আপনি আগে দেখলেই ত এত গোলমাল হত না। আমিও জানি লোক্যাল ঘটনা সব আছে। ধরেন, ঐ জব্বরের দাদারাই ত কনট্রাকটরি করে। ওরা সব যেই দেখছে এদিকে এই সব কাজ শুরু হইছে–অমনি বলাকওয়া শুরু করে দিছে যে লোক্যাল কনট্রাকটারদের দিয়া কাজ করিবার লাগবে। এই মিটিঙেই সেই কথা তুলত, নেহাত সুযোগ পায় নাই। আবার এই ভদ্রলোক ঐসব বললেন, এই নিয়ে সাত কথা হবে।
আমি স্যার বুঝি নাই, ঝোঁকের মাথায় বলে ফেললাম।
না ঐ কথাটা তুমি বলতে গেলে কেন, তুমি ত আর নামধাম বলবে না, সে কথা কি আর দশ জনের সামনে বলা যায়, সাব-এ্যাসিস্টান্ট ইনজিনিয়ার মণ্ডল বলে।
যাক, ছেড়ে দিন। আসলে এসব লোক্যাল ইস্যু বাড়তে দিলেই বাড়ে। তার ওপর নানা রকম ইন্টারেস্ট আছে। পলিটিক্যাল ইন্টারেস্টই কি কম। আপনারা একটু ট্যাক্টফুলি চলবেন। বীরেনদাও যদি আপনাদের ওপর রাগ করেন, তা হলে আর আপনারা কাজ করবেন কাকে নিয়ে? বীরেনদাইবা অত। রেগে গেলে কেন? আরো যাও লাথি মেরে রেলিং ভাঙতে, এখন পা ব্যথা করছে?
আরে না, না, আমি কি আর জোরে লাথি মারতে গেছি? তবে আপনারা যাই বলেন, ঐরকম পাটকাঠির মতন রেলিং কোনো ব্রিজের থাকে না। আপনি ও নিয়ে ভাববেন না স্যার, আমি কাল সকালে ঠিকাদার আর মণ্ডল দুজনকে নিয়ে গিয়ে দেখে কী ভাবে কী করা যায় ঠিক করে আসব। আমি আপনাকে জানিয়ে দেব।
.
সে শুধুই দর্শক আর শ্রোতা ছিল যে-মিটিংটাতে, তার অভিজ্ঞতা সুহাস নিজের কাছে ছকে নিতে চায় কিন্তু পারে না। শেষ পর্যন্ত ত ধরা পড়ে যায় গ্রামের ভেতরের কোন-একটা ছোট নদীর ওপর তৈরি ক্যালভার্টে নিয়ম অনুযায়ী সিমেন্ট-বালি-লোহা এই সব ব্যবহার করা হয়েছে কি না তা নিয়ে এম-এল-এর এত গভীর উদ্বেগের আসল কারণ তার চিঠি পেয়েও এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার না এসে সাব এ্যাসিস্ট্যান্ট এসেছে কেন, আর তাকে স্যার বলা হয় না কেন। যদি ইনজিনিয়ারটি ফুলবাড়িতে যেত, তা হলে ত আর এরকম একটা মিটিং হত না। যদি কোথাও কোনো গোলমাল থাকত তা হলে সেটা ঐ ইনজিনিয়ারের অফিসেই মিটমাট হত–যেমন এখনো হবে। যে-নিয়ম ও আইনকানুনের কথা বারবার ইনজিনিয়ার ভদ্রলোক বলছিলেন, সুহাস তা মেনে ন নিয়ে পারে না, শুধু এই নেহাত ব্যক্তিগত কারণে যে তার কাজের ভেতর এ-রকম হস্তক্ষেপ হলে তারও ত একমাত্র রক্ষাব্যবস্থা সরকারি ঐ আইনকানুনই। আর এত মিটিং-টিটিং সত্ত্বেও সকলের চোখের সামনেই ত ইনজিনিয়ার ওদের কৃষক সমিতির সম্পাদককে গাড়ি করে নিয়ে এল। এটা আর কে না বুঝবে ঐ ভদ্রলোক ইনজিনিয়ারদের। নিরাপত্তার গ্যারান্টিই শুধু ছিলেন না, এমন-কি এম-এল-এর সঙ্গে ঝগড়ারও একমাত্র মীমাংসাকর্তা ছিলেন তিনিই।
