তখন বারান্দায় হ্যাজাকের আলোতে দেখা যায় মোটর সাইকেলের ওপর একজন বসে আছে, আর-একজন, বেঁটেমত, সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার শুরু করেছে। গয়ানাথ জোতদারকে চিনতে এইটুকু আলোরও দরকার ছিল না, শুধু গলার আওয়াজ শুনলেই হত। সিঁড়ির ওপর থেকে কেউ বলে, ব্যাস, ভটভটি জোতদার আসি গেইল।
তার মানে, এখন এই ভিড়ে শুধু ফুলবাড়ি বস্তির লোকজনই নেই, এখানকার লোকজনও কেউ-কেউ আছে–যারা গয়ানাথকে সকালে ভটভটিয়াতে চড়ে সার্ভের জায়গায় যেতে দেখেছে। গয়ানাথের এই নামকরণ এর আগে কখনো হয় নি। জামাইয়ের ভটভটিয়াতে সে সাধারণত ওঠে না, এমন কি জলপাইগুড়ি যাওয়ার জন্যে বাস ধরতেও না। কিন্তু সকালে সার্ভে পার্টি পৌঁছে গেছে দেখে চড়তে হয়েছিল। আর, এখন এই সন্ধ্যায় আসিন্দিরই গিয়ে খবর দিল এম-এল-এ আবার এসে বসে আছে। একই দিনে দুই-দুইবার ভটভটিয়া চড়ে একই জনসমাবেশে নামলে ত একটা নামকরণ হয়েই যায়। কিন্তু নামটা টিকবে কি না তা নির্ভর করবে ভটভটিয়া সম্পর্কে গয়ানাথের পরবর্তী ব্যবহারে।
গয়ানাথ তখন তার কাপড় এক হাতে তুলে, আর-এক হাত নেড়ে আসিন্দিরকে শাসাচ্ছে, শালো, ভটভটিয়াখান তোর পাছত ঢুকাই দিম। মাঠে চষিবার ধইচছে এই এক দো-চকিয়া। কহিছু মোক আস্তার [রাস্তার ওপর নামি দে, নামি দে। না, চলো কেনে, চলো কেনে, এ্যালায় তো যাছি তর শ্বশুরবাড়ি। শালো, তর কোন জারুয়া [জারজ] বাপ মাঠের ভিতর দিয়া হাইওয়ে বানাই থছে? শালো ডাঙ্গুয়া [প্রৌঢ়া বিধবার যুবক সঙ্গী] ঢেমনা। সিঁড়ির ওপর ও মাঠে যারা দাঁড়িয়ে ও বসে ছিল তারা। হাততালি দিয়ে ওঠে।
এম-এল-এ চিৎকার করে ডাকে, হে গয়ানাথ কাকা, চলি আসেন এইঠে, ও ঠেলি দিবে উমরায়, চলি আসেন।
সেই ডাকে গয়ানাথ এদিকে আসতে শুরু করে বটে কিন্তু দুপা এসেই ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার চিৎকার করে ওঠে, শালো ঢেমনা, তারপর হন হন করে এগিয়ে আসে, যেন এইটুকু গালগালই বাকি ছিল। গয়ানাথ কাছাকাছি আসতেই কেউ বলে, আসিন্দিরের পাছাখান কত ফাঁক হে, একখান আস্ত ভটভটি ঢুকি যাবে?
গয়ানাথ সেদিকে তাকিয়ে আবার চিৎকার করে, তর বাপের পাছত ঢুকিবে–
এম-এল-এ চিৎকার করে বলে, হে কাকা, ক্যানং বুদ্ধি তোমার, জোয়াইঅক [জামাই] কছেন অ্যালাং-প্যালাং?
