.
০৪৮.
এম-এল-এ ও অফিসার : সংলাপের আরেক ধরন
তখন সেই ছেলেটি দাঁড়িয়ে উঠে বলতে শুরু করে, কমরেডমন।
এম-এল-এ হাতটা তুলে বলে, বসি-বসি বলো হেমেন, বসি-বসি বলো।
কাকা তখন একগাল হেসে একটা হাত তুলে নাড়ায়। কিন্তু হাসির বেগে কথা বলতে পারে না। কাকার ভঙ্গিতে অথবা এম-এল-এর কথায় ঐ দলটা হেসে ওঠে। দলটার ভেতর যে একটা বেশ উত্তেজনা পাকিয়ে উঠছিল, সেটা সত্ত্বেও সবাই হেসে ওঠে। হাসির ফলে উত্তেজনাটা যে একটু শিথিল হয়ে যায়, তা সত্ত্বেও হেসে ফেলে। আর হেমেন দুহাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ে।
আরে, আরে, হল কী, হল কী, বলো, হেমেন, মণি সোজা হয়ে বসে বলে। মণির দাঁতগুলো বড়বড়। ফলে তার সব কথাই একটু রাগী রাগী শোনায়। আর এর মধ্যে কাজের কথার শুরুটাও যে ঘটে না এতে ত মণি একটু বিরক্তই ছিল। ইনজিনিয়ারদের কাছে সে ঘটনাটা শুনেছে। কিন্তু এদের তরফের কথাটা ত শোনে নি। যদিও না-শুনেও সে বুঝে ফেলতে পারে, ঘটনাটা কী হয়েছে। অফিসারদের কথা থেকেই সত্য ঘটনাটা জানা যায়। মণি বুঝতে পারছে না, বীরেন ব্যাপারটাতে কতটা জড়িত! স্বাভাবিক ছিল, মালবাজারে গিয়ে ইনজিনিয়ারের সঙ্গে কথা বলা। বীরেন যখন তা করে নি, তখন মণিকে আগে বীরেনের মনটা বুঝতে হবে। মণির কথাতে একটু বিরক্তি থাকায় এই দলের হাসিটা থেমে যায়। কাকাও হাসি বন্ধ করে বলে, আরে, ঐটা ত তোতলা। কথা কইব্যার পারে না। তাই খাড়া হইয়া ভাষণ দিব্যার ধইরছে। ভাষণ দিলে হেমেন আমাগ তোতলায় না- কাকার কথাতে আবার একটা হাসির দমক ওঠে। কিন্তু হেমেন হাতের ভেতর থেকে মুখ তোলে না।
ছাড়ি দ্যান, মুই কহিছু, জব্বর দাঁড়ায়। ফুলবাড়ির সবচেয়ে বড় জোতদারের ছোট ছেলে। কংগ্রেসের বাড়ি, বড় ভাইরাও সব কংগ্রেস। জব্বর সাতষট্টি সালে প্রথম সি-পি-আই হল। তার পর বছর দুই পর-পর পার্টি বদলিয়ে এখন আবার বামফ্রন্টে ঘুরে এসেছে। টেরিলিনের প্যান্ট আর টেরিলিনের গেঞ্জি পরনে জব্বর দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করে, শুনেন, কথাটা ত সবারই জানা। আমাদের ফুলঝোরার ক্যালভার্টটা তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা প্রথম থিকেই এই ঠিকাদারের কাজে সন্তুষ্ট হতে পারি নাই। আমরা কেউই পারি নাই–আমার বাবাও পারে নাই, আবার জগদীশ কাকাও পারে তাই। এইটা পার্টির কথা না। আমাদের সবাইয়ের কথা। আমাদের ভয় ছিল ব্রিজটা ভাঙি পড়িবে। ত মাজ আমাদের এম-এল-এ সাহেবের পায়ের আঘাতেই সেইটা হল। এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য। কারণ—
জব্বরের কথায় বাধা দিয়ে ইনজিনিয়ারদের ভেতর থেকে কেউ বলে, একটু জোরে বলুন, শুনতে পাচ্ছি না।
