ব্রিফকেসটা পাশে রেখে এম-এল-এ বলে, শুনেন, এখন কথাটা আরম্ভ হওয়া দরকার। এই কথাটা হওয়া উচিত ছিল ফুলবাড়িতে। কিন্তু সেখানে আমাদের এসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার সাহেব ছিলেন না। আর মালবাজারে তার অফিসেও আমি কথাগুলি বলতে পারতাম। কিন্তু একটা মুখোমুখি কথার দরকার ছিল। তাই আমি এইখানে আসার জন্য বলি। উনি দয়া করে আসিছেন। আমাদের জিলা কৃষক সমিতির সম্পাদক কমরেড মণি বাগচিও আসছেন। সুতরাং এখন কথাবার্তা হইতে পারে। তা হলে আমার অনুরোধ ফুলবাড়ির মানষি যারা, এইখানে আছে যারা, তাদেরই উচিত প্রথমে সব বলা। তাদের কী বলার আছে। তার বাদে আমরা ইনজিনিয়ার সাহেবের কথা শুনিব। ত কন, ফুলবাড়ির কমরেডরা, কেউ কহেন।
যে দলটা এম-এল-এর মুখোমুখি বারান্দার কোনার দিকে একসঙ্গে ছিল, তারা নড়েচড়ে বসে। সামনের একজনকে ধাক্কা দিয়ে বলে, হে-ই নকুইল্যা, তুই ক কেনে।
সে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, কাকা কহেন।
যাকে কাকা বলা হয় সে মাঝামাঝি বসে ছিল। সে বসে থেকে এম-এল-এর দিকে তাকিয়ে উঁচু গলায় শুরু করে, এর মধ্যি এত কওনের-শোননের কী আছে, জানি না। য্যাখন থিক্যা ঐ ফুলবাড়ির ফুলঝোরার উপর একখান ব্রিজ হইব বইল্যা ঠিক হইয়াছে, তখন থিক্যাই নানা গোলমাল লাইগ্যাই আছে। আমরা গিয়্যা খোঁজ নেই, তা কয়, কেডা কইছে ব্রিজ হব, আঁ, লোকটি একবার এম-এল-এর দিকে, একবার মণির দিকে, আর একবার মাথা ঘুরিয়ে ইনজিনিয়ারদের দিকে তাকায়। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে, কেডায় কইছে ব্রিজ হব, আঁ, কেডায় কইছে? নে বাবা, আমরা ত পইডল্যাম গিয়া সাত হাত জলের তলায় ত ধরেন গিয়্যা, ঐ ফুলঝোরার ব্রিজ নিয়্যাত গত ত্রিশ বচ্ছর ধইর্যাই কত কাণ্ড! আমি যখন ধরেন বিশ বছরের জুয়ান তখন খগেন দাশগুপ্ত মন্ত্রী। আর সেই কী কয়, আরে তখুন মালবাজার জেনারেল সিট, কী নাম, সেই এম-এল-এ, তারে তখুন ত কইলেই কয়, হয়্যা গ্যাল গা, এই ধর সামনের বর্ষার আগেই হয়্যা যাবে নে, একবার ত কাণ্ড।
লোকটি গল্প বলতে-বলতে একবার এম-এল-এর দিকে, একবার মণির দিকে, আর একবার ইনজিনিয়ারদের দিকে ঘাড় বারবার ঘোরাতে-ঘোরাতে নিজেই ধীরে-ধীরে ঘুরে যায়। এখন তার মুখ মণির দিকেই। মণি আর-একটা সিগারেট ধরিয়ে একটু এলিয়ে বসে আছে। মণি হেড়ে লম্বা। ফলে মনে হয় নিজেকে ভেঙেচুরে বসেছে যেন। তার মুখেচোখে বিরক্তির ভাবটা সে গোপনের চেষ্টা করে সিগারেটের ধোয়ার ছলে। লোকটি তখন বলতে শুরু করেছে, হইল কী, আমরা ত সেইবার পূর্তমন্ত্রীরে সবাই মিল্যা বলছি যে ব্রিজ নাই ত ভোট নাই। তাই শুইন্যা মন্ত্রী কয় কী, সে কী? ব্রিজ হয় নাই? আমাদের ত জানা হইয়া গেল ব্রিজ হইছে, তার টাকাপয়সা সুদ্ধ্যা দেয়ানেয়া শ্যাষ। আমরা ভাবলাম, খাইছে। মিথ্যা কইর্যা যদি একবার ব্রিজের টাকা বাইর হয়া থাকে, আবার কি আর হইব ব্রিজ? ব্যাস, খোঁজ-খোঁজ, কোথায় গেল ব্রিজ। অফিসাররা খুঁইজব্যার ধরল জলপাইগুড়ির অফিসের কাগজে-কই গেল ব্রিজ। মন্ত্রী খুঁইজব্যার ধইরল কইলকাত্তার কাগজে–কই গেল ব্রিজ। আর আমরা হককলে যুইজবার লাইগল্যাম এইখ্যানে, কই গেল ব্রিজ। লোকটি থামে। সে জানে এখানে হাসির জন্যে সবাই একটু সময় নেয়। সে নিজে খানিকটা হেসে সেই সময়টুকু দেয়। মণি এম-এল-এর দিকে তাকিয়ে হাতের পাতা একবার উল্টোয়। এম-এল-এর চোখ দেখে বোঝা যায় না, সে সেটা দেখল কিনা। কিন্তু গল্প যে বলছিল সে দেখে ফেলে তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, মণিবাবু, আমি তাড়াতাড়ি কয়্যা দিচ্ছি। আচ্ছা, ছাড়ান দ্যান সেই গল্প। এখন কথাটা হইল কি–
পেছন থেকে একটি ছেলে গলাটা তুলে বলে, কাকা, মুই কম? এইবারকার কথাখান মুই কম?
