তাই, অধ্যাপক জর্জ টমসনের কাছে প্রাচীন ইতিহাস রচনার কাজে আদিবাসী সংক্রান্ত আধুনিক গবেষণা,—বিশেষ করে মর্গানের গবেষণা—এতো মূল্যবান হয়েছে। লোকায়ত-দর্শনের আলোচনায় আমাদের প্রধান সমস্যা অবশ্যই পুরাতত্ত্বমূলক আবিষ্কারকে নৃতত্ত্বে আলোয় বোঝবার সমস্যা নয়, তার বদলে প্রাচীন সাহিত্যের কিছুকিছু আপাত-দুর্বোধ্য নিদর্শনের তাৎপর্য নির্ণয় করবার সমস্যা। তবু, এই নিদর্শনগুলিও যেহেতু বহু পুরোনো যুগের স্মারক সেইহেতুই অধ্যাপক জর্জ টমসনের পদ্ধতি আমাদের প্রচেষ্টার পক্ষেও অমূল্য। অবশ্যই, আজকের দিনে পণ্ডিতমহলে নৃতত্ত্ব নিয়ে উৎসাএর অভাব নেই। কিন্তু বিদগ্ধ মহলের একজন দিকপাল হয়েও অধ্যাপক জর্জ টমসনের পক্ষে এইভাবে প্রাচীন ইতিহাসের ক্ষেত্রে নৃতত্ত্বের প্রয়োগে বৈশিষ্ট্য আছে। বৈশিষ্ট্যটি হলো, তাঁর বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যার একটি পরিচয় হলো মর্গানের গবেষণাকে গ্রহণ করা। কেননা, সোভিএট ইউনিয়ন ও নয়া-গণতান্ত্রিক দেশগুলির বাইরে মার্কস-এর আবিষ্কারের মতোই মর্গানের আবিষ্কারও নিষিদ্ধ করা হয়ে রয়েছে(১৩৯)। মর্গানের বিরুদ্ধে এই প্রতিবন্ধের পরিচয় শুধু আজকের দিনেই নয়, তাঁর গ্রন্থ প্রকাশিত হবার অব্যবহিত পরেই তাঁর আবিষ্কারগুলি চেপে যাবার চেষ্টা করা হয়েছে(১৪০)।  অধ্যাপক জর্জ টমসন দেখাচ্ছেন সমস্যাবিশেষের আলোচনায় মর্গানের আবিষ্কার অগ্রাহ্য করাই দরুনই রিভারস্‌, মেনিলাউস্কি প্রমুখের রচনায় নৃতত্ত্ব বিজ্ঞান কী ভাবে প্রায় অজ্ঞানের কোঠায় পৌঁছেছে(১৪১)।

মর্গানের বিরুদ্ধে এই প্রতিবন্ধের কারণ ভালো করে বিশ্লেষণ করা দরকার। কোনো একজন বৈজ্ঞানিক আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে প্রায় পুরো জীবনটা কাটিয়ে যদি তাদের সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করে থাকেন। তাহলে আধুনিক বিদগ্ধ-সমাজ তাঁর প্রতি বিরূপ হবে কেন?

অবশ্যই, আদিবাসী-সংক্রান্ত তাঁর ওই গবেষণা শুধুমাত্র অসভ্য মানুষ সম্বন্ধেই আমাদের জ্ঞান দেয়নি, আমাদের নিজেদের অতীতটাকেও আমাদের চিনতে শিখিয়েছে। এবং আসল হ্যাঙ্গামাটা ঠিক এইখানেই : অতীতের উপর থেকে পর্দা সরালে শুধুমাত্র অতীতটুকুও চোখে পড়ে না—পাওয়া যায় এক ভবিষ্যতের নির্দেশও(১৪২)। কী ভাবে তাই দেখা যাক।

মর্গান আবিষ্কার করলেন, আধুনিক দাম্পত্য-সম্পর্ক, ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা রাষ্ট্রব্যবস্থা—মানবজাতির পক্ষে এগুলির কোনোটাই অপরিহার্য নয়। কেননা, প্রত্যেক জাতির জীবনেই এমন একটা যুগ গিয়েছে যখন তাদের মধ্যে এ-সব কিছুরই পরিচয় ছিলো না। বস্তুত, আজকের দিনে ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রভাব যতো প্রচণ্ডই মনে হোক না কেন, পৃথিবীর বুকে মানবজাতির পুরো জীবনটার তুলনায় ব্যক্তিগত সম্পত্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের যুগটা চোখের পলকের মতো। তার প্রমাণ, মধ্য-বন্য-দশা থেকে শুরু করে মধ্য-বর্বর-দশা পর্যন্ত সমাজ-বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে যে-সব মানবদল এখনো টিকে রয়েছে তাদের জীবনে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মানবজীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হতে পারে না। অতীতে যদি তার প্রভাব ছাড়াও জীবনধারণ সম্ভবপর হয়ে থাকে তাহলে ভবিষ্যতেও মানুষের পক্ষে ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রভাব-মুক্ত হওয়া অসম্ভব কথা নয়। আর, ঠিক এই কথাটিই হলো মর্গানের গবেষণার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তিনি দেখলেন, বর্তমান যুগে এই ব্যক্তিগত সম্পত্তির সর্বগ্রাসী প্রভাবে মানুষের জীবন বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু সমাজ-বিকাশের বিভিন্ন প্রাচীন পর্যায় আলোচনা করে তাঁর মনে এ-বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিলো যে মানুষ এগিয়ে চলবে—মানুষ চিরকাল এগিয়ে চলেছে, এগিয়ে চলার ক্ষমতাই তাকে পশুর রাজ্য থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে এতো আশ্চর্য সভ্যতার আওতায়। তাই, ব্যক্তিগত সম্পত্তি আজ তার জীবনে যতো বাধাই সৃষ্টি করুক না কেন, সে-বাধা অলঙ্ঘনীয় নয়। অগ্রগতি অতীতের নিয়ম হয়েছে, অগ্রগতিই ভবিষ্যতের নিয়ম হবে। তাই মর্গান মানুষের সামনে যে-উজ্জ্বল ভবিষ্যত দেখতে পেলেন সেখানে ব্যক্তিগত-সম্পত্তির গ্লানি নেই—সবাই সমান, সবাই স্বাধীন, মানুষে-মানুষে সত্যিই ভাই-ভাই ভাব। আর মর্গান চিনতেও পারলেন : এ-যেন সেই প্রাচীন সমাজেরই পুনরাবর্তন—কিন্তু ওই প্রাচীন পর্যায়ে নয়, উন্নত ও সমৃদ্ধ এক নতুন পর্যায়ে। ভবিষ্যতের ওই ছবিটি মর্গানের কাছে দিবাস্বপ্ন নয়, অতীত-অনুসন্ধানের অনিবার্য অনুসিদ্ধান্ত।

কিন্তু আজকের যুগে দিনের চিন্তা আর রাত্রির স্বপ্ন সবকিছুর উপরই ব্যক্তিগত সম্পত্তির অমোঘ প্রভাব। এই আবহাওয়াতেই লালিত হয়েছে আধুনিক বিদ্বান-ব্যক্তিরাও। অতি বড়ো বিদ্বানের দৃষ্টিও তাই ভবিষ্যতের ওই ছবিটির দিকে যেতে চায় না। ফলে, অতীত সম্বন্ধেও এক আশ্চর্য অন্ধভাব!

প্রাচীন রচনাবলীর তাৎপর্য-নির্ণয় করা নিয়েই আমাদের সমস্যা। কিন্তু আমরা যতোদিন পর্যন্ত ওই অন্ধভাবের বশবর্তী হয়ে থাকবো ততোদিন পর্যন্ত এ-তাৎপর্য উদ্ধার করবার সম্ভাবনা থাকবে না। কেননা, অস্পষ্ট এক অতীতে রচিত বলেই এগুলির মধ্যে প্রাচীন-সমাজের বহু স্মৃতি থেকে গিয়েছে। সেগুলি বুঝতে হলে প্রাচীন সমাজকেও স্পষ্টভাবে চিনতে হবে। প্রাচীন সমাজকে যদি চিনতে হয় তাহলে পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সনাতন মনে করা চলবে না।

আমরা যে-অর্থে অন্ধভাবের কথা বলছি তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারা যাবে কার্ল মার্কস-এর একটি চিঠি উদ্ধৃত করলে। চিঠিটি তিনি লিখেছিলেন মাউরের নামে জার্মান ঐতিহাসিক ও আইনবিদের গবেষণা-প্রসঙ্গে। এ-গবেষণার আলোয় দেখা গেলো জার্মান দেশে জমিতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি দেখা দিয়েছে অনেক পরের যুগে, এবং এমনকি আধুনিক যুগেও নানা জায়গায় প্রাচীন যৌথ-সম্পত্তির চিহ্ন টিকে থেকেছে। তাহলে, ব্যক্তিগত-সম্পত্তির বিরুদ্ধে অতি-আধুনিক সমাজতান্ত্রিক আয়োজনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পত্তির চিহ্নহীন অতি প্রাচীন ব্যবস্থার সাদৃশ্য রয়েছে; অতি প্রাচীনের মধ্যেই আবিষ্কার করা যাচ্ছে অতি-আধুনিককে এবং এই আবিষ্কারের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক প্রচেষ্টার যোগাযোগ রয়েছে। মার্কস(১৪৩) বলছেন :

Owing to a certain judicial blindness, even the best minds fail to see, on principle, what lies in front of their noses. Later, when the time has come, we are surprised that there are traces everywhere of what we failed to see. The first reaction to the French Revolution and the Enlightenment bound up with it was naturally to regard everything as mediaeval, romantic, and even people like Grimm are not free from this. The second reaction to it is to look beyond the Middle Ages into the primitive age of every people — and this corresponds to the socialist tendency, though these learned men have no idea that they are connected with it. And they are then surprised to find what is newest in what is oldest, and even egalitarians to a degree which would have made Proudhon shudder.
অর্থাৎ, এক রকম আইনগত অন্ধতার দরুন এমনকি শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমানেরাও যা একেবারে নাকের গোড়ায় রয়েছে তা দেখতেই পান না। পরে, যখন সময় উপস্থিত হয়ে তখন, যে-সব চিহ্ন আমরা আগে দেখতে পাইনি সর্বত্র সেগুলিকে দেখে অবাক হয়ে যাই। ফরাসী বিপ্লব সম্বন্ধে এবং তার সঙ্গে সংযুক্ত নবজাগরণের যুগের সম্বন্ধে, প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো মধ্যযুগীয় সবকিছুকেই সুন্দর মনে করায়; এবং গ্রীম্‌-এর মতো ব্যক্তিরাও এর প্রভাবমুক্ত নন। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া হলো, মধ্যযুগ পেরিয়ে…প্রত্যেক জাতিরই আদিম যুগটির দিকে চেয়ে দেখা, এবং এ-চেষ্টা সমাজতান্ত্রিক প্রচেষ্টারই অনুরূপ, যদিও এই দু’-এর মধ্যে যে কোনো সম্পর্ক আছে সে-সম্বন্ধে ওই সব বিদ্বান-ব্যক্তিদের কোনো ধারণাই নেই। তাঁরা তাই যা কিনা সবচেয়ে পুরোনো তারই মধ্যে যা হলো সবচেয়ে নতুন তাকে দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে যান—এমনকি সাম্যবাদীদেরও এই দশা, ব্যাপারটা এতোই চরম যে প্রুধঁ-র মতো ব্যক্তিরও তা দেখে হৃৎকম্প হবে।

উদ্ধৃত অংশের বিশেষ করে তিনটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথম, মার্কস একরকম আইনগত অন্ধতার কথা বলছেন : শ্রেণীসমাজের আবহাওয়ায় ব্যক্তিগত সম্পত্তিকেই মানুষ পরমপুরুষার্থ মনে করতে শিখেছে, তাই যেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অভাব তা একেবারে নাকের গোড়ায় থাকলেও সাধারণত আমাদের চোখে পড়তে চায় না।

দ্বিতীয়ত, মার্কস বলছেন, প্রত্যেক জাতির আদিম যুগটির দিকে চেয়ে দেখা সমাজতান্ত্রিক প্রচেষ্টারই অনুরূপ। তার কারণ, সমাজতন্ত্র এই ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রভাব থেকে মুক্ত হবার পথনির্দেশ দিচ্ছে এবং প্রত্যেক জাতিরই আদিম অবস্থার দিকে চেয়ে দেখলে দেখা যায় তখনো মানুষের সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির সূচনা হয়নি।

আর, ঠিক এই কারণেই মার্কস বলছেন, যা-কিনা সবচেয়ে পুরোনো তারই মধ্যে, যা-হলো সবচেয়ে নতুন তাকে আবিষ্কার করতে পারা। মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে আধুনিক বলতে সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা বা সাম্যবাদের আয়োজন। আদিম মানবসমাজও একরমের সাম্যসমাজ। এই প্রসঙ্গেই মনে রাখতে হবে, মর্গানের সামনেও অতীতের উপর থেকে পর্দা সরে যাবার দরুনই এক ভবিষ্যতের চিত্র উন্মোচিত হয়েছিলো এবং সে-ভবিষ্যতের বর্ণনায় মর্গান বলেছিলেন : ‘সেই প্রাচীন সমাজের সাম্য মৈত্রী ও স্বাধীনতাই আবার ফিরে আসবে উন্নততর এক পর্যায়ে’।

আমাদের বর্তমান আলোচনায় বিশেষ করে প্রাসঙ্গিক হলো আধুনিক যুগের ব্যক্তিগত-সম্পত্তির প্রভাব-লালিত অন্ধতা প্রাচীন রচনাবলীর তাৎপর্য নির্ণয়ে কী রকম বাধা সৃষ্টি করে সে-সম্বন্ধে সচেতন হবার প্রয়োজনীয়তা তারই উদাহরণ হিসেবে মার্কস(১৪৪) বলছেন :

To show how much we are all implicated in this judicial blindness :…philologists of the force of a Grimm mistranslated the simplest Latin sentences…
E.g., the well-known passage in Tacitus: “arva per annos mutant et superest ager,” which means, “they exchange the fields, arva (by lot, hence also sortes [lot] in all the later law codes of the barbarians) and the common land remains over” (ager as public land contrasted with arva)–is translated by Grimm, etc. “they cultivate fresh fields every year and still there is always (uncultivated) land over!”
আমরা সবাই কী ভাবে এই আইনগত অন্ধতার বশ তাই দেখা যাক।…গ্রীম্‌-এর মতো অতো বড়ো ভাষাতত্ত্ববিদও সবচেয়ে সরল লাতিন বাক্যের ভ্রান্ত তর্জমা করেছেন। উদাহরণ : “arva per annos mutant et superest ager“—ট্যাসিটাসের এই বিখ্যাত অংশটির মানে হলো, “তারা লটারি করে জমি বদল করে এবং সাধারণের জমি বাকি থাকে”; গ্রীম্‌ প্রভৃতি এর তর্জমা করছেন, “তারা প্রতি বছর নতুন জমি চাষ করে এবং তবুও অনাবাদী জমি বাকি পড়ে থাকে”। (সংক্ষিপ্ত অনুবাদ)।

প্রাচীন সমাজ সম্বন্ধে সাধারণভাবে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে তার সাহায্য না নিয়ে প্রাচীন সাহিত্যের অর্থনির্ণয় করবার চেষ্টায় অতিবড়ো বিদ্বানেরাও কী রকম কাল্পনিক কথা বলতে পারেন তার একটি দৃষ্টান্ত ভারতীয় সাহিত্য থেকে এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে। মহাভারতে বাহীকদের বর্ণনায়(১৪৫) ঘৃণাভরে বলা হয়েছে :

তস্মাত্তেষাং ভাগহরা ভাগিনেয়া ন সুনবঃ
অর্থাৎ এই নিমিত্তই তাহাদের পুত্রেরা ধনাধিকারী না হইয়া ভাগিনেয়গণই ধনাধিকারী হইয়া থাকে।

প্রাচীন সমাজ সম্বন্ধে সাধারণভাবে জানতে-পারা তথ্য অনুসারে এই উত্তরাধিকার ব্যবস্থা মাতৃ-প্রধান সমাজের স্বাভাবিক স্মারক বলে বুঝতে অসুবিধে হয় না। মহাভারতে বাহীকদের বর্ণনায় এই মাতৃপ্রধান্যের ইঙ্গিতও অস্পষ্ট নয়(১৪৬) এবং আজো ভারতের স্থানবিশেষে(১৪৭),—যেখানে মাতৃপ্রাধান সমাজের চিহ্ন আছে সেখানে,—এই জাতীয় উত্তরাধিকার ব্যবস্থাই দেখতে পাওয়া যায়। অথচ, মহাভারতের এই সরল তথ্যটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নীলকণ্ঠের মতো বিদ্বান-ব্যক্তিও কী রকম মনগড়া কথা বলছেন :

যদি অপি পুত্রী পুত্রঃ চ দ্বৌ অপি জারজৌ তথাপি পিতৃত্বে ইব মাতৃত্বে বিসংবাদীভাবাৎ দৌহিত্রঃ এব রিঞ্চ্‌ অহারী ভবতি ন পুত্রঃ ইতি ভাবঃ। যতঃ তে ভগিনীষু এব অপত্যানি জনয়ন্তি স্বাদারেষু অতঃ তেষাং ভাগিনেয়াঃ ভাগহরাঃ ইতি……
অর্থাৎ, যদিও পুত্রী ও পুত্র দুজনেই জারজ তথাপি পিতৃত্বের ন্যায় মাতৃত্বে বিসংবাদঅভাব হেতুম দৌহিত্রই ধনাধিকারী হয়, পুত্র নহে। যেহেতু তাহারা ভগিনীতেই অপত্য উৎপাদন করে, নিজেদের পত্নীতে নহে—সেই হেতু তাহাদিগের ভাগিনেয়গণই উত্তরাধিকারী হয়।

মার্কস যে-অন্ধতার কথা উল্লেখ করছেন এখানে তারই অনুরূপ অন্ধতার পরিচয়। এখানে এই অন্ধতা দূর করবার জন্যেই গ্রীকতত্ত্বের অতো বড় পণ্ডিত হয়েও অধ্যাপক জর্জ টমসন গ্রীক সাহিত্য বোঝবার তাগিদেই মার্কসবাদী হয়েছিলেন।

————–
১২৮. F. Engels OFPPS ভূমিকা দ্রষ্টব্য।
১২৯. Ibid 7.
১৩০. F. Engels LF, AD ইত্যাদি দ্রষ্টব্য।
১৩১. G. Thomson AA 421; SAGS 43; FP 43-4, ইত্যাদি।
১৩২. বেদান্তসার প্রভৃতি দ্রষ্টব্য।
১৩৩. H. L. Morgan AS 3.
১৩৪. Ibid 10-1, 56.
১৩৫. Ibid 17-8.
১৩৬. G. Thomson SAGS 34.
১৩৭. G. Childe MMH 51.
১৩৮. G. Thomson op. cit. 35.
১৩৯. Ibid 86.
১৪০. F. Engels OFFPPS 30.
১৪১. G. Thomson op. cit. 85-6.
১৪২. Ibid 57 : “To tell the whole story from beginning to end would not only reveal the present as a continuation of the past—it would lift the veil on the future. There’s the rub.”
১৪৩. K. Marx & F. Engels C 209.
১৪৪. Ibid.
১৪৫. কর্ণপর্ব ৩৪:১১৯।
১৪৬. তৃতীয় পরিচ্ছেদের “রাষ্টশক্তির আবির্ভাব” অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
১৪৭. G. Thomson SAGS 155 : আমেরিকার ইরোকোয়া এবং ভারতের খাসিদের মধ্যে এই ব্যবস্থা প্রচলিত। অন্যান্য ভারতীয় দৃষ্টান্তের জন্য O. R. Ehrenfels-এর MI দ্রষ্টব্য।

২৪. উপসংহার (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : পদ্ধতি প্রসঙ্গে)

আধুনিক যুগের বিদ্বানেরা ভারতবর্ষের প্রাচীন রচনাবলী সম্বন্ধে অনেক গবেষণা করেছেন। সে-গবেষণাকে ছোটো করবার প্রশ্ন নিশ্চয়ই ওঠে না; কেননা, তার উপর নির্ভর করতে না পারলে আমাদের পক্ষে আজ হয়তো ওই পুঁথিপত্রগুলির দিকে অগ্রসর হওয়াই অনেকাংশে অসম্ভব হতো। কিন্তু তবুও শুধুমাত্র এই গবেষণা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাও সম্ভব নয়। কেননা, এই রচনাগুলিতে প্রাচীন-সমাজের সে-সব স্মারক পড়ে রয়েছে আধুনিক বিদ্বানেরা সেগুলির প্রকৃত ব্যাখ্যা খোঁজ করেন নি। তার কারণ কি এই যে, প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির ওই সব ঝুলজমা ধুলোঢাকা গহ্বরগুলিতে এমন কঙ্কাল লুকানো রয়েছে যার কাহিনী শুনতে আধুনিক সমাজ সাহস পায় না? এই কঙ্কালগুলি রবীন্দ্রনাথের কঙ্কাল গল্পের অশরীরী নায়িকাটির মতো সত্যিই বড় অপরূপ কাহিনী আমাদের শোনাতে চায়। এরা বলতে চায়, উত্তরযুগের ভারতীয় সমাজে হিংসা ও বিদ্বেষের তাণ্ডব যতো প্রচণ্ড হয়েই উঠুক না কেন এককালে এই সমাজেই সবাই স্বাধীন ছিলো, সবাই সমান ছিলো, মানুষে-মানুষে ছিলো ভাই-ভাই সম্পর্ক। তখনো মানুষ মানুষকে শোষণ করতে শেখেনি, তাই শেখেনি অধ্যাত্মবাদের প্রবঞ্চনা, শেখেনি ভাববাদের আলেয়া দেখিয়ে মানুষকে ভুল পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

এ-কাহিনী প্রকাশ করতে আধুনিক সমাজ এতো ভয় পায় কেন? কেননা, সে-কাহিনী শুনে আজকের মানুষ আবার সমানে-সমান সম্পর্ককে ফিরে পেতে চাইবে। তার মানে অবশ্যই সে-সমাজের দৈন্যকে ফিরে পাবার কথা নয়—ধনসম্পদের দৈন্যও নয়, চিন্তাচেতনার দৈন্যও নয়—তার বদলে, প্রাচুর্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নতুন সাম্য-সমাজ, আর তারই অনুরূপ ধ্যানধারণা হিসেবে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ লোকায়ত-দর্শনও। অতীতকে আবিষ্কার করবার সঙ্গে শুধুই অতীতকে চেনবার সম্পর্ক নয়—সচেতনভাবে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবার যোগাযোগও আছে।

২ম খণ্ড : বস্তুবাদ । ৩য় পরিচ্ছেদ : গণপতি—বস্তুবাদের উৎস-সন্ধানে

 ০১. ভারতের কি কোন ইতিহাস নেই?

দ্বিতীয় খণ্ড
বস্তুবাদ
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
গণপতি : লোকায়ত-র উৎস সন্ধানে

দার্শনিক হেগেল দেখাতে চেয়েছেন, ভারতবর্ষের কোনো ইতিহাস নেই। এদেশে জীবাত্মা তার নিজস্ব সত্তা খোয়াতে খোয়াতে  একেবারে দেউলে হয়ে গিয়েছে। এদেশে পরমাত্মার মর্যাদাকে মলিন করা হয়েছে খণ্ড, সংকীর্ণ বস্তুরাজ্যের মধ্যে তাঁকে বিলীন করে দিয়ে। এবং এ-পরিস্থিতিতে আর যাই হোক ইতিহাস বলে কিছু সম্ভব নয়।

হেগেলের এই ভারত-আবিষ্কার সত্যিই বিস্ময়কর!

ভারতের কি কোন ইতিহাস নেই?

হেগেলের মূল কথা হলো, মানুষের ইতিহাসকে শুধুমাত্র মানুষের কীর্তিকাহিনী মনে করা ভুল। কেননা, এই পরিদৃশ্যমান জগতের পিছনে আছেন এক চিন্ময় পরমাত্মা। এখানের ধূলিকণা থেকে শুরু করে ধ্যানধারণার জটিলটা পর্যন্ত সর্বত্রই তাঁর বিকাশ।

তাই, ইতিহাস বলতে মরলোকের মানুষ যেটুকু দেখেছে সেটুকুই সব নয়। আসলে সবই তাঁর লীলা। আর কী অপরূপ এই লীলা : যুগের পর যুগ ধরে একের পর এক পর্যায় পার হয়ে, ভগবান তাঁর মহিমার বিকাশ করে চলেছেন! এক এক যুগের এক এক দেশের কথা তাই এই লীলাপ্রসঙ্গেই যেন এক একটি পরিচ্ছেদ।

আমাদের দেশে, ভারতবর্ষে, লীলাময়ের কী রকম মহিমা?

হেগেল(১) বলছেন, এ-যেন তাঁর স্বপ্ন-দশা। স্বপ্নমহিমা। তার মধ্যে লাবণ্য যে নেই তা নয় : যা-কিছু কঠিন, যা-কিছু এলোমেলো, এবড়ো-খেবড়ো, দ্বন্দ্বকণ্টকিত, তা সবই এখানে শান্ত, সমাধিস্থ হয়ে গিয়েছে। তবুও, কী সাংঘাতিক অলীক এই স্বপ্ন—এমনকি মনগড়া বা কাল্পনিক কথার মতোও নয়। যদি তাই হতো তাহলেও জীবাত্মা এ-কল্পনা থেকে ও-কল্পনায় সহজে যাতায়াত করতে পারতো। তার মানে, একটা কল্পনাকে যতো সহজে জড়িয়ে ধরতো ততো সহজেই আবার তাকে ছেড়ে আসতে পারতো। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে লীলাময়ের যে-স্বপ্ন-দশা সেখানে জীবাত্মা যে-কোনো একটি খণ্ড ও সংকীর্ণ বস্তুর কাছেই একেবারে চরম আত্মসমর্পণ করে বসে—যেন বিধাতার পায়ে, ভগবানের কাছে, একেবারে বিলীন হয়ে যাওয়া! এখানে তার সবকিছুই যেন এক একটি মূর্তিমান ভগবান : সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, গঙ্গা, সিন্ধু, জানোয়ার, সবকিছুই। ঈশ্বর-সৃষ্টির এই নেশায় জীবাত্মার স্বরূপ ও স্বাতন্ত্র্য সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। অপরপক্ষে আবার সংকীর্ণ ও খণ্ড বস্তুরাজ্যের স্তরে নামিয়ে এনে মলিন করা হয় ঈশ্বরের মর্যাদা।

আর, হেগেল বলছেন, ঠিক এই কারণে ইতিহাস বলতে সত্যিই যা বোঝায় এ-দেশে তার সন্ধান করা চলে না(২)। কেননা, ব্যক্তিচেতনা যেখানে ধ্বংস হয়েছে, বস্তু-চেতনা যেখানে অনাবিল নয় সেখানে ইতিহাসের আশা করা নিষ্ফল। ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গির মূল কথা হলো একদিকে চরম আত্মনাশ এবং অপরদিকে খণ্ডবস্তুর স্বরূপ ভুলে সবকিছুকেই ঈশ্বর করে তোলা। একদিকে জীবাত্মার বিলোপ, অপরদিকে পরমাত্মার অমর্যাদা। এ-শুধু স্বপ্ন-দশায় সম্ভব—একে ইতিহাস বলে না।

অতএব, হেগেল আরো বলে চলেছেন, ইয়োরোপের কাছে ভারতবর্ষ অনিবার্যভাবেই মাথা নোয়াতে বাধ্য ছিলো, কেননা, ইয়োরোপের শুধু যে ইতিহাস আছে তাই নয়, সে-ইতিহাসে পরমাত্মার অনেক উন্নত পর্যায়ের বিকাশ। হেগেল ভবিষ্যৎ-বাণী করেছিলেন, চীনও একদিন না একদিন এইভাবেই ইয়োরোপের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। বস্তুত, এসিয়ার সমস্ত দেশেরই এই হলো অনিবার্য ভবিষ্যৎ(৩)।

কিন্তু ভারতবর্ষ—তথা এসিয়া—যে একদিন ইয়োরোপের দাসত্বশৃঙ্খল থেকে মুক্তিও পাবে হেগেলের ভবিষ্যৎ-বাণীর মধ্যে এ-কথার স্থান নেই। কী করে থাকবে? যার অতীতটা অস্বীকার করা গেলেও তার ভবিষ্যৎটা স্বীকার করবার অস্বস্তি থেকে মুক্তিও পাওয়া যায়। তাই ভারতবর্ষের মুক্তিসংগ্রামে ভারতবর্ষের অতীত নিয়ে প্রশ্নটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেননা, অতীতের কথার সঙ্গে ভবিষ্যতের কথা সম্পর্কহীন নয়—অতীতের উপর থেকে যবনিকা উঠলে পর ভবিষ্যতেরও নির্দেশ পাওয়া যায়।

ভারতবর্ষের সত্যিই কি কোনো অতীত ছিলো? যদি থাকে, তাহলে সে-অতীতকে আবিষ্কার করে ভারতবর্ষের ভবিষ্যতের কোন ধরনের নির্দেশ পাওয়া সম্ভব হবে?

——————–
১. G. W. F. Hegel PH 147.
২. Ibid 148.
৩. Ibid 149.

