তেমনি একটা জায়গা পেয়ে বাঘারু দাঁড়ায়। তার পর পাড়ের পাথরটিতে পা দিয়ে এক লাফে জলের কিনারের পাথরের ওপর দাঁড়ায়। তার পর একটুও না দাঁড়িয়ে আরো নীচে জলের, আরো কিনারের পাথরটিতে পা দেয়। তার পরেই জলে পা হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যায় আর পাতাগুলো হাতের পাশে ভেসে কাঁধে লাগে, সাঁতার কাটতে ডান হাত নাড়াতে পারবে না। বাঘারু মুহূর্তের মধ্যে ফাস থেকে হাত বের করে নিয়ে ফাঁসটা গলায় পরে নেয়–পাতাগুলো পিঠের ওপর ভেসে থাকে। চকিতে একবার ভাবে, পাথরটা কোমরে বেঁধে নিলে ভাল হত, কিন্তু তার আর সময় নেই। যে-জনপদ সে পেরিয়ে এল সে দিকে একবারও না তাকিয়ে বাঘারু জলের ভেতরে ঢুকে যায়, যেমন ঢুকে যাওয়া বাঘারুর স্বভাব, যেন সে জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারে, এই পাথর ভাসানো স্রোতের ওপর দিয়ে। ওপারে অরণ্যপদ। সে-অরণ্যের শেষ বাঘারু দেখে নি, জানে না। সেখানে তার নির্বাসন। মাল নদীতে স্রোত ছিল। স্রোত এসে বাঘারুর গায়ে ধাক্কা লাগায়। বাঘারু সে স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়। বাঘারু পেছন ফিরে দেখে নি, সেই তার কুকুর, জলে নামল, কি নামল না। ভাসতে-ভাসতে বুঝতে পারে, কুকুরটা–ভোখাবোকা–তার পাতলা শরীরে স্রোতের ধাক্কায় বাঘারুকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেল। তার পরই সামনে দেখতে পায়, ভোখাবোকা মাথাটা স্রোতের ওপর ভাসিয়ে রেখে ডাইনে বয়ে ঘোরাচ্ছে। বাঘারুর মাথার পেছনে পিঠের ওপরে পাতার গোছা ভাসে, গলায় পাথর ডোবে আর লোখাবোকার মতই স্রোতে ভেসে থেকে বাঘারু ওপারে, ফরেস্টে, তার নির্বাসনে চলে যায়।
.
০৬৭.
অর্থনীতির কিছু প্রক্ষিপ্ত
সরকারি ফরেস্টে গরুমোষ চরাবার একটা ব্যবস্থা আছে। তার জন্যে গরুমোষপিছু একটা পয়সা দিয়ে লাইসেন্স নিতে হয়।
শীতের শেষে আগুন লাগিয়ে জঙ্গল সাফ করা হয়, যাতে বর্ষার আগে নতুন গাছ পোতা হয়। কোনো-কোনো জায়গায় মরা গাছ কেটে বাদ দেয়া হয়। কোনো-কোনো গাছ এতই মরা যে কাটার খরচ পোষায় না। সেসব গাছও পুড়িয়ে দেয়া হয়।
এই সব আগুনটাগুন লাগিয়ে যখন ফরেস্ট সাফসুরত করা হয় তখনই গরুমেষ চরাবার লাইসেন্স করে রাখতে হয়। এসব লাইসেন্স দেয় বিট অফিস। তবে, সেখান থেকে রেঞ্জ অফিসে গিয়ে সিল লাগিয়ে আনতে হয়।
আগুন লাগানোর পর সারাটা ফরেস্ট কেমন খালি-খালি লাগে। তলায়-তলায় বহুদূর পর্যন্ত চোখ চলে যেতে পারে–এক নদীর পার থেকে আর-এক নদীর আর-এক পার। বর্ষার প্রথম কদিন যায় ফরেস্টের পোড়া দাগটা ধুয়ে যেতে। দেখতে দেখতে পরিষ্কার হয়ে যায়। বেশ তকতকে ঝকঝকে লাগে পুরো ফরেস্টের আঙিনা ঐ আকাশ-ছাওয়া গাছগুলোর তলায়।
