পাহাড়ের মত এত-এত পাথর, নুড়ির মত ছড়িয়ে আছে বলেই চট করে বোঝা যায় না, নদীর সারাটা বুক বোল্ডারে ঠাসা কেন, যেন বাধানো। বালিভূমি আর নদীখাত জুড়ে এত বোল্ডার পড়ে, মনে হতে পারে, এই পাহাড়-পাহাড় পাথর দিয়ে নদীটাকে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।
এই বড় পাথর আর বোল্ডার ছাড়া প্রায় বালির মতই ছড়ানো নুড়ি পাথর। নানা আকারের, নানা রঙের। ডায়না দিয়ে বান বয়ে যাওয়ার সময় এই সব নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে জল নেমে যায় প্রায় ভাঙনেরই টানে। তার পর, জল কমতে শুরু করলে জলের ভেতরে রামধনুর রঙে চমকে-চমকে ওঠে নুড়ি পাথরের এই প্রান্তর। ডায়নার সহসাবিস্তৃত সেই জলরাশিতে মনে হয় আকাশের ছায়া, পড়েছে–এত গভীর আর এত রঙিন সেই নুড়ি-পাথরের জলপথ।
আপনাদের তিস্তায় পাথরের এই বিস্তার নেই। সেখানে মধ্যরাত্রিতে তিস্তার গভীর থেকে কামানের গর্জন উঠে আসে। লোকে বলে, তিস্তার কামান। তিস্তার তলার মাটিতে পাথরে-পাথরে ধাক্কা লাগে। জল এত গভীর, নদী এত ছড়ানো, পাথর মাথা তুলতে পারে না। আপলাদ ত নীচে, সমতলে, সেখানে মাটির ঢাল এত খাড়া নয়।
ডায়না নদীর ঠিক এই জায়গাটিতেই এমন ঘটছে, কারণ এখানেই পাহাড় থেকে নেমে এসে, ডায়না একটু বায়ে বেঁকে, সমতলে চলে গেছে! পশ্চিমে গাটিয়া, আরো কিছু পশ্চিমে জলঢাকাও, গিয়ে নীচে ডায়নায় মিশেছে। ডায়নার ব্রিজে দাঁড়িয়ে দক্ষিণে তাকালে সেই সমতলটা দেখা যায়। বেশ কিছুটা পর্যন্ত ডায়নার চর। তার পর থেকেই লোয়ার তণ্ডুর ফরেস্টের নদীসীমা গাছের দেয়াল দিয়ে গাথা। ডায়নার বুক ক্রমেই চওড়া থেকে চওড়া হয়ে নীচে নেমে গেছে–তিন-তিনটি বড় নদীর জল, আরো অনেক ঝোরা-নালীর জল ঐ বুকে এঁটে যায়। ওখান থেকেই জলঢাকা-গাটিয়া-ডায়না, তিস্তা থেকে পুবে, আরো পুবে সরে-সরে গেছে, শেষে, আরো পুবে কোচবিহারের পাশ দিয়ে। তার নীচে দক্ষিণ-পুবে মোড় নিয়ে রংপুরের কাছে তোর্সার সঙ্গে মিশে তিস্তায় গিয়ে পড়েছে। ডায়নার পুবে আর-কোনো নদী নীচে তিস্তায় পড়ে নি। পশ্চিমে তিস্তা আর পুবে ডায়না–এই ত সম্ভাব্য বিস্তৃততম তিস্তাপার।
ডায়নার এই চরে গয়ানাথের বাথান। এই চরের বাথানটুকু পেতে গয়ানাথকে, তার জোয়াই আসিন্দিরকে লাগিয়ে, ফরেস্টের অফিসে তদবির করতে হয়েছিল। বাথান তাকে রাখতেই হবে, এদিকে। তার কনট্রাক্টার দুধ সাপ্লাই দেয় এই ল্যাটারাল রোডের ওপর, বিন্নাগুড়ির দিকে। সে ত আর ট্রাকের তেল পুড়িয়ে আপলচাদে গিয়ে দুধ দোয়াত না। অবিশ্যি উল্টো দিকে, আপাদে বাথান থাকলে গয়ানাথ ওদলাবাড়ির দিকের কোনো কনট্রাক্টারের সঙ্গে বন্দোবস্ত করত। কিন্তু সেদিকেও যে গয়ানাথের বাথান নেই, তার নিশ্চয়তা কী? তিস্তাপারের পুব সীমা শিভক আর পশ্চিম সীমা এই ডায়নার মধ্যে কোথায় গয়ানাথ আছে আর কোথায় নেই, তা কি সব সময় গয়ানাথেরই জানা?