গয়ানাথ তখন সিঁড়িতে পা দিয়েছে। চিৎকার করে ওঠে, কায় কহিছে ঐ ডেঙ্গুয়া মোর জোয়াই? মুই অক তালাক দিম।
পেছনে এবার হাততালির সঙ্গে চিৎকারও। এম-এল-এ হো হো হাসে। গয়ানাথ গিয়ে বারান্দায় ওঠে। আর তখনই মোটর সাইকেলের আলোটা সগর্জন জ্বলে হু–স করে বারান্দার সামনে চলে এসে আওয়াজটা দুই-চার বার বাড়িয়ে কমিয়ে হো-হো করে হেসে, বাইকটা ঘুরিয়ে, আসিন্দির রাস্তার দিকে চলে যায়। আসিন্দিরের ওপর রাগের ঝোঁকে গয়ানাথ হন হন করে বারান্দার ওপর উঠে এসেছিল। এখন বুঝতে পারছে বারান্দায় তার বসার বা দাঁড়ানোর জায়গা নেই। গয়ানাথ সামনের অফিস বরেও ঢুকতে পারে না, মেঝের ওপর ধপাস করে বসে পড়তেও পারে না। পারে, কিন্তু আর-কেউ ত তেমন বসে নেই। তার চাইতে মাঠে বা রাস্তায় ঘোরাঘুরি করাটাই ভাল ছিল–এম-এল-একে একবার মুখ দেখিয়ে। কিন্তু এম-এল-এ ফিরে এসে এই হা ক্যাম্পেই বসে আছে কেন, সেটা তার জানা দরকার। তখন গয়ানাথের বাঘারুর কথা মনে পড়ে। একবার তাকায়, তাকে কোথাও দেখা যায় কি না। তা হলে ওর সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারত ফুলবাড়ি বস্তিতে কী হয়েছে। কিন্তু বাঘারুকে কোথাও দেখা যায় না। বাঘারুর কথা মনে হতেই গয়ানাথ ভাবে যে তার ত হকই আছে এম-এল-এর, ভালমন্দের খবর নেয়ার, কারণ তার লোকই ত সঙ্গে ছিল নদী পার করে দিতে। গয়ানাথ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই জিজ্ঞাসা করে, কুননা অসুবিধা হয় নাই ত তোমার?
কেনে? কী অসুবিধা? এম-এল-এ জিজ্ঞাসা করে।
এই, ফুলবাড়ি গেলেন, আবার চলি আসিলেন?
ই আর অসুবিধা কী। ঐ ইনজিনিয়ার খবর দিবার গিসে। এইঠে বসিবার সুবিধা, তাই বসি আছি।
উমরায় ঠিক মতন পার করি দিছে ত নদীখান?
কায়?
আরে, ঐ বলদটা, তোমার নগত যায় গিছে ফুলবাড়ি যাওয়ার বাদে।
হয়, হয়, এম-এল-এর মনে পড়ে যায়, বাঘারু। কী বাঘারু? এম-এল-এ মনে আনতে চেষ্টা করে।
গয়ানাথ জিজ্ঞাসা করে, হয় হয়। বাঘারু। ঐটা ফিরে নাই তোমার নগত?
তা ত কহিবার পার না। ফিরিবার পারে। ফিরিবার টাইমে ত নৌকা আছিল। আহা কহেন না কাকা–
কী?
তোমার ঐ মানষিটার নাম, কী, বামারু বর্মন ত?
বর্মন? অর বাপা বর্মন!
আরে, উমরার একখান পুরা নাম, নাম্বা নাম আছে না?
বাঘারুর একখান নাম আছে? তোমাক কহিছে?
কহিছে ত কত কথা। উমরাক তো বাঘ ধরিছিল?
হয়। তোমার তানে কথা কহিছে ঐটা, এত্ত?
সে কি একখান কাথা? কত কাথা? অর জন্মকথা। অর মাই-এর কথা। মানষিটা বড় ভাল হে তোমার কাকা
বলদ।
উমরাক একখান আধিয়ারি দিছেন?
কাক?
উমরাক?
বাঘারুক?
হয়।
বাঘারুক আধিয়ারি?
হয়। এ্যানং কামের মানষিটা–
উ কহিছে তোমাক? আধিয়ারি দিবার কাথা?
না-হয়, না-হয়। মুই কহিছু।
উ তো হালের আগত থাকে। হালের পাছত বান্ধিলে উল্টা চাষ হবা ধরিবে।
কী কহিছেন? চারি পুহে এ্যাত জমি তুমার আর ঐ মানষিটাক একখান আধিয়ারি দিবার না পারেন?
আরে তোমরালা তো মোকই একখান আধিয়ার বানাবার ধইচছেন। মুই আর কাক আধিয়ারি দিম? খাড়াও কেনে। ঘরতে চলল। হাতমুখ ধোও। তার বাদে এইঠে আসি মিটিং দাও। আসিন্দিরক ডাকি, ভটভটিখান নি আসুক। গয়নাথ, হয় কথাটা এড়াতে, নয়, সামাজিকতার তাড়ায় বারান্দা থেকে নেমে রাস্তার দিকে হনহন করে হাঁটে। এম-এল-এ পেছন থেকে চেঁচায়, হে কাকা শুনেন, হে–