০২. তেত্রিশকোটি দেবদেবীর কথা

আমাদের মন আমাদের অতীত সম্বন্ধে একটা গর্বের ভাব নিশ্চয়ই রয়েছে। এবং নানান রকম প্রচারের ফলে এ-গর্ব প্রধানতই আমাদের আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্য নিয়ে। তাই, হেগেলের ওই অধ্যাত্মবাদী সমালোচনাটা আমাদের অনেকেরই মনঃপুত হবে না।

হেগেলের তরফ থেকে কিন্তু তর্ক তুলে বলা যাবে, এ-দেশে অন্তত তেত্রিশকোটি দেবদেবীর ভিড় রয়েছে। তাঁদের বাদ দিয়ে দেশের কথাটা তো সত্যিই বোঝা যায় না! আর, ওই তেত্রিশকোটি দেবদেবী থেকেই প্রমাণ হয়, এ-দেশে মানুষ যা-কিছু সামনে পেয়েছে তাকেই একেবারে ভগবান বলে আঁকড়ে ধরবার চেষ্টা করেছে : সূর্য, চন্দ্র, জানোয়ার, ফুল্ম সবকিছুই! তাই, একে একরকম ঘোরের দশাই বলতে হবে। স্বপ্নের ঘোর। শুধু তাই নয়, ওই ঘোরের মধ্যে একেবারে বিলীন হয়ে যাওয়াও।

তেত্রিশকোটি দেবদেবী! সত্যিই তো, ভিড় বড়ো কম নয়। কে যেন বলেছিলো, এ-দেশে মানুষের চেয়েও দেবতারা দলে ভারি। কথাটা অবশ্যই রসিকতা, হেগেলের মতো প্রগাঢ় দার্শনিকতা নয়। তবুও, রসিকতা হলেও উড়িয়ে দেওয়া চলে না। হিসেবে তার প্রমাণ রয়েছে। হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে, ষোড়শ শতাব্দীতে(৪) ভারতবর্ষের জনসংখ্যা মাত্র দশকোটির মতো হচিলো আর দেবতারা যে তখন দলে কম-ভারি ছিলেন তা নিশ্চয়ই ভাবা যায় না। এমনকি, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষাশেষি(৫), যখন সর্বপ্রথম দেশের মানুষ ভালো করে গুনে দেখা হলো তখন, দেখা গেলো মানুষের সংখ্যা মোটের উপর পঁচিশ কোটির চেয়ে সামান্য বেশি। তেত্রিশকোটির পাশে পঁচিশ কোটি নিশ্চয়ই খুব একটা জাঁকালো সংখ্যা নয়।

দেশের শাসকেরা এই ভিড় নিয়ে স্বভাবতই বিব্রত ও বিরক্ত হন। কিন্তু, অন্তত আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, তাঁদের মনোভাবে একটি বিরোধ থেকে গিয়েছে। কেননা, শাসকসম্প্রদায়ের বিরক্তিটা একান্তভাবেই ভিড়ের ছোটো অংশটুকু সম্বন্ধেই, সংখ্যালঘু ওই মরলোকের মানুষগুলি সম্বন্ধেই। ঐশী বাসিন্দারা দেশের ভিড়কে যতো অসহ্যই করে তুলুন না কেন তাঁদের সম্বন্ধে শাসকসম্প্রদায়ের বিরক্তি নেই, বরং একটা প্রকাশ্য শ্রদ্ধাভক্তির ভাবই দেখা যায়(৬)

অবশ্যই, ভালো করে বিচার করলে শাসকদের এই আপাত-বিরোধী মনেওভাবের ন্যায়সঙ্গত তাৎপর্য বোঝাবার ব্যাপারে তাঁদের তরফ থেকে ক্লান্তির পরিচয় পাওয়া যায়নি।

রক্তমাংসে-গড়া এই সংখ্যালঘুর দল নির্বিচারে বংশবৃদ্ধি করে, সন্তানের জন্ম দেয় বেপরোয়ার মতো। বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ আনিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে দেওয়া হচ্ছে(৭), এরই দরুন দেশের বুকে অভাব-অনটনের বন্যা না বয়ে পারে না। এ যে অর্থনীতির এক অমোঘ বিধান : খাইয়া মানুষের সংখ্যা বাড়লে খাবারে ঘাটতি পড়বেই। অথচ, কার্যকারণসম্পর্ক সম্বন্ধে অন্ধ ওই প্রাকৃতজনেরা একদিকে সেকালের বামাচারীদের মতোই প্রজনন-উৎসাহী এবং অপরদিকে লোকায়তিকদের মতোই অমৃত বদলে অন্নকেই পুরুষার্থ মনে করছে। ফলে, একালেও সন্তান-উৎপাদনের সঙ্গে খাদ্য-উৎপাদনের প্রসঙ্গ না উঠে পারছে না। দাবি উঠছে, দেশের উৎপাদন-পদ্ধতিকে উন্নততর করতে হবে—অনাবাসী জমিকে আবাদ-যোগ্য করে তুলতে হবে, আবাদী জমিতে চাষবাদের মামুলি আয়োজনটুক নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা চলবে না, দেশের বুকে গড়ে তুলতে হবে আধুনিক কলকারখানা। দেশের মানুষ যদি সংখ্যায় সত্যিই বাড়ে তাহলে সমাধানটা অনাহার নয়, খামারের আয়োজন বাড়ানোই।

কিন্তু, উৎপাদন-পদ্ধতির সঙ্গে শাসন-ব্যবস্থারও যোগাযোগ রয়েছে। ফলে, এ-জাতীয় দাবী শাসক-সম্প্রদায়ের সুনিশ্চিত শান্তিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। তাই দেখা দেয় বিরক্তিও। তুলনায় কিন্তু ঐশী বাসিন্দারা দলে যতোই বেশি হোন না কেন, এরকম বিরক্তিজনক পরিস্থিতি মোটেই সৃষ্টি করেন না। দেশের উৎপাদন-পদ্ধতিকে উন্নততর করবার বদলে বরং পিছিয়ে-পড়ে থিতোনো আবহাওয়াই তাঁদের পক্ষেও নিরাপদ। দেশের জনসাধারণ যাতে নিজেদের দুঃখদৈন্যকে নিজেদেরই কর্মফল বলে মেনে শুধুমাত্র নিজেদের কপালেই করাঘাত করতে শেখে এ-চেষ্টাতেও তাঁরা উদাসীন নন। ফলে, দেশের শাসক-সম্প্রদায়ও এঁদের সম্বন্ধে বিরক্তির বদলে শ্রদ্ধাভক্তিই প্রচার করতে চায়।

———————-
৪. Moreland IDA 22; R. P. Dutt IT 48.
৫. Census of 1871-2 cf. W. W. Hunter IGI 4:164-5.
৬. যথা, Queen’s Proclamation of 1858. See R. P. Dutt IT 286-7. cf. H. Maine VCEW 46.
৭. এ-জাতীয় প্রচারের চুড়ান্ত জবাব হিসেবে Castro GH দ্রষ্টব্য।

০৩. ভারতের আদিপর্ব

কিন্তু দার্শনিক হেগেলের পক্ষে কথাটা যতোই অসন্তোষজনক হোক না কেন, ভারতবর্ষেরও একটা অতীত ইতিহাস সত্যিই আছে। বরং, ওই যে তেত্রিশকোটি দেবদেবীর নজির দেখিয়ে হেগেল প্রমাণ করতে চেয়েছেন এ-দেশের কোনো ইতিহাস নেই,—ওঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করলেই এ-দেশের অতীত ইতিহাসটার আভাস পাওয়া যেতে পারে। কেননা, এই দেবদেবীদের নিজেদের ইতিহাস আছে এবং সে-ইতিহাস শুধুই যে চিত্তাকর্ষক তাই নয়, তারই মধ্যে দেশের ইতিহাসও প্রতিফলিত হতে দেখা যায়।

দেশের সেই আদিপর্বের ইতিহাসটির সন্ধান পেলে দেখা যায় অবস্থাটা চিরকালই স্বপ্নের ঘোরের মতো নয়। আর, হেগেল ওই যে স্বপ্ন-লাবণ্যের কথা বলছেন,—যা-কিছু কঠিন, যা-কিছু কঠোর, যা-কিছু দ্বন্দ্বকণ্টকিত ও সংঘাতচঞ্চল তা সবই স্বপ্নের দশায় শান্ত সমাধিস্থ হয়ে যাওয়ার লাবণ্য—তা আর যাই হোক অন্তত ভারতীয় ইতিহাসের আদিপর্বের বেলায় অলীক কল্পনামাত্র।

কিন্তু দেবদেবীদের আবার ইতিহাস কী? স্বর্গের কাহিনীর সঙ্গে মর্তের মানুষদের সম্পর্কই বা কী করে সম্ভবপর?

আসলে এই দেবদেবীরা চিরকালই স্বর্গের বাসিন্দা ছিলেন না। তার মানে, এমন একটা যুগ ছিলো যখন তাঁরা আধুনিক অর্থে দেবদেবীই হয়ে ওঠেননি। তাই মর্তের মানুষের সংগেই তাঁদের সম্পর্ক তখন খুব নিবিড়। মানুষের উৎপন্ন অন্ন থেকে নৈবেদ্য পাবার বদলে তখন তাঁরা অনেকেই মানুষের উৎপাদন-উৎসাহে, এমনকি প্রজনন-উৎসাহেও, প্রকাশ্যভাবেই নেতৃত্বগ্রহণ করতে দ্বিধা করেননি।

 

ভারতবর্ষের সেই আদিপর্বের চিত্রটি তাই আশ্চর্য, অপরূপ। মানুষের সমাজে তখনো উদ্বৃত্তজীবী শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটেনি আর তাই সে-শ্রেণীর চেতনা দিয়ে গড়া নৈবেদ্যজীবী দেবদেবীরাও নয়।

তারপর অবশ্যই উদ্বৃত্তশ্রণীর মানুষের আবির্ভাব হয়েছে। যদিও অবশ্য, ঠিক কী করে তা হলো সে-প্রশ্ন খুবই জটিল। প্রাচীন ভারতে রাষ্ট্রের উৎপত্তি-ইতিহাস এখনো লেখা হয়নি। কিন্তু এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, আসমুদ্রহিমাচল এই বিরাট দেশে সমস্ত মানুষের জীবনে একই তালে পরিবর্তন দেখা দেয়নি। রাষ্ট্রশক্তি গড়ে ওঠবার পাশাপাশিই থেকে গিয়েছে প্রাগ্‌-বিভক্ত প্রাচীন সমাজ। আর, ওর রাষ্ট্রশক্তির বর্ণধারেরা প্রাগ্‌-বিভক্ত সমাজের মানুষগুলিকে যে কী রকম বিষনজরে দেখেছিলেন তার দলিল রচনা করে গিয়েছেন স্বয়ং কৌটিল্য। কৌটিল্যের রচনা অনুসরণ করেই যৌথ-সমাজের প্রতি শ্রেণীবিভক্ত-সমাজের শাসক-সম্প্রদায়ের মনোভাব সম্বন্ধে পরে আলোচনা তুলবো। আপাতত প্রশ্ন হলো, দেবদেবীদের আদিরূপটির প্রতি ওই শাসক-শ্রেণীর মনোভাব কী রকম? যে-মানুষদের সঙ্গে তখনো ওই দেবদেবীদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সেই মানুষদের প্রতি যে-রকম মনোভাব, সেই রকমই। অর্থাৎ, দেশের শাসক-সম্প্রদায়ও এঁদের মোটেই সুনজরে দেখেনি, এমনকি খোদ আইনকর্তারাও এঁদের বিরুদ্ধে আইনজারি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। অর্থাৎ, দেবলোকের অনেক যুদ্ধই তখন পর্যন্ত ঘটে চলেছিলো মরলোকের বুকেই।

আর্য-অনার্য মতবাদের জটিলতায় ভারতের আদিপর্বে শ্রেণীসমাজের আবির্ভাব-কাহিনী আজো অনেকখানি অস্পষ্ট হয়ে রয়েছে। অথচ, ওই আদিপর্বের ইতিহাস খুঁজে না পেলে প্রাচীন ভারতে ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে সংগ্রাম ও সংঘাতকে বুঝতে পারা সম্ভব নয়। তার কারণ, ধ্যানধারণাগুলি স্বয়ম্ভূ নয়। মানুষের মূর্ত জীবনেরই প্রতিবিম্ব।

অতএব, লোকায়তিক ধ্যানধারণার উৎস-আবিষ্কারের প্রচেষ্টা ভারতের আদিপর্ব ইতিহাসটি খোঁজবার চেষ্টাও হতে বাধ্য। এবং, যে দেবদেবীদের নজির দেখিয়ে হেগেল ভারতবর্ষের গোটা ইতিহাসটাকেই অস্বীকার করতে চান তাঁদেরই অনুসরণ করে আমরা হয়তো ভারতের আদিপর্বের ওই ইতিহাসটির সন্ধান পাবো।

০৪. গণেশের কথা কেন?

কিন্তু দেবতা তো এ-দেশে এক-আধটি নন। তাঁদের মধ্যে কাকে ছেড়ে কাকে অনুসরণ করা যাবে?

আগেই বলেছি, আমরা বিশেষ করে গণপতির পদানুসরণ করবো। কেননা, তাঁকে অনুসরণ করবার অনেক রকম সুবিধে আছে।

প্রথমত, এ-নির্বাচন আমাদের ঐতিহ্য-বিচ্যুত করবে না। দেশের ঐতিহ্য অনুসারে যে-কোনো পূজোর বেলাতি গণেশ পুজো পান সর্বপ্রথম। এই ঐতিহ্য অনুসারে গণেশ হলেন সিদ্ধিদাতা। সংকল্প যতো দুরহই হোক না কেন, তাঁকে অনুসরণ করলে সিদ্ধিলাভ সুনিশ্চিত হয়।

কিন্তু ঐতিহ্যের কথা ছাড়াও অন্য যুক্তি রয়েছে। আপনি যদি চণ্ডী বা মনসা বা ওই রকম আর কোনো দেবদেবীকে অনুসরণ করতে চান তাহলে শুরুতেই আপনার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে—কিন্তু বিঘ্ন-বিনাশক গণেশের বেলায় সে-বিঘ্নের ভয় নেই। কী রকম বিঘ্ন? মনসা প্রভৃতির বেলায় আধুনিক পণ্ডিতেরা বলবেন, এঁরা ছিলেন স্থানীয় অনার্যদের উপাস্য দেবদেবী। তাই, আগন্তুক আর্যদের মনে, কিংবা আভিজাতিক আর্য-ঐতিহ্যের বাহকদের পক্ষে, এঁদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিবন্ধ থাকাই স্বাভাবিক। চাঁদসওদাগরের উপাখ্যানে তারই স্বাক্ষর রয়েছে(৮)। কিন্তু এ-প্রতিবন্ধ শুধুমাত্র ধর্মবোধপ্রসূত, আর্যদের ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে অনার্যদের ধর্মবিশ্বাসের সংঘাত-কাহিনী। সে-কাহিনী থেকে ধর্মবিশ্বাসের সংঘাত অনুমান করা যেতে পারে, তার চেয়ে বেশি কিছুই নয়। গণপতির বেলায় কিন্তু এতো সহজ একটা সমাধান দেখিয়ে আমাদের প্রচেষ্টাকে নিরস্ত করা যাবে না। কেননা, গণপতি হলেন না আর্য না অনার্য, কিংবা, আর্য আর অনার্য দুই-ই। বাজসনেয়ী সংহিতায়(৯) তাঁর গান শোনা যায় : গণানাং ত্বাং গণপতি হবামহে! এমনকি, বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীনতম অংশে—ঋগ্বেদের দ্বিতীয় মণ্ডলে—তাঁর উল্লেখ আছে(১০)। আবার ভিলদের গ্রামেও তাঁকে দেখা যায়—চাষের আগে আবাদী জমির উপর একটি শিলাখণ্ডকে তারা গণেশ বলেই সম্বোধন করছে(১১)। গণেশ যে স্থানীয় অনার্যদের বিশ্বাস থেকে ঋগ্বেদ সংহিতায় বা বাজসনেয়ী সংহিতায় প্রবেশলাভ করেছিলেন, এমন কথা যদিও ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়(১২) প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছেন তবুও তাঁর যুক্তির জোর খুবই ক্ষীণ মনে হয়। অপরপক্ষে গণেশ যে সংহিতা সাহিত্য থেকে বেরিয়ে কোলভিলদের মন জয় করেছিলেন এ-ধরনের কথা প্রমাণ করা আরো দুঃসাধ্য হবে। তাই, অন্যান্য দেবদেবীর বেলায় আধুনিক পণ্ডিতেরা যে অতিসরল সমাধান দিতে পারবেন গণেশের বেলায় তা সম্ভব হবে না।

গণেশকে অনুসরণ করবার তৃতীয় সুবিধে হলো, আধুনিক পণ্ডিতদের মধ্যে ইতিপূর্বে অনেকেই তাঁর ইতিহাস রচনা করবার চেষ্টা করেছেন। এ-বিষয়ে শ্রীযুক্ত হরিদাস মিত্র(১৩) ও শ্রীমতি অ্যালিস গেটীর(১৪) গবেষণা বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য। পূর্বসুরীদের এই জাতীয় গবেষণা আমাদের প্রচেষ্টাকে অপেক্ষকৃত সহজসাধ্য করতে পারে।

সুবিধের কথা ছাড়াও আমাদের পক্ষে গণেশের ইতিহাস অন্বেষণ করাই বিশেষ করে প্রাসঙ্গিক। তারও নানান কারণ আছে। প্রথমত, আমাদের উদ্দেশ্য হলো লোকায়তিক ধ্যানধারণার উৎস অনুসন্ধান করা এবং আমরা আগেই দেখেছি লোকায়তের সঙ্গে বামাচারের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। এবং ওই তেত্রিশকোটির মধ্যে গণেশই বোধ হয় একমাত্র দেবতা যাঁর সঙ্গে লোকায়ত ও বামাচার দু’-এর স্পষ্ট যোগাযোগ রয়েছে। দেশের ঐতিহ্য অনুসারে লোকায়ত-দর্শনের আদি-গুরু হলেন বৃহস্পতি এবং ঋগ্বেদের মন্ত্র অনুসারে বৃহস্পতি ও গণপতিতে তফাত নেই(১৫)। অপরপক্ষে, এই গণেশই আবার তান্ত্রিক সাহিত্যের হেরম্ব—হেরম্ব ছাড়াও তন্ত্রে গণেশের আরো অনেক রকম নাম আছে। তাছাড়াও, শক্তি-গণপতির মূর্তি এবং আনন্দগিরির শঙ্কর বিজয়ে গাণপত্যসম্প্রদায়ের বর্ণনা গণেশকে একেবারে অভ্রান্তভাবেই বামাচারের সঙ্গে সংযুক্ত বলে প্রমাণ করে(১৬)। দ্বিতীয়ত, সমাজ-ইতিহাসের কথা বাদ দিয়ে দর্শনের ইতিহাস আলোচনা অসম্ভব। গণপতিকে অনুসরণ করেই প্রাচীনকালের সমাজ-ইতিহাসের দিকে অগ্রসর হওয়া সুবিধাজনক। কেননা, গণপতির কাহিনী আর গণের কাহিনী আলাদা নয়। এখানেও পূর্বসূরীদের প্রচেষ্টা আমাদের পক্ষে বিশেষভাবে সহায়ক হবে। কেননা, আধুনিক যুগের দু’জন বিখ্যাত ঐতিহাসিক,—অধ্যাপক কে. পি. জয়সওয়াল(১৭) ও অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদার(১৮),—এই গণের কথাই বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমরা একটি পরেই দেখবো, মার্কস যাকে বলেছেন ‘আইনগত অন্ধতা’ তারই দরুন এঁরা গণ সম্বন্ধে বহু তথ্য সংগ্রহ করেও শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান-বিচ্যুত হয়েছেন। কিন্তু এঁদের সিদ্ধান্ত স্বীকারযোগ্য না হলেও এঁরা যে-সব তথ্য সঞ্চয় করেছেন তা মহামূল্যবান।

——————–
৮. A. Mitra CWB 1951—TCWB 7.
৯. বাজসনেয়ী সংহিতা ২৩.১৯।
১০. ঋগ্বেদ ২.২৩.১।
১১. W. Crooke RFNI 250.
১২. ক্ষিতিমোহন সেন : জাতিভেদ ৬৪।
১৩. H. Mitra in VQ 1931-32, 1935.
১৪. A. Getty G.
১৫. ঋগ্বেদ ২.২৩.১। cf. R. G. Bhandarkar VS 149.
১৬. এই গ্রন্থের তৃতীয় পরিচ্ছেদের “আয়ুধজীবীগণ ও বার্তাশস্ত্রোপজীবীগণ” অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
১৭. K. P. Jayaswal HP.
১৮. R. C. Majumder CLAI.

০৫. গণেশ মানে কী?

এই সব নানান কারণে আমরা তেত্রিশকোটির মধ্যে বিশেষ করে গণপতিরই শরনাপন্ন হতে চেয়েছি।

কিন্তু গণেশ না হয়ে শিবও হতে পারতো, কৃষ্ণও হতে পারতো; হতে পারতো বুদ্ধ, হতে পারতো কপিল; এমনকি হতে পারতো স্বয়ং বৃহস্পতি—যাঁর নামের সঙ্গে লোকায়ত-দর্শনের যোগাযোগটা কিছুতেই ভোলা চলে না। কিন্তু এখানে খুবই আশ্চর্য ব্যাপার আছে—যেন, উপনিষদের ভাষায়, একবিজ্ঞানেন সর্ববিজ্ঞানম্‌। এক গণেশের ইতিহাসকে খুঁজে পেলেই শিব, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, কপিল, বৃহস্পতি—অনেকেরই জন্মাদিরহস্য খুঁজে পাওয়া যায়। তাছাড়া, ভারতীয় ঐতিহ্যের এমনই জটিলতা যে, গণেশের সঙ্গে শিবের আর কৃষ্ণের, কপিলের আর বুদ্ধের একাত্মভাব একাধিকবার ঘোষিত হয়েছে। বৃহস্পতির কথা তো আগেই বলেছি। ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয় বলছেন, “এখন আমরা গণদেবতা বলিতে শুধু গণেশকেই বুঝি। কিন্তু মহাদেবও গণেরই দেবতা। গণদেবতা অর্থাৎ সাধারণ লোকপূজ্য দেবতা(?)। মহাদেবেরই এক নাম গণেশ (বনপর্ব, ৩৯, ৭৯), তিনিই গণানাং পতিঃ (দ্রোণপর্ব, ২০১, ৪৮), তিনিই গণাধ্যক্ষ গণাধিপ (সৌপ্তিকপর্ব, ৭, ৮; শান্তিপর্ব, ২৮৪, ৭৬)। বিষ্ণুও গণদেবতা। তাই তাঁর নাম গণেশ্বর, লোকবন্ধু, লোকনাথ, ইত্যাদি (অনুশাসনপর্ব, ১৪৯, বিষ্ণু সহস্রনাম)। মহাদেবের প্রায় নামই বিষ্ণু সহস্রনামে দেখা যায়। যথা, ঈশান, স্থাণু, মহাদেব, রুদ্র, বৃষাকৃতি, লোকাধ্যক্ষ ইত্যাদি।(১৯) মনিয়ার উইলিয়ামসও(২০) বলছেন, মহাভারতের স্থানবিশেষে শিবের নাম গণাধিপতি বা গণেশ। বুদ্ধ আর কপিলের সঙ্গেও অন্তত এই রকমই নামের মাধ্যমেই গণেশের সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, গণেশের একটি নাম হলো বিনায়ক। এবং বিণায়ক বলতে বুদ্ধকেও বোঝায়, কপিলকেও বোঝায়।

তাই, গণপতির ইতিহাস একা গণপতিই ইতিহাস নয়। কিংবা, ঘুরিয়ে বললে হয়তো একথাও বলা যায় যে, এক গণপতিই নানা রূপে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের নানা জায়গা জুড়ে রয়েছেন।

ভারতীয় ঐতিহ্যের এতো সব জটিলতা সত্ত্বেও কিন্তু এতোটুকুও জটিলতা নেই গণেশের নামটা নিয়ে। অতুলচন্দ্র গুপ্ত(২১) মহাশয় যেমন বলছেন, “সর্ববিঘ্নহর ও সর্বসিদ্ধিদাতা বলে যে দেবতাটি হিন্দুর পূজা-পার্বণে সর্বাগ্রে পূজা পান, তাঁর গণেশ নামেই পরিচয় যে, তিনি ‘গণ’ অর্থাৎ জনসঙ্ঘের দেবতা। এ থেকে যেন কেউ অনুমান না করেন যে, প্রাচীন হিন্দুসমাজের যাঁরা মাথা তাঁরা জনসঙ্ঘের উপর অশেষ ভক্তি ও প্রীতিমান ছিলেন। যেমন তার সব সমাজের মাথা, তেমনি তাঁরাও সঙ্ঘবদ্ধ জনশক্তিকে ভক্তি করতেন না, ভয় করতেন!…গণশক্তির প্রতি প্রাচীন হিন্দুসভ্যতার কর্তাদের মনোভাব কি ছিল। তা গণেশের নরশরীরের উপর জানোয়ারের মাথার কল্পনাতেই প্রকাশ।”

অতুলচন্দ্র গুপ্ত মহাশয়ের ‘গণেশ’ বলে ওই ছোট্ট প্রবন্ধটি আমাদের কাছে খুবই মূল্যবান মনে হয়েছে। তার প্রধান কারণ এই যে, তিনিই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আমাদের স্মরন করিয়ে দিলেন, গণেশের প্রতি শাসক-সমাজের একালের মনোভাবটার সঙ্গে সেকালের মনোভাবের মিল নেই। আমরা একটু পরেই দেখবো, এই সূত্রটি আমাদের পক্ষে কতোখানি মূল্যবান।

কিন্তু তার মানে নিশ্চয়ই এই নয় যে, অতুলবাবুর প্রতিটি মন্তব্যই স্বীকারযোগ্য। প্রথমত, ‘গণ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ কী, এ-বিষয়ে দিকপাল ভারততত্ত্ববিদেরা বহু আলোচনা করেছেন—তাঁদের আলোচনা উপেক্ষা করে গণেশের ইতিহাস আলোচনা করা যায় না। দ্বিতীয়ত, গণেশের ওই গজাননটির কাহিনী সত্যিই অতো সহজ নয়। বিশেষ করে এই কারণে নয় যে, গণেশের চিরকালই এ-রকম হাতির মাথা ছিলো কিনা সন্দেহের কথা। বৈদিক সাহিত্যে গণপতির উল্লেখ আছে, কিন্তু তাঁর গজাননের উল্লেখ নেই(২২)। তান্ত্রিক সাহিত্যে গণেশের বহু চিত্তাকর্ষক নামের মধ্যে কয়েকটি নাম হলো : বৃষভধ্বজ, দ্বিজিহ্ব, বৃষকেতন ইত্যাদি(২৩)। এই জাতীয় নাম হাতির বদলে সাপ আর ষাঁড়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। খোদাইকরের ছেনি যদি গণেশকে দ্বিজিহ্বের রূপ দিতো তাহলে নিশ্চয়ই তাঁর মূর্তিতে গজমূণ্ডের চিহ্ন থাকত না। বস্তুত, নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি অঞ্চলে পাওয়া কোনো কোনো গণেশমূর্তির(২৪) সঙ্গে হাতির মাথার সত্যিই কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি, নির্দিষ্ট কোনো রূপহীন শিলাখণ্ডকে আজো ভারতবর্ষের নানা জায়গায় গণেশ আখ্যা দেওয়া হয়(২৫)। আনন্দকুমার কুমারস্বামী(২৬) মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গজাননবিশিষ্ট গণেশের এই মূর্তিটি ভারতবর্ষ বহুলভাবে প্রচলিত হতে শুরু করেছে শুধু গুপ্তযুগ থেকেই। এই সব নানা কারণে আমাদের সন্দেহ হয় গণেশের ওই হাতির মাথার মধ্যে অনেক রকম খবর লুকোনো আছে তার তাই এ-বিষয়ে কোনো একটা মতবাদকে তাড়াতাড়ি মেনে নিতে আমাদের দ্বিধা হয়।

তৃতীয়ত, অতুলচন্দ্র গুপ্ত মহাশয় বলছেন, গণেশ নামেই পরিচয় যে, তিনি গণ অর্থাৎ জনসঙ্ঘের দেবতা। কিন্তু এখান দেবতা কথাটিতে উত্তরযুগের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ঠিক কতোটুকু বর্তমা তাও ভেবে দেখা দরকার। বাজসনেয়ী সংহিতায় যিনি গণপতি তাঁর মধ্যে আধুনিক অর্থে দেবভাব একান্তই আছে কিনা তা ভেবে দেখবার কথা। মনিয়ার উইলিয়ামস-এর(২৭) মতে সেখানে গণপতি বলতে একদল মানুষের বা কোনো এক গোষ্ঠীর নেতামাত্রই বুঝিয়েছে। এবং, তাঁর ধারণায় ঋগ্বেদের দ্বিতীয় মণ্ডলে গণপতি বা ব্রহ্মণস্পতি নামের তাৎপর্যও আলাদা নয়। বরাহমিহিরও(২৮) গণনায়ক শব্দটিকে ঠিক এই অর্থেই ব্যবহার করেছেন। মনে রাখা দরকার, গণেশেরই অপর নাম হলো গণনায়ক এবং নায়ক মানে নেতা। গণেশের দেবত্বের অভাব আরো স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে অন্য একটি নামের মধ্যে। উইলসন(২৯) বলছেন, গণেশের একটি নাম শুধু গণ। তান্ত্রিক সাহিত্যেও(৩০) এ-কথার নজির রয়েছে। এবং গণ বলতে যাই বোঝাক না কেন, দেবতা বোঝাবার কোনো কারণ নেই। তার মানে, এমনটা হওয়া নিশ্চয়ই অসম্ভব নয় যে, শুরুর যুগে গণেশ আধুনিক অর্থে দেবতা ছিলেন না।

আপত্তি তুলে হয়তো বলা হবে, নামে কিছুই আসে যায় না। গণেশ হলেন সিদ্ধিদাতা দেবতা—তা তাঁকে গণপতিই বলা হোক বা গণনায়কই বলা হোক বা শুধু গণ-ই বলা হোক। আমাদের ধারণায় অবশ্য নামে নিশ্চয়ই আস-যায়। কিন্তু আপাতত সে-তর্ক না তুললেও চলতে পারে। কেননা, শুধুমাত্র ওই বিচিত্র নামগুলিই গণেশের ইতিহাসে বড়ো কথা নয়। আগেই বলেছি, গণেশ না হয়ে কৃষ্ণ হতে পারতো, কপিল হতে পারতো, বুদ্ধ হতে পারতো, বৃহস্পতি হতে পারতো। এঁদের নামের সঙ্গে অন্তত আপাত-দৃষ্টিতে গণের কোনো সম্পর্ক নেই। তার মানে, গণেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আশ্চর্য দিকটিকে তাঁর ওই নামগুলির মধ্যেই খোঁজ করবার প্রয়োজন নেই।

তাহলে, সেই আশ্চর্য দিকটি ঠিক কী? সে-এক অপরূপ পরিবর্তন।

একটা বিশেষ যুগে দেখা যায় সমাজের সদরমহলে গণেশের প্রতি মনোভাবটা একেবারে পাল্টে যাচ্ছে। আর, শুধু এই মনোভাবের পরিবর্তনই নয়, গণেশের নিজস্ব তাৎপর্যও। এই ওলট-পালটের কাহিনী ভারতের আদিপর্বের ধ্যানধারণার ইতিহাসের উপর আলোকপাত করে। এবং ধ্যানধারণা বলতে যেহেতু অনিবার্যভাবেই মানুষের ধ্যানধারণা সেই হেতু দেবতাদের সূত্র ধরে অগ্রসর হয়েই মানুষের ইতিহাসও অনুমান করবার অবকাশ পাওয়া যেতে পারে। এবং, শুধুমাত্র গণেশের ক্ষেত্রেই যদি এই জাতীয় ওলট-পালট চোখে পড়তো তাহলে না হয় তা অগ্রাহ্য করবার অবকাশ থাকতো—এই একই ঘটনা ঘুরেদিরে নানান বার নানান ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে। তাই, এ-ঘটনা হলো চলতি কথায় যাকে বলা হয় টিপিক্যাল। দর্শনের ক্ষেত্রে কপিল, বুদ্ধ বা বৃহস্পতির বেলাতেও কী ভাবে একই অদলবদল ঘটেছে তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবার অবকাশ হয়তো হবে না। তবু গণেশের ইতিহাস থেকেই তাঁদের ইতিহাসও অনুমান করা অসম্ভব নয়।

গণেশের ইতিহাসে ওই অপরূপ অদল-বদলটি ঠিক কী রকম?