কাকা আবার সকলের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ক না ক্যা, আমি ত তগ কইতেই কই। আমি কথা শুরু কইরলেই সাত কইল্যানা কথা মনে আছে। আর তগ কাম হচ্ছে এই কল্যানা। ধরেন কেনে, আমাগো সময় নেতা ছিল নরেশ চক্কত্তি-পটল ঘোষ, আর এখন আমাগো মণিবাবু লিডার, তারপর কী কয়, বীরেনবাবু এম-এল-এ। এ্যাহন ত তরাই কবিক, ক।
কাকার গলার স্বরটা একটু উঁচুতে। সে টেনে-টেনে, নানা ভঙ্গিতে, স্বর তুলে নামিয়ে গল্পটা যখন বলছিল তখন কিন্তু ধীরে-ধীরে সেই গল্পের একটা আবহাওয়া তৈরি হচ্ছিল। এমন-কি, এইখানে যারা ভদ্রলোক, সুহাস আর ইনজিনিয়াররা আর প্রিয়নাথ, যদি মণিকে নাই ধরা হয়, তারাও যেন গল্পটার একটা টান বোধ করে ফেলছিল। এম-এল-এ এমন বসে ছিল যাতে মনে হয় গল্পটা সারারাত চললেও তার আপত্তি নেই, বা এখন থেমে গেলেও তার আপত্তি নেই, বা একমাত্র সে জানে কখন গল্পটা আপনি থেমে যাবে। একমাত্র মণি বাগচিই অধৈর্যে বারবার সিগারেট ধরাচ্ছিল। কিন্তু এই এলাকাটা বীরেনের। বীরেন এখানে বসে থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ারকে ডাকিয়ে এনেছে। সুতরাং কী-হবে না-হবে সেটা বীরেনই ঠিক করবে। পরে নিশ্চয়ই বীরেনকে সে বলবে, এইভাবে যদি অফিসারদের হ্যারাস করা হয় তা হলে কোনো অফিসার আর-কোনো কাজ করার উৎসাহ পাবে না। কিন্তু মণি জানে, বীরেনও তাকে জিজ্ঞাসা করে বসতে পারে যে এ্যসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার গিয়ে বলল আর মণি অমনি গাড়িতে কেন চড়ে বসল–এটা জেনেশুনে যে বীরেন ক্রান্তি হাটে নিজে বসে আছে। তাতে ত সবার ধারণা হল যে পার্টির ভেতর অফিসারদের খুঁটি হচ্ছে মণিবাবু। কিন্তু এমন আশঙ্কা আছে বলেই মণি ভেবে রেখেছে তার কৈফিয়ৎ। বীরেনবাবু লোকজন নিয়ে ক্রান্তি হাটে বসে থেকে যদি ইনজিনিয়ারদের ডেকে পাঠায় আর তারা যদি প্যানিকি হয়ে মণির সাহায্য চায়, তা হলে ত অফিসারদের মর্যাল রাখার জন্যেই মণিকে অফিসারদের সঙ্গে আসতে হয়। মণি জানে, তাদের পার্টির ভেতর এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা, অফিসাররা যেন ডিমর্যালাইজড না হয়, তাতে দু-এক জায়গায় লোকজন একটু ভুল বুঝলে, বুঝবে। মণিব ধারণা, পাটির ভেতরের এই ঝোঁকগুলো বীরেন বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু তাই বলে মণি ত আর বীরেনের এলাকায় নাক গলাতেও পারে না।
