বাঘারু যে-ভাবে আগুনগলির সামনে দাঁড়িয়ে, সেভাবে সাধারণত বনের পশুরা দাঁড়ায়, যেন পথ ঠিক করতে পারছে না। লম্বা হাত দুটো নাড়িয়ে ফরেস্টের বাতাস কেটে বাঘারু গন্ধ শোকে–ফরেস্টের। একবার ডাইনে ঘাড় ঘুরিয়ে হাতির রাস্তা ধরে আনন্দপুরের দিকে তাকায়। আবার, ঘাড় কাত করে আকাশের চাঁদটাকে দেখে। তার পর, ফরেস্টের ভেতরটা একবার দেখে। শেষে, ডাইনে ঘুরে সোজা হাঁটতে শুরু করে বাগানের দিকে।
এখন, বাঘারু যতই বাগানের দিকে এগয়, চাঁদটা ততই গাছের ডালে-ডালে তিস্তার দিকে পেছয়। মাঝেমধ্যেই তাকিয়ে-তাকিয়ে বাঘারু দেখে নেয়। ঘাড়টা তাকে বারবারই বেশি ঘোরাতে হয়। আনন্দপুরে ঢুকে যাওয়ার পর ঘাড় ঘুরিয়েও চাঁদটাকে হয়ত আর দেখা যাবে না। আরো খানিকটা সকাল ত হল– বেশিক্ষণ আকাশ সবুজ থাকবে না। আলো পড়লেই প্রথমে নীল, তার পর শাদা হতে শুরু করবে। তখন ঐ জলছাপ চাঁদ আর দেখা যাবে না। বাঘারুর হাটার বিপরীতেই যখন ঐ চাঁদের গতি আজ, তা হলে চাঁদটা তিস্তার ওপর গিয়ে পড়বে। ওপরে নীলচে শাদা আকাশ, নীচে তিস্তার শাদা ঘোলাটে জল–ও চাঁদ তখন কোথায় মিশে যাবে?
এখন এই ফরেস্ট, খেতবাড়ি, নদী, হাট, বাড়ি-টাড়িবস্তি, এই বাতাস, ভেজা ঘাস, আপথ, বাঁশ ঝাড়, চা-বাগানের ফ্যাকটরির নল, এই-সব কিছু নিয়ে একটা নতুন দুনিয়া তৈরি হয়ে উঠেছে আবার একটা দিনের জন্যে।
সেই নতুন দুনিয়ার এখন পর্যন্ত এক বাঘারু আছে আর ঐ চাঁদ আছে।
.
০৫৩.
ভোরের আগে চা-বাগান
মাঠে-মাঠে খেতবাড়িতে, জঙ্গলবাড়িতে, ধানবাড়িতে যেমন হাটে বাঘারু, তেমনি হটছে, এখন। নদীর বা ফরেস্টের জঙ্গলের ভেতর আলাদা হাঁটা–ঠেলে-ঠেলে। আর-সব হাঁটাই এক রকম–আকাশের অনেক ওপরে পাখির ডানা-ভাসানো ওড়ার মত ভেসে-ভেসে হাটা, পায়ে-পায়ে খুব বেশি ধুলো ওড়ে না, খুব বেশি দাপাদাপি হয় না–মাটির ওপর নিজের ওজন ছাড়া। তিস্তার খুব টান-টান স্রোতে শালগাছ যেমন হালকা হয়ে যায়, এই বহুদূর পর্যন্ত ছড়ানো মাঠের টানে বাঘারুর লম্বা শরীর, চওড়া বুক-পিঠ, লম্বা-চওড়া, বাহুকজি, শক্ত কাঁধ আর লম্বা পা দুটোর তেমনি সব ভার চলে যায়।
কিন্তু মাঠেরও স্রোত আছে আর বাঘারুও শালগাছ বলে হাঁটাটা মাটির ভেতর গেঁথে যায়। এতটাই, যেন মাটিটা হাঁটে–ফরেস্ট, হাট, টাড়ি-বাড়িসহ এই মাটিটাই। তখন সামনে যাই আসুক, গতি প্রতিহত করা যায় না। হয় বাঘারুকে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়ে নামতে হবে, নয় সামনের বাধাটাই ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়।
বাঘারুর ত আর রাস্তা দিয়ে যাওয়া নয়। রাস্তায় সামনে অনেকখানি দেখা যায়, রাস্তাটাও দু-পাশের সঙ্গে মিশে যায় না, আলাদা থাকে, দু-পাশটাই বদলায়।