সমাজের সদরমহল এককালে গণেশকে রক্তকলুষ বিঘ্নস্রষ্টা বলেই চিনতে চেয়েছিলো। অথচ, এই গণেশই শেষ পর্যন্ত হয়ে গেলো সর্বসিদ্ধির দেবতা! এ-পরিবর্তন সত্যিই বড়ো অপরূপ!

—————
১৯. ক্ষিতিমোহন সেন : জাতিভেদ ৬৪।
২০. M. Monier-Williams SED 343.
২১. অতুলচন্দ্র গুপ্ত : শিক্ষা ও সভ্যতা ১৪৪।
২২. ঋগ্বেদ ২.২৩.১।।১০.১১২.৯।।cf. P. V. Kane HD 2:213.
২৩. বিশ্বকোষ ৫:২০৫।
২৪. A. Getty G Plates দ্রষ্টব্য।
২৫. বিশ্বকোষ ৫:২০৫। cf. P. B Kane HD 2:716 cf. A. Getty G 22.
২৬. A. Coomarswamy in BBMFA 26 (1928):30.
২৭. M. Monier-Williams op. cit.—‘Gana’.
২৮. Ibid.
২৯. Ibid.
৩০. বিশ্বকোষ ৫:২০২।

০৬. গণেশ যখন রক্তকলুষ বিঘ্নরাজ

অতুলচন্দ্র গুপ্ত(৩১) বলছেন, “আদিতে গণেশ ছিলেন কর্মসিদ্ধির দেবতা নয়, কর্মবিঘ্নের দেবতা”। দেবতা কিনা, কিংবা, আধুনিক অর্থে দেবতা কিনা, তা কিছুটা পরেই দেখা যাবে। আপাতত দেখা যাক একটি বিশেষ যুগের আইন-কর্তাদের চোখে গণেশের সঙ্গে কর্মবিঘ্নের যোগাযোগ কতোটা ঘনিষ্ঠ।

প্রথমেই মনে রাখা দরকার, গণেশ এক নয়, বহু। মহাভারতে(৩২) গণেশ বা গণপতি প্রসঙ্গে বহুবচনের প্রয়োগ দেখা যায় এবং স্যর ভাণ্ডারকর(৩৩) মনে করিয়ে দিচ্ছেন শতরুদ্রীয়-তে যেরকম বহু ক্ষেত্রে বিদ্যমান বহু রুদ্রের কথা রয়েছে মহাভারতেও তেমনি বহু ক্ষেত্রে বিদ্যমান বহু গণপতির কথাই বলা হয়েছে। এবং, শুধুই যে গণেশ বহু তাই নয়, তাঁর নামও বহু। আধুনিকপন্থী বা প্রাচীনপন্থী কোনো পণ্ডিতই অস্বীকার করবেন না যে, অথর্বশিরস-উপনিষদ(৩৪), মানবগৃহ্যসূত্র(৩৫), যাজ্ঞবল্ক্য-সংহিতা(৩৬) প্রভৃতি বইতে বিনায়ক বলে যাঁদের উল্লেখ করা হয়েছে তাঁরা ওই গণপতি ছাড়া আর কেউই নন। প্রশ্ন হলো, ওই পুঁথিপত্রগুলিতে এই গণপতিদের প্রতি কী রকম মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে?

মানবগৃহ্যসূত্র(৩৭) থেকেই শুরু করা যাক। আধুনিক পণ্ডিতদের হিসেবে(৩৮) যীশুখ্রীষ্ট জন্মাবার অন্তত চার শ’ বছর আগে এই পুঁথি রচিত হয়েছিলো। এবং, এই পুঁথিতে গ্রন্থকার গণেশদের এক অতি আতঙ্কজনক ছবি এঁকেছেন। গণেশদের বা বিনায়কদের দৃষ্টি পড়লে যে কতোরকম ভয়াবহ মানসিক অবস্থা সৃষ্ট হয় তারই ফর্দ দিয়ে তিনি আলোচনা শুরু করছেন। এই ফর্দের মধ্যে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন থেকে কঠিন উন্মাদরোগ পর্যন্ত কিছুই বাদ পড়েনি। কিন্তু শুধু ওই রকম মনোবিকার সৃষ্টি করেই গণেশরা ক্ষান্ত নন। তাঁদেরই প্রভাবে রাজার ছেলে রাজ্যলাভে উপযুক্ত হলেও রাজ্য পায় না, কুমারী বিবাহযোগ্যা হলেও তার বর জোটে না, সন্তানবতী হবার উপযুক্ত হলেও নারীর সন্তান হয় না, কিংবা, যার সন্তান আছে তার সন্তান-বিয়োগ ঘটে। বিদ্বান আচার্যের শিষ্য জোটে না, শিষ্যদের বিদ্যালাভ হয় না। কৃষি ও বানিজ্য উচ্ছন্নে যায়।

তখনকার কালের মানুষদের সুখসম্ভোগের সম্বাবনা যে-রকম সংকীর্ণ তার অনুপাতে সর্বনাশের তালিকাটা নিশ্চয়ই এর চেয়ে বড়ো হতে পারতো না। এবং, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, তখনকার কালে যাঁদের হাতে শাসনক্ষমতা তাঁদেরই মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে এই গৃহ্যসূত্রগুলির(৩৯) মধ্যে। তার মানে, গণেশদের প্রতি উপরোক্ত মনোভাবকে সে-যুগের শাসকশ্রেণীর মনোভাবই বলতে হবে। এবং, এ-মনোভাব যে খুবই সাময়িক ছিলো না তারও প্রমাণ আছে। কেননা, মানবগৃহ্যসূত্রের বেশ কয়েক শ’ বছর পরে যাজ্ঞবল্ক্য আইনের যে-বই লিখলেন(৪০) তার মধ্যেও গণেশদের প্রতি হুবহু একই মনোভাবে :

বিনায়কঃ কর্মবিঘ্নসিদ্ধ্যররথং বিনিযোজিতঃ।
গণানামাধিপত্যে চ রুদ্রেণ ব্রহ্মণা তথা।।
তেনোপসৃষ্টো যন্তস্য লক্ষণানি নিবোধত।
স্বপ্নে ইবগাহতে ইত্যর্থং জলং মুণ্ডাংশ্চ পশ্যতি।।
কাষায়বাসসশ্চৈব ক্রব্যাদাংশ্চাধিরোহতি।
অন্ত্যজৈর্গর্দ্দভৈরুষ্ট্রৈঃ সহৈকত্রাবতিষ্ঠতে।।
ব্রজন্তঞ্চ তথাত্মানং মন্যতেহনুগতং পরৈঃ।
বিমনা বিফলারম্ভঃ সংসাদত্যনিমিত্ততঃ।।
তেনোপসৃষ্টৌ লভতে ন রাজ্যং রাজনন্দনঃ।
কুমারী ন চ ভর্ত্তারমপত্যং ন চ গর্ভিনী।।
আচার্যত্বং শ্রোত্রিয়শ্চ ন শিষ্যোহ-ধ্যয়নং তথা।
বণিগ্লাভং চাপ্নোতি কৃষিঞ্চৈব কৃষীবলঃ।।

পঞ্চানন তর্করত্ন মহাশয়(৪১) তর্জমা করছেন : ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর, বিনায়ককে কর্মবিঘ্নের জন্য এবং গণদিগের আধিপত্যে নিযুক্ত করিয়াছেন। তিনি যাহার উপর উপসর্গ করেন তাহার লক্ষণ বলিতেছি, শ্রবণ কর। যে ব্যক্তি যেন জলে অবগাহণ করিতেছে, কাষায়বাস মুণ্ডিতমুণ্ড ব্যক্তিগণকে দেখিতেছে, আমমাংসাশী মৃগাদিতে আরোহণ করিতেছে, এবং চণ্ডালাদি অন্তজজাতি গর্দভ ও উষ্ট্রের সহিত একত্র অবস্থান করিতেছে, দৌড়িতে চেষ্টা করিতেছে, কিন্তু ইচ্ছামতো দৌড়িতে না পারায় পশ্চাদনুগামী শত্রুর করকবলিত হইতেছে, এইসকল স্বপ্ন দেখিতে পায়। আর সর্বদাই অন্যমনস্ক থাকে, আরদ্ধ কোনো কার্যই সিদ্ধ হয় না এবং বিনা কারণে বিষন্ন হয়। তাঁহার (বিনায়কের) উপসর্গ হইলে রাজকুমার রাজ্যলাভ করিতে পারে না; কুমারী অভিলষিত স্বামী প্রাপ্ত হয় না; গর্ভবতী স্ত্রী অপত্যলাভে বঞ্চিত থাকে; ঋতুমতী স্ত্রীর গর্ভ হয় না। শ্রোত্রিয় আচার্যতা, শিষ্য অধ্যয়ন, বণিক লাভ এবং কর্ষক কৃষিফল প্রাপ্ত হয় না।

ভয়াবহ চিত্র, সন্দেহ নেই। “এবং”, অতুলচন্দ্র গুপ্ত(৪২) মনে করিয়ে দিচ্ছেন, “গণেশের যে-পূজা তা ছিলো এই ভয়ঙ্কর দেবতাটিকে শান্ত রাখার জন্য; তিনি কাজকর্মের উপর দৃষ্টি না দেন, সে-জন্য ঘুষের ব্যবস্থা”। এই ঘুষের ব্যবস্থাটি যে কতোখানি ফলাও তার পরিচয় যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতি(৪৩) থেকেই পাওয়া যায়।

প্রাচীনকালের আইনের বইতে গণেশের প্রতি এই যে-মনোভাবটি প্রকাশ পেয়েছে তার কথা মনে না রাখলে গণেশের কয়েকটি পুরোনো নামের তাৎপর্য বুঝতে পারাই সম্ভব নয়। নানা রকম পুঁথিপত্রে(৪৪) এই নামগুলির উল্লেখ পাওয়া যায়। নমুনা : বিঘ্নেশ, বিঘ্নকৃৎ, বিঘ্নেশ্বর, বিঘ্নরাজ, ইত্যাদি। চলতি কথায়, ‘যতো নষ্টের গোড়া’—ট্রাবল-মেকার। দুর্বৃত্তদের পাণ্ডাও বলতে পারেন। অবশ্যই, পরের যুগের পরিবর্তিত আবহাওয়ায় গণেশ সম্বন্ধে অন্য রকম ধারণা দেখা দিলো। এবং, এই পরবর্তী ধারণার বশবর্তী হয়ে আধুনিক পণ্ডিতেরা ওই প্রাচীন নামগুলির ভুল ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করলেন। তাঁরা বলতে চাইলেন, বিঘ্ন দূর করবার ক্ষমতা গণেশের, বাধাবিঘ্নের শক্তি গণেশের কাছে নতজানু—তাই তিনি বিঘ্নের অধিপতি, বিঘ্নেশ। দুর্বৃত্ত বলে বিঘ্নরাজ নন, দুর্বৃত্তদের দমন করেন বলেই বিঘ্নরাজ। এই জাতীয় ব্যাখ্যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ মনিয়ার-উইলিয়ামস-এর(৪৫) রচনায় : বিঘ্ন দূর করতে পারেন বলেই গণেশের ওই রকম নাম আর তাইজন্যেই সমস্তরকম ক্রিয়াকর্মের শুরুতে নমো গণেশায় বিঘ্নেশ্বরায় বলে প্রণাম করবার প্রথা রয়েছে। কিন্তু মনিয়ার-উইলিয়ামস-এর এই ব্যাখ্যা যে মনগড় তার প্রমাণ আছে। বিঘ্নকৃত বলে নামটির তাৎপর্য বিঘ্ন দূর করা নয়, বিঘ্ন সৃষ্টি করাই। বৌধায়ন-ধর্মসূত্রে(৪৬) গণেশের কয়েকটি চিত্তাকর্ষক নামের মধ্যে একটি হলো বিঘ্ন এবং শুধু বিঘ্ন। এবং, আমরা একটু আগেই দেখেছি, যাজ্ঞবল্ক সরাসরি বলছেন যে, বিঘ্নসাধন করবার জন্যেই বিনায়কেরা নিযুক্ত আছেন। তাই মানতেই হবে যে, এককালে গণেশকে শুধু দুর্বৃত্ত বলেই দেখবার চেষ্টা করা হয়েছিলো, দুর্বৃত্ত-দলনের কথাটি অর্বাচীন।

আর, অন্তত আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, গণেশকে তখন শুধুমাত্র দুর্বৃত্ত বলেই কল্পনা করা হয়নি,–তার বদলে রীতিমত রক্তকলুষ দুর্বৃত্তই। কেননা, গণেশের ওই যে হাতির মাথা জীববিজ্ঞানমতে তো তাতে দুটি গজদন্ত থাকবার কথা। শাস্ত্রমতে কিন্তু তা নয়। গণেশের দাঁত বলতে মাত্র একটি। গণেশের নামই হলো একদন্ত। এবং, এই যে মাত্র একটি দাঁত—এর রংটাও স্বাভাবিক হাতির দাঁতের মতো নয়। শাস্ত্রমতে একেবারে টকটকে লাল। ওরকম টকটকে লাল কেন? শাস্ত্রমতে, গণেশ ওই দাঁতের আঘাত বহু শত্রু  বিনাশ করেছেন আর তাদেরই রক্তে স্নাত হয়ে দাঁতটার ওই চেহারা হয়েছে : দন্তাঘাতবিদারিতারিরুধিরৈঃ সিন্দুরশোভাকরং(৪৭)। কিন্তু, প্রশ্ন হলো, গণেশের অরি বা শত্রু  বলতে ঠিক কে বা কারা? পুরাণে এ-প্রশ্নের রকমারি জবাব আছে। তার মধ্যে একটা জবাব আন্দাজ করা যায় গণেশের অপর দাঁতটি কী করে হারালো তারই কাহিনী থেকে। ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণে(৪৮) এক রোমহর্ষক যুদ্ধের কাহিনী পাওয়া যায়—পরশুরামের সঙ্গে গণেশের যুদ্ধ। লড়াই করতে করতে পরশুরাম তাঁর হাতের কুঠারটা ছুঁড়ে মারলেন গণেশের দিকে। তারই আঘাতে গণেশের একটা দাঁত উড়ে গেলো। অবশ্যই, তাই বলে গণেশকে পরশুরামের তুলনায় দুর্বল মনে করা চলবে না। কেননা, ব্রহ্মাণ্ডপুরাণে(৪৯) বলা হয়েছে, ইচ্ছে করলে গণেশ ওই কুঠারাঘাতকে প্রত্যাখ্যান করতে পারতেন। কিন্তু গণেশ দেখলেন, কুঠারটি তাঁর পিতার হাতের তৈরি, তাই কুঠারকে নিষ্ফল করলে পিতাকে অমর্যাদা দেখানো হয়। তাই পিতার মর্যাদা রক্ষা করবার জন্যেই গণেশ একটি দাঁত এগিয়ে দিয়ে কুঠারের আঘাতটা গ্রহণ করে নিলেন। অবশ্যই, এই হারজিতের কাহিনীই এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক নয়। আমাদের কাছে তার চেয়ে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো এই পৌরাণিক কাহিনী থেকে গণেশের শত্রুকে চেনবার চেষ্টা। কার সঙ্গে গণেশের লড়াই? কে তাঁর ওই শত্রু ? পরশুরাম। পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে সামান্যমাত্র পরিচয় থাকলেই এই পরশুরামকে সনাক্ত করা সম্ভব। হিংসার ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের এমন জঙ্গী প্রবর্তকের কথা শাস্ত্রগ্রন্থে নিশ্চয়ই অদ্বিতীয়। এই প্রসঙ্গে ডক্টর ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের(৫০) গ্রন্থে পরশুরামের পৌরাণিক কাহিনীর সামাজিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা স্মরণীয়।

তার মানে কি এই যে, একটা বিশেষ যুগে গণেশের শত্রু  বলতে ওই পুরোহিত-শ্রেণীকেই বুঝতে হবে? সে-যুগে রচিত পুরোহিত-শ্রেণীর সাহিত্যে গণেশের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারও একই ইঙ্গিত দিতে চায়। কিন্তু খুব তাড়াহুড়ো করে কোনো একটা সিদ্ধন্তে পৌঁছবার তাগিদ নেই। কেননা, প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির আদালতে বিস্তর সাক্ষী-সাবুদ ভিড় করে আছে। ঐতিহাসিকেরা সবসময় তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন না, কেননা, তাহলে অপ্রিয় সিদ্ধান্তে পৌঁছবার ভয়। সে-আতঙ্ক উত্তীর্ণ হতে পারলে গণেশের পদচিহ্ন অনুসরণ করেই নানারকম আশ্চর্য সওয়াল আমরা শুনে আসতে পারবো।

আপাতত গণেশের বিরুদ্ধে সেকালের এই প্রকট ঘৃণার মনোভাবের আরো কিছুকিছু নমুনা দেখা যায়। অতুলচন্দ্র গুপ্ত(৫১) মহাশয় বলছেন, “এইজন্যেই গণেশের অনেক প্রাচীন পাথরের মূর্তিতে দেখা যায় যে, শিল্পী তাঁকে অতি ভয়ানক চেহারা দিয়ে গড়েছে”। আলফ্রেড ফুসে-ও(৫২) গণেশের কদাকার মূর্তির উল্লেখ করে শিল্পীদের মনে গণেশের প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাব অনুমান করতে চাইছেন। কিন্তু এমনও হতে পারে যে, গণেশের ওইসব বীভৎস চেহারার আসল তাৎপর্য অন্য। তবু এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে, ভারতীয় দেব-শিল্পের ইতিহাসের কোনো এক পর্যায়ে গণেশের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্বেষের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছিলো—প্রতিমা-পরিকল্পনাতেই তার প্রকট প্রমাণ রয়েছে। কেননা, অনেক মূর্তিতেই দেখতে পাওয়া যায় গণেশ কোনো-না-কোনো আভিজাতিক দেবদেবীর পায়ের তলায় অবদলিত হয়েছেন।

বাংলা দেশেই(৫৩) পাথরের মূর্তি পাওয়া গিয়েছে যেখানে দেখা যায় গণেশ অবদলিত হয়েছেন ভ্রুকুটিতারা বা পর্ণশবরীর পায়ের তলায়। তবু তাঁর হাতে ঢাল-তলোয়ার দেখে অনায়াসেই অনুমান করা যায় বিনা যুদ্ধে তিনি আত্মসমর্পণ করেননি। বিশেষ করে লক্ষ্য করা দরকার, এই মূর্তিতে গণেশের গজানন নেই—মুখটা কদাকার, কিন্তু মানুষেরই মুখ। তিব্বতে পাওয়া(৫৪) ব্রোঞ্জ-এর মূর্তিতে দেখি দেবতা মহাকাল গণেশকে পায়ের তলায় দলছে। মঞ্জুশ্রীর পায়ের তলায় অবদলিত অবস্থায় গণেশের মূর্তিও একান্ত দুর্লভ নয়। তার চেয়েও চিত্তাকর্ষক হলো আর এক রকম মূর্তি(৫৫) যেখানে গণেশকে দেখানো হয়েছে বিঘ্নহন্তা বলে এক দেবতার পায়ের তলায়।  নামেই প্রমাণ, বিঘ্নকে জয় করবার কল্পনা থেকেই বিঘ্নহন্তার জন্ম—এই মূর্তিতে বিজিত গণেশ তাই সাক্ষাৎ বিঘ্নই। নেপালের উপকথায়(৫৬) এই বিঘ্নহন্তার যে বৃত্তান্ত পাওয়া যায় তা থেকেও প্রমাণিত হয় বিঘ্ন বলতে এখানে গণেশই।

আপত্তি উঠবে, উল্লেখিত দেবদেবীরা জাতে বৌদ্ধ। তাই মূর্তিগুলির সাক্ষ্য এই কথাই প্রমাণ করে যে, বৌদ্ধ ধর্মের কর্তারা এককালে বিষনজরে দেখেছিলেন। এবং, গণেশের প্রতি বৌদ্ধ দেবদেবীদের এই আচরণ হিন্দু-বৌদ্ধ সংঘাতের ইঙ্গিত হয়তো দিতে পারে, কিন্তু সাধারণভাবে গণেশের বিরুদ্ধে শাসক-সম্প্রদায়ের প্রতিবন্ধ কী করে প্রমাণ করবে?

উত্তরে বলবো, ভাস্কর্যের ভাষায় এই যে গণেশ-দলন কাহিনী পাওয়া যাচ্ছে তার নায়ক-নায়িকারা হিন্দুস্বর্গের বাসিন্দাই হোন আর বৌদ্ধস্বর্গের বাসিন্দা হোন, আমাদের মূল যুক্তির পক্ষে তাতে খুব বড়ো তফাত হয় না। কেননা, মর্তের প্রতিবিম্ব হিসেবে এঁদের সকলের জাত একই। অর্থাৎ, হিন্দু দেবতাদের মতো এঁরাও হলেন মানবসমাজের আভিজাতিক-শ্রেণীর প্রতিনিধি। মহাকালের কথাটাই ভেবে দেখা যাক। দেবলোকের বাসিন্দা হলেও মরলোকের আভিজাতিক-শ্রেণীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে এতোটুকুও সন্দেহের অবকাশ নেই। শান্তি আর শৃঙ্খলার রক্ষক হিসেবেই তাঁর পরিচয়(৫৭)। তাছাড়া, নজর করলেই দেখা যায় তাঁর হাতে একটি মোহরের থলি রয়েছে : চৈনিক পর্যটক ঈ-সীন(৫৮) বলছেন, ভারতবর্ষে অধিকাংশ মঠের দোরগোড়ায় তিনি এক দেবমূর্তি দেখে গিয়েছেন, তাঁর হাতে স্বর্ণমুদ্রার থলি আর তাঁরই নাম হলো মহাকাল। ভারতবর্ষের বাইরেও আভিজাতিক-শ্রেণীর সঙ্গে মহাকালের সম্পর্কটা অস্পষ্ট নয় : মঙ্গোলিয়ার শাসক আল্টন খাঁ হুকুম জারি করেছিলেন, মহাকালই হবেন দেশের এক এবং অদ্বিতীয় দেবতা, তাঁরই খাতিরে বাকি সব দেবমূর্তি পুড়িয়ে ফেলতে হবে(৫৯)। তাই বৌদ্ধস্বর্গের বাসিন্দা এই মহাকাল যখন গণেশকে পদদলন করছেন তখন তাঁর সঙ্গে হিন্দুসমাজের আইনকর্তা যাজ্ঞবল্ক্যের দৃষ্টিভঙ্গির খুব বেশি তফাত খুঁজতে যাওয়াটা ভুল হবে। আইনকর্তাদের কথাটা যখন উঠলোই তখন তা শেষ করে নেওয়াই ভালো। মনু নাকি বলেছেন, গণেশ ব্রাহ্মণদের দেবতা নন, ক্ষত্রিয়দের দেবতা নন, এমনকি বৈশ্যদেরও দেবতা নন—তার বদলে শুধুমাত্র শূদ্রদের দেবতাই :
বিপ্রাণাং দৈবতং শম্ভুঃ ক্ষত্রিয়াণাং তু মাধবঃ।
বৈশ্যানাং তু ভবেৎ ব্রহ্মা শূদ্রানাং গণনায়কঃ।।
–অর্থাৎ, ব্রাহ্মণদের দেবতা হলেন শম্ভু, ক্ষত্রিয়দের মাধব, বৈশ্যদের ব্রহ্মা আর শূদ্রদের গণনায়ক। অবশ্যই এই শ্লোকটি মনুস্মৃতিতে খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু উইলসন থেকে অক্ষয়কুমার দত্ত(৬০) পর্যন্ত দেশ-বিদেশের পণ্ডিতেরা একবাক্যে বললেন, দেশের ঐতিহ্য অনুসারে শ্লোকটি মনুরই রচনা।

প্রশ্ন হলো, শূদ্র মানে কী? যাদের চোখে জল(৬১), শ্রমের দায়িত্ব যাদের উপর,—অর্থাৎ, শঙ্করাচার্যের ভাষায় যারা হলো ওই প্রাকৃতজনাঃ বা পণ্ডিত জবাহরলাল নেহেরুর ভাষায় যারা হলো কিনা ‘unthinking masses’—তারাই শূদ্র। এরা এলো কোথা থেকে—সে প্রশ্ন নিয়ে ডক্টর ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত(৬২) সুদীর্ঘ আলোচনা করেছেন। কিন্তু আমাদের যুক্তির বর্তমান পর্যায়ে বিশেষভাবে জরুরী প্রশ্ন হলো, মনু ওই গণনায়ককে যাদের দেবতা বলেছেন তাদের প্রতি শাসকসমাজের মনোভাবটা কী রকম? অতুলচন্দ্র গুপ্ত(৬৩) বলছেন :

‘বাংলা ছিলো সোনার বাংলা, তা তো বটেই। কিন্তু বলে ছিলো? কলকারখানা ম্যাঞ্চেস্টারের কাপড় আসবার পূর্ব পর্যন্ত কি? সেই সময়েই তো ছিয়াত্তুরের মন্বন্তর। তাতে নাকি সোনার বাংলার একপোয়া লোকের উপর না খেয়ে মরেছিলো! মোগল পাঠানের আমলে বোধ হয়? বিদেশীদের বর্ণনা, আবুল ফজলের গেজেটিয়ার, মুকুন্দরামের কবিতা রয়েছে। গোলায় ধান, গোয়ালে গরু, অবশ্যই ছিলো—এখনও আছে। কিন্তু এখনকার মতো তখনো সে গোলা আর গোয়ালের মালিক অল্প ক’জনাই ছিলো।…তবে হিন্দুযুগে নিশ্চয়। কিন্তু সে যুগেও কি এখনকার মতো দেশে শূদ্রই ছিলো বেশি? তাদের standard of living তো মনু বেঁধে দিয়েছেন :

উচ্ছিষ্টমন্নং দাতব্য জীর্ণানি বসনানি চ।
পুলাকাশ্চৈব ধান্যানাং জীর্ণাশ্চৈব পরিচ্ছদাঃ।।

ঋষি গৌতমেরও ঐ ব্যবস্থা : জীর্ণান্যুপানচ্ছত্রবাসাঃ—কূর্চ্চান্যুচ্ছিষ্টাশনং। পুরোনো জুতো, ভাঙা ছাতা, জীর্ণ কাপড় তাদের পোষাক পরিচ্ছদ, ছেঁড়া মাদুর তাদের আসন, উচ্ছিষ্ট অন্ন তাদের আহার। ‘পুলাক’ কথাটার অর্থ ধানের আগড়া; টীকাকারদের ভাষায় ‘অসার ধান’। দেশে গোলাভরা ধান থাকলেও দেশবাসীর বেশির ভাগের কপালে খুদকূঁড়ো জুটতে কোনও আটক নেই।

মনে রাখা দরকার, মনুর মতে এ-হেন শূদ্রদের সঙ্গেই গণেশের সম্পর্ক। ঐহিত্যনির্ণীত মনুর ওই উক্তিটি মনে না রাখলে মনুস্মৃতিরই অন্য উক্তি বুঝতে অসুবিধে হবে। মনুস্মৃতিতে(৬৪) লেখা আছ, যারা গণযাগ করে শ্রাদ্ধবাড়িতে তাদের প্রবেশ নিষেধ :

স্বক্রীড়ী শ্যেনজীবী চ কন্যাদূষক এব চ।
হিংস্রো বৃষলবৃত্তিশ্চ গণাগাংশ্চৈব যাজকঃ।।

আধুনিক পণ্ডিতেরা এই ‘গণানাংশ্চৈব যাজকঃ’ কথাটা নিয়ে রীতিমতো অসুবিধেয় পড়েন। অসুবিধের কারণ এই নয় যে, টীকাকারেরা ও-কথার তাৎপর্য নির্ণয়ে সত্যিই ঔদাসীন্যের পরিচয় দিয়েছেন। মেধাতিথি বলছেন, গণানাং দেবানাঞ্চ যাজকঃ—গণযাজাঃ প্রসিদ্ধাঃ। কুল্লুকভট্ট আরো পরিষ্কার করে বলছেন, বিনায়কাদি-গনযাগকৃৎ। সোজা কথায়, গাণপত্য বা গণেশ-সম্প্রদায়ের লোক। অথচ, আজকের আবহাওয়ায় সমস্ত রকম পূজা-পার্বণের বেলায় গণেশকেই সর্বপ্রথম পূজো পেতে দেখে মনুর এই সহজ কথাটিকে সহজ অর্থে গ্রহণ করা কঠিন। অথচ মনুস্মৃতি থেকেই প্রমাণ যে, এককালে গণযাজকদের স্বক্রীড়ী, শ্যেনজীবী আর কন্যাদূষকদের সমান নিন্দনীয় মনে করা হতো।

——————
৩১. শিক্ষা ও সভ্যতা ১৪৪।
৩২. R. G. Bhandakar VS 147.
৩৩. Ibid.
৩৪. Ibid.
৩৫. মানবগৃহ্য সূত্র ২.১৪।
৩৬. cf. R. G. Bhandakar VS 145.
৩৭. মানবগৃহ্য সূত্র ২.১৪।
৩৮. P. V. Kane HD 2:xi.
৩৯. P. V. Kane প্রভৃতি গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।
৪০. যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি ১.২৭১-৬।
৪১. পঞ্চানন তর্করত্ন : ঊনবিংশসংহিতা ১৫৭।
৪২. শিক্ষা ও সভ্যতা ১৪৪।
৪৩. যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি ১.২৯৩ ইত্যাদি।
৪৪. বিশ্বকোষ ৫:২০২।
৪৫. M. Monier-Williams op. cit. 343.
৪৬. বৌধায়ন ২.৫.৮৩-৯০ ।। SBE 14:254. cf. P. V. Kane op. cit 2:213.
৪৭. বিশ্বকোষ ৫:২০২।
৪৮. ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ : গণেশখণ্ড।।
৪৯. T. A. G. Rao EHI 1:60.
৫০. B. N. Datta SISP 13.
৫১. শিক্ষা ও সভ্যতা ১৪৪।
৫২. Introduction to A. Getty G xv.
৫৩. A Getty G Plates xix & xxiii (a) & (b).
৫৪. Ibid 43.
৫৫. Ibid Plates xviii (a) & (d).
৫৬. Ibid 43.
৫৭. A. Getty GNB 160-1.
৫৮. Ibid.
৫৯. Ibid.
৬০. H. H. Wilson RSH.
৬১. B. N. Datta SISP 28. “It is said that the words Sudra means ‘one who grieves’”…
৬২. Ibid 28ff.
৬৩. শিক্ষা ও সভ্যতা ১৪০।-১।
৬৪. মনু ৩.১৬৪।

 ০৭. বিঘ্নরাজ থেকে সিদ্ধিদাতা

শাসকসম্প্রদায়ের মুখপাত্ররা এককালে গণেশের প্রতি যে-বিদ্বেষ প্রকাশ করেছিলেন তার আরো কিছু নমুনা সংগ্রহ করা অসম্ভব নয়। কিন্তু গণেশের অভিজ্ঞাওতাতেই তার চেয়েও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটতে দেখা গিয়েছে। কেননা, এককালে যিনি ছিলেন ওই রক্তকলুষিত বিঘ্নরাজ আর এককালে তিনিই খোদ সিদ্ধিদাতা সেজে বসলেন, সমাজের সদরমহল এককালে যাঁর ভয়ে আতঙ্কিত ছিলো আর এককালে দেখা গেলো তাঁকেই বরণ করে নিচ্ছে আভিজাতিক দেবদেবীদের জমকালো সভায়।

কিন্তু খোদ বিঘ্নরাজকে একেবারে সিদ্ধিদাতা করে তোলা যেন এক অসম্ভবকে সম্ভব করবার চেষ্টা। তাই, দরকার পড়লো গণেশের এই নব্যরূপকে প্রচার করবার অজস্র তোড়জোড়। ওই প্রচার-প্রচেষ্টা অবশ্যই সার্থক হয়েছে। গণেশের সেই ভয়াবহ রূপটিকে ভুলে গিয়ে আজকের দিনে আমরা শুভকর্মের সূচনায় তাঁরই আশীর্বাদ অপরিহার্য মনে করি।

গণেশের এই নব্যরূপের প্রচার বহুমুখী ও ব্যাপক। শুধুমাত্র সাহিত্যের ক্ষেত্রেই তার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় দিতে হলে হয়তো ছোটোখাটো একটি পুঁথি রচনা করা প্রয়োজন।

দেশের পুরাণগুলি গণেশের মাহাত্ম্যে মুখর হয়ে উঠলো। বিশেষ করে দুটি পুরাণে—ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণে ও স্কন্দপুরাণে(৬৫),—গণেশ জুড়ে বসলেন সুদীর্ঘ স্থান। স্কন্দপুরাণ(৬৬) গণেশকে অবতার বলে ঘোষণা করলো। গণপতি-তত্ত্ব(৬৭) বলে আর একটি গ্রন্থে আরো এক-পা এগিয়ে গিয়ে বলা হলো গণেশও যা আর উপনিষদের ব্রহ্মও তাই। শুধুমাত্র গণেশের মাহাত্ম্য প্রচার করবার আশাতেই রচিত হলো একটি উপপুরাণ ও একটি নতুন উপনিষদ—গণেশপুরাণ ও গণেশউপনিষদ(৬৮)। এমনকি, একথাও হয়তো বলা যায় যে, অনেক সময়ই প্রচারের প্রচেষ্টাটা সচেতন। কেননা, নারদপুরাণের গণেশস্তোত্রে(৬৯) লেখা আছে :

অষ্টানাং ব্রাহ্মণানাং চ লিখিত্বা যঃ সমর্পয়েৎ।
ভস্য বিদ্যা ভবেৎ সদ্য গণেশস্য প্রসাদতঃ।।

–মোদ্দা কথায়, স্তোত্রটি লিখেলিখে বিলি করতে হবে। অনেকটা আধুনিক কালের হ্যাণ্ডবিল বিলি করবার মতোই নয় কি?

