বাঘারু এবারের টানটা আরো যাচকা মারে। তাতে তার মনে হয়, ছেঁড়া যেতেও পারে। এতক্ষণ পর অন্তত এতটা শক্ত একটা লতা যখন পাওয়া গেছে বাঘারু ছাড়ছে না।
বাঘারু এবার দুই হাতে ঝুরিটা ধরে পেঁচিয়ে, হাত দুটো মাথার ওপর তোলে। ফলে ঝুরিটা ঢিলে হয়ে যায়। এখন আচমকা একটা হ্যাঁচকা টান মেরে প্রায় ঝুলে পড়ে। ওপারে পটপট আওয়াজ ওঠে। বাঘারু বোঝে, একটু নেমেও এল। আর দু-একটা টানেই ছেঁড়া যাবে। বাঘারু ঢিলে দেয়।
আবার দু হাতে পেঁচিয়ে নিয়ে, হাতটা মাথার ওপর তুলে, আচমকা এ্যাচকা টান মেরে, বাঘারু ঝুরিটাতে ঝুলেই পড়ে। তার শরীরের ভার দিয়ে বুঝতে পারে ঝুরিটা নেমে আসছে। বড় জোর আর দু-এক টান লাগবে। কিন্তু বাঘারু ঝুরি থেকে নামে না। সে তার শরীরের ওজনটা দিয়ে ঝুলে থাকে। পটপট আওয়াজ তুলে ঝুরিটা ডাল থেকে খসতে শুরু করে। কিন্তু খসে পড়ার আগেই ছিঁড়ে যায়, আর বাঘারু সেই ঝুরিসহ মাটিতে ধপাস করে পড়ে। বাঘারু আগে মাটিতে পড়ে, ঝুরিটা তার ওপর পড়ে। তাকে জড়িয়ে ফেলে।
কুকুরটা এতক্ষণ একটু দূরে দাঁড়িয়ে হাঁ করে নীরবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাতাস থেকে পোকা তাড়াচ্ছিল। বাঘারুকে পড়ে যেতে দেখে, ঘেউ করে ডেকে উঠে লাফিয়ে সামনে চলে আসে। শালো ভোখছে খালি, শালো ভোখা, খাড়া।
বাঘারু ততক্ষণে ঝুরিসহ উঠে দাঁড়িয়ে মাথা-ঘাড় থেকে ঝুরিটা খোলে। বেশ লম্বা ঝুরি। মাঝখান থেকে ছিঁড়ে গেছে। দেখতে-দেখতে লতাটাকে বা হাতের কব্জিতে ডান হাত দিয়ে পেঁচাতে থাকে। বেশ অনেকখানি হয়। বাঘারু এসে পাথর আর পাতার পাশে বসে।
বাঘারু ভাবতে শুরু করে কী ভাবে বাধবে। শুকনো লতা শক্ত বলেই ছিঁড়বে না, কিন্তু আবার, শক্ত বলেই জোরে গিঠ দেয়া যাবে না। একটু ভেবে পাথরটাকে আলাদা করে। তার পর পাতাগুলো দেখে আর হাতের লতাটা দেখে। লম্বালম্বি একটা বা দুটো প্যাঁচ দিলে জলের ধাক্কায় পাতাগুলো বাধনের পাশ। গলিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। আড়াআড়ি বঁধলে ত তুলা দিয়ে গলে যাবে। লতাটা হাতে নিয়ে আর পাতার গোছাটা সামনে নিয়ে বাঘারু একবার হাতের দিকে আর একবার পাতার গোছর দিকে ফিরে-ফিরে তাকায়। সেই প্রক্রিয়াতেই তার হাত যেন বাঁধনের ধরনটা তৈরি করে ফেলে। বাঘারু একবার ঘাড় ঘুরিয়ে নদীর স্রোতের দিকে তাকায়, কত জোরে ধাক্কা মাররে, সেটারও আন্দাজ পেতে।
