মাথায় ফুল গোজা, রঙচঙে শাড়ি পরা, এমন একদল মেয়ে যদি সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ে আর এক দিকে হেলে যায়, তা হলে তাদের হাতে-হাতে ধরতেই হয়। আর তেমন ধরলেই, নাচের তাল এসে যায় পায়ে। নিজেরাই বুঝে ওঠার আগে বাঘারুকে ঘেরা এই মেয়েদের সারি পরস্পরের কোমরে হাত দিয়ে নাচের তালে-তালে পা ফেলে দেয় আর আপন মনেই খিলখিল হেসে সেই নাচের সঙ্গত দেয়।
আরে ও রাখোয়াল, তাড়াতাড়ি এসো,
পাহাড় থেকে এক বুনো, ভালুক নেমে এসে
আমাদের নাচের সারি ভেঙে দিল
এই গানের সঙ্গতিতে ঐ লোকটি চট করে বাঘারুর পেছনে চলে আসে, বাঘারু আর মেয়েদের সারির মাঝখানে। মেয়েদের গানের তালে-তালে পা.ফেলে সে বাঘারুর পেছনে-পেছনে চলে। বাঘারুর অত বড় শরীরটার পেছনে লোকটির অতটুকু শরীর আর টাইট ছোট প্যান্টে তার কোমরের অত ঘন-ঘন দুলুনি, কেমন নাচে-গানে অভিনয়ে নটঙ্গী তামাশা-মতই জমে ওঠে। লোকটি তার স্টিক তুলে বাঘারুর পেছনে-পেছন চলে, একবার বা পায়ের বায়ে ডান পা ফেলে, আবার ডান পায়ের ডাইনে বা পা ফেলে। লোকটি স্টিকটা দিয়ে বাঘারুর পায়ের বাটিতে মারে, ডাইনোয়ে, উরুতে মারে, ডাইনোয়ে, পেছনে মারে, ডাইনে বায়ে। আর শেষে পেছনের ফাঁকটাতে, কানিটার ওপরে, লাঠিটাকে সোজা করে ধরে, যেন সেটা বাঘারুর পাছার ভেতরে ঢোকাবে।
এতে হাসি সামলানোর জন্যে হাতগুলো মেয়েদের দরকার হয় বলে নাচের সারি ভেঙে যায়, গান থেমে যায়, আর এই লোকটির পেছনে সারাটা মিছিল হো হো হাসিতে, খিলখিল হাসিতে, ফেটে পড়ে। বাঘারু ত মিছিলটার মাঝখানে পড়ে গেছে, তার সামনেও ত লোকজন আছে। তারাও ফিরে তাকায়, আর বাঘারুকে দেখেই বুঝে নেয়, পেছনের অত হল্লার কারণ কী।
তাকে ঘিরে এই মিছিলটা মেতে উঠেছে–বাঘারু টের পায়। তাকে ঘিরে সারাটা মিছিলে হাসি উঠেছে–বাঘারু বোঝে। তাকে ঘিরে মেয়েদের দল নাচতে শুরু করে–বাঘারু দেখেও খানিকটা। ঐ বেঁটে লোকটা এসে তাকে খোঁচায়। সামনে থেকে আবার পেছনে চলে যায়। কিন্তু বাঘারু বুঝে উঠতেই পারে না, সে কী করবে। বাঘারু এই ভিড়টা থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে পারে, কিন্তু যাবে কোথায়। এই মিছিলের পাশেই ত ঘরবাড়ি, ঘরের দুয়োরে বাচ্চারা ও মুরগি-ছাগল। মিছিলটাকে তছনছ করে দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে সে দাঁড়াবে কোথায়? মিছিলের বাইরে? মিছিলটা চলে যাওয়ার অপেক্ষায়? বন্যায় উৎপাটিত শালগাছের মত বাঘারু অগত্যা মিছিলের টানে চলে–তাকে ঘিরে হাততালি আর নাচগানার হুল্লোড়ের সঙ্গে সঙ্গে।
