আনন্দপুরের লোকজন এখনো ঘুম থেকে ওঠে নি, অন্তত ফ্যাক্টরি আর অফিসের এই রাস্তায় আসে নি। কিন্তু গোচাবাড়ি থেকে বেরবার পর মাঠে, হাঁসখালির বাধে, হাতির রাস্তায়, আকাশের আর মাটির রঙে সকালটা যেরকম হচ্ছিল আনন্দপুরে তা বদলে যায়। শিরীষ গাছের ছাউনি আর চা-গাছের মাথার মাঝখানে ত আর-কিছু নেই–সমস্তটা ফাঁক। আকাশ নয়, মাটি নয়, আকাশ-মাটির মাঝখানের ঐ জায়গাটা ফাঁকা। আর চা বাগানে ত ঐ মাঝখানের জায়গাটাই আসল। ঐ ফাঁক দিয়ে আলো, আকাশের মতই, ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাঘারু সেই বানানো সকালের মধ্যে, ডাইনে বয়ে করতে করতে, বাগানের পুর সীমার দিকে চলে–বেরিয়ে যেতে। বাঘারু ভেবেছিল পুরগেট দিয়ে বেরিয়ে ডাইনে বেঁকে মাঠ-বরাবর বারঘরিয়ায় উঠবে। কিন্তু একটা মোড় থেকে ডাইনে তাকিয়ে সে বেঁকে যায় মনে হয়, এদিককার বেড়া গলে ওদিকের মাঠে নেমে যেতে পারবে।
কিন্তু এগিয়ে দেখে গলতে হবে না, বেরবার একটা রাস্তা আছে, দু-আঙুলের ফাঁকের মত লোহার খুঁটি।
বাইরে যাবার রাস্তা, এত বর্ষার পরও শক্ত। পায়ে চলা রাস্তাতেও ঘাস গজায় নি। রাস্তার পর রাস্তা, মোড়ের পর মোড়, মোড় থেকে মোড় দিয়ে ঘেরা ছক, ছকের ভেতর মাঠের মত সমান চা-গাছ আর ছাতার মত সমান শিরীষ গাছ–এমন চা-বাগান ছেড়ে বাঘারু এখন, আল বেয়ে, আরো-আরো আল দিয়ে দিয়ে ছক কাটা, অসমান, নানা আল দিয়ে নানা অসমান ছককাটা মাঠে নামে। এই সামান্য একটু উঁচু থেকে বাঘারুর মনে হয়, মাঠটার আলগুলো শীতকালের নদীর মতন; কোথায় শুরু, কোথা দিয়ে বয়, কখনো সরু, কখনো মোটা।
মাঠের ভেতর নেমে এলে আর তেমন লাগে না। তখন মাঠেরই দূরের কোনো অংশ তার থেকে উঁচুতে, আবার সামনের আলটাই ছোট্ট একটা গাছ বেয়ে ওপরে উঠেছে। বাগানের গা-লাগা জমিটা একটা ঢাল। তার পরই ডাঙা। ঢাল জমিটাতে ভাল ধান হয়েছে। কিন্তু তার পরই পাথুরে বরমতল। এখন ত চা বাগান আর ফরেস্ট শুরু হবে। ধানি জমি কমে আসবে। খেতবাড়ি তিস্তাপারেই ভাল।
সেই নিচু জমির আলটা দিয়ে চলতে-চলতেই বাঘারু দেখে,সামনের ডাঙারও ওপারে আকাশটা লাল হয়ে উঠছে, যেন ঐ ডাঙাটা আকাশটারই ঢাল। বাঘারু খুশি হয়ে ওঠে। গোচামারিতে বাড়ি থেকে বেরতে-বেরতেই যদি সূর্যটা উঠত, তা হলে তার পেছনে পড়ত, সে সূর্যোদয় দেখতে পেত না, অবিশ্যি আকাশটাও অনেকক্ষণ তার মাথার ওপর ছিল–সেখানে রঙের খেলা দেখতে পেত। কিন্তু এখন ত তার মুখোমুখি সূর্যোদয়, এই ঢাল পেরিয়ে ঐ ডাঙায় উঠলেই। যেন এই সূর্যোদয়ের কারণেই এই বারঘরিয়ার মাঠে বাঘারুর আসা–এমনই লাফিয়ে লাফিয়ে সে ডাঙাটার দিকে ছোটে।
ডাঙাটাতে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার সামনে কোণাকুনি বারঘরিয়ার মাঠটা ছড়িয়ে গেছে সেই পুব-দক্ষিণে কান্তদিঘি কুমারপাড়া পর্যন্ত। কান্তদিঘি কুমারপাড়ার ঐ দিক থেকে সূর্য উঠছে। এখন, বাঘারুকে যেতে হবে এই সূর্যটাকে ডাইনে রেখে একটু উত্তর বরাবর। কিন্তু, এমন সূর্যোদয়ের মুখোমুখি পড়ে বাঘারু যেন আর নড়তে পারে না। ডাঙার ওপরে উঠেই সে দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর, যেন একটা ভাল জায়গা বেছে, শ্যাওড়া গাছটার নীচে গিয়ে দাঁড়ায়। তার সামনে, অর্ধবৃত্তাকার প্রান্তরের শেষে দিগন্তে সূর্যোদয়ের দৈনন্দিন ধারাবাহিকতা শুরু হয়ে গেছে।
.
