এই কথার জবাবে ইনজিনিয়ার বুঝি কিছু বলতে চায়, কিন্তু মণি হাত তুলে থামায়। মণি দাঁড়িয়েই থাকে। সে দাঁড়িয়ে আছে একমাত্র এই কারণে যদি বীরেনদা চুপ করে। মণি যে ইনজিনিয়ারকে থামিয়ে দেয় সেটা দেখে এম-এল-এ আবার বলে ওঠে, উমরাক থামাছেন কেনে, কহিবার দ্যান, আর নতুন কী কহিবেন? য্যালায় দেখিলেন ঐ সব টেস্টমেস্ট বলিয়াও হামরাক ঘাবড়ান গেইল না, স্যালায় ঠিকাদারের মানষিক দিয়া বলিবার ধইরছে যে এই ফুলবাড়ির মানষিগিলাই চোর।
ফুলবাড়ির দলটা একসঙ্গে ফুঁসে ওঠে, নাম কহেন, নাম কহেন, আমরা তাক ডাকি আনিব, দলের ভেতর থেকে দু-চারজন দাঁড়িয়ে উঠে ইনজিনিয়ারদের দলটার দিকে চেঁচায়। মণি তাদের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, বসি পড়েন, এই বসো।
এম-এল-এর রাগ ঠিক সেই সময় চরমে ওঠে, করিবেনটা কী? ঠিকাদারের চুরি ধরিলে আপনাকে চোর বানাবে, ইনজিনিয়ারক ফাঁকি ধরিলে আপনাক ঠক বানাবে, আইন ধরি চলিবার রাজি হইলে আপনাক বেতাইন বানাবে, কালি..গিয়া খবরের কাগজ-এডিওতে প্রচার করি দিবে–আবার ডুয়ার্সে গণআদালত, ইনজিনিয়ারদের বিচার।
মণি নিচু হয়ে এম-এল-একে অত্যন্ত দ্রুত কিছু বলে, তারপর সোজা দাঁড়িয়ে চিৎকার করে, শোনেন, আপনারা যদি না বসেন আমি এ মিটিং এখনই ভেঙে দেব, বসেন বসেন।
ধমকে ফুলবাড়ির দলটা বসে পড়তেই মণি চিৎকার করে বলতে শুরু করে, শোনেন, এমন কিছু হয় নাই যে এখানে একটা দাঙ্গা-হাঙ্গামা বেধে যাবে। এখানকার ইনজিনিয়ারদের ব্যবহারে আমাদের এম-এল-এ খুব দুঃখিত হয়েছেন। এম-এল-এ আমাদের সকলের ভোটের দ্বারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। সুতরাং এমএল-এর দুঃখ আমাদের সকলের দুঃখ। তার দুঃখ আমাদের দূর করতে হবে। কিন্তু তিনি ত কোনো ব্যক্তিগত কারণে দুঃখ পান নাই। দেশের একটা কাজে এরকম একটা গোলমাল হয়ে গেছে বলেই তার দুঃখ। সরকারি কাজকর্মের নিয়মই আলাদা। সেই নিয়মে হয়ত ইনজিনিয়ারসাহেব ভেবেছেন যে ছোট ইনজিনিয়ারই সব বুঝিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু ইনজিনিয়ারসাহেবের উচিত ছিল এম-এল-এ সাহেবের সঙ্গে দেখা করা। কিন্তু এই সব রাগারাগি দিয়ে ত আর আমাদের এই অঞ্চলের কাজকর্ম চলবে না। তার ওপর আমরা ঠিকাদারদের কথাও শুনলাম। সেও একজন অতি ছোট্ট ঠিকাদার। সে যদি আজ আইনের প্যাঁচে পড়ে যায় তা হলে বড় ঠিকাদার তাকে বাঁচাতে আসবে না, সেটাও আমাদের দেখতে হবে। তাই আমি প্রস্তাব দিচ্ছি যে, এই সভায় ত সব খোলাখুলি আলোচনা হল। এখন এইটুকু একটা ব্রিজ নিয়ে হিল্লিদিল্লি করার দরকার নেই। মালবাজারে একদিন এম-এল-এ, ইনজিনিয়ার, ঠিকাদার ও আপনাদের ফুলবাড়ির দুইজন লোক মিলে বসে সব মীমাংসা করে নেন। তাতে ব্রিজের কোনো অংশ ভেঙে যদি আবার তৈরি করতে হয়, তৈরি করে দিতে হবে। আর দুটো-একটা বর্ষায় ব্রিজের কোনো ক্ষতি হয় কিনা সেটা পরীক্ষা করার জন্যেও সময় দিতে হবে।
ঠিক এই সময়, গয়ানাথ আর হাট কমিটির মেম্বার আগে-আগে ও তাদের পেছনে-পেছনে একটি ছেলে একটা বড় কেটলি, আর-একটি ছেলে একটা ঝুড়ি, আর-একটি ছেলে আর-একটা ঝুড়ি নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে বারন্দায় উঠে একেবারে শতরঞ্চির মাঝখানে চলে এলে, মিটিংটা যেন ভেঙে যাবার মত হয়। সেই ভাঙা মিটিঙের ওপর দুটো হাত তুলে মণি জিজ্ঞাসা করে, তা হলে এইটাই ঠিক ত? তা হলে এইটাই ঠিক থাকল?