তাকে ত এক পলক দেখেই বোঝা যাচ্ছিল সে এ-ভিড়ের কেউ নয়। এই সাতসকালে কাজের মিছিলে বাঘারুর শরীরটা বড় বেশি নগ্ন হয়ে গেছে। এতটা নগ্নতা এই মিছিলেরও সয় না। হুল্লোড় বাধিয়ে মিছিলটা তাই বাঘারু থেকে নিজেকে আলাদা করে নিচ্ছে, বাঘারুর এই নগ্ন শরীরটা থেকে নিজেকে তফাত করছে।
অথচ বাঘারুর পায়ের পাতা দুটো এমনই লম্বা-চওড়া, যে মনে হয় এই মিছিলেই প্রোথিত, মাটির ভেতর থেকে উঠে মাটিসহ চলছে। তার শরীরময় শুধু ত সেই নেমে যাওয়া শিকড়ের টান। কয়েক দশক ধরে বেড়ে ওঠা মহীরুহের কাণ্ডের মত তার পিঠটা কোথাও পিছল, কোথাও শ্যাওলাধরা, কোথাও রুক্ষ। অথচ মেরুদণ্ডের দু পাশের পেশিপুঞ্জ এমন ঝরনার মত নেচে-নেচে ওঠেনামে যে বোঝা যায়, এ-শরীরে বৃক্ষের প্রাচীনতা আছে অথচ স্থাণুতা নেই। ঐ কোমর থেকে পায়ের সরল অবতরণ, মূর্তির আকার নেয়, কোথাও কোনো ঢাকা নেই বলেই। যেন, নির্মীয়মাণ কোনো ব্রিজের সদ্য তৈরি দুটো পিলার নদীখাত থেকে উঠে এসে এই মিছিলে ছুটছে। অথচ এই মিছিলে প্রোথিত এই শরীর এই। মিছিলের নয়। বাঘারুর শরীর এখন বাঘারুর বৈরী।
বাঘারুকে ঘিরে নাচতে নাচতে, গাইতে-গাইতে, বাঘারুকে বেঁচাতে-খোঁচাতে এই মিছিলটা একটা চড়াই ভেঙে ওঠে। বাঘারু চড়াইটা দেখতে পায় নিতার আগে এত লোক। কিন্তু পায়ে-পায়ে পায়ের বাটির পেশির টানে, আঙুলের ভরে, টের পেয়ে যায়। চড়াইটায় উঠতেই এই মিছিল থেকে একটা ভিড় আলাদা হয়ে ডাইনে বেঁকে। বাঘারু সরে দাঁড়াতে গেলে আবার সেই মিছিল তাকে সোজা টেনে নিয়ে যায়, সে আর বেরতে পারে না। ফ্যাক্টরি ডাইনে পড়ে থাকে। পাতা শুকোবার শেড পড়ে থাকে। বাঘারুকে নিয়ে মিছিলটা এগিয়ে যায় আর মিছিল থেকে গোছা-গোছা নোক খসে পড়ে, যে-যার কাজের জায়গায়। এখন বাঘারু দেখতে পায় তার সামনে আনন্দপুরের গেটের মতই একটা গেট আর তার ওপরে চা-বাগিচা। সাইকেল আর ট্রানজিস্টার নিয়ে ঐ বাকি মিছিলটা চা-বাগিচায় নামে।
এখন বাঘারুকে নিয়ে মিছিলটা আর ব্যস্ত নয়, কিন্তু বাঘারু মিছিলটাতে আটকা পড়ে গেছে। এই উঁচু থেকে বাঘারু দেখতে-দেখতে নীচে নেমে যায়–তারের বেড়ার ঘের দেয়া চা বাগান, রাস্তার পর রাস্তা, মোড়ের পর মোড়, মাঠের মত সমান চা-গাছের মাথার ওপরে ছাতার মত সমান শিরীষ গাছের মাথা। আর সেই বাগিচা জুড়ে নানা রঙের মানুষ কাজ করছে।
কিন্তু, দেখতে না-দেখতেই মিছিলটা বাগিচার ভেতর নেমে পড়ে বলে বাঘারু আর দেখতে পায় না। সে সমান বেগেই ছোটে–তার শরীর ঘেরা মিছিলটা খসাতে-খসাতে।
.
০৫৮.
বাঘারু ও বাবু
দুই পাশে চা বাগিচার সারি, মাঝখানে চওড়া সবুজ রাস্তা, বাঘারু দাঁড়িয়ে থাকে, একলা, বাকল খুবলে নেয়া অর্জুন গাছের মত, মিছিলটা যে সম্পূর্ণ ঝরে গেছে, বুঝতে।
