বাঁ হাতটা কুকুরের ঘাড়ে ঢোকানোয় বাঘারুর বা বাহু ও ঘাড় ওর মুখের নাগালের ভেতর চলে। আসে। কুকুরটা বাঘারুর বাহুটা হাঁ করে কামড়ে ধরে। বাঘারু তার বাহুতে সঁতের ধার টের পায়। ডান হাতটা দিয়ে একটু ঠেলে রেখে তপ্ত শাসে বাঘারু বলে, খাড়ো, খাড়োকনেক, খাড়ো। ডান পাটা একটু সরাতে হয় বাঘারুকে। আর তখনই কুকুরটা এমন তীব্রতায় ডান থেকে বায়ে তার ঘাড় ঘোরায় যে বাঘারুকে পা হড়কে চিৎপাত পড়ে যেতে হয় মাটিতে। কুকুরটা পাশে পড়ে যায় কিন্তু চার পায়ের ওপর ঠিক দাঁড়িয়ে পড়ে। আর এইবার যেন ভাল বাগে পেয়েছে এমন ভাবে বাঘারুর ঘাড়ের খাজটার দিকে হা করে মুখ এগিয়ে দেয়। খাড়ো, খাড়ো, বলে বাঘারু ওকে ঠেকাতে চায়। কিন্তু তবু ও জোর খাটায় দেখে, হেসে ফেলে, বাঘারু দু হাতে ওর ঘাড় ধরে, শা-লো বলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
কুকুরটা বাঘারুর পায়ের দিকে গড়িয়ে যায়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। ততক্ষণে, বাঘারু উঠে পড়ার জন্য মাথা থেকে পা পর্যন্ত আকাশের দিকে ধনুকের মৃত তুলে দিয়েছে। সেই ভঙ্গিকে আহ্বান ভেবে তার দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে কুকুরটা বাঘারুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু ও নিচু থেকে ঝাঁপ দেয় বলেই ধপ করে বাঘারুর বুকের ওপর পড়ে যায় আর বাঘারু আবার চিৎ হয়ে পড়ে। এবার কুকুরটা তার ওপরে।
শালো, বার বার কছি খাড়ো, তা শুনিবার চাহে না, বাঘারু তার শক্ত দুই হাতে জড়িয়ে ধরে কুকুরটাকে পাশে কাত করতে নেয়। কুকুরটাও তার শরীরের ওজনে বাঘারুকে চেপে রাখতে পারে খানিকটা। বাঘারু তার দুই হাঁটুকে সঁড়াশির মত করে নিয়ে কুকুরটাকে কাত করে ফেলে। তার পর সেই ঝোঁকেই ওটাকে আরো শাস্তি দিতে চিৎ করে ফেলে। কুকুরটার পাশে উপুড় হয়ে বাঘারু হাত আর পায়ের জোরে কুকুরটাকে চিৎ করে ঠেসে রাখে। আকাশের দিকে চার ঠ্যাং তুলে আর মুখটা একবার ডাইনে আর একবার বায়ে ঘোরাতে-ঘোরাতে কুকুরটা কুঁই কুঁই শুরু করে, ছাড়া পেতে গায়ে আঁকি দেয়। শালো, বার বার কছি, খাড়ো, খাড়ো, শুনিবার চাহে না। বড় গরম দেখাছিস্? এ্যালায় থাক কেনে এ্যানং চিৎ হয়্যা।
যেন তার জবাবেই কুকুরটা কুঁই কুঁই করে ওঠে–অ্যালায় কুঁই কুঁই করিবার ধইচছিস! বাঘারু বা হাতের আর বা পায়ের চাপে ওকে চিৎ রেখে, নিজে যেন বিশ্রামের জন্য নিজের ডান কনুইয়ের ভাজে, কপাল ঠেকায়। কুকুরটা আরো করুণ কুঁই কুঁই শুরু করে আর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়তে চায়। শালো, বলে বাঘারু হাত আর পায়ের চাপটা শিথিল করতেই কুকুরটা এক ঝটকায় সরে যায়। বাঘারুর হাত আর পা ওখানেই পড়ে থাকে। সে আর চোখে খোলে না। মাথা গুঁজে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে।
ছাড়া পেয়ে কুকুরটা প্রথমে কয়েকবার গা ঝাড়া দেয়। একবার ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, যেন বাঘারু ওখানে নেই। শেষে বাঘারুর দিকে তাকায়। বাঘারু অমন চুপচাপ উপুড় হয়ে শুয়ে থাকায়, নড়াচড়া না করায় আর তার বা-হাত বাঁ-পা ঐ রকম ছিটকে থাকায় কুকুরটার যেন কেমন সন্দেহ হয়। সে নরম গলায় ঘেউ ঘেউ ডেকে ওঠে, বাঘারুকে ডাকতে। তবু বাঘারু নড়ে না দেখে মাটি শুঁকতে-শুঁকতে বাঘারুর হাতের কাছে আসে। হাতটা শোকে। বাতাসটা সেঁকে। আর দু পা এগিয়ে এসে বাঘারুর পিঠটা শুঁকতেই থাকে। ওর ঠোঁটের ভেজা ঘেঁয়া বাঘারু সারা পিঠময় পেতে থাকে!
