কোনো-কোনো পাখি পাখা নেড়ে ঘুম কাড়ে, গাছের পাতায়-পাতায় মর্মরধ্বনি ওঠে, সে-ধ্বনি গাছ থেকে গাছে চলে যায়। কোনো-কোনো পাখি ডেকে ওঠার অপেক্ষায় গলায় একটা স্বগত ধ্বনি তুলতে থাকে–গলায় উঠে সে ধ্বনি গলার ভেতরে চলে যায়। মহিষের বাথানের এক দিক থেকে আর-এক দিকে কান আর লেজ ঝাঁপটানোর আওয়াজ ওঠে। ঘাসবনে শির শির আওয়াজ টানা চলে যায় দূরে, মাটি ঘেসে-বাতাসের বা শ্বাপদের। ঝিঁঝির আওয়াজ থেকে-থেকে থেমে গিয়ে সেই নৈঃশব্দ্যকে আরো নিঃশব্দ করে তোলে।
সেই পাখিটা জেগে ওঠে-ডায়নার ওপরে, জঙ্গলের ভেতরে, কোনো উঁচু ডালে। তার পাখাঝাড়ার বেশ জোর আওয়াজ নদীপথ ধরে নেমে আসে। পাখিটা ডাল বদল করে। গাছের কয়েকটা পাতা অনেক শব্দ তুলে খসে যেতে থাকে। পাখিটার গায়ের সঙ্গে পাতার ঘর্ষণের আওয়াজও নদীপথ ধরে নামে। সে বসে বসেই আরো একবার পাখা ঝাঁপটায়। তার পর, সেই আধো অন্ধকারে, একটা কাতর ক-অ-অ-ক-ধ্বনি তোলার সময় জুড়ে, নদীপথের আকাশ জুড়ে তার পাখনাটার প্রবল আলোড়নে, উড়ে আসে, এই ফাঁকার ওপরে। এই ফাঁকাটায় সে দুবার পাক খায়, বাঘারুর পাথরটাকেও ঘোরে। তার পর ঝুপ করে নদীর ওপরেই যেন নেমে যায়। কিন্তু উল্টো টানে উঠে এসে বসে বাঘারুরই পাথরের কিনারায়। এই পাথরটায় উড়ে আসার জন্যেই যেন তার নদীতে ঝাঁপ দেয়ার দরকার ছিল।
কিন্তু এসে বসেই বাঘারুকে দেখে, পাখা আর গোটায় না, যেন আবার উড়ে যাওয়ার জন্যেই কাঁপায়, কিন্তু ওড়ে না। ঐ উঁচু পাথরের কিনারায় পাখাটা মেলে রেখে দুটো সরু ঠ্যাঙের ওপর বসে। পাখা-মেলা সেই শরীরের ভারে পা-দুটো কাপে, পাখিটা দোলে। কাপুনি আর দুলুনি থামাতে পাখি ঘোরে। পায়ে-পায়ে এক পাক দু পাক। তার পর পাখা মেলে রেখেই দুটো ছোট-ছোট লাফে সে বাঘারুর দিকে ঘোরে। ঘুরেও পাখাটাকে বন্ধ করে না। ভোলা পাখা নিয়ে স্থির হয়ে বাঘারুকে দেখতে চায়। ঐ স্থিরতার প্রয়োজনেই পাখাটা আস্তে বন্ধ করে মিশিয়ে নেয় নিজের শরীরের সঙ্গে তার পরে লম্বা শরীরটাকে দুলিয়ে বাঘারুর দিকে দুপা এগয়। আগে পাখাটা শরীরের সঙ্গে সম্পূর্ণ মেলে নি, তখন মেলে। ডালের ওপর বসলে যে লেজটা ঝুলে থাকতে পারে, এখানে পাথরের ওপর সেটাকে খাড়া রাখতে হয়।
পাখাটা সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিয়ে পাখিটা নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যকে স্পষ্ট করে বাঘারুর শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকে। পাথরেরই ওপর আর-একটা পাথরের মত শুয়ে আছে বাঘারু। বাঘারুর মাথার ওপর দিয়ে পাখিটার গলা উঁচু করা; ফলে বাঘারুর