অবশ্যই, এখন থেকে গণেশকে আর অপর কোনো আভিজাতিক দেবদেবীর পায়ের তলায় নিপীড়িত হতে দেখবার কথা নয়। কেননা, গণেশ নিজেই আভিজাতিক হয়ে উঠেছেন, তাঁর মূর্তিতে জমকালো অলঙ্কার দেখা দিলো। কিন্তু এইখানে একটি খুব জরুরী কথা মনে রাখা দরকার, কথাটি আনন্দকুমার কুমারস্বামী(৭০) আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন : ভারতীয় ভাস্কর্যের ইতিহাসে গণেশের এ-হেন মূর্তি একটি নির্দিষ্ট যুগ থেকে হঠাৎ দেখা দিতে শুরু করেছে। এবং কুমারস্বামীই বলছেন, গণেশের এই আবির্ভাব যেমন আকস্মিক তেমনি বহুল।

কিন্তু গণেশের এই নব্যরূপের প্রচার যতোই জমজমাট হোক না কেন, এরই মধ্যে যেন কয়েকটি ফাটল থেকে গিয়েছে। সেই ফাটলগুলির ভিতর দিয়ে উঁকি মারলে স্পষ্টই বুঝতে পারা যাবে সমস্ত প্রচেষ্টাটুকুই কী রকম কৃত্রিম! এখানে দু’-একটা নমুনার উল্লেখ করবো।

খাপছাড়াভাবেই গণপতির বিদ্যা ও জ্ঞানের গৌরব প্রচার করতে শুরু করা হলো। নজির হিসেবে বলা হলো, ব্যাসদেব যখন মহাভারত রচনা করেন তখন লিপিকার হিসেবে গণেশ ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায়নি। অথচ, এই কাহিনী মহাভারত রচিত হবার অনেক পরের রচনা, এতএব কৃত্রিমভাবে কোনো এক সময়ে মহাভারতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রমাণ : মহাভারতের শুধুমাত্র উত্তর-ভারতীয় সংস্করণে এই গল্পটি দেখতে পাওয়া যায়, দক্ষিণ-ভারতীয় সংস্করণে গল্পটি নেই। এ-বিষয়ে উইনটারনিৎস-এর আলোচনা(৭১) দ্রষ্টব্য।

আর একটা নমুনা : গণেশকে জ্ঞানিশ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করতে হলে তাঁর মুখে খুব গুরুগম্ভীর দার্শনিক কথাবার্তা বসিয়ে দেওয়া দরকার। সচেতনভাবে এই চেষ্টা থেকে হোক আর নাই হোক, উত্তরযুগে দেখা যায় গণেশগীতা বলে একটি পুঁথি রচিত হলো। কিন্তু পুঁথিটি যে কতোখানি কৃত্রিম তা বুঝতে পারাও কঠিন নয় : গণেশগীতা আগাগোড়াই শ্রীমদ্ভাবগতগীতাই—তফাতের মধ্যে শুধু, কৃষ্ণের বদলে কোনোমতে গণেশের নামটি বসিয়ে দেওয়া হয়েছে(৭২)।

তার মানে, গণেশের বিদ্যাবুদ্ধির খ্যাতিটা গণেশের তুলনায় অনেক অর্বাচীন, পরের যুগের রচনা। এই কথাটি স্পষ্টভাবে মনে রাখেননি বলেই আধুনিক কালের অনেক বড়ো বড়ো বিদ্বানও এ-বিষয়ে কৃত্রিম ও বিচারবিরুদ্ধ মতবাদ দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছেন। মনিয়ার-উইলিয়মস(৭৩) বলছেন, গণেশের বুদ্ধিটা যে কতোখানি তা বোঝাবার জন্যেই তাঁর অমন এক হাতির মাথা কল্পনা করা হয়েছে। হাতির মাথার তাৎপর্য নিয়ে পরে আলোচনা তোলা যাবে এবং আমরা আগেই বলেছি গণেশের রকমারি নাম দেখেই সন্দেহের অবকাশ রয়েছে হাতির মাথাটা তাঁর আদি ও অকৃত্রিম অঙ্গ না হতেও পারে। আপাতত মন্তব্য হলো, হাতির সঙ্গে জ্ঞানের আনুষঙ্গ ভারতীয় ঐতিহ্যে যদিই বা থাকে তাহলেও তার স্থান নিশ্চয়ই গৌণ।

স্যর ভাণ্ডারকর(৭৪) বলছেন, গণেশের বিদ্যাবুদ্ধির খ্যাতিটা খুব সম্ভব তাঁর নামের সঙ্গে বৃহস্পতির নামের যোগাযোগের দরুনই। অবশ্যই, গণেশের নামের সঙ্গে বৃহস্পতির নামের যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা তোলা দরকার : ওই যোগাযোগ এবং অন্যান্য তথ্য থেকেই দেখতে পাওয়া যায় গণেশের ইতিহাস কতো—কতো পুরোনো। সিদ্ধিদাতা হিসেবে ঘোষিত হবার আগে,—এমনকি বিঘ্নরাজ হয়ে আতঙ্ক সঞ্চার করবার অনেক আগে,—ভারতের ইতিহাসে গণেশ দেখা দিয়েছিলেন এক আশ্চর্য রূপে : না বিঘ্নরাজ, না সিদ্ধিদাতা। সে-ইতিহাসের কথায় একটু পরেই ফেরা যাবে। আপাতত, স্যর ভাণ্ডরকরের মন্তব্য সম্বন্ধে আমাদের মন্তব্য হলো, তিনি নিজেই বলছেন মানবগৃহ্যসূত্র এবং যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতি অনুসারে গণেশের দৃষ্টি পড়লে আচার্য্যের শিষ্য জোটে না, বিদ্যার্থীর বিদ্যালাভ হয় না। তাই গণেশের বিদ্যাবুদ্ধির খ্যাতিটা সূত্র ও স্মৃতি সাহিত্যের অনেক পরের যুগে রচিত হয়েছে। অতএব এই খ্যাতি যে বৈদিক-সাহিত্যে ঘোষিত তাঁর সঙ্গে বৃহস্পতির সম্পর্কেরই রেশ—এ-কথা বললেও মাঝখানের যুগটিতে গণেশের প্রকট বিদ্যাবিরোধিতা যে কেন সে-প্রশ্নের মীমাংসা বাকি থেকে যায়।

—————–
৬৫. ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ এবং স্কন্দপুরাণের গণেশখণ্ড।
৬৬. বিশ্বকোষ ৫:২০২।
৬৭. ঐ : “গণপতিতত্ত্ব নামক গ্রন্থের মতে গণেশই পরব্রহ্ম”…।
৬৮. A. Getty G 5.
৬৯. Ibid—Quotations in Title pages.
৭০. A. Coomarswamy BBMFA 26 (1928) 30—“the figure of Ganesa appears suddenly and not rarely in the Gupta period.” cf. P. V. Kane HD 2:215 & 725.
৭১. JRAS April, 1898. cf. A. Coomarswamy. BBMFA 26 (1928)—30; A. Getty G. 3.
৭২. ERE 6:175.
৭৩. M. Monier-Williams SED 343: “and to denote his sagacity, has the head of an elephant.”
৭৪. R. G. Bhandarkar VS 149.

 ০৮. অতিকথার বিড়ম্বনা

বিঘ্নরাজকে সিদ্ধিদাতা সাজাতে হলে তাঁর একটা জমকালো জন্মকথার দরকার পড়ে। এ-চাহিদা মেটাতে গিয়ে পুরাণকারেরা রীতিমতো হিমশিম খেয়ে গিয়েছেন। তাই, আলফ্রেড ফুসে(৭৫) বলছেন, এবং ঠিকই বলছেন, গণেশের জন্মবৃত্তান্তগুলির মধ্যে অসঙ্গতি এবং বিশেষ করে অসংলগ্ন থেকেই প্রমাণ হয় এগুলি উত্তরযুগের নতুন পরিস্থিতির চাহিদা মেটাবার জন্যেই উদ্ভাবিত হয়েছে—যাঁরা উদ্ভাবন করেছিলেন তাঁরা সামান্য ব্যক্তি ছিলেন না।

উপাখ্যানগুলির মধ্যে অসঙ্গতি এবং অসংলগ্ন যে কতোদূর তা কেনেডির(৭৬) ‘হিন্দু মাইথোলজি’ বা গোপীনাথ রাও-এর(৭৭) ‘হিন্দু আইকনোগ্রাফি’ দেখলেই বুঝতে পারা যাবে,—এঁরা উভয়েই বিভিন্ন পুরাণ থেকে এ-জাতীয় বহু উপাখ্যান সংকলিত করেছেন। আমাদের যুক্তির পক্ষে মাত্র কয়েকটি নমুনা উদ্ধৃত করাই যথেষ্ট হবে।

কোনো পুরাণে(৭৮) লেখা আছে, একা শিব থেকেই গণেশের জন্ম। কোনো পুরাণে(৭৯) আবার লেখা আছে, একা পার্বতী থেকেই গণেশের জন্ম। অথচ এমন নয় যে, স্ত্রী-পুরুষে মিলন বাদ দিয়ে প্রজনন-সম্ভাবনাকে পুরাণকারেরা সত্যিই স্বাভাবিক মনে করতেন। তাই, এ-জাতীয় কাহিনী থেকেই প্রমাণ হয় যে, আভিজাতিক দেবলোকে গণেশের আবির্ভাব আর যাই হোক সহজ যা স্বাভাবিক ব্যাপার নয়।

ওই অস্বাভাবিক ঘটনাটিকে স্বাভাবিক বলে প্রতিপন্ন করবার একটা মস্ত অন্তরায় ছিলো গণেশের গজাননটি। তাই, গণেশের মাথা নিয়ে পুরাণকারদের মাথাব্যাথাও খুব কম নয়। এ-নিয়েও অনেক রকম অসংলগ্ন ও এলোমেলো কাহিনী পাওয়া যায়। ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণের গণেশখণ্ডে(৮০) লেখা আছে জন্মাবার পর শনির দৃষ্টিতে গণেশের মাথা উড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বিষ্ণু একটি হাতির মাথা কেটে এনে নবজাতকের কাঁধের উপর এঁটে দেন। আবার স্কন্দপুরাণের গণেশখণ্ডে(৮১) লেখা আছে, সিন্দুর বলে এক দৈত্য পার্বতীর গর্ভে অষ্টম মাসের সময় প্রবেশ করে গণেশের মাথাটি কেটে দেয় এবং শিরহীন অবস্থায় জন্মার পর নারদের অনুরোধে গণেশ গজাসুরের মাথাটি কেটে নিজের স্কন্ধে যোজনা করেন—তার মানে, গণেশের গজাননটি তাঁর নিজস্ব নয়, গজাসুরের কাছ থেকে ধার করা। কিন্তু এ-বিষয়ে সবচেয়ে আশ্চর্য পৌরাণিক কাহিনী(৮২) হলো, শিব ও পার্বতী একবার হাতির রূপে মৈথুন করেছিলেন—তাই ওই রকম গজানন সন্তানের জন্ম হয়।

কিন্তু এতোভাবে গণেশের জন্মকাহিনী রচনা করেও পুরাণকারেরা যেন কিছুতেই ভুলতে পারেন না যে, তাঁর জন্মের সঙ্গে একটা নোংরা কিছুর সম্পর্ক রয়েছে। তাই, তাঁকে পার্বতী-তনয় বলে মেনে নেওয়া সত্ত্বেও এ-কথাও বলতে যেন দ্বিধা হচ্ছে যে, পার্বতীর গর্ভে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর জন্ম হয়েছিলো। পুরাণকারেরা বারবার(৮৩) বলছেন, নিজের গায়ের নোংরা নিয়ে খেলা করতে করতে পার্বতী একটি কিম্ভুত-কিমাকার শিশুমূর্তি গড়ে তোলেন এবং শেষ পর্যন্ত তারই মধ্যে প্রাণসঞ্চার করে গণেশকে সৃষ্টি করেন।

আর একটি পুরাণ(৮৪) যেন আরো এক-পা এগিয়ে যেতে চায় এবং ওই আভিজাতিক দেবলোকে গণেশের আসল আবির্ভাব-কাহিনীকে প্রকাশ করে দেবার উপক্রম। এই কাহিনী অনুসারে পার্বতী বুঝি একবার স্নানের সময় গায়ে-মাখা তেলের সঙ্গে নিজের শরীরের নোংরা মেশান এবং মালিনী বলে গঙ্গাতীরবর্তী এক গজাননা রাক্ষসীকে এই উপাদেয় বস্তুটি খাওয়ান। তারই ফলে মালিনীর গর্ভে গণেশের জন্ম হয়। তারপর পার্বতী তাঁকে গ্রহণ করেন। এই উপাখ্যানটি চিত্তাকর্ষক। কেননা, এখানে স্পষ্টই বলে দেওয়া হচ্ছে যে, গণেশের জন্মটা আসলে দেবতাদের ঘরে নয়। দেবলোকে তাঁর স্থান পোষ্য-সন্তান হিসেবেই। কেবল এই উপাখ্যানে বলে দেওয়া হয়নি যে, পোষ্য-গ্রহণের আগে সংস্কার করবার দরকার হয়েছিলো—সেই সংস্কারের ফলেই রাক্ষসকুলজাত  বিঘ্নরাজ দেবলোক-লালিত সিদ্ধিদাতায় পর্যবসিত হন।

গণেশ-সংক্রান্ত পৌরাণিক কাহিনীগুলির মধ্যে আর এক রকম কাহিনীতে(৮৫) ওই বিঘ্ন-বিপর্যয়ের স্মৃতিটা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি, যদিও সে-স্মৃতি টিকে রয়েছে উল্টো হয়ে। কাহিনীটা হলো, ইন্দ্র প্রভৃতি আভিজাতিক দেবতারা একবার খুবই বিপদে পড়েছিলেন। তার কারণ, নারী ও শূদ্ররা দলে দলে সোমনাথ পাহাড়ে শিবের কাছে যাত্রা করেছিলো। এই নিকৃষ্টদের মিছিল  দেখে দেবতারা বিশেষ শঙ্কিত হন। তাঁরা শিবের কাছে গিয়ে বললেন—প্রভু, ওদের এই মিছিল বন্ধ করবার জন্যে যা হোক একটা ব্যবস্থা করুন। শিব তাতে রাজি হলেন না। তাই, ইন্দ্রাদি দেবতারা গিয়ে পড়লেন পার্বতীর কাছে। পার্বতী নাকি এই মানবেতরদের মিছিলে বিঘ্ন সৃষ্টি করবার জন্যেই বিঘ্নেশ্বরকে সৃষ্টি করলেন।

পৌরাণিক সাহিত্যে এই কাহিনী বা এই জাতীয় কাহিনী একাধিকবার পাওয়া গেলেও এর মধ্যে বাস্তবের প্রতিবিম্ব যে উল্টো হয়ে পড়েছে সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। গণেশ-সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য থেকেই তা বুঝতে পারা যায়। আমরা আগেই দেখেছি, মনুর মতে গণেশ হলেন শূদ্রদের দেবতা। পরে, উচ্ছিষ্টগণপতির আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা দেখতে পাবো, গাণপত্য সম্প্রদায়ের একটু মূল কথা হলো নারীজাতির সাম্য ও স্বাধীনতা। তাই এই গণেশই যে স্ত্রী-শূদ্রের বিরুদ্ধে বিঘ্ন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তা সরাসরি স্বীকার করতে দ্বিধা হয়। ফলে, উক্ত পৌরাণিক কাহিনীর তাৎপর্য বুঝতে হলে মনে রাখা দরকার, শাসক-শ্রেণীর চেতনায় বাস্তবের প্রতিবিম্ব উল্টো হয়ে পড়ে(৮৬)। অর্থাৎ, এককালে বিঘ্ন সৃষ্টিই হলো গণেশের কাজ—কিন্তু সে-বিঘ্ন স্ত্রী-শূদ্রের বিরুদ্ধে নয়। যাজ্ঞবল্ক্যের বিনায়ক-বর্ণনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বুঝা যায় বিঘ্নটা আসলে কাদের বিরুদ্ধে।

এই প্রসঙ্গেই মনে রাখা দরকার, গণেশের বহু নামের মধ্যে সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক নাম হলো, দ্বিদেহক(৮৭)। অর্থাৎ, গণেশের দুটি স্বতন্ত্র দেহ। আর সত্যিই তাই। গণেশের সত্যিই দুটি দেহ—দুটি স্বতন্ত্র জন্ম, দুটি স্বতন্ত্র সত্তা। এক, বিঘ্নরাজ। দুই, সিদ্ধিদাতা। বিঘ্নরাজটা আগেকার। সিদ্ধিদাতাটা পরের যুগের।

———————-
৭৫. Introduction to A. Getty G xxi.
৭৬. Kennedy HM 353f.
৭৭. T. G. N. Rao EHI Vol. I Part I.
৭৮. বরাহপুরাণ। cf. H. Mitra in VQ-May 1935, 105.
৭৯. শিবপুরাণ, মৎসপুরাণ ও স্কন্দপুরাণ। cf. H. Mitra op. cit. cf. A. Getty G 5.
৮০. ERE 2:808.
৮১. বিশ্বকোষ ৫:২০২।
৮২. H. Mitra op. cit. 105. cf. A. Getty G 7; T. G. N. Rao EHI Vol. I. Part I.
৮৩. মৎস্যপুরাণ, স্কন্দপুরাণ ইত্যাদি।
৮৪. ERE 2:808.
৮৫. A. Getty G 5.
৮৬. F. Engels AD 470-2.
৮৭. A. Getty G xxiv.

০৯. বিঘ্নরাজেরও আগে

গণপতির ইতিহাসে এই চিত্তাকর্ষক পরিবর্তনটি আধুনিক বিদ্বানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁরা এই পরিবর্তনের একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। সে-ব্যাখ্যার মূল কথা হলো, আদিতে গণপতি ছিলেন স্থানীয় অনার্যদের দেবতা। তাই আর্যরা বা বৈদিক ঐতিহ্যের অনুগামীরা, শুরুতে এই দেবতাটিকে ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করেন। কিন্তু কালক্রমে তাঁরা গণেশকে গ্রহণ করে নেন। সেই কারণেই গণপতির রূপান্তর ঘটে।

এই সিদ্ধান্তের দৃষ্টান্ত হিসেবে শ্রদ্ধেয় ক্ষিতিমোহন সেন(৮৮) মহাশয়ের রচনা উদ্ধ্বৃত করা যায় : “অনার্য অনেক দবেওতাকে আর্যেরা স্বীকার না করিয়া পারেন নাই। চারিদিকের প্রভাবকে দীর্ঘকাল ঠেকাইয়া রাখা অসম্ভব। তাহার পরে গণচিত্তকে প্রসন্ন না করিলে মানুষকে যে অতিষ্ঠ হইতে হয় এই কথা প্রাচীন আর্যেরাও বুঝিতে পারিয়াছিলেন। তাই গণদেবতা গণপতির পূজা সকল যজ্ঞের অগ্রে অনুষ্ঠান করা হইত।” শ্রদ্ধেয় হরিদাস মিত্র(৮৯) মহাশয় অবশ্য গণেশকে অনার্য-উপাসিত দেবতা বলছেন না,

As Ganesa was perhaps originally the special deity of the ‘Ganas’—wild Aryan tribes, inhabiting desert wastes, mountains and forests,—he was probably in later times affiliated to ‘Pasupati’ (Sankara) and ‘Bhutapati’ (Siva); and when he was admitted to the highter Aryan pantheon, various descriptions of his origin were given in the Purans, as necessity arose. These explanations might have taken centuries to grow.
যেহেতু গণেশ আদিতে সম্ভবত বিশেষ করে গণগুলিরই—অর্থাৎ, মরুভূমি, পর্বত ও বনজঙ্গলের বুনো আর্য উপজাতিগুলিরই—দেবতা ছিলেন সেই হেতু খুব সম্ভব উত্তরযুগে তাঁকে পশুপতি (শঙ্কর) ও ভূতপতির (শিব) সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়; এবং তাঁকে যখন উচ্চতর আর্য দেবলোকে গ্রহণ করা হলো তখন প্রয়োজনের খাতিরে পুরাণে তাঁর জন্ম-সংক্রান্ত নানারকম উপাখ্যান রচনা করা দরকার হলো। এই ব্যাখ্যাগুলি গড়ে উঠবার জন্যে সম্ভবত অনেক শতাব্দী সময় লেগেছিলো।

আমাদের মন্তব্য হলো, এ-জাতীয় ব্যাখ্যায় দেবলোকের ইতিহাসকে মরলোকের ইতিহাসের প্রতিবিম্ব বলে দেখবার চেষ্টা নেই। তাই, আধুনিক বিদ্বানদের এ-জাতীয় গবেষণা দুর্মূল্য হলেও পূর্ণাঙ্গ হতে পারেনি। প্রথমত, গণেশ বলতে এককালে নির্দিষ্ট একজনকে বোঝাতো না—প্রাচীন পুঁথিপত্র থেকে প্রমাণ হয় বিনায়ক ছিলেন বহু। গণেশের নানাবিধ নামের মধ্যে দ্বিজিহ্বক, বৃষকেতন প্রভৃতি নাম দেখে সন্দেহ হয় প্রাণীজগতের মধ্যে শুধুমাত্র হাতির সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক ছিলো না, সাপ ষাঁড় প্রভৃতির সঙ্গেও সম্পর্ক ছিলো। যাঁরা গণেশকে এ-জাতীয় নামে চিনতেন যাঁরা গণেশের মূর্তি রচনা করলে আজকের দিনে আমাদের পক্ষে সেই মূর্তিগুলিকে গণেশ বলে চেনাই হয়তো দুঃসাধ্য হতো। তাই, উন্নততর আর্যেরা অনার্যদের কাছ থেকে, বা অনুন্নত আর্য উপজাতিদের কাছ থেকেই, এই গণেশকে গ্রহণ করেছিলেন—এ-জাতীয় মতবাদ স্বীকার করলেও অনেক প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায়। কেন গ্রহণ করলেন? এবং, তারচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বহু বিনায়কের মধ্যে, কিংবা, বিনায়কের বহু রূপের মধ্যে ওই একটিমাত্র নির্দিষ্ট রূপই কেন গৃহীত হলো? আমরা একটু পরেই দেখতে পাবো, এই দ্বিতীয় প্রশ্নটির জবাব হয়তো আজ স্পষ্টভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা, এমন হতে পারে যে, এই প্রশ্নকে অনুসরণ করেই ভারতবর্ষে রাষ্ট্রের উৎপত্তিসংক্রান্ত অমীমাংসিত সময়ার মীমাংসা অন্বেষণ করা যেতে পারে।

এইখানে আমরা আমাদের মূল যুক্তির আভাস দিয়ে রাখতে পারি।

আমাদের মূল যুক্তি হলো, অন্যান্য দেশের মতোই ভারতবর্ষেও রাষ্ট্রশক্তি ও শ্রেণীবিভক্ত সমাজের কাহিনী অনাদি নয়। প্রাগ-বিভক্ত সমাজের ধ্বংসস্তূপের উপরই রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হয়েছে। কিন্তু সারা ভারতবর্ষ জুড়ে একসঙ্গে তা ঘটেনি। শ্রেণী-বিভক্ত সমাজের পাশেই থেকেছে প্রাগ-বিভক্ত প্রাচীন সমাজ। এমনকি, প্রাগ-বিভক্ত সমাজ যেখানে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে সেখানেও তার সমস্ত চিহ্ন নির্মূল হয়ে যায়নি।

আমরা দেখাবার চেষ্টা করবো, ভারতীয় সাহিত্য ওই প্রাগ-বিভক্ত সমাজেরই নাম হলো গণ। ইংরেজী পরিভাষা অনুসারে ট্রাইব। অবশ্যই, দুর্ভাগ্যবশত এই ট্রাইব শব্দটিকে প্রায়ই এলোমেলোভাবে ব্যবহার করা হয়—মর্গান-এর আলোচনা অনুসরণ করে ওই ট্রাইব্যাল-সমাজ বা গণ-সমাজকে স্পষ্টভাবে চেনবার চেষ্টা করা হয়নি। তার বদলে সাধারণত একরকম আধো-অস্পষ্ট আদিম জীবনের চিত্রই উল্লেখ করা হয়। মর্গান-এর গবেষণা অনুসরণ করলে দেখা যায় এই গণ-সমাজের চিত্রটিকে অস্পষ্ট বা অনির্দিষ্ট মনে করবার কারণ নেই। তার বদলে এখানে সমাজসংগঠনের একটি নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট রূপ রয়েছে। শুধু তাই নয়। ওই গণ-সমাজেরও একটা ইতিহাসও আছে, বিকাশ আছে : মর্গান-এর পরিভাষা অনুসারে মধ্য-বন্য-দশা থেকে মধ্য-বর্বর-দশা পর্যন্ত। মধ্য-বর্বর-দশার পর থেকেই ওই গণ-সমাজের গড়নে ভাঙন দেখা দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই ধ্বংসস্তূপের উপরেই গড়ে উঠেছে রাষ্ট্রশক্তি। এই গণ-সমাজকে আমরা প্রাগ-বিভক্ত সমাজ বলছি, কেননা, যতোদিন পর্যন্ত এই গণ-সমাজে ভাঙন দেখা দেয়নি ততোদিন পর্যন্ত শ্রেণীবিভাগেরও পরিচয় নেই—পরিচয় নেই ব্যক্তিগত সম্পত্তির, আধুনিক স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের (পরিবারের) এবং রাষ্ট্রশক্তির।