ডায়নার এই চরটাই বাথানের জন্যে বাছার কারণ একসঙ্গে এতগুলো যে তার ভেতর কোনটা আগে কোনটা পরে বিচার করা শক্ত।
এখানেই, ডায়না, পাহাড় থেকে নেমে, সমতলে চলে যায় বলে ব্রিজের পরে জলটা যেন ফেটে ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ বালি আর পাথরের জন্যে এত বড় বুকটাও ত অসমান। ফলে, ডায়নার চরটাকে মাঝখানে রেখে অনেক দূর-দূর দিয়ে দুটো বড় ধারা গড়িয়ে গেছে। কিছু-কিছু ধারা আবার চরের মধ্যেও ঢুকে গেছে। এই মাঝখানের চরটাতে যদি বাথান থাকে, তা হলে দু ধারের জলই বাথানটাকে অনেকখানি বাঁচায়।
এই মাঝখানটাতে থাকার ত অন্য অসুবিধে নেই, কারণ, চরটা উঁচু ঘাসের জঙ্গলে ছাওয়া। যদি নানারকম ঘাস খাওয়াতেই ইচ্ছে হয়, চরটার ভেতর ঘুরতে দিলেই গরুমোষ নিজেই পছন্দমত ঘাস জোগাড় করে নেয়। তার ওপর, এই ঘাসবনের পরেই জঙ্গলবাড়ি। সেখানে ছোটখাটো নানা রকম ঝোপঝাড়, লতাপাতা, গাছগাছড়া। ঘাড় নুইয়ে ঘাস খেতে-খেতে গরুমাষের যদি একটু একঘেয়ে লাগে, তা হলে তাকে জঙ্গলে এক পাক ঘোরানোও যায়। তারও পরে পাথর আর বালি পার হয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ফরেস্ট শুরু। পুরো বাথান নিয়ে সেই ধনুকাকার ফরেস্টের বা দিক দিয়ে সকালে ঢুকে, ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে বিকেলের ভেতর চরে ফিরে আসা যায়। ফরেস্টের কতকগুলো জায়গা যেমন কতকগুলি কাজের জন্যেই নির্দিষ্ট থাকে, এই জায়গাটি তেমনি যেন বাথান রাখার জন্যেই ঠিক করা। এই সব চরের জঙ্গলবাড়ি-ঘাসবাড়িতে একমাত্র ভয় গোবাঘারুর। কিন্তু তেমন কোনো বাঘ আছে কি না, এ খবর আগেই পাওয়া যায়। তা ছাড়া এতগুলো মোষ নিয়ে গো বাঘারুর মুখোমুখি হওয়ার সাহস না থাকলে তার আর বাথান রাখার দরকারটা কী? ল্যাটারাল রোডটা মাঝখান দিয়ে চলে গেছে বলে গাড়িঘোড়ার আওয়াজে বাঘ এদিকে আসে না। অথচ এই রাস্তা আছে বলেই সকালে কনট্রাক্টারের গাড়ি এসে দাঁড়াতে পারে।
২.৪ পাখি জাগে, বাঘারু জাগে
এই ইতিহাস ও ভূগোলের মধ্যে নির্বাসিত বাঘারু, এখন, কোনো এক রাত শেষে, ঘুমিয়ে আছে পাহাড় আর ব্রিজের মাঝখানের ফাঁকাটাতে, নদীর বুকে, একটা ছোট টিলার মত একলা-পাথরের ওপরে।
তিন দিক থেকে তিনটি বনমোরগ একসঙ্গে ডেকে উঠে রাত্রির শেষ ঘোষণা করে দেয়। মোরগ তিনটির একটি বাঘারুর ডাইনে, আর-একটি বায়ে, জঙ্গলের ভেতর। তাদের ডাক দুটো মিশে যায়, কিন্তু প্রতিধ্বনি দুটো মেশে না। আর-একটা মোরগ ডাকে ব্রিজের দক্ষিণে চরের মাঝখান থেকে। তার ডাকটাই হালকা আসে, প্রতিধ্বনি ওঠে না। ফলে, তিনটি মাত্র বনমোরগের ডাকের সাত-আট রকম আওয়াজে জায়গাটা হঠাৎ ভরে ওঠে। আওয়াজগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে অনেকটা সময় নেয়। নিঃশেষিত মিলিয়ে যাওয়ার আগেই চরের আর ফরেস্টের ভেতরের নানা আওয়াজ তার সঙ্গে মিশে যায়।
