ফরেস্টের ভেতরে হালবলদে চষা বিছনছেটানো খেতে, এই সব ওষুধ ছিটিয়ে দেয়া হয়। কতটা ওষুধ কী ভাবে ছেটাতে হয়, সে-সবই আন্দাজ মাত্র। কোনোটাই জানা নয়।
হরিণ, হাতি, গণ্ডার, এরা ধান খেতে ভালবাসে। ধানের খোঁজে পাল বেঁধে ফরেস্টের বাইরেও চলে যায়। ফরেস্টের ভেতরে, হয়ত তাদের যাতায়াতের পথের পাশেই, এমন ধানখেত দেখলে তারাও আসে। হরিণেরা পাল বেঁধে, হাতিরা দল বেঁধে আর বেশির ভাগ গণ্ডার একা-একা।
ওষুধ ছিটনোর পরপরই যদি তারা আসে তা হলে ধানের সঙ্গে সঙ্গে এই সব ওষুধও গিলতে থাকে রাশি রাশি। ফলে, এই পশুর দল বনে ফিরে যাওয়ার পর এই ওষুধের বিষক্রিয়া শুরু হয়। এরা কতটা বিষ খেয়েছে সেই অনুপাতে মরে। সেই মৃত পশুদের মাংস যে-সব শেয়াল, বনকুকুর আর পাখিরা খায়–সেগুলোও মরতে শুরু করে। ফলে, নেহাতই আচমকা, এক-একটা ফরেস্টের এক-একটা জায়গায় মহামারী লেগে যায় যেন। আজকাল, এই সব মহামারী যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, তার নানা রকম ব্যবস্থা হয়েছে–কিন্তু সেসব ব্যবস্থাই ত কীটনাশক, জীবাণুনাশক দিয়ে। কীট আর জীবাণুনাশক খেয়েই যে-মড়ক শুরু তা প্রতিরোধের কোনো উপায় নেই। এক ভরসা; কাছাকাছি স্রোতবতী নদী না-থাকলে মড়ক বেশি দূর ছড়াতে পারে না। থাকলে, স্রোতের সঙ্গে বিষ আরো নীচে নেমে যায়। আর-এক ভরসা, যদি বৃষ্টি হয় প্রচুর, তা হলে অত জলে বিষের সক্রিয়তা কমে যায়। কিন্তু ফসল ত পাকে, বর্ষা শেষের রোদেই। তখনই ত পোকা ধরে বেশি, পশুপাখিও ধান খেতে যায় বেশি আর ওষুধও ছেটানো হয় বেশি।
দাক্ষিণাত্যের কোনো-কোনো ফরেস্টে বাথানের গরুমোষ বাঘ মেরে নিয়ে গেলে বাথানদারেরা সেই মারা পশুটাকে খুঁজে বের করত জঙ্গলের মধ্যে। বাঘ ত আর একবারে সবটা খেতে পারে না, পরে খাবে বলে রেখে দিয়ে যায়। সেই মড়াটার ভেতরে এই বীজাণুনাশক ও কীটনাশক ওষুধ গ্রামবাসীরা ঢুকিয়ে দিয়ে আসত। তার পর সেই মাংস খেয়ে বাঘ ত মরতই, শকুন-শেয়াল-হায়নাও মরত। নিজেদের বাথানের গরুমোষ ফরেস্টে নিরাপদে চরাবার জন্য ফরেস্টের মাংসাশীদের সেই ওষুধের বিষে নিকেশ করা হয়। ১৯৭৬ সালেই কেনেথ অ্যাণ্ডারসন বলেছেন, এর ফলে আজ দাক্ষিণাত্যের এই সব বনে কোনো বাঘ নেই, শেয়াল নেই, হায়না নেই. শকুন নেই।
জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সে অবস্থা এখনো ততটা খারাপ নয়। কিন্তু লক্ষণটা দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর আগে ফরেস্টের এক ব্লকে একটি রাত্রিতে সম্বর হরিণের একটা পাল সারাটা সল্ট লিক জুড়ে শুকনো পাতার মত ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে ছিল। শরীরের ভেতরের অনভ্যস্ত বিষক্রিয়ায় শরীরেরই কোনো এক অজানা নিয়মে জিভ বের করে নুনমাটি চাটতে-চাটতেই মরে যায়। এই মৃত্যুর তদন্ত হয়েছিল। কলকাতা থেকে বিশেষজ্ঞরা এসেছিলেন। পোস্টমর্টেমও হয়েছিল। তার পরে আর-কিছু জানা যায় নি।