কিন্তু তাই বলে ত মাঠজঙ্গল ভেঙে হাতির পাল, মোষের পালের মত যাওয়া বাঘারুর নয়। তার পায়ের একটা আন্দাজ আছে–নির্ভূল। তাকে যদি চালসার পুবে ডায়না নদীর চরে পৌঁছতে হয় তা হলে তাকে প্রায় সিধে উত্তর-পূবে হাঁটতে হবে। এখন থেকে সিধে কোনাকুনি চললে রাস্তা ছোট হয়ে আসবে। কিন্তু রাস্তা ছোট করার জন্যে বাঘারু ত আর তার চেনা লাইন, চেনা জায়গা ছাড়তে পারে না।
আনন্দপুর চা-বাগানে ঢোকার একটা গেট আছে। গেটের আগে জলনিকাশী বড় নালার ওপরে লোহার পাইপ একটু-একটু ফাঁক করে সাজিয়ে তৈরি করা ক্যালভার্ট। গরু-ছাগলে ঢুকতে পারে না, পাইপে পা পিছলে ফাঁকে আটকে যায়। চওড়া বেঁটে গেটের পাশে লোহার খুঁটি সানজির। (দুই আঙুলের মাঝখানের ফাঁক] মত–যাতে মানুষজন যাতায়াত করতে পারে, গেট বন্ধ থাকলে। ওখান থেকেই বাগান ঘেরা তারের বেড়া।
আনন্দপুরের গেটটা পার হতেই সকালটা যেন শুরু হয়ে যায় কেন, বাঘারু বোঝে না। এতক্ষণ যে বাঘারু হেঁটে এল আকাশ আলো-গাছপালা-হাওয়া সব এক হয়ে মিলেমিশে ছিল। আনন্দপুরে সবই সাজানোগোছানো, আলাদা-আলাদা। দু-পাশে চা-বাগানের কাটাছাটা সমান বেড। সেগুলোর মাথার ওপরে ছায়া-দেয়া গাছের সমান মাথা। মাঠের মত সমান চা-বাগানের বেডের ওপরে ছাতির মত সমান। গাছের মাথা। বেড়গুলো তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা, ওপাশে গভীর নালা। জল যা যাওয়ার যায়, কিন্তু বেডের ভেতর হাতি ঢুকতে পারে না ঐ নালীর জন্যে। মানুষজনের যাতায়াতের জন্যে মাঝেমধ্যে ইটের সিঁড়ি, কোথাও-বা কাঠেরও সিঁড়ি, দুই-এক জায়গায় আবার আঙুলফাঁক লোহার খুঁটি।
মাঠঘাট বনবাদাড় পেরিয়ে এসে বাঘারুকে এই চা-বাগান আনন্দপূরে শুধু রঙ দেখতে হয়। বাবুদের বাড়ির টিনের চালের সবুজ বাংলোর দোতলা চালের সবুজ, জানলা-দরজার সবুজ–চার পাশের এত সবুজের মধ্যেও এই সবুজগুলো আলাদাভাবেই চোখে পড়ে। রাস্তার মোড়ে-মোড়ে লাল-শাদা রঙের খুঁটিগুলোর বাক অনেক দূর থেকে দেখা যায়। আর, মোড়ের যেন শেষ নেই। একটা মোড় পেরনোর সময় ডাইনোয়ে সামনে-পেছনে তাকালেই দেখা যায় চারদিকে লাইন বেঁধে মোড়ের পর মোড়, মোড়ের পর মোড়। আর মোড় মানেই ত রাস্তা, রাস্তার পর রাস্তা। একই রকম শিরীষ গাছের তলায়, একই রকম চাবাগিচায়, একই রকম রাস্তায়, তার পর একই রকম মোড় হয়ে হয়ে যাওয়ায় সোজাসুজি রাস্তারই একটা গোলক ধাঁধা তৈরি হয়। এত রাস্তা দিয়ে কত লাক হাঁটে। এত রকম বাড়িতেই বা কত লোক আঁটে। ছোট-ছোট বারান্দার বাড়ি, লম্বা-লম্বা বারান্দার বাড়ি, ছাদের বাড়ি, টিনের বাড়ি, ভামনির বাড়ি, কাঠের বাড়ি, দালানের বাড়ি, বেড়ার বাড়ি।
