বন্যার তিস্তায় ঝাঁপ দেওয়ার আগে যেমন সামনে পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে বাঘারু স্রোতের ছক বুঝে নেয়, জলের ঢক দেখে নেয় আর নিজের মনে-মনে একটা নকশা ভেবে নেয়, তেমনি করে ডাইনে আপলাদের দিকে তাকায়–উচা উচা গাছার মাথত আগুন লাগি গেইসে–পেছন ফিরে মাথার ওপরে শ্যাওড়া গাছটাকে দেখে পাতাগিলা ঝলঝল করিবার ধইচছে য্যান বিষ্টি হবা ধরিছে,–বাঘারু তার নিজের শরীরের দিকে তাকায়—-সারা শরীলখান কায় অং মাখাছে–বাঘারু পায়ের তলার ঘাসের দিকে তাকায়–ঘাস গিলা সব আয়না হয়্যা যাছে
আলোর সেই নিমজ্জনে বাঘারু দাঁড়িয়ে থাকে, খাড়া। এতটা এমন বেগে হাঁটার পর তার গা জুড়ে ঘাম ফুটে উঠতে শুরু করে। সেই বরমডাঙার [ব্রহ্মভাঙা] এক সীমায় দাঁড়িয়ে আর-এক সীমার তাদৃশ্য পেছন থেকে ঘটে যাওয়া সূর্যোদয় দেখতে-দেখতে বাঘারু ঘামে। এই বারঘরিয়ার মাঠটায় ঠিক এই সময় উঠতে না পারলেই ত বাঘারু আর এই সূর্যোদয় পেত না। গোচিমারি থেকে হাঁসখালির পথে ঘটে গেলে ত পেছনে থাকত। হাতির রাস্তা ঘটে গেলে ত কোনাকুনি থাকত। আনন্দপুর বাগানের ভেতর ঘটলেও ডান কোনায় পড়ত। এই বারঘরিয়র মাঠে সে কখন পৌঁছবে তার জন্যেই যদি সূর্যোদয় অতক্ষণ ঠেকে থাকে, তা হলে ত বাঘারুকে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতেই হয়, দেখার জন্য দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ঘামতেও হয়।
সেই দেখা আর ঘামার মধ্যেই বাঘারুকে এক সময় এইটা বুঝতে হয়, মুই খালি-খালি খাড়া আছি। আর সত্যি যে শুধু তার এই উদোম ঢ্যাঙা শরীরটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটা তার শরীরের ভারহীনত দিয়ে তাকে বুঝে নিতে হয়। তার কাঁধে লাঙল নেই–গয়ানারে লাঙল। মোর কাঁধত গাছ নাই–গয়ানাথের গাছ। বাঘারুকে গয়ানাথ নির্বাসন দিয়েছে। ডায়না নদীর জঙ্গলে তার মহিষের বাথান আছে–বাঘারু সেখানেই যাচ্ছে। কিন্তু যাচ্ছে ত তার এই শরীরটা নিয়েই শুধু। বরমতলায় সেই সূর্যোদয়ের সামনে নির্বাসনের পথে বাঘারুর শরীরে-মনে কেমন মুক্তির বোধ এসে যায়। আর সেই বোধটাকে নিজে নিজে বুঝে নিতে, নিজেই নিজের শরীরের দিকে ফিরে-ফিরে তাকায়।
কোনো অদৃশ্য আড়াল থেকে উৎক্ষিপ্ত রঙের এই আকাশমাটিব্যাপী বিস্ফোরণে আর নিজের এই শরীরটার এমন মুক্তিতে বাঘারু হাসে। বাঘারু ত তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে দিয়ে আলাদা-আলাদা কাজ করতে পারে না। সে যা করে তার সারাটা শরীর দিয়েই করে। শুধু ঠোঁট দিয়ে হাসতে পারে না ত বাঘারু, তাই সেই আলোর রঙের ধাক্কায় বাঘারুর সারাটা শরীরই হেসে উঠে কাঁপতে থাকে–বাতাস লাগা শিরীষ গাছের মত। বাঘারুর ত শরীর ছাড়া কিছু নেই–তাও আবার এত বড় একটা শরীর যে, শুধু শরীরটাই আছে বললেও তাকে যেন ততটা সর্বস্বহীন বোঝায় না। অত বড় শরীরটা রঙিন আলোর আঘাতে শিহরিত হতে থাকে।
