বাঘারু জবাব দেয়, কিছু কহ নাই।
কহ নাই? যেইলা উমরাক ফুলবাড়িতে নিয়া গিছিস, কী কহিছিস?
মোর নামখান কহিছু।
খুব নাম চিনবার ধইচছিস, না?
মোর জন্মকথাখানা কহিছু। তুই শালো অবতার হবার ধইচছিস, না? নিজের জন্মকথাখান নিজেই শুনাবার ধইচছিস মানুষক? আধিয়ারির কথা কহিস নাই, এম-এল-অক?
কী কাথা?
আধিয়ারির কাথা। এম-এল-এ হামাক কহিল, তুই কহিছিস আধিয়ারির কাথা। এম-এল-এ হামাক কহিল, উমরাক একখান আধিয়ারি দ্যান কেনে। শালো, জমিন মোর, না তোর এম-এল-অর?
মুই কহ নাই।
কহিছিস কি কহিস নাই, বুঝিবু এ্যালায়। তুই কালি সূর্য উঠিবার আগত এই তিস্তাপার ছাড়ি চলি যাবি। হু-ই নাগরাকাটাত ডায়না নদীর চরত মহিষের বাথান আছে, ঐঠে থাকিবু। বুঝলু? আর কান্দুরা ঐঠে আছে। পাঠাই দিবি। বুঝলু?
.
০৫২.
বাঘারু ও চাঁদ
পরদিন, রাত না পোহাতে বাড়ি থেকে নেমে বাঘারু দেখে, আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে, আকাশ ঝকঝকে সবুজ, সেখানে একটা শাদা চাঁদ।
বাঘারু ডাঙা থেকে লাফ দিয়ে নীচে নামে। আর চাঁদটাও তড়াক করে লাফ দিয়ে আপলাদ ফরেস্টের মাথা থেকে তার মাথার ওপর এসে পড়ে। লাফ দিয়ে নেমে বাঘারুকে দাঁড়াতে হয়। চাঁদটাও আকাশে আটকে যায়। বাঘারু মাঠ দিয়ে চলা শুরু করে দক্ষিণ হাঁসখালির দিকে। চাঁদটাও গড়িয়ে-গড়িয়ে চলে। চাঁদটা টাকার জলছাপের মত। চার পাশে আলো ফুটলে আর দেখা যাবে না। আকাশটা এত ঝকঝকে সবুজ, আলো ফুটতে দেরি হবে না।
তিস্তা এখন তার পেছনে। তাকে তিস্তা পার থেকে চলে যেতে হচ্ছে। দেউনিয়া এখনো ঘুম থেকে ওঠে নি। আসিন্দিরজোয়াইও ওঠে নি। ওরা উঠে দেখবে বাঘারু নেই। জানে, বাঘারু থাকবে না। বাঘারুকে ডাকবে না।
বরসোজা উত্তরে-পুবে, এই আনন্দপুর বাগানে ঢুকে ও চাঁদটা আরো বায়ে
এখন নিজের চোখের সামনেটা পরিষ্কার। বিঘাখানেক দূরের জায়গা নজরে আসে না। দূরে, বাড়ি-টাড়ি জলছিটানো কুয়াশায় ঢাকা। এই ধোয়া ধোয়া ভাবটা কাটতে সময় নেয়। সারা দিনই কিছু-না-কিছু লেগে থাকে গাছের মাথায়, নদীর ওপরে। এগুলো আকাশের কুয়াশা নয়–বনের বা নদীর কুয়াশা। সোজা তাকিয়ে হাঁটলে মনে হয় চাঁদের আলোয় হাঁটছে, সামনে কী আছে জানে না। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটলে বেশি দূর দেখা যায়। বাঘারু ঘাড় কাত করে আকাশেই তাকায়।
গোচিমারি থেকে হাঁসখালি পর্যন্ত অনেকখানি ঢাল জমি–তিন পাশের সব জমিই উঁচু, কোনো-কোনোটা ত বেশ উঁচু। এই ঢালটার ওপরে, এই সবুজ আকাশ যেন ঢাকনা। গোচিমারির ঢালের মাঝখানটা কড়াইয়ের মত। সেখানে নামতেই চাঁদটা এক লাফে তার মাথার ওপর এসে পড়ে। চার পাশে উঁচু ডাঙার জন্যে আর-কিছুই দেখা যায় না। দূরে ফরেস্টের গাছগুলোকে মনে হয় পাহাড়ের গায়ে জঙ্গল। সেই খাদের ভেতর বাঘারু আকাশের চাঁদের মুখোমুখি।