বেশ কয়েক বছর আগে ফালাকাটার কাছে যে-গণ্ডারটা মারা যায়, তারও কারণ নাকি বিষ। কেউ-কেউ সন্দেহ করে, সে বিষ মিশিয়েছিল পোচাররাই। দুটো গণ্ডার প্রায় নিয়মিত ধান খেতে আসত সংলগ্ন খেতে। ভোরের আগেই ফিরে যেত। জ্যোৎস্না রাতে অনেকে দেখেওছে, গণ্ডার দুটো সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে–দেখে মনে হয়েছে কোনো কাটা গাছের মোটা গুঁড়ি পড়ে আছে। যারা ঐ খেত চব্বিশ ঘণ্টা দেখছে তারা ত জানে ওখানে কোনো গাছের গুঁড়ি নেই। প্রথম-প্রথম গণ্ডার দুটোকে তাড়িয়ে দেয়ারও চেষ্টা করেছে। ফল খুব একটা হয় নি। শেষে, ধীরে-ধীরে এটা অভ্যাসই হয়ে যায় রাস্তার বা পাড়ার ষাড় যে-নিয়মে চেনা হয়ে যায়। আর, একবার অভ্যাসে এসে গেলে ত এই গণ্ডার দুটো ঐ রাতগুলোর জন্যে ঐ গ্রামটারই বাসিন্দা হয়ে যায়।
কিন্তু অভ্যাসের অন্য একটা দিকও আছে। গণ্ডার দুটোর আসাটা যখন প্রায় নিয়ম হয়ে গেছে, সবার জানা হয়ে গেছে, তেমনি কোনো একদিন দেখা গেল, একটা গণ্ডার মরে পড়ে আছে। বলা উচিত, শোনা গেল। কারণ শেষ রাতে অপর গণ্ডারটির তীব্র চিৎকারেই সবার ঘুম ভাঙে। প্রথমে কেউ চিৎকারটি চিনে উঠতে পারে নি। কিন্তু নিয়মিত ব্যবধানে একই জায়গা থেকে চিৎকারটি বার বার উঠে আসায় বাধ্য হয়ে তোকজনকে বেরতে হয়। বেরনোর পর বোঝা যায় চিৎকারটি একটি গণ্ডারের নয়, দুটো গণ্ডারের। ততক্ষণে একটি গণ্ডার খেতের ভেতর এমন ছুটছে, যেন ভূমিকম্প হয়ে চলেছে। আর-একটি গণ্ডার ছোটে না, দাঁড়িয়ে থাকে। সমস্ত দৃশ্যটা দেখতে হয় বেশ দূর-দূর থেকে। একটা গণ্ডারের মৃতদেহ বেরল সকালে। কিন্তু মাদি গণ্ডারটা তখনো দাঁড়িয়ে। শুধু তখনই নয়, দিনের পর দিন। জায়গাটা থেকে নড়ছিলই না। প্রথম দিকে ঘন-ঘন চেঁচাচ্ছিল। পরের দিকে মাঝেমধ্যে। সে চিৎকারে মাটি ফেটে যাচ্ছে মনে হত। মাদি গণ্ডারটাকে বনে ফিরিয়ে দিতে আর মৃত গণ্ডারটার মৃত্যুর তদন্ত করতে কলকাতা থেকে বিশেষজ্ঞরা এসেছিলেন। গণ্ডারের পেট কাটতে ইলেকট্রিক করাত আনতে হয়েছিল। সে করাত চালাতে জেনারেটারঅলা গাড়ি আনতে হয়েছিল। তার ফলে কী জানা যায়, তা জানা যায় নি।
শোনা যায়, গণ্ডারটা মরেছিল ঐ পোকামারার ওষুধ খেয়ে। সে বিষ নাকি মিশিয়েছিল পোচাররাই। তারা নাকি ঐ জমিতে এত ওষুধ ঢালে যে ঐ জায়গাটা একেবারে পুড়ে যায়। কিন্তু দুটো গণ্ডারের বদলে একটা গণ্ডার ধান খেতে গেল কেন? সেটা ত অনেক সময় হতেও পারে। কেন হয়, তা এক পশুরাই জানে।
