.
০৬৩.
কুকুরের তাড়া
এখন বাঘারু মাথায় তরিকা পাতাগুলো, একটার পর একটা,লম্বালম্বি। খাজে-খাজে মিলে আছে। তার পরে, ঠিক বাঘারুর মাথার ওপরে পাথর। পাথরটা একটু এদিক-ওদিক হলে পাথরের ভারে যাতে পাতাগুলো ভেঙে না যায়। এতক্ষণ এক হাতেই পাতাগুলো ধরে হাটছিল। এখন, দুই হাতে ধরে ডেমকাঝোরায় নামছে।
ডেমকাঝোরা ছোট খালের মত নদী, কিন্তু পাড় বেশ উঁচু। মাথায় পাতা আর পাথর নিয়ে বাঘারুকে পা টিপেটিপে নামতে হয়। জলে নামার আগে মাটিতে বসে পড়ে। ডান পা দিয়ে জলে নামার জায়গা পরখ করে, ঘুরে দাঁড়িয়ে বা হাতে পাড় আর ডান হাতে পাতা ধরে বা পাটা ধীরে-ধীরে নামিয়ে, ঘুরে যায়। জলে একবার নেমে পড়ার পর দু হাতে পাতাগুলো ধরে বাঘারু ধীরে ধীরে এগয়।
যদি একটা গামছা বা ত্যানা থাকত, বা রাস্তায় যদি কিছু পোয়াল পেয়ে যেত, তা হলে একটা বিড়ে পাকিয়ে, মাথার ওপর পাতা আর তার ওপর পাথর দিয়ে, দু হাত ছেড়েই হাঁটতে পারত। এক হাতে পাতা, আর-এক হাতে পাথর ঝুলিয়ে হাঁটা যায় না–দুই হাতই আটকে যায়। পথে যদি কোনো ভামনি বন পায়, তা হলে একটা বিড়ে পাকিয়ে নেবে।
জলটা যদি আচমকা কোথাও বেশি হয়ে যায়, তা হলেই বিপদ। সে জন্যেই বাঘারু দুই হাতে পাতাগুলো শক্ত করে ধরে রাখে, যাতে তেমন হলে পাতাগুলো নামিয়ে সামনে ভাসিয়ে, পাথরটাকে এক হাতে নিয়ে সে একটু সাতরে যেতে পারে।
এইবার জলটা কোমর পর্যন্ত ওঠে। বাঘারু এক-পা, এক-পা করে এগয়। আচমকা পাথরটা যদি জলে পড়ে যায় তা হলে ডুবে-ডুবে তুলতে হবে। পাড় সামনে এসে গেছে। এর মধ্যে জলটা আর আচমকা বাড়বে না। তবে জলকে বিশ্বাস নেই। হয়ত পাড়ের কাছেই একটা গভীর গর্ত হয়ে আছে। সামনের পাড় এসে গেল।
বাঘারু আগে পাতা আর পাথর নামিয়ে রাখে, তার পর নিজে ওঠে। সে উঠে দাঁড়াতেই তার গায়ের জলে জায়গাটা কাদা হয়ে যায়। বাঘারু দু হাতে শরীরের জল কাঁচে। এদিক-ওদিক তাকায়। সে আরো একবার তার গায়ের জল কেচে ফেলে। তার পর পাতা আর পাথর মাথায় তুলে, দু হাতে একটু ঠিক করে নিয়ে, আবার হাঁটতে শুরু করে।
হাটের লোকজনের যাতায়াতে ডেমকাঝোরা থেকে হায়হায়পাথার যাওয়ার একটা ছোট কাঁচা রাস্তা। তৈরি হয়ে গেছে। সেই রাস্তায়, সামনে একটা বড় টাড়িও দেখা যায়। তা হলে কি বাঘায় সেখান থেকে একটু দড়ি চেয়ে নেবে, পাটের? না হয় ত, কিছু পোয়াল? পাতা আর পাথর বেঁধে নেবে, বিড়ে পাকাবে।
যে-কাঁচা রাস্তা দিয়ে বাঘারু ঐ টাড়িতে ঢুকছিল, তার ওপর একটা কুকুর শুয়ে ছিল। সামনেই একটা টিনের চালের বড় বাড়ি। ঐ বাড়িতেই ঢুকবে বাঘারু।