এই সরকারি চাকরিতে ঢোকার আগে সুহাস গ্রাম ও কৃষক নিয়ে এক জাগরণের অনির্দিষ্ট অথচ যেন সম্ভাব্য চিন্তায় মগ্ন ছিল। অনির্দিষ্ট বলেই তাতে এমন সব নেহাত বাস্তব ঘটনার জায়গা করে দিতে পারে না সুহাস যে সরকারি পার্টির লোক হবার সুবাদে কনট্রাকটারের কাছ থেকে কিছু সিমেন্ট আদায় করার চেষ্টা আর ঠিকেদারদের কাজের ওপর এমন নজর রাখা একই সঙ্গে ঘটতে পারে। বাস্তবে, ঘটনার গায়ে ঘটনা, কার্যকারণের শৃঙ্খলা ছাড়াও যে লেগে থাকে, আর সেই একটি ঘটনার ভূমিকা যে অন্য ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল থাকে না সব সময়, কোনো-কোনো সময় আলাদা ও স্বাধীন হয়ে যেতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা সুহাস ত জানে না। তাই তার ব্যক্তিনিরপেক্ষ মহত্তর-বৃহত্তর কামনাবাসনায় গ্রহণই লেগে থাকে সুহাসের। বীরেন্দ্রনাথ রায়বর্মনের মত এক স্থানীয় এম-এল-এ-র সঙ্গে সরকারি চাকরির ঐতিহ্যবান ইনজিনিয়ারদের এই মোকাবিলায় এম-এল-এ যে ইনজিনিয়ারকে তাদেরই খেলার নিয়মে প্রায় হারিয়ে দিচ্ছিল টেস্ট হাউসে পরীক্ষা করতে পাঠানোয় আরজি হয়ে গিয়ে, সেটা ত সুহাসের কাছে একটা কৌশলমাত্র। সেই কৌশলটা যে এম-এল-এ আয়ত্ত করতে পেরেছে এটা তার কাছে ধরা পড়ে না। এতটা পরিবেশনিরপেক্ষ হলে সুহাসকে নিজেরই চারপাশে পাক খেতে হবে। সুহাস নিজেকে ঘিরে আর-একটা পাক জড়ায়।
গয়ানাথ তার বাড়ির বাইরে উঠোনে ঢুকতে-ঢুকতেই চেঁচায়, হেই বাঘারু, বাঘারু, হেই বাঘারু। গয়ানাথের গলা শুনে ভেতর থেকে একজন একটা লণ্ঠন নিয়ে আসে। সেই লণ্ঠনের আলোতে গয়ানাথের এই বাড়িঘর সর লম্বা হয়ে মাটিতে দোল খায়।
গয়ানাথের বৌ ভেতরে চিৎকার করে ওঠে, নিজের বাড়িত কি ডাকাতি করিবার আইচছেন?
আসিন্দির মোটর সাইকেলটা ঠেলতে-ঠেলতে ভেতরে নিয়ে রাখে। চেঁচায়, এই, কায় আছিস, লণ্ঠনখান ধর এতৃতি। যে লণ্ঠন নিয়ে আসছিল সে দাঁড়িয়ে পড়ে, তারপর পথ দেখাতে উঁচু করে ধরে।
গয়ানাথ আবার চিৎকার করে ওঠে, হে-ই বাঘারু, বাঘারু। তার পর হঠাৎই তার একেবারে সামনে, প্রায় তার ওপরে, বাঘারুকে দেখে চমকে ওঠে, শালো বলদ, জবাব দিবার পারিস নাই? শালা, বোবা ত হাম্বা ডাক কেনে। যা, দূরত যা, দূরত যা।
বাঘারু একটু দূরে সরে যায়। কিন্তু তখনো গয়ানাথ তার চোখের দিকে তাকাতে পারে না। বস ঐঠে, শালো বলদ, বস কেনে, খাড়া হইছে য্যান ফরেস্টের শালগাছ।
গয়ানাথের কথা শুনে বাঘারু বসে পড়ে, মাটির ওপরে। হয়ত রাত্রি বলেই, বসার পর বাঘারুর সামনে গয়ানাথকে যেন আরো ছোট দেখায়। গয়ানাথ তার ফাটা বাঁশের মত চেরা অথচ সরু গলায় চিৎকার করে ওঠে, কী কহিছিস এম-এল-অক?