নামেই প্রমাণ, ওই গণ-সমাজের সঙ্গেই গণপতির সম্পর্ক।

কিন্তু ভারতবর্ষে রাষ্ট্রশক্তির পাশাপাশিই ওই গণ-সমাজও টিকে থেকেছে,—সারা ভারতবর্ষ জুড়ে সমাজ-পরিবর্তন একতালে ঘটেনি। রাষ্ট্রশক্তির দেখা দেবার পর তার অধিনায়কেরা আশেপাশের গণ-সমাজকে কীরকম বিষনজরে দেখেহচিলেন তার নমুনা মহাভারত এবং অর্থশাস্ত্র থেকে উদ্ধৃত করবো। আর, তাঁদের এই মনোভাবে থেকেই মূলসূত্র পাওয়া যাবে গণেশ সম্বন্ধে এককালের ওই বিদ্বেষ-বিতৃষ্ণাকে বোঝবার : যাজ্ঞবল্ক্যের বিনায়ক-আতঙ্ক আর কৌটিল্যের সংঘবৃত্ত হয়তো সম্পর্কহীন হয়। অবশ্য, এই বিঘ্নরাজ বিনায়কই যে শেষ পর্যন্ত কী করে সিদ্ধিদাতার সম্মান পেলেন সে-সমস্যা স্বতন্ত্র। গণচিত্তকে তুষ্ট করবার উদ্দেশ্যেই এই গণদেবতাকে গ্রহণ করা হয়েছিলো—এমনতরো সমাধান সহজ হলেও সন্তোষজনক নয়। কেননা, বিনায়ক এক ছিলেন না, বহু। কখনো তাঁর চেহারায় হাতির চিহ্ন, কখনো তাঁর নামে সাপের চিহ্ন, ষাঁড়ের চিহ্ন, কিংবা হয়তো আরো অন্যরকম। উদ্দেশ্যটা যদি গনচিত্তকে তোষণ করাই হয়—যদিও অবশ্য একথার অর্থ খুব স্পষ্ট নয়,—তাহলে ওই বহুবিনায়কের মধ্যে এক-বিনায়ককে কেন বেছে নেওয়া হলো সে-প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যায় না। তাছাড়া, বিঘ্নরাজ বিনায়ক এবং সিদ্ধিদাতা গণেশের মধ্যে যে-মৌকিক প্রভেদ আছে তাও এই মতবাদ ঠিকমতো গ্রাহ্য করে না। তাই, গণনায়কের পক্ষে সিদ্ধিদাতা গণেশ হয়ে যাওয়ার সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল ও কঠিন। আজকের দিনেই হয়তো এ-সমস্যার সমাধান করা যাবে না; কিন্তু তার থেকেই প্রমাণ হবে না যে, আগামীকালের উন্নততর গবেষণার ভিত্তিতেও সে-সমাধান সুদূরপরাহত থেকে যাবে। আমরা শুধু এইটুকুই দেখাবার চেষ্টা করবো যে, এই সমস্যার সঙ্গে প্রাচীন ভারতে রাষ্ট্রশক্তির অভ্যুত্থান কাহিনীর সম্পর্ক রয়েছে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রাগ-বিভক্ত সমাজ ভেঙে রাষ্ট্রশক্তির অভ্যুত্থান কী করে হলো ঠিক এই বিষয়ে গবেষণা এখনো হয়নি। আজই হোক বা আগামীকালই হোক, আমাদের ঐতিহাসিকদের এ-বিষয়ে মনোনিয়োগ করতে হবে।

কিন্তু আপাতত যে-বিষয়টির দিকে বিশেষ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই : গণপতির ইতিহাসে ওই বিঘ্নরাজ-চরিতের চেয়েও পুরোনো একটি পরিচ্ছেদ আছে। তার প্রমাণ ঋগ্বেদে, তার প্রমাণ যজুর্ব্বেদ—মানবগৃহ্যসূত্র যা যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতির চেয়েও অনেক আগেকার সাহিত্য।

ঋগ্বেদের দ্বিতীয় মণ্ডলে(৯০),—অর্থাৎ, আধুনিক পণ্ডিতদের হিসেবে ঋগ্বেদের প্রাচীনতম অংশে,—দেখতে পাওয়া যায় গৃৎসমদ ঋষি গান রচনা করেছেন :

গণানাং ত্বা গণপতিং হবামহে
কবিং কবীনামুপমশ্রবস্তমম্।
জ্যেষ্ঠরাজং ব্রহ্মণাং ব্রহ্মণস্পতে
আ নঃ শ্রৃণ্বন্নূতিভিঃ সীদসাদনম্।।
অর্থাৎ,
হে ব্রহ্মণস্পতি, তুমি গণগুলির মধ্যে গণপতি, কবিগণের মধ্যে কবি, সমস্ত অন্নের উপমাস্বরূপ অন্ন যাঁদের আছে তুমি তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, জ্যেষ্ঠদের মধ্যে তুমি বিরাজমান, তুমি মন্ত্রসমূহের স্বামী। তুমি আমাদের আহ্বান শ্রবণ করে আশ্রয় প্রদানার্থ যজ্ঞস্থানে উপবেশন কর।

প্রসঙ্গক্রমে বলা যেতে পারে এই গান ছান্দোগ্যের সেই কুকুরগুলির গান মনে পড়িয়ে দেয়। কেননা, এখানেও অধ্যাত্মবাদী বা ভাববাদী ধ্যানধারণার পরিচয় নেই, তার বদলে এ-গানের মূলে রয়েছে অন্নকামনাই : শ্রব মানে অন্ন এবং সায়ন বলেছেন ব্রহ্মণস্পতি শব্দে ওই ব্রহ্মণ্‌ বলে কথাটি অন্নবাচকই : ব্রহ্মণঃ অন্নস্য পরিবৃঢ়স্য কর্মণো বা পতে পালয়িতঃ। অবশ্যই, ব্রহ্মণস্পতির অর্থ নিয়ে আমাদের পক্ষে পরে দীর্ঘতর আলোচনা তোলবার দরকার পড়বে, কেননা, দেশের ঐতিহ্য অনুসারে এই ব্রহ্মণস্পতি বা বৃহস্পতিই হলেন লোকায়ত-দর্শনের আদিগুরু। তাই, আমরা এই নামটির আলোচনায় পরে ফিরবো। আপাতত বৈদিক সাহিত্যেই গণপতির আদি-রূপটির দিকেই দৃষ্টি রাখা যাক।

বাজসনেয়ী সংহিতায়(৯১) দেখা যায় অশ্বমেধযজ্ঞ প্রসঙ্গে মেয়েরা দল বেঁধে গাইছে :

গণানাং ত্বাং গণপতিং হবামহে।।
প্রিয়ানাং ত্বাং প্রিয়পতিং হবাহমে।।
নিধীনাং ত্বাং নিধিপতিং হবামহে।।
অর্থাৎ,
গণদের মধ্যে তুমি গণপতি, আমরা তোমার যজ্ঞ করি। প্রিয়দের মধ্যে তুমি প্রিয়পতি, আমরা তোমার যজ্ঞ করি। নিধিদের মধ্যে তুমি নিধিপতি, আমরা তোমার যজ্ঞ করি।

ওই গানে নিধি শব্দটির প্রতি দৃষ্টি আবদ্ধ রাখলে সন্দেহ করা যেতে পারে যে, এখানে প্রাগ-বিভক্ত সমাজের,—ব্যক্তিগত সম্পত্তি দেখা দেবার আগেকার পর্যায়ের—স্মৃতিচিহ্ন খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়। মনিয়ার উইলিয়ামস(৯২) বলছেন, সংহিতা সাহিত্যে নিধি শব্দ store, hoard, treasure, ইত্যাদি বুঝিয়েছে; ‘ধা’ ধাতু (to deposit) থেকে শব্দটির নিষ্পত্তি। নিধি বলতে তাই এক জায়গায় জমা করা ধনসম্পত্তি বোঝায়। কিন্তু কার ধনসম্পত্তি? উত্তরযুগের পৌরাণিক সাহিত্য আর আইনের বই থেকে সন্দেহ হয় এ হলো এমন ধনসম্পত্তি যার উপর কারুর ব্যক্তিগত মালিকানা নেই। পৌরাণিক সাহিত্যে(৯৩) সাধারণত ন’জন (কখনো আটজন) নিধির উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের নামগুলিতেই টোটেম-বিশ্বাসের—অতএব আদিম সমাজের—চিহ্ন টিকে রয়েছে : পদ্ম, মহাপদ্ম, শঙ্খ, মকর, কচ্ছপ, ইত্যাদি, ইত্যাদি। পৌরাণিক সাহিত্যে যদিও এই নিধিদের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন করে কুবের বা লক্ষ্মীর অনুচর হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে তবুও অনুমিত হয় এ-কল্পনার পিছনে কোনো-না-কোনো বাস্তব সমাজ-পরিবেশ এককালে ছিলো। কিন্তু তার চেয়েও চিত্তাকর্ষক হলো আইনের পুঁথিগুলির সাক্ষ্য। কেননা, আইনের বই(৯৪) থেকে এটুকু নিঃসন্দেহে প্রমাণ হয় যে, নিধি হলে এমন ধনরত্ন যার উপর কারুর ব্যক্তিগত স্বামিত্ব নেই। অবশ্যই, এ-যুগে আমরা যাকে চিরপ্রনষ্ট স্বামীক (গুপ্তধন?) বলি, মিতাক্ষরা প্রভৃতি অপেক্ষাকৃত একালের আইনের বইতে নিধি বলতে হয়তো তাই-ই বুঝিয়েছে; কিন্তু এ-কথা কল্পনা করা সত্যিই কঠিন যে, বাজসনেয়ী সংহিতার যুগেও এ-ধরনের গুপ্তধনের বাস্তব সম্ভাবনা ছিলো(৯৫)। তাই, সেকালের স্বামীবিহীন সম্পদকে প্রাচীন সমাজের যৌথ-সম্পদ মনে করবার অবকাশ আছে—উত্তরকালের আইনকর্তাদের রচনাতেও নিধি শব্দ থেকে ব্যক্তিগত মালিকানার অভাবসূচক তাৎপর্যটা মুছে যায়নি। কিন্তু তাঁদের সমাজে এ-হেন সম্পত্তি বলতে যৌথ-সম্পদ নয়—মালিকহীন সম্পত্তি বলতে শুধুমাত্র প্রনষ্টস্বামীক সম্পদ।

সংহিতার এই দুটি উদ্ধৃতিতে আমরা বিশেষ করে দুটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা করলাম : প্রথমটিতে প্রাগ-অধ্যাত্মবাদী চেতনার স্মৃতি; দ্বিতীয়টিতে প্রাগ-ব্যক্তিগত-সম্পত্তির পর্যায়ের স্মৃতি। আমাদের মূল যুক্তি অনুসারে দু’-এর মধ্যে যোগাযোগ আছে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিকাশ এবং অধ্যাত্মবাদী চেতনার বিকাশ সম্পর্কহীন নয়। এবং আমাদের কাছেও গণেশ সত্যিই যেন সিদ্ধিদাতা : তাঁর ইতিহাস অনুসন্ধান করতে করতে আমরা সমাজ-বিকাশের এমন এক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে যাই যেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়নি এবং সেই সঙ্গেই আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখি, অধ্যাত্মবাদী বা ভাববাদী ধ্যানধারণারও নয়!

তাই, গণপতির প্রসঙ্গ ছেড়ে যাওয়া চলবে না। তাঁরই কথায় ফিরে আসা যাক।

ভারতবর্ষের ইতিহাস একটি আশ্চর্য ঘটনা বারবার চোখে পড়ে। যে-কোনো কারণেই হোক, এদেশে রাষ্ট্রশক্তির অধিনায়কেরা বৈদিক ঐতিহ্যের গরিমা চেয়েছিলেন। এমনকি, অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক কালেও শূদ্র শিবাজী রাষ্ট্রশক্তি লাভ করবার পর কাশী থেকে গার্গভট্ট বলে জনৈক পণ্ডিতকে আনিতে তাঁর সাহায্যে নিজেকে ক্ষত্রিয় বলে ঘোষণা করবার ব্যবস্থা করলেন(৯৬)।

এবং বৈদিক-গরিমা-লোপুপ রাষ্ট্রশক্তির এই অধিনায়কেরাই গণ-সমাজ সম্বন্ধে বিদ্বেষ ও বিতৃষ্ণায় মুখর হয়েছিলেন।

ফলে, ঐ বৈদিক মানুষদেরও যে একটা অতীত ছিলো,—তাঁরাও যে এককালে গণ-সমাজেই বাস করতেন,—এ-কথা আমরা আজকের দিনে প্রায়ই ভুলে যাই। অথচ, তারই স্মৃতি টিকে রয়েছে সংহিতার উদ্ধৃতি দুটির মধ্যে। তাই, আমরা আগে যে যুক্তির উল্লেখ করেছি এখানে তারই পুনরুল্লেখ করা প্রয়োজন : আর্য-অনার্য মতবাদের সাহায্যে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির ব্যাখ্যা করবার চেষ্টায় একটা বিপদ হলো, ওই আর্যদেরই অতীত ইতিহাসটাকে ভুলে যাবার বা ভুল বোঝবার সম্ভাবনা থাকে। কেননা, আর্যদের রচনায় সেই অতীতের যে-কোনো স্মৃতিচিহ্ন দেখলেই তা অনার্যদের কাছ থেকে গৃহীত হয়েছিলো বলে ব্যাখ্যা করবার ঝোঁক এসে যায়। গণপতির ক্ষেত্রেই ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়ের রচনা এই ঝোঁকের একটি দৃষ্টান্ত : এদেশের অনার্য অধিবাসীদের যেন খুশি করবার জন্যেই বৈদিক আর্যরা অনার্য গণপতিটিকে গ্রহণ করেছিলেন। আমাদের যুক্তি হলো, তা না হতেও পারে। এককালে তাঁরা নিজেদেরই খুশি করবার জন্যে গণপতি নিয়ে গান রচনা করেছিলেন। কেননা, পৃথিবীর বাকি সব মানুষের মতোই এই আর্যরাও এককালে গন-সমাজেই বাস করতেন—তার চিহ্ন বৈদিক সাহিত্য থেকে বিলুপ্ত হয়নি।

সংক্ষেপে : গণপতির ইতিহাসে মোটের উপর তিনটি পর্যায় দেখতে পাওয়া যায়। এক : প্রাগ-বিভক্ত সমাজের স্মৃতি বহন করে এককালে বৈদিক মানুষেরাই গণপতিকে নিয়ে গান রচনা করেছিলেন। দুই : শ্রেণী-বিভক্ত সমাজের রাষ্ট্রশক্তির প্রতিনিধি হিসেবে রাজনীতির গ্রন্থে কৌটিল্য ওই গণ-সমাজের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করলেন এবং আইনের গ্রন্থে যাজ্ঞবল্ক্য প্রমুখ গণপতিকে দেখলেন বিষনজরে—কেননা, সারা ভারতবর্ষ জুড়ে সামাজিক পরিবর্তন একতালে ঘটেনি, শ্রেণীসমাজের আশপাশেই বেঁচে ছিলো প্রাক-বিভক্ত গণসমাজ। তিন : বহু বিনায়কের মধ্যে গজাননধারী একটি নির্দিষ্ট বিনায়ক সিদ্ধিদাতা দেবতা হিসেবে ঘোষিত হলেন এবং বহুভাবে তাঁর এই নব রূপটির প্রচার করা হলো। গণপতির ইতিহাসের এই তিনটি পর্যায়ের সঙ্গে আদিম সাম্যসমাজ থেকে রাষ্ট্রের উৎপত্তি পর্যন্ত সুদীর্ঘ সমাজ-ইতিহাসের সম্পর্ক রয়েছে। শুধু তাই নয়। সম্পর্ক রয়েছে লোকায়তিক চেতনার স্তর থেকে অধ্যাত্মবাদের বিকাশ পর্যন্ত ধ্যানধারণার ইতিহাসেরও।

গণপতিরই আর একটা নাম হলো লোকবন্ধু, লোকনাথ(৯৭)। লোকায়তিক ধ্যানধারণার উৎস-সন্ধানে আমরা তাই এই লোকবন্ধুরই পদাঙ্ক অনুসরণ করবার পণ করেছি। সে-পথে এগোতে গেলে সর্বপ্রথম নিশ্চয়ই প্রশ্ন তুলতে হয় : গণ মানে কী? কেননা গণনায়ক শুধুই গণের নায়ক নন, তাঁর একটি নামই হলো গণ—শুধু গণ। তাই গণের রহস্য না বুঝলে গণনায়কের রহস্য বোঝা যাবে না।

———————–
৮৮. ক্ষিতিমোহন সেন : জাতিভেদ ৬৪।
৮৯. H. Mitra op. cit. 1935, 104.
৯০. ঋগ্বেদ ২.২৩.১।
৯১. বাজসনেয়ী সংহিতা ২৩.১৯।
৯২. M. Monier-Williams op. cit. 548.
৯৩. Ibid.
৯৪. বিশ্বকোষ ১০.১২৬-৭।
৯৫. এই গ্রন্থের চতুর্থ পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।
৯৬. H. P. Shastri AV 2.
৯৭. ক্ষিতিমোহন সেন : জাতিভেদ ৬৪।

১০. গণ মানে কী—কালীপ্রসাদ জয়সওয়াল ও রমেশচন্দ্র মজুমদার

গণ মানে কী? এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া সত্যিই তেমন দুরূহ হওয়া উচিত নয়। কেননা, প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র রেখে যাবার ব্যাপারে প্রাচীনেরা মোটেই কৃপণ ছিলেন না। তবু এ-কথাও ঠিক যে, শুধুমাত্র ওই দলিলগুলির শব্দার্থের মধ্যে আবদ্ধ থাকলে গণকে বোঝবার চেষ্টা একপেশে, অতএব ভুলও হতে পারে। তার কারণটা খুব জটিল নয়। দলিলগুলির উপর চোখ বোলালেই বুঝতে পারা যায় গণ ছিলো সেকালের কোনো একরকম সমাজ-সংগঠন। তাই, গণকে বুঝতে হলে সংস্কারমুক্ত সমাজবিজ্ঞানের সাহায্যও প্রয়োজন।

এই সংস্কারমুক্তির কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, শুধু যে সেকালের রচনাই সেকালের সামাজিক-পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত হতে বাধ্য তাই নয়, সেকালের রচনা সম্বন্ধে একালের মনোভাবটির একালের সামাজিক-পরিস্থিতির প্রভাব নিরপেক্ষ হওয়া কঠিন। কারণ, সেকাল নিয়ে গবেষণা করলেও একালের ঐতিহাসিক হাজার হোক একালেরই মানুষ। এবং, একালের মানুষ হিসেবে তাঁর মনে একালের প্রয়োজন নানারকম সংস্কার সৃষ্টি করতে বাধ্য। তাই, আধুনিক ঐতিহাসিকের লেখনী পুরোনো দলিলপত্রের ব্যাখ্যা দেবার সময় সেগুলিকে আধুনিক যুগের আশা-আকাঙ্খার রঞ্জিত করবার প্রলোভনে পড়তে পারে। এ-ক্ষেত্রে নৈর্ব্যক্তিক হবার একমাত্র পথ হলো, আধুনিক যুগের আশা-আকাঙ্খাগুলিকে সচেতনভাবে সমালোচনা করবার প্রবেষ্টা(৯৮)।

কথাটা বিশেষ করে কেন উঠলো তাই বলি। আধুনিক ঐতিহাসিকেরা গণ নিয়ে গবেষণা বড়ো কম করেননি। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক কাশীপ্রসাদ জয়সয়ালের “হিন্দু পলিটি” এবং অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদারের “কর্পোরেট লাইফ ইন এন্সেণ্ট ইণ্ডিয়া”,–বিশেষ করে প্রথম বইটির নাম—উল্লেখ না করলেই নয়। এই বই দুটিতে তাঁরা প্রাচীনদের কাছ থেকে পাওয়া গণ-সংক্রান্ত বহু তথ্য একত্রিত করেছেন—বস্তুত, তাঁদের ওই পরিশ্রমই আমাদের পক্ষে গণ নিয়ে আলোচনার পথ সুগম করেছে। তবুও তাঁরা যে-সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চেয়েছেন তা আমাদের কাছে স্বীকারযোগ্য মনে হয়নি। তার কারণ, তাঁদের ঐতিহাসিক দক্ষতার অভাব নয়, তাঁদের মনের উপর আধুনিক যুগের এক নির্দিষ্ট আশা-আকাঙ্খার প্রভাব। কেননা, তাঁদের গবেষণার পিছনে স্পষ্ট প্রেরণা হলো একটি নির্দিষ্ট যুগের একটি নির্দিষ্ট রাজনীতির। এই রাজনীতির সাময়িকতা ও সংকীর্ণতা তাঁদের সিদ্ধান্তকেও সাময়িক মূল্য দিয়েছে ও সংকীর্ন করেছে।

কথাটা এমনি শুনলে হয়তো সন্দেহজনক মনে হবে। অথচ, তথ্যের দিক থেকে তাঁদের গবেষণার পিছনে তাঁদের সময়কার রাজনীতির দাবিটা সত্যিই অস্পষ্ট নয়।

প্রথমত, জয়সওয়াল আর মজুমদারের আগেও অনেক বড়ো বড়ো বিদ্বান প্রাচীন ভারতের ইতিহাস নিয়ে অনেক বড়ো বড়ো বই রচনা করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই বইগুলিতে গণ-এর তাৎপর্য-বিচারের চেষ্টা নেই বললেই চলে। জয়সওয়াল ও মজুমদারের রচনাই সর্বপ্রথম বলিষ্ঠভাবে ঘোষণা করলো, প্রাচীন ভারতের ইতিহাসকে সম্যকভাবে বুঝতে হলে গণ-এর তাৎপর্য বিচার করবার প্রয়োজন আছে। এ-ঘটনা উল্লেখযোগ্য। কারণ, আগেই বলেছি, প্রাচীন পুঁথিপত্রে গণ-সংক্রান্ত যে-মালমশলা মজুত আছে তার পরিমাণ বড়ো কম নয়। তাই, আগেকার স্বনামধন্য ঐতিহাসিকদের পক্ষে সেগুলিকে উপেক্ষা করাও তুচ্ছ ঘটনা নয়। গণ-এর প্রতি তাঁদের নজর না পড়বার কারণ হলো তাঁদের পক্ষে গণকে বোঝবার তাদিগই ছিলো না। অথচ, গণ-এর প্রতি আলোচ্য ঐতিহাসিক দু’জনের দৃষ্টি পড়লো, কেননা, দৃষ্টি পড়বার স্পষ্ট তাগিদ ছিলো। তাগিদটি ঠিক কী রকম তা বোঝবার জন্যে আমাদের জাতীয়-সংগ্রামের ইতিহাসের একটি পর্যায়ের কথা মনে রাখতে হবে।

বই দুইটি রচনাকাল কী? অধ্যাপক জয়সওরালের বই প্রকাশিত হয়েছে ১৯২৪-এ। কিন্তু লেখা কয়েক বছর আগেকার। প্রকাশিত হতে দেরি হবার অপ্রীতিকর কারণ লেখক ভূমিকায় ব্যাখ্যা করেছেন। অধ্যাপক মজুমদারের বইটির রচনাকালও আনুমানিক একই রকম, ১৯১৯-এর কিছু আগে হবে।

এই সময়টা বরাবর ভারবর্ষের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অবস্থাটা ভেবে দেখা যাক। জাতীয় কংগ্রেসের কণ্ঠে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১৯১৯-এর প্রস্তাবে(৯৯) ঘোষণা করা হলো, স্বায়ত্বশাসনের ভিত্তিতে দেশে সাধারণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্র চাই। অবশ্যই, এ-দাবির প্রতিষেধক হিসেবে ইংরেজ শাসকেরা পাইক-পেয়াদা থেকে অর্ডিন্যান্স-গোয়েন্দা পর্যন্ত কোনো অনুষ্ঠানেরই ত্রুটি করেননি।

কিন্তু তাছাড়াও দেশের জনমতকে ধোঁকা দেবার জন্যে দরকার ছিলো ইতিহাসের দোহাই। ও-তরফের পণ্ডিতেরা তাই আমাদের বারবার বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন যে, ভারতবর্ষে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথাই ওঠে না,—ভারতবর্ষের ঐতিহ্যে তার কোনো নজির নেই। বিদেশী শাসকদের মুখপাত্রেরা তাই প্রমাণ করছিলেন, সাধারণতান্ত্রিক স্বায়ত্বশাসনের দাবিটা আমাদের পক্ষে নেহাতই বিজাতীয় উৎসাহের পরিচায়ক।

ফলে, জাতীয় আন্দোলনের তরফ থেকেও ঐতিহাসিক গবেষণা যে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের হাতিয়ার হয়ে উঠবে তাতে বিস্ময়ের অবকাশ নেই। তাগিদ পড়লো দেশের অতীত খুঁড়ে পাল্টা নজির খুঁজে বের করবার। আর, এই কারণেই ঐতিহাসিকদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো উপেক্ষিত ও অবহেলিত গণগুলির দিকে। পাল্টা নজির হিসেবে ওই গণ-এর সাক্ষ্য সত্যিই দুর্মূল্য। কেননা, গণ বলতে আসলে যাই বোঝাক না কেন, এ-বিষয়ে এতোটুকুও সন্দেহের অবকাশ নেই যে, তা একরকমের সমাজসংগঠন এবং তার মধ্যে সাধারণতান্ত্রিক স্বায়ত্বশাসনের আয়োজন সত্যিই ষোলো আনা।

বই-এর ভূমিকায়(১০০) অধ্যাপক জয়সওয়াল সানন্দে ঘোষণা করলেন, স্যর শঙ্কর নায়ার ভারতসরকারের কাছে গঠনতান্ত্রিক সংশোধনের প্রথম সুপারিশে (৫ই মার্চ, ১৯১৭) বইটির পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধৃত করেছেন। আর, বইটির রচনা-সময়েই লেখক যে গণতান্ত্রিক সংশোধন-বিষয়ে কতোখানি হুশিয়ার ছিলেন তা বইটির সূচীপত্রের উপর একবার চোখ বোলালেই বুঝতে পারা যায়। তাঁর ভারত-আবিষ্কার থেকে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্রমূলক কোনো রকম খুঁটিনাটির হিসেবই বাদ পড়েনি : লোকসভার আসন, কোরাম, হুইপ, ভোট, অনুপস্থিতের ভোট, ব্যালট ভোট, সংখ্যা-গরিষ্ঠ সংক্রান্ত নীতি, প্রতিনিধি নির্বাচন পদ্ধতি, ভোটের অধিকার, রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন, নাগরিকের অধিকার,—এক কথায়, জাতীয় কংগ্রেস তখন যে-গঠনতন্ত্র চেয়েছে তার প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি পর্যন্ত।

অধ্যাপক মজুমদারের বই-এর মূলেও এই রাজনৈতিক প্রেরণা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। বইটি সম্বন্ধে স্বদেশী পত্রিকাগুলির প্রতিক্রিয়া থেকেই তা অনুমান করা যায়। অধ্যাপক মজুমদারের বইটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই মডার্ন রিভিউ(১০১) উচ্ছ্বাস করে বললো : ইতিহাসকে অস্বীকার করে যাঁরা প্রমাণ করতে ব্যস্ত যে, স্বায়ত্বশাসনে শুধুমাত্র পাশ্চাত্য জাতিদেরই একচেটিয়া অধিকার তাঁদের যুক্তিকে এ-বই একবারে নস্যাৎ করে দেবে। অমৃতবাজার পত্রিকা(১০২) সগর্বে ঘোষণা করলো : ফিরিঙ্গি ভায়ারা তো বারবার তর্ক তুলে বলেন যে, গণতান্ত্রিক পরীক্ষা ভারতবর্ষে চলবে না—এই বই তাঁদের একেবারে মুখের মতো জবাব হয়েছে।

ঐতিহাসিক আবিষ্কারের পিছনে সমসাময়িক রাজনীতির প্রেরণাটা এতোটুকুও অস্পষ্ট নয়।

আমাদের যুক্তি হলো, সেকাল সম্বন্ধে গবেষণায় প্রবৃত্ত হলেও একালের ঐতিহাসিক যেহেতু অনিবার্যভাবেই একালের আশা-আকাঙ্খার দ্বারা প্রভাবিত হতে বাধ্য সেই হেতু নৈর্ব্যক্তিক হবার একমাত্র পথ একালের ওই ধ্যানধারণাগুলিকে সচেতনভাবে সমালোচনা করবার প্রচেষ্টা। তাই, গণ-সংক্রান্ত আধুনিক ঐতিহাসিকদের গবেষণাকে গ্রহণ করবার আগে তাঁদের ওই রাজনৈতিক প্রেরণার সমালোচনা করা প্রয়োজন।

আমরা আমাদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় জেনেছি, ওই রাজনীতির আসন অবদানই বা কোথায় আর সংকীর্ণতাই বা ঠিক কী। গণতান্ত্রিক গণতন্ত্রের দাবিতে নিশ্চয়ই অগ্রগতির স্বাক্ষর ছিলো। অপরপক্ষে, জনসাধারণের মধ্যে সাম্যজীবনের চাহিদাকে উপেক্ষা করাই এ-রাজনীতির প্রকৃত সংকীর্ণতা। উক্ত রাজনীতির প্রেরণায় যে ঐতিহাসিক গবেষণা তার বেলাতেই একই কথা। ইংরেজ ও ফিরিঙ্গি যুক্তির বিরুদ্ধে দেশের ইতিহাস থেকে গনতান্ত্রিক স্বায়ত্বশাসনের ঐতিহ্যকে তুলে ধরবার চেষ্টা এঁদের গবেষণার প্রকৃত গৌরব। কিন্তু অন্যান্য সমস্ত দেশের মানুষের মতোই ভারতবর্ষের মানুষও যে এককালে আদিম সাম্য সমাজে বাস করেছে সে-বিষয়ে চেতনার অভাব এঁদের গবেষণার প্রকৃত সংকীর্ণতা। বস্তুত, আমরা বহু প্রমাণের সাহায্যে একটু পরেই দেখতে পাবো, গণ শব্দের আদি তাৎপর্য অভ্রান্তভাবেই ওই আদিম সাম্যসমাজ। অথচ, দেশের ঐতিহ্য সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নজির খোঁজবার প্রেরণায় উভয় ঐতিহাসিকই গণকে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এঁদের প্রধান যুক্তি হলো, গণকে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে মানতেই হবে, কেননা, গণ-এর মধ্যে গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ আয়োজন রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র গণতন্ত্রের লক্ষণ থেকেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রমাণ হয় না। মর্গানের(১০৩) গবেষণার সাহায্য গ্রহণ করলে এঁরা অনায়াসেই দেখতে পেতেন, প্রাগ-বিভক্ত প্রাচীন সমাজে গণতন্ত্রের ষোলো আনা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রশক্তির পরিচয় নেই। ওই একান্ত গণতান্ত্রিক সাম্যসমাজের ধ্বংসস্তূপের উপরই রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হয়েছে।

