বাঘারু পাথরের আকারটাকে বুঝতে চায়। হাত-দাওয়ের নাখান? গর্তখান নাই ত? কাটিবার গর্তখান? বরং সে দিকটা ভরা। কিন্তু আকারটা যেন তার চেনা-চেনাও ঠেকে। তলার দিকটা সরু। এক মুঠোতেই ধরা যায়। ডান হাতের মুঠোতে পাথরটা ঝুলিয়ে হাতটা দোলায়। পাথরটা দোলে। দোলাতে-দোলাতে হাতটাতে গতি আনে। তার পর, পাথরসহ হাতটাকে বেগে মাথার ওপর তোলে। যেন, কোনো কিছুর ওপর নামাচ্ছে এমন ভাবে পাথরটা যখন বাতাস কেটে খাড়া নামায়, তখন বাঘারুর মনে ঝিলিক দেয়, পাহাড়ি মানষিলার খুরকির নাখান?
বাঘারুর নামানোর বেগে হাতটা পাথরসহ আবার দোল খায়। দুলুনি থেমে এলে দুই হাতে পাথরটাকে ধরে। তার পর আবার পাথরটাকে দেখে, এই পাথরটা হলেই চলে যাবে বাঘারুর, পাতা না-হলেও। কত ভাবেই না পাথরটাকে ব্যবহার করবে সে, ভেবে, দুই হাতে পাথরটাকে মাথার ওপর ট্রন-টান তোলে। তুলে দেখবার জন্যে নিজেই ঘাড় ভেঙে তাকায়।
ঘাড়টা এতই হেলানো বাঘারুর, আকাশের টলটলে নীলটাই শুধু দেখতে পায়, ওপর থেকে তাকে ঢাকা দিয়ে ফেলেছে যেন। দুই হাতে ধরা পাথরটা সেই নীলে উৎক্ষিপ্ত। বাঘারু দেখে, ঐ পাথরের মাথা থেকে, বাঘারুর মুষ্টি, কব্জি, পুরোবাহু ও বাহু পর্যন্ত একটাই পাথর যেন। দেখাটা এমন ঘটে যায় বলেই ঐ নীলে ক্ষোদিত পাথরের আকারটাকে চিনে নিতে পারে বাঘারুতার বাহু, পুরোবাহু, কব্জি আর দুটো হাত নমস্কারের মত জোড়া করা একটা পাথর যেন! পরনামিয়া পাথর।
বাঘারু পাথরসহ হাত দুটি নামিয়ে আনে। তার পর, এক হাতের মুঠোতে যেন এক জোড়া হাত ধরে নাড়তে নাড়তে তরিকা গাছের ঝাড়ের দিকে ছোটে।
ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে বাঘারুর একটু অসুবিধা হয়। সে যেমন তার শরীরের ভারে নেমে আসতে পারে, সহজে, তেমনি, সেই ভারের জন্যেই, নুড়ি আর কুচি পাথরে ভরা ঢাল বেয়ে উঠতে পারে না, পাথরগুলো গড়িয়ে যায়। ঢালের মাথায় পৌঁছে একটা কিছু ধরার দরকার হয়। না হলে, তরিকা গাছের গোড়ায় একটা পা তুলতে আর-একটা পায়ে যে ভর দেবে, তাতেই হড়কে পড়ে যাবে। বাঘারু ঢালের মাথায় পাথরটা রাখে। তার পর মাটির একটা খুঁজ ধরে, হেঁচড়ে ওপরে উঠে পাথরটা নিয়ে দাঁড়ায়।
বাঘারু পাতা বাছতে শুরু করে। পাতা বড় হলেই হবে না, সোজা হওয়া চাই। তরিকা পাতার মজাই এই, টিনের মত খাজ কাটা। একটা পাতার জের ওপর আর-একটা পাতা বসে যেতে পারে। বৃষ্টির জল ঐ খুঁজ দিয়ে গড়িয়ে যায়। পাতা যদি বাকাচোরা হয়, খাজে-খাজে না মেলে, জল ভেতরে গড়িয়ে পড়ে। পাতা খুব বেশি বড় হলে, পাশের দিকটা ছড়িয়ে যায়–কলাপাতার মত। আর নিজের ভারে-ভারে বেঁকে চুরে যায়। বাঘারু তাই এমন একটা পাতা খোঁজে যেটা বড় কিন্তু বুড়ো নয়; কলাপাতার মত দু পাশে ছড়িয়েছে কিন্তু বেঁকে যায় নি। এমন একটা পাতা, যার মাঝখানের খাজটা গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত, নিটোল।