কখন এক সময় নতুন ঘাস গজানো শুরু হয়ে যায়। ফরেস্টের মাটি দেখতে-দেখতে কচি-কচি ঘাসে ভরে যায়। দেখতে-দেখতে পোড়া জঙ্গল জুড়ে এই সবুজ নতুন ঘাস লক লক করে ওঠে। সেই সময় গরু আর মোষের বাথানে বিভিন্ন এলাকা ভরে উঠতে থাকে।
বাথানদার প্রায় সারা বছরই ফরেস্টে কাটায়। শীতের শেষে বসন্তের শুরুতে তাদের লাইসেন্সের মেয়াদ আইনত পার হয়ে যায়। তাদের বাথান নিয়ে ফরেস্টের বাইরে চলে আসতে হয়–এটাই আইন। কারণ, তখন জঙ্গল সাফ করার সময়। কিন্তু বাথান নিয়ে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। পঁচিশ-পঞ্চাশ-একশ গরুমোষ নিয়ে কি ফরেস্ট থেকে বেরিয়ে আবার গায়ে ফিরে যাওয়া সম্ভব? এসব গরু-মোষের সঙ্গে গায়ের কোনো সম্পর্কই নেই। বাথানদাররা তাই ঐ সময়েও ফরেস্টের ভেতরেই থাকে। বাথানদাররা জানতেই পারে, কখন কোন জঙ্গল সাফ হবে। সেই অনুযায়ী সরে-সরে যায়। তেমন সুযোগ থাকলে, ফরেস্টের ভেতরে ফরেস্টেরই ভোলা খালি জমিতে, বা নদীর চরে, বা কোনো চা বাগানের বড় মাঠে ঐ কটি দিন কাটিয়ে দেয়। ফরেস্টের মধ্যেই চা বাগানের তেমন-তেমন খোলা জমি থাকলে সেখানে এই কয়েক দিনের জন্যে বিরাট গো-হাটা মোষ-হাটা বসে যায়। কয়েকটা বাথান একসঙ্গে কয়েকদিন থাকে। তেমন সুযোগ থাকলে মালিকরাও এই সময় এসে তাদের বাথান দেখে যায়। কিছু-কিছু বেচাকেনাও চলে। বছরের পর বছর এই একই নিয়মে চলতে-চলতে এখন সবটাই সকলের জানা হয়ে গেছে, কখন কোন বাথান কোথায় থাকে।
সারাটা বছর জুড়েই কেন এই বাথানবাথান গরুমোষ ফরেস্টের ভেতরে-ভেতরে থাকে?
তার দুটো কারণ আছে দু-দিক থেকে। একটা কারণ ফরেস্টের। এত গরুমোষ খাওয়ার পরেও ফরেস্টে এত আগাছা জন্মায় যে নতুন চারার বাড় নষ্ট হয়, পুরনো গাছের শরীর খাক হয়ে যায়। বিশেষত, জলপাইগুড়ির এই ফরেস্টে, যেখানে বার মাসের সাত মাসই বৃষ্টি। এই কারণের ভেতর আরো অনেক ছোট ছোট কারণ জন্মে গেছে, অনেক দিন ধরে। সারা বছরের জন্য গেরুমোষ চরাবার লাইসন্স-ফি মাথা পিছু দশ-বিশ পয়সা। যার বিশটা সে দশটার জন্যে, যার পঞ্চাশটা সে পঁচিশটার জন্যে, যার একশটা সে পঞ্চাশটার জন্যে, লাইসেন্স ফি দেয়। এর অতিরিক্ত গরুমোষের জন্যে ফরেস্ট গার্ড, বিট অফিসার, তেমন বড় বড় বাথানের বেলায় এমন কি রেঞ্জ অফিসারও, একটা পয়সা পায়। সুতরাং ফরেস্টে গরুমেষ চরানোয় ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের স্বার্থ যেমন, কর্মচারীদেরও তেমনই স্বার্থ।
ফরেস্টে বাথান রাখার একটা কারণ আছে বাথানের মালিকদের। ফরেস্টের ভেতর বাথান রেখে দেয়াটা অনেক শস্তা পড়ে। গরুমোষের খাবার খরচই যে বাঁচে তা নয়, এতগুলো গরুমোষ রাখতে যে-পরিমাণ জমি নষ্ট হত, গোয়ালঘর রাখতে আর প্রতি বছর ছাইতে যে-খরচ পড়ত, সেটা বেঁচে যায়।
