দোকানপাতিতে যারা বসে ছিল, তারা ত হাট-কমিটির ঘরের দিকে, এখন হলকা ক্যাম্পের দিকে, হাঁটা দেয়ই, এম-এল-এর পার্টির লোকদের খবর দেয়ার জন্যেও কেউ-কেউ, ছোটে, আর কেউ-কেউ যায় তাদের দেউনিয়াদের জানাতে। গেরিমাটি রঙের জামাপরা ভদ্রলোক সিঁড়ি বেয়ে উঠে মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে বলেন, এইঠে কখন আসি বসিছ?
এই তো অ্যালায় আইচচু।
ফুলবাড়িঠে?
হয়।
ঐঠে কি লাথি দিয়া ব্রিজ ভাঙি দিছ!
না-হয়, না-হয়, বলে এম-এল-এ হাসে।
ত চলো কেনে, ঘরতে চলল, হাত মুখ ধোও, তার বাদে আসি বসিও, এইঠে কি মিটিং দিবেন আজি?
না-হয়, না-হয় মিটিং দিম কেনে?
কায় যে কহিল মালবাজারঠে ইনজিনিয়ার আসিবে।
আসিবে। মোরঠে কাথা আছে।
রাস্তা থেকে একটা দল মাঠে নামে। তাদের পেছনে একটা খুব চড়া আলো ঝুলিয়ে কেউ আসে। আচমকা ভাবটা কেটে গেলেই বোঝা যায়, হ্যাজাক। মাঠের লোকজনের লম্বা-লম্বা ছায়া বারান্দার আর ঘরের দেয়ালের আলোকে অন্ধকার দিয়ে ফালাফালা করতে করতে ক্রমেই ওপরে উঠে যায়। সেই লোজন, আর তাদের পেছনে একজন একটা টিনের থালার মধ্যে কয়েক কাপ চা আর একটা ডিশে মিষ্টি আর সিঙাড়া নিয়ে, এসে দাঁড়ায়। যার হাতে হ্যাজাকটা ছিল সে পেছন থেকে সামনে এসে বারান্দার ওপর আলোটা রাখায় লোকজনের খাড়া ছায়া বারান্দার দেয়াল থেকে বারান্দা গড়িয়ে মাঠে লম্বা হয়ে যায়। হ্যাজাকের পাশেই চা-মিষ্টির থালাটা নামিয়ে রেখে খালি গায়ের ছেলেটি বুড়ো আঙুলে ভর দিয়ে গলা বাড়িয়ে বলে, ঐ দোকানঠে পাঠাই দিছে, এততি
সেই গেরিমাটি-জামা ভদ্রলোক এতক্ষণে বারান্দায় উঠে এসে মিষ্টির ডিশটা তুলে এম-এল-এর সামনে ধরে বলে, ন্যাও; খ্যাও কেনে। একটা সিঙাড়া তুলতে-তুলতে এম-এল-এ সুহাসের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে, সাহেবকে দেন।
ভদ্রলোক সুহাসের সামনে নিয়ে যায়। সুহাস একটা ছোট মিষ্টি তুলে নেয়। ভদ্রলোক আবার এম-এল-এর সামনে ধরে বলেন, তুমি খাও ত বীরেন, আত্তিরে রাত্রিতে) এইঠে থাকিবেন ত?
আরে না-হয়, মোক কালি জলপাইগুড়ি যাবা লাগিবে, মিটিং আছে, বলে, এম-এল-এ একটা মিষ্টি তুলে মুখে ফেলে আঙুলটা পায়ে মুছে বলে, মুই আর খাম না, তারপর মিষ্টির ঢোকটা গিলে ফেলে বলে ওঠে, আরে আবার চা-টা কোথায়?
গেরিমাটির জামাপরা ভদ্রলোক মিষ্টির ডিশটা থেকে একটা করে মিষ্টি ভাগ করে করে বিলি করতে করতে বলে, দিছু খাড়াও, তারপর তাড়াতাড়ি এসে ঐ থালাটার ওপর ডিশটা নামিয়ে রেখে, থালায় উপচনো চায়ের জলে আঙুলটা ধুয়ে, একটা কাপ তুলে এনে এম-এল-একে দেয়। এম-এল-এ চায়ের কাপে চুমুকটা দিয়েই বলে, এ-হে, এ তো ঠাণ্ডা হয়া গেইসে–, বলে এক চুমুকে কাপটা শেষ, করে দেয়।
সুহাস একটু আড়ালে চলে গিয়েছিল তার নিজের ঘরের দিকে। এম-এল-এ যে চা-টা মুখে দিয়ে কথাটা বলে ওঠে এতে যেন তাদের দুজনের মধ্যে অভিজ্ঞতার একটা বিনিময় ঘটে যায়, নাগরিক অভিজ্ঞতার। সে জিজ্ঞাসা করে, কী, চা খাবেন নাকি আর-এক কাপ?
