.
০৪৬.
এম-এল-এর লাথি
গাড়ির আওয়াজটা পাওয়া গিয়েছিল আগেই। সেটা ক্রমেই বাড়তে থাকে। তার পর, উত্তরে, কাঁঠালগুড়ির মোড়ে যে এদিকে ঘুরল সেটাও বোঝা যায় আওয়াজ থেকেই। তার পর, আলোটা রাস্তায় পড়ে। আর, সেই আলোটা আর আওয়াজটা বাড়তে থাকে। এই বারান্দায় বসে, এই মাঠটা পার হয়ে রাস্তায় গাড়িটাকে আসতে দেখা, যেন নদীর বান-আসা দেখার মত। কেউ একজন বলেও বসে, আসি গেইছে।
গাড়িটা একটু এগিয়ে আড়াল হয়, যা হওয়ার কথা। ঐ মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নিশ্চয়ই জিজ্ঞাসা করে নিচ্ছে, যা করার কথা। এম-এল-এ শুধু বলে দিয়েছিল, ক্রান্তি হাটের হলকা ক্যাম্প।
গাড়িটাতে আওয়াজ ওঠাপড়া শুরু হয়। তারপরই আলোটাকে দেখা যায় ফাঁক-ফোকর দিয়ে হাটখোলায় পড়ছে আর সরে যাচ্ছে। শেষে এই বারান্দাটাকেও একটু ছুঁয়ে ঘুরে যায়। এইবার গাড়িটা একটা জোর আওয়াজ তুলে মাঠের দিকে ঘোরে। হেডলাইটের আলো এসে বারান্দায় ঝাঁপিয়ে পড়ে।
যে-ভাবে গাড়িটা মাঠ বরাবর মোড় নিয়েছিল তাতে হু-স করে মাঠ পেরিয়ে বারান্দার সামনে এসে দাঁড়াবার কথা। তার বদলে ব্রেক কষে গো-গো করতে থাকে আর মাঠ বরাবর আলোটা শুধু পড়ে থাকে।
গাড়ি থেকে একজন, দুজন, তিনজন, চারজন, পাঁচজন নামে। তারা মাঠটা পার হয়ে সোজা হাঁটতে শুরু করে। গাড়িটা রাস্তার ওপর উঠে দাঁড়ানোর জন্যে পেছুতে গেলে, এদের ভেতর দুজন হাত তুলে না করে। বারান্দা থেকে সেই হাত-তোলা নিষেধটা ছায়ার মত দেখায়। আলোতে মাঠের কাদা-জল। দেখে-দেখে এরা সাবধানে এই ঘরবারান্দার দিকে এগয়।
এরকম দেখে-দেখে আসে বলেই, সময় নেয়। বা, এদের আসাটা এরকম দেখতে হচ্ছে বলেই মনে হয় সময় লাগছে। তাছাড়া পঁচজন কারা কারা সেটাও এই বারান্দা থেকে সবাই বুঝে নিতে চায়। বারান্দার ওপরে ত এক কোনায় এম-এল-এ চেয়ারে, আর-এক কোনায় সুহাস চেয়ারে। প্রিয়নাথও দরজায় আসে। সিঁড়িতে যারা ছিল তারা উঠে দাঁড়িয়েছে। আর, ঐ পাঁচজনের পেছনে-পেছনে আরো অনেকে ওদিককার দোকানগুলো থেকে বেরিয়ে চলে আসছে। এতক্ষণ সবাই নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অপেক্ষা করছিল, এখন জড়ো হয়ে যাচ্ছে।
ঐ পাঁচজনের দলটার ভেতর থেকে কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে, হে-ই বীরেনদা, তুমি কি আর মিটিং ডাকার জায়গা পাও নাই নাকি, এই কাদা মাঠ? আরে, মণিদা আসছেন নাকি? এম-এল-এ তাড়াতাড়ি পা নামিয়ে সোজা হয়, তার পর উঠে বারান্দার কোনায় গিয়ে দাঁড়ায়। এবার এম-এল-এই চিৎকার করে ওঠে, আরে মণিদা, আপনি আবার কোথা থিকে আসছেন?
