এম-এল-একে এবার হেসে উঠতেই হয়। বলতে হয়, আমার কথা ছাড়ি দেন। ফুলবাড়ির মানষিদের সঙ্গে ত ইনজিনিয়ারদের দেখা হওয়ার দরকার।
ইনজিনিয়ারদের ত অফিস আছে।
সে অফিস-টফিস হইয়া গিছে মণিদা, উনি ফুলবাড়ির লোক শুইনলেই কয়্যা দ্যান দ্যাখা হব না, সিঁড়ির ওপর থেকে একজন চেঁচায়।
সে বলবেন, ওঁরা ত এসেছেন, এত চেঁচাচ্ছেন কেন? মণি সিঁড়ির দিকে দু-পা গিয়ে একটু কড়া গলায় বলে।
এই চুপ যা চুপ যা মিটিং শুরু হোক।
না, আমিও ত কথার কথাই কইছি।
দেখি, দেখি, বলে সেই গেরিমাটি রঙের জামাপরা ভদ্রলোক ঢোকেন, পেছনে একজন মাথায় শতরঞ্চি। উনি বারান্দায় উঠে দাঁড়িয়ে লোকটিকে বলেন, টান-টান করি পাতি দেন। এতজন উঠতে থাকার ফলে সিঁড়ির মুখটাতে একটা ভিড় হয়। হাট কমিটির মেম্বার ওপরে ওঠেন। মণি নেমে আসে এম-এল-এ নেমে আসে। আর-একজন সিঁড়ির দুই ধাপ উঠে বলে, নমস্কার, মণিবাবু।
আরে গয়ানাথবাবু, আপনিও এসে গেছেন?
আসিবার নাগে ত, কহেন? আমাদের ক্রান্তি হাটের আজি কত সৌভাগ্য।
কী হল, এত সৌভাগ্য?
এই যে আপনারা সব মিটিং করিবার সেন্টার বানিলেন, সৌভাগ্য না? বলে গয়ানাথ ইনজিনিয়ারদেরও দেখায়। তারা একটু দূরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। তাদের নিয়ে কিছু বলা হল দেখে একজন একটু হেসে জিজ্ঞাসা করে, কিছু বললেন?
মণি সিগারেট তুলেই না জানায়।
গয়ানাথ মণিকে বলে, হেই মণিবাবু, শুনেন একটু। সিঁড়ি থেকে নেমে একটু সরে দাঁড়ালে গয়ানাথ জিজ্ঞাসা করে, আতিত [রাত্রিতে] কতজন থাকিবেন? পাকাবার শুরু করি?
আরে না, না, আমরা এখনই যাব, এখনই, ও সব করবেন না।
.
০৪৭.
ভাষণ ও ভাবন
হাট কমিটির এই শতরঞ্চিটা এত বড়, সুহাসের দরজা পর্যন্ত প্রায় গেছে। চওড়ার দিকটা মুড়ে দিতে হয়েছে। সুহাসের দরজার কাছে, শতরঞ্চির মাথায় দুটো চেয়ার পাশাপাশি সাজানো। হ্যাজাকটা চেয়ার দুটোর কাছাকাছি রাখা। হাট কমিটির মেম্বার ভদ্রলোক সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে বলে, মণিবাবু, বসেন এইঠে। আগত কহি রাখিলে ত টেবিল-চেয়ার আনা যাইত কিন্তু এ্যালায় ত ইশকুল বন্ধ আর মাস্টার ত থাকে সেই মানাবাড়ি
আরে না না, টেবিল চেয়ার লাগবে কিসে, এ ত আপনারা জনসভার ব্যবস্থা করছেন।
আমাদের আর কতক্ষণের মিটিং হবে? কী? বীরেনদা?
