বাঘারুর সামনে সব জায়গাতেই কাজ। চা-ঝোপে মেয়েদের বুক পর্যন্ত ঢাকা-যেন স্নানে নেমেছে। মেয়েরা টুকটুক করে পাতি ভেঙে হাতের ভেতরই রাখছে। হাত ভরে গেলে কাঁধে ঝোলানো থলিটাতে ফেলে। আঙুলগুলো আবার গাছের ওপর নেমে আসে। খোঁজাখুজি নেই। আঙুলগুলো জানে, কোথায় পাতা! মুহূর্তে-মুহূর্তে পুটপুট আওয়াজ। ধানখেতের গোড়া নিড়নোর সময় এরকম আওয়াজ খেতময় ছড়িয়ে পড়ে। ধানখেতের কথা মনে হতেই বাগিচার এই কাজ আর তার নিজের কাজের ভেতর কেমন মিল খুঁজে পেয়ে যায়, দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই, আর নিজের হাত দুটো নিজের চোখের সামনে মেলে ধরে। তাকে যদি পাতি তুলতে হয়, সে কি একটি পাতিও তুলতে পারবে? নাকি, তার আঙুলগুলো, ষাড়ের জিভের মত, এক গোছ পাতা মুচড়ে আনবে? ডান হাতটা চোখের সামনে মেলে, বুড়ো আঙুলটা বঁকিয়ে, ভেতর দিকে আনার চেষ্টা করে। আঙুল বেঁকে না। বুড়ো আঙুলের তলার মাংসতে দুটো-একটা দাগ পড়ে মাত্র। বাঘারু তখন তার বুড়ো আঙুলটা দিয়ে বাকি চারটি আঙুলের মাথা ছুঁয়ে যায়। বোঝার চেষ্টা করে, হেঁয়াটা সে বুঝতে পারে কি না।
বাঁ-পাশে একদল মরদ বাকানো দা নিয়ে চা-গাছগুলোর ডাল কাটছিল। দা-টা ছুরির মত পাতলা, হাতলটা ছোট্ট। বাঘারু কি তার হাতের মুঠোয় ঐটুকু হাতল ধরতে পারত? বাঘারু আবার তার ডান হাতটা তুলে চোখের সামনে পরীক্ষা করে। অভিজ্ঞ চোখে ধরা পড়ে, তার মুঠোর ফাঁকাটা এতই বড় যে কুড়োল, কোদাল বা লাঙল ধরা যায়, কিন্তু ছুরির মত দায়ের বাট আলগা হয়ে খসে যাবে। বাঘারু ডান হাতটা মুঠো পাকায়। অবলম্বনহীন তার আঙুলগুলো গেঁথে বসতে পারে না, আলগা থাকে। বাঁ দিকে একদল মরদ নালীর মধ্যে নেমে কোদাল দিয়ে নালীর গা থেকে ভেজা মাটি তুলে-তুলে ওপরে ফেলছিল। মাথার ওপর কোদাল তুলে ধরার ভঙ্গি বাঘারুর চেনা। উৎপাটিত সেই মাটির কাল বাঘারুর চেনা। বর্ষার জঙ্গলে বন্ধ নালীটার একটা ছোট অংশের ধীরে-ধারে পরিষ্কার হয়ে ওঠাটা বাঘারুর চেনা।
সামনে তাকিয়ে দেখে, মোড়ে কয়েকজন বাবু। মিছিলটা তাকে এখানে রেখে ঝরে যাওয়ার পর, আবার তার নিজেরই কাছে নিজের গ্রাহ্য হয়ে উঠতে বাঘারুর সময় লাগে। চা বাগিচার চারপাশের এই সব আধোচেনা কাজকর্ম আর সে-সবের সঙ্গে তার নিজের কাজ করার অভিজ্ঞতার বিনিময়–এই সবের ভেতর দিয়ে বাঘারু তার নিজের কাছে ফিরে আসে।
সামনে, বাবুদের দেখতে পেয়ে যেন যাওয়ার একটা জায়গা পায়। বাবুরা ছিল না বলেই বাঘারু এতক্ষণ মিছিলবন্দী হয়ে ছিল। বাবুরা আছে বলেই এখন ত বাঘারুর একটা কাজও জুটে যেতে পারে–এরকম নালী কাটা বা কোদাল কুড়োল চালানো কাজ। কাজ থাকলে মিছিলটা তাকে এরকম তাড়া করে ফিরত না, তার পর তাকে একা ফেলে খসে যেত না। বাঘারু কি মিছিলেই ঢুকতে চায়? বাবুদের সামনে বাঘারু পৌঁছে যায় বটে কিন্তু তার পরই মুশকিল বাধে। বাঘারু এমনি ত যেখানে-সেখানে একা-একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে কিন্তু এখন যে তাকে এত উঁচু থেকে চোখ নামিয়ে বাবুদের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হয়–সেটাই বড় কষ্টের। শরীরটাই এমন বাঘারুর যে শুধু দাঁড়িয়ে থাকলেও না-দেখে উপায় নেই। বাবুই জিজ্ঞাসা করেন তাকে, কী? কিছু বলছ?
