তা হলে কি তাই ঠিক হবে? এম-এল-এ সবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে।
.
০৫০.
এম–এল-এর রাগ ও মিটিঙের শেষ
কনট্রাকটারের পক্ষ থেকে এই লোকটি কিছু বলতে চায়–ইনজিনিয়ার তাদের দলের মধ্যে বসে থাকা একজনকে দেখিয়ে বলে।
হ্যাঁ, বলেন, আপনি ঠিকাদারের লোক? এম-এল-এ জিজ্ঞাসা করে।
লোকটি উঠে দাঁড়িয়েছিল, বলল, হ্যাঁ, স্যার। আপনারা এই মিটিঙে যা ঠিক করবেন সে আমার মালিক বুঝবে, আমি কাল জলপাইগুড়ি গিয়ে মালিককে জানাব। কিন্তু আমাদের নিয়ে ত অনেক কথা এইখানে হল। আমরাও তা হলে কিছু কথা বলতে চাই, সেইটা আপনি বলেন।
বলেন, আপনি কী বলতে চান, বলেন, এম-এল-এ বলে। আপনারা ত কনট্রাকটার এই সব নিয়ে এত কথা বললেন। কনট্রাকটার ত আর এক রক না। আমার মালিক বড় কনট্রাকটার। এই সব ছোট কাজ করেন না। সে এই সাহেবরা জানেন। মণিবাবু জানেন। এম-এল-এ বাবুও জানেন। কিন্তু হল কি, আমি ওর সঙ্গে নানা সাইটে কাজ করছি পাঁচ-সাত বছর। এই রকম ছোট কাজ আমি মালিককে বলে ওনার নামে টেন্ডার দেই। আমার ত আর লিস্টে নাম নাই। আমার মালিকের টেন্ডার থাকলে সেটা ত সবাই জানবেই। আর রেট অনেক লো ছিল। কেন, না আমি নিজেই রাজের কাজ জানি। আমার দুই ভাই আছে, ওরাও জানে। আর কিছু লোক লাগাই। তাতে আমরা লো-তে কাজ তুলে দিয়ে মোটামুটি লাভ করতে পারি। এখন হল কি, মালিক যদি দেখে তার কোম্পানির নাম নিয়ে এইসব গোলমাল হচ্ছে, তাতে মালিকের বদনাম হয়ে যাবে, মালিক আমাকে বরখাস্ত করে দেবে। মানে চাকরি যাবে না ঠিকই, কারণ আমি মালিকের বিশ্বাসের লোক। কিন্তু এই যে আমি ছোট-ছোট কাজ করে নিজের একটা কাজ বানাচ্ছি এইটা আমার একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে, লোকটি কথা শেষ করে দাঁড়িয়ে থাকে। এম-এল-এও তার দিকে তাকিয়ে থাকে। বোঝা যায়, এই লোকটির কথাতে অবস্থাটা আবার বদলাতে শুরু করেছে। মণি ভাবে, এই সুযোগটা সে নেবে। সে সিগারেটটায় টান দিয়ে কথা শুরু করার আগেই এম-এল-এ বলে ওঠে, সেটা তুমি অফিসারদের বলো। আমরা ত তাদের কবে থিকে বলছি যে এই ব্রিজ নিয়া একখান গোলমাল পাকি যাবার ধরিছে। ত অফিসার আমাদের কথার কোনো ত দামই দেন নাই। ত যাউক, টেস্ট-মেস্ট হইয়া আসুক
লোকটি বলে, এইটা নিয়ে আমার কথা আছে। আমি এতদিন বলি নাই। কিন্তু এখন ত আমার বিপদ হয়ে যাচ্ছে। তাই বলতেই হচ্ছে। আমি কারো নাম বলব না। আপনারাও জিগেস করবেন না। আমরা যখন প্রথম এইখানকার কাজ ধরি, মানে সাইটে আসি, তখনই এখানকার কয়েকজন এসে বলেন আমরা সরকারের পার্টির লোক, আমাদের পাঁচ বস্তা সিমেন্ট দিতে হবে। আমি কীভাবে কাজ করি তা ত আপনারা শুনলেন। পঁচ বস্তা সিমেন্ট দিলে আমার আর কী থাকবে। আমি বললাম, ভাই, একটু-আধটু নিতে