অনেকে বলে, যার জমি তার ভুলে এটা হয়েছে। অনেকে বলে, তারই বা পোচার হতে বাধা কোথায়? বা পোচারদের হয়ে এই কাজটুকু করে দিতে?
তবে, গণ্ডারের মৃত্যু এই কীটনাশক থেকে হতে পারে কি না এই নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক আছে। কিন্তু যদি কীটনাশকে মৃত্যু না হয়ে থাকে অথচ কোনো-কোনো লোক যদি সেটাকেই মৃত্যুর কারণ মনে করে, তা হলেই ত বুঝতে হয় এটা একটা সামাজিক বাস্তবতা হিশেবে স্বীকৃত হয়ে যাচ্ছে–পশুপাখি, গাছপালা, নদীনালা, মানুষজন নিয়ে ফরেস্টের সে-সঙ্গতি তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এমনই এক সামাজিক বাস্তবতা হিশেবে।
.
০৬৯.
রাজনীতির কিছু প্রক্ষিপ্ত
পুরনো জোতদারির নতুন কৃষির মত, নতুন করে বাথানদারিও শুরু হয়েছে।
জলপাইগুড়ি, ডুয়ার্স আর দার্জিলিং পাহাড়ের তলার দিকের অনেক জায়গায় নামই আছে বাথান দিয়ে। গরুবাথান, মহিষবাথান ত বেশ চেনা নাম। ছোট অনেক জায়গায় নামও এরকম আছে। কেন এই নামগুলো এমন হয়েছে তা নিয়ে কিছু-কিছু গল্প আছে। এসব জায়গার লোকবসতি ত খুব বেশি দিনের নয়। সুতরাং সেসব গল্পের ভেতর এখনো পর্যন্ত ইতিহাসই হয়ত আছে।
কিন্তু এখনকার এই বাথানবাথান গরুমোষ রাখা শুরু হয়েছে বড় জোর বছর পনের। ঠিক ভাবে বলতে গেলে, দশ বার বছরও হতে পারে।
১৯৬২-তে চীন-ভারত যুদ্ধ যখন শুরু হল, সকাল-সন্ধ্যা রেডিওতে নতুন-নতুন জায়গার নাম শোনা ছাড়া, ডুয়ার্সের লোকজন যুদ্ধ কিছু বোঝে নি। হাইওয়ের কাছে যারা থাকে তারা দেখেছে, মিলিটারি গাড়ি যাতায়াতের যেন শেষ নেই। কিন্তু সবাই ত সেটাও দেখতে পায় নি। তারাও দেশের অন্যান্য জায়গার লোকের মত রেডিওতে শুনেছে, যারা পড়তে পারে কাগজে পড়েছে। সে যুদ্ধ ত কয়েক মাস পর থেমেও গেল।
যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর সারাটা ডুয়ার্স জুড়ে নানা ঘটনা ঘটা শুরু হল বছরের পর বছর। সরু রাস্তাগুলো চওড়া হয়ে গেল। কাঠের ক্যালভার্টগুলো ঢালাই হয়ে গেল। ছোট-ছোট নদীর ওপর পাকা ব্রিজ হল। জলপাইগুড়ির ওপর তিস্তার ব্রিজ হল। এখন আর শিভক ব্রিজ হয়ে ঘুরে যেতে হবে না। আর, শিলিগুড়ির উত্তরে দার্জিলিং পাহাড়ের তলা থেকে আসাম পর্যন্ত, হাইওয়ের দুপাশে, বনের ভেতরের জঙ্গল পরিষ্কার করে, মিলিটারির ক্যাম্প বসল। সে ক্যাম্পের যেন আর শেষ নেই। বনের ভেতরটা পরিষ্কার করে পাকা বাড়ি, পাকা রাস্তা, অগুনতি গাড়ি আর অগুনতি মানুষজন। ফরেস্টের বড়বড় গাছ থেকেই গেল, তলাটা সাফ করে নেয়া হল।
শুধু জঙ্গলেই নয়, কোথাও-কোথাও শহরের বাইরে আর-এক শহর তৈরি করে ফেলল মিলিটারিরা। সেই সব শহর কোথা থেকে শুরু আর কোথায় শেষ কেউ জানে না। সমস্ত জায়গাটাই কোথাও দেয়াল, কোথাও কাটাতার দিয়ে ঘিরে রাখা। কখনোকখনো সেই সব ঘেরের ভেতর প্লেন নামে। তা ছাড়া, গাড়ির সারি ত লেগেই আছে। এরকম কত ঘেরা শহর তৈরি হয়ে আছে দার্জিলিং পাহাড়ের তলায়, শিলিগুড়ির উত্তর থেকে, হাইওয়ে ধরে, আসাম পর্যন্ত। কিন্তু এমন টানা ও প্রায় অবিচ্ছিন্ন নতুন সামরিক পত্তনের কোনো পরিচয় স্থানীয় লোকেরা না-জানলেও বহু দূর-দূর জায়গা এরই সূত্রে একত্রিত : হয়ে যায়। কোথায় কোন পাহাড়ের আড়ালে কামানের গোলার শক্তি পরীক্ষায় বা কামান চালনার অভ্যাসে কতদূর