.
০৬০.
বাঘারুর পাথর খোঁজা
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ দিয়ে বাঘারু তার পাথরটা খোঁজে। যে-কোনো একটা পাথর, হাতে ধরা যায় এমন ছোট, আর কাটা যায় এমন ধারালো। লম্বাটে একটা পাথরের টুকরো তার চোখে পড়ে-কাঠের টুকরোর মত, ধরার সুবিধে। কিন্তু চকচক করছে। তার মানে বালি-পাথর। ভেঙে যায়।
সেটা থেকে চোখ সরিয়ে এপাশ-ওপাশ দেখতে-দেখতে আবার সেটাকেই ফিরে দেখে ফেলে। এখান থেকে দেখে, তার কাজের পক্ষে সবচেয়ে ভাল পাথর ওটাকেই মনে হয়। কিন্তু এত চকচক করছে যখন, রাঘারু জানে, ওটা বালি-পাথর। তবু, একবার যাচাই করে ফেলে না দিলে চোখটা বারবারই ওদিকে যাবে। বাঘারু পাথরটার দিকে পা ফেলে। তার পা ফেলার দোলায় শরীরে লেগে থাকা পাথরকুচি পাথরে ঝরে পড়তে থাকে।
পাথরটা তুলে দেখে–গোটা নয়, একটা দিকে কোনাকুনি ভেঙেছে আর সেই দিকের খানিকটা চটে গেছে। তার ফলে ঐ দিকটাতে একটা ধার আছে। মারলে কেটে যাবে। কিন্তু ধরার জায়গা নেই। সে না-হয় দুই হাতেই ধরল। দুই হাতে ধরে দেখে বাঘা। মনে হয় পাথরের ওপরটা কে যেন খুঁটে রেখেছে। বালি-পাথরগুলো তুললেই এরকম মনে হয়। বোন্ডার পাথরগুলো একেবারে চকচকে গোল। কোনো জায়গায় একটু ওঠা-নামা নেই।
দুই হাত তুলে গাছের গোড়ায় মারলে পাথরটা ভেঙে যাবে কিনা পরীক্ষা করতে, বাঘারু দুই হাতে ধরে দুই দিকে চাপ দেয়। বা হাতে পাথরটা লম্বালম্বি ভেঙে যায়। বাঘারুর দুই হাতই সরিয়ে নিলে পাথরটা তার পায়ের কাছেই পড়ে। তাতে আবার একটা ছোট লম্বা টুকরো হয়। বাঘারু দেখে, তার পায়ের কাছে পড়ে আছে একটা ভাঙা মৃর্তি, পিঠের বাকটার কাছে একটু খোবলানো, গলাটা লম্বা। বেটিছোঁয়াদেও। বাঘারু তার মূর্তি থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। বাঘারু ত গাছতলায় বসাবার পাথর খুঁজছে না, সে ডাল কাটার অস্ত্র খুঁজছে।
আর-একটা পাথর দেখে এগয়। তার শরীর থেকে পাথরকুচি পাথরে পড়ে ঝুরঝুর। কাছে গিয়ে দেখে, বোধহয় গেড়ে আছে। পা দিয়ে পাথরটা নাড়ায়, নড়ে না, তার মানে মাটির অনেকখানি ভেতরে সেঁদিয়ে আছে। বাইরে যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতে কিছুই বোঝা যায় না। গা ঐ পাথরের ওপরই রেখে আবার পাথর খোঁজে বাঘারু।
পায়ের কাছে একটা ছোট জাম্বুরা [বাতাবি) সাইজের পাথর পড়ে ছিল; কুড়িয়ে নেয়। দুই হাতের চেটোতে সেই গোল, নিটোল পাথরটাকে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখে। দেখতে কী সুন্দর! হেই এটুস ময়লা-ময়লা শাদা, ঠাণ্ডা নাখান, আর ডিমের নাখান একটা দিক গোল, আরেকখান চুখা। বাঘারু চোখা দিকটা এক হাতে ধরে সোজা করে। মানষির মাথার নাখান।
সেটা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে বাঘারু দেখে এটা থেকে কত ভাল একটা টুকরো বের করা যেত। করাত দিয়ে কাটলে, মাঝখানের টুকরোটা একেবারে আস্ত একটা দা হয়ে যেত। বাঘারু পাথরটাকে তার হাতের সমস্ত জোর দিয়ে সামনের একটা বড় পাথরের ওপর মারে। আগুনের ফুলকি ছোটার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা বন্দুকের আওয়াজ একসঙ্গে হয়। বারুদের গন্ধটা বাঘারুর নাকে এসে লাগে যখন, প্রতিধ্বনিটা তখন আসে বাগানের দিক থেকে। পাথরটা তখনো গড়িয়ে যাচ্ছে।