গণ বলতে প্রাচীনেরা সত্যিই যদি এ-হেন প্রাগ-বিভক্ত আদিম সাম্য সমাজ বুঝে থাকেন তাহলে জাতীয় কংগ্রেসের একটি নির্দিষ্ট দাবির মধ্যে ঐতিহাসিক গবেষণার প্রেরণাকে আবদ্ধ রেখে এই গণ-সমাজের স্বরূপ উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। অধ্যাপক জয়সওয়াল ও অধ্যাপক মজুমদারের সিদ্ধান্ত তাই অনিবার্যভাবেই বিজ্ঞান-ভ্রষ্ট ও ভ্রান্ত হয়েছে। গণ-এর অর্থবিচার এবং প্রাচীন সমাজে গণতন্ত্রের আয়োজন নিয়ে আলোচনা সুদীর্ঘ হবে। এখানে শুধু নমুনা হিসেবে উল্লেখ করা যায় একটি নির্দিষ্ট রাজনীতির প্রেরণার ফলে অতো বড়ো বড়ো ঐতিহাসিকেরাও কী রকম কাল্পনিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।

মহাভারতের সভাপর্বে(১০৪) নকুলের দিগ্বিজয়-বর্ণনার এক জায়গায় বলা হয়েছে যে, যুদ্ধে পৌরব ও পর্বতবাসী দস্যুদের পরাস্ত করবার পর উৎসব-সংকেত নামের সাতটি গণ তিনি জয় করলেন।

পৌরবং যুধি নির্জিত্য দস্যুন্‌ পর্বতবাসিনঃ।
গণানুৎসবসংকেতানজয়ৎ সপ্ত পাণ্ডবঃ।।

তাহলে এখানে সেকালের সাতটি গণ-এর কথা পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলির সমবেত নাম হলো উৎসব-সংকেত। প্রশ্ন হলো, উৎসব-সংকেত মানে কী? টীকাকার নীলকণ্ঠ বলছেন:

উৎসবসংকেতানাং স্ত্রী-পুরুষয়োঃ পরস্পরপ্রীতিরেব রত্যর্থং সংকেতঃ। ন তু দাম্পত্যব্যবস্থা। পশুনামিব যত্রান্তীত্যর্থঃ।
অর্থাৎ, এই উৎসব-সংকেতের বেলায় স্ত্রী-পুরুষদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি প্রীতিই হলো রতিসম্পর্কের সংকেত। এদের মধ্যে দাম্পত্যব্যবস্থা নেই। তাই, এদের যৌন-জীবন পশুদের মতোই নির্বিচার।

মনিয়ার উইলিয়ামস-এর অভিধান অনুসারে সংকেত কথার শব্দার্থ হলো এনগেজমেণ্ট। উৎসব শব্দটিকে আমরা আজকাল যে-অর্থে বুঝি এখানেও যদি সেই অর্থে গ্রহণ করবার অবকাশ থাকে তাহলে আধুনিক নৃতত্ত্ব-বিজ্ঞানের সঙ্গেও সামঞ্জস্য থাকে। কেননা, প্রাগ-বিভক্ত উপজাতি-সমাজে ‘উৎসবে’র সঙ্গেই ‘রত্যর্থং সংকেতঃ’ দেখা যায়। কিন্তু আপাতত সে-আলোচনা না হয় ছেড়েই দেওয়া গেলো। তাহলেও এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে, নীলকণ্ঠ দাম্পত্য-জীবন বলতে স্ত্রী-পুরুষের যে-সম্পর্ককে সমাজ সঙ্গত বলে মনে করতেন এই গণগুলির মধ্যে তার অভাব ছিলো। অবশ্যই, নীলকণ্ঠ যদি তাঁর সমসাময়িক নীতিবোধের তাড়নায় “পশুনামিব যত্রাস্তীত্যররথঃ” বলে গালাগাল না দিয়ে ওই প্রাগ-দাম্পত্য সম্পর্কের স্পষ্টতর বিবরণ দিতেন তাহলে এই গণগুলি প্রাগ-বিভক্ত সমাজের ঠিক কোন পর্যায়ে ছিলো তা মর্গানের গবেষণার আলোয় অনুমান হয়তো করা যেতো। কেননা, মর্গান দেখিয়েছেন, প্রাচীন প্রাগ-বিভক্ত সমাজে শুধুই যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রশক্তির অভাব তাই নয়, উত্তরকালের দাম্পত্য-ব্যবস্থারও অভাব আছে এবং অবশ্যই ওই প্রাগ-বিভক্ত সমাজেরও ইতিহাস আছে এবং সে-ইতিহাসের পর্যায়ভেদের সঙ্গে নরনারীর সম্পর্কেও প্রভেদ দেখা দিয়েছে। কিন্তু এখানে অতো খুঁটিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছবার অবকাশ না থাকলেও এটুকু নিশ্চয়ই বলা চলে যে, উত্তরকালের সংজ্ঞা অনুসারে যা দাম্পত্য-ব্যবস্থা (অর্থাৎ, এক-বিবাহ বা মনোগ্যামী)  নীলকণ্ঠের বর্ণনা অনুসারে উৎসব-সংকেতের মধ্যে যেহেতু তার অভাব সেই হেতু এই গণগুলিকে প্রাগ-বিভক্ত সমাজের কোনো এক পর্যায় বলে না মেনে উপায় নেই।

কিন্তু অধ্যাপক জয়সওয়ালের পক্ষে এই মূল্যবান সূত্রটি অনুসরণ করবার কথাই ওঠে না। তার কারণ তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো প্রাচীন ভারতে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আবিষ্কার করা। তাই, তিনি বিনা দ্বিধায় লিখলেন(১০৫) :

The Utasaba-Sanketas were republicans, probably founded by two men Utasava and Sanketa. We may, however, point out that ‘sanketa’ is a technical term denoting an act or resolution passed by a republic and it is just possible that ‘sanketa’ here originally denoted a state founded by resolution of the Utasavas.
অর্থাৎ, উৎসব সংকেতগুলি প্রজাতান্ত্রিক ছিলো, খুব সম্ভব উৎসব ও সংকেত নামের দুই ব্যক্তি সেগুলির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। কিন্তু এখানে বলে রাখা যায় যে, সংকেত একটি পারিভাষিক শব্দ, তার অর্থ হলো প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গৃহীত প্রস্তাব। এবং এও নিশ্চয়ই সম্ভব যে, সংকেত বলতে এখানে এমন এক রাষ্ট্র বোঝানো হয়েছে যা উৎসবদের গ্রহণ করা প্রস্তাবের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো।

অতো বড়ো একজন ঐতিহাসিকের রচনায় এ-রকম আবোল-তাবোল কথা পড়লে দুঃখিত হতে হয়। অথচ, সমসাময়িক কোনো আশা-আকাঙ্খাকে ঐতিহাসিক গবেষণার একমাত্র প্রেরণা বলে গ্রহণ করলে শেষ পর্যন্ত এ-ভাবে বিজ্ঞান ভ্রষ্ট ন হয়েই বা উপায় কী।

——————————–
৯৯.  R. P. Dutt IT 314.
১০০. K. P. Jayaswal HP 1:vi.
১০১. Modern Review : 1919, March.
১০২. Amrita Bazar Patrika : 1919, 20th E.
১০৩. H. L. Morgan AS 47-154.
১০৪. সভাপর্ব ২৭.১৬।
১০৫. K. P. Jayaswal HP 1:156.

১১. গণ মানে কী—শব্দার্থ বিচার

তাহলে, নিজেদের সাময়িক ধ্যানধারণা ও আশা-আকাঙ্খাকে সচেতন ভাবে সমালোচনা করেই গণ-এর তাৎপর্য অন্বেষণে অগ্রসর হতে হবে।

গণ প্রসঙ্গে প্রাচীন পুঁথিপত্রে নানা রকম শব্দ ব্যবহার হয়েছে। প্রথমে সেগুলির অর্থ-বিচার করা দরকার।

মহামহোপাধ্যায় পি. ভি. কানে(১০৬) বলছেন, কাত্যায়নের মতে গণ, শ্রেণী, ব্রাত, পূগ, সংঘ ও পাষণ্ড এই ক’টি শব্দ একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে—অর্থটা হলো সমূহ বা বর্গ। মহামহোপাধ্যায় কাত্যায়ন থেকে উদ্ধৃত করছেন : গণাঃ পাষণ্ডপুগাশ্চ ব্রাতাশ্চ শ্রেণয়স্তথা, সমূহাখ্যাশ্চ যে চান্যে বর্গাখ্যাস্তে বৃহস্পতিঃ। এবং, মহামহোপাধ্যায়(১০৭) বলছেন, এই শব্দগুলি বৈদিক সাহিত্যেও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, কিন্তু সেখানে এগুলি শুধু সাধারণভাবে সমূহবাচক (a group),–তার চেয়ে আর কোনো বিশিষ্ট অর্থ এগুলির নেই।

পাণিনিও(১০৮) পূগ, গণ, সংঘ এবং ব্রাত শব্দ নিয়ে আলোচনা করেছেন, তাঁর ভাষ্যকারেরা এই শব্দগুলিকে আরো বিস্তারিতিভাবে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করছেন।

পাণিনি : ব্রাতেন জীবতি।
মহাভাষ্য : নানাজাতীয় অনিয়তবৃত্তয় উৎসেধজীবিনঃ সঙ্ঘধা ব্রাতাঃ। তেষাং কর্ম ব্রাতং। তেন ব্রাতকর্মণা জীবতীতি ব্রাতীনঃ।
কাশিকা : নানাজাতীয় অনিয়তবৃত্তয়োহর্থকামপ্রধানাঃ সঙ্ঘধাঃ পূগাঃ।

এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, ব্রাত প্রভৃতি শব্দের অর্থে মূল ঝোঁকটা সমূহত্বের (যৌথ-জীবনের) উপরই। তবুও ভাষ্যকারদের কয়েকটি কথার শব্দার্থ সম্বন্ধে খুঁটিয়ে ভাবা দরকার। যেহেতু সমূহ-জীবনের পর্যায়ে জাতিভেদ দেখা দেওয়া সমাজ-বিজ্ঞান অনুসারে স্বাভাবিক ঘটনা নয় (কেননা, জাতিভেদ প্রধাণতই ভেদের কথা, আর তাই সমূহার্থের সম্পূর্ণ বিপরীত), সেইহেতু ভাষ্যকারদের ‘নানাজাতীয়’ শব্দকে সাধারণভাবে ‘নানা প্রকার’ অর্থে গ্রহণ করাই উচিত নয় কি? এই মানের সঙ্গেই ‘অনিয়ত বৃত্তি’ শব্দাদিরঅ সঙ্গতি থাকা সম্ভব—কেননা, জাতিভেদের একটি লক্ষণই হলো বৃত্তি বা জীবিকা স্থিরনিশ্চিত বা নিয়ত হয়ে যাওয়া। তাছাড়া, ব্রাতকর্ম বলতেও পুরো দলের কাজকর্ম বোঝানোই সম্ভব—ব্রাতের মধ্যে যদি জাতিভেদ সত্যিই থাকে তাহলে ব্রাতকর্ম বলে একটি শব্দ ব্যবহার করা স্বাভাবিক নয়। এই কারণেই, মহামহোপাধ্যায় কানের(১০৯) ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। তিনি বলছেন : Vratas are groups formed by ‘men of various castes’ with no fixed means of livelihood but subsisting by the might (or strength) of their bodies (by bodily labour of various kinds)। আমাদের মন্তব্য বলো, গণ বা ব্রাত নামের ওই যৌথ-জীবনের ধ্বংসস্তূপের উপরই উত্তরযুগের জাতিভেদের ইমারত গড়ে ওঠা সম্ভবপর।

মহাভাষ্য ও কাশিকার উদ্ধৃত অংশ দুটির উপর নির্ভর করে আমরা এখানে লোকায়তিক ধ্যানধারণা-সংক্রান্ত আমাদের মূল যুক্তিরও পুনরুল্লেখ করতে চাই। কাশিকায় ‘অর্থকামপ্রধানাঃ’ বলে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে—এখানে যেন লোকায়তিকদের পুরুষার্থের কথাই ব্রাতজীবীদের বিশেষণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আমাদের যুক্তি হলো, ব্রাত ব্রা প্রাগ-বিভক্ত যৌথজীবনে যে-হেতু কর্মজীবনের সঙ্গে মানব-চেতনার বিচ্ছেদ হয়নি সেই হেতুই অধ্যাত্মবাদ বা ভাববাদের আবির্ভাবও সম্ভব নয়—তাই, সে-স্তরের চেতনাকে আধুনিক অর্থে বস্তুবাদীদর্শন বলা অসঙ্গত হলেও তা লোকায়তিক চেতনাই—ওই লোকায়তিক চেতনা যতো মুক, অব্যক্ত ও অচেতন হোক না কেন। এই প্রসংগে ব্যাকরণ-সাহিত্যে ব্যবহৃত ওই উৎসেধজীবী শব্দটির তাৎপর্যও চিত্তাকর্ষক। মহামহোপাধ্যা কানে উৎসেধজীবী বলতে শারীরিক শ্রমজীবীই বোঝাতে চায় এবং আধুনিক টীকাকারও বলছেন, ‘শারীরিক শ্রমেন (ন তু বুদ্ধি বৈভবেন) জীবন্তি তে ব্রাতা’(১১০)।

তাহলে, ব্যাকরণ-সাহিত্যের দিক থেকেও প্রাগ-বিভক্ত যৌথ-জীবন ও তার সঙ্গে শারীরিক শ্রম এবং অতএব অর্থকামপ্রধান (লোকায়তিক) চেতনার যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায় কি?

কিন্তু গণ, ব্রাত প্রভৃতি শব্দে যে ওই প্রাগ-বিভক্ত যৌথ-সমাজই বোঝানো হয়েছে সে-আলোচনায় ফেরা যাক।

ম্যাকডোন্যাল(১১১), উইলসন(১১২), মনিয়ার-উইলিয়ামস(১১৩) প্রমুখ আধুনিক বিদ্বানেরাও গণ শব্দটির এই সমূহবাচকত্বের তাৎপর্য অনুসরণ করে ইংরেজী প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করছেন : ‘community, corporation, association,’ ইত্যাদি। মনিয়ার উইলিয়ামস তো সরাসরি ‘tribe’ শব্দটিই ব্যবহার করেছেন। এবং এ-জাতীয় অর্থনির্ণয়ের নমুনা ভারতীয় অভিধানেও দুর্লভ নয়। তাই, জে. এফ. ফ্লিট(১১৪) সিদ্ধান্ত করেছিলেন :

…the word ‘gana’ is given in Indian lexicons, with many other terms as primarily a synonym of samuha or samgha, of which the radical and leading idea is that of a ‘gathering together, a collection’.
ভারতীয় অভিধান অন্যান্য কয়েকটি শব্দের সঙ্গে গণ শব্দটিকে সমূহ বা সঙ্ঘের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত করা হয়েছে এবং তার প্রধান ও চূড়ান্ত অর্থ হলো একত্রিত হওয়া, যুথবদ্ধতা।

এবং, এই নজির থেকেই শ্রীযুক্ত ফ্লিট সরাসরি সিদ্ধান্ত করেন যে, গণ বলতে প্রাচীনেরা ‘tribe’-ই বুঝতেন(১১৫)। যদিও অবশ্য অন্যান্য বহু আধুনিক বিদ্বানের মতোই শ্রীযুক্ত ফ্লিটও ওই ‘tribe’  শব্দটির প্রকৃত অর্থ কী তা আলোচনা করেননি(১১৬)। তিনি যদি মর্গানের গবেষণা অনুসরণ করে সে-কথার আলোচনা করতে রাজী হতেন তাহলে তাঁকেও আদিম-সাম্যসমাজের প্রসঙ্গ তুলতে হতো। আমরা একটু পরে সে-প্রসঙ্গে প্রত্যাবর্তন করবো। তার আগে দেখা দরকার শ্রীযুক্ত ফ্লিট-এর এই ব্যাখ্যা কী ভাবে খণ্ডন করবার চেষ্টা করা হয়েছে এবং ওই চেষ্টা সত্যিই স্বীকারযোগ্য কি না।

রয়েল এসিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায়(১১৭) পাতার পর পাতা জুড়ে এ-বিষয়ে শ্রীযুক্ত জে. এফ. ফ্লিটের সঙ্গে শ্রীযুক্ত এফ. ডাব্লিউ. টমাসের সুদীর্ঘ বিতর্ক হয়েছিলো। বিতর্কের কারণ ছিলো দুটি শিলালিপির পাঠোদ্ধার—শিলালিপি দুটি আনুমানিক পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীর এবং দুটি লিপিতেই ‘গণ’ শব্দের উল্লেখ দেখা গিয়েছিলো। শ্রীযুক্ত ফ্লিট এই গণ শব্দকে সরাসরি ‘ট্রাইব’ অর্থে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এ-তর্জমায় শ্রীযুক্ত টমাসের ঘোরতর আপত্তি ছিলো। তাঁর ধারণায়, গণ শব্দ সাধাণতভাবে ট্রাইব না বুঝিয়ে ট্রাইব-সমাজের শাসক-গোষ্ঠীটুকুকেই (‘governing body of the tribe’) বোঝায়। যদিও অবশ্য মর্গানের গবেষণা অনুসরণ করলে পর দেখতে পাওয়া যায়, ট্রাইব-সমাজ সম্বন্ধে আমরা সাধারণভাবে যে-জ্ঞান পাই তার সঙ্গে শ্রীযুক্ত টমাস কল্পিত এই প্রভেদের সঙ্গতি নেই।

এ-বিতর্ক শুধুমাত্র ওই পাশ্চাত্য বিদ্বানদের মধ্যেই আবদ্ধ ছিলো না। শ্রীযুক্ত ফ্লিট নজির দিয়েছিলেন স্যর ভাণ্ডারকরের রচনার, শ্রীযুক্ত টমাসকে সমর্থন জানালেন অধ্যাপক জয়সওয়াল(১১৮)।

এখানে আমরা বিশেষ করে অধ্যাপক জয়সওয়ালের যুক্তিরই আলোচনা করতে চাই। তার কারণ, আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে জোর দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, প্রাচীন সাহিত্যে গণ বলতে ট্রাইবের বদলে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই বুঝিয়েছিলো—এবং, এই মতবাদ আমাদের সিদ্ধান্তের সম্পূর্ন বিরুদ্ধ। আমরা বলতে চাই, গণ বলতে প্রাগ-বিভক্ত, অতএব প্রাক-রাষ্ট্র, সমাজ-সংগঠনকে বুঝতে হবে। তাছাড়া, ফ্লিট-বনাম-টমাসের বিতর্কে তথ্য প্রভৃতির ভিত্তি সামান্যই ছিলো; অপরপক্ষে অধ্যাপক জয়সওয়াল আত্মপক্ষ সমর্থনে প্রাচীন সাহিত্য থেকে বহু তত্য উদ্ধৃত করেছেন। সেগুলিকে নতুন করে বিচার করলে শুধুই যে অধ্যাপক জয়সওয়ালের সিদ্ধান্ত বিচার করা হবে তাই নয়, আমাদের পক্ষে তথ্য-ভিত্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছবার কাজও অনেক সহজসাধ্য হবে।

ব্যাকরন-সাহিত্যে গণ এবং সঙ্ঘ বলে দুটি শব্দই যে একার্থবাচক, এ-কথা অধ্যাপক জয়সওয়ালও অস্বীকার করেন না। এ-বিষয়ে আমরা ইতিপূর্বেই কাত্যায়নের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছি—গণ, পূগ, পাষণ্ড, ব্রাত প্রভৃতি সমস্ত শব্দই সমূহ-বাচক। এবং অধ্যাপক জয়সওয়াল নিজেই বলছেন, পাণিনি গণ এবং সঙ্ঘ বলে দুটি শব্দকে একই অর্থে গ্রহণ করেছেন(১১৯) :

Panini, dealing with the formation of the word ‘Samgha’ in III. 3. 86 (সঙ্ঘাদ্‌ধৌ গণ-প্রশংসয়োঃ) says that the word ‘Sangha’ (as against the regular ‘Samghata’ derived from III, 3. 76) is in the meaning of ‘gana’.
অর্থাৎ, পাণিনি সঙ্ঘ শব্দের নিষ্পত্তি আলোচনা করতে গিয়ে বলছেন (সঙ্ঘদ্‌ধৌ গণ-প্রশংসয়োঃ—৩, ৩, ৮৬) সঙ্ঘ বলতে গণ বোঝায়—হন্‌ ধাতু জাত সঙ্ঘাত নয়।

অধ্যাপক জয়সওয়াল এ-বিষয়ে বৌদ্ধ পুঁথিরও নিদর্শন তুলছেন—সেখানেও গণ ও সঙ্ঘ শব্দ একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে(১২০)। সঙ্ঘ ও গণ-এর এই একার্থবাচকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা, কৌটিল্যের সঙ্ঘবৃত্ত আলোচনা করবার সময় আমরা স্পষ্টই দেখতে পাবো, যে-সঙ্ঘগুলিকে ভাঙবার জন্যে তিনি নির্লজ্জতম পদ্ধতির নির্দেশ দিতেও কুণ্ঠিত হচ্ছে না সেগুলি ট্রাইব্যাল-সংগঠন ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। অথচ, বিস্ময়ের কথা হলো, গণ ও সঙ্ঘের মধ্যে এই অভেদ প্রদর্শন করবার পরই অধ্যাপক জয়সওয়াল বলছেন(১২১) :

The term ‘gana’ signified the form of Government. Samgha on the other hand signified the State.
অর্থাৎ, গণ বলতে বুঝিয়েছিলো সরকারের রূপ; অপরপক্ষে সঙ্ঘ বলতে বুঝিয়েছিলো রাষ্ট্র।

এবং, সঙ্ঘ বা গণ বলতে ট্রাইব বোঝবার বিরুদ্ধে তিনি যুক্তি দিচ্ছেন(১২২) :

Panini, we have seen, equates ‘Gana’ with ‘Samgha’. No one would say that the word ‘samgha’ can in any way be connected with tribe there. Again, new ‘ganas’ were founded. Would that mean that ‘new’ tribe were founded? Such a meaning would hardly deserve consideration.
অর্থাৎ, আমরা দেখেছি, পাণিনি গণ এবং সঙ্ঘকে এক করেছেন। সেখানে সঙ্ঘ যে ট্রাইব-এর সঙ্গে কোনোভাবে সংযুক্ত, এ-কথা কেউই বলবেন না। তাছাড়া নতুন গণ প্রতিষ্ঠিত হতো। তার মানে কি এই হবে যে, নতুন ট্রাইব প্রতিষ্ঠিত হতো? এ-ধরনের মতবাদ আলোচনার যোগ্যই নয়।

কিন্তু কেন? বরং রাষ্ট্রের বেলায় শাসক-শাসিতের মধ্যে প্রভেদ আছে বলেই এবং গণ বা সঙ্ঘ একান্তভাবে সমুহার্থক বলেই, গণ বলতে রাষ্ট্র মনে করা কষ্টকল্পনার পরিচায়ক। অপরপক্ষে, নতুন গণ প্রতিষ্ঠিত হবার কথা এতোটুকুও অসম্ভব নয়(১২৩)। বস্তুত, গণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক জয়সওয়ালই আরো যে-সব তথ্য সংগ্রহ করেছেন তা থেকে গণকে ট্রাইব মনে করাই খুব স্বাভাবিক হয়। যেমন, বৌদ্ধ-পুঁথি(১২৪) থেকে তিনি গণ-বন্ধন বলে শব্দ তুলছেন, জৈন-পুঁথি(১২৫) থেকে সচিত-সমূহ বলে আর একটি কথা তুলছেন। প্রথম শব্দটির অর্থ ‘group-bond’ এবং দ্বিতীয়টির অর্থ ‘group-consciousness’ হওয়াই সবচেয়ে স্বাভাবিক। এবং রাষ্ট্র-ব্যবস্থার বর্ণনায় এ-জাতীয় বিশেষণ প্রাসঙ্গিক না হওয়াই সম্ভবপর।

প্রাচীন ব্যাকরণ-সাহিত্যেই এই জাতীয় মানবগোষ্ঠীর যে-সব নাম পাওয়া যায় তা থেকেও ট্রাইব অর্থই অনুমান করা স্বাভাবিক মনে হয়। কয়েকটি নামের নমুনে(১২৬) : লৌহিত-ধ্বজাঃ, লৌহধ্বজাঃ, কৌঞ্জায়ন্যঃ, ব্রাধ্নায়ন্যঃ, কৌণ্ডীবৃষঃ, বার্কেণ্য, ঔলপয়ঃ (ভোঁদড় থেকে), ক্রোষ্টুকীয়ঃ (শিয়াল থেকে), শিবি, ইত্যাদি।

এই নামগুলির উৎসে টোটেম-বিশ্বাস অনুমান করা কষ্টকর নয় এবং তার তাৎপর্য আর যাই হোক রাষ্ট্র হতে পারে না। অবশ্যই, তর্ক করে বলা যেতে পারে, রাষ্ট্র-ব্যবস্থা গড়ে ওঠবার পরও টোটেমিক নাম টিকে থাকা সম্ভব। কিন্তু সুখের বিষয়, ব্যাকরণ-সাহিত্যে উল্লেখিত এই নামগুলির বেলায় সে-তর্কের অবকাশ সত্যিই নেই। কেননা, প্রাচীন সাহিত্যে শুধু এই নামগুলিই টিকে নেই,–ওই নামের মানবগোষ্ঠীর বর্ণনাও পাওয়া যায়। এবং সে-বর্ণনার মধ্যে প্রাগ-রাষ্ট্র ট্রাইব-সমাজের ছবিই স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

এই বর্ণনা পাবার জন্যে ব্যাকরণ-সাহিত্য থেকে মহাভারতের দিকে এগোনো দরকার।

—————————-

১০৬. P. V. Kane HD 2:66.
১০৭. Ibid 2:67.
১০৮. পাণিনি ৫.২.২১ ও ৫.২.৫২।
১০৯. P. V. Kane op. cit. 2:67.
১১০. প্রভাখ্যটীকা ৩০৭।
১১১. A. A. Macdonnel SED—‘Gana’.
১১২. H. H. Wilson SED—‘Gana’
১১৩. M. Monier-Williams SED 343.
১১৪. J. F. Fleet in JRAS-1915, 138.
১১৫. Ibid.
১১৬. cf. G. Thomson SAGS 97.
১১৭. JRAS 1914:413-4, 745-7; 1915:138-40, 533-5, 802-4.
১১৮. K. P. Jayaswal HP 1:29 cf. F. W. Thomas JRAS-1915, 534. R. G. Bhandarkar in IA-1912, 161 cf. J. F. Fleet JRAS 1914 : 745f. cf. R. G. Bhandarkar VS 104.
১১৯. K. P. Jayaswal HP 1:27-8.
১২০. Ibid 1:28.
১২১. Ibid 1:28.
১২২. Ibid 1:29.
১২৩. H. L. Morgan AS 105.
১২৪. Jataka 1:422 cf. K. P. Jayaswal op. cit. 1:30.
১২৫. K. P. Jayaswal op. cit. 1:31-2.
১২৬. Ibid 1:35.

১২. গণ মানে কী? মহাভারতের বর্ণনা

একরকম সঙ্ঘের বিশেষণ হিসেবে পাণিনি ‘আয়ুধজীবী’ শব্দ ব্যবহার করছেন। এ-শব্দের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা একটু পরেই তোলা যাবে। এই প্রসঙ্গেই পাণিনি(১২৭) খবর দিচ্ছেন যে, উক্ত সঙ্ঘগুলি বাহীক দেশস্থিত। এই বাহীক দেশস্থিত সঙ্ঘের বর্ণনা মহাভারতে বিস্তারিতভাবেই পাওয়া যায়। মহাভারতের বর্ণনায় এই মানুষগুলি সম্বন্ধে যে তীব্র ঘৃণার মনোভাব ফুটে উঠেছে তার কারণ নিয়ে আলোচনা অবশ্যই স্বতন্ত্র। আপাতত আমাদের প্রশ্ন হলো, এই বর্ণনার মধ্যে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ছবি পাওয়া যায় না, আদিম সমাজের কোনো এক পর্যায়ের ছবি পাওয়া যায়? কালিপ্রসন্ন সিংহের(১২৮) তর্জমা থেকে এই বর্ণনা উদ্ধৃত করা যাক। কর্ণ বলছেন,

হে মদ্ররাজ! আমি ধৃতরাষ্ট্র সমীপে ব্রাহ্মণ মুখে যাহা শ্রবণ করিয়াছি, তুমি অবহিত হইয়া তাহা শ্রবণ কর। ব্রাহ্মণগণ ধৃতরাষ্ট্রমন্দিরে বিবিধ বিচিত্র দেশ ও পূর্বতন ভূপতিগণের বৃত্তান্ত কহিতেন। তথায় একদা এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বাহীক ও মদ্রদেশোদ্ভব ব্যক্তিদিগকে নিন্দা করত কহিতে লাগিলেন, হে রাজন্‌! যাহারা হিমালয়, গঙ্গ, সরস্বতী, যমুনা ও কুরুক্ষেত্রের বহির্ভাগে এবং যাহারা সিন্ধুনদী ও তাহার পাঁচ শাখা হইতে দূর প্রদেশে অবস্থিত, সেই সমস্ত ধর্মবর্জিত অশুচি বাহীকগণকে পরিত্যাগ করা কর্তব্য।…আমি নিতান্ত নিগূড় কার্যানুরোধ বশতঃ বাহীকগণের সহিত বাস করিয়াছিলাম। তন্নিবন্ধন তাহাদের ব্যবহার বিদিত হইয়াছে।…তথায় আচারভ্রষ্ট ব্যক্তিরা গৌড়ীসুরা পান এবং লণ্ডনের সহিত ভৃষ্ট যব, অপুপ ও গোমাংস ভোজন করিয়া থাকে। কামিনীগণ মত্ত, বিবস্ত্র ও মাল্যচন্দন রহিত হইয়া নগরের গৃহ-প্রাচীর সমীপে নৃত্য এবং গর্দভ ও উষ্ট্রের ন্যায় চিৎকার করিয়া অশ্লীল সঙ্গীত করিয়া থাকে। তাহারা স্বপরপুরুষ বিবেক-বিহীন হইয়া স্বেচ্ছাক্রমে বিহার করত উচ্চৈস্বরে পুরুষগণের প্রতি আহ্লাদজনক বাক্য প্রয়োগ করে। একদা একজন বাহীক কুরুজাঙ্গলে অবস্থান পূর্বক অপ্রফুল্ল মনে করিয়াছিল, আহা! সেই সূক্ষ্মকম্বলবাসিনী গৌরী আমাকে স্মরণ করিয়া শয়ন করতেছে। হায়! আমি কতদিনে রম্যা, শতদ্রু ও ইরাবতী উর্ত্তীর্ণ হইয়া স্বদেশে গমনপূর্বক সেই কম্বলাজীর্ণসংবীত স্থূল ললাটাস্থিসম্পন্ন গৌরীগণের মনঃশিলার ন্যায় উজ্জ্বল অপাঙ্গদেশ, ললাট, কপাল ও চিকুরে অঞ্জনচিহ্ন এবং গর্দভ, উষ্ট্র ও অশ্বতরের শব্দতুল্য মৃদঙ্গ, আনক, শঙ্খ ও মর্দলের নিস্বন সহকারে কেলিপ্রসঙ্গ অবলোকন করিব। হায়! কত দিনে শমী, পীলু ও করবীরের অরণ্যে চক্রসমবেত অপুপ ও শক্তুপিণ্ড ভোজন করত সুখী হইব…

সেই ব্রাহ্মণ পুনরায় যাহা কহিলেন, তাহাও শ্রবণ কর। বাহীক দেশে শাকল নামে এক নগর আছে। তথায় এক রাক্ষসী প্রতি কৃষ্ণা চতুর্দশীর রজনীতে দুন্দুভিধ্বনি করত এইরূপ সঙ্গীত করিয়া থাকে যে, আহা! আমি কতদিনে পুনরায় এই শাকল নগরে সুসজ্জিত হইয়া গৌরীগণের সহিত গৌড়ীসুরা পান এবং গোমাংস ও পলাণ্ডুযুক্ত মেষমাংস ভোজন করিয়া বাহেয়িক সঙ্গীত করিব। যাহারা, বরাহ, কুক্কুট, গো, গর্দভ, উষ্ট্র ও মেষের মাংস ভোজন না করে, তাহাদের জন্ম নিরর্থক! হে শল্য! শাকলদেশের আবালবৃদ্ধ সকলেই সুরাপানে মত্ত হইয়া এইরূপ সঙ্গীত করিয়া থাকে; এতএব তাহাদিগের ধর্মজ্ঞান কিরূপে সম্ভাবিত হইতে পারে?