পর্যন্ত কেঁপে-কেঁপে ওঠে। এতদিন সেই কম্পনে লোজন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কামানের গোলার ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হওয়া ছাড়া এই ব্যাপক অঞ্চলের ভেতর এই এত সামরিক ঘটনার কোনো প্রতিক্রিয়াই ঘটে না। তার একটা কারণ নিশ্চয়ই এই সারা এলাকায় জমির তুলনায় বসতি অনেক কম আর বসতির তুলনায় পাহাড়-নদীবন অনেক বেশি। তাই এই এত দূর বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে সেনানগর গড়ে উঠতে পারে স্বাধীনভাবে। স্থানীয় কোনো ব্যাপারের ওপর তার কোনো প্রতিক্রিয়া হল না। শুধু, মালবাজারে আর হাসিমারাতে পুরনো ও বাতিল ইউনিফর্মের দুটো দোকান হল। এই দুই জায়গাতে বেশ কটি ফটোর দোকান হল। আর এই দুই জায়গায় ত বুটেই, আরো কোনো-কোনো জায়গার ছোট-ছোট বই আর পত্রিকার দোকান বেশ বেড়ে গেল। মালবাজার আর হাসিমারার মত জায়গায় হিন্দি-ইংরেজি ত বটেই, তামিল, মালয়ালি, তেলেগু ভাষার কাগজ পর্যন্ত দোকানে টাঙিয়ে রাখা। এত ভাষার এত কাগজ সত্ত্বেও সব কাগজের ওপর একই মেয়ের ছবি! বীরপাড়াতে একটা বিরাট দোকান হল–তাতে ওষুধ থেকে শুরু করে জামাকাপড়, স্যুটকেস-সাইকেল-মদ সবই পাওয়া যায়।
কিন্তু সামান্য এই কটি দোকানপাট ছাড়া, এই যে এতগুলো ক্যাম্প যত্রতত্র বসে গেল–শোনা যায় বিন্নাগুড়িতে ত নাকি একটা পুরো ক্যান্টনমেন্টই হয়ে আছে, শুধু এখনো ক্যান্টনমেন্ট বলে ঘোষণা হয় নি এই মাত্র–তার কোনো প্রতিক্রিয়া স্থানীয় বাজারের ওপর হল না। অর্থাৎ বাজারে জিনিশপত্রের বিক্রিবাটরা বাড়বে, আমদানি বাড়বে, লোকের হাতে একটু পয়সা খেলবে, সে-সব হল না। লোকের ভাগ্যে থাকল ঐ ছেঁড়া পোশাক আর কাগজের দোকানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে মিলিটারির সুবাদে বিনি পয়সায় নানা ভাষায় ও নানা রঙে একটি মেয়েরই আধা ন্যাংটো ছবি মলাটে দেখা।
এত-এত ক্যাম্পের এত-এত খাবার, সেসব কনট্রাক্টাররা আনে ট্রাকে করে করে বাইরে থেকে। শিলিগুড়িতে একটা ডিপো আছে। কাঁচা তরকারিটরকারি সেখান থেকে কিছু আসে। কিন্তু খাশি আসে বিহার থেকে, একেবারে ট্রাক-ট্রাক লাদাই করে। এখন নাকি কিষনগঞ্জের পরে একটি জায়গায় আর ওদিকে বালুরঘাটে ডিপো হয়েছে। বালুরঘাটের ডিপোর কারণ বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে চোরাই-চালান। মিলিটারির কাজকারবার সারা দেশ জুড়ে। আর এই সব মিলিটারি কনট্রাক্টারদের কারবারও যেন তাই। যেন, এইখানে যে-কোম্পানি বদলি হয়ে আসে, তার সঙ্গে-সঙ্গে কোম্পানির কনট্রাক্টাররাও চলে আসে–সে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকেই হোক বা ভারতের পশ্চিম সমুদ্রের পার থেকেই হোক। এতদিনে হয়ত এই-সব কনট্রাক্টাররা এখানে, বিশেষত শিলিগুড়িতে, এখানকার লোকদেরও কিছু-কিছু সাবকনট্রাক্টারি দিচ্ছে কিন্তু আসল কনট্রাক্টের ব্যাপারে কেউ নাক গলাতে পারে না। অর্থাৎ পুরো এলাকা জুড়ে ৬২র যুদ্ধের পর মিলিটারির এত কিছু কাণ্ড হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় লোকজনের আয়ব্যয়ের ওপর তার কোনো প্রতিক্রিয়া হয় নি। মিলিটারি জাতীয় ব্যাপার বলেই হয়ত তার প্রতিক্রিয়াও জাতীয়-স্তরেই হয়, এত তলায় আর নামতে পারে না।