তরিকা গাছের এমন সারিতে, এমন তরতরিয়ে বেড়ে ওঠা পাতার রাশির মধ্যে বাঘারু তার পাতাটি বা পাতাগুলো খুঁজে পায় না, খানিকটা যেন দিশেহারা হয়েই, আর খানিকটা যেন ইচ্ছে করেই, এমন বাছাইয়ের স্বাধীনতা তার আছে বলেই।
দিশেহারা ভাবেই হোক আর স্বাধীন ভাবেই হোক, বাঘারুর এমন বাছাবাছির ভেতর আবার একটা সভয় তাড়াও ছিল।
এই বেড়ার ওপাশেই চা-বাগান। মাঠের মত লম্বা-লম্বা রাস্তা, রাস্তায় রাস্তায় মোড়, মাঠের মত সমান শিরীষ গাছের মাথা। সেখানে পাতি তোলে, নালী কাটে, ডাল ফাড়ে। শেয়ালও যাতে ঢুকতে না পারে, সেইজন্যে এই তরিকা গাছের সারির তলার মাটিচাপা দেয়া আছে! হাতির পাল যাতে ভাঙতে না পারে, সেইজন্যেই তরিকা গাছের কাটা পাতার সারি। পাতা যাতে বড় হয়, বেড়ে ছড়িয়ে পড়ে, সেইজন্যে এই গাছগুলোর ত দেখাশোনাও হয় নিশ্চয়। যে-পাতা এতগুলো কাজের জন্যে রাখা, সেই পাতা বাঘারু কেটে নিচ্ছে! বাঘারুকে যদি ধরতে পারে!
ধরতে পারলে কী হবে, সে-বিষয়ে তার কোনো নিশ্চিত ধারণা নেই। ভয়ও নেই। কিন্তু ধরতে এলে মানুষ পালায়, সেই নিয়মে বাঘারু ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নিতে চায় মাঠটার ভেতর চা বাগানের সীমাটা কদ্দূর। যেন তার ওপরই তাকে ধরা বা না-ধরা নির্ভর করে।
আর দেরি করে না। প্রথম পাতাটা খুঁজতেই সে এত দেরি করছে, অথচ তাকে ত, একটা নয়, ছয-ছয়টা পাতা বের করতে হবে।
একটা পাতা বাঘারু পেয়ে যায়। সেটা যেন কাটা পড়ার জন্যেই খাড়া দাঁড়িয়েছিল। কচি, কিন্তু বড়, মাঝখানের খাজটা নিটোল গভীর! কিন্তু পাতার গোড়াটা গাছের ওদিকে। এদিক থেকে কাটতে গেলে হাতটা বাড়িয়ে ওদিকে দিয়ে তবে কাটতে হবে। সেটা দা-মত কিছু দিয়ে করা যেতে পারে। কিন্তু পাথরটাকে ত ওপর থেকে নামাতে হবে। বাঘারু ছেড়ে দেয়।
বেড়ার এদিকে একটা পাতা পেয়ে যায়। গোড়ার দিকটা একটু হেঁতলানো। কিন্তু বাঘারু ঠিক করে এটাকেই কাটবে। তারপর খুঁজতে হলে, আরো পাঁচটা খুঁজবে। পাতাটা ডালের সবচেয়ে নীচে, এদিকে ছড়িয়ে পড়েছে বাঘারুর দিকে যেন গলা বাড়িয়ে দিয়ে আছে। ডালের যে-জায়গাটা থেকে পাতাটা বেরিয়েছে সেখানে কোপটাও দেয়া যায় বাধাহীন।
পাথরটাকে একবার যাচাই করে নেয়–লোহার অস্ত্রের ধার পরীক্ষার মত। তার পর সরু দিকটা দুই হাতের মুঠোতে চেপে মাথার ওপর তোলে। দমটা টেনে পুরো ধার আর ভারটা নামিয়ে আনে পাতাটার ওপর–নিজের শরীরের ভার যোগ করে। পাতাটা ভেঙে নেতিয়ে যায়। বাঘারু দেখে, গাছের কাটার ধারও কমে গেছে অনেকখানি। পাথরের গা থেকে রস, গাছের কাঁচা চামড়া মুছে নিয়ে বাঘারু আর এক কোপ তোলে।