হে মদ্ররাজ, আর এক ব্রাহ্মণ কুরুসভার যাহা কহিয়াছিলেন, তাহাও শ্রবণ কর। হিমাচলের বহির্ভাগে, যে স্থানে পীলু বন বিদ্যমান আছে এবং সিন্ধু ও তাহার শাখা শতদ্রু, বিপাশা, ইরাবতী, চন্দ্রভাগা ও বিতস্তা নদী প্রবাহিত হইতেছে, সেই অরট্টদেশ নিতান্ত ধর্মহীন; তথায় গমন করা অবিধেয়। ব্রাহ্মণ, দেবতা ও পিতৃলোক ধর্মভ্রষ্ট সংস্কারহীন অরট্টদেশীয় বাহিকদিগের পূজা গ্রহণ করেন না…

হে শল্য! কুরুসভায় বিপ্র আরো যাহা করিয়াছিলেন, আমি তাহা তোমার নিকট কীর্তন করিতেছি। যে ব্যক্তি যুগন্ধরে উষ্ট্রাদির দুগ্ধ পান, অচ্যুত স্থলে বাস বা ভূতিলয়ে স্নান করে তাহার কিরূপে স্বর্গলাভ হইবে? পঞ্চনদী পর্বত হইতে নিঃসৃত হইয়া যে স্থলে প্রবাহিত হইতেছে, সেই স্থলের নাম অরট্ট; সাধুলোক তথায় কদাচ দুইদিন অবস্থান করিবেন না। বিপাশা নদীতে বাহ ও বাহীক নামে দুইটি পিশাচ আছে। বাহকেরা তাহাদেরই অপত্য। উহারা প্রজাপতির সৃষ্ট নহেল সুতরাং হীনযোনি হইয়া কিরূপে শাস্ত্রবিহিত ধর্ম পরিজ্ঞাত হইবে। ধর্মবিবর্জিত কারস্কর মাহিষক, কালিঙ্গ, কেরল, কর্কোটক ও বীরকগণকে পরিত্যাগ করা কর্তব্য। হে মহারাজ! সেই ব্রাহ্মণ তীর্থগমনানুরোধে সেই অরট্টদেশে এক রাত্র অবস্থান করিয়াছিলেন। ঐ রজনীতে এক উলুখলমেখলা রাক্ষসী তাঁহাকে এই সকল বৃত্তান্ত কহিয়াছিল। সেই অরট্টদেশে এক রাত্র অবস্থান করিয়াছিলেন। ঐ রজনীতে এক উলুখলমেখলা রাক্ষসী তাঁহাকে এই সকল বৃত্তান্ত কহিয়াছিল। সেই অরট্টদেশ বাহীকগণের বাসস্থান, তথায় যে সকল হতভাগ্য ব্রাহ্মণ বাস করে, তাহাদের বেদাধ্যয়ন বা যজ্ঞানুষ্ঠান কিছুই নাই। দেবগণ সেই ব্রতবিহীন দুরাচারদিগের অন্ন ভোজন করেন না। অরট্টদেশের ন্যায় প্রস্থল, মদ্র, গান্ধার, খস, বসাতি, সিন্ধু ও সৌবীর দেশে এই কুৎসিত ব্যবহার প্রচলিত আছে।

হে শল্য! আমি পুনরায় তোমাকে এক উপাখ্যান কহিতেছি…কিছুদিন হইল, এক ব্রাহ্মণ আমাদের ভবনে অতিথি হইয়াছিলেন…(তিনি কহিলেন)…গান্ধার মদ্রক ও বাহীকেরা সকলেই কামাচারী, লঘুচেতা ও সংকীর্ণ।…হে মদ্রাধিপ! আমি আর একজনের নিকট বাহীকদিগের যে কুৎসিত কথা শ্রবণ করিয়াছিলাম, তাহাও কহিতেছি…। পূর্বে অরট্টদেশীয় দস্যুরা এক পরিব্রতা সীমন্তিনীকে অপহরণ পূর্বক তাঁহার সতীত্ব ভঙ্গ করিলে তিনি শাপ প্রদান করিয়াছিলেন যে, হে নরাধমগণ! তোমরা অধর্মাচরণপূর্বক আমার সতীত্ব ভঙ্গ করিলে; অতএব তোমাদিগের কুলকামিনীগণ সকলেই ব্যাভিচারিণী হইবে । আর তোমরা কখনই এই ঘোরতর শাপ হইতে বিমুক্ত হইবে না। হে শল্য! এই নিমিত্তই অরট্টদিগের পুত্রেরা ধনাধিকারী না হইয়া ভাগিনেয়গণই ধনাধিকারী হইয়া থাকে।…

পাণিনি যদি স্পষ্টভাষায় বলে থাকেন এ-হেন বাহীকরাই আয়ুধজীবী সঙ্ঘের বা গণের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত(১২৯) তাহলে নিশ্চয়ই মহাভারতে পাওয়া তাদের এই বর্ণনা গণসমাজের অর্থ-নির্ণয় কাজে বিশেষভাবে সহায়ক হবে। অধ্যাপক জয়সওয়াল অবশ্যই মহাভারতের এই অংশকে অগ্রাহ্য করেননি। কিন্তু এই দীর্ঘ বর্ণনা থেকে তিনি শুধুমাত্র একটি তথ্য উদ্ধার করবার চেষ্টা করছেন : সেকালের ভারতবর্ষের ঠিক কোন অংশে বাহীকদের বাস ছিলো(১৩০)! বলাই বাহুল্য, সে-তথ্য তুচ্ছ নয়; কিন্তু তাই বলে এ-বর্ণনায় বাহীকদের সমাজ-জীবন সংক্রান্ত যে সাধারণ ছবিটি পাওয়া গেলো তাকেও অবজ্ঞা করা উচিত নয়। অথচ, অধ্যাপক জয়সওয়াল তা অবজ্ঞা করছেন। তার কারণ কি এই যে, সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাঠামোয় এ-বর্ণনায় পুরতে গেলে কাঠামোটিই ভেঙে চৌচির হবার ভয়?

অবশ্যই, মহাভারতের সংবাদদাতাদের বর্ণনায় বাহীকদের প্রতি একটা তীব্র ঘৃণার ভাব রয়েছে। সেই ঘৃণার প্রভাবে তাঁরা কিছুকিছু কাল্পনিক কথা এই বর্ণনায় জুড়ে দিয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখানে বাহীকদের সমাজ-জীবন সংক্রান্ত কিছু মূল্যবান তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলির দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ রাখলে আমরা দেখতে পাবো, এ-বর্ণনা প্রাগ-রাষ্ট্র ট্রাইব-সমাজেরই ইঙ্গিত দেয়।

বাহীকদের সম্বন্ধে মহাভারতের সংবাদদাতাদের মনে যা নিয়ে সবচেয়ে তীব্র ঘৃণা প্রথমে তারই আলোচনা করা যাক : বাহীকদের মধ্যে যৌন-নিষ্ঠার অভাব। এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, সভ্য-সমাজের কাছে পরিবার জীবন বা দাম্পত্য-ব্যবস্থা বলতে যা বোঝায় বাহীকদের মধ্যে মহাভারতের সংবাদদাতা তা দেখতে পাননি। কিন্তু সেই সঙ্গেই মনে রাখতে হবে, সভ্য-সমাজের এই দাম্পত্য-জীবন চিরন্তন নয় : প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক মানবজাতিই সভ্যতার দিকে এগোবার পথে যে-পর্যায়গুলি উর্ত্তীর্ণ হয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে সেগুলির মধ্যে আধুনিক বিবাহ-সম্পর্ক অনুপস্থিত। আমরা আগেই দেখেছি, মর্গানের পরিভাষা অনুসারে মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছে বন্য-দশার নিম্ন স্তর থেকে; তারপর বন্য-দশার মধ্য ও উচ্চ স্তর পেরিয়ে মানুষ বর্বর-দশায় উঠে এলো এবং এই বর্বর-দশারও নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ এই তিনটি স্তর পেরোলে পরই মানুষের পক্ষে সভ্যতার আওতায় পৌঁছোনো সম্ভব। এবং মর্গান দেখালেন, বন্য-দশার আগাগোড়া এবং বর্বর-দশার নিম্ন ও মধ্য স্তর পর্যন্ত কোথাও আধুনিক দাম্পত্য-সম্পর্কের বা এক-বিবাহের পরিচয় নেই(১৩১) :

…it (অর্থাৎ, আধুনিক বিবাহ-সম্পর্ক) was preceded by more ancient which prevailed universal throughout the period of savagery through the Older and into the Middle Period of barbarism; and that neither the monogamian nor the patriarchal can be traced back to the Later Period of barbarism. They were essentially modern.
অর্থাৎ, বন্য-দশার আগাগোড়াই, এবং বর্বর-দশার আদ্য ও মধ্য স্তর পর্যন্ত সর্বত্রই, আধুনিক দাম্পত্য-সম্পর্কের তুলনায় প্রাচীনতর নরনারী-সম্পর্ক বর্তমান ছিলো। উচ্চ-বর্বর স্তরের আগে পর্যন্ত কোথাও এ-বিবাহ বা পিতৃ-প্রধান পরিবারের চিহ্ন পাওয়া যায় না। এগুলি একান্তই আধুনিক।

মর্গাএর এই সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রমাণ আছে। কেননা, যদিও বন্য-দশার নিম্ন স্তরে আজ আর কোনো মানবদলকে স্বচক্ষে দেখবার উপায় নেই তবুও বন্য-দশার মধ্য-স্তর থেকে শুরু করে বর্বর দশার মধ্য-স্তর পর্যন্ত প্রতিটা অবস্থায় আটকে-পড়ে-থাকা বিভিন্ন মানবদলকে প্রত্যক্ষভাবেই জানতে পারা গিয়েছে এবং দেখা গিয়েছে এই অবস্থাগুলির কোথাও আধুনিক দাম্পত্য-সম্পর্কের পরিচয় নেই। মনে রাখতে হবে, মানবজাতির যে-কোনো শাখাই সভ্যতার স্তরে পৌঁছুক না কেন তার পক্ষে বন্য-দশার নিম্ন-স্তর থেকেই যাত্রা শুরু করতে হয়েছে এবং তারপর ধাপে ধাপে বন্য-দশার মধ্য ও উচ্চ স্তরে উঠে ও তারপর বর্বর-দশার নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ স্তর পার হয়ে সভ্যতার পর্যায়ে পৌঁছুনো সম্ভব হয়েছে।

আমাদের যুক্তি হলো, ভূয়োদর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত মর্গানের এই সিদ্ধান্তগুলিকে প্রাচীন সমাজ সম্বন্ধে সাধারণভাবে জানতে পারা বৈজ্ঞানিক মূলসূত্র হিসেবে গ্রহণ করেই প্রাচীন পুঁথিতে বর্ণিত সেকালের মানুষদের সমাজ-জীবনকে সনাক্ত করবার চেষ্টা করতে হবে। তাই এ-জাতীয় কোনো বর্ণনায় যদি আধুনিক দাম্পত্য-সম্পর্কের অভাব দেখা যায় তাহলে অনুমান করবার সুযোগ থাকে যে, বর্ণিত মানবদল বর্বর-দশার উচ্চ স্তরের আগেকার  কোনো পর্যায়ে জীবন যাপন করতো। আলোচ্য ক্ষেত্রে, বাহীকদের মধ্যে আধুনিক সাম্পত্য-সম্পর্কের অভাব চোখে পড়ে। তাই তাদের সমাজ-জীবন বর্বর-দশার উচ্চ-স্তরের আগেকার কোনো এক পর্যায়ের বলেই অনুমান করা স্বাভাবিক। এই অনুমান গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, বর্বর-দশার মধ্য-স্তরের পর থেকেই ট্রাইব্যাল-সমাজে,–বা আদিম সাম্যসমাজে,–ভাঙন শুরু হয়েছে(১৩২)। অতএব, পাণিনিত মতে এই বাহীকদের সমাজই যদি গণ-সমাজের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয় তাহলে স্বীকার করা দরকার যে, গণ বলতে প্রাগ-বিভক্ত ট্রাইব্যাল-সমাজই হওয়া স্বাভাবিক।

মর্গানের গবেষণা থেকেই সাধারণ বৈজ্ঞানিক মূলসূত্র হিসেবে আমরা আরো জেনেছি যে, মানব-ইতিহাসে এক-বিবাহমূলক সাম্পত্য-সম্পর্কের আবির্ভাব ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থার আবির্ভাব সম্পর্কহীন ঘটনা নয়(১৩৩)। বর্বর-দশার উচ্চ-স্তরে পৌঁছবার আগে পর্যন্ত শুধুই এক-বিবাহ নয়, রাষ্ট্র-ব্যবস্থারও পরিচয় নেই। আর যদি তাই হয় তাহলে বাহীকদের ওই গণ-সংগঠনকে কোনো রকম রাষ্ট্র-সংগঠন বলে অনুমান করারও সুযোগ নেই। গণ বলতে প্রাগ-রাষ্ট্র ট্রাইব্যাল সমাজই বুঝিয়েছে। আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে যাঁরা ‘গণ’কে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা বলে মনে করেছেন তাঁদের কাছে প্রাক-রাষ্ট্র ট্রাইব্যাল সমাজের ধারণাটিই সুস্পষ্ট নয়(১৩৪)। তাই, গণের মধ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ষোলো-আনা আয়োজন দেখে তাঁরা অনুমান করেছেন যে, সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছাড়া গণ আর কিছুই নয়। কিন্তু, গণতন্ত্র অতএব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র—এ-অনুমান বিজ্ঞানসম্পত নয়। কেননা, অধ্যাপক জর্জ টমসন(১৩৫) দেখাচ্ছেন, এমনকি গ্রীক নগররাষ্ট্রগুলিতেও ট্রাইব্যাল সমাজের মতো আদি ও অকৃত্রিম-গণতন্ত্রের আয়োজন ছিলো না।

অবশ্যই, মহাভারতের সংবাদদাতারা যদি বাহীকদের মধ্যে প্রচলিত নরনারী-সম্পর্ককে আরো খুঁটিয়ে বর্ণনা করতেন তাহলে আমাদের পক্ষে তাদের সমাজ-জীবনকে আরো সুনিশ্চিতভাবে সনাক্ত করবার সুযোগ বাড়তো। কেননা, আদিম সাম্যসমাজেরও একটা সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে—বন্য-দশার মধ্য-স্তর থেকে শুরু করে বর্বর-দশার মধ্য-স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত সেই ইতিহাস। তেমনি, আধুনিক দাম্পত্য-জীবনের আগে পর্যন্ত যে-নরনারীসম্পর্ক তার মধ্যেও রূপান্তর ঘটেছে(১৩৬)। তাই প্রাচীনকালের কোনো মানবদলের মধ্যে প্রচলিত নরনারী-সম্পর্কের স্পষ্টতর বর্ণনা পাওয়া গেলে তারই উপর নির্ভর করে অনুমান করবার সুযোগ থাকে, বর্ণিত মানবদল আদিম-সমাজের কোন পর্যায়ে বাস কতো(১৩৭)। কিন্তু আমাদের দেশের প্রাচীন পুঁথিপত্র থেকে অতোখানি খুঁটিয়ে অনুমান করবার সুযোগ সত্যিই পাওয়া যায় না। তার কারণ, এই পুঁথিগুলির সংবাদদাতাদের উদ্দেশ্য প্রাচীন সমাজ সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সরবরাহ করা নয়, তার বদলে ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রচার। ফলে, তথ্যের দিক থেকে প্রায়ই তাঁদের বর্ণনা অস্পষ্ট ও পর্যাপ্ত—মোটের উপর শুধু এইটুকুই বোঝা যায় যে, বর্ণিত মানুষগুলির মধ্যে এক-বিবাহ বা আধুনিক দাম্পত্য-সম্পর্কের পরিচয় নেই। আমাদের মূল যুক্তির পক্ষে অবশ্য আপাতত এই তথ্যটুকুই পর্যাপ্ত বলে স্বীকৃত হতে পারে। কেননা, এর থেকে যদিও অনুমান করা যায় না যে, বর্ণিত মানবদল প্রাগ-বিভক্ত সমাজের ঠিক কোন পর্যায়ে বাস করতো তবুও একথা অনুমান করবার সুযোগ থাকে যে, তারা প্রাগ-বিভক্ত সমাজের কোনো-এক স্তরে জীবন যাপন করতো। সুখের বিষয়, এ-ক্ষেত্রে মহাভারতের ওই বর্ণনার মধ্যেই আরো একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত থেকে গিয়েছে। ইঙ্গিতটি হলো, বাহীকদের মধ্যে প্রচলিত উত্তরাধিকার-সূত্র : তস্মাত্তেষাং ভাগহরা ভাগিনেয়া ন সূনবঃ—তাদের মধ্যে পুত্রেরা ধনাধিকারী না হয়ে ভাগিনেয়রাই ধনাধিকারী হয়। এই উত্তরাধিকার-সূত্রকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে টীকাকার নীলকণ্ঠ কী রকম কাল্পনিক কথা বলছেন তার নমুনা আমরা আগেই দেখেছি (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, উপসংহার অধ্যায়)। এ-জাতীয় উদ্ভট কথা তিনি কল্পনা করেছেন, তার কারণ প্রাচীন সমাজ-সংক্রান্ত সাধারণ তথ্যের উপর নির্ভর না করেই তিনি এই উত্তরাধিকার সূত্রটিকে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করেছেন। অথচ, প্রাচীন সমাজ-সংক্রান্ত তথ্যের দিক থেকে এই উত্তরাধিকার-সূত্রে মাতৃ-প্রধান সমাজের চিহ্ন থেকে গিয়েছে। আজো আমাদের দেশের মাতৃপ্রধান অঞ্চলগুলিতে(১৩৮) এ-জাতীয় উত্তরাধিকার ব্যবস্থা টিকে থাকতে দেখা যায়। পূর্ণাঙ্গ মাতৃ-প্রধান-সমাজে উত্তরাধিকারসূত্র ছিলো মায়ের দিক থেকে মেয়ের দিকে। এই ব্যবস্থারই কিছুটা রদবদল হয়ে মামার দিক(১৩৯) থেকে ভাগনের দিকে উত্তরাধিকারসূত্র প্রবর্তিত হলো। তারপর, শেষ পর্যন্ত মাতৃ-প্রধান সমাজ সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যাবার পর, যখন পূর্ণ পিতৃ-প্রধানসমাজ দেখা দিলো তখন উত্তরাধিকারসূত্র হলো পিতা থেকে পুত্রের দিকে। মাতুল থেকে ভাগিনেয়র দিকে উত্তরাধিকারসূত্র যতোদিন বর্তমান ততোদিক পর্যন্ত সমাজ-সংগঠনে মাতৃ-প্রাধ্যান্যের লক্ষণ রয়েছে বলে অনুমান করা যায়। মাতৃ-প্রধান সমাজ ঠিক কী ও কেন—এ-প্রশ্ন নিয়ে একটু পরেই দীর্ঘতর আলোচনা তোলা যাবে। আপাতত এ-বিষয়ে অধ্যাপক জর্জ টমসনের(১৪০) নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত আমাদের মূল যুক্তির পক্ষে প্রাসঙ্গিক হবে :

…the social dominance of the  female sex tend to go with the survival of common ownership.
অর্থাৎ, নারীজাতির সামাজিক প্রতিপত্তির সঙ্গে যৌথ-সম্পত্তিত যোগাযোগ আছে।

মহাভারত-বর্ণিত ওই উত্তরাধিকার-সূত্রে যদি নারীজাতির সামাজিক প্রতিপত্তির স্বাক্ষর,–বা অন্তত স্পষ্ট স্বারক,–থাকে তাহলে তারই মধ্যে যৌথজীবনের ইঙ্গিত থেকে গিয়েছে একথা অনুমান করবার অবকাশ আছে না কি?

আমাদের মূল যুক্তির পক্ষে এই যৌথ-জীবনের ইঙ্গিতটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, গণ-সংক্রান্ত আরো কয়েকটি শব্দের মধ্যে যেখানে ওই যৌথ-জীবনের ইঙ্গিতটি স্পষ্ট সেই শব্দগুলির উল্লেখ এখানে প্রাসঙ্গিক হবে। গণদ্রব্য(১৪১) বলতে বোঝায়, সাধারণের দ্রব্য—যে দ্রব্যের স্বামী অনেকে এবং একত্রিতভাবে। গণচক্রক(১৪২) বলতে বোঝায় একত্র ভোজন। গণান্ন(১৪৩) বলতে বোঝায় বহুস্বামীক অন্ন—যাতে অনেকের সত্ত্ব আছে। অবশ্যই, মনু যে-হেতু গণজীবনকে সুনজরে দেখেননি সেই হেতুই তাঁর কাছে এই গণান্ন নিন্দনীয়(১৪৪) : গণান্নং গণিকান্নঞ্চ লোকেভ্যঃ পরিকৃন্ততি—গণান্ন ও গণিকান্ন ভোজন করলে তপস্যাসিদ্ধ স্বর্গাদিলোক থেকে বিচ্যুত হতে হয়। ভ্রাতৃবর্গ অথবা বন্ধুবর্গের অনুষ্ঠেয় মরুৎস্তোম নামের যজ্ঞকে কাত্যায়নের শৌতসূত্রে গণযজ্ঞ(১৪৫) বলা হয়েছে। গণবন্ধন শব্দের তাৎপর্য ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই জাতীয় শব্দগুলির মধ্যে থেকে গণ-এর যৌথজীবনবাচকতাই ফুটে ওঠে।

—————————
১২৭. পাণিনি ৫.৫.১১৪।
১২৮. মহাভারত (কালীপ্রসন্ন সিংহ) ১১১৫-৭।
১২৯. K. P. Jayaswal op. cit 1:36.
১৩০. Ibid. 1:38.
১৩১. H. L. Morgan AS 393.
১৩২. F. Engels OFPPS 257ff.
১৩৩. H. L. Morgan AS 393ff.
১৩৪. এই কারণে অধিকাংশ লেখকই ‘tribe’ শব্দটিকে প্রায় নির্বিচারে ব্যবহার করে থাকেন।
১৩৫. G. Thomson SAGS ch. Iii.
১৩৬. H. L. Morgan AS Part III.
১৩৭. যদিও অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন যে বিবাহ-সম্পর্ক পরিবর্তিত হতে তুলনায় বেশি সময় লাগতে পারে; তাই এ-অনুমান যন্ত্রচালিতের মতো করা সঙ্গত নয়।
১৩৮. উত্তরে খাসি এবং দক্ষিণে নায়ারদের দৃষ্টান্ত উল্লেখযোগ্য। O. R. Ehrenfels MI দ্রষ্টব্য।
১৩৯. G. Thomson SAGS 155.
১৪০. Ibid. 71-2.
১৪১. বিশ্বকোষ ৫:১৯৮।
১৪২. ঐ।
১৪৩. ঐ ৫:২০০।
১৪৪. মনু ৪.২১৯।
১৪৫. কাত্যায়ন ২২.১১.২ cf. বিশ্বকোষ ৫:২০০

১৩. ব্রাত্য মানে কী

বলাই বাহুল্য, পুরোনো পুঁথিপত্রে গণ-সংক্রান্ত যে-অজস্র তথ্য পাওয়া যায় তার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ আমাদের পক্ষে বর্তমানে সম্ভব হবে না—বিশেষ করে এই কারণে নয় যে তাহলে আমাদের মূল যুক্তি থেকে বহুদূরে বিক্ষিপ্ত হবার ভয় থাকে। তাই এখানে আমরা আমাদের মূল যুক্তির দিকে নজর রেখেই গণ সম্বন্ধে আরো কিছু নির্বাচিত তথ্যর আলোচনা করবো। আমাদের মূল যুক্তি হলো, গণ বলতে প্রাক-বিভক্ত যৌথ-সমাজকে বোঝানো হয়েছে। পৃথিবীর অন্যন্য সমস্ত মানবদলের মতোই বৈদিক মানুষেরাও এককালে এই প্রাক-বিভক্ত যৌথ-সমাজেই জীবন যাপন করতেন। তাই তাঁদের সাহিত্যের প্রাচীনতর পর্যায়গুলিতে গণ বা গণপতি সম্বন্ধে ঘৃণার ভাব নেই। কিন্তু উত্তরকালে রাষ্ট্রশক্তির মুখপাত্ররা বৈদিক ঐতিহ্যের গরিমা দাবি করলেও গণসমাজকে—এবং অতএব গণপতিকেও—ঘৃণার চোখেই দেখতে শিখেছিলেন : মানব-গৃহ্যসূত্র বা যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতিতে গণপতি বা বিনায়কের বিরুদ্ধে যে-বিষোদগার তার সঙ্গে মহাভারতের সংবাদদাতাদের মুখে বাহীক-প্রমুখদের সম্বন্ধে ওই তীব্র ঘৃণার সম্পর্ক রয়েছে। ভারতবর্ষের জমিতে যে এইরকম ঘটনা ঘটেছে তার কারণ, ভারতবর্ষ এতোটুকু দেশ নয় এবং এখানে পুরো দেশ জুড়ে একই তালে সব মানুষের সমাজজীবন সমান পরিবর্তন দেখা দেয়নি। তাই এদেশে রাষ্ট্রশক্তির পাশাপাশিই টিকে থেকেছে আদিম সাম্যসমাজ।

গণেশকে অনুসরণ করে গণসমাজ-সংক্রান্ত আমরা যে-ইতিহাসটার ইঙ্গিত পাই তারই অনুরূপ ইতিহাস পাওয়া যায় ব্রাত্য শব্দটির তাৎপর্য বিচার করলে। উত্তরযুগে যাঁরা বৈদিক ঐতিহ্যের বাহক বলে নিজেদের পরিচয় দেবার চেষ্টা করলেন, তাঁদের মধ্যে শুধুই যে গণ বা গণপতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষের ভাব ফুটে উঠলো তাই নয়, ব্রাত্য সম্বন্ধেও। তেমনি বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীনতর পর্যায়ে শুধুই গণ বা গণপতির গৌরবোজ্জল চিত্র নয়, ব্রাত্যেরও। এবং ব্রাত্যের এই ইতিহাসটিকে বিশ্লেষণ করার বিশেষ প্রয়োজন আছে; কেননা, আধুনিক পণ্ডিতমহলে ব্রাত্য শব্দটি নিয়ে নানা রকম ভুল ধারণার প্রচলন দেখা যায়।

বাহীকদের বর্ণনায় মহাভারতের যে-অংশের তর্জমা উদ্ধৃতি করেছি তাতে রয়েছে, ‘দেবগণ সেই ব্রতবিহীন দুরাচারদিগের অন্ন ভোজন করেন না’। প্রশ্ন হলো, ব্রতবিহীন শব্দটি এলো কোথা থেকে? মূলে আছে, ব্রাত্যনাম্‌ দাসমীয়ানাম্‌ অন্নম্‌ দেবাঃ ন ভুঞ্জতে (১৪৬)। স্পষ্টই, ওই ব্রাত্যানাম্‌ শব্দটিকে ব্রতবিহীন বলে তর্জমা করা হয়েছে। এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, আধুনিক কালে ব্রাত্য শব্দটির ওই রকমই একটা অর্থ করবার চেষ্টা করা হয়। এবং এ-চেষ্টা অকারণ বা অমূলক নয়। কেননা, মনু, বোধায়ন (১৪৭) প্রমুখেরা ব্রাত্য শব্দের অর্থ করেছেন সাবিত্রীপতিত। মনু (১৪৮) বলছেন, সাবিত্রীপতিতা ব্রাত্যা ভবন্ত্যার্য্যবিগর্হিতাঃ—ঠিক বয়সে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের সন্তানদের উপনয়ন না হলে তারা আর্যবিগর্হিত হয়, তাদেরই ব্রাত্য বলে। অতএব, মনুর মত অনুসরণ করে বলা হয়েছে (১৪৯) “সাবিত্রীপতিত উপনয়নাদি সংস্কারবিহীন ব্যক্তিই ব্রাত্য নামে অভিহিত। ব্রাত্যের যজ্ঞাদি বেদবিহিত ক্রিয়ায় অধিকার নাই—ব্রাত্য ব্যবহারযোগ্যও নহে, ইহাই এক শ্রেণীর শাস্ত্রসম্মত সিদ্ধান্ত।” এই রকমই অর্থের উপর নির্ভর করে আধুনিক পণ্ডিতেরা (১৫০) ব্রাত্য বলতে “ব্রত থেকে পতিত” অর্থ করছেন। “কিন্তু”, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৫১) দেখাচ্ছেন, “ব্রত হইতে পতিত এইরূপ অর্থে ব্রত শব্দের উত্তর কোন রূপ তদ্বিত প্রত্যয় করিয়া ব্রাত্য শব্দ নিষ্পন্ন হইতে পারে তাহার সূত্র পণিনির ব্যাকরণে নাই।” শাস্ত্রী মহাশয় শুধু এইটুকু কথাই বললেন, কিন্তু পাণিনির ব্যাকরণে এই ব্রাত্য শব্দের নিষ্পত্তি ঠিক কী ভাবে করা হয়েছে তার উল্লেখ তিনি করলেন না। সেইদিক থেকে দেখা যায়, ব্রাত্য শব্দের নিষ্পত্তি ব্রত শব্দ থেকে নয়। কেননা, পাণিনি বলছেন (১৫২), ব্রাত শব্দের উত্তর স্বার্থে এবং ঞং প্রত্যয় করে ব্রাত্য শব্দ নিষ্পন্ন হয়। তাই, ব্রাত এবং ব্রাত্য।

যদি ব্রাত শব্দের উত্তর স্বার্থে ঞং প্রত্যয় করে ব্রাত্য শব্দ নিষ্পন্ন হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চয়ই ব্রাত্য বলতে ব্যতহীন অর্থ করবার অবকাশ থাকে না। আমরা আগেই দেখেছি, মহামহোপাধ্যায় পি. ভি. কানে কাত্যায়নের শ্রৌতসূত্রের নজির দেখিয়ে বলছেন, গণ পূগ ব্রাত শ্রেণী প্রভৃতি শব্দগুলির একই অর্থ। অর্থটা হলো, সমূহ। পাণিনির ভাষ্যকারদের মধ্যেও ব্রাত শব্দের তাৎপর্য-নির্ণয় প্রসঙ্গে দলবাচকত্বের উপরই ঝোঁকটা সবচেয়ে বেশি। এবং এই ব্যাকরণশাস্ত্রের ঢের আগে, ঋগ্বেদে (১৫৩), গণ ও ব্রাত শব্দ সমানার্থে,—বা অন্তত প্রায়-সমানার্থে,—ব্যবহৃত হয়েছে:

ষো বঃ সেনানী মহতঃ গণস্য
রাজা ব্রাতস্য প্রথমঃ বভূব।
তস্মৈ কৃণোমি ন ধনা রুণধ্নি
দশাহং প্রাচীন্তঋতং বদামি।।

অর্থাৎ (খুব সম্ভব অক্ষর ঘুঁটিগুলিকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে!) মহৎ গণের মধ্যে যিনি সেনানী (নায়ক), ব্রাতর মধ্যে যিনি প্রথম রাজা, আমি তাঁকে প্রণাম করি। দশ-আঙুল তুলে আমি দেখাচ্ছি, আমি ধন গোপন করছি না; আমি সত্য (ঋত) কথা বলছি।

বলাই বাহুল্য, এই ঋকটির অর্থ অনেকাংশে দুর্বোধ্য; পরবর্তী পরিচ্ছেদে এর আলোচনায় ফেরবার চেষ্টা করবো। বর্তমানে আমাদের যুক্তির পক্ষে শুধু এইটুকুই প্রাসঙ্গিক যে, এখানে গণ ও ব্রাত শব্দ প্রায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই ভাষ্যে সায়ণ বলছেন, গণব্রাতয়োরল্পো ভেদঃ—গণ এবং ব্রাত-র মধ্যে বড়ো একটা তফাত নেই।

ব্রাত এবং ব্রাত্যঃ। গণব্রাতয়োরল্পো ভেদঃ। অথচ মনু প্রমুখের রচনায় এই ব্রাত্যই পতিতসূচক হয়ে দাঁড়ালো। তার কারণ কি এই নয় যে, উত্তরযুগে মনু প্রমুখের মতো শ্রেণীশাসনের প্রচারকেরা গণসমাজকে ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করলেন? অথচ, যে-বৈদিক ঐতিহ্যের গরিমায় তাঁরা নিজেরা অতোখানি আত্মপ্রসাদ পেতেন সেই বৈদিক সাহিত্যেই ব্রাত্য সম্বন্ধে মনোভাবটা একেবারে বিপরীত। আর যদি তা হয় তাহলে কি অনুমান করবার অবকাশ থাকে না যে, বৈদিক সাহিত্য সমাজ-বিকাশের যে-স্তরের স্মৃতি বহন করছে সে-স্তরে শ্রেণীবিভাগ দেখা দেয়নি?

