ইনজিনিয়ারকে একটু সময় নিতে হয় কী ভাবে শুরু করবে স্থির করতে, সভাপতি মহাশয়, না, বন্ধুগণ, না, কমরেডস। কমরেডস বলা চলে না, কারণ বোঝাই যাচ্ছে এখানে সব পার্টির লোকই আছে। আর, জীবনে কোনোদিনই ইনজিনিয়ারকে বন্ধুগণ বলতে হয় নি, বসে বসে বন্ধুগণ বলা যায় কি না বুঝতে পারে না। সভাপতি মহাশয় অবিশ্যি বলা যায় কিন্তু এটা সভাপতির সভা, না, এম-এল-এর সভা? খুব কম সময়ের ভেতর এতগুলো কথা তাকে ভেবে নিতে হয়। আর তখনই শোনে এম-এল-এ তাকে প্রশ্ন করে, আপনি এদের ডেপুটিশন আর আমার পাঠানো চিঠি ত পেয়েছেন?
হ্যাঁ। এই ব্যাপারটা ত আমাদের এস-এ-ই মিস্টার মণ্ডল ডিল করেন। উনি বলতে পারবেন।
ওনার সঙ্গে ত আমাদের কথাবার্তা হইছে। উনিই ত আপনাকে খবর দিছেন। আমি জানতে চাই যে আপনি কখনোই চিঠিপত্রগুলা দেখিছেন, কি দেখেন নাই? এম-এল-এ খুব ঠাণ্ডা ভাবে প্রশ্ন করে। কিন্তু ফুলবাড়ির ভিড়টা এই কথাতে যেভাবে একসঙ্গে মাথা নাড়ে তাতে মনে হয় প্রশ্নটা খুব দরকারি।
ইনজিনিয়ার তখন বলতে শুরু করে, আসলে সরকারি অফিসেও এক-একজন অফিসার এক-একটা কাজের চার্জে থাকেন, সেই সব কাজের করসপনডেন্স ফাইলগুলোও তারাই দেখেন। আমাকে যখন জানান তখন আমি জানতে পারি।
এই কথায় এম-এল-এ হেসে ওঠে, সামান্য, তারপর বলে, আপনার অফিসের জন্যে এই নিয়মটা ত আপনার ভাল নিয়ম। সেটা আমি জানতাম না বলেই সব গোলমাল পাকি গেইছে। কিন্তু এক-এক সরকারি অফিসে এক-এক নিয়ম হইলে আমাদের মত মানষির বিপদ হয়।
সব সরকারি অফিসেই ত মোটামুটি এই নিয়মই হয়, এক-এক ফাইল এক-এক অফিসারের চার্জে। আমি ত ফুলঝোরা ক্যালভার্টের ফাইল সঙ্গে নিয়ে এসেছি।
সে ত আজ এখন আনবেন, আমরা সব এইখানে বসি আছি, ত আনবেন। কিন্তু আপনি য্যানং সরকারি অফিসের আইন জানেন, আমরাও ত দুটা-একটা জানি। আমি এমন সরকারি অফিসের কথা জানি অফিসের কোনো নতুন বিয়া বসা মেয়ের চিঠি আসিলেও অফিসার নিজে পড়ি দেন–
একটা চাপা হাসির দমক ওঠে। গয়ানাথ ঘন-ঘন মাথা ঝাঁকায়, যেন এ-রকম তারও অনেক জানা। হাট কমিটির মেম্বার চুপচাপ হাসে। আর মণি একটু অবাক হয়ে বীরেনের দিকে তাকায়। বীরেন এত থেমে-থেমে, এত গুছিয়ে-গুছিয়ে, ইনজিনিয়ারকে অপদস্থ করে দিচ্ছে? এসেম্বলিতে বীরেন অবিশ্যি দুটো-না-তিনটে বক্তৃতা করেছে, কাগজে উঠেছিল। বক্তৃতা ও ভাল করে। আর এম-এল-এ হয়েও খাটে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তাই বলে এতটাই বদলে গেছে?
মণির যেন আর মনে থাকে না সে ইনজিনিয়ারদের কাছে শুনে তবে এখানে এসেছে। তার মনে হয়–বীরেনের এই পরিবর্তন দেখাটাই তার লক্ষ ছিল।
এম-এল-এ বলে, তা হলে এই কথাটা এই মিটিঙে আর তোলার দরকার নাই যে আমরা আপনার চিঠির জবাব কেন পাই না।
না, সেটা আপনারা নিশ্চয়ই বলবেন। কিন্তু আমাদের অফিসে ক্ল্যারিক্যাল স্টাফ মাত্র দুজন। আর, টাইপিস্ট একজন। তিনি মেটার্নিটি লিভ নেয়ায় নতুন রিলিভিং হ্যান্ড আসে নি। আমাদের একজন এ্যাসিস্ট্যান্ট, টাইপের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সেও তিনি কোঅর্ডিনেশন কমিটির মেম্বার বলে–
সে ঠিক আছে। কিন্তু আমি ত আপনাদের এইখানকার এম-এল-এ।
এবারের হাসিতে ইনজিনিয়ারও যোগ দেয়, মণিও হেসে ফেলে। এম-এল-এ তখন বলে, আমি কি আমাদের এই এলাকায় যে-সব কাজ হচ্ছে তা নিয়ে কোনো কথা জানাবার থাকলে আগে জানি নিব কোন অফিসার কোন কাজের চার্জে আছেন, তার পর তার কাছে লিখব?
না সেটা কেন হবে, আপনি আমাকেই লিখবেন।
কিন্তু আপনি ত আমার চিঠিরও কুনো জবাব দেন নাই। আমি আগে আপনাকে চিঠিতে জানালাম যে আজ আমি ফুলবাড়ির ঐ ব্রিজটা দেখতে যাব। কিন্তু ঐখানে দেখি আপনাদের মিস্টার মণ্ডল আছেন। কিন্তু কথা ছিল ত আপনার সঙ্গে।
আমি ওটা বুঝি নি। আমি ভেবেছি মিস্টার মণ্ডল কাজটার চার্জে আছেন, উনি থাকলেই হবে।
আমার যদি আপনার সঙ্গে কোনো কথা থাকত আমি আপনার অফিসে যেতাম। কিন্তু আসলে এই কথাটা ঐ ব্রিজের সামনে হওয়া দরকার। কারণ এই অভিযোগটা হচ্ছে যে কনট্রাক্টার এই কাজটা ঠিকমত করে নাই–
.
০৪৯.
ঠিকাদার আর ইনজিনিয়ার…
এই সব কমপ্লেন যদি একটু স্পেসিফিক না হয়, কী পার্টিকুলার কমপ্লেন, তা হলে ত ডিপার্টমেন্টের পক্ষে এনকোয়ারি করা মুশকিল। এতে আবার সব কাজেরই প্রগ্রেস হ্যামপার করবে। কনট্রাকটাররা ডিমর্যালাইজড হবে।
সে যদি ফুলবাড়ি বস্তির লোকেরা আপনাকে বলতেই পারত যে কী কী দোষ হচ্ছে তা হলে ত ওরাই ইনজিনিয়ার হত। কিন্তু যে কথাটা বারবার হচ্ছিল যে কনট্রাকটার বালি আর সিমেন্টের মিশাল ঠিকমত বানাচ্ছে না। ফুলঝোরা দিয়া বর্ষায় ত বড় স্রোত যায়। ঐ রকম পাতলা মিশাল ভাসি যাবে। এইটা কি আপনাদের কানে যায় নাই?
হ্যাঁ। আমরা শুনেছি, কিন্তু স্পেসিফিক কমপ্লেন ত ছিল না, তাই
মিশালের
ফুলবাড়ি বস্তির ভিড় থেকে কেউ একজন বলে, মশলার।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, মশলার মিশাল কি আপনারা কেউ পরীক্ষা করে দেখছেন?
না। তা করা হয় নাই ঠিক। কিন্তু এইরকম ত কখনো করা হয় না। একজন কনট্রাকটার কেন ওরকম করতে যাবে সমবেত হাসিতে ইনজিনিয়ারের কথাট চাপা পড়ে যায়। ইনজিনিয়ার একটু অপ্রস্তুত হয়ে থেমে যায়।
এইটি আপনি কী বললেন? কনট্রাকটাররা কাজে কেন ফাঁকি দেবে বা চুরি করবে তা আপনি জানেন না? মণি খুব হেসে সিগারেটে টান দেয়।
