হু, বাবু চোখটা ঘুরিয়ে নেন। সেই চোখ ঘোরানোতে কোনো অবজ্ঞাও থাকে না, মাতাল কুলিকামিনের এমন দার্শনিক সংলাপে তার অভিজ্ঞতারই একটা প্রকাশ থাকে মাত্র।
বাবু
হু
মুই ডাল কাটিবার না পারি, বলে বাঘারু বাবুর সামনে তার হাতটা তোলে, বাবুকে ছাড়িয়ে হাতটা বিঘত খানেক এগিয়ে যায়–তার হাতটা এতই লম্বা, ঐ ঠে বাবু।
হু
ঐ ঠে ছুরিখান চালাছে। মুই না-পারি বাবু।
হু
ডাল কাটতে পারে, কিন্তু ঐ কলম ছুরি তার হাতে ধরবে না এত জটিল কথা কী ভাষায় বোঝায় বাঘারু?
বাঘারু চুপ করে যায়। তার আর-কিছু মনে পড়ে না। কিন্তু এটা বোঝে তার কথাটা বাকি আছে। বাঘারুর সাইজের একটা মানুষ এত কাছে দাঁড়িয়ে থাকলে তার ছায়া পড়ে। বাবু যেন অপেক্ষায় ছিলেন, সেই ছায়াটা সরে যাবে। যায় না দেখে মুখ ঘুরিয়ে বলেন, ত হয়েছে ত, এবার যাও।
কোটত বাবু?
যেখানে যাচ্ছিলে।
কোটত বাবু?
সেটা আমি বলব কী করে বাবা, এখানে পাতিটেপা ফাড়ুয়ামারা এই সব হচ্ছে, এ-সব ত তোমার কাজ না, এখন যাও।
বাবুর এই কথাটিতেই বাঘারুর আবার মনে পড়ে যায়, সে তাড়াতাড়ি বলে ফেলে, মনে পড়ার আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে, মুই কোদাল চালাবার পারি বাবু, কুড়িয়াল চালাবার পারি। যা পারে সেটা বলে ফেলতে পেরে এবার তার প্রমাণ দিতে দুই পা ফাঁক করে বাঘারু হাত দুটো ওপরে তুলে কুড়োল-কোদাল নামানোর ভঙ্গিতে বলে, এ্যানং, বাবু।
হু
এই, এ্যানং, যেন কোদাল কুড়োল চালানোটা কথা দিয়ে বাবুকে বাঘারু সম্পূর্ণ বুঝিয়ে উঠতে পারছে না, তাই তাকে দেখিয়ে বোঝাতে হচ্ছে।
পার ত চালাও।
বাঘারু মুহূর্তে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তার পর তার চোখ স্থির করতে হয় সেই ফাড়য়া-চালানো দলটার কাছে নালীর মাটি যারা তুলছিল তাদের ওপর। বাঘারু তাদের দিকে ছুটে যায়।
বেড় ও রাস্তার মাঝখানে সরল নালীটা এতটাই গভীর যে সেখানে নেমে যারা কাজ করছিল তাদের ঘাড়টুটু শুধু ওপরে আছে, এতটাই চওড়া, যে অইন বেঁধে এই দলটির কোদাল চালাতে কোনো অসুবিধে হচ্ছে না, এমন কি, ঘুরে দাঁড়িয়ে দেয়াল চাছতেও পারছে। কিন্তু গভীরতা এত বেশি বলেই চওড়াটা চোখে পড়ে না। অভ্যস্ত কাজের ব্যস্ততাহীনতায় ভেতরের জংলা কাল মাটি চেঁছে ওপরে তুলে রাখা হচ্ছিল আর কোদালের ঝিলিক তুলে আবার মাথার ওপর থেকে নামানো হচ্ছিল গর্তের অন্ধকারে।
বাঘারু সরাসরি অনেকটা চলে যায়। যেন তার জন্যে একটা কোদাল বাইরে রাখাই আছে, নিয়ে গর্তে নেমে যাবে–এমন নিশ্চয়তায় সে কোদাল খুঁজে যায়। বেশ খানিকটা গিয়ে আবার ফিরতে-ফিরতে বলতে শুরু করে, মোর কোদালখান কোটত, বাবু কহিল মোক, মোর কোদালখান?