তার পর হঠাৎ কী-একটা দেখে কুকুরটা বাঘারুর পিঠ থেকে মুখটা তুলে ফেলে, যেন ভয় পেয়েছে এমন গলায় চাপা গরুর আওয়াজ করে। তার পর আবার বাঘারুর ডান পিঠের ওপরের জায়গাটা শুঁকতে থাকে। শুঁকতে-শুঁকতে গরুর আওয়াজ করে। তার পর ঠোঁটটা হেঁয়ায়, আওয়াজ বন্ধ হয়। পেছনের পায়ের নখে মাটি আঁচড়ায়। ঘন-ঘন শ্বাস পড়ে কুকুরটার। বাঘারু বোঝে, কুকুরটা তার পিঠে বাঘের থাবার দাগ চিনতে পেরেছে।
বাঘারু টের পায়, এইবার চাটতে শুরু করল। গরম কর্কশ সেই চাটায় বাঘারুর আরাম লাগে। জিভের টানে পুরনো জখমের জায়গাটা শিরশির করে ওঠে। আর..লালায় ভিজে যায়। চেটে-চেটে পরিষ্কার করে নিয়ে কুকুরটা আর-এক জন্তুর পুরো থাবাটার দাগ থাবাহীন মানুষটার শরীরে চিনে নিতে চায়।
.
০৬৬.
নির্বাসনের দিকে
কুকুরটাকে দেখার আগে বাঘারু যেদিকে যাচ্ছিল, এখন কুকুরটাকে নিয়ে সেই ঝোপঝাড় গাছপালার দিকে যায়। কুকুরটা বাঘারুর পায়ে-পায়ে চলছিল না; নিজের মত চলছিল। মাঝে-মাঝে নিজের লেজ ধরার জন্যে নিজের চারপাশে পাক দিয়েও নিচ্ছিল।
পাতা আর পাথরগুলো বাধার কিছু একটা পেলেই হয়নদীটুকু পেরতে। ওপারে উঠলেই ত ফরেস্ট। একটা ঝোপের ওপরে-লতানো একটা পাতা দেখে বাঘারু টান দিয়ে দেখতে গেলে, ছিঁড়ে যায়। এত কিছুর দরকারই ছিল না, একটু পোয়াল পেলেই হত। সেই একটু পোয়াল পাওয়া গেল না। বা, সারা রাস্তায় একটা ভামনি বন পড়ল না।
একটা পাকুড় গাছ থেকে সরু ঝুরি নেমে এসেছে। দেখে বাঘারু দাঁড়ায়। শুকনো। শক্ত হবে। প্যাঁচ লাগে নি। তা হলে হয়ত ছেঁড়াও যাবে।
ছেঁড়া যায় কি না পরীক্ষা করতে বাঘারু এক হাতে ঝুরিটা ধরে হেঁচকা টান দেয়। টানটা পুরো তার হাতেই লাগে। বাঘারু আবার তার হাতে প্যাচায়। টেনে ছিঁড়তে না-পারলে ঐ পাথরটা এনে তেলে কেটে নেবে। আর-একটা পাথর এনে, তার ওপর, ধরে।