মাথার রেখা, পাখির শরীরের রেখার সঙ্গে মিশে যায়। যেন বাঘারুর মাথাটাই উঁচু রেখায় পাখিটার গলার নরম ঢাল হয়ে ঠোঁট পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এসেছে। সেই রেখাটা ভেঙে দিয়ে পাখি ডাইনে ঘাড় ঘোরায়। দু পা ঘোরে। তারপর কিনারায় সরে এসে বাঘারুর বিপরীতে পাহাড়ের দিকে মুখ করে। লেজটা বাঘারুর মাথায় ঠেকে গেলে উঁচু করে। বুকটা এমনই নিচু হয় যেন তখনই উড়ে যাবে। কিন্তু ওড়ে না। লেজটা বাঘারুর কপালের ওপর ফেলে রেখে ওড়ার ভঙ্গিতে স্থির হয়ে যায়।
বাঘারু জেগে যায়, চোখ খোলে, কিন্তু নড়ে না। পাখিটার লেজ তার কপাল ছাড়িয়ে চোখের ওপর পড়েছে। তবু এত অস্পষ্টতায় বাঘারু বুঝতে পারে না লেজটা কত বড়, কী রকম, শেষে চেরা, না গুটনো, লেজের শেষ দিকে কি অন্য কোনো রঙের ঘের আছে? পাখিটা তাকে যেরকম নিষ্প্রাণ ভেবে কপালের ওপর লেজটার ভর রেখে দিয়েছে, বাঘারু সেরকম নিষ্প্রাণ হয়ে থাকে। নইলে পাখিটা মুহূর্তে উড়ে যাবে। আর যদি বাঘারু পাথরের ওপর পাথরের মতই পড়ে থাকে, তা হলে পাখিটা ঘুরে এমন কোথাও দাঁড়াতে পারে যে বাঘারু তাকে সম্পূর্ণ দেখতে পাবে। তিন দিন ধরে বাঘারু পাখিটাকে একবার দেখতে চাইছে, পারছে না।
বাঘারুর কপালের ওপর লেজটা একটু নড়ল, সুড়সুড়ি লাগল। তা হলে পাখিটা একটু ঘুরল। সুড়সুড়ি লাগছে। লেজটা এখন বাঘারুর ডান চোখটা ঢেকে দিয়েছে। বাঁ হাত দিয়ে এক ঝটকায় বাঘারু পাখিটাকে ধরে ফেলতে পারে। লেজটা বাঘারুর কপাল থেকে উঠে যায়।
বাঘারু পাখার কোনো আওয়াজ পায় না। তা হলে উড়ে যায় নি। বাঘারু তার এই পাথরে পাখির পাতলা নখের কোনো স্পর্শ শোনে না। তা হলে কি নড়ছে না?
তারপরই, বাঘারুর মুখের ওপর পাখার একটা ঝাঁপটা মেরে পাখিটা উড়ে চলে যায় বাঘারুর পায়ের দিকের আকাশে, ব্রিজের কাছটাতে। বাঘারু আবছায়া শুধু উড়ে যাওয়াটুকু বুঝতে পারে। দুই চোখ মেলে রেখে বাঘারু দেখে আকাশে কোনো তারা নেই! সে অপেক্ষায় থাকে পাখিটা আবার কখন উড়ে যাবে। ততক্ষণে পাখিটা ব্যায়ে মোড় নিয়ে আবার নদীর ওপরের ফাঁকাটায় চলে গেছে। বাঘারু উপুড় হয়ে যায়। দেখে, তার উল্টো দিকে, জলের ওপারে, উঁচলো বড় পাথরটার মাথায় গিয়ে বসল।
পাথরটা ছুঁচলো বলেই, পাখির ছায়াখন দেখা যাছে-য্যান একখান পাথরের পাখি। ঘাড় ঘোরাছে। স্যালায় বুঝা যায়, পাথর না হয়, পাখি। ছায়াখান মোরগের নাখান টানটান। বুকখান চিতানা। মাথাত ঝুটি আছে কি নাই, বুঝা না যায়। উপুড় হয়ে দুই হাতের ওপরে থুতনি রেখে বাঘারু তাকিয়ে। বাঘারু একবার পাখিটাকে দেখতে চায়, পুরোটা দেখতে।
