মেয়েদের শাড়ির চড়া রঙ। শাড়িগুলো একটু উঁচু করে পরা। আঁচল নেই। সামনের দিকটা একটু বেশি তুলে আঁচলটা বুক থেকে নেমে এসেছে। কারো কারো আঁচল নেই-ই, পুরো শাড়িটাই বুকের ওপর থেকে গোল হয়ে নেমে এসেছে। চুলের বাহার পরনের বাহারকে হার মানায়। কারো চুল মাঝখানে সিথির দু-পাশে পাট করা। কারো বা দুই বেণী মাথার ওপর তুলে গিঠ দেয়া। কারো আবার ছোট চুল, ঘাড়ের কাছে গিঠ। কারো একটু উঁচুতে ঘেঁপা বাধা। প্রায় সবার চুলেই ফুল। সকালে যে যা হাতের কাছে পেয়েছে, সেই ফুলই খুঁজে দিয়েছে। দু-একজনের মাথায় বড় বড় গাদা। কাল রাত্রিতে বাংলো থেকে তুলে এনে রেখেছে। বেগুনি রঙের ছোট-ছোট ঘাস ফুলও কেউ-কেউ ঝাটার কাঠিতে গেঁথে গুঁজে দিয়েছে। ফুলের কাঠি মাথার ওপর উঠে আছে, চলার সময় কাঁপছে।
মেয়েদের অনেকেরই পিঠের ঝোলায় বাচ্চা। ঝোলার বাইরে বাচ্চার ন্যাড়া মাথা বেরিয়ে আছে। চলার তালে দোলে। পা আর হাত দুটোও বেরিয়ে ঝোলে। বোধহয় চলার দুলুনিতেই, সব বাচ্চাই প্রায় ঘুমিয়ে।
মেয়েরা এত রঙিন বলেই হয়ত শাদা শাড়ি আর জামায় দুএকজন মাঝবয়সিনীকেও রঙিনই দেখায় মাঝে-মাঝে।
কিন্তু মেয়েমরদ, বুড়োবুড়ি, ছোকরাছুকরি–এইরকম ভাগ-ভাগ করে দেখলে কুলি লাইনের রাস্তাটা ধরে এই যে সবাই এক সঙ্গে সকালের বাঁশি শুনে কাজে চলেছে, সেই এক সঙ্গে যাওয়াটাকে ঠিক বুঝে ওঠা যায় না। এখন এই বাঁশি শুনে, এই সকালে, এক সঙ্গে যাওয়াটাই সব চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। তাতে কাউকে আলাদা করা যায় না, সব মিলেমিশে একটা ঘটনা ও একটা দৃশ্য হয়ে ওঠে। পোশাকেআশাকে চলনেবলনে কেউ যদি আলাদা হয়ে যায় সেটাও যেন এই সমগ্রতাকেই স্পষ্ট করে। কত রকমের হটাতেই না এই চলাটা তৈরি হয়ে উঠেছে। তাড়াতাড়ি পা চালাতে গিয়ে কেউ প্রায় দুলে-দুলে চলে, কেউ কোমরটা বেশি নাচিয়ে ফেলে, চুলের গোছার দোলায় কারো হাঁটার ছন্দও অন্য রকম দেখায়, কোনো আধবুড়ো হাঁটুর কাছে ঝোলা হাফ প্যান্টে মাটির দিকে তাকাতে-তাকাতে ছোট-ছোট পায়ে এগিয়ে চলে। এত বিচিত্র হাঁটা সত্ত্বেও কাজের জায়গাতে পৌঁছবার তাড়া যে-গতি আনে সেটাই প্রধান হয়ে ওঠে–সব বৈচিত্র্য সত্ত্বেও।
দুটো নতুন সাইকেল ঠেলে-ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে–অত ভিড়ের মধ্যে। মাঝে-মাঝে বেল বাজাচ্ছে। সাইকেলের হ্যাঁন্ডেলে প্লাস্টিকের দড়ির গুচ্ছ–চালালে ওড়ে। এইটুকু রাস্তা ত চড়লেই ফুরিয়ে যাবে। তার চাইতে সবাইয়ের সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে সাইকেলটা টেনে নিয়ে যেতে ত অনেকটা সময় লাগবে। এতটা সময়ই তো সাইকেলটা নতুন থাকবে। এখন কিছুদিন চলবে–ঠেলে-ঠেলে কাজের জায়গায় নিয়ে গিয়ে আবার ঠেলে-ঠেলে ফিরিয়ে আনা। সাইকেল আছে বলে বাবু তাকে