বাঘারু উঁচুতে উঠছে। হায়হায়পাথারের সেই নিধুয়া ডাঙা যেন বিশাল একটা খেপা শুয়োর–লেজটা মাটিতে লাগিয়ে মাথাটা সিধে নিয়ে উত্তরের পাহাড়ের দিকে ছুটে যাচ্ছে। ঘাস নাই, গাছ নাই, চাষ নাই, বাড়ি নাই। শুয়োরের বা পেট বেয়ে বাঘারু উঠছিল, পেছনের বা পায়ের পাশ দিয়ে।
বাঘারুর চোখ এখন পায়ের দিকে লাল-লাল পাথরে ছাওয়া চড়াই। এই রকম পাথর এদিকে দেখা যায় না। এ-পাথর পাহাড় থেকে নদী বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে গোল হয়ে নামে নি। মনে হয় যেন খুব একটা ভাঙাভাঙি হয়েছিল এখানে। সব পাথরই চোখা। বাঘারু ভাবে, এখানে ধারালো পাথর বোধ হয় খুঁজতে হয় না, হাত দিলেই মেলে। পাথর কথাটা মনে হতেই তাড়াতাড়ি তার নিজের পাথরটা মনে আসে। যেইলা একখান পরনামিয়া পাথথর মোর জুটি গেইছে, ঐলা পাথর কোটত মিলিবে?
শুয়োরের ভাঙার পিঠটা ডান দিকের ঢাল বেয়ে নদীর দিকে নামার সময় বাঘারু পা দিয়ে-দিয়ে দু-একটা পাথর গড়িয়ে দিতে চায়, দেখে মজা পেতে। কিন্তু প্রায় কোনো পাথরই নাড়াতে পারে না, দুটো একটা আলগা পাথর ছাড়া। এই সব কি পাথরের গাছ? সব মাটির ভিতরঠে মাথা তুলিছে…! উঁচু থেকে নামছে বলেই বাঘারু এখন অনেকটা দৃশ্য দেখতে পায়–এই পাথরের শেষ, সবুজের শুরু, জলের রেখা, চা-বাগানের সীমা, টাড়িবাড়ির গাছগাছড়া। আরমাল নদীর ওপারে ফরেস্টের ছাইরঙা দেয়াল, দূর থেকে সব ফরেস্টকেই যেমন লাগে, মনে হয় ঢোকা যাবে না। মাল নদীর ওপারে এই যে-ফরেস্ট শুরু হল, এর আর শেষ নেই। মাঝে হাইওয়ে আছে, চা বাগান আছে, রেল লাইন আছে, নদী আছে, নদীর চরও আছে–কিন্তু সে সবই ফরেস্টের মধ্যে। এই ফরেস্টের ভেতরেই একটি জায়গায় গিয়ে বাঘারুকে পৌঁছতে হবে। ডায়না ফরেস্টে।
নামতে নামতে আবার দৃশ্য কমতে শুরু করে। কিন্তু বাঘারুকে একটা কিছু খুঁজতে হবে, এই পাতা আর পাথর বাধতে। তাকে একটু দেখতে হবে, কোথাও দড়ির মত কিছু পাওয়া যায় কিনা।
বাঘারু দাঁড়িয়ে মাথা থেকে পাথরটা ডান হাতে নামায়। বা হাতে পাতা আর ডান হাতে পাথর ঝুলিয়ে সে নামতে শুরু করে।
.
০৬৪.
