কিন্তু একটি জিনিশ কনট্রাক্টারদের স্থানীয় ভাবেই সংগ্রহ করতে হত–দুধ। পাউডার মিল্ক বা ঐ-জাতীয় পানীয় সরবরাহে কোনো অসুবিধে হয়ত আছে। বা হয়ত, ঐ ধরনের পানীয়, যা দূরের কোনো জায়গা থেকে একবারে আসে, তার সঙ্গে স্থানীয় ভাবে সংগৃহীত দুধ দিয়েই দৈনিক রেশনের কোটা পূরণ করা যায়। কারণ যাই হোক, মিলিটারি ক্যাম্পের ফলে স্থানীয় ভাবে দুধের চাহিদা শুধু বেড়ে যায় বললেই হয় না, বাড়তে বাড়তে তা ছড়িয়ে পড়ে শিভক ব্রিজ পেরিয়ে সেই পাহাড়ের তলায়, বনে, এমন কি, পাহাড়েও, ব্যাঙডুবি-মিরিক থেকে সেই আসাম সীমা পর্যন্ত। দুধের জন্যেও ত কনট্রাক্টার আছে। তারা আবার ফড়ে লাগায়। ফড়েরা আবার লোক লাগায়। তারা সব দুধ জোগাড় করে আনে বস্তির আর টাড়ির ভেতর থেকে।
প্রথম দিকে এ নিয়ে নানা কাণ্ডও হয়েছে। মিলিটারি ক্যাম্পেক্যাম্পে এই দুধ জোগানোর ব্যাপারে নদী-নালাবন-পাহাড়ের আড়ালের সব বস্তি-টাড়ি পর্যন্ত, রাজবংশী-নেপালী-মদেশিয়া যাবতীয় লোকজন, জড়িয়ে গেছে। বস্তির লোক এক জায়গায় নিয়ে যেত। সেখান থেকে আর-একজন আরেক জায়গায়। সেখান থেকে আর-একজন বড় রাস্তায়। সেখান থেকে ট্রাকে, ইত্যাদি ইত্যাদি। সে-সমস্ত প্রাথমিক স্তর কেটে গিয়ে এখন একটা পাকাপাকি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
জোতদাররা বছর তিন-চারেকের মধ্যে কিষনগঞ্জ-পূর্ণিয়াতে তোক পাঠিয়ে, মোষ কিনে এনেছে। সামরিক কারণেই বোধহয়, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টও উৎসাহ দেখায় গরুমোষ চরানোর লাইসেন্স দিতে। দেখতে-দেখতে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এই হাইওয়ের দু-পাশে সেই শিলিগুড়ির উত্তর থেকে আসামের সীমান্ত পর্যন্ত ফরেস্টগুলো গরুমোষ রাখার বাথানে ভরে গেল। দুধের কনট্রাক্টারের সঙ্গে প্রত্যেক বাথানের মালিকের ব্যবস্থা। কনট্রাক্টারকে যেবা যে-যে ক্যাম্পে দুধ সাপ্লাই করতে হয়, সেই ক্যাম্পের রাস্তার কাছাকাছি ফরেস্টে বাথান রাখতে হয় যাতে গাড়ি করে সাতসকালে দুধ সংগ্রহ করে আনা যায়। তাতে অবশ্য অসুবিধে হয় না, কারণ এক মালিকের যেমন একাধিক বাথান থাকে, তেমনি এক কনট্রাক্টারেরও একাধিক ক্যাম্প থাকে। ফরেস্টের ভেতর বড় রাস্তাগুলো জুড়ে সকালে ট্রাক-ট্রাক দুধ ভরে ছোটাছুটি চলতে থাকে। ফানেল আটকানো লম্বা-লম্বা নল গরুমোষের ব্যাটে লাগিয়ে যন্ত্র দিয়ে পাম্প করে দুধ দোয়া হয়ে যায়। ডায়না নদীর ব্রিজের নীচে, ল্যাটারাল রোডের পাশে, গয়ানাথের এমনই এক বাথান।
.
০৭০.