বাঃ বাঃ, এবার পাঁচজনের দলটা একেবারে কাছে চলে এসেছে, সিঁড়ির কাছের লোকজন সরে গিয়ে পথ করে দিচ্ছে, যাতে দলটা বারান্দার উঠে যেতে পারে, তুমি গিয়ে লাথি মেরে সব ক্যালভার্ট ভাঙতে পারো আর আমি এইটুকু আসতে পারি না?
এম-এল-এ হে-হে করে হেসে ওঠে, কিন্তু সে-হাসির আওয়াজটা একটু অন্যরকম শোনায়। তাকে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রিয়নাথকে বলতে হয়, একটা বিছানা-মাদুর-টাদুর কিছু পাওয়া যাবে, এখানে বসার জন্যে? প্রিয়নাথ ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। সুহাসকে তার ঘরের সামনে চেয়ারটা ছেড়ে দাঁড়াতেই হয়। সে একবার ভাবে, চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে ঘরে ঢুকে যাবে। এই মিটিঙের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই। তার থাকাও বোধহয় উচিত নয়।
প্রিয়নাথ ঘরের ভেতর থেকে কয়েকটা চট বের করে আনে। সেগুলো একা-একা বিছিয়ে দিতে চেষ্টা করলে এম-এল-এ সিঁড়ির লোকজনের দিকে তাকিয়ে বলে, এই ধরেন কেনে আপনারা। দুজন তাড়াতাড়ি উঠে এসে চটটা ধরে। গাড়িটা এতক্ষণে রাস্তার ওপর ওঠার জন্যে পেছুতে শুরু করলে মাঠটা ও বারান্দাটা একটু অন্ধকার ঠেকে। হ্যাজাকটাতে একজন এসে পাম্প দিতে শুরু করে।
এম-এল-এ কি ভেবেছিল, সে চেয়ারে বসে থাকবে আর ইনজিনিয়ার-অফিসাররা বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে? তা না-হলে বারান্দার ওপরে একটা বসার ব্যবস্থার জন্যে সে ত অনেক আগেই বলতে পারত।
মণিই প্রথমে বারান্দায় ওঠে–আমি তোমার জন্যে মালবাজারে বসে আছি, আর তুমি এখানে খুব মিটিং করছ, মণি পকেট থেকে সিগারেট-দেশলাই বের করে।
আরে আমি ভাবলাম ত ওদলাবাড়িতে সন্ধ্যাবেলায় একটু দেখাশোনা করি রাত্রিতে মালবাজারে চলি যাব। আপনার ত আজকে মালবাজারেই আসার কথা–কাল জলপাইগুড়ি যেতে হবে না?
সেই জন্যেই ত এলাম। এসে শুনি তুমি নাই।
আরে ফুলবাড়ির ঐ জায়গাটা নিয়ে গোলমাল চলিছেই। আমার ত মাস-দুই-তিন আসাই হবে না, ভাবলাম গোলমালটা আজিকৈ চুকাই দেই।
তা চুকাও। কিন্তু এর পর ত তোমাকে সার্কাসের দলে নিয়ে নেবে–তুমি লাথি দিয়ে ক্যালভার্টের রেলিং ভেঙে দিলে?
সিঁড়ির কাছের ভিড় থেকে কেউ একজন চিৎকার করে বলে, সিমেন্টের বদলে বালি দিলে ত পোলাপানও লাথথি দিয়্যা ভাঙবার পারে। তা হালেই বোঝেন কী দিয়া ব্রিজ বানাইছে?
মণি সিগারেটে টান দিতে দিতে সিঁড়ির ভিড়ের কথাটা শোনে। তার পর আস্তে করে এম-এল-একে জিজ্ঞাসা করে, একটু সময় দিয়ে, কিন্তু সবাইকে শুনিয়ে, আমি ত ভাবলাম, তোমার পা ভেঙেছে তাই এখানে পড়ে আছ, নিয়ে যেতে হবে। তা এঁরা বলছেন, না, উনি ঠিক আছেন–ক্যালভার্ট ভেঙেছে।