সুহাসের কথার ভেতরই ইঙ্গিত ছিল–সে বানানোর কথাই বলছে, দোকান থেকে আনার কথা নয়।
আপনি খাবেন? তা হলে আমিও খাই, বলে এম-এল-এ হাসে।
সুহাস তার ঘরের কাছ থেকে এগিয়ে এসে প্রিয়নাথের ঘরে ঢোকে। প্রিয়নাথ তখন রান্না চাপিয়ে দিয়েছে, প্রিয়নাথবাবু, আপনার হাতের চা ত আমাদের ভাল লেগে গেছে।
বসেন স্যার, আমি দিচ্ছি করে, প্রিয়নাথ তরকারি কুটতে কুটতে বলে।
আপনি একা বঁধছেন?
ওঁরা এসে যাবেন স্যার। ও তো আমাদের ঠিক হয়ে গেছে স্যার।
সুহাস বেরিয়ে আবার তার ঘরের সামনে এসে চেয়ারটিতে বসে পড়ে।
তার মানে, এই এম-এল-এর রুচি-স্বভাবে কলকাতার ছোঁয়া লেগে গেছে? এই অঞ্চলের ভেতর প্রোথিত এই মানুষটির স্বাদে ও অভ্যাসে নাগরিকতা এসে যাচ্ছে? কলকাতা ও নাগরিকতার সেই টানেই কি লোকটি ফুলবাড়ি বস্তি থেকে এসে তার এখানে বসেছে, একই অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লোভে?
এই একটু আড়াল থেকে সুহাস মনের এই প্রশ্নগুলি নিয়ে এম-এল-এর দিকে তাকায়। এম-এল-এ তখন তার পা নাচিয়ে-নাচিয়ে হাসতে-হাসতে সামনে মাঠের ভেতর ও পেছনে সিঁড়িতে দাঁড়ানো লোকগুলোর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
.
০৪৫.
এম-এল-এ ও গয়ানাথ
আলো ফেলে রাস্তায় একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায়। কিন্তু আওয়াজ করতেই বোঝা যায় মোটর সাইকেল। মোটর সাইকেল চলার সময় যত আওয়াজ করে, দাঁড়ালে আওয়াজ হয় তার চাইতে বেশি। কয়েকবার হেঁচকি তুলে মোটরসাইকেলটা আবার চলতে শুরু করে। আস্তে-আস্তে চলছে বলে হ্যান্ডেলটা নড়ে আর আলোটা ব্যায়ের জঙ্গল আর ডাইনের বাড়িঘরের গায়ে আছড়ায়–যেন কিছু খোঁজাখুজি চলছে। আলোটা মাঠের ভেতর কিছু চলে আসে, আবার ঘুরে যায়। মোটর সাইকেলের আওয়াজটাও # বাড়ে-কমে। তারপরই মোটর সাইকেলের আলোটা এই বারান্দার দিকে পড়ে আর আরো আওয়াজ তুলে এদিকে ছুটে আসে। হেডলাইটের আলো বারান্দা টপকে ঘরের ভেতর চলে যায়, হ্যাজাকের আলোটা মুছে দিয়ে। কিন্তু মোটর সাইকেলটা হঠাৎ থেমে যায়। আওয়াজ বাড়ে, আলো বাড়ে কিন্তু মোটর সাইকেলটা আর এগয় না। সিঁড়ির ওপর থেকে কেউ বলে, ফাঁসি গেইছে। এম-এল-এ বলে ওঠে, দেখেন ত কায়, ঠেলি দিয়া আসেন কনেক। দুজন লাফিয়ে নেমে মোটর সাইকেলের আলোটার দিকেই ছুটে যায়–বলদের গাড়ি কাদোত গাড়ি গেইছে, ঠেলো এ্যালায়। আলোটা একটা আওয়াজ তুলে নিবে যায়।
