এম-এল-এ নীরবে একটু হাসে, আপনি খুব জবর প্রশ্ন করলেন, আবার একটু চুপ করে থেকে বলে, হয় সত্যি জবাব দিব, না-হয় ত চুপ করি থাকব, আবার একটু চুপ করে থেকে বলে, আমিও আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে পারি কেন এই কথা জিজ্ঞাসা করলেন। সুহাস বোঝে না এই ভাষায় প্রশ্নটা আসলে করাই হল কি না। এম-এল-এ বলে, কিন্তু সেটা ত আমি জানি, আপনারা কেন এই কথা জিজ্ঞাসা করেন জানি, আমি ঠিক উত্তরটাই দিব।
একটু সময় নিয়ে এম-এল-এ বলে, প্রথম থিকেই বলি। বড় ঘুম পায়।
সুহাস হাসে, আমরা ত তাই শুনি, এসেম্বলিতে ভাল ঘুম হয়।
হ্যাঁ। এয়ার কনডিশন ত। আর কলকাতায় সে গরম। ঘামিটামি ঢুকিলেন আর অনং ঠাণ্ডা। শরীরটা চট করি ছাড়ি দিবার চায়। প্রথম প্রথম ত চোখ দুইখান খুলা রাখাই এক হাঙ্গামা হয়া গেইল। যখনই যাই তখনই ঘুমাই। তার পর ভাত না খাইয়া রুটি খাওয়া ধরিলাম।
এসেম্বলির জন্যে খাওয়া বদলালেন?
না বদলাই করি কী। আমরা ত ভাত খাই, জানেনই, হাইজাম্পের নাখান। অত ভাত খায়া ঐ হলে ঢুকিবার বাদে মরার মতন ঘুম আসে। এখন ঘুমটা কমি গেইসে। ইচ্ছা করিলে ঘুমাবার পারি। ইচ্ছা করিলে জাগি থাকবার পারি। কিন্তু মাথাধরাশান মোর এ্যালায়ও সারে নাই।
মাথা ধরে?
হ্যাঁ।
বক্তৃতায়?
না। ঐ এয়ার কনডিশনে। যখন বাহিরে আসি কেমন গা গোলায় আর মাথা ধরে আর বুকটা ঠাণ্ডা লাগে।
তা হলে যান কেন? আপনাকে ত আর অত ঘন-ঘন বলতে হয় না!
আমাকে বলতে হয় না কিন্তু আমাদের সব প্রফেসর কমরেডরা আছে, উকিল কমরেডরা আছে। ভাল বলে। ইউনিয়নের নেতারাও ভাল বলে। তাদের সব পয়েন্ট দেই, কী কেস বুঝাই, কোর্টের মতন আর কী!
কোর্টের মতন?
ঐ আর-কি। আপনি আমি কি আর কোর্টে গিয়া সওয়াল করতে পারি? তার জন্য উকিল-মোক্তার। লাগে। কালা কোর্ট লাগে। ওরা সব কোর্টের আইন জানে। তেমনি এসেম্বলিরও নিয়ম আছে সব। কখন কোনটা বলা যায়। বললে ঠিকমত লাগবে। কখন কোন কথাটা তুলতে হয়। সেই সব যারা জানে তারাই বলা-কওয়া করে।
আপনিও তো উকিল। মেম্বার
জুনিয়র জুনিয়র বলে এম-এল-এ হো হো করে হেসে উঠে যোগ করে, আপনি আমার ভোটার না ত তাই বলি দিলাম। ভোটারকে বলি আমি না গেলে ত এসেম্বলি অচল বলে এম-এল-এ আরো হাসে। সুহাসও তার সঙ্গে যোগ দেয়। তারপর জিজ্ঞাসা করে, তাহলে যান কেন ওখানে?
এইটা আপনারা কী বলেন? এম-এল-এ হাসি কমাতে কমাতে বলে, পার্টি করি মানে তো ক্ষমতা চাই। এসেম্বলিতে যে-পার্টির মেম্বার বেশি সেই পার্টি ক্ষমতায় আসে। আমরাও ক্ষমতায় আছি। পাটি করিবেন কিন্তু ক্ষমতা নিবেন না এ ক্যানং করি হবে? বিয়া বসিবেন কিন্তু বউয়ের সঙ্গে শুবেন না–এ কি হয়? সে ত হিজড়ারাও কবার পারে–গর্ভ ধরে শুয়াররা আর এক মানষিই পারে হিজড়া হবার। এম-এল-এর হাসি উত্তাল হয়ে ওঠে। সুহাসকে, যেন পরাজিতের মত স্মিত থাকতে হয়।
.