০৫৪.
বাঘারু ও সূর্যোদয়
কান্তদিঘিকুমারপাড়ার দিকে মুখ করে বাঘারু দাঁড়িয়ে। তার পুবে কুমলাই, তার পুবে মাথাচুলকা, মাথা চুলকার পুবে ধূপঝোরা। এই সূর্যোদয়ের ভূগোল বাঘারুর এই পর্যন্তই জানা। সে যেখানে যাচ্ছে, সেই ডায়না নদীর জঙ্গলে ত পুব দিক আছে। সেই সব পুব দিকের নাম তার জানা নেই। সূর্য ত সেখান দিয়েও উঠছে। পুবের রাস্তা, সেখানে, আরো পুবে, আসামের দিকে গেছে। সেই সব পুবদিক দিয়েও এই একই সূর্যোদয়। এখন বাঘারু সেই না-জানা পুবদিকেই চলেছে বলে এই সূর্যোদয় আকাশময় ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে-সঙ্গে সেই জানা-অজা মেশানো সারাটা পুবদিকই বাঘারুর সামনে খুলে যাচ্ছে।
কান্তদিঘি-কুমারপাড়া আর কুমলাইয়ের আকাশটা আগুনরাঙা। সেই আগুন ফরেস্টের বড় বড় গাছগুলোর মাথা উঁল। এতদূর থেকে ফরেস্ট ত সবুজ না, ছাই-ছাই। যেখানে-যেখানে আগুন লাগছে, ছাই ফেটে অন্য রঙ বের হচ্ছে। দূর থেকে দেখায়, ফরেস্টের ভেতর এক-একটা আলগা-আলগা গাছে আগুন লেগেছে, এক-একটা গাছে যেমন বাজ পড়ে।
ফরেস্টের ছাই-ছাই রঙ আর নদীর ওপরে বা মাঠের শেষে দিগন্তের ছাই-ছাই এমনই মিলে গেছে, কোনটা ফরেস্ট বোঝা যাচ্ছিল না, এখন বহু দূরে-দূরে ঐ আগুন রঙ লেগে যাচ্ছে বলে বাঘারুর চোখের সামনে, গাছগাছড়া জলজঙ্গলের রঙগুলো আলাদা-আলাদা হয়ে যায়।
কিন্তু সূর্যের সেই আগুনরাঙা আলো সারা আকাশে ত একই রকম লেপে যাচ্ছে না। গয়ানাথের বাড়ি থেকে তার মাথায়-মাথায় চলে আসছে যে-আকাশ, সবুজ নাগান, সেই আকাশের বহুদূর পর্যন্ত আগুনরঙের ফালি চলে গেলে তার ভেতর থেকে সবজে ফালিগুলোও বেরিয়ে থাকে। আকাশের সবুজের নীচে, কোথাও-কোথাও কিছু-কিছু মেঘ ছিল। সেই সব জায়গায় আকাশের রঙ, মেঘের রঙ, আলোর রঙ মিলে আর নানা রকম রঙ তৈরি হচ্ছিল।
কুন অং [রং] কুখন ফুটে উঠে আর মিলি যায়, না-দেখা যায়, না-বোঝা যায়। চক্ষুর পলকখান একবারে ফেলিবার মধ্যে আকাশখান আর-এক ঝলক বদলি গিছে। আগুনের নাখান অংটা দূরত-দূরত চলি যাছে, হু-ই পচিম পাখত তিস্তানদীর পারত, তার পচিমে জলপাইগুড়ি সদরত, তার পচিমে কোটত কোটত আজগঞ্জ—-সবখানের আকাশ নাল [লাল টকটকা হবা ধরিছে হে। এ্যালায় কুমলাইয়ের পুবত অংখান পাতলা হবা ধরিছে। কায় য্যান ঐ লাল অংটা ধুইবার ধইচচে। আর-হুঁ-ই তিস্তাপারের পচিম পাখ তক পাতলা হয়্যা যাছে। কোটত আলো কোটত যায়।