শরীরের এই শিহরণ ত বাঘারুর চেনা নয়। বা, এমন কিছুই ত তার চেনা নয়, যা এই শিহরণের মত ব্যক্তিগত। তাই বাঘারু তার নিজের শরীরের কম্পনে নিজেই হে-হে হাসে। এমন একা-একা হাসা নিজের হাসির আওয়াজে বাঘারু আরো হেসে ওঠে। আর তাতেই তার আরো হাসি উঠে আসে। নিজের হাসির আওয়াজ বাঘারুর ত খুব চেনা নয়।
দুহাতে মুখ ঢেকে বাঘারু হাসিটা ঢাকতে চায়। তার হাত এত শক্ত যে এখন আর আঙুলগুলো বেকানো যায় না। তবু, হাত যখন, একটা তালু থাকে। আর তালু যখন, তখন আঁজলা হয়। বাঘারু মুখ ঢাকতে দুই হাত তুললে, হাতের তালু আলোতে, রঙে ভরে যায়, যেন বাঘারু নিচু হয়ে মাঠ থেকে আঁজলা ভরে আলো আর রঙ তুলে আনল। এখন তার চোখের সামনে দুই অঞ্জলি থেকে সেই রঙিন আলো ঝরঝর ঝরে পড়ে শরীরে।
নিজের হাতের আঁজলায়, নিজের শরীরে, এই প্রথম রঙ-আলো ঢালছে বাঘারু। শরীরটা এই প্রথম তার নিজের হয়ে উঠছে যেন।
হাত দুটো মাথার ওপরে, বা হাতে ডান হাতের মগরা (কজি চেপে ধরে বাঘারু পিঠটা ধনুকের মত বাকায়, পেছনে। কাঁচা বাশের মত তার শরীরটা ঐ রকম হেলে থাকে আর হেলানোর ভার বইতে তার পায়ের মচকা [বাটি], থলমা [উরু] আর পেটের বুকের পেশিগুলো টুকরো-টুকরো হয়ে ফুলে-ফুলে ওঠে। আড়মুড়ি ভাঙছে বাঘারু। আবার, পেছন ফিরে দুই হাত মাথার ওপর তুলে ধনুকের মত বাকায়, সামনে। তার পাথরের চাঙাড়ের মত পিঠটার ঢাল মাটির দিকে নেমে গেলে নড়ডারুর গিঠগুলো প্রখর জাগে, যেন ঐ শিরদাঁড়া বেয়ে এখনই কোনো ঝরনা ঝপাবে। কাঁধে, ঘাড়ে, পিঠে, বাহুতে, কোমরে, উরুতে, কটিতে আলোর স্বাদ পেতে ভালো লাগে বাঘারুর–আলোর উষ্ণ স্বাদ। সে একটু ঘুরে দাঁড়ায়, বায়ে, আলো তার বা পাজর দিয়ে, বা তলবুক থেকে বা তলপেটে চলে যায়। খানিকক্ষণ ও-রকম থেকে বাঘারু ডাইনে ঘোরে, আলো তার ডান পাজর থেকে ডান তলপেট পর্যন্ত লেপটে যায়।
খাড়া হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাঘারু দেখে, সূর্যের প্রথম আলো তীক্ষ্ণ রেখায় প্রান্তরের অপর প্রান্ত থেকে বাঘারুর দিকে ছুটে আসছে সঁ সঁ। বাঘায়ু আলোর দিকে ছুটে যায় কিন্তু সে পৌঁছনোর আগেই আলোর তীক্ষ্ণ সূচিমুখটা ফেটে যায় আর আলো ছড়িয়ে পড়ে মাঠময়। বাঘারু মাটিতে গড়িয়ে পড়ে মাটি থেকে আলো সর্বাঙ্গে মাখতে থাকে।
.
০৫৫.
বাঘারুর সঙ্গীতলাভ
বারঘরিয়ার মাঠ ছেড়ে বাঘারু নিপুছাপুরের দিকে চলতে শুরু করে। ডান দিক জুড়ে সূর্যোদয়ের অব্যবহিত পরের মাঠের দিকে তাকিয়ে বাঘারু বিড়বিড় গুনগুন করে! আর, একবার করেই থাকেম না। বার বার ঘুরেফিরে করে। করে, আর হাঁটতে-হাঁটতেই দোলে।