অথর্ববেদের পঞ্চদশ কাণ্ডটি কেবল ব্রাত্য মহিমাতে পরিপূর্ণ। ব্রাত্য বৈদিক-কার্য্যে অধিকারী, ব্রাত্য মহানুভব, ব্রাত্য দেবপ্রিয়, ব্রাত্য ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় প্রভৃতির পূজ্য, অধিক কথা কি, ব্রাত্য স্বয়ং দেবাধিদেব। ব্রাত্য যেখানে গমন করেন, বিশ্বজগৎ ও বিশ্বদেবগণও সেইখানে তাঁহার অনুগমন করেন। তিনি যেখানে অবস্থান করেন, বিশ্বদেবগণ সেই স্থানে অবস্থান করেন, তিনি তথা হইতে গমন করিলে তাঁহারাও তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে গমন করেন। সুতরাং তিনি যখন সেখানে গমন করেন, তখন যে রাজার ন্যায় গমন করিয়া থাকেন।

সমগ্র পঞ্চদশ কাণ্ডেই এইরূপ কেবল ব্রাত্যমহিমা দেখিতে পাওয়া যায়। অথর্ববেদের পঞ্চদশ কাণ্ডোক্ত ব্রাত্য বাচ্যবিষয়ে ধর্মসংহিতোক্ত ব্রাত্য হইতে সম্যক স্বতন্ত্র। এই ব্রাত্যসকল বৈদিক পুরুষসূক্তের পুরুষ এবং পৌরাণিকগণের বিরাট পুরুষ বলিয়াই ধর্তব্য। (১৫৪)

অগত্যা, ভাষ্যরচনার সময় সায়ণাচার্যকে বলতে হচ্ছে যে, অথর্ববেদের এই বর্ণনা সমস্ত ব্রাত্যের উপরই নির্বিচারে প্রযোজ্য নয়—তার বদলে এই বর্ণনা ব্রাত্যদের মধ্যে শুধুমাত্র সাধু ও শক্তিশালীদের উপরই প্রযোজ্য (১৫৫)। সায়ণের এই ব্যাখ্যা যে কৃত্রিম তা আধুনিক পণ্ডিতের চোখে এড়িয়ে যায়নি (১৫৬)। কিন্তু এ-বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে, উত্তরযুগে ব্রাত্য শব্দের যে-পরিণতি দাঁড়িয়েছে তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রাচীন যুগের রচনার ভাষ্য করতে হলে এই জাতীয় কৃত্রিম উক্তি না করে উপায় নেই। আধুনিক পণ্ডিত (১৫৭) বলছেন :

কী প্রকারে ব্রাত্য শব্দের এইরূপ অর্থাবনতি সংগঠিত হইল, পরব্রহ্মের বাচক শব্দটি কী প্রকারে মানবসমাজের অসম্মানিত জনের অর্থবোধক রূপে ব্যবহৃত হইল, তাহারও অনুসন্ধান প্রয়োজন।

আমাদের মন্তব্য হলো, যতোদিন না সমাজ-বিজ্ঞানের দিক থেকে এই অনুসন্ধান করা হবে ততোদিন পর্যন্ত সমস্যাটির প্রকৃত সমাধান সুদূরপরাহত হয়ে থাকবে।

——————-
১৪৬. কর্ণপর্ব ৪৪.৪৫।
১৪৭. P. V. Kane HD 2:376.
১৪৮. মনু ২.৩৯।
১৪৯. বিশ্বকোষ ২০:১০১।
১৫০. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী : ব্রাত্য। ‘প্রাচী’-অগ্রাহয়ণ ১৩৩০।
১৫১. ঐ।
১৫২. পাণিনি ৫.৩.১১৩।
১৫৩. ঋগ্বেদ ১০.৩৪.১২।
১৫৪. বিশ্বকোষ ১০:১০১।
১৫৫. P. V. Kane HD 2:386.
১৫৬. Ibid.
১৫৭. বিশ্বকোষ ১০:১০৩।

১৪. রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব

সমাজ-বিজ্ঞান অনুসারে, ওই প্রাগ-বিভক্ত গণসমাজের ধ্বংসস্তূপের উপরই রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হয়েছে। কিন্তু এ-বিষয়ে আমাদের দেশের প্রাচীন পুঁথিপত্রের মধ্যে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় কি? যায়। কেবল মনে রাখতে হবে, প্রাচীন পুঁথিপত্রের এই নজিরগুলিকে ঠিকমতো বুঝতে হলে মানবসমাজের ক্রমবিকাশে-সংক্রান্ত যে-তথ্যকে সাধারণ সত্য হিসাবে জানতে পারা গিয়েছে তারই আলোয় বোঝবার চেষ্টা করতে হবে।
মহাভারতের(১৫৮) এক জায়গায় ভীষ্ম বলছেন:

সর্বপ্রথমে পৃথিবীতে রাজ্য, রাজা, দণ্ড ও দণ্ডার্হ ব্যক্তি কিছুই ছিল না। মানুষেরা একমাত্র ধর্ম অবলম্বন পূর্বক পরস্পরকে রক্ষা করিত। মানবগণ এইরূপে কিছুদিন কালযাপন করিয়া পরিশেষে পরস্পরের রক্ষণাবেক্ষণ নিতান্ত কষ্টকর বোধ করিতে লাগিল। ঐ সময়ে মোহ তাহাদিগের মনোমন্দিরে প্রবিষ্ট হইল। মোহের আবির্ভাব বশতঃ ক্রমশঃ জ্ঞান ও ধর্মের লোপ হইতে লাগিল এবং মানবগণ ক্রমে ক্রমে লোভপরতন্ত্র, পরধনগ্রহণতৎপর, কামপরায়ণ, বিষয়াসক্ত ও কার্য্যাকার্য্য-বিবেকশূন্য হইয়া উঠিল।

ভীষ্ম বলে চলেছেন (১৫৯), এই অবস্থার হাত থেকে মানুষকে মুক্তি দেবার জন্যে সৃষ্টি হলো রাজা, রাজধর্ম, রাষ্ট্রনীতি, ইত্যাদি।

তার মানে, প্রাগ-বিভক্ত সাম্য-সম্পর্কের ধ্বংসস্তূপেরই ওপর যে রাষ্ট্র-যন্ত্র দেখা দিয়েছে এ-কথা ভীষ্মের উক্তিতে একটুও অস্পষ্ট নয়। অবশ্যই। এখানে তিনি এমন কথা নিশ্চয়ই বলছেন যা যে, ওই প্রাগ-রাষ্ট্র অমাজ-সংগঠনেরই নাম হলো গণ। কিন্তু ১০৭ অধ্যায়ে গণ-সংগঠন কেমন করে ধ্বংস হয় তার বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি যেহেতু একই কারণের উল্লেখ করছেন, সেই হেতু অনুমানের অবকাশ থাকে বই কি যে, ৫৭ অধ্যায়ের ওই প্রাগ-রাষ্ট্র সংগঠনের নামই গণ-সংগঠন। দুঃখের বিষয় ১০৭ অধ্যায়টি তর্জমা কালীপ্রসন্ন সিংহের সংস্করণে প্রায় একেবারেই মূল্যহীন। গণ শব্দের বদলে শূর শব্দ ব্যবহারে করে সেখানে মৌলিক ভ্রান্তির সৃষ্টি করা হয়েছে।
ভীষ্ম বলছেন(১৬০):

গণানাঞ্চ কুলানাঞ্চ রাজ্ঞাং ভরতসপ্তম।
বৈরসন্দীপনা বেতৌ লোভামর্ষৌ নরাধিপ।।
লোভমেকো হি বৃণুতে ততোহমর্ষমণস্তরম্‌।
তৌ ক্ষয়ব্যয়সংযুক্তাবন্যোন্যশ্চ বিনাশিনৌ।।

ইত্যাদি ইত্যাদি।

অবশ্যই, এখানে ভীষ্মের সামনে সমস্যাটা একটু অন্য রকমের : উদীয়মান রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে আশপাশের গণ-সঙ্ঘগুলিকে কীভাবে তাঁবে রাখা যায় তারই সমস্যা। তাই গণের মধ্যে ভেদসৃষ্টির কৌশল নিয়ে আলোচনাও। কিন্তু, এ-আলোচনা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে অনেক ধারালো আর নির্লজ্জও। তাই কৌটিল্য-প্রসঙ্গেই সে-কথা তোলা যাবে।

আপাতত যে আলোচনা হচ্ছিলো : প্রাগ-বিভক্ত সমাজের ধ্বংসস্তূপের উপরই কীভাবে রাষ্ট্রশক্তি দেখা দিলো তার স্মৃতি যে শুধুই মহাভারতের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে তাই নয়, বৌদ্ধ সাহিত্যেও এর নজির রয়েছে। নমুনা, মহাবস্তু অবদান। বরং, মহাভারতের চেয়ে এখানের বর্ণনাটি অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক; কেননা, বাস্তবনিষ্ঠ। মহাভারতে শুধুমাত্র লোভ। ব্যক্তিগত সম্পত্তি ইত্যাদির উল্লেখ করা হয়েছে; কিন্তু মহাবস্তু অবদান দেখাচ্ছে যে, সবকিছুর মূলে আসল কারণ হলো উৎপাদন-পদ্ধতির উন্নতি। কৃষি ব্যবস্থা শেখবার পর দরকার পড়লো দলের সবাইকার মধ্যে জমি আলাদা-আলাদাভাবে বিলি করে দেয়ার ব্যবস্থা। আর শেষ পর্যন্ত এই ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিয়ে নানান সমস্যা সমাধানের জন্যেই রাষ্ট্রশক্তির উদ্ভব। অবশ্যই মহাবস্তু অবদানের ভাষাটা পুরাণ-ঘেঁষা, তবুও কিন্তু অস্পষ্ট নয়। সেই ভাষায় বর্ণনাটি কী রকমের তাই দেখা যাক।

আগেকার যৌথ-জীবন কী রকম ছিলো? মহাবস্তু অবদানে(১৬১) বলা হচ্ছে, “সুখনিবাসে থাকিয়া তাঁহারা প্রীতিভক্ষণ করিয়া জীবনযাত্রা নির্বাহ করেন। তাঁহারা যাহা করেন সকলই ধর্ম।” কিন্তু চাষবাসের কায়দাকানুন শেখবার পর, দলের মধ্যে জমি বিলি হবার পর, দেখা দিলো চুরি, মিথ্যে কথা, মারামারি কাটাকাটি। “তখন সকলে মিলিয়া পরামর্শ করিতে লাগিল: আইস, আমরা একজন বলমান বুদ্ধিমান, সকলের মন যোগাইয়া চলে,– এমন লোককে আমাদের ক্ষেত রাখিবার জন্য নিযুক্ত করি। তাহাকে আমরা সকলে ফসলের অংশ দিব। সে অপরাধের দণ্ড দিবে, ভালো লোককে রক্ষা করিবে আর আমাদের ভাগমতো ফলস দেওয়াইয়া দিবে। তাহারা একজন লোক বাছিয়া লইল। তাঁহাকে তাহারা ফসলের ছয়ভাগের এক ভাগ দিতে রাজী হইল।…এইরূপে তেজোময় জীব অনন্ত আকাশে ঘুরিয়া বেড়াইতে বেড়াইতে ক্রমে লোভ পড়িয়া মাটিতে মাটি হইয়া গেলো। শেষে তাহাদের ক্ষেত আগলাইবার জন্যে একজন ক্ষেতওয়ালার দরকার হইল। সেই ক্ষেতওয়ালাই রাজা, ফসলের ছয় ভাগের এক ভাগই তাহার মাহিনা”(১৬২)।

এইখানে অবশ্যই অনেকগুলি কথা মনে রাখতে হবে। প্রথমত, বৌদ্ধ ঐতিহ্যে গণতন্ত্রের প্রভাব অনেক প্রবল, তাই রাজাকে যে-চোখে দেখা হয়েছে তারও বৈশিষ্ট্য আছে। দ্বিতীয়ত, মহাবস্তু অবদানের বর্ণনাটাই পুরাণ-ঘেঁষা, তায় উদ্ধৃতিটা মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশায়ের লেখা থেকে, তিনি কিনা ঘরোয়া গল্পের ঢং-এ মহাবস্তু অবদানের কথাটা নতুন করে বলছেন। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য তো আর এই উপাখ্যান থেকে সমাজ-বিজ্ঞানে হাতেখড়ি নয়। তার বদলে শুধু এইটুকুই দেখা যে, সমাজ-বিজ্ঞানের একটি মূল সিদ্ধান্ত হিসেবে এঙ্গেল্‌স্‌ ও মর্গান যে দেখাচ্ছেন প্রাগ-বিভক্ত সমাজের ধ্বংসস্তূপের উপরই দেখা দিয়েছে রাষ্ট্রশক্তি, প্রাচীনদের লেখা ঠিকমতো বুঝতে পারলে এই সিদ্ধান্তের সমর্থন খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়।

জয়সওয়াল প্রমুখ পণ্ডিতেরা নিশ্চয়ই তর্ক করে বলবেন, মহাভারত কিংবা মহাবস্তু অবদানে যে রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্মকথা বর্ণিত হচ্ছে তা রাজতন্ত্র। তাই উদ্ধৃতগুলি এখানে অবান্তর। কেননা, রাজতন্ত্রের জন্মবৃত্তান্ত মোটের ওপর এই রকম, একথা মানলেও উদ্ধৃতির বর্ণনাকে রাষ্ট্রমাত্রের জন্মবৃত্তান্ত বলে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা চলবে না। অপরপক্ষে, ওঁরা বলবেন গণ বলে সংগঠনের মধ্যে যদি সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিচয় পাওয়া যায় তাহলে এই গণকে রাষ্ট্রব্যবস্থা বলে অস্বীকার করবার সুযোগ কোথায়? উত্তরে, ওঁদের রচনা থেকে যেটা কিনা একমাত্র যুক্তি হিসেবে উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছি, সেটা হলো গণ-এর মধ্যে নিখুঁত গণতন্ত্রের আয়োজন। এইটেই হলো ওঁদের তরফের আসল কথা আর এইখানেই ওঁদের দৃষ্টিভঙ্গির আসল সংকীর্ণতাও। কেননা, ওঁদের মূল কথা হলো, গণকে কোনো-না-কোনো রকমের রাষ্ট্রব্যবস্থা হতেই হবে, তাই এ রাষ্ট্র যদি রাজতন্ত্র না হয়, যদি এর মধ্যে পাওয়া যায় গণতন্ত্রের পরিচয়, তাহলে একে সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছাড়া আর কী বলা সম্ভব? অথচ, সমাজ-বিজ্ঞান অনুসারে, রাষ্ট্রব্যবস্থার আবির্ভাব হবার আগে পর্যন্ত যে সাম্যসমাজ তার শাসন ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের আয়োজন একেবারে ষোলো আনাই। তাই, গণতন্ত্র অতএব সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্র—এমনতরো কথা যুক্তি বিজ্ঞানসম্মত নয়। অবশ্যই, তাই বলে, গণতন্ত্র অতএব প্রাগ্‌-বিভক্ত সমাজ—এমনতরো পালটা যুক্তিও নিশ্চয়ই সমর্থনযোগ্য নয়। আর আমাদের যুক্তি তা নয়ও। গণ বলতে যে প্রাগ্‌-বিভক্ত ট্রাইব্যাল সমাজই বুঝতে হবে তার অন্যান্য প্রমাণ হলো গণের ওই যৌন-সম্পর্ক আর যৌথ-চেতনা।

—————
১৫৮. শান্তিপর্ব ১০৭।
১৫৯. ঐ।
১৬০. ঐ।
১৬১. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী : বৌদ্ধধর্ম ১৪২।
১৬২. ঐ ১৪৫।

১৫. সিদ্ধিদাতার জন্মকথা : গণসমাজ থেকে রাষ্ট্রের উৎপত্তি

তাহলে প্রাচীনদের স্মৃতি থেকে এ-কথা একেবারে মুছে যায়নি যে, এক আদিম অবিভক্ত সমাজের ধ্বংসস্তূপের উপরেই রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব ঘটেছিলো। সেই আদিম সমাজে শাসক-শাসিতে প্রভেদ নেই; রাজা নেই, প্রজা নেই; লোভ নেই, অধর্ম নেই—মানুষের সঙ্গে মানুষের শুধু প্রীতির সম্পর্ক। আমাদের বক্তব্য হলো, এদেশে আদিম সমাজের রূপটি ঠিক কী রকম ছিলো এবং কী ভাবে সে-সমাজ ধ্বংস হয়ে আবির্ভাব হলো রাষ্ট্রশক্তির—এ-বিষয়ে মৌলিক গবেষণার অবকাশ রয়েছে, ভারততত্ত্বে যাঁরা সুপণ্ডিত তাঁদের দৃষ্টি এই সমস্যার দিকে আকৃষ্ট হওয়া প্রয়োজন। গণপতির পদানুসণ করে আমরা এই ইতিহাসের বহিঃরেখার আভাষ পেলাম এবং সাধারণভাবে কয়েকটি কথা মানতে বাধ্য হলাম। প্রথমত, আমাদের প্রাচীন পুঁথিপত্রে এই প্রাগ্‌-বিভক্ত প্রাচীন সমাজের উল্লেখ রয়েছে—গণ, ব্রাত, সংঘ, পূগ, শ্রেণী প্রভৃতি নানান নামে প্রাচীনেরা এই সমাজকে অভিহিত করতে চেয়েছেন। এই আদিম সাম্যসমাজে অবশ্যই ষোলো আনা গণতন্ত্রের আয়োজন; দুঃখের বিষয় আধুনিক ঐতিহাসিকেরা এই গণতন্ত্রের লক্ষণ থেকে আদিম সমাজকে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে সনাক্ত করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে সর্বত্রই এক সঙ্গে এই আদিম সমাজ ভেঙে রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব ঘটেনি। আজো, ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে ওই জাতীয় আদিম সমাজ টিকে রয়েছে : সাঁওতাল বিদ্রোহের বর্ণনাদাতা ইংরেজ লেখক(১৬৩) সাঁওতালদের সম্বন্ধে বলছেন, they republicans and communists in politics—ওরা রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রজাতন্ত্রবাদী ও সাম্যবাদী। উনবিংশ শতাব্দীতেই যদি ওই জাতীয় সমাজ দেশে টিকে থাকে (আজো আছে), তাহলে আজ থেকে প্রায় হাজার দুয়েক বছর আগেকার ভারতবর্ষের রাজনৈতিক মানচিত্রে নিশ্চয়ই ওই আদিম সমাজের—বা গণ-সমাজের পরিচয় বেশি হবার কথা। অতএব, অনুমান করা যায়, প্রাচীন ভারতের এখানে-ওখানে রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হবার পর তারই আশে পাশে গণসমাজও থেকে গিয়েছিলো। গণপতির পদাঙ্ক অনুসরণ করেই আমরা দেখতে পেলাম, রাষ্ট্রশক্তির মুখপাত্ররা এই গণসমাজকে খুব সুনজরে দেখেননি। এই কারণেই, প্রচীন আইনের পুঁথিতে গণপতি দেখা দিয়েছেন মূর্তিমান বিঘ্ন বা বিঘ্নরাজ হিসেবে।

অবশ্যই, গণপতির ইতিহাসে এর চেয়েও চিত্তাকর্ষক পর্যায় হলো ওই বিঘ্নরাজের পক্ষে সিদ্ধিদাতার পর্যবসিত হওয়া। এবং আমরা বলতে চাইছি, আধুনিক ঐতিহাসিকেরা যদিও গণপতির ইতিহাসের এই পর্যায়টির দিকে ভালো করে নজর দেননি তবুও এমন হওয়া অসম্ভব নয় যে, এই পর্যায়টির দিকে ভালো করে বিশ্লেষণ করলে পর ভারতীয় ইতিহাসের একটি বিখ্যাত রাষ্ট্রের আবির্ভাব কাহিনী উদ্ধার করা যাবে। অবশ্যই, ব্যক্তিগতভাবে আমার পক্ষে উক্ত বিশ্লেষণের যোগ্যতা নেই। কিন্তু দক্ষতর বিদ্বানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার আশায় আমি এখানে কয়েকটি কথার অবতারণা করতে চাই।

প্রথমত, ঐতিহাসিক বিবর্তনের কয়েকটি মূল নিয়ম আছে। এ-কথা না মানলে ইতিহাসকে বিজ্ঞানের মর্যাদা দেওয়া দুষ্কর(১৬৪)। কিন্তু এ-কথা মানতে হলে স্বীকার করতে হবে, অন্যান্য দেশের ইতিহাসের বেলায় যে-ভাবে রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব ঘটেছে আমাদের দেশের ইতিহাসের বেলাতেও সেইভাবেই রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব হওয়াই স্বাভাবিক। তাই অন্যান্য কোনো দেশের বেলায় যদি কোনো সূত্র ধরে রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব-কাহিনী নিয়ে সার্থক গবেষণা হয়ে থাকে তাহলে আমাদের দেশের পুরোনো ইতিহাসের বেলাতেও একই সূত্রে অগ্রসর হয়ে রাষ্ট্রের আবির্ভাব-কাহিনী উদ্ধার করা সম্ভব। কিন্তু দুঃখের বিষয় যদিও বিদেশের ক্ষেত্রে এ-বিষয়ে সত্যিই উচ্চাঙ্গের গবেষণা হয়েছে তবুও এখনো আমাদের ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনুরূপ পথে অগ্রসর হবার উৎসাহ দেখা দেয়নি।

অথচ, আমাদের প্রাচীন পুঁথিপত্রেই এমন ইঙ্গিত রয়েছে যেগুলিকে বিশ্লেষণ করলে অনুরূপ পথে অগ্রসর হবার সুযোগ পাওয়া যায়। প্রথমে এইরকমেরই কিছু ইঙ্গিতের উল্লেখ করবো এবং তারপর আলোচনা করবো বিঘ্নরাজ থেকে সিদ্ধিদাতায় পর্যবসিত হবার পেছনে রাষ্ট্রশক্তির আবির্ভাব-কাহিনী সংক্রান্ত কী তথ্য পাওয়া যায়।

ধরা যাক মৌর্য রাষ্ট্রের কথা। এ-রাষ্ট্রের উৎপত্তি কী করে হলো? সাধারণত আমরা এ-বিষয়ে মূরা-নাম্নী দাসী পুত্রের কাহিনী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকি। অথচ, আধুনিক গবেষণার আলোয় ইতিহাসের একটি সাধারণ নিয়ম হিসেবে আমরা আজ এ-কথা মানতে বাধ্য যে, ট্রাইব্যাল-সমাজ ভেঙেই রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়। এই ট্রাইব্যাল-সমাজকে চেনবার একটি উপায় হলো জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকে সমাজর নাম-করণ পদ্ধতি—অর্থাৎ, টোটেমবিশ্বাস মূলক নাম। এই দুটি কথা মনে রাখলে মৌর্য-রাষ্ট্রের আবির্ভাব-ইতিহাস হিসেবে মূরা নাম্নী দাসীর কাহিনী নিশ্চয়ই পর্যাপ্ত হবে না। কেননা, অপরপক্ষে অন্যান্য তথ্য রয়েছে, এবং সেই তথ্যগুলির তাৎপর্য ইতিহাস-বিজ্ঞানের দিক থেকে মূল্যবান। প্রথমত, আধুনিক ঐতিহাসিকেরা জানেন যে, মৌর্য অশোক তাঁর রাজ্যে ময়ুর-বধ নিষিদ্ধ করেছিলেন(১৬৫)। এই ঘটনাটির তাৎপর্য ঠিক কী? এ-কি শুধুই অশোকের পক্ষে জীবে দয়ার পরিচয়? তা হতে পারতো, যদি রাজাজ্ঞায় নির্বিচারে সমস্ত রকম প্রাণীবধই নিষিদ্ধ হতো। কিন্তু নিষেধটা যেতেতু নির্দিষ্ট এক প্রাণী সম্বন্ধেই সেইহেতু অনুমান করবার সুযোগ থেকে যে এর পিছনে কোনোরকম টোটেম-বিশ্বাসের পরিচয় থাকতে পারে। কেননা, টোটেম বিশ্বাসের সঙ্গে টাবু-র বা নিষেধাজ্ঞার যোগাযোগ রয়েছে। এই টাবু প্রধাণত দু-রকম। এক, বিবাহ সংক্রান্ত; দুই, টোটেম-প্রাণীটির হত্যা ও আহার সংক্রান্ত : হরিণ-দলের মানুষ হরিণদলের কাউকে বিয়ে করতে পারবে না, হরিণ-দলের মানুষ হরিণ-হত্যা করতে পারবে না। হরিণ-দলের মানুষ অন্য যে-কোনো রকম প্রাণী হত্যা করতে ও ভক্ষণ করতে পারে, কেবল হরিণ হয়। তাই মৌর্য অশোকের রাজ্যে যদি নির্দিষ্টভাবে ময়ূর-বধ নিষিদ্ধ হয়ে থাকে তাহলে এই নিষেধাজ্ঞাকে ময়ূর-বধ সংক্রান্ত টাবুর স্মারক মনে করবার অবকাশ থাকে না কী? তার মানে এই এই নয় যে, মৌর্য রাজবংশের উৎপত্তি ময়ূর-টোটেম-যুক্ত কোনো ট্রাইব্যাল-সমাজ থেকে হওয়াই সম্ভবপর? এবং ঠিই এই ইঙ্গিতটিই পাওয়া যায় জৈন-পুঁথিতে(১৬৬) :

চন্দ্রবচ্চন্দ্রগুপ্তহপি ব্যবর্দ্ধত দিনে দিনে।
ময়ূর পোষক কুলোৎপলিনী বনলাসকঃ।।
অর্থাৎ, গুপ্ত ছিদ্রযুক্ত তৃণমণ্ডপমধ্যে চন্দ্রসুধাপান করিয়া সন্তানপ্রসূত হয় বলিয়া তাহার নাম হইল চন্দ্রগুপ্ত। ইনি ময়ূরপোষক-কুলোৎপন্ন।

এইদিক থেকে ভেবে দেখলে মনে হয় ময়ূর-টোটেম-যুক্ত কোনো ট্রাইব্যাল-সমাজ থেকে মৌর্যবংশের উৎপত্