কোনো জরুরি কাজে পাঠাতে পারে। তেমন হলে, পুরো বাগানটাই টহল দিয়ে আসতে হতে পারে। তখন, একা-একা সাইকেলটা চালাতে খুব ভাল লাগে। দু-পাশের বেডে বা রাস্তায় কাজ করছে যারা, তারা তাকিয়ে দেখে, কে সাইকেল কিনল। চেনাজানা লোক আওয়াজও দেয়। মেয়েগুলো খিলখিল হাসে। আর এই সবে প্যাডেলের জোর বেড়ে যায়। দু-পাশের ঘন সবুজ চা গাছের ভেতর দিয়ে চকচকে সবুজ সাইকেলটা চলে। শুধু রঙের জন্যে পঁচাত্তর টাকা বেশি। হ্যাঁন্ডেলের লাল ঝালরগুলো বাতাসে ওড়ে দু-পাশে। হ্যাঁন্ডেলের সঙ্গে লাগানো দু-দুটো আয়নায় পেছনের চা-বেডগুলো সঁ সঁ সামনে ছড়িয়ে যাবে। দুটো আয়নার জন্যে পঞ্চাশ টাকা বেশি। পেছনের লাল আলো চার পাশের সবুজের ভেতর জ্বলজ্বল করে। যেন আলো দেখেই চিনে নেয়া যায় কার সাইকেল চালাতে হলে সাইকেল ঐরকম চালানোতেই সুখ–যেন, সার্কাসের খেলোয়াড় খেলা দেখাচ্ছে, চার পাশে গ্যালারি, আওয়াজ, হাততালি। আর, যদি এমন হয়, যেখানে চালাচ্ছে, তার দু-পাশে কেউ নেই, তা হলেও ত নিজের কানের দু-পাশে নিজেরই ছোটার হাওয়া লাগে, যত লাগে সাইকেলের গতি তত বাড়ে। চালাতে হলে ঐ রকম সাইকেল চালাতে হয়, না-হলে, ভো শুনে সবার সঙ্গে হেঁটে যাওয়াই ভাল, সাইকেলটাও যেন কাজে যাচ্ছে।
সারাটা মিছিল জুড়েই ট্রানজিস্টার বাজে। চামড়ার ব্যাগে কারো কাঁধে ঝোলানো, ব্যাগছাড় কারো হাতে ঝোলানো, কারো হাতের পাতায় আটা, কানে কানে সাটা। যে যার মত সেন্টার ধরে আছে–বিবিধ ভারতী, সিলোন, করাচি। রাশি রাশি গান বাজছে। এক-একটা গানের পাশে জোট বেঁধে সেই শ্রোতারা ছুটছে। কেউ-কেউ সঙ্গে-সঙ্গে গায়। কেউ হাততালি দেয় তালে-তালে। দু-হাত ওপরে তুলে কেউবা দুই হাতেই তুড়ি বাজায়।
এত গান এত জোরে একসঙ্গে বাজছে যে সেই সব মিলে একটা অর্থহীন কোলাহলের আওয়াজ ক্রমেই বেড়ে ওঠে। এতগুলো লোকেরএকসঙ্গে ছোটা, কথা বলা, গান গাওয়া, হাসাহাসি ইত্যাদির ফলেও সেই আওয়াজ ক্রমেই বেড়ে ওঠে। চোখ বুজে শুনলে মনে হতে পারে একটা অর্থহীন উদ্দেশ্যহীন কোলাহল বাগানের এই রাস্তাটা ধরে ছুটে চলেছে। সেই আওয়াজের কোনো উদ্দেশ্য নেই বলেই তাতে কোনো আকস্মিকতা থাকে না। আর থাকে না বলেই মাঝে-মাঝেই কৃত্রিম নাটকীয়তায় উচ্চগ্রামে উঠে আবার আচমকা নেমে যায়।
কিন্তু যারা এই কোলাহলের মাঝখানে আছে তারা যে-যার মত গান শুনছে, অথবা শুনছে না। যে-যার পছন্দমত গান বেছে নিতেও পারছে। এক গান শেষ হলে, অন্য রেডিয়োর অন্য গান ভাল লাগলে একটু সরেও যাচ্ছে। আর নিজেদের এই ভাল লাগাটা কোনো-না-কোনো ভাবে জানিয়েও দিচ্ছে–গেয়ে, বা হাত-তালিতে, বা তুড়িতে, বা উল্লাসে। যে-ভাললাগার বিষয় নিজেরা কোনো-না-কোনো ভাবে তৈরি করে নি, সে-ভাললাগার ওপর এদের যেন পুরো স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না।
