পাতার সাইজ দেখে, হিশেব করে বাঘারুকে নিশ্চিত হতে হয়, এই পাতাগুলো কাটার জন্য তার দা বা ছোট কুড়োল দরকার, মুচড়ে নেয়া অসম্ভব। পাথর তেমন একটা পেলে হয়ত চেষ্টা করা যায় কিন্তু তাতে কতক্ষণে কটা কাটা যাবে তার আন্দাজ এখন চলে না। অর্থাৎমুচড়ে নেয়া ত সম্ভবই নয়। পাথর হল সর্বশেষ অস্ত্র। সুতরাং বাঘারুকে পেছন ফিরে ঐ মাঠের ভেতর একটু এগিয়ে পাথর খুঁজতে হয়।
বাঘারু একটু উদাসীনই এগিয়ে চলে। পাথরটা যে সে পেল না, এই ঘটনাটা যেন কোনো জায়গাতেই শেষ হয় না। সে খুঁজতে-খুজতে এরকম পা ফেলে চলবে। তার চলার সঙ্গে এই খোঁজট মিশে যাবে। তার পর সেই চলার নিয়মেই, কোনো এক সময়, খোঁজাটা শেষ হয়ে যাবে। তখন চলবে কিন্তু আর খুঁজবে না। তার আগেই সে খোঁজার নিয়মে পেয়ে যেতে পারে কিন্তু আর ফিরবে না। সেখান থেকে ফিরে আর কাটা চলে না।
বাঘারু লোহার পাতের একটা বান্ডিল, ছোট, দেখতে পায়। চায়ের বাক্স বাধা হয় এই পাতগুলো দিয়ে মুড়ে। সে দৌড়ে গিয়ে তোলে। তার হাতে উঠে আসতেই কিছুটা ঝরে পড়ে যায়। মরচেতে ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। তবু বাঘারু দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বান্ডিলটা খুলতে থাকে। খানিকটা অংশও যদি ব্যবহার্য থাকে।
ছোট পাতের বান্ডিলের একটা মাথা আগে খসে গেছে। কয়েকটা গিঠে গোল-পাকানো আর-একটা মাথা ভেতরে। বাঘারু প্রথমে গিঠগুলো খুলে সোজা করে, তা থেকে একটা টুকরো, সে যত ছোট টুকরোই হোকলোহা ত, বের করতে চায়। কিন্তু গিঠের দু-দিকের পাত ধরে টান দিতেই ঝুরঝুরিয়ে খসে যায়। তখন বাঘারু গিঠ না খুলে তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখে যে ভেতর দিকের কোনো-একটা অংশ একটু আস্ত আছে কিনা। নেই। তখন তার এক হাতের মুঠোর ভেতর লোহার সেই পাতটা গুড়ো-গুড়ো ধুলো করে ফেলে দেয়।
কিন্তু মরচে ধরা লোহার পাতই যদি এমন জুটে যায়, এখানে, তা হলে ত মরচে না ধরা খানিকটা তারও অন্তত বাঘারু পেয়ে যেতে পারে। বা, আর-একটা ভাল পাতই, বা পাতের টুকোরই। বাগানের সীমার জমিতে বাগানের ময়লাটয়লা ফেলে হয়ত কখনো কখনো। তাতে একটা ছোেট, আস্ত, লোহার পাত কি আর মরচে না পড়ে, এখন পর্যন্ত, বাঘারুর জন্যে থেকে যেতে পারে না? বা অন্তত তার? দড়ির মত এক টুকরো তার?
তারের কথাটা মনে হতে, পাতের চাইতে তারটাই তার কাছে বেশি কাজের লাগে। শক্ত, নতুন তার যদি হয়, গাছের গোড়ায় গোল করে লাগিয়ে দু প্রান্ত ধরে বাঘারু যদি টানে, গাছের নরম কাণ্ডের ভেতর তারটা বসে যাবে আর গাছটা কেটে আসবে। যদি কাণ্ডটা বেশি মোটা হয়, তা হলে একটা-একটা করে, পাতা কেটে নিতে পারবে।
পাথর শেষ হয়ে এখন ঘাস ঝোপঝাড় চলছে। বাঘারু লোহার পাত, আর তারের সঙ্গে সঙ্গে কাঁচের টুকরোও খোঁজে! বাগানের মানুষরা কাঁচ ব্যবহার করে। তা হলে এখানে ভাঙা কাঁচের টুকরোও পাওয়া যেতে পারে। বোতলভাঙা কাঁচের কোনাটা সব সময়ই ধারালো হয়। বোতলের কাঁচ ত লম্বালম্বিই ভাঙে। একটা দিক ধরে, আর-একটা দিক দিয়ে কাটা যায়। যদি গোল করেও ভাঙে তা হলেও ঘষে-ঘষে কাটা চলে। সুতরাং বাঘারু কাঁচও খোঁজে।
লোহার পাত, বা তার, বা কাঁচকোনো কিছুতেই বাঘারুর কোনো অসুবিধে নেই যেন। টানতে, বা ঘষে ঘষে কাটতে, সেই তার বা কাঁচ তার হাতের তালুতেও কেটে বসে যেতে পারে না যেন!
