কিন্তু এই মালিকদের বেলাতেও এই প্রধান কারণটার সঙ্গে আরো অনেক ছোট-ছোট কারণ জড়িয়ে আছে, অনেক দিন ধরে। অনেক ক্ষেত্রে সেই ছোট কারণগুলোর যোগফল, প্রধান কারণের চাইতেও বেশি।
ফরেস্টের জমি ত সর্বত্রই ছড়ানো। গাছগাছড়ার জঙ্গলে বাইরে অনেক জায়গা পড়ে থাকে। কোথাও-কোথাও ত ফরেস্টের ব্লকটার চাইতে এই খালি জায়গাটাই বড়। বাথানের মালিক ঐ রকম মাঠওয়ালা ব্লকের লাইসেন্স জোগাড় করতে পারলে বাথানদার হাল-বিছনও নিয়ে আসে। বাথান বাথানের মত থাকে আর বাথানদার ফরেস্টের জমিতে জোতদারের জন্যে চাষ-আবাদ করে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের যারা এই দিকে থাকে তারাও চাষে সাহায্য করে। কারণ ফসলের একটা অংশ তারাও পায়।
ফরেস্টের জমিতে চাষ লাগানোর, অর্থাৎ জমি ফরেস্টের আর হাল বলদ-বিছন জোতদারের, আর-একটি পদ্ধতিও আছে। ফরেস্টের ভেতরে ফরেস্ট-ভিলেজার বলে এক-একটা দলকে থাকতে দেয়া হয়। তারা শুকনো পাতা, কাঠকুটো আর হাতের মুঠোর জমিটুকুতে কিছু চাষ করা আর থাকার অধিকারের বদলে ফরেস্ট পাহারা দেয়–প্রধানত পোচার ও চোরা কাঠকাটুনিদের খবর বিট অফিসে পৌঁছে দেয়। এরা সারাধারণ এত গরিব যে গরিব রাজবংশী গ্রামেও এদের জায়গা জোটে না। কিন্তু ফরেস্ট ভিলেজার হিশাবে এখন এদের কদর বাড়ছে বাইরের জোতদারদের কাছে। এই ফরেস্ট ভিলেজারদের সামান্য আইনি অধিকার আছে ফরেস্টের জমিতে। কিন্তু সেইটুকু অধিকারের সুযোগেই যদি তাদের হাল আর বিছন দেয়া যায়–বাথানদারদের হাত দিয়ে, আর তাদের ঘরের লাগাও জমি চাষে দেয়া যায় তা হলে ত সেটা আইনসঙ্গত চাষই হয়। জোতদার-দেউনিয়া তার ন্যায্য ভাগটুকু নিলে সেটাও আইনসঙ্গত ভাগই হয়।
এটাকে দুদিক থেকেই দেখা যায়-ফরেস্টের জমিতে জোতদারের আধিয়ারি, বা ডুয়ার্সের গভীর অরণ্যে কৃষিকর্মের বিস্তার।
নানা ভাবে এই প্রক্রিয়া ভারতের সব বনাঞ্চলেই শুরু হয়েছে। ফরেস্টের চাষযোগ্য জমিতে ফরেস্ট আর দখল রাখতে পারছে না। পুলিশ-টুলিশ দিয়ে এই সব জবরদখলকারীদের তুলে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দেখতে-দেখতে গত কয়েক বছর খবরের কাগজে ফরেস্ট স্কোয়াটার্স শব্দটা তৈরি হয়ে গেছে।
ফরেস্টে গেলেই রাশি রাশি জমি আর ফসল ব্যাপারটা যদি এই হত তা হলে ত ফরেস্টেই গ্রাম বসে যেত। হয়ত যেত। কিন্তু এখন ত আর তা সম্ভব নয়। এখন ফরেস্টের ব্যবসা জোতদারের চাষের ব্যবসার চাইতেও অনেক-অনেক গুণ লাভের। জোতদার, বা যে-কোনো ব্যবসায়ীর কাছেই, যে ব্যবসার টাকা তার ঘরে আসে না, সেই ব্যবসাটাই অর্থহীন। কী বা হছে, এ্যানং পাহাড়-পাহাড় আর জিলা-জিলা জঙ্গল রাখি? আরে মানষি থাকিবার পারে না, ত গাছ! তার আবার বাঘক বাঁচাবার নাগে, কুমিরক বাঁচাবার নাগে। তা বাঁচা কেনে, বাঁচা। মানুষজনক ধরি-ধরি বাঘ দে কেনে। বাচুক তর বনজঙ্গল আর বাঘ-হাতি।
নিজেদের ফরেস্ট বানাবার আর কাঠ বেচবার যদি আইন থাকত, তা হলে এরাই ধানগম চাষ তুলে দিয়ে শুধু বনচাষ করত।