নির্বাসনভূমি
বাঘারুর এই নির্বাসনভূমি দিগন্তজোড়া ধনুকের মত বাকা ও নদীর এক পার থেকে অন্য পারের মত ধূসর।
কলকাতা থেকে আসাম ন্যাশনাল হাইওয়ে চালসার কাছে দক্ষিণে নেমে, আবার ময়নাগুড়ি দিয়ে উত্তরে উঠেছে। যে বিশাল ফরেস্টটা এই প্রায় মাইল পঞ্চাশ লম্বা U-এর বিচ্ছিন্ন দুই প্রান্ত ঘিরে রেখেছে, ফরেস্টের ম্যাপে তার নানা জায়গার নাম আছে–ওপর-চালসা আর নীচ-চালসা, ওপর আর নিচু তণ্ডু, ডায়না রেঞ্জ, ডায়না চর, গরুমারা, খুঁটিমারি। ফরেস্টের ম্যাপের এই নানা নামের ভেতরে একটা নিয়ম আছে–বড় থেকে ছোট হয়ে আসা নাম। ঐ চালসা থেকেই একটা ল্যাটারাল রোড বেরিয়ে এই পঞ্চাশ মাইল U-টার ওপরের দু-মাথা যোগ করে প্রায় সত্তর আশি মাইল বড় একটা গোল 0 বানিয়ে দিয়েছে।
বাঘারুর নির্বাসনভূমি যে-ধনুকের মত বাকা, এই ল্যাটারাল রোডটা সেই ধনুকের ছিলা। ডায়না নদীর ব্রিজটা সেই ছিলার মধ্যবিন্দু। ছিলা আর ধনুকের মাঝখানের শূন্যতা জুড়ে ডায়না নদী। ডয়না-চর ত জঙ্গল। তার পেছনে পাহাড়ের গা বেয়ে ফরেস্ট উঠে গেছে খাড়া ও ধনুকের মত বাকা। তার ওপারে ভূটান পাহাড়। এই ডায়না নদীর কোনো পাড় নেই, নীচে তিস্তার যেমন আছে। এই নদীর তিন দিক জুড়ে পাহাড়–আপলাদের তিস্তার তেমন নেই। এই নদীর চাইতে আপলাদের নদীর বুক বড়। এই ডায়নার খোলা বুকের মাত্র একটা অংশ দিয়ে পাথরে-পাথরে ধাক্কা খেয়ে-খেয়ে এই নদী এমনই বেগে ছুটছে–জল মাটি ছুঁতে পারে না। এত পাথরে ধাক্কা খেয়ে এত মুহুর্মুহু বাক নিয়ে এই ডায়না নদী নামে আর ছোটে যে মনে হয় নদীতে জল নেই, শুধু বুদ্বুদ আছে। বাঘারুর তিস্তায় ফেনা নেই বুদ্বুদ নেই–মাটির কোন অতল পর্যন্ত জল, তিস্তার বুকের ভেতর জল আঁটে না, ফেটে যায়। তিস্তার মত এপার-ওপার করে নয়, ডায়নাকে দেখতে হয় লম্বালম্বি, তলা থেকে ওপরে। কিন্তু লম্বালম্বিও ডায়নার অনেকটা একসঙ্গে দেখা যায় না, পাথর ও পাহাড়ে নদী এমনই হামেশা আড়াল হয়।
নদীর বুকের কিছু অংশে, জলের দু পাশে, বালি। তারপর অনেকটা জুড়ে শুধুই পাথর, যেন মনে হয় পাহাড়কে পাহাড় ভেঙে হঠাৎ ওখানে ছড়িয়ে আছে। ছোট-ছোট পাহাড়ের সমান এমন বড় বড় পাথর নদীর মাঝখানে আলগা পড়ে আছে, যার মাথায় উঠতে মানুষের বুকি,আর বাঘ বা কুকুরের নখ, দরকার। এমন বড় পাথরের খাড়া মাথা মাটির ওপর ঝুঁকে নিজেরই শরীরের ভেতরে এমন গর্ত তৈরি, করে, যেখানে ঝড়বৃষ্টির সময় মানুষ ও পশু আশ্রয় নিতে পারে। কোনো-কোনো পাথর আকাশে সূচ্যগ্র জেগে থাকে। চড়াইয়ে গড়াতে-গড়াতে ঝুলে থাকে কোনো পাথর, যেন এই মুহূর্তে গড়িয়ে নেমে আসবে। কিন্তু সেই পাথরের আড়াল থেকে নামা স্রোতের ধাক্কায়-ধাক্কায় তার তলায় শ্যাওলা পুরু হয়ে আছে। কোথাও-কোথাও কোনো এমন পাথর ঘিরে মানুষ-ডোবা ঘাসের জঙ্গল। সমান পাথরের বেদিতে কোনাকুনি খাড়া হয়ে আছে শাদা পাথরের স্থাপত্য-ধূসর সবুজের সামনে, স্রোতস্বান, ফেনপুঞ্জের পেছনে, বালি আর নুড়ির মাঝখানে।
