উঠেন উঠেন বেলা ঠাকুর চিকচিক্যানি দিয়্যা
উঠেন উঠেন বেলা ঠাকুর আগুন-টকটক হয়্যা
খুলি দিছু দেহবাড়ি ছ্যাকা দিয়্যা যান।
জল যাউক, হিম যাউক, খাড়াউক শরীলখান।
কোলের বাচ্চাদের চপচপ করে তেল মাখিয়ে সূর্যের দিকে ধরে দোলাতে-দোলাতে এই গান মায়েরা গায়। বাঘারুর দুই হাতে কখনো কোনো শিশু দোল খায় নি। আর এখন সূর্যের দিকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দোলানোর মত শিশু যখন বাঘারুর হাতের মধ্যে নেই, তখন বাঘারু নিজেকেই দোলাক। এই কম হাঁটতে-হাঁটতে যতটা দোলানো যায়, দোলাক। আর যতটা বিড়বিড় গুনগুন করা যায়, করুক। বাঘারু এখন তার নিজেরই শিশু।
কিন্তু একবার বলেই ত আর থামতে পারে না বাঘারু, এমন কি, বারকয়েক বলেও না। এই ছড়া একবার মাথার ভেতর সেঁদিয়ে গেলে আর বেরতে চায় না। তার ওপর আবার হাঁটার দোলনটাও ছড়ার সঙ্গে মিশে গেছে। হাটা না থামালে আর এই বিড়বিড়-গুনগুন থামবে না। এই দোলানি আর ছড়ানি কবে সেই জন্মকালে বাঘারুর মাথার ভেতর সেঁদিয়ে আছে–তার ব্যস্ততাহীন নির্জন মাথায়। তারপর পাখির ডাক, জীবজন্তুর মুখ আর আলো-হাওয়ার গতি যেমন.চেনা হয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যে, যখনই তেমন সময় আসে, তখনই, এই ছড়ানিগিলা চলি আসিবার ধরে এ্যানং নাম্বা লম্বা হাঁটনে, কামছাড়া গাওছাড়া এ্যানং নাম্বা হাঁটেন, ছড়াগিলা গানগিলা পিপিড়ার মত চলি আসিবার ধরে এককারে লাইন বান্ধি, একোটার পর একোটা, কোটত আসে কোটত যায় কায় জানে।
বাঘারু চলতে-চলতে দোলে আর দুলতে-দুলতে বলে
বেলা ঠাকুরের মাই গে
সিন্দুর ফেল্যান কেনে, সিন্দুর ফেল্যান কেনে?
না ফেলিছু, না ফেলিছু, কৌটা উলটি গেইছে।
দাওয়া লালাইছে তায়।
সূয্যি ঠাকুরের মা, সিঁদুর ফেলেন কেন? ফেলি নাই, সিঁদুর ফেলি নাই, সিদুরের কৌটো উল্টে গেছে। আকাশ তাই লাল।
বেলা ঠাকুরের মাই গে
জল ঢালিছেন কেনে, জল ঢালিছেন কেনে?
না ঢালিছু, না ঢালিছু ছোঁয়াক নোহাইছু
মাটি ভিজেন তায়।
সুয্যি ঠাকুরের মা, এত জল ঢালেন কেন? ঢালি নাই, জল ঢালি নাই, ছেলেকে নাইয়েছি, সেই জলে। মাটি ভেজা।
বেলা ঠাকুরের মাই গে
ঝাঁটা ঝাড়িছেন কেনে, ঝাটা ছাড়িছেন কেনে?
না-ঝাড়িছু, না-ঝাড়িছু, ছোঁয়াক শুকাইছু
বাও উঠেন তায়।
সূয্যি ঠাকুরের মা, সকালে এত ঝাড়েন কেন, হিমেল বাতাস দেয় কেন? ঝাড়ি নাই, ঝাড়ি নাই, আঁচলের বাতাস দিয়ে, ছেলের গায়ের জল শুকাই, তাই বাতাস ওঠে।
বেলা ঠাকুরের মাই গে।
ঘর বোয়া কইচছিস কেনে, ঘর থোয়া কইচছিস কেনে?
না করিছু, না করিছু ছোঁয়াক ছাড়ি দিম
এগিনা ধুছি তাই।
সূয্যি ঠাকুরের মা, ঘরদোর এত বোয়া-মোছা করছেন কেন আকাশ নীল ঝকঝকে? মুছি নাই, ঘর মুছি নাই, ছেলেকে ছেড়ে দেব বলে আঙিনা, আকাশ, ধুচ্ছি।
বেলা ঠাকুরের মাই গে
ছোঁয়াক ছাড়েন কেনে, ছোঁয়াক ছাড়েন কেনে?