বাঘারু পাতাগুলোয় আড়াআড়ি একটা বাধন দেয়–গোড়ার কাছে। এখানে পাতাগুলো সবচেয়ে কম চওড়া, তাই বাধনটা দেয়া যায় বটে, গিঠটা জোর হয় না। লতার জন্যেও বটে, পাতার জন্যেও বটে, পাতাগুলো তা হলে ভেঙে যাবে। এই বাঁধনটা দিয়ে বাঘারু কিছুক্ষণ তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখে, লতাটা কাটে না, যেন নিশ্চিত হয়ে যেতে চায়, এটাই ঠিক। তার পর পাথরটা তুলে নেয়। লতাটার নীচে একটা টুকরো পাথর এনে রাখে। এক হাতে পরনামিয়া পাথরটা তুলে লতাটার ওপর মারে। বাঘারুর মুখে হাসি ফোটে। এমন ধার তার পাথরের, এক কোপেই প্রায় কেটে যয়। বাঘারু একটানে থেঁতলানো জায়গাটা ছিঁড়ে ফেলে। এবার, আর-একটা গিঠ দেবে আগার দিকে।
শেষ পর্যন্ত যা হয়, সেটা নিয়ে বাঘারু দাঁড়ায়! দাঁড়িয়ে, ঝোলায়। ঝুলিয়ে, দেখে নেয়। আগায় আর গোড়ায় দুটো আড়াআড়ি, আর সেই দুটো গিঠকে যোগ করে লম্বালম্বি একটা গিঠ। একটা খাঁচার মত হয়ে গেছে। পাতাগুলো স্রোতের ধাক্কায় বেরিয়ে যেতে পারবে না। কিন্তু ঢিলে হয়েছে। এক ভরসা ঐ মাঝখানের খুঁজে-খাজে পাতাগুলো আটকেই আছে। আর পাতাগুলো পিছল নয়।
কিন্তু পাতাগিলা ত ঝুলিবার নাগিবে, হাত বরাবর কাঁধত। কাধ থেকে ঝোলানোর ফাসটা বাঘারু এবার বানায়।
পাথরটা পেঁচানোর জন্যে বাঘারুকে এত কিছু ভাবতে হয় না। সে আন্দাজমত অংশ কেটে নিয়ে চ্যাপ্টা পাথরটাকে আড়াআড়ি লম্বালম্বি পেঁচিয়ে, একটা গিঠ মেরে, খানিকটা ফাঁক দিয়ে, একটা ফাস বানিয়ে নেয়। ব্যাস, মালার মত হয়ে গেল। বাঘারু দাঁড়িয়ে ফাস হাতে নিয়ে ঝোলায়। ব্যাস, ঝুলিও নিগার পারি। বাঘারু ফাসটা গলায় পরে নেয়। পাথরটা তার বুকের কাছে দোলে। সেটা দুলে-দুলে বুকে লাগবে কি না দেখতে কয়েক পা হাঁটে। কিন্তু নদীর ভিতর পাথরখানা দুলিবে কেনে। স্যালায় ত সঁরিবার নাগিবে। বাঘারু থেমে যায়। কিন্তু তার পরই তার মনে আসে, পাড়ে উঠেও ত পাতাগুলো কাঁধে ও পাথরটা গলায় ঝুলিয়ে সে হাঁটতে পারে। বাঘারু পাথরটা গলা থেকে খুলে ফ্লাসটা আর-একটু ছোট করে নেয়, যাতে পাথর দুলে বুকে লাগার বদলে সেঁটে থাকে।
তাও বেশ খানিকটা লতা বেঁচে যায়। বাঘারু কুকুরটার দিকে তাকায়। সেটা তখন নিজের লেজ ধরার জন্য পেছনের দুই পায়ের ভেতর দিয়ে মুখ গলাতে গিয়ে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। শালো, ভোখা না-হয়, বোকা, হে বোকা এইঠে আয়। কুকুর তার কথা শোনে না। বাঘারু চেঁচায়, এততি আয় বোকা। তার পর বা হাতে কুকুরের ঘাড় ধরে এনে তার গলায় বাকি লতাটা পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে দেয়। থাকুক, কুখন কুন কামে লাগি যায়, কায় জানে।
এইবার বাঘারু নদীর দিকে চলে। বুকে পাথর ঝুলছে। কাঁধে পাতা। পাশে তার কুকুর, গলায় লতা পেঁচানো। বাঘারু সরাসরি নদীর পাড়ে চলে আসে। তারপর পাড় দেখতে-দেখতে হাটে, কোথায় নামা যায়। পাড়টা উঁচু ও ভাঙা। কিন্তু পাথর আছে–ছোট-বড় নানা সাইজের পাথর। পা দিয়ে-দিয়ে নীচে নেমে যাওয়া যায়।
