সামনে এসে দেখে তরিকা গাছের সারি দিয়ে বেড়া। আনারসের মত মোটা, শক্ত, অথচ অনেক বড়, চ্যাপ্টা পাতা ছড়ানো! বড় বড় গাছগুলোতে আবার একটা ডাল থেকে আর-একটা ডাল বেরিয়েছে। মাথা নিচু করে বাঘারু ফল খোঁজে, ছিঁড়ে নেবে। একটু এদিকে-ওদিকেও তাকায়। এখন ফলের সময় না। তবু গাছ দেখলেই ফল খুঁজতে হয়। গাছো দেখিবেন, ফলো খুঁজিবেন।
ফল না পেয়ে বাঘারু এবার পাতাগুলো দেখে। এখানে কেউ এ পাতা কাটে না। লাগেও না হয়ত কাররা। এখানকার কুলিদের ত ঘর আছে। তা হলে ঐ পাতা দিয়ে আর ছাওয়াবে কী? আর এত এমনিতে হয় নি, লাইন বেধে। চা বাগানের সীমানা দিয়ে পোতা হয়েছে কাটাবেড়া দেয়ার জন্যে।
বাঘারুর ত এই পাতাগিলান নাগে। যেইঠে যাছে বাঘারু, ঐঠে যদি এইলা বড়বড় তরিকা পাতা না মিলে? এ্যানং টিনের নাখান তরিকা পাতা দেখি ক্যানং করি ছাড়ি যাবে বাঘারু? ছাড়া যায়? এ্যানং সাইজের পাতাগিলা, এ, ধর কেনে একখান হবা ধরিবে সিকিখান দশ ফুটি টিন। তা, ধর কেনে, চারখান পাতা জোড়া লাগিলে একখান টিন হয়্যা যাবে। আর দুইখান টিন পাশত দিবেব্যাস, বাঘারুর এই ঠ্যাং দুটা বাদ দিয়া বাকি শরীলখানের উপরে চালা উঠি যাবে
নিজের শরীর আধাআধি ঢাকার মত এমন ছাউনি হাতের নাগালে পেয়ে ছাড়ে কী করে বাঘারু?
কিন্তু এত মোটা, লম্বা পাতা ত আর মুচড়ে ঘেঁড়া যাবে না, কাটতে হবে। দা বা কুড়োল পাবে কোথায়? নিচু হয়ে ঝোপঝাড়ের তলায়-তলায় সুবিধেমত পাথর খোঁজে। এই পাতার ডালগুলোতে রস থাকে। চ্যাপ্টা ধারালো পাথর পেলে সেটা দিয়ে মেরে-মেরে তেলে-তেলে কেটে নিতে পারে। কিন্তু তেমন একটা সুবিধেমত পাথর পায় কোথায়? আর, তাও আবার এদিকে? বাগানের ভেতরে? এখানে পাথর আসবে কোত্থেকে? এলেও ত কুড়িয়ে ফেলে দেবে–বাগান পরিষ্কার রাখতে। বেড়ার ওদিকটায় গেলে পাথর পাওয়া যেত, হয়ত, চ্যাপ্টা ধারালো পাথর।
বাঘারু ঝোপের ফাঁক খোঁজে–বাইরে গলে যাওয়ার ফাঁক। বর্ষায় জল আর মাটির রস খেয়ে গাছগুলোর গোড়া এত ফোলা যে ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে গেছে। তলায় ফেঁকড়িও বেরিয়েছে অনেক। গাছের গোড়ায় মাটি আগের মত উঁচু করে সাজানো-যাতে কোনো ফাঁক না থাকে। অথচ বাঘারু তেমন একটা ফাঁকই খোঁজে-শেয়ালের তৈরি করা ফাঁক। শেয়াল সামনের দুই পায়ের নখে মাটি সরিয়ে-সরিয়ে, পরে চার পায়ের নখে বেড়ার তলায় গর্তবানায়। গর্তের পেছনে টান-টান হয়ে শুয়ে আর ঘষে-ঘষে গলা গর্তের মধ্যে নামায় মাটিরা নিন্দুরের (মেটে ইঁদুর) নাখান। তার পর গর্তের ঢাল বেয়েই বেড়ার অন্য দিকে গলা তুলতে থাকে, যেন শিয়াল কোনো চার পেয়ে খাড়া জন্তু নয়, লেপটানো জন্তু। পেছনটা একবার পেরিয়ে গেলেই লাফিয়ে চার পায়ের ওপর খাড়া হয়ে, গা ঝাড়া দিয়ে ধুলোমাটি ঝরিয়ে নেয়। শিয়ালের ঘোড়া তেমন গর্ত পেলে বাঘারু নিজের দুই হাতে তাকে আরো কিছুটা গভীর করে, গলে যাবে? এই একটু আগে যে বাঘারু নিজের শরীরের বিশালতা ও নগ্নতা নিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে কুঁকড়ে যাচ্ছিল সে এখন একটা বেড়া টপকানোর জন্যে নিজের শরীরকে শেয়ালের মত নরম ও নমনীয় ভেবে নিতে পারছে?