ততক্ষণে বাবু তাকে একটু জোরেই ডাকেন, এই, এই এখানে কী, এই, এদিকে এসো, আরে
মুখ ফিরিয়ে দেখে বাবু তাকেই ডাকছেন, এদিকে এসো, ওখানে কী?
আবার বাবুর কাছে ফিরে যেতে শুরু করে। কাছাকাছি আসতেই বাবু রেগে উঠে বলেন, ওখানে কী করছ? কাজ হচ্ছে, যাও, বাবু বা-হাতটা তুলে বা-দিকটা, বাঘারুর দাঁড়িয়ে থাকা রাস্তাটাই সোজা, দেখিয়ে দেন, সেটাই বাঘারুর বেরবার একমাত্র রাস্তা, আর, বাঘারু সেই রাস্তা ধরে সঙ্গে সঙ্গে চলতে শুরু করে–এমন নির্দেশ পালনের শারীরিক অভ্যাসে! বাবু পেছন থেকে বলে ওঠেন, এ ত বুলডোজার, বাবা।
বাবুর কাছ থেকে বাঘারু একটু সরে যেতেই সে আবার ঐ ঝোপঝাড় আর গাছ-পালার অংশ হয়ে যায়। চা বাগানটায় ঝোপঝাড় আর গাছপালাই ত বেশি, ক-টা জায়গাতেইবা কাজ হয়। কিন্তু এত সাজানো-গোছানো ঝোপঝাড় আর টানা সোজা চওড়া রাস্তায় বাঘারুর এই এত লম্বা শরীরটা এত উদোম হয়ে থাকে।
.
০৫৯.
মাথা-ছাউনির পাতা
সামনে, কিছু দূরে চা বাগানের শেষে টানা ঝোপের লাইন শুরু, রাস্তার শেষে। ওদিকে নিশ্চয়ই ঝোরা। বা, গর্তের লাইন। বাগিচার সীমানা শেষ। ঐ ঝোপের ফাঁক দিয়ে বাঘারু বাইরে বেরিয়ে যেতে পারবে। বড় জোর একটু এদিক-ওদিক করতে হবে।
ভিড়ের মাঝখানে আচমকা পড়ে, ভিড়ের টানে-টানে এতটা চলে আসতে হয়েছে বাঘারুকে, এই, একেবারে চা বাগানের মাঝখানে। তার পর সেই ভিড় বাঘারুকে আবার একলা ফেলে খসে পড়েছে।
এত ঘন আর এত লম্বা একটা ভিড় তাকে ঘিরে টেনে এতদূর নিয়ে এসে ফেলেছে বলেই কি বাঘারুর,, এখন এই চাবাগানের এমন নির্জনতাতেও, নিজেকে নাংটিয়া লাগে। মাঠে, ফরেস্টে, নদীতে, নদীর পাড়ে ত বাঘারুর এমন লাগে না। সেখানে ত তার শরীরটা একটা গাছের মত, নাগিন (চাপা) গাছ, বাতাসটা ধরার জন্যে, খাড়া। ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে বাতাসের ইশারা দেয়ার জন্যে, খাড়া। বা স্রোতের ইশারা দেয়ার জন্যে, শোয়া। বাঘারুর শরীর যেন সেই ইশারা হারিয়ে ফেলে–মানুষের হাতে পোতা এই হাজারে-হাজারে চা-গাছ আর সারে-সরে শিরীষ গাছ আর ঝোপঝাড়ের মাঝখানে! মাঠের মত সমান চা-গাছের মাথা আর ছাতার মতন সমান শিরীষ গাছের মাথার মাঝখানে মানুষের বানো আকাশ দিয়ে হাওয়া এসে বাঘারুর গায়ে লাগলে সে কুঁকড়ে যায় তার শরীরটা আর-একটু ছোট হলে পারত, বা তার নেংটিটা আর-একটু বড়, এই চা বাগানের ভেতর দিয়ে চলার মত ছোট, বা বড়।
ডাইনে বাঁয়ে না বেঁকে বাঘারু সোজা ঐ ঝোপঝাড়ের দিকেই চলে। ঐ মিছিলটা তাকে অনেকখানি উত্তরে সরিয়ে এনেছে। বেরিয়ে একটু দক্ষিণে গিয়ে তাকে ডেমকাঝোরার রাস্তাটায় উঠতে হবে। দিকের নিশানা ঠিক থাকলে ঐ রাস্তাটাতে গিয়েই ঠেকবে।
