এত কিছুর পরেও এই এত মানুষের ভিড়ের এমনি ছোেটার ভেতর অভ্যাস আর দৈনন্দিনের এক ছন্দ থাকে। কখনোই মনে হয় না–এটা ছুটির দিন। এটাও কখনো মনে হয় না-কাজে যাবার আগের শেষতম মুহূর্তটি পর্যন্ত নিজেদের জীবনযাপনের স্বাভাবিকতাটা আস্বাদ করে নেয়ার স্বাসরুদ্ধকর এক তাড়াতেই এমন হৈ-হল্লা। চা বাগানের কাজকর্মের ভেতর অনিবার্যতই কৃষিকাজের অবকাশ ছড়ানো থাকে কিছু। তাই বাগিচার পাশেই এই সাইকেল দাঁড় করানো থাকবে, রেডিও চা-গাছের ওপর শোয়ানো থাকবে। এই রঙ, এই সাজগোছ, এই গান, এই তালের ভেতর দিয়ে এরা সবাই কাজে চলেছে–রোজকার কাজে, বাগানের বাঁশির সঙ্গে-সঙ্গে। যেন উৎসব। কাজে যাওয়াটা ত শ্রমিকদের রোজকারই উৎসব।
.
০৫৭.
বাঘারু ও শ্রমিকশ্রেণী
বাঘারু এই উৎসবের কেউ নয়। বারঘরিয়ার মাঠ থেকে নেমে নিপুছাপুরে ঢুকে সে এই উৎসবের পথে, উৎসবের ভেতর আটকা পড়ে গেছে। বারঘরিয়ার মাঠ নিচু হয়ে ঢলে পড়েছে নিপুছাপুরেরই বাগিচার বাইরের জমির ওপর। কোম্পানি এগুলো অল্পস্বল্প আধিতেও দেয় কুলিদের। সেই ধানি জমিগুলো দিয়ে তারের বেড়া টপকে কুলি লাইনের ভেতরের রাস্তায় বাঘারু পড়ে। প্রথমে সে বোঝে নি আটকা পড়ে যাচ্ছে। ভো শুনে যে যার মত হাঁটছে, বাঘারুও হাঁটছে। কিন্তু অমন কয়েক পা হাঁটতে-হাঁটতেই রাস্তায় দু-দিকের বাড়িঘর, ফঁকফোকর, ওদিকের বাড়িঘর, ভেতরের ফাঁকফোকর এই সব কিছু থেকে কিলবিল করে মানুষজন বেরতে থাকে। জানলে, তখনো বাঘারু সরে দাঁড়াতে পারত। এরা চলে গেলে, নিজের পথে যেত। কিন্তু ততক্ষণে এই ভিড়টা তৈরি হয়ে গেছে আর ভিড়টা ছুটে চলেছে নিজের বেগে, নিজের নিয়মে। আর বাঘারু নিজে টের পায়, সামনের ও পাশের লোকটি যে-গতিতে ছুটছে, যেমন করে পা ফেলছে, তাকেও সেই গতিতে ছুটতে হচ্ছে ও সেই মত পা ফেলতে হচ্ছে। বাঘারু দু-একবার থেমে পড়তে চেয়েছে। কিন্তু পারে নি। এমন নিজে ভেবে থেমেঘর্তে সে শেখেনি পারে না। যদি পড়ে যেত আর তার ওপর দিয়ে এরা চলে যেত, বা যদি সবাই মিলে ধাক্কিয়ে তাকে বের করে দিত যে সে এই লাইনের লোক না, তা হলেই বাঘারু এই মিছিল থেকে আলাদা হতুে পা-কিন্তু বাঘারু ত কোনোদিনই ঘটনা ঘটিয়ে উঠতে পারে না, তাকে নিয়ে ঘটনা শুধু ঘটে যায়। যতক্ষণ তা না ঘটে, ততক্ষণ বাঘারুকে এই ভিড়ের আর এই মিছিলের চলার সঙ্গে ছুটতে হচ্ছে, এরা যেদিকে যায় সেদিকেই।
তাতেও কিছু হত না। বাঘারু ত মিশেই যেতে পারত এই বিচিত্র মিছিলে। বাঘা যদি একটু ছোটখাট হত কারো নজরই পড়ত না তার ওপর। বা, বাঘারুর অত বড় শরীরটা যদি একটু ঢাকা থাকত। বাঘারু ঐ ভিড়ের মধ্যে পড়ে গিয়ে যখন ভিড়েরই বেগে ছোটে, তখন, তাকে দেখায় যেন ঐ ভিড়ের মাস্তুল। বহু পেছনের মানুষও বাঘারুর মাথা দেখেই দিক ঠিক করবে। কিন্তু সত্যিকারের মাস্তুলের গায়েও অন্তত আলকাতরার বা রঙের যে আবরণটুকু থাকে, বাঘারুর তাও নেই। একটি ছোট, নেংটি তার কোমরের সামনে বাধা। গাছের পাতাতেও এর চাইতেও বেশি ঢাকে। ফলে, সেই একমুখো ভিড়ের সঙ্গে স্রোতের বেগে ছুটলেও বাঘারু স্রোত হয়ে