ঠিকাদার আর ইনজিনিয়ার
দ্যাশখান কইরল ছারখার।
এই বর্ষাকাল আইল, কুথায় কুন ফরেস্টের মধ্যে কুন নদী ভাঙল, ব্যাস, ফেল পাথর। কার পাথর, কেডায় ফ্যালে আর কেডায় হিশাব রাখে, কন! এক-একডা পাথর জলে পইড়লে ঠিকাদারের বার আনি আর সাহেবের চার আনি। আর যে-পাথরডা তুলাও হয় না, ফেলাও হয় না–সেই পাথরের চোদ্দ আনি সাহেবের, দুই আনি ঠিকাদারের।
এই রকম কথা হলে ত মুশকিল।
কাকা, চুপ করেন, এই সব কথা বলবেন না, যদি ধরতে পারেন স্যালায় কহিবেন, এম-এল-এর কথায় ফুলবাড়ির কাকা হো-হো করে হেসে ওঠে, এইডা ভাল কইছেন, তা হালি ত তিস্তাবুড়ির তানে হিশাব লইতে হয়, কী, না, বুড়ি কয়ডা পাথর পাইছ?
আজকা সকালে ঢালাই হল। আমি, ধরেন, সন্ধ্যার মুখে বা তার আগেই পৌঁছাই। আমি পরীক্ষা করার জন্য পা দিয়া একটা ঝাঁকি দিছি। আপনাদের মিস্টার মণ্ডলও ছিলেন। কিন্তু পুরা রেলিং ঝর ঝর করি পড়ি গেল। এইটাও কি প্রমাণ না? আপনার মিস্টার মণ্ডল তখন আমাকে বুঝান যে সব জায়গাতেই নাকি এরকম হয়– এম-এল-এ বলে।
মিস্টার মণ্ডল কিছু বলতে ওঠে কিন্তু ইনজিনিয়ার হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেয়, কোনো ঢালাইই ত চব্বিশ ঘণ্টা না গেলে জমে না, সে যত সিমেন্টই দেয়া হোক। বার ঘণ্টার মধ্যে পা দিয়ে ধাক্কা দিলে হিন্দুস্থান কনস্ট্রাকশনের বানানো রেলিঙও ভেঙে যাবে–, ইনজিনিয়ার এতক্ষণে হাসার সুযোগ পায়। ইনজিনিয়ারদের অন্য কারো হাসি তার সঙ্গে মেশে না বটে, কিন্তু বোঝা যায়, ঐ দলটাতে একটা সমর্থনের নড়াচড়া ঘটে। এতক্ষণ এম-এল-এ যেরকম ঠাণ্ডা গলায় কথা বলছিল, ইনজিনিয়ারের গলায়। এতক্ষণে সেই ঠাণ্ডা ভাবটা আসে। তার কথা বলার ভঙ্গিতে বোঝা যায়, এই বিষয়টা তার জানার সীমার মধ্যে আর এ-বিষয়ে তার কোনো ইতস্তত নেই।
এম-এল-এ জানত তার জন্যে এই বিপদটা অপেক্ষা করে আছে আর কথাটা এখানে আসবেই। তার অভিজ্ঞতায় সে জানে, এই নিয়ে আলোচনা যত এগবে, ইনজিনিয়াররা তত বেশি সুবিধে পাবে। আর, এই এম-এল-এ তার কাজকর্মে বারবারই এখানে এসে ঠেকে যায়। তার ঠেকে যাওয়ার আরো অনেকগুলো জায়গা আছে, কিন্তু সে সব কিছুর ভেতর এই জায়গাটা এলে যেন পুরো আটকে যায়। এম-এল-এ মাথা ঠণ্ডা রেখে বলে, শুনেন, এইটা ত তর্ক করি মীমাংসা হবে না। আমাদের সন্দেহ ঠিক কি বেঠিক তার ত একটা পরীক্ষা হওয়ার নিয়ম আছে। সেই নিয়মটা আপনি বলেন আমরা শুনি।
ইনজিনিয়ার ঠাণ্ডা গলাতে জবাব দেয়, ঐ মিকশ্চারের স্যাম্পল নিয়ে স্টেট টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পাঠাতে হবে। তারা রিপোর্ট দেবে।
এই কেসটাতে আপনারা সেটা করতে রাজি আছেন?
আমাদের রাজি-অরাজির ত কোনো কথা নেই। আপনারা যদি করতে বলেন আমরা পাঠাব। কিন্তু তা হলে ত যতদিন রিপোর্ট না আসে ততদিন কাজ বন্ধ রাখতে হবে?
কাজ আর বন্ধ থাকবে কী? রেলিংটা আর বানাবেন না, এই ত? কী? আপনাদের কি রেলিং ছাড়া খুব অসুবিধা হবে?
ঐ ব্রিজ তুমি নি গেলেও হামরালার কুনো অসুবিধা নাই, আজি বাদে কালি ত ভাঙি পড়িবেই, অ যতই ইনজারি বলেন না কেন, ফুলবাড়ির দলের ভেতর থেকে কেউ বলে।
এম-এল-এ ধমকে ওঠে, আজেবাজে কথা ছাড়েন, শুধাছি সেইটার জবাব দেন।
এর ভেতর ইনজিনিয়ারদের ভেতর কিছু কথা হয়। ইনজিনিয়ার বলে, আপনি শুধু রেলিং বলছেন কেন, প্ল্যাটফর্ম আর রোডের মধ্যে আর্থ ওয়ার্কও বাকি আছে, সেটাও হবে না। মানে ব্রিজটা ইউজ করা যাবে না। তা ছাড়া স্যাম্পল ত শুধু রেলিং থেকে নিলে হবে না, সব পার্ট থেকেই নিতে হবে।
খাড়ান, একে একে কন। মানে রাস্তা আর ব্রিজের মাঝখানের ফঁকখান বুজান হবে না, এই ত?
হ্যাঁ।
আপনারা একবেলা কাম করি বুজি নিবার পারিবেন না? ফুলবাড়ির দলটাকে এম-এল-এ জিজ্ঞাসা করে।
হয়। কনট্রাকটার বুজালেও ত আমাগো দিয়্যাই কইরত। এইডাও আমরাই কইরব। বিনা পয়সায়।
মণি বুঝে উঠতে পারে না, বীরেন কোন দিকে যাচ্ছে ও কেন যাচ্ছে। ফুলঝোরার এক দুই-হাতি ক্যালভার্ট নিয়ে কোথায় স্যাম্পল পাঠাবে, আর, এই সুযোগে অফিসার আর ঠিকেদার মিলে এদিককার সব কাজ বন্ধ কর দেবে। তা ছাড়া এই ব্যাপারটা নিয়ে এতদূর কেন যাওয়া হবে, মণি তাও বুঝে উঠতে পারে না। ফুলবাড়িতে তাদের পার্টির লোকজন কোনো কালেই নেই, এই সরকার হাওয়ার পর হয়েছে। সরকার চলে গেলেই চলে যাবে। আর বীরেন এতদূর যাচ্ছেই বা কেন। এর সঙ্গে ত নীতির প্রশ্ন জড়িত। পার্টির ভেতরে বারবার আলোচনা হয়েছে, এমন কিছু কখনোই কেউ করবে না যাতে লোক্যা থানা বা অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, বা গবর্মেন্ট অফিসাররা ছুতো ধরতে পারে। মণি বোঝে, তার এবার কথা বল উচিত। কিন্তু সে ঠিক করতে পারে না, এখানে যা হয় তা হতে দিয়ে, পরে, মানে, এখান থেকে ফিরে মালবাজারেই, ইনজিনিয়ার আর বীরেনকে নিয়ে বসে একটা মিটমাট করে দেবে, নাকি, এখানেই সে কথা বলবে। কিন্তু বীরেনের সঙ্গে আগে ত কথা বলে নি। সে জানে না, বীরেন এতটা রেগে আছে কেন।
তা হলে আজ রাত্রিতে বীরেনের সঙ্গে কথা বলে, কাল সকালে ইনজিনিয়ারকে আসতে বলতে পারে।
আর-একটা কথা কী বলছিলেন?
স্যাম্পল ত সব জায়গা থেকেই নিতে হবে, সেই কথা।
তার জন্যে কি পুরা ব্রিজ ভাঙতে হবে, নাকি?
না, তা কেন, একটু নিলেই হবে ভেঙে।