হ্যাঁ। এ ত মিটিং না হয়, কথাবার্তা কহিবার জন্যে, বলতে-বলতে এম-এল-এ বারান্দায় ওঠে। জুতো খুলে হাতে নিয়ে একেবারে হ্যাজাকের সামনে গিয়ে বসে। আর এম-এল-এর পেছনে-পেছনে সব্বাই বারান্দায় উঠতে শুরু করে। যে যার, জুতো খুলে হাতে নিচ্ছে। একটা দল গিয়ে হ্যাজাকের সামনে এম-এল-এর মুখোমুখি, কিন্তু বারান্দার কোনার দিকে বসে। সবাই বসে পড়ার পর দেখা যায় জায়গার তুলনায় তোক অত বেশি নেই। এম-এল-এ ডাকে, মণিদা আসেন, আর দেরি করা যায় না।
মণি স্যান্ডেলটা বারান্দার ওপরে খুলে রেখে আসে। পেছন থেকে ইনজিনিয়ারদের একজন বলে, আপনারা দরকার হলে ডাকবেন, আমরা এখানে আছি।
কেন। কথা হবে আপনাদের সঙ্গে আর আপনারা ওখানে থাকবেন কেন, এম-এল-এ ইনজিনিয়ারদের দিকে তাকিয়ে বলে, যোগ করে, মুখোন পাছত করি করি কথা কহিবার নাগিবে?
ইনজিনিয়াররা এবার একে-একে উঠতে শুরু করে। তাদের প্রথম জনের পায়ে ফিতেওয়ালা জুতো বলে নিচু হয়ে খুলতে হয়। একটু সময় নেয়। পেছনের দু-জন দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই পা তুলে জুতোর বেল্ট, খুলে নেয়। আর-একজনের পায়ে স্যান্ডেল। মণিবাবুর জুতোর পাশে জুতোগুলো খুলে রেখে ওরা একটু এগিয়ে, সকলের পেছনে দেওয়াল ঘেঁষে বসে।
হঠাৎ গয়ানাথ সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠে আসে, তার পর সরু গলাটা তুলে জিজ্ঞাসা করে, মণিবাবু ও আমাদের এম-এল-এ মেম্বার, আমার একটা প্রশ্ন ছিল। সবাই তাকালে গয়ানাথ বলতে থাকে, প্রশ্নটা হছে কি, এই মিটিংটা কি প্রাইভেট দিছেন না জনসভা দিছেন? য্যালায় প্রাইভেট মিটিং হবা ধরে, মোরা থাকিম না। কেনে। না, মোরা আপনার পার্টির মানষি না। আর যদি জনসভা দিছেন ত আমরা থাকিবার চাহি। কেনে। না মোরা জনসভার মেম্বার এবং মণিবাবু ও হামরালার এম-এল-এ মেম্বারের ভাষণ শুনিবার চাহি। কেনে–
গয়ানাথকে থামিয়ে দিয়ে মণি বলে ওঠে, কী, বীরেনদা?
এম-এল-এ গয়ানাথকে বলে, আরে বসেন না বসেন, এ ত সবার কথাই হচ্ছে, আপনি থাকিলে ত ভালই হয়। মোরা কহিবার পারিম গয়ানাথবাবুও এই মিটিঙে ছিলেন। আরে, যার ঘরত আসি বসিলাম, তিনিই নাই, এম-এল-এ দরজার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ডাকে, কই, আপনিও আসেন না।
সুহাস ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে বলে, আমি আর এখানে কী—
আরে, বসুন না, বসুন, মণি ডান হাতটা ডাইনে ছড়িয়ে যেন জায়গা দেখায় ইনজিনিয়ারদেরই দিকে। সুহাস এম-এল-এর সামনে দিয়ে আবার প্রথম দলটার পাশ দিয়ে গিয়ে ইনজিনিয়ারদের কাছাকাছি দেওয়াল ঘেঁষে বসে।
গয়ানাথ আবার বলে, ঠিক আছে। আপনারা আলাপন শুরু করেন। মোর অনুমতিখান ত থাকিল। আপনাদের চায়ের ব্যবস্থা দেখি আসি, বসিম।
এম-এল-এ এমন ভাবে মুখটা তোলে যে সকলেই বোঝে এইবার সে কিছু বলবে। কিন্তু এম-এল-এ হঠাৎ পাশে তাকিয়ে ঘাড় উঁচু করে সিঁড়ির দিকটা দেখে, ঘাড় ফিরিয়ে, চেয়ারের ওপরটা দেখে, বলে ওঠে, আমার ব্রিফকেসটা? সকলেই একবার খোঁজে যেন। প্রিয়নাথ ঘরের ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে ব্রিফকেসটা দেয়।