কিন্তু উল্টোদিকে আবার ব্যাপারটা অর্থনীতির এমন সরল অঙ্ক নয় যে বাথানের ছুতো করে বন ঢুকে নানা কায়দায় বেআইনি জোতদারি করাটাই এত সব বাথানের উদ্দেশ্য। বাথান রাখার সরাসরি খুব কারণ আছে–দুধ বেচে বিনি খাটুনি বিনি খরচায় দৈনিক লাভের কারণ। কিন্তু তার সঙ্গে কখনো কখনো এই বেআইনি জোতদারিও মিলে যায়। আবার অনেক সময় যায়ও না, নেহাত বনের ভেতর বাথান রেখে দেয়ার সুবিধে বলেই রেখে দেয়া হয়। কথাটা শুধু এই যে বনের জমিতে গরুমোষের বাথান রাখা যেমন একটা ব্যবসা বা রীতি, বনের জমিতে বেআইনি জোতদারিটাও একটা রীতি। প্রথমটা অনেক প্রাচীন রীতি–এখন আবার নতুন ভাবে শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়টা একেবারেই নতুন রীতি–এতটাই নতুন যে এখনো রীতি হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে বলা যায় না। ফরেস্টের ভেতরে এত পশুর খাদ্য থাকে, যা বাইরে জোটে না, আর, বাথান নিয়ে থাকা লোকগুলোর পেটে এত সামান্য খিদে থাকে, যা বাইরে মেটে না। তাই বাথান, আর বাথানদার, গাছ-গাছড়া-পশুপাখি, এমন কি, বাঘ-হাতির মত পশুও, একটা সুসঙ্গতিতে থেকে যেতে পারে। সেই সঙ্গতিটাই জোরদারির ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
.
০৬৮.
কৃষিবিজ্ঞানের কিছু প্রক্ষিপ্ত
সঙ্গতি নষ্ট হচ্ছে কৃষিকাজের আধুনিকতার ফলে।
শুধু হালবলদে চাষ হতে পারে, বিছন হলেই ফসল হতে পারে। ফসল হলেই ত আর ফলন হয় না। পাকা ও কাটা পর্যন্ত ত সেই ফসল মাঠে রাখতে হয়।
ফরেস্টের ভেতরের জমিতে ফরেস্ট-ভিলেজাররা আগে লাঙল ছাড়া, বলদ ছাড়া, যেটুকু জমি দুই হাতে চষতে পারত, সেটুকুর ফসল দুই হাতে ফলন পর্যন্ত রাখতে পারত। কিন্তু ফরেস্টের ভেতর হালবলদের চাষের বিছন-ছড়ানো ফলন দুই হাতে রক্ষা করা যায় না। প্রধান বিপদ দু-দিক থেকে আসতে পারে।
এক : বনের পাখিরা এতটা খোলা জায়গায় এত ঘন ধানের এত ফলন দেখে নি। ফসল ফলল কি ফলল না, তারা ঝাঁকে ঝাকে নেমে এসে কয়েক দিনের মধ্যেই ধানগুলো খেয়ে ফেলে। ধানছাড়া গাছগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কয়েক দিনের মধ্যে পোয়াল হয়ে গেলে ওড়াউড়ির তাতে কোনো অসুবিধে হয় না।
দুই : ধান গাছও আগুনের মত–নিজের পোকা নিজেই টেনে আনে। দু-হাতের মুঠোয় এটে যায় এমন ফলনে সে-পোকা দু-আঙুলে টিপে মেরে ফেলা যায়। কিন্তু হালবলদের চাষের বিছন-ছড়ানো ধানের পোকা মারতে ওষুধ লাগে। সেই পোকা মারার ওষুধের কোনো অসুবিধেও নেই আজকাল। দেউনিয়া জোতদারদের ঘরে কৌটোয়, জেলিক্যানে, প্লাস্টিকের বস্তায় ভোলা থাকে। পাট, ধান আর আলুর পোকা মারা ছাড়া সে-ওষুধ জোতদাররা অন্য কাজেও লাগায় কখনো কখনো। ঘরেও লাগায়, বাইরেও লাগায়। তাছাড়া আছে চা-বাগান। সেখানে ত এই সব ওষুধের গুদাম। চা-গাছের পাতার দাম ধানগমের চাইতে অনেক বেশি। সে পাতা বাঁচানোর ওষুধের দামও অনেক গুণ। তেমন দরকারে, ফরেস্টেরই ভেতর ছড়ানোছিটনো চা বাগানগুলো থেকে এসব সব ওষুধ আনা যায়। আনা হয়।
