নিজের সঙ্গে এই কথাবার্তার শেষে বাঘারু হায়হায়পাথারের এই শুয়োরের ডাঙার তলা থেকে কুকুরটার দিকে তার লম্বা হাত বাড়িয়ে ডাকে, সিও সিও।
মুহূর্তে কুকুরটা সোজা হয়ে যায়, যেন যাচাই করতে চায় ডাকটা সত্য কি না। সোজা হয়ে লেজ-কান-নাড়ানো বন্ধ করে ওপারের ফরেস্টের দিকে ঘাড় তুলে তাকায়। মোক ঢক দেখাছে? চেহারা দেখাচ্ছে, বাঘারুকে। বাঘারুর অবিশ্যি দেখতে ভালই লাগে কান খাড়া, ঘাড় সিধা, ঠ্যাং সরু-লম্বা, বুক বড়। শালো, ঝাপিবার পাড়িবে। ঝাপাতে পারবে। কিন্তু দৌড়? বাঘারু ত এখনো ওর পিঠ আর পেছন দেখে নি।
বাঘারু আবার তার ডান হাতটা তুলে দেয়, সিও, সিও। এই দ্বিতীয় ডাক শুনে কুকুরটা আর না-নড়ে পারে না। দু পা নেমে দাঁড়িয়ে পড়ে। অন্য দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়ায়। যেন, এখন বাঘারুরই এগিয়ে আসার কথা। এই বাঘারু আর এই কুকুরের ত একবারও চোখাচোখি হয় নি, তাদের চামড়ায়-চামড়ায় একবারও ঘষাঘষি হয় নি। এখনো ত তারা দুজন দুজনের ভাষা জানে না। অন্তত একবার জেনে নেয়া দরকার। মাত্র একবারই। কুত্তা আর গাই, যা কওয়াছেন তাই।
বাঘারু কুকুরটার দিকে উঠতে শুরু করে।
কুকুরটা অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একটা নতুন মানুষ তার দিকে উঠে আসছে আর সে দাঁড়িয়েই আছে এই অনিশ্চয়তা তার পক্ষে অসহ্য বলেই যেন ঘাড়টা ফেরানো। কিন্তু বাঘারু মাঝামাঝি পর্যন্ত উঠে এসেছে দেখে সে একবার বাঘারুকে না দেখে পারে না। ততক্ষণে লেজকান ঘাড় নাড়ানো শুরু হয়ে গেছে। খুব দুর্বল ভাবে একবার দেখে নেয় শুয়োরের ডাঙার পিঠটা-পালিয়ে যাওয়ার পথ। বাঘারু কুকুরটার কাছে চলে এসেছে। কুকুর তার গলাটা মাটির ও বাঘারুর দিকে লম্বা করে দু-পা পেছিয়ে যায়। বাঘারু আর দু-পদক্ষেপেই তার একেবারে কাছে এসে পড়ে।
এখন বাঘারু কুকুরটাকে ধরে ফেলতে পারে। কিন্তু ধরে না। এখন কুকুরটা লাফিয়ে পালিয়ে যেতেও পারবে না। লেজটা ঠ্যাঙের মধ্যে দিয়ে কুকুরটা কুঁই কুঁই শুরু করে। না-নড়ে, শুধু হাত বাড়িয়ে ওর গলটা বাঘারু ধরতে গেলে, কুঁই কুঁই করতে করতে একটু সরে যায়। বাঘারু আর এগয় না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, দুই হাত সামনে বাড়িয়ে ডাকে, সিও, সিও। ডাকে, ফিসফিস করে।
ঘাড় লেজ নিচু রেখেই কোনাকুনি তাকিয়ে কুকুরটা যেন বুঝে নিতে চায়, শেষ বারের মত স্বাধীনভাবে, বাঘারুকে। এখন ত সে সবটাই বাঘারুর হাতের সীমানায়। কিন্তু বাঘারু আর এগচ্ছে না। কুকুরটা একবার এগিয়ে ধরা দিয়ে ফেললে তার ফেরার আর-কোনো পথ থাকবে না। তার গৃহহীনতার টান কুকুরটা শেষবারের মত বোধ করছে। বাঘারুকে সে যে চেনে না, সেই ভয়ও তার এখন চরমে। দুটো একসঙ্গেই ছিঁড়বে। ভেঁড়ার সেই শেষতম মুহূর্তের টানে কুকুরটা মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল।