জব্বর আঙুল নাড়ায় যত বেশি, তত জোরে কথা বলে উঠতে পারে না। গলাটা একটু তুলে সে বলে, আজ আমাদের সৌভাগ্য এম-এল-এ সাহেব ফুলবাড়িতে গিয়াছিলেন এবং আমাদের অভিযোগ সত্য কি না, ব্রিজ ভাঙি যেতে পারে কি না, সেটা পরীক্ষার জন্য ব্রিজের রেলিঙে নিজেই লাথি মারিলেন এবং ব্রিজের রেলিঙ ভাঙি গেল। অর্থাৎ কিনা, আমরা যদি পরে বলতাম তা হলে ফুলঝোরার মানুষের সবই দোষ হইত যে তোমরা নিজেরাই ব্রিজ ভাঙিছ, বুঝেন, অমাদের ব্রিজ আমরাই ভাঙিব? যে-ব্রিজের জন্য আমাদের কত মানুষের কত কষ্ট গিয়াছে জব্বরের গলা উঠতেই এম-এল-এ হাত তুলে তাকে থামায়।
ঠিক আছে, জব্বর বসে পড়ে। এম-এল-এ পরিষ্কার করার জন্যে দু-তিনবার গলা ঝাড়ে। মুখের, ওপর দুই-একবার হাত বোলায়। বোঝা যায়, নিজেই এবার বলবে। ইনজিনিয়ারদের দলটা দেয়াল থেকে পিঠ সরিয়ে সোজা হয়। মণি আর-একটা সিগারেট ধরিয়ে পা গুটিয়ে সোজা হয়ে বসে। মণি বুঝতে চাইছে, বীরেন কী চায়। আর ব্যাপারটার সঙ্গে এমন আচমকা জড়িয়ে পড়ে মণি একটা সমাধান তাড়াতাড়ি বের করে নিতে চাইছে। বীরেন সমাধান চায়, না, আরো পাকাতে চায়–তা অবিশ্যি মণি জানে না। আর, এখন, এই জব্বর ছোকরার কথা শুনতে-শুনতে মণির মনে হতে থাকে যে সাব-এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ারের কাছে খবর পেয়ে আচমকা এখানে আসতে হচ্ছিল বলেই এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার তাকে বুঝিয়েছে সে ব্যাপারটি মেটাতে চায়, মণিদেরই কথা মত, যদিও মণিদের পার্টির লোকজনের কথা ঠিক নয়। আজকের এই মিটিংটা একবার পার হয়ে গেলে ঐ অফিসারই নানা প্যাঁচ কষতে পারে। যদি প্যাঁচ কষাকষিই চলে, তা হলে বীরেনের প্যাঁচটাই পড়ক আগে। মণি, তার স্বভাব-অনুযায়ী, এতক্ষণ যা ভেবে আসছিল, তার বিপরীত সিদ্ধান্ত নিতে ঝুঁকছে। ততক্ষণে এম-এল-এ কথা শুরু করে দিয়েছে। গয়ানাথ, হাট কমিটির মেম্বারসহ আরো অনেকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এসে শতরঞ্চির মাঝখানটাতে বসে–সুহাসের পাশে, ফুলবাড়ি বস্তির দলের পেছনে। শুদ্ধ্যা– এটা ফুলবাড়ি বস্তির সবাই বলতে পারে যে তারা এই কনট্রাকটারের ব্যাপারে আমাকে, সরকারকে ও ডিপার্টমেন্টকে অনেক চিঠি দিছে। আমার পক্ষ থিকে বলতে পারি যে আমি সেই সব চিঠির জবাব দিতে পারি নাই। কিন্তু আমি স্থানীয় পি-ডবলু-ডির এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ারের অফিসে সেই সব চিঠি পাঠাইছি। আমাদের কি এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার সাহেব একটু আলোচনা করিবেন সেই চিঠিগুলি বিষয়ে যে তিনি পাইছেন কি না, কী করিলেন, এই সব বিষয়?
এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার এই ধরনের মিটিঙে অনভ্যস্ত ত বটেই, একটু ভয়ও পেয়েছে। উঠে দাঁড়ায়। এম-এল-এ বলে, আপনি বসেন, আমরা শুনতে পাব, বসে বসে বলেন।