বাঘারুর পায়ের আওয়াজ শুনে কুকুরটা শুয়ে থেকেই, চোখ না খুলেই, একবার ডেকে দিল, ঘেউ। তার আওয়াজে বাঘারুর পায়ের আওয়াজ থামে না দেখে, সে আবার ডাকে, ঘেউ। বাঘারু তার পাশ দিয়ে হনহনিয়ে চলে যায়। বাঘারুর মাটিকাঁপানো চলনে কুকুরটা চমকে ঘাড় ঘোরায়। তার পরই ঘেউ-ঘেউ আওয়াজে আকাশ ফাটিয়ে বাঘারুকে তাড়া করে। কুকুরটা বাঘারুর পাশ দিয়ে ছুটে সামনে গিয়ে দাঁড়ায় আর তার পথ আটকে আকাশ-ফাটানো চিৎকার জুড়ে দেয়। বাঘারু তার গতি একটুও না কমিয়ে হনহন করে এগিয়ে যাওয়ায়, কুকুরটা দৌড়ে সরে যায়, আবার ফিরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে। সামনে ডান হাতে সেই বড় বাড়ি, বাঘারু ঢুকবে। কিন্তু প্রথম কুকুরটার ডাকাডাকিতেই হোক, আর, বাঘারুর চলার গতিতেই হোক, ঐ বাড়িটা থেকেই দশবারটা কুকুর একসঙ্গে বেরিয়ে এসে বাঘারুকে ঘিরে ধরে এমন চেঁচানো শুরু করে, যেন অন্ধকার রাত্রিতে পাড়ায় ডাকাত পড়েছে। কুকুরগুলো বাঘারুকে এমনই ঘিরে ফেলে কিছুতেই এগতে দেবে না। এখন যদি বাঘারুকে ঐ বাড়ির বাহির এগিনায় ঢুকতে হয় তা হলে কুকুরগুলোকে ঠেলে এগতে হবে। বাঘারু আর ঐ হাঙ্গামায় না গিয়ে সোজা হাঁটতে থাকে, একই গতিতে। বাঘারু চলার গতি একটুও কমায় না দেখে কুকুরগুলো সামনের পথটা ছেড়ে দিয়ে তাকে তিনদিক থেকে ঘিরে চেঁচাতে থাকে। টাড়িটার শেষে বাশঝাড়। ডাইনে রেখে রাস্তাটা বায়ে বেঁকেছে। তার বায়ে টাড়ির বুড়িঘর পাটকাঠি দিয়ে তৈরি। কুকুরগুলো ঐখানে দাঁড়িয়ে পড়ে আর বাঘারু বাঁক নেয়। একটা কুকুর তবু ডেকে-ডেকে ওঠে। বাঘারু বাশঝাড়কে ডাইনে রেখে ডাইনে বাক নিয়ে আড়াল হয়ে গেলে, একটু পরে শুনতে পায় কুকুরগুলো আবার একসঙ্গে অলস ডেকে উঠে, ধীরে-ধীরে একে-একে থামতে শুরু করে। মাঝেমধ্যে একটা কুকুরের ঘেউ-ঘেউ ডাক ওঠে। তার পর সেটাও থেমে যায়।
বাঘারু দাঁড়িয়ে দু হাতে মাথার পাতাটা একটু সরিয়ে দেখে, বায়ে তার পেছনে হায়হায়পাথার চা বাগানের সীমা। একটু বুঝে নিতে, আরো একটু দেখতে হয় বাঘারুকে। ডেমকাঝোড়া নদী নিশ্চয়ই ঐখানে একটা বাঁক নিয়েছে। নদীটাকে বায়ে রাখতে এই রাস্তাটা ডাইনে ঘুরে, আবার বায়ে ফিরে, চা বাগানের দিকে গেছে। বাঘারু আর-কিছুতেই চা বাগানে ঢুকবে না। সে রাস্তা ছেড়ে মাঠে নেমে পড়ে। সোজা গিয়ে হায়হায়পাথারের ডাঙা পার হয়ে উত্তরে হাঁটলে শালবাড়িতে উঠবে। শালবাড়িতে–ও উঠতে পারে, দক্ষিণ দিয়ে ফরেস্টে ঢুকে ফরেস্টের ভেতর দিয়ে দিয়েই হাইওয়েতে উঠবে। তার পর হাইওয়ে ধরেই চালসা হয়ে নতুন রোড ধরত পারে। আবার, ফরেস্টের ভেতর দিয়েও যেতে পারে। সে, তখনকার কথা তখন। এখন, সামনে মাল নদী। পাতা আর পাথরটা তার আগে বেঁধে ফেলতে হবে।