বাঘারু দেখে, বা দেখেছিল আগেই, এখন ভাবে, বরং এই এত পাথরের মধ্যে খুঁজে বের করার চাইতে, আর-একটু নীচে নেমে, যেখানে ঢাল শেষে হয়েছে, সেখানে ছড়ানো-ছিটনো পাথরগুলোর ভেতর খুঁজে বের করা বোধ হয় সহজ। বাঘারু তাই নীচে নামতে থাকে। একটা বড় পাথর থেকে আর-একটা বড় পাথরে লাফিয়ে, নুড়ি পাথরগুলোর ওপর একটা পা দিয়ে আর-একটা বড় পাথরে উঠে, বাঘারু লাফিয়ে, ঢালটার তলায় নেমে যায়। তার পায়ের ধাক্কায় আর তার এক-একটি লাফে নুড়িপাথর আর ঢিল পাথরগুলো ঝুরঝুর গড়গড় করে গড়িয়ে যেতে থাকে আর যে-দুই জায়গায় সে পা রাখে, সেখানকার পাথর মাটিতে গেড়ে যায়।
যেখানে লাফিয়ে নামে, সেখানে, তার সামনে, বাঘারু দেখে একটা বিরাট উঁচু মানুষের মাথা এলোমলো হয়ে পড়ে আছে। ঘাস, বালি আর বুনো ঝোপের মাঝখানে, যেন কেউ ফেলে রেখে গেছে। বাঘারু নিচু হয়ে মাথাটাকে সোজা করে দিতে চায়, পারে না, এত ভারী। তখন দুই হাতে পাথরটাকে টানে। মাটি আর পাথরের রেখায় বাঘারু বোঝে, এখানে বর্ষার জল নেমে, জমে, আবার বেরিয়ে যায়। আর সঙ্গে নিয়ে আসে ছোট-ছোট পাতলা নুড়ি। মাটির সঙ্গে মিশে শক্ত হয়ে-হয়ে এই মানুষের মাথাটা তৈরি হয়েছে। এখন বাঘারু ওটাকে উল্টে দেয়ায় মানুষের মাথা বলে মনে হচ্ছে না। বায়ারু দুই হাতে ওটাকে তুলে সামনের উঁচু পাথরটার ওপরে বসিয়ে দেয়। দেখে-দেখে হেসে ওঠে। ছিলুমাঠত, শুইয়া, এ্যালায় থাকেন পাথরের ওপর বসিয়া। বাঘারু যেন জানে, ঐ মূর্তিটা সে ওখানে চিরকালের জন্যই গড়ল।
২.৩ পাথর বা ধাতু বা…
এই যে এতক্ষণ বাঘারু গাছের দিকে পেছন ফিরে, নিচু হয়ে পাথর খুঁজে ফিরছে তাতেই তার মনে হতে শুরু করে দেয়, সে মিছিমিছি পাথর খুঁজে যাচ্ছে। তরিকা গাছের ডাল আর কত মোটা হতে পারে–সেটা মুচড়ে ছেঁড়া যাবে না, বা টেনে তুলে ফেলা যাবে না?
সে এই তলা থেকেই চাবাগানের বেড়াটার দিকে তাকায়। এখান থেকে যেন আরো ভাল দেখা যাচ্ছে, বুনো ঝাড় নয়, যত্ন করে লাগানো লাইন বাধা ঝোপ। আর-কেউ কোনোদিন এই ঝোপগুলো থেকে পাতা কাটেনি বোধহয়। গাছের পাতাগুলো টিনের চালের মত ছাউনি তৈরি করেছে, বেড়াছাড়া ছাউনি, বারান্দার নাখান। এখান থেকে পাতাগুলোকেই, প্রধানত দেখা যায় বলে, মনে হচ্ছে, ঐ পাতাগুলোর নীচে ঘর-সংসার পাতা যায়। দুটো পাতা দু-দিকে দুই ছোট বশের মধ্যে বেঁধে দিলে ছোট বাচ্চাকাচ্চার ঘর হয়ে যাবে। ওদ নাগিবে না, বৃষ্টির ছাট নাগিবার পারে। দুটো লম্বা আর দুটো আড়াআড়ি দিলে একখান বেটিছোঁয়া ঢাকি যাবে। আর তার সঙ্গে আরো দুটোপাতা লম্বা করলে বাঘারুর কোমর পর্যন্ত পুরো ঢাকবে। তা হলে কি বাঘারুকে.এখন তরিকা গাছের ছ-ছটা পাতা কাটতে হবে? একটা নয়, দুটো নয়, ছ-ছটা?