কুকুরের সাড়া
নদীর একটু ওপরে, ঢালের গায়েই বাঘারু মাটির ওপর পাতাগুলো রেখে পাথর চাপা দেয়। তার পর খালি হাতে নামে। ঘাড় ঘুরিয়ে একটু দেখে নেয় পাতা-পাথর ঠিক থাকবে কি না। দড়িদড়া বা পোয়ালা বা লতাগোছের কিছু পায় কি না দেখতে বাঘারু এদিক-ওদিক ঘুরবে। এগুলো বেঁধে না-নিলে মাল নদ পেরনো যাবে না।
নীচে নেমে ফিরে তাকিয়ে বাঘারু দেখে, শুয়োরের ডাঙার এই ঢালের ওপরের দিকে একটা কুকুর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে। ডাঙার মাথার দিকে কুকুরের লেজ, ডাঙার লেজের দিকে কুকুরের মাথা। মুখটা এখন এদিকে ঘোরাচ্ছে-ফেরাচ্ছে–ফরেস্টের দিকে ওপারে, বাঘারুর দিকে এপারে, এমন-কি, এই দুইয়ের মাঝখানে নদীর টুকরোটার দিকেও।
বাঘারু তাকে দেখল এটা সে বুঝেছে–জানাতে কুকুরটা ঘাড়ের সঙ্গে সামনের পা দুটোও এদিকে সামান্য একটু ঘোরায়, নদীর দিকে চোখ রেখেই। লেজটাও একটু নাড়ায়। ভাবটা, তারও ওপারেই যাওয়ার কথা।
কিন্তু এই ডাঙার ওপর কুকুর আসবে কোত্থেকে? পথ হারিয়ে ফেলেছে? কুত্তায় আস্তা (রাস্তা) হারায় না। বাগানের দিক থেকে এসেছে? আসিবা পারে, কিন্তু কেনে? তা হলে কি বাঘারুরই পেছন-পেছন কোথাও থেকে চলে আসছে? কোনঠে? বাঘারু ত টের পায় নি। মাথায় পাতা থাকায় বাঘারু অবশ্য পায়ের সামনেটুকু ছাড়া কিছু অনেকক্ষণ ধরে দেখতেই পাচ্ছিল না। কিন্তু কুকুরটা কি একবারও তার সামনে আসে নি। আওয়াজও ত পায় নি। ভোখিবার ধরে নাই, একবারও? না-ও ডাকতে পারে। পেছন-পেছন এসেছে, ডাকতে যাবে কেন। বাঘারু কি একবারও পেছন ফিরে তাকায় নি? পাছত চাও নাই? শেষ কখন পেছনে তাকিয়েছে বাঘারু?
এতটা দূর একা হেঁটে এসে, এমন ডাঙায় ফরেস্টে ঢোকার আগে শেষ নদীটায় ও ওপারে ফরেস্টের গভীর নির্জনতার সামনে বাঘারুর যেন বড় দরকার হয়ে পড়ে, কুকুরটা যে তারই পেছু-পেছু এসেছে, নিজের কাছে সেটা প্রমাণ করার। কুত্তা আর গাই, যা কওয়াবেন তাই।
ডেমকাঝোরা পার হয়ে, পাড়ে পাতা আর পাথর রেখে, বাঘারু চার পাশে তাকিয়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। তার পর, আবার মাথায় নিয়ে রওনা দিয়েছে। ঘঁটি আসিছে। হাটি আসিছে। আর ত পেছন ফিরে তাকায় নি। আর ত পাছত না তাকাই। সেই টাড়িটায় একটা বিরাট কুকুরের দল বাঘারুকে ঘিরে ধরল।
এই পর্যন্ত ভাবতেই বাঘারু যেন থই পেয়ে যায়। তখনই এই কুকুরটা তার পেছনে ছিল? সেই জন্যেই টাড়ি বাড়ির কুকুরের পাল এত খেপে গিয়েছিল?- না-হয় তা বাঘারুক দেখি এ্যানং ভোকিবার ধরিবে কেনে? বাঘারু সাহেব না-হয়, বাঘারুর মাথাত্ টুপি নেই, বাঘারুর ভটভটিয়া নাই, বাঘারু ত নিজের এই দুইখান পায়ের উপর খাড়া একখান মানষি। কুত্তালা ত চিনিবার পারে। ত স্যানং ভোকিবার ধরিল কেনে?
নিশ্চয়ই এই কুত্তাটাও তখন পেছনে ছিল আর টাড়ির দল এই দলছুট কুত্তাকে তাড়া করেছিল।
–এইখান ত একবারও ভোকে নাই? তাড়িখোয়া কুত্তার ডোকাভুকি নাই। এইখান ত একবারও সমুখত আসে নাই? সমুখত কায় আসিবে? দুই ঠ্যাঙের ভিতর ন্যাজখান ঢুকাই মোর দুই ঠ্যাঙের ভিতর সিন্ধাইছে? ত মুই দেখ নাই? কোন কুত্তা তাড়িছে আর কোন কুত্তা তাড়ি খাছে? কায় জানে? দেখিছু কিন্তু বুঝিবার পার নাই।