যেতে পারে না। সে স্রোত নয়, স্রোতোবাহিত-তিস্তার স্রোতের টানে. যেমন পড়ানো শালগাছ ছোটে। মেয়েদের যে-দলটা বাঘারুর ঠিক পেছনে গিয়ে পড়ে, তারা বাঘারুকে হঠাৎ দেখে ফেলেই হাসতে শুরু করে দেয়। এমন উৎসবের পথে হাসি ত সংক্রামক, দেখতে-দেখতে হাসিটা ছাড়িয়ে পড়তে থাকে। যারা কাছাকাছি তারা ত হাসির কারণ চোখের সামনেই দেখতে পায়। আর-একটু ভাল করে দেখতে তারা কাছে আসতে চায়। মেয়েদের ভেতর একটা হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। এ ওকে ঠেলে এগতে চায়, পারে না। বাঘারুর পেছনে যারা প্রথম সারিতে ছিল, তারা কিছুতেই জায়গা ছাড়ে না। পেছন থেকে ক্রমে কেউ-কেউ তার ভতরেই ঠেলেঠুলে ঢুকে পড়ে। দেখতে-দেখতে বাঘারুকে ঘিরে একটা ঘের-মত হয়ে যায়; প্রধানত মেয়েদের।
জলে একটা ঢিল পড়লে যেমন জলের কাঁপন চলতেই থাকে, এই ভিড়ে বাঘারুকে নিয়ে হাসির কাপন তেমনি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। যারা বেশ দূরে তারা বাঘারুকে ভাল করে না দেখেও হাসতে থাকে। কেউ-কেউ আঙুল তুলে বাঘারুকে দেখায়। আর হাসিটা আরো দূরে-দূরে ছড়ায়। শেষ পর্যন্ত। বাঘারু এই সম্পূর্ণ অথচ ক্রমবর্ধমান মিছিলের অন্তর্গত চলমান দৃশ্য হয়ে পড়ে।
.
প্রতিদিন কাজে যাওয়া মানুষজনের এই মিছিলের ভিড়ের ভেতর পড়ে গেছে বলেই যেন বাঘারুকে কেমন আউলাভাউলা দেখায়। তার চুল জটপাকানো-ধুলো-মাটিতে। সারা গায়ে ধুলোমাটিরই রঙ। যেন ধুলোমাটি থেকে উঠেই সে এমন লাইনে ঢুকে গেছে। এত বড় একটা লাইনের এত মানুষজন বাঘারুতে যেন একটা খেপাবাউড়া পেয়ে যায়। মিছিলের একটা অংশ তাকে ঘিরে খেপাতে-খেপাতে চলছে।
একটা লোক বেশ লাফিয়ে-লাফিয়ে চলছিল। টাইট ছোট প্যান্ট আর টাইট গোল গলার গেঞ্জি, পায়ে মোজাসহ কেডস, হাতে একটা মাথা বাঁধানো স্টিক। সে মাঝে-মাঝেই স্টিকটা দিয়ে কেডসটাতে মারছিল আর নিজেই লাফিয়েলাফিয়ে উঠছিল। সেই লোকটি যেন তার স্টিকার আরো ভাল ব্যবহার খুঁজে পায়, বাঘারুর সামনে এসে পঁড়ায়। তার পর যেন পেছনে পা ফেলে মার্চ করে করে চলছে এই রকম করে পা তুলে-তুলে হাঁটে। বৃঘারুর সারা শরীরে তখন মিছিলের হাঁটা বা ছোটার গতি ধাক্কা দিয়েছে। এমন দলবদ্ধ ছোটায় ত সে অভ্যস্ত নয়। আর তার এত বড় শরীরে ছোটার একটা গতি এসে গেলে, শরীরটার ভারও সেই গতিটাকে ক্রমেই বাড়িয়ে দিতে থাকে, পাথরের পাহাড় গড়ানো যেমন। মাথায় লোকটি বাঘারুর কোমরের কাছ পর্যন্ত। সে যখন বাঘারুর সামনে ঐরকম কদমে কদমে পেছনে পা ফেলে, তখন মনে হয়, বাঘারু যেন কোনো উঁচু মূর্তি, লোকটি তাই দেখছে। আর সেই দেখার যুক্তিতেই সে তার বাধানো স্টিকটা তুলে বাঘারুর বা বাহুতে মারে। হাতে পেলে টিপে দেখত, পাচ্ছে না বলে স্টিক দিয়ে টিপছে। ডান বাহুতেও একই রকম মারে। বাঘারুর পেটে একটা বেঁচা-মত দিতেই যে মেয়েদের দল বাঘারুকে ঘিরে ফেলেছিল তারা হাতগুলি দিয়ে নেচে উঠে কৌতুকে দুই হাত একসঙ্গে ঠোঁটের কাছে তুলে ধরে, আচমকা, বাতাসে-হেলা গাছের মত, হাসির দমকে হেলে পড়ে।