হয় না, কিন্তু এত সিমেন্ট আমি কোথা থেকে দেব। কিন্তু তারা রাজি হয় না। উনি ওর একটা ঘরের বাইরের জায়গাটা ইট-সিমেন্ট দিয়ে বাধাতে চান। সেইটা আমি রাজি হই নাই বলেই আমার এই অবস্থা। আগে জানলে আমি দিয়ে দিতাম। কিন্তু তখন বুঝি নাই যে এত কাণ্ড হবে। আমি এতদিন এ-কথা বলি নাই। কিন্তু আজ না বললে আমার বিপদ বলেই বললাম, লোকটি বসে পড়ে। ফুলবাড়ির দলটার মধ্যে কথাবার্তা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু মণি তার আগেই এম-এল-একে আস্তে করে বলে, আমি একটু বলছি। তারপর দাঁড়িয়ে ওঠে।
কিন্তু, সঙ্গে-সঙ্গেই গয়ানাথ উঠে দাঁড়িয়ে বলে, মণিবাবু, আমাদের ত এইটা একখান সৌভাগ্য কিনা তোমরালা সকলে, এম-এল-এ আর এ্যানং সব ইনজিনিয়ার মোর এই ক্রান্তিহাটত আসিছেন। ত হামরা তোমাক চা খিলাবার চাই। যদি বলেন ত এ্যালায় আনিবার কহি।
আনেন, চা খাওয়াবেন সে ত ভাল, বলে মণি অপেক্ষা করে, গয়ানাথ আর হাট কমিটির মেম্বার উঠে নীচে নামা পর্যন্ত, তারপর বলে, আমার এর মধ্যে কোনো কথা বলা উচিত না, আমি হঠাৎ এসে পড়েছি। কিন্তু আমার মনে হল কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে, না হলে এরকম ঘটনা কেন ঘটবে, এত ত ব্রিজ তৈরি হচ্ছে, রাস্তা তৈরি হচ্ছে। একটু আগে সাবধান হলে বোধ হয় এত গোলমাল। হত না। আমাদের ইনজিনিয়ার যদি আমাদের এম-এল-এর চিঠির জবাব দিতেন বা তাদের ভেতর যদি যোগাযোগ হত, তা হলে অনেক আগেই এ সব মিটে যেত। কী বলেন, ইনজিনিয়ার সাহেব?
ইনজিনিয়ার সে-ইঙ্গিত বুঝে ফেলে, বলে, আমার এটা নিশ্চয়ই দোষ হয়েছে। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম মিস্টার মণ্ডল
ইনজিনিয়ারকে থামিয়ে দিয়ে এম-এল-এ হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, আপনার মানষিলার খুব প্রেস্টিজ লাগে, না, সিডিউল সিটের এম-এল-একে পাত্তা দিতে?
মণি হঠাৎ চমকে গিয়ে বলে ওঠে, এই বীরেনদা, কী বলছ? এম-এল-এ মণিকে বলে ওঠে, আপনি চুপ করেন, আপনারা এইসব বুঝবেন না, আপনাদের সঙ্গে ত এরা এরকম করে না। আপনারা ইংরাজি কহিলে ইংরাজি কহিবার পারেন। আমিও এই সব বুঝিতাম না, এম-এল-এ না হইলে। না-হইলে উনি মালবাজারের এক এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার, উমরার সাহস হয় কী করি, মোর চিঠি আগত পাইছেন তবু ঐঠে হাজির না থাকিবার? আর এ্যালায় যদি জলপাইগুড়ি কি ধূপগুড়ির এম-এল-এ চিঠি দিত তার বাদে দশবার গিয়া স্যার স্যার করিতেন। ত হউক কেনে, বিচার হউক। যাউক মশলা টেস্ট করিবার। কিন্তু যদি দোষ বাহির হয়, তবে ঐ একখান গরিব ঠিকাদার আর ঐ আর-একখান সিডিউল কাস্ট মণ্ডলের উপর দোষ চাপানো চলিবে না; ইনজিনিয়ারক দায়ী হওয়া লাগিবে।