বাঘারু চাঁদের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে। হেসে বাঁ দিকে মুখ ঘোরায়-চঁদ ডাইনে সরে। ডাইনে মুখ ঘোরায়, চাঁদ বয়ে সরে। বাঘারু একটা ঢেলা কুড়োয়। সেটা চাঁদের দিকে ছোঁড়ার জন্যে কয়েক পা দৌড়তেই চাঁদটাও তাড়াতাড়ি গড়িয়ে সরে যায়। ঢেলাটা ছুঁড়ে বাঘারু দাঁড়িয়ে পড়ে। চাঁদটাও থেমে যায়। একটু দূরে ঢেলাটা পড়ে যাওয়ার ধুপ আওয়াজ হয়। চাঁদটার দিকে একটু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বাঘারু আবার হাঁটতে শুরু করে হাঁসখালির বাঁধের দিকে। চাঁদও গড়াতে থাকে আপলাদের দিকে। এখন বাঘারুকে আবার একটু-একটু করে উঁচুতে উঠতে হচ্ছে–কড়াইয়ের গা বেয়ে। চাঁদটাও একটু-একটু করে ওপরে উঠে যেতে থাকে–আরো উত্তরে। এখন আবার ডাঙার ওপরের গাছগাছড়া দেখা যাচ্ছে। ফরেস্টটা মাটিতে নেমে আসছে। সেই ফাঁকে চাঁদটা আড়ালে সরে যায়। বাঘারু বোঝে, দেখা না-গেলেও কোথাও আছে। সে হাঁসখালির বাধে উঠে পড়ে। আর দেখে, বাঁধ বরাবর সোজা উত্তরে-পুবে, একেবারে তার সামনাসামনি, চাঁদটা আকাশের গায়ে সেঁটে আছে। এই হাঁসখালির বাধ বা হাতির রাস্তাটা সোজা আনন্দপুর বাগানে ঢুকে গেছে। আপলাদের ভিতর দিয়ে যে রাস্তাটা ওদলাবাড়ির দিকে গেছে, সেটা বয়ে রেখে বাঘারু সিধে হাঁটে। চাঁদটা আরো বায়ে ফরেস্টের মাথায় চলে যায়। বাঘারু ফরেস্টের মাথার ফাঁক দিয়ে দিয়ে চাঁদটাকে দেখে। ফরেস্টের ভেতরটায় এখনো অন্ধকার–শেষ রাত্রি। সেই অন্ধকারের ভেতর দিয়ে আকাশটা আরো সবুজ ও চাঁদটা আরো স্পষ্ট দেখায়–সকালের শাদা চাঁদ নয়, রাত্রির জ্বলজ্বলে চাঁদ। এখন, এই হাতির রাস্তাটা ছেড়ে ফরেস্টের ভেতর ঢুকলে চাঁদের সেই আলো পাওয়া যাবে। ফরেস্টের ভেতরের এই রাত্রির আড়ালে-আড়ালে চাঁদটা অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারে। মাঝখানে একটা আগুনলাইনের সড়ক–ফরেস্টটাকে দু-ভাগ করছে। বাঘারু বায়ে ঘুরে, দাঁড়িয়ে পড়ে। ফরেস্টের ভেতরের রাত্রির ওপরে চাঁদটা ডাইনে লেগে আছে। যে-আগুনলাইনের দিকে মুখ করে বাঘারু দাঁড়িয়ে সেটাতে গাছপালা নেই। তাই একটু আলো আছে। কিছুদূর গিয়েই সে আলো আবার আবছা। এখনো আকাশে দিনের আলো এত জমে নি যে এই আগুনলাইনটা পুরো দেখা যাবে। মাঝখানের সেই অন্ধকারের পরে ঐ আগুনলাইনের শেষের আভাস দেখা যায়–আকাশের সবুজ আর নদীর বালির শাদায়। মনে হয়, সেখানে আরো বেশি সকাল হয়ে আছে।