০৪৪.
এম-এল-এ–র চা খাওয়া
এম-এল-এ-র সঙ্গে যে-দলটা এসেছিল তার কেউ-কেউ চায়ের দোকানে গেছে আর কেউ-কেউ সিঁড়ির ওপর হেলান দিয়ে বসে। প্রিয়নাথের লণ্ঠনে এত কালি পড়েছে সেটার আলোতে আর-কিছু দেখা যায় না, শুধু সেটাকেই দেখা যায়। কিন্তু ক্রান্তি হাটের মত জায়গার একটা আস্ত এম-এল-এ এরকম অন্ধকারে একটা বারান্দায় বসে থাকবে-এটা ত খুব স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। পরন্তু এম-এল-এ আজ দুপুরেই সার্ভে ক্যাম্প দেখে, সেখানে সকলের সামনে একটা বক্তৃতা দিয়ে, ক্রান্তি হাট দিয়ে, আপলাদ ফরেস্ট দিয়ে, সেই ফুলবাড়ি বস্তি চলে গিয়েছিল। আবার, সন্ধ্যাবেলায় ফিরে এসেছে। সঙ্গে ফুলবাড়ির লোকজন। লোকজন অবিশ্যি এম-এল-এর সঙ্গে সব সময়ই থাকে। কিন্তু দুপুরে ক্রান্তি হাট থেকে গিয়ে, আবার সন্ধ্যাতেই ক্রান্তি হাটে ফিরে আসা, এটা খুব সাধারণ ব্যাপার নয়। এম-এল-এরা সব সময় ফোঁড়াখুঁড়ি করে চলে। এদিক দিয়ে ঢুকে ওদিক দিয়ে বেরয়। এই বীরেনবাবু এম-এল-এ ফুলবাড়ি থেকে মানাবাড়ি-ওদলাবাড়ি দিয়ে বেরলে টুরে তার ঐ—-জায়গাটাও দেখা হয়ে যেত, লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা হতে পারত। তা না করে যখন সে ফিরে এসেছে তখন ঘটনা খুব পাকিয়ে উঠেছে, নিশ্চয়। এসে, আবার বারান্দায় বসে আছে? এম-এল-এ কখনো এক জায়গায় বসে থাকে না, মিটিং ছাড়া। এম-এল-এ মানেই চলছে–হয় হেঁটে, নয় গাড়িতে, না-হয় প্লেনে, না-হয় ট্রেনে। মিটিং ছাড়া এম-এল-এ একা-একা বসে আছে, মানে, ঘটনাটাও বসে পড়ার মত।
এই রকম একটা ঘটনা ক্রান্তি হাটেই ঘটে যাবে, আজ সন্ধ্যাবেলায়, এর জন্য কেউ তৈরি ছিল না। এম-এল-এ কাউকে খবর দেয় নি। যাবার সময় বলেও যায় নি, ফিরে আসবে। সোজা হলকা ক্যাম্পে গিয়ে বারান্দায় বসেছে, অন্ধকারে! আর, এখানকার লোকজনকে সে-খবরটা শুনতে হয়, ফুলবাড়ি বস্তির যারা এম-এল-এর সঙ্গে এসেছে, চায়ের দোকানে তাদের কারো কারো কথা থেকে। হাটবার ছাড়া ক্রান্তি হাটের এই চায়ের দোকানে এতগুলো অচেনা মুখের লোক যদি একসঙ্গে বসে চা খায়, তা হলে তাদের কথাবার্তায় কান পাততেই হয়, আর তাতেই খবরটা জানা যায়। তখন তাদের সরাসরি জিজ্ঞাসাও করা যায়–কেন এসেছে, কোথায় আছে, কী ব্যাপার। ফুলবাড়ির ফুলঝোরার ওপরে যে ক্যালভার্টটা তৈরি হচ্ছিল, তাই নিয়ে গোলমাল। এম-এল-এ নাকি রেলিংটাতে এক লাথি মেরেছে আর রেলিংটা ভেঙে গেছে। ইনজিনিয়ারকে ডাকতে মালবাজারে তোক গেছে। ইঞ্জিনিয়ারকে এখানে ধরে নিয়ে আসবে।