মোর ছোঁয়াটার ছ্যাঁক নাগিলে তোর ছোঁয়াটা উঠে
ছোয়াক ছাড়িছু তাই।
সূয্যি ঠাকুরের মা ছেলেকে ছেড়ে দিচ্ছেন কেন? আমার ছেলের ঘঁহ্যাঁকা খেয়ে তোর ছেলে উঠবে, তাই।
হেই গে মোর বেটাখান
হেই গে মোর ছোয়াখান।
হেই গে মোর ছাওয়া-ছোটর ঘরখান
নিন্দ ভাঙ্গি উঠি গেইছে।
হা করিছে, ভ্যা করিছে
আর তোর ছোয়াখানেক দেখি পুটপুটাইয়া হাসিবার ধইরেছে…
আমার ছেলে উঠে গেল, আমার বেটার ঘুম ছুটল, হাই তুলছে, কাঁদছে আর তোমার ছেলে সূর্যের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
উঠেন উঠেন বেলা ঠাকুর চিকমিক্যানি দিয়া….
বাঘারুর কবিতার সঙ্গতিতেই আকাশের লাল রঙ ধুয়ে ঝকঝকে নীল রঙ বেরিয়ে পড়ে। আর কান্তদিঘি কুমারপাড়া, কুমলাই, মাথাচুলকার আড়ালে-আড়ালে যে সূর্য উঠছিল সেটা যে এখন সারা দুনিয়াতেই উঠে গেছে, অন্তত বাঘারুর সারা দুনিয়াতে, নিপুছাপুরের ফ্যাক্টরির টানা লম্বা বাঁশিতে তা রটতে থাকে।
সেই দুনিয়ার এক সীমান্ত থেকে আরেক সীমান্তের দিকে বাঘারুর এই চলার সামনে এখন এই বারঘরিয়ার প্রান্তরের ঢাল। ঢাল বেয়ে শিশুর মত গড়াতে গিয়ে বাঘারু তার শরীরের দোলা আর ছড়ার দোলা হারিয়ে ফেলে।
ছড়ায় শিশু ছাড়া সকাল নেই। শিশু ছাড়া কবিতা নেই। বাঘারু এখন তাই নিজেই নিজের শিশু।
.
০৫৬.
শ্রমিকদের দৈনিক উৎসব
বাঁশি শুনে নিপুছাপুর চা বাগানের লাইনগুলো থেকে সবাই বেরিয়ে পড়েছে। সবার কাঁধে একটা ছাতা। কাঁধে কাঁধে রুমালের মত থলি, লম্বা ডাণ্ডির মাথায় ছোট চ্যাপ্টা কোদাল, হাতের আঙুলের মত কাটা কোদাল, বাকা দাও, লম্বা কলম ছুরি। যার কাঁধে যেমন ঝোলানো বা আটকানো সে তেমন হাঁটছে। যার কাঁধে রুমাল দোলে সে নিজে যেমন খুশি দুলতে পারে। কোদালগুলো যাদের কাঁধে তারাও খানিক হেলতে পারে। কিন্তু দাও আর ছুরি যাদের কাঁধে লাগানো তারা সেই কাধটা নাড়ায় না।
মরদদের বেশির ভাগেরই পরনে উরু কামড়ে থাকা ছোট হাফ প্যান্ট–সামনে পেছনে অনেক সেলাই ও পকেট। আর গায়ে নানা রকমের গেঞ্জি-গোলগলা, কলার, ভিকলার, কলারের সামনে-পেছনে দাগ, বুকে-পিঠে নকশা। গেঞ্জির রঙ নানা রকম। কিন্তু সব রঙই মরে গেছে, মাঝে-মাঝে আচমকা এক-একটা টাটকা রঙ ছাড়া। বয়স্ক কারো কারো পরনে ধুতি-হাঁটুর ওপর টেনে তোলা, ও গেঞ্জি। কারো কারো খাকি প্যান্টের ভেতর হাফশার্ট গেঁজা। বেশির ভাগই খালি পা। আচমকা দু-একজনের পায়ে মোজাসহ বুটজুতো, চকচকে। তেমন দু-একজনের হাতে ছোট স্টিকও আছে। কেডস-পরাও আছে কয়েকজন। তারা এমন হাঁটে, যেন খেলতে যাচ্ছে। তেল চকচকে কাল চুল পাট-পাট আঁচড়ানোর নানা বাহার–পেছনে বাবরি, দু-পাশে বাবরি, সামনে সিঙাড়া, মাঝখান দিয়ে চিরে চিরে দু-পাশে সিঙাড়া, মাঝখান দিয়ে সমান চিরে আবার মিশিয়ে দেয়া, কপালের ওপর একটু এগনো-ফেল্ট ক্যাপের মত, আবার কপালের ওপর একেবারে ভুরু পর্যন্ত লেপটিয়ে নামিয়ে গোল করে তুলে দেয়। কিন্তু বাহার শুধু সামনের নয়, পেছনেরও। কোনো ঘাড় বাবড়ি, কোনো ঘাড় বব, কোনো ঘাড় মোটা ভাবে হেঁটে তোলা, কোনো ঘাড় ইংরেজি ইউ-এর মত, কোনোটা ইংরেজি ভি-এর মত, কারো দুকান সম্পূর্ণ ঢাকা, কারো অর্ধেক, কারো পেছনটাও সিথির মত চেরা। এরই ভেতর দু-একজন আছে, সম্পূর্ণ ন্যাড়া।
