সবচেয়ে নীচের পাথরটাতে পা দিয়ে একটা ছোট্ট লাফে বাঘারু নদীর বুকে নামে। এতক্ষণ পাথরের মাথায় যে-প্রকৃতির ভেতর বাঘারু ছিল, তা সম্পূর্ণ বদলে যায়। এখন সামনে ফেনার রাশি, নদীব কল্লোল চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
যে-পাথরটার ওপর থেকে বাঘারু নেমে আসে তার তলায় প্রায় পর-পর একটার পর একটা বড় পাথর। টিলার মত পাথটার সঙ্গে খাজে একটা কেমন আশ্রয়ের মত হয়েছে। বাঘারু সেই খাজটার ভেতর ঢুকে, নিচু হয়ে, আর-এক পাথরের সংযোগের মাঝখানের অবকাশটাতে পাখির পালক দুটো রাখে। ওখানে আরো তিনটি পালক আছে। আর, আছে, বাঘারুর সেই পরনামিয়া পাথর।
এই বার বাঘারু নেমে পড়ে নদীর বুকে, পাথর আর বালির ওপরে, তার বাথানের মাঝখানে। মোঘগুলোর পেছন, পেট, মুখ, শিঙ ছুঁয়ে ছুঁয়ে, এঁকেবেঁকে পথ করে নিতে-নিতে, বাঘারু জলের দিকে যায়। মোষগুলো ফোঁস-ফোঁস শ্বাস ছেড়ে বাঘারুকে জানান দেয়, চিনেছে। ঘাড়গুলো দিক বদলায়, কান আর লেজের ঝাঁপট পড়ে গায়ে পট-পট। পাথরের তলা থেকে জলের কিনারা পর্যন্ত আওয়াজে-আওয়াজে মোষগুলোর জানা হয়ে যায়-বাঘারু উঠেছে। রাতে ফেলা গোবরে বাঘারুর দুই পা ভর্তি। নাড়া-খাওয়া গোবরের গন্ধ শেষ রাতের ভারী বাতাসে লেগে যায় কিন্তু ছড়ায় না, বাঘারুর পায়ে তার সঙ্গে ভেজা বালি। মোষের গা থেকে কিছু হাতে লেপটে যায়। ডায়নার জলের কিনারায় চলে এসে বাঘারু একটু দাঁড়ায়।
জল থাকলেই সে-জায়গাটা একটু পরিষ্কার লাগে। জলে আলো খেলবেই। আর, ডায়নার ফেনা-ওঠা জল ত নিজেই আলো ছড়ায় একরকম। বাঘারু তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখে। আরো নীচের তিস্তাপারের মানুষ সে। ওপরের এমন নদী রোজ দেখা ত তার অভ্যেস নেই। তাই ভুলে-ভুলে যায়। তিস্তা ত ফরেস্টের মত, বা একটা বড় ডাঙার মত, বা একটা আকাশের মত।–সেটা ত ঐঠে থাকি যায়, দেখো কি না দেখো। সেখানে ত অভ্যেস হওয়ার কিছু নেই-তুমিই ত সেই নদীর ভেতর আছো; জানো কি না-জানো। কিন্তু জলে ফেনা তুলে এরকম আওয়াজে ডায়নার ছুটে চলাটা এমনই, মনে হয়, যখন আমি দেখব না, তখন এই দৃশ্যটাও থাকবে না। সকাল হওয়ার আগে, রোজই, বাঘারুকে এমন একটু সময় দিতে হয় ডায়নাকে অভ্যেস করে নিতে, ডায়নার সেই চুটন্ত ফেনরাশির দিকে তাকিয়ে বুঝে নিতে যে ডায়না সারা রাত ধরে এমনই রয়েছে।
বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ঐ কল্লোল ও স্রোত বাঘারুর ধাতস্থ হয়। বাঘারু একটু হাসে–ক্যানং নদীখান, ডাইনাং? ডুবিবার চাহিলে ডুবিবার পারো না, কিন্তু জল চলিবার ধইচছে দিন-আতি, আতি-দিন।