কিন্তু বাঘারু করে বসে উল্টোটা। পাথর বা ফাঁক খুঁজতে কোমর ভেঙে ডানদিকের ঝোপটার তলায় তাকাতে-তাকাতে যাচ্ছিল–যেন তার পয়সা হারিয়েছে। একটা জায়গায় এসে দেখে, গাছগুলোর গোড়া তেমন বড় ও মোটা নয়। তা হলে মাথায়ও বাড়ে নি নিশ্চয়। উঠে দাঁড়ায়, দেখতে। কিন্তু, দাঁড়িয়েই, দুই হাতে পাতাগুলোকে দুদিকে একটু কাত করে, নিজে কাত হয়ে প্রথমে বা পা বাইরে দেয়, তার পর ডান পা টানে। হাতি এই রকম ফাঁক বুঝে কাটাগাছ পেরোয়, তলায় কাটাগাছের ঝোপ একটুও না ছুঁয়ে।
বাঁ পা-টা বারু গাছের নীচৈ উঁচু করে দেয়া আলগা মাটির ওপর রেখেছিল। কিন্তু তখনো শরীরের ওজন তার ডান পায়ের ওপর, বাগানের ভেতরে। যেই ডান পাটা তুলে বুকটাকে ঝোপের ফাঁকে গলিয়ে দিয়েছে, অমনি নিজেরই শরীরের ভারে পায়ের তলার মাটি খসে যায়; আর, নদীর পাড়ভাঙার মত, বাঘারুর একেবারে হুড়মুড় করে ধসে যায়।
পাক খেয়ে-খেয়ে গড়াতে-গড়াতে বাঘারু এক জায়গায় আটকে যায়। ঘাড়টা তুলতে গিয়ে আবার একটু গড়ায়, কিন্তু ততক্ষণে লতার মত লম্বা আর পাথরের মত শক্ত পায়ের গিরগিটির মত আঙুলগুলো মাটি পেয়ে গেছে।
সেই পায়ের ভর দিয়ে বাঘারু প্রথমে উঠে বসে। চারপাশে দেখে। এমন কিছু নয়। চা-বাগানটা খাড়াইয়ে, মাটি ভেঙে ঢাল বেয়ে বাঘারু নীচে পড়ে গেছে। এই ঢালটার সামনে খোলা মাঠ।
আর-একবার তাকিয়ে বাঘারু আবিষ্কার করে ঢালটা পাথরে-পাথরে বোঝাই। এই এত পাথর দেখে তার মনে পড়ে, সে পাথর খুঁজছিল। আচমকা পড়ে যাওয়ায়, সে ভুলে গিয়েছিল। মনে পড়ার পর পতনটাই ভুলে গিয়ে বাঘারু খাড়া দাঁড়ায়। বাঘারুর চুল থেকে গোড়ালি পর্যন্ত অসংখ্য কুচো পাথর লেগে আছে, যেন সে আর বাঘারু নয়, বাঘারুর পাথুরে মূর্তি। শরীর তার পেশিতে পেশিতে এমনই খুঁজময় আর ঘাম-ঘামভাবে এমনই আঠালো যে পাথরকুচি তার সারা গায়ে লেগে, ফুটে, থেকে যেতে পারে।
দাঁড়িয়ে উঠে, মাটিতে চোখ ফেলে বাঘারু পাথরগুলোকে একবার দেখে নেয়। পাথর যা আছে, এই ঢালটারই গায়ে। বড় বড় পাথরগুলো ঢাল বেয়ে নিচুতে। তা ছাড়া বোল্ডার আর বড় সাইজের পাথরই বেশি। সেই ফাঁকগুলো পাথরকুচিতে ভরা। বড় পাথরগুলোতে তলার দিকে শ্যাওলা, অনেকদিন ধরে পড়ে আছে। ছোট পাথরগুলো হলদেটে বেশি। কিছু শাদা। চা বাগানের সীমানার ঢাল। জমিটা হয়ত চা বাগানেরই, কিন্তু চায়ের খেত হয়ত ঐখানেই শেষ। মাটি যাতে না ভাঙে সেইজন্যে কোম্পানি প্রতি বছরই পাথর ফেলে।