না হয় বাবু, বলে ফেলে তার মনে পড়ে যায় সে ত এইটুকু বলতে চেয়েছিল যে কোদালকুড়োল চালানোর কাজটা সে পারে। সে তাড়াতাড়ি বলে, হয় বাবু
বাবুর বোধহয় একটু সময় ছিল, বাবুদের হাতে যেমন থাকে। জিজ্ঞাসা করেন কী হয়?
বাঘারু আবার ফাঁপরে পড়ে। বাবুরা প্রায় কোনো সময়ই বাঘারুকে কিছু জিজ্ঞাসা করে না। কিন্তু অন্যদের করলে সেটাও ত বাঘারু শুনতে পায়। কখনো কখনো কোনো-কোনো বাবু তার সঙ্গে কথা বলে, যেমন এমেলিয়া বাবু। কিন্তু কখনো কোনো বাবুর কথার কোনো জবাব তার মাথায় এল না। বাবুরা কী জানার জন্যে কী জিজ্ঞাসা করে, বাঘারু, তার আন্দাজ পায় না। তাড়াতাড়ি বলে, না হয় বাবু।
জবাবটা শুনে বাবু খুশি হয়েছেন বোঝা যায়। হাসেন। যেন এই জবাবই তিনি চাইছিলেন। বাঘারু বলতে চায়, সে পাতি তোলার কাজ জানে না, ছুরি চালানোর কাজ জানে না। এর পর সে বলতে চায়, সে কোদাল চালানোর কাজ জানে, সে কুড়োল চালানোর কাজ জানে। এরও পর সে বলতে চায়, বাবু তাকে একটা কোদাল বা কুড়োল দিক।
কিন্তু এই তিনটি কথার কোনটা আগে আর কোনটা পরে বলবে তা নিয়ে বাঘারুর সংশয়ের শেষ নেই। মনেও থাকে না তার, কোনটা আগে আর কোনটা পরে–যদিও সেই ক্রমটা বাঘারুই ঠিক করেছে। বাঘারুর নিজের কাছে কথাটা যেমন পরপর আসে, বাবুর কাছে সেরকম পরপর হয়ত আসে না। এই একটা হয়ত-তে বাঘারু বিপর্যস্ত হয়ে যায়।
বাবু, মুই পাতা তুলিবার না পারি।
শুনে বাবু মুখ তুলে তাকায়। বাঘা ঘাড় ঘোরায় সেই জায়গাটা খুঁজতে, যেখানে মেয়েরা পাতি তুলছিল, এমন ভাবে যেন বুকজলে নেমে আছে। সে জায়গাটা দেখতে পায় না। ফলে বাঘারুকে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, বাবুকে সম্পূর্ণ ভুলে, অথচ, তার কথার প্রমাণের জন্যে বাবুর সামনে ঐ পাতিতোলা কাজটা দেখাতে। বাঘারু কথা দিয়ে কাজ বোঝাতে পারে না, কাজ দিয়ে কথা বোঝায়।
সেই মেয়েদের দেখতে পেয়ে আঙুলটা তুলে বলে, ঐ যে বাবু।
কী?
পাতা তুলিছে বেটিছছায়ার ঘর। মুই না পারি।