বাঘারু নদীতে নামে। পায়ের গোড়ালি ছাপিয়ে জল ওঠে। স্রোত পা বেয়েও খানিকটা উঠতে চায়! বাঘারু পা-টা জলে ফেলেই স্রোতের টান বুঝতে পারে। বাঘারুর পা-টা পেয়েই স্রোতটা একটু সঙ্কুল হয়ে ওঠে, আওয়াজ একটু বলদায়। জলের সারা রাতের উষ্ণতা বাঘারুর পা বেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে যায়। বাঘারু পা ফেলে। পায়ে লেগে নুড়িগুলো ছিটকে যায়। নদীর মাঝামাঝি একটা চওড়া পাথরের ওপর বাঘারু দাঁড়ায়।
রোজ এই পাথরটাতেই দাঁড়ায় বাঘারু। তার পথ পাথরটাতেই ঘুরে-ঘুরে মুখটা ডায়নার মুখের দিকে ঘোরায়। পাহাড় আর জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে ঠিক যে-জায়য়াটায় ডায়না প্রায় সমকোণে বায়ে ঘুরেছে, পাথরটা ঠিক সেই জায়গায়। স্রোতের উল্টোমুখে দাঁড়ানো বাঘারুর বায়ে এখন সেই ছুঁচলো পাথর, যার ওপর পাখিটা বসেছিল আর ডাইনে, খানিকটা দূরে বাঘারুর পাথর।
জলের ভেতরের এই পাথরটা খুব স্থির নয়। নুড়িপাথরের ওপর আছে–স্রোতের ধাক্কায় সব সময়ই নড়ছে। বাঘারুর মত ওজন নিয়েই নড়ছে। অথচ এতগুলো দিন গেল, রোজ বাঘারু এই পাথরটার ওপর এসে দাঁড়িয়েছে। এর ভেতর একদিন একটা বড় বান গেল ঠিক প্রথম রাত্রিতে। বাঘারু পাথরটিলায় ছিল। মোষগুলোর প্রায় হাঁটু পর্যন্ত জল উঠেছিল। জলস্রোত এসে ঘা মারছিল পাথরটিলার তলাতেও। কিন্তু তবু সকালে এই পাথরটা এখানেই ছিল। স্রোতের অমন ধাক্কাতেও নড়ে নি।
তার দুটো বিশাল পায়েই ভরে যাওয়া পাথরটুকুর ওপর বাঘারুর দাঁড়ানোটা ত খাড়া, সোজা, কোনো নড়নচড়ন নেই। এইখান থেকেই বাঘারু ডায়নার বেশ খানিকটা একসঙ্গে দেখতে পায়। বাঘারু দেখে, যা রোজ দেখে, কিন্তু প্রতিদিনই যেন সে প্রথম দেখছে এতটাই নতুন সে দৃশ্য তার অভিজ্ঞতায়।
–আন্ধিয়ার দ্যাওয়াত চরক খেলিবার নখান ছুটি আসিছে ডাইনাং ঝোরাখান, শাদা, ফটফটা– অন্ধকার আকাশে বিদ্যুচ্চমকের মত-উদ্ভাসিত শাদা ফেনার একটি চলরেখায় ডায়না ছুটে নামছে। মাটির সঙ্গে জলের যে-ঘর্ষণে জলকল্লোল উঠছিল মনে হয়, তার পেছনে স্রোতের এমনই প্রবল ধাক্কা আছে বোঝা যায় ডায়নার এই প্রপাতের মত নিষ্প্রমণ দেখলে। পাখিখান এই স্রোতের ওপর দিয়া ওর ঘরত যায় আর ডাকো দেয়। ডাকিবু? এ্যালায়? বাঘারু ডায়নাকেই দেখে। ডায়না ত বাঘারুর নদী নয়। কিন্তু প্রতিদিন এই একটি সময় ডায়নার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আরো খানিকটা দেখে নিতে নিতে বাঘারু যেন কোথায় একটা টান বোধ করতেও পারে; সামনের ঐ জঙ্গল-পাহাড় আর খাড়াপথ বাঘারুকে যেন আশ্রয় দিতেও পারে।
তার পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বাঘারু জলের ওপর ঝুঁকে পড়ে। সেই ফেনরাশিতে দুই হাত ডুবিয়ে দেয়। হাতে ছিটকে জল বাঘারুর চোখে-মুখে বুকে লাগে।