পাথর শেষ হয়ে যায়।
বাঘারু ক্রমেই মাঠের মাঝ বরাবর চলে আসে। মাঝেমধ্যে ঝোপঝাড়। কিন্তু কোথাওই এমন-কিছু নেই যা মানুষ ব্যবহার করে ফেলে দিয়েছে, এবং এখন বাঘারু ব্যবহার করতে পারে। বা, একটা পাথর, যা বাঘারুই প্রথম ব্যবহার করবে।
.
০৬২.
বাঘারুর অস্ত্রলাভ
কিন্তু বাঘারু তার পাথরটা পেয়ে যায়, তারই জন্যে তৈরি পাথরটা। নাকি পাথরটাই বাঘারুকে পায়।
এই পাথরটা পাবে বলেই পাথর দিয়ে বানো ঢালে কোনো পাথর মিলল না! ঢালের শেষেও মাঠের ভেতর পাত, বা তার, বা কাঁচ মিলল না! বাঘারু তখন পায়ে-পায়ে চলে আসছে। চলে আসছে আর মনে-মনে ছকতে শুরু করেছে মাঠটা কোনাকুনি যাবে, যেখানে পাবে ডেমকাঝোরা সেখানেই পার হবে, তার পর, ওপারে উঠে নিজের রাস্তা ধরবে। এরকম ছকে নিতে তাকে দু-একবার ঘাড় তুলে মাঠের শেষটা দেখতে হয়েছে। বোধহয়, পাথরখোঁজা, আর পথখোঁজা, মাঠদেখা আর মাঠ শেষদেখা–এই সবের ভেতর সে ধীরে-ধীরে একটু ভাগ হয়ে যাচ্ছিল বলেই তার বাঁ-পায়ের বঁ-দিকটা হঠাৎ খাড়া ধারালো কিছুর ওপর পড়ে! মনে হল, তার পায়ের মাংসের ভেতর ধারটা একেবারে বসে গেল। তাও আবার বাঘারুর পা, যার চাপে পাথর গুড়ো হয়ে যায়। যদিও বাঘারুর মনে হয়, তার পায়ের মাংসের ভেতরশান-দেয়া কোনো লোহার ধার বসে গেল, তবু, ব্যথায় বসে পড়েও, সে প্রথমে পা দেখে না, কিসে কাটল, সেটা খোঁজে।
কুড়োলের আগার মত ছড়ানো একটা পাথরের ধারালো দিক মাটির ভেতর থেকে উঁচিয়ে আছে। ঠিক ওপরে তার পা পড়েছে। বাঘারু পা দেখে, কাটে নি। কিন্তু ব্যথা তখনো আছে। পা ছেড়ে দিয়ে বাঘারু দুই হাতে পাথরটাকে নাড়ায়, ঢিলে করে নিয়ে মাটির ভেতর থেকে টেনে তুলে ফেলবে বলে। পাথরটা বেশি গাড়া ছিল না। বাঘারু যে-জোরে নাড়া দেয়, তাতেই উপড়ে যায়, আর বাঘারু হুমড়ি খেয়ে পড়ে সামনে। সামলে, দুই হাতে পাথরটাকে নিয়ে দেখে বাঘারু। তারপর, উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে পাথরটাকে আরো ভাল করে দেখে সে, যে-দিকটা মাটির ভেতর ছিল, সেই মোটা :: অংশটা ভেজা ও মাটি লাগা। ওপরের দিকটা চকচকে ধারালো, পাথরের পক্ষে যতটা ধারালো হওয়া সম্ভব-মানুষের হাতের ঘষা ছাড়াই। মানুষের হাতের ঘষা পড়লে এ-পাথরে লোহার শান আসে।