গয়ানাথ আর মেম্বার মিলে চা দেয় হাতে-হাতে, চা নয়, চায়ের গ্লাশ। আর কেটলি হাতে ছেলেটি গ্লাশগুলোতে চা ঢালে, হেই দেখিস কেনে, ফেলিস না গাওত। ঐটুকু ছেলের অত বড় কেটলি নাড়ানোর অভিজ্ঞতা এমনই যে সে কোনো গ্লাশেই এতটা চা ঢালে না,যাতে উপচে যায়। গ্লাশ দেয়া হয়ে গেলে গয়ানাথ আর মেম্বার মিলে আর-এক ঝুড়ি থেকে প্রত্যেককে একটা করে সিঙাড়া আর একটা করে মিঠা নিমকি হাতে-হাতে দিতে শুরু করে।
এইসব মিটিং যেমন ভাঙে, এই মিটিংটাও তেমনি ভাঙতে শুরু করে। কথাবার্তা, ঝগড়াঝাটি, রাগারাগি, মিলমিশ এই সবের ভেতর দিয়ে বেশ একটা তৃপ্তির ভাব আসে। খুব বিশেষ বিশেষ উপলক্ষ ছাড়া এত রাতে এতগুলো মানুষ একই সঙ্গে এক জায়গা থেকে বেরচ্ছে এমন ঘটনা ক্রান্তিহাটে খুব হয় না। ফলে, মিটিং ভাঙার মধ্যে একটা নতুন অভিজ্ঞতার আরামও জোটে।
গাড়ি করে যারা মালবাজারে ফিরে গেল, মণি, এম-এল এ ও ইনজিনিয়ার, ঠিকাদার, আর, এখানে সুহাস, এই আরামের ভাগিদার নয়। আর নয় গয়ানাথ, কিছু পরিমাণে।
২.২ এক মিটিঙের তিন ফল
চা-সিঙাড়া খেতে-খেতে মিটিংটা ভাঙার পর সবাই নানা দলে ভাগ হয়ে যায়। ক্রান্তিহাটের দল মালবাজারের গাড়ি চলে গেলে যে যার বাড়ি চলে যাবে। গয়ানাথ আর হাট কমিটির মেম্বারকে এম-এল-এ বলে, শতরঞ্চিটা রেখে দিতে যাতে ফুলবাড়ির ওরা রাতটা ঘুমতে পারে, আর সুহাসকে বারবার দুঃখ জানায় তার ঘাড়ে এসে মিটিংটা করল বলে। মিষ্টির দোকানদার হ্যাজাক নিয়ে যেতে লোক পাঠায়। সেই লোকটি হ্যাজাক ধরে পথ দেখিয়ে এম-এল-এ, ইনজিনিয়ার ও মণিবাবুকে জিপ গাড়ির সামনে নিয়ে যায়। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে তৈরিই ছিল বলে বিদায় নিতে দেরি হয় না।
গাড়িটা মিনিট দু-এক চলার পরই ইনজিনিয়ার এম-এল-একে বলে, বীরেনবাবু, আমি না বুঝে আপনার সেন্টিমেন্টকে আঘাত দিয়েছি। বিশ্বাস করুন, সত্যি আমি ওরকম কিছু ভেবে কিছু করি নি। আপনি কিছু মনে করবেন না। আর এই ব্রিজের ব্যাপারটা আপনি ভাববেন না, আমি দেখব।