কিন্তু কুকুরটা জানতই তাকেই একটি পা বাড়িয়ে দিতে হবে এবার–যত ভয়ে-ভয়েই হোক। গলাটাও বাড়িয়ে দিতে হবে এবার মাটির সঙ্গে লেপটে হলেও।
কুঁই কুঁই করতে করতে দুপা আসে। বাঘারু কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কুকুরটা লেজ নাড়ে। বাঘারু তাকে ছোয় না। কুকুরটা বোঝে, হেঁয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। তখন সে অতি ধীরে-ধীরে তার মুখটা তুলতে থাকে। প্রথমে বাঘারুর দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে সেই নদী-ফরেস্টের চেনা দৃশ্যের দিকে। তার পর, তার সম্মুখতম অচেনা দৃশ্যের গায়ে। কিন্তু তখনো বাঘারু তার হাত অথবা পা কুকুরটায় গায়ে হেঁয়ায় না। কোনো পশুর পক্ষে এতটা সময় নিজের ক্ষমতা প্রয়োগসীমার সম্পূর্ণ বাইরে থাকা সম্ভব নয়। লেজ নাড়ানো বন্ধ করে কুকুরটা বাঘারুর কোমরের দিকে মুখ তোলে। পেছনের পা দুটো দিয়ে মাটি আঁচড়ায়। কিছু নুড়ি-পাথর ঝুরঝুর ঝরে যায়। কুকুরটার মুখের দিকে হাসি-হাসি মুখে একটু তাকিয়ে বাঘারু ডান হাতে খুব নরম করে কুকুরের মুখটা চেপে ধরে। হাতের তালু কুকুরটার ঠোঁটের ওপরে।
সে এই ইঙ্গিতটুকু পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল, তার ভেজা ঠোঁট আরো একটু ঢুকিয়ে দেয় বাঘারুর মুঠোর মধ্যে। বাঘারুর হাতের তালুতে কুকুরের ঠোঁটের জল লাগে। বাঘারু এই ইঙ্গিতটুকু পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। সে দু হাতেই কুকুরের দু গালে আদরের চড় মারে।
.
০৬৫.
বাঘারুর সঙ্গীলাভ
এতটা সময় যে তাকে ঘাড়-বেজ নামিয়ে মাটির সঙ্গে লেপটে থাকতে হয়েছে, সেটা ভুলে যেতে, মুহূর্তের মধ্যে কুকুরটা বাঘারুর মুঠোর ভেতর থেকে ছিটকে সরে যায় আর পেছনের দুই পায়ের ওপর। ভর দিয়ে সামনের পা দুটো বাঘারুর বুকের ওপর তুলে মুখটা বাড়িয়ে দেয় বাঘারুর মুখের দিকে। বাঘারু মাথাটা সরায়। নাকে কুকুরটার গায়ের গন্ধ লাগে। কুকুরটা বাঘারুর গলার কাছাকাছি নাকটা নিয়ে গিয়ে বাঘারুর গায়ের গন্ধ তার ছোট-ছোট শাসে টেনে নিতে থাকে।
কুকুরটা তার বুকে ভর দিয়ে দাঁড়ানোয় বাঘারুর পা হড়কে যেতে শুরু করে। সে কোমরটা আর ব-পাটা একটু এগিয়ে দিয়ে শরীরের ভর ঠিক রাখে।উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা থেকে এতক্ষণ পর ছাড়া পেয়ে কুকুরটা তার বশ্যতার সম্পূর্ণ শারীরিক তৃপ্তি ছাড়া শান্ত হবে না।
বাঘারু তাড়াতাড়ি কুকুরটার সামনের দুই পায়ের নীচে দুই হাত দিয়ে একটু সামাল দিতে চায়। তারপর বা হাতটা কুকুরটার ঘাড়ের লোমের ভেতর সম্পূর্ণ ঢুকিয়ে দিয়ে ঘাড়ের চামড়ার কাছে নখগুলো বেঁধায়। হয়, হয়, সিও, সিও–এই শান্ত করার ধ্বনিতেও বাঘারুর শ্বাসের উষ্ণতা লাগে